“আমি একটু আপনার সাথে একাকী কথা বলতে চাই,” সোজাসুজি বলে দিলো ইম। ও খুব ভালোমতোই জানে যে দরবার হচ্ছে রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চ, এখানে বসে রাজাকে পটানো যাবে না।
শাহুজি ঠোঁট গোল করে তাকালেন টমের দিকে। তারপর কোনো কথা না বলে সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিচে নেমে এলেন। সভাসদরা সরে দাঁড়ালো; দূরের দেয়ালে একটা দরজা খুলে দিলো কেউ। টম আর বাকিরা রাজার পিছু নিয়ে আগালো সেদিকে। দরজাটা দিয়ে ওরা বাইরের প্রান্তরের দিকে মুখ করে থাকা একটা পাথরের ব্যালকনিতে এসে উপস্থিত হলো। অ্যানার বলা মুঘল সেনাপতির পরিবারের কথা মনে পড়লো টমের। এখানে দাঁড়িয়েই কি সেনাপতি দেখতে পেয়েছিলেন যে তার স্ত্রী আর মেয়ে নিচে কামানের মুখে বাধা? ওদের কান্না কি ওখান থেকে ওনার কানে এসে পৌঁছাচ্ছিলো?
প্রহরীরা ওদেরকে ওখানে রেখে দরবারে ফিরে গেলো আবার। যাওয়ার পথে দরজাটা ভিড়িয়ে দিলো। এখানেও সব কিছু নীরব, শুধু রাজার গলার মালার টুকটাক আর পাহাড়ে বাড়ি খাওয়া বাতাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে মাঝে মাঝে।
“কেন আপনি আপনার ভাইয়ের বিরুদ্ধে যেতে চান?” শাহুজি একরকম নির্বিকার ভাবে প্রশ্নটা করলেন। যেনো টমের শরীর স্বাস্থ্যের খবর নিচ্ছেন।
“আমার ধারণা আমাদের দুজনেরই একজনের বিরুদ্ধে শত্রুতা আছে।”
“গভর্নর কোর্টনী আমার শক্র না।”
“আমি দস্যু আংরিয়ার কথা বলছিলাম। সে আপনার জাহাজ লুট করে উপকূলে ত্রাসের সৃষ্টি করেছে। আর সে আপনার বিরুদ্ধে আপনার ফুফুর পক্ষ হয়ে কাজ করছে।”
শাহুজি এতো সামান্য মাথা ঝোঁকালেন যে বোঝাই গেলো না।
“আংরিয়া আমার স্ত্রী আর তার বোনকে ধরে নিয়ে গিয়েছে,” টম বলে চললো। “তারপর টিরাকোলার দুর্গে ওদেরকে আটকে রেখেছে।”
শাহুজির চেহারায় সামান্য বিরক্তি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেলো আবার, এই প্রথম তার চেহারায় কোনো অনুভূতি দেখা গেলো। “টিরাকোলা আমার দুর্গ,” শাহুজী বললেন।
“আর সেজন্যেই আমরা আপনার কাছে এসেছি,” তাড়াতাড়ি বললো টম। “আপনি আপনার দুর্গ ফেরত চান, আমি আমার পরিবার ফেরত চাই।”
শাহুজি কি ওর কথায় উৎসাহিত হলেন নাকি অপমানিত হলেন সেটা টম বুঝতে পারলো না।
“আমার ভাই গাই আপনার সাথে একটা চুক্তি করতে চায়,” টম বললো। “ও আংরিয়াকে ওর শয়তানি চালিয়ে যেতে দিচ্ছে, যাতে করে আপনি ওর সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হন। কিন্তু আমরা যদি আংরিয়াকে ওর দুর্গ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে ওর আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে পারি, তাহলে আপনি কিন্তু। গাইয়ের চাইতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। আর তাছাড়া উপরি হিসেবে নিজের দুৰ্গটা তো ফেরত পাচ্ছেন-ই।”
“তা আমাকে এসব কেন বলছেন?” শাহুজি জিজ্ঞেস করলেন।
“কারণ আংরিয়া বন্দীদের জন্যে মুক্তিপণ দাবী করেছে, আর গাই সেই টাকাটা দিতে সম্মত হচ্ছে না,” ফ্রান্সিস মাঝখান থেকে বলে উঠলো। “একমাত্র আপনার পক্ষেই টিরাকোলা দুর্গ আংরিয়ার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আমাদের পরিবারকে মুক্ত করা সম্ভব।”
টম ফ্রান্সিসের দিকে নিষেধের দৃষ্টিতে তাকালো, তবে শাহুজিকে দেখে মনে হলো না যে উনি কিছু মনে করেছেন। শুধু ওনার টা কিছুটা উঁচু হলো।
“আপনাদের কেন মনে হচ্ছে যে আমার টিরাকোলা দখলের সামর্থ্য থাকার পরেও, আমি সেটা দখল না করেই বসে আছি?” বলে উনি পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। এখনো পুরো প্রান্তর জুড়ে হালকা কুয়াশার আস্তরণ। “আমার রাজ্যের অবস্থা আপনাকে বলছি শুনুন, শাহুজি বলে চললেন। “আপনারা আসার পথে জমিগুলোতে কোনো ফসল দেখেছেন?”
টম আর ফ্রান্সিস মাঠ নাড়লো।
আবার বলা শুরু করলেন শাহুজি, “আপনার রাজা যদি আপনার গ্রামকে রক্ষাই করতে না পারে, তাহলে ফসল ফলিয়ে লাভটা কি? একসময় দেশটা প্রাচুর্যে ভরপূর ছিলো। এখন কৃষকেরা শুধুমাত্র সেসব ফসল বোনে যেগুলো তারা জঙ্গলে পালানোর সময় সাথে নিয়ে যেতে পারবে। তিরিশ বছর ধরে আমার ঠাকুরদা ছত্রপতি শিবাজি মুঘলদের সাথে এই সাম্রাজ্যের জন্য লড়েছেন। উনি মারা যাওয়ার পরে আমার ফুফু দাবি করলেন তার ছেলে নাকি এখানকার সম্রাট হবেন, কিন্তু আদতে সিংহাসনের দাবি আসলে আমার। মুঘলেরা মারা গিয়েছে। তাদের সাম্রাজ্যও খণ্ড বিখণ্ড হয়ে পড়ছে। কিন্তু আমরা শান্তি খুঁজে পাচ্ছি না, কারণ আমরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করছি। আমরা এটাকে বলি ভালেরাই-মানে বল্লমের শাসন। প্রতিটা গ্রামের মাতবর মনে করে যে সে একজন সেনাপতি। তারা তাদের নিজেদের লোকজন জড়ো করে সামান্য কারণেই মারামারি করতে লেগে যায়। কোথাও কোথাও তো আমাকে গ্রামের চৌকিদারের চাইতেও কম দাম দেওয়া হয়।
রাজা দেয়াল থেকে খুলে আসা একটা ছোট পাথর তুলে নিয়ে নিচে ফেলে দিলেন।
“ঠাকুরদা যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই মুঘলেরা আমাদেরকে ডাকাত হিসেবে ঘোষণা করে। গোয়ালঘরের দুর’ বলে ডাকতো ওরা আমাদেরকে। আমি দেখেছি ইঁদুরের যখন খাওয়ার কিছু পায় না, তখন ওরা কিভাবে একে অপরকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খায়। মুঘলদের কথাই আসলে ঠিক ছিলো, আমরা আসলেই তাই।” রাজা এতোগুলো কথা বললেন কিন্তু একবারের জন্যেও তার কষ্ঠ উঁচু হলো না বা কোনো অনুভূতি খেলা করলো না।
“আপনারা পৃথিবীর সবচে শক্তিধর সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছেন,” টম মনে করিয়ে দিলো।
