“আমাদের কি হাতীর পিঠে চড়ে বাঘের পিছনে ধাওয়া করা উচিত না?” ফ্রান্সিস জানতে চাইলো।
অ্যানা ওর প্রশ্নটা রাজাকে অনুবাদ করে শোনালো।
“জঙ্গলে ঢুকে খুঁজলেই বাঘ পাওয়া যায় না,” রাজা ব্যাখ্যা করলেন। “ওদেরকে আগে ওদের আস্তানা থেকে বের করে আনতে হবে। আমার লোকেরা বনের কয়েকটা জায়গায় মহিষ বেধে রেখেছে। বাঘ ওগুলোকে খেতে আসলেই, ওরা আমাদেরকে খবর দেবে। তখন আমরা সেখানে যাবো।”
শাহুজিকে সেদিন সকালে বেশ ফুরফুরে মেজাজে দেখা গেলো। মহলে থাকতে যেকরকম সবসময় চিন্তিত থাকেন এখানে সেরকম নেই মোটেও। অবশ্য একটা ভাবগাম্ভীর্যের মুখোশ পরে আছেন, কিন্তু তবুও শিকারের আনন্দ আর উত্তেজনা লুকাতে পারছেন না। যে লোকটা জীবনের অর্ধেক সময় বন্দী হিসেবে কাটিয়েছে, তার কাছে এই বিশাল জঙ্গলের মাঝে একটা জন্তুকে ধাওয়া করা যে কেমন আনন্দের হতে পারে, তা টম অনুধাবন করতে পারলো।
একজন সংবাদ বাহক প্যাগোডার সামনের খোলা জায়গাটায় দৌড়ে এলো। তার সারা গা ঘামে ভেজা, জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে। খবরটা কোনোমতে দিয়েই হাটু মুড়ে বসে পড়লো সে।
শাহুজি তার অতিথিদের দিকে ফিরলেন। উত্তেজনায় চেহারা জ্বলজ্বল করছে তার। এরমধ্যেই চাকরেরা হাতীগুলোতে অস্ত্রপাতি তুলতে শুরু করে দিয়েছে।
“একটা বাঘ মহিষ খেতে এসেছে,” একজন আর একজনকে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো সবাই।
টম জীবনে অগণিত হাতী মেরেছে, কিন্তু এই প্রথম একটার পিঠে চড়তে যাচ্ছে। আফ্রিকার যেসব হাতি দেখে অভ্যস্ত ও, এটা সেগুলোর চাইতে ছোট, কিন্তু তবুও দেখলেই সম্ভ্রম জাগে। হাতীগুলোর দুই চোখের মাঝে লাল রঙের বিশাল একটা বৃত্ত আঁকা হয়েছে। তাতে চেহারায় একটা জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব চলে এসেছে। অভ্যাসবশত টম ওটার দাঁত দুটো মাপতে শুরু করলো আর ভাবতে লাগলো কেপ টাউনে কতোটা নিয়ে ফিরতে পারবে।
মাহুত হাতীটার পেটে চাপড় দিতেই ওটা হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো। টম জানোয়ারটার বাড়িয়ে দেওয়া পিছনের পায়ে ভর দিয়ে ওটার নিতম্বের উপর উঠে এলো, তারপর হাওড়ায় গিয়ে বসলো। একটা ছোট ছেলে এক জোড়া জবরদস্ত বন্দুক নিয়ে উঠে এলো। বন্দুকের গায়ে রুপার খোল পরানো। চোখ কুচকে নলের ভিতর দিয়ে তাকালো টম। বন্দুকটার গতি আর দক্ষতা যে অনেক বেশি, তা দেখেই বোঝা গেলো।
মাহুত দড়াবাজিকরের মতো লাফ দিয়ে হাতীর মাথার দিক দিয়ে উঠে এলো। তারপর ওটার ঘাড়ের ওপর বসে পা দুটো গুঁজে দিলো জানোয়ারটার কানের পেছনে। লোকটা স্পষ্ট কিন্তু নিচু গলায় কিছু একটা বলতেই উঠে দাঁড়ালো হাতীটা। টম পিছনে তাকিয়ে দেখলো অ্যানা আর ফ্রান্সিসও যার যার হাতীতে চড়ে বসেছে। সবার আগে আছেন রাজা। ওনার হাওড়াটার কাঠে দুর্দান্ত সুন্দর নকশা কাটা আর সোনার সুতা দিয়ে বোনা একটা কাপড় দিয়ে মোড়া।
টম কিছুক্ষণের মাঝেই হাতীটার হেলেদুলে চলার সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেলো। ধীরে ধীরে জঙ্গলের গভীরে এগিয়ে চললো ওটা। জন্তুটার সামর্থের কথা ভাবতেই মনে মনে অবাক হলো টম। যদি হাওড়াটা গাছের কোনো ডালে বাধার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তাহলে হাতীটা শুড় বাড়িয়ে সেই ডালটা টেনে ভেঙে দিতে লাগলো। মাঝে মাঝে সরু রাস্তায় পুরো গাছটাকেই ঠেলে ফেলে দিলো। রাস্তায় পানি বা কাদা থাকলে মাথা নামিয়ে শুড় দিয়ে দেখে নিতে লাগলো কোথায় পাড়া দিলে পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
কয়েক মাইল পর একটা শৈলশিরার কাছে এসে উপস্থিত হলো ওরা। ওখানে রাস্তা থেকে নেমে একটা নালা দিয়ে আগাতে লাগলো এরপর। নালাটা আসলে একটা শুকিয়ে যাওয়া নদীগর্ভ। ওখান দিয়ে প্রায় কয়েক মাইল গেলো ওরা। নদী গর্ভের কাদা আর বালিতে নানা প্রজাতির জন্তু জানোয়ারের পদচিহ্ন চিহ্নিত করতে পারলো টম। গাছের ডালে বানর কিচিকিচ করতে লাগলো। নদীর ধার দিয়ে গলা বড়িয়ে উঁকিঝুঁকি দিতে লাগলো বন মোরগ। এক ঝাঁক ময়ুর উড়ে গেলো ওদের মাথার ঠিক উপর দিয়ে। সূর্যের আলোয় ওগুলোর নীল রঙের গলা ঝিলিক দিতে লাগলো। দৃশ্যটা দেখে টম হঠাৎ একটা বেদনা অনুভব করলো। নেপচুন তরবারিটার কথা মনে পড়ে গিয়েছে ওর।
নদীর এক জায়গায় একটা ক্ষীণ ধারা এসে মিশেছে, রাজা সেখানে সবাইকে থামতে আদেশ করলেন। হাতীগুলো হাঁটু মুড়ে বসতেই শিকারিরা সব নেমে পড়লো। টম ওর পা সোজা করতে করতে আশপাশটা দেখতে লাগলো। নিচের মাটিতে ওদের শিকারের কোনো চিহ্ন দেখা যায় কিনা সেটা খুঁজছে।
শাহুজির চোখ এড়ালো না ব্যাপারটা। এর আগে কখনো বাঘ শিকার করেছেন?” অ্যানার মাধ্যমে জিজ্ঞেস করলেন উনি।
“সিংহ শিকার করেছি।”
শাহুজি মাথা ঝাঁকালেন। “আমি সিংহ দেখেছি। মুঘল সম্রাট তার মনোরঞ্জনের জন্যে দিল্লির দরবারে কয়েকটা এনে রেখেছিলেন। কিন্তু বাঘ বেশি ভয়ংকর। আকারেও বড়, শক্তিশালী, হিংস্র। সিংহ দলবেধে শিকার করে, কিন্তু বাঘ করে একা একা। তাই ওকে বেশি শক্তিশালী আর ধূর্ত হতে হয়। আমি একটা বাঘকে একটা মহিষ মেরে মুখে করে টেনে নিয়ে যেতে দেখেছি। যেনো একটা বিড়াল ইঁদুর মেরে নিয়ে যাচ্ছে।”
শাহুজি টমের চেহারার অবিশ্বাসী দৃষ্টিটা খেয়াল করলেন। “একবার দিল্লিতে, সম্রাট বাঘ আর সিংহের লড়াইয়ের আয়োজন করেছিলেন। মহল জুড়ে তখন শুধু এই লড়াই নিয়ে আলাপ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সামন্তরা জড়ো হতে থাকেন এই অভূতপূর্ব লড়াই দেখার জন্যে। জানোয়ার দুটোকে যখন খাঁচার ভিতর ছেড়ে দেওয়া হয়, দর্শকেরা সবাই উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো।”
