এতোদিন পরে এসে ওরা সাতারা-র দুর্গের কাছে পৌঁছেছে। রাস্তাটা প্রায় খাড়াভাবে উঠে গিয়েছে পাহাড়ের চূড়ায়। প্রধান ফটকে প্রহরী আটকালো ওদেরকে। টম এগিয়ে গেলো কথা বলতে। আর ওর পরিচয় লুকানোর কিছু নেই। ধীরে সুস্থে স্পষ্টভাবে সব বললো ও। অ্যানা পাশ থেকে অনুবাদ করে দিলো।
“আমি টমাস কোর্টনী। বোম্বের গভর্নর গাই কোর্টনীর ভাই। আমি রাজা শাহুজির সাথে কথা বলতে চাই।”
ওর পরিচয় শুনে প্রহরীদের চোখ কপালে উঠে গেলো, টম বুঝলো না সেটা কি ভালো নাকি খারাপ। তবে ঢুকতে দেওয়া হলো ওদেরকে। একজন চাকর পথ দেখিয়ে ওদেরকে একটা বিশ্রাম কক্ষে নিয়ে এলো। তারপর ওদেরকে বসতে বলে সে দুর্গের মূল ভবনের ভিতরে ঢুকে গেলো।
“এই রাজা সম্পর্কে কিছু জানো তুমি?” অ্যানাকে জিজ্ঞেস করলো টম। “তার সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, ওনার কি এখন আর নতুন যুদ্ধে জড়ানোর সুযোগ আছে?”
“রাজাকে হালকা ভাবে নেবেন না,” সতর্ক করলো অ্যানা। “একবার মুঘল সৈন্যরা এই দুর্গ দখল করে নিয়েছিলো। ওরা যে থাকতেই এসেছে সেটা প্রমাণ করতে মুঘল সেনাপতি নিজের স্ত্রী আর বাচ্চাদেরকে এখানে নিয়ে আসেন। শাহুজি দুৰ্গটা অবরোধ করে, মুঘল সেনাপতির স্ত্রী আর মেয়েদের ধরে নিয়ে আসেন। তারপর তাদেরকে দেয়ালের নিচে কামানের নলের উপর বেঁধে, কামানে পাউডার ভরে, পাশে আগুন হাতে ওনার লোকদের দাঁড় করিয়ে রাখেন।”
“তারপর কি হলো,” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো।
“মুঘল সেনাপতি আত্মসমর্পণ করেন। শাহুজি ওনার রাজধানী পুনরুদ্ধার করেন আর সেই থেকে এখানেই আছেন।” বলে অ্যানা হাতের উপর বসা একটা মাছি ঝাঁকি মেরে তাড়ালো। “শুনেছি যে উনি নাকি একেকজনের কাছে একেকরকম রূপে নিজেকে উপস্থাপন করেন। মানে যাকে ওনার চরিত্রের যেটুকু দেখাতে ইচ্ছে হয় সেটুকুই দেখান। তাই আপনার সামনে যে ভান-ই করুক না কেন, প্রতারিত হবেন না।”
চাকরটা ফিরে আসতেই অ্যানা থেমে গেলো। গাই কোর্টনীর নামটা সাথে সাথেই কাজে দিয়েছে দেখা যাচ্ছে। মেরিডিউ আর বাকিদেরকে রেখে টম, অ্যানা আর ফ্রান্সিস আরও বেশ কয়েকটা করিডোর আর ঘর পেরিয়ে দুর্গের একেবারে মাঝখানে এসে উপস্থিত হলো।
“এর মানে কি?” ফিসফিসিয়ে জানতে চাইলো ফ্রান্সিস।
“এটা হচ্ছে শাহুজির আত্মবিশ্বাসের প্রমাণ, টম জবাব দিলো। “একজন ফালতু লোক হলে সে আমাদেরকে খামাখা বসিয়ে রেখে নিজের ক্ষমতা জাহির করার চেষ্টা করতো।”
বিশাল সিঁড়িটার একদম মাথায় উঠে চমৎকার কারুকার্যময় এক জোড়া দরজা পেরিয়ে দরবার কক্ষে এসে হাজির হলো ওরা। ভারতীয় হিসেবে দরবারটা নিতান্তই অনাড়ম্বর বলা চলে। কিন্তু এর পরেও যে কোনো ইউরোপিয়ান রাজদরবার এটার জৌলুসতার কাছে একদম একটা মঠের মতো মনে হবে। ঘরের একদম মাঝে একটা বেদীর উপর একটা সিংহাসন। তার চারপাশ ঘিরে আছে সভাসদ আর প্রহরীরা। সিংহাসনটা দেখে মনে হচ্ছে খাঁটি স্বর্ণের তৈরি। তার উপর বাঘ আর সিংহের ছাল বিছানো। ওটায় যে লোকটা বসে আছে তার পরনেও দামী পোশাক। তাতে রূপার সুতো দিয়ে হাতীর দাঁতের নকশা সেলাই করা। আর সেই সাথে মণি-মুক্তা এসব তো আছেই।
টম যতোটা ভেবেছিলো তার চাইতে কম বয়স রাজার। এখনো তিরিশ হয়নি। নিখুঁতভাবে কামানো গাল তার যৌবনকে আরো উদ্ভাসিত করছে। সোজা হয়ে বসে আছেন রাজা, নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন, নিজের যা আছে তা নিয়ে গর্বিত। তিন আগন্তুককে ভালো ভাবে দেখলেন তিনি। তার চোখের দৃষ্টি রহস্যময়। সারা দরবার জুড়ে কোনো শব্দ নেই। শুধুমাত্র শাহুজি যখন নিজের গলায় ঝুলানো মুক্তার মালাগুলো নাড়ছেন তখন টক টক শব্দ হচ্ছে।
“আপনি গভর্নর কোর্টনীর ভাই,” অবশেষে নীরবতা ভাঙলেন উনি। কথাটা একটা মন্তব্য ছিলো, প্রশ্ন না। উনি কথা বলছেন পর্তুগিজে। আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে মোজাম্বিক আর সোফালাতে ব্যবসা করার সময় টম ওখানকার পর্তুগিজ বসতকারীদের কাছে থেকে কিছুটা পর্তুগিজ শিখেছিলো। কিন্তু তবুও অ্যানাকেই কাজে লাগালো। কারণ ভুল বোঝাবুঝি হলে সমস্যা।
“আমি গাই কোর্টনীর যমজ ভাই।”
“উনি কি আমার কাছে যে ফরমানটা দাবী করেছিলেন সেটা নিতে আপনাকে পাঠিয়েছেন?” শাহুজি জানতে চাইলেন।
“আমি এখানে আমার ভাইয়ের পক্ষ থেকে আসিনি,” টম স্বীকার করলো। “আমি এখানে এসেছি আপনি কিভাবে তার কাছে থেকে একটা সুবিধা আদায় করতে পারেন, সে ব্যাপারে একটা পরামর্শ দিতে।”
রাজা চোখ পিটপিট করে তাকালেন ওর দিকে। আপনি যদি গাই কোর্টনীর ভাই হয়ে থাকেন, তাহলে তার সাথে বেঈমানি করতে চাচ্ছেন কেন?” টমের মনে পড়লো আনা ওদেরকে মারাঠাদের গৃহযুদ্ধের কারণটা বলেছিলো। শাহুজির ফুফু ওনার কাছে থেকে রাজ্যটা ছিনিয়ে নিতে চাচ্ছেন।
“আমার ধারণা আপনি ব্যাপারটা অন্য যে কারো চাইতে ভালো বুঝবেন, মহামান্য। সবসময় একই পরিবারের সদস্যুদের একই উদ্দেশ্যে কাজ করা সম্ভব হয় না।
অ্যানা অনুবাদ করে দেওয়ার পর টম ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগলো। একবার ভাবলো যে বাড়িয়ে বলে ফেললো কিনা। রাজা যদি অপমানবোধ করেন তাহলে ঝামেলা। রাজার চোখ সরু হয়ে থাকায় তার মনোভাব কিছুই বোঝ গেলো না। শহুজি চোখ খুলে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর সামান্য একটু ঝুঁকে এলেন সামনে। “তা ঠিক কিসের জন্য আমার কাছে এসেছেন?”
