“আমরা ওদের মুক্তিপণ দিতে পারবো না, আনমনে বললো টম। “তার মানে বিকল্প উপায় একটাই।”
“জোর করে মুক্ত করে আনা?” কথাটা যেনো বিশ্বাস করতে পারছে না ফ্রান্সিস। “কিন্তু আংরিয়ার দুর্গ তো নাকি দুর্ভেদ্য।”
টম নৌকার সাথে আড়াআড়ি বসে আছে। তাই সবাই সেটা বলে, কিন্তু নিশ্চিত হচ্ছো কি করে? গুজব শোনা যায় যে এটা দুর্ভেদ্য, তাই আর কেউ কখনো ওটা জয় করার চেষ্টাও করে না। আর যেহেতু কেউ কখনো জয় করতে পারেনি, তাই ওটার দুর্ভেদ্য হিসেবে সুনাম আরো বেশি করে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু আমি কখনো এমন কোনো দুর্গের কথা শুনিনি যেটা জয় করা সম্ভব না।”
“কিন্তু সে জন্যে আমাদের একটা সৈন্যদল লাগবে,” দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বললো ফ্রান্সিস।
টম ওর কাঁধে চাপড় দিলো। “সেটাই।”
টম অ্যানার কাছ থেকে হালটা নিজের হাতে নিয়ে নৌকাটা সোজা অন্ধকার উপকূলের দিকে চালাতে লাগলো। ফ্রান্সিস চেয়ে রইলো ওর দিকে।
“কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
“আমাদের জন্যে একটা সৈন্যবাহিনি খুঁজতে।”
*
টিরাকোলা দুর্গের নিচের গুহাগুলোয় সবসময়েই রাতের অন্ধকার। এর মাঝেও লিডিয়া ফয় তার তীক্ষ্ণ শ্রবণশক্তির সাহায্যে কানে আসা নানা শব্দ মিলিয়ে, সময় আর দিন রাতের আগমন অনুমান করতে শিখে ফেলেছে। এই বিশাল বিশাল পাথরের চাঁইগুলোর ভিতর দিয়েও ও ভাটার টান আর জোয়ারের স্রোত আলাদা করতে পারে, রাতের বেলার অব্যাহত নিস্তব্ধতা আর দিনের কর্মব্যস্ততার আভাস পায়।
এখন দুর্গ ঘুমিয়ে আছে। দূরের বাতিটা থেকে যে সামান্য আলো আসছে তার আলোয় লিডিয়া দেখতে পেলো দুই বোন একসাথে শুয়ে আছে। সারাহের মাথা অ্যাগনেসের বুকের উপর রাখা। সারাহের পেট এখন খুব ভালোমতোই ফুলে উঠেছে। এই আলো আধারিতেও বোঝা যায়। ব্যাপারটাকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেও আর পারবে না। দুজনেই ঘুমাচ্ছে, খুব আস্তে আস্তে পড়ছে শ্বাস।
যা করার এখনি করতে হবে লিডিয়াকে। ও নিজের স্কার্টটা তুলে হাতের বেড়ির ভিতর ঢুকিয়ে দিলো যাতে নাড়াচাড়ায় শেকলে কোনো শব্দ না হয়। তারপর পা টিপে টিপে কয়েদখানার দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। সারাহ বা অ্যাগনেস কেউই টের পেলো না কিছু। গরাদ আটা দরজার উল্টো পাশে একটা বাতি জ্বলছে। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দেখা গেলো প্রহরী সিঁড়ির উপর বসে বসে নাক ডাকছে।
লিডিয়া মেঝে থেকে একটা ছোট নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে সৈন্যটার দিকে ছুঁড়ে দিলো। নুড়িটা সোজা কপালে গিয়ে লাগলো তার, ঘুম ভেঙে ঘোত ঘোত করে উঠলো লোকটা। হাত চলে গেলো দেয়ালে ঝোলানো মাস্কেটের দিকে। মাস্কেটটা নামিয়ে লিডিয়ার দিকে তাক করে, ভয় দেখিয়ে ওকে ফিরে যেতে বললো সে। অন্য হাত দিয়ে কপাল ডলছে তখনও। লিডিয়া এক পা-ও নড়লো না।
“ক্যাপ্টেনের সাথে কথা বলতে চাই আমি,” ভাঙা ভাঙা পর্তুগিজে বললো লিডিয়া।
প্রহরী ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে নিজের আঙুলের মাথায় রক্ত লেগেছে কিনা সেটা পরীক্ষা করতে লাগলো। লিডিয়া তাই বুঝলো না যে লোকটা ওর কথা বুঝেছে কিনা। যে কয়টা ভারতীয় শব্দ ও জানে সেগুলো দিয়ে চেষ্টা করলো আর একবার। “সুবাদার? জাগিরদার? হাবালদার?”
প্রহরী মাথা ঝাঁকিয়ে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে।
লিডিয়া ওর স্কার্টের নিচের দিকে হাত বাড়ালো। গার্ডের চেহারায় আগ্রহ দেখা গেলো এবার। লিডিয়া ওর দুই পায়ের ফাঁকে হাত ঘষতে লাগলো। প্রহরী ঠোঁট চেটে উঠে দাঁড়ালো। তারপর এসে দরজার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো যাতে ভালো করে দেখতে পায়।
লিডিয়া কাপড়ের নিচ থেকে হাত বের করে আনতেই দেখা গেলো আঙুলের ফাঁকে একটা স্বর্ণালি প্যাগোডা খচিত মুদ্রা। যখন দস্যুদের হাতে ধরা পড়া নিশ্চিত হয়ে গেলো, তখন ও এটা নিজের ভিতর লুকিয়ে রেখেছিলো। নিজের স্কার্টে মুদ্রাটা মুছে প্রহরীর দিকে বাড়িয়ে ধরলো ও। প্রহরী ওটা নিতে হাত বাড়ালো কিন্তু লিডিয়া গরাদের ফাঁক দিয়ে হাত টেনে নিলো। প্রহরী হতাশ চোখে চেয়ে রইলো ওর দিকে।
“হাবালদার, “ আবার বললো লিডিয়া। তারপর পর্তুগিজে বললো, “আমার ওনাকে জরুরি একটা খবর দেওয়ার আছে।”
প্রহরী ইতস্তত করতে লাগলো, কিন্তু লিডিয়ার হাতের মুদ্রাটার অমোঘ আকর্ষণ এড়াতে পারছে না। ও দেয়াল থেকে একটা চাবির গোছে নিয়ে দরজা খুলে, মুদ্রাটার জন্যে হাত পেতে দিলো।
“হাবালদার,” আবার বললো লিডিয়া। মুদ্রাটা মুঠো করে শরীরের পিছনে নিয়ে রেখেছে।
প্রহরী আর কথা বাড়ালো না। লিডিয়াকে সিঁড়ি দিয়ে উপরে নিয়ে যেতে লাগলো। উপর দিকে, ভবনের কাঠামো একদম অন্যরকম। নিচের অংশটা নিরেট পাথর কেটে বানানো। আর উপরে অংশটা মাপ মতো কাটা পাথরের ইট দিয়ে গড়া। একটু পর পরই বাতি ঝোলানো দেয়ালে। আরো উপর উঠতেই দেয়ালে পর্দা আর নানান অলঙ্করণ দেখা যেতে লাগলো। এতো সুন্দর যে, বোঝাই যাচ্ছে ওগুলো লুটের মাল। এই পরিস্থিতিতেও লিডিয়া ওগুলোর দামদর করতে লাগলো মনে মনে।
অবশেষে ওরা প্রহরীদের কক্ষে পৌঁছালো। আধা ডজনের মতো প্রহরী পাশা খেলছিলো ওখানে। লিডিয়াকে দেখা মাত্র ওদের ক্যাপ্টেন সাথের প্রহরীটাকে ধমকাতে শুরু করলো। কিন্তু লিডিয়া সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সোজা ক্যাপ্টেনের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
