“আপনি কখনো কোনো মুঘল ঘোড়সওয়ারকে দেখেছেন?” প্রশ্নটা করে শাহুজি উত্তরের অপেক্ষা না করেই বললেন, “ওদের ঘোড়াগুলো দুনিয়ার সবচে বড় আর সবার চাইতে শক্তিশালী। ঘোড়াগুলোকে ওভাবেই বড় করা হয়। কারণ অস্ত্র আর বর্মসহ একজন ঘোড়সওয়ারের ওজন হয় অনেক। আমাদের ঘোড়াগুলো ছোট। ছোট ছোট পায়ের জানোয়ার। পাহাড়ে চড়তে বা দ্রুত পালাতে কাজে লাগে। আমরা কখনোই মুঘলদের সাথে সামনা সামনি লড়াই করার সাহস করিনি। ওরা যখন আমাদের বিরুদ্ধে লড়তে আসতো, তখন আমরা ওদেরকে পার হয়ে যেতে দিতাম। তারপর ওদের রসদপত্র আনা নেওয়ার রাস্তা দিতাম বন্ধ করে। ওরা যখন আমাদের দুর্গ অবরোধ করতো, আমরা ওদেরকে দখল ছেড়ে দিয়ে আমাদের নিজেদের ফসলের ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিতাম আর সব গবাদি পশু জবাই করে ফেলতাম, যাতে দখলকারীরা না খেয়ে থাকে। এভাবেই আমরা যুদ্ধ চালিয়েছি। টিরাকোলার মতো একটা দুর্গের সামনে আমরা খড়কুটোর মতোই উড়ে যাবে।”
“আপনাদের মনে কোনো দয়ামায়া নেই?” রেগেমেগে বললো ফ্রান্সিস। “কতোদিন হচ্ছে আমার খালা দস্যুগুলোর হাতে বন্দী। আপনি ওনাদেরকে ঐ কয়েদখানায় ওভাবে পচে মরতে দেবেন?”
নির্বিকার চোখে ওর দিকে তাকালেন শাহুজি। “ছোট থাকতে আমাকে বন্দী করে মুঘল দরবারে পাঠানো হয়েছিলো। আমি আমার পুরো শৈশব ওখানে কাটিয়েছি। আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবতাম আজ কি প্রহরীরা আমার গর্দান উড়িয়ে দেবে কিনা; আর প্রতি সন্ধ্যায় শুতে যাওয়ার আগে আমি জানতাম না যে পরের সকালটা দেখতে পাবো কিনা।”
“আমি জানতাম না সেটা,” ফ্রান্সিস চোখ নামিয়ে নিলো। লজ্জা পেয়েছে।
“আমার বয়স যখন এগারো, মুঘলেরা আমার বাবাকে আটক করে। আমার বাবা আনুগত্য স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। মুঘলরা তাই তাকে শিকারি কুকুরের মুখে ছেড়ে দেয়। ওরা বাবার একটা একটা করে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ছিঁড়ে ফেলে। আমাকে জোর করে পুরো দৃশ্যটা দেখানো হয়। তারপর এই বিজয়ের উৎসবে আমাকে বসানো হয় ঠিক মুঘল সম্রাটের পাশে। তাহলে বুঝতেই পারছেন, বন্দী হিসেবে কেমন লাগে সেটা জানা আছে আমার।”
ফ্রান্সিস নিচু গলায় ক্ষমা চাইলো। টমও মাথা নিচু করে সহমর্মিতা জানালো। এখন ও বুঝতে পারছে যে কিভাবে শাহুজি এতো নিরুত্তাপ কণ্ঠে নিজের সাম্রাজ্যের ধংসের কথা আলাপ করতে পারছেন। একজন বন্দী হিসেবে, সবসময় গলার সামনে একটা তরবারি নিয়ে বড় হয়েছেন উনি। ফলে ওনার আবেগ অনুভূতিকে এতো গভীরে কবর দিতে শিখেছেন যে ওগুলো হয়তো আর কোনোদিনও আলোর মুখ দেখবে না।
“আমি আসলে করুণা ভিক্ষার জন্যে আসিনি,” টম বলতে শুরু করলো।
শাহুজি কিছুই বললেন না, কিন্তু তার চোখে অধৈর্য ঝিলিক দিয়ে উঠলো।
“কিন্তু আমার বিশ্বাস আমাদের দুজনেরই লক্ষ্য উদ্দেশ্য একই।”
অ্যানা যোগ দিলো আলোচনায়। “দস্যু আংরিয়া এই গৃহযুদ্ধে আপনার ফুফু আর তার ছেলেকে সমর্থন দিচ্ছে। আপনি যদি আপনার রাজ্যকে আবার জোড়া দিতে চান, তাহলে সবার আগে আংরিয়াকে সরাতে হবে।”
“আমার বাবা মুঘলদেরকে তিলে তিলে পরাজিত করেছিলেন। আমিও আংরিয়াকে সেভাবেই পরাজিত করবো-সময় নিয়ে। আর তাছাড়া টিরাকোলা দুর্গ অজেয়।”
টম বিরক্তিসূচক শব্দ করে উঠলো। “যার সাথেই দেখা হয়, সে-ই একথা বলে। কেউ কখনো ওটাকে আক্রমণ করে দেখেছে?”
“যারা করেছে তারা সেই কাহিনি বলার জন্যে আর বেঁচে নেই,” শাহুজির মুখে একটা হাসি ফুটে উঠতে উঠতেও উঠলো না।
“আমাকে একদল সৈন্য দিন। আমি ওই দুর্গের ফটক খুলে আপনার হাতে তুলে দেবো,” নিষ্কল্প কণ্ঠে বললো টম।
“আমি শুনেছি যে আপনি নাকি অবরোধ ঠেকানোর ব্যাপারে ভালোই পারদর্শী। তা সেভাবে কি অবরোধ করতেও পারবেন?”
টম শাহুজির তাকানোর ভঙ্গিটা খেয়াল করলো। লোকটার জ্ঞান সম্পর্কে একটা আন্দাজ করতে পারলো ও। ব্রিঞ্জোয়ানের দুর্গ অবরোধ এখান থেকে কয়েকশো মাইল দূরে সংগঠিত হয়েছে। অন্য আর একটা সাম্রাজ্য, অন্য আর একটা নামে, কিন্তু তবুও শাহজি সেটা জানেন। এটাও ধরে ফেলেছেন যে টম ওখানে ছিলো। অথচ ও আজ সকালেই এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। টম ভিতরে ভিতরে মুগ্ধ না হয়ে পারলো না।
“আপনি কি দস্যু আল-আউফ এর নাম শুনেছেন?” টম জিজ্ঞেস করলো।
“অশুভ?” শাহুজি সহজেই আরবি নামটার বাঙলা করে ফেললেন। মুঘল দরবারে বড় হওয়ায় আরবি ভাষাটা সম্ভবত ভালোই জানেন উনি। “দুঃখি শুনিনি।”
“কারণ সে বহু আগেই মারা গিয়ছে। মরার আগ পর্যন্ত সে ছিলো ভারত মহাসাগরের সবচে ভয়ংকর জলদস্যু। এমনকি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এতো সুরক্ষিত জাহাজগুলো পর্যন্ত ওর হাত থেকে রক্ষা পেতো না। ফ্লোর-ডি-লা মার নামের একটা দ্বীপে বিশাল একটা দুর্গ ছিলো তার। ওখান থেকেই সবকিছু পরিচালনা করতো সে। দুর্গের প্রতিরক্ষায় ছিলো অস্ত্র-গোলাবারুদ আর কামানসহ প্রায় এক হাজার জলদস্যুর বিশাল বাহিনি। লোকজন ঐ দুৰ্গটাকেও দুর্ভেদ্য বলতো। আমি আর আমার বাবা মিলে ওদের জাহাজের বহর জ্বালিয়ে দিয়ে, দুর্গের দরজা উড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমি নিজে আল-আউফের মাথা ওর ধড় থেকে আলাদা করেছিলাম।”
ওটাই ছিলো হাল কোর্টনীর জীবনের শেষ যুদ্ধ। যে বিস্ফোরণে দুর্গের দেয়াল উড়িয়ে দেওয়া হয়, সেটার আঘাতেই উনি পা হারান। কয়দিন পরেই গ্যাংগ্রিনে তার জীবনাবসান হয়। কিন্তু টম সেটার কথা উল্লেখ করলো না।
