শাহুজির পিছনে, সূর্যের আলো মেঘ ভেদ করে নেমে এসে কুয়াশাকে রাঙ্গিয়ে দিলো। ঠিক যুদ্ধক্ষেত্রে ধোঁয়ার মাঝে কামানের গোলার আগুনের মতো। টম রাজার দিকে তাকালো, কিন্তু তার ভাবলেশহীন চেহারা দেখে কিছুই বোঝা গেলো না।
তবে বোঝা গেলো যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। উনি সোজা হয়ে টমের কাঁধের উপর দিয়ে কিছু একটা বললেন। ঘুরতেই টম দেখলো কমপক্ষে আধা ডজন চাকর দাঁড়িয়ে আছে পিছনে। যদিও ও নিশ্চিত যে এরা এখানে একটু আগেও ছিলো না। চাকরেরা কুর্নিশ করে টম আর তার সাথীদেরকে ওদের পিছু নিতে ইশারা করলো। তার মানে ওদের আলাপ শেষ।
“উনি কি বললেন?” আবার প্রাসাদের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে ফ্রান্সিস অ্যানাকে জিজ্ঞেস করলো।
“ঘোষণা দিলেন যে উনি শিকারে যাবেন।”
ফ্রান্সিস করিডোরের মুখে ঝপ করে দাঁড়িয়ে গেলো। “আমরা এখানে যুদ্ধ করতে এসেছি, শিকার না, প্রতিবাদ করলো ও।
“তুমি বোঝোনি,” অ্যানা বললো। “একটা হচ্ছে অন্যটার প্রস্তুতি। রাজা আমাদের প্রস্তাব বিবেচনা করছেন, কিন্তু উনি আরো কয়েকটা বিকল্পও ভেবে দেখছেন। যখন উনি ওনার সামন্তদেরকে শিকারের জন্য আহ্বান করবেন, তখন তারা তাদের সাথে তাদের চাকর বাকর, সৈন্যদল আর অস্ত্রপাতিও নিয়ে আসবে। উনি ওনার সৈন্যদেরকে জড়ো করছেন কিন্তু যুদ্ধে যাবেন কি যাবেন সেই সিদ্ধান্ত ভোলা রয়েছে। আর তাছাড়া শিকার সফল হলে সেটা যুদ্ধে সাফল্যের জন্যেও বড় একটা লক্ষণ বলে বিবেচিত হবে।”
“যদি শিকার ভালো না হয়?”
অ্যানা কাঁধ ঝাঁকালো, “প্রার্থনা করো যেনো তেমনটা না হয়।”
৮. শাহুজির প্রাসাদ
শাহুজির প্রাসাদেই থাকার ব্যবস্থা হলো ওদের। পরের কয়েকদিন যাবত একের পর এক অস্ত্রধারী সৈন্যদল পাহাড়ের ওই বিপদসংকুল রাস্তাটা ধরে উঠে আসতে লাগলো। সেই থেকে পুরো মহল এক মুহূর্তের জন্যেও আর নীরব নেই। আস্তাবলে, হাতীর দল থেকে থেকে শুড় তুলে ডেকে উঠছে। ঘোড়াগুলো মাটিতে খুর ঠুকে শব্দ করছে।
টম পুরোটা সময় জাবর কেটে পার করে দিলো। ওদের খাতির যত্ন কম করছেন না শাহুজি। সুন্দরি পরিচারিকাদেরকে দিয়ে প্রচুর খাবার আর পানীয় পাঠিয়েছেন। কিন্তু মহলের মূল ভবন ছেড়ে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। টম জানালার ধারে বসে বসে সৈন্য সামন্তের আসা যাওয়া দেখলো, তারপর বিরক্তি ধরে গেলে দাবা খেললো বসে বসে। ফ্রান্সিস মোটামুটি খেলতে পারে। টম সেই ছোট থেকেই দাবা খেলে বড় হয়েছে। তাই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলো আনার সাথে।
“ইশ যদি বাস্তব জীবনেও একটা দুর্গ দখল করা এতোটা সহজ হতো,” টমের একটা নৌকা খেয়ে দিয়ে বললো অ্যানা। খুঁটিগুলো সব হাতীর দাঁতের বানানো। টম আগে কখনো এরকম খুঁটি দিয়ে দাবা খেলেনি। সবগুলো খুঁটিই হয় হাতী, নাহয় কোনো দেবতা, নাহয় সাধারণ কোনো সৈনিকের মতো করে বানানো। মানে খুঁটিগুলোর পদমর্যাদাও একদম নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
টম মন্ত্রী দিয়ে আক্রমণ করে জবাব দিলো। পরের কয়েক চালেই ও অ্যানার দুটো বড়ে, একটা হাতী আর একটা নৌকা খেয়ে রাজাকে কোণঠাসা করে ফেললো।
“আপনি ঠিক একজন ইংরেজের মতো খেলেন,” অ্যানা বললো। কণ্ঠে মুগ্ধতা। বাকি সব টুপিওয়ালার মতোই আপনি আক্রমণ করতে ভালোবাসেন, ফলাফল নিয়ে অতো ভাবেন না। আর ভারতীয়রা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে ভালোবাসে।”
অ্যানা ওর ঘোড়াটা তুলে একটা চুমু খেলো, তারপর সেটা দিয়ে টমের মন্ত্রীকে খেয়ে দিলো।
“অপেক্ষা খুবই বিরক্তিকর,” টম বললো অ্যানাকে। ওর হাতী বোর্ডের অন্য প্রান্ত থেকে এসে রাজার কোণাকুণি একটা ঘরে স্থির হলো। রাজা চাইলে ওটাকে খেতে পারবে না, কারণ ঘরটাকে পাহারা দিচ্ছে ওর ঘোড়া। ফলে রাজার আর নড়ার জায়গা রইলো না।
“চেকমেট,” হেসে অ্যানাকে বললো টম।
*
শিকারের দিন সকাল বেলা শাহুজির একজন চাকর এসে ওদেরকে ডেকে নিয়ে গেলো। তারপর পালকিতে করে পাহাড় থেকে নিচে নামিয়ে আরো কয়েক মাইল দূরে শাহুজির শিকার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসলো রাজার ডুলিরা। বাড়িটা হচ্ছে একটা নির্মল দিঘির পাশে বানানো কয়েক তলার একটা প্যাগোডা। ওটার সামনে দেয়ালে ঘেরা একটা বাগানও আছে।
টম আর ফ্রান্সিস দুজনেরই শিকারে হাতেখড়ি হাই উইল্ড এস্টেটের বাগানবাড়িতে। সেই পুরনো স্মৃতি ফিরে এলো ওদেরঃ ঢাকের আওয়াজ, শিঙার শব্দ আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো উত্তেজনা। তবে এতো বড় পরিসরে কখনো শিকারের সুযোগ হয়নি আগে। কয়েকশো ঢাক দেখা গেলো। বাদ্যকরেরা বাঁশি সহ আরো নানা প্রকার তারের বাদ্য বাজাচ্ছে। পরিচারিকারা সবাইকে লবঙ্গ মেশানো আরক পরিবেশন করছে, এছাড়াও আছে থালা ভর্তি খেজুর আর কাঠবাদাম। হাতীগুলো শান্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে, মাহুতের দেওয়া বিশাল পাতার আটি থেকে একমনে চিবিয়ে যাচ্ছে। ওগুলোর পিঠে সুন্দর নকশাকাটা অনেকগুলো বক্স দেখা গেলো। অ্যানা বললো ওগুলোর নাম নাকি হাওড়াহ।
“ওগুলোতে করে বাঘ মারতে যাবো আমরা, অ্যানা জানালো।
ফ্রান্সিস বিশাল জানোয়ারগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো। “পড়ে যাবো নাতো?”
“সরাসরি বাঘের মুখে পড়ার চাইতে অন্তত নিরাপদ,” আশ্বস্ত করলো অ্যানা।
প্রথমে ঢাকীর দলে ঢুকে গেলো জঙ্গলের ভিতরে। হাতে লাঠি আর কুড়াল। বাকিরা অপেক্ষা করতে করতে সকালটা ওখানেই কাটিয়ে দিলো। বাদ্যকরেরা বাজানো বন্ধ করে দিলো একসময়; হাসি ঠাট্টা স্তিমিত হয়ে নীরব কথপকথনে রূপ নিলো। সবচে জোরে শব্দ হতে লাগলো শুধু হাতীগুলোর পাতা চাবানোর। সকল শিকারিরা জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
