ক্রিস্টোফারের ঘুম এলো না। পাশে শুয়ে লিডিয়ার লম্বা চুলে হাত বুলাতে বুলাতে, ওর বলা কথাগুলোর মর্মার্থ অনুধাবন করার চেষ্টা করতে লাগলো।
যদিও ওর অ্যাগনেস খালার কথা খুব বেশি মনে নেই। ও ছোট থাকতেই বোম্বে ছেড়ে চলে এসেছিলেন উনি। উনি কিভাবে টিরাকোলা দুর্গে এসে আটকা পড়েছেন সেটা অনুমান করতে পারছে ক্রিস্টোফার। কিন্তু সারাহ কোটনী?
ওর মা ক্যারোলিন তার মেঝো বোন সম্পর্কে কোনো কথাই বলতেন না; ক্রিস্টোফার বারো বছর বয়সে প্রথম তার কথা জানতে পারে। ওর জিজ্ঞাসার জবাবে ওর মা জানিয়েছিলেন যে সারাহ বহু বছর আগেই ওনার স্বামী, মানে ক্রিস্টোফারের চাচা টমের সাথে আফ্রিকায় মারা গিয়েছেন।
কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে উনি আসলে মারা যাননি। আর উনি যদি জীবিত থাকেন, তার মানে কি টমও জীবিত না?
কেল্লার জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে উল্টোপাশের দেয়ালে ঝোলানো নেপচুন তরবারিটায় লেগে প্রতিফলিত হতে লাগলো। স্বর্নালি ধারটা চাঁদের আলোয় রূপালি লাগছে। টম-ই কি তরবারিটা ভারতে নিয়ে এসেছেন? আর তাই যদি হয়, তাহলে সেটা ক্রিস্টোফারের জন্যে ভালো না খারাপ?
গাই, টম চাচাকে দুই চোখে দেখতে পারতো না। ক্রিস্টোফার গাইকে দেখতে পারে না। তার মানে কি ও আর ওর চাচা জোট বেঁধে ওর বাবার বিরুদ্ধে কিছু একটা করতে পারবে? ও কি সারাহকে ব্যবহার করে টম চাচাকে নিজের পক্ষে কোনোভাবে আনতে পারবে? নাকি লিডিয়ার কথাটা আংরিয়ার কানে পৌঁছে দেব? এতে মুক্তিপণের পরিমাণ বাড়বে। আর তাতে ও আংরিয়ার আরো বেশি আস্থাভাজন হতে পারবে।
চাঁদ হেলে পড়লো, তারা ডুবে গেলো আর ক্রিস্টোফারের জানালার পাশের আকাশ ফর্সা হতে শুরু করলো। ক্রিস্টোফার লিডিয়ার হাতকড়ার বন্ধন থেকে সন্তর্পণে নিজেকে মুক্ত করে উঠে দাঁড়ালো। লিডিয়ার দিকে তাকালো ও। ওর চামড়া নিখুঁত ফর্সা আর মসৃণ। আবার ওর নাভীর নিচে শিরশির করে উঠলো। পরে হবে, দুনিয়ার সমস্ত সময় পড়ে আছে; নিজেকে বললো ও।
ক্রিস্টোফার আবার লিডিয়ার পাশে শুয়ে, হাত বাড়িয়ে ওর নরম স্তনে চাপ দিলো। অস্ফুটে গুঙিয়ে উঠলো লিডিয়া।
ঠিক তখনি, বজ্রপাতের মতো স্পষ্ট কিন্তু চাপা একটা আওয়াজ ভেসে এলো জানালা দিয়ে। মুহূর্তে দাঁড়িয়ে গেলো ক্রিস্টোফার। অনেক দূর থেকে এসেছে, কিন্তু শব্দটা নিজের নিঃশ্বাসের শব্দের মতোই চেনা ওর কাছে। অনেক দূর থেকে ভেসে আসা কামানের গোলা ছোঁড়ার আওয়াজ ওটা।
জানালার কাছে এগিয়ে মাথা বের করলো ক্রিস্টোফার। দুর্গের দেয়ালের পেছনে, যে সরু শৈল অন্তরীপটা দুর্গের সাথে মূল ভূ-খণ্ডের সংযোগ দিয়েছে সেটার পিছন দিয়ে একটা ছোট পাহাড়ের গা বেয়ে সূর্য উদিত হচ্ছে। আর সেই পাহাড়ের গা বেয়ে দেখা যাচ্ছে কয়েক হাজার বল্লমের মাথায় বাধা পতাকা। সকালের মৃদু বাতাসে উড়ছে সেগুলো। আর ওগুলো বহন করছে যে ঘোড়সওয়ারেরা, তারা ঘোড়া থামিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে টিরাকোলা দুর্গের দিকে।
দুর্গ আক্রমণ করতে এগিয়ে আসছে এক বিশাল সেনাবাহিনি।
*
পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে যাওয়া আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। রাস্তা এতো সরু যে এক পাশপাশি দুজনেরও হাঁটার উপায় নেই। সামনের আলো আধারিতে মস্ত একটা অবয়ব আবছা দেখা যাচ্ছে, ওটাই পাহাড়ের উপরের বিশাল দুৰ্গটা।
দলটার সবার সামনে আছে টম কোর্টনী। অ্যানা আর ফ্রান্সিস আছে ওর পেছনেই। মেরিডিউ আর কেস্ট্রেল থেকে বেঁচে যাওয়া আরও চারজন আছে ওদের পেছনে। অনেকদিন হয় বোম্বে ছেড়েছে ওরা। নৌকা নিয়ে সোজা উপকূল বরাবর আগাতে আগাতে শেষে একটা পাহাড়ের গোড়ায় এই রাস্তাটা খুঁজে পেয়েছে। এটা দিয়ে পশ্চিমদিকের পর্বতশ্রেণীর চূড়ায় পৌঁছানো যায়।
“এটা পুরো একটা রূপকথার দেশ। সব জায়গা যেনো কোনো অভিশাপে মুড়ে আছে,” ফ্রান্সিস বললো। ছোট বেলায় হাই উইন্ডের লাইব্রেরিতে যেসব আর্থারিয়ান নাইটদের গল্প কথা ছিলো সেসব ও গোগ্রাসে গিলতে। এখানে আসার পথে ওরা যেসব জায়গা পেরিয়ে এসেছে, সেসব ওকে রাজা ফিশারের থাকার জায়গা-সেই অভিশপ্ত গ্রেইল দুর্গের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সদ্য বর্ষা গত হয়েছে, রাস্তার দু-ধারের সবকিছু সবুজ আর সতেজ হয়ে থাকার কথা; কিন্তু মাঠঘাট সব বিরান হয়ে পড়ে আছে। বেশিরভাগ গ্রামই জনশূন্য। মাঝে মাঝে এমন হয়েছে যে তিন চার দিনেও ওরা কোনো জনমানবের দেখা পায়নি। রাতের বেলাতেও আশেপাশে তেমন কোনো আগুন বা বাতি দেখা যায় না। যাদের দেখা পেলো তারাও সবাই-ই প্রায় উলঙ্গ আর ক্ষুধার্ত। ওদের পদশব্দ পেয়ে এমনভাবে নিজেদের মাটির তৈরি ছোট ছোট বাসা থেকে বের হয়ে আসছিলো যেনো কোনো পশু নিজের গর্ত থেকে বেরিয়ে আসছে। সভ্যতার একমাত্র চিহ্ন ছিলো প্রতিটা প্রান্তরের শেষ মাথায় থাকা দুর্গগুলো। পাহাড়ের মাথায় ওগুলো দেখতে ঈগল পাখির বাসার মতো লাগে।
“এখানে এই অবস্থা কেন?” ওদের যাত্রার দ্বিতীয় দিন সকালে জিজ্ঞেস করেছিলো ফ্রান্সিস।
“যুদ্ধ,” জানিয়েছিলো অ্যানা। “এটা হচ্ছে মারাঠাদের এলাকা। গত তিরিশ বছর ধরে স্বাধীনতার দাবিতে ওরা মুঘলদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। সেজন্যে যথেষ্ট ভুগতে হয়েছে ওদেরকে। আর এখন নিজেদের রাজ্য উদ্ধার হলেও কে সেটা শাসন করবে সেটা নিয়ে শুরু হয়েছে গণ্ডগোল। গৃহযুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দেশটা।”
