“ব্যারি?” টম ঠোঁট নেড়ে জিজ্ঞেস করলো। ফ্রান্সিস গলা বরাবর বুড়ো আঙুল দিয়ে টান দিলো। ব্যারি মাথা নামাতে এক মুহূর্ত দেরি করে ফেলেছিলো। ফলে চড়া মূল্যই দিতে হয়েছে।
টম উপরে জানালার দিকে তাকিয়ে দেখে ধোয়া কেটে গিয়েছে; সেখান থেকে প্রথমে চিৎকার শুনতে পেলো। তারপর গুলির আওয়াজ। আদেশ দেওয়ার জন্যে সার্জেন্ট না থাকায় সিপাহীরা সম্ভবত এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়ছে, আধারে নিজেদেরকেই মারছে কিনা কে জানে। তবে বেশিক্ষণ এই দশা থাকবে না। টম দেয়ালের গায়ে একটা সিঁড়ি বা মইয়ের আশায় এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো।
ওরা ফাঁদে আটকে পড়েছে। নিজের গোপনীয়তা রক্ষার জন্যে, জানালার নিচ থেকে কোনো প্রহরী ওর কথা শুনে ফেলার ভয়ে গাই দুই দিকের দেয়ালেই কোনো ফাঁক রাখেনি। এখান থেকে নামার কোনো রাস্তা নেই।
উপর থেকে গাই-এর গলা ভেসে এলো। আদেশ করছে কিছু একটা। সিপাহীরা জানালার ধারে এসে নিচে তাকালেই দেখতে পাবে টম আর ওর সঙ্গীরা একটা ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মতোই অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“পানিতে ঝাঁপ দাও,” আদেশ দিলো টম। “আর কোনো উপায় নেই।”
টম দেয়ালের কামান বসানোর ছিদ্র পথে নেমে পড়লো। নিচেই দুর্গ আর সাগরের মিলনস্থলে সাদা ফেনায়িত ঢেউ আছড়ে পড়ছে পাথরে। ও জানে না পানির নিচে কি আছে। কতো দ্রুত-ইবা ওরা নিচে পড়বে?
“থামো বলছি,” জানালা থেকে চিৎকার করে বললো কেউ। টম তাকিয়েও দেখলো না। জানে লোকটা কে। ও গুঁড়ি মেরে গর্তটায় বসে দু পাশের দেয়াল আঁকড়ে ধরলো, তারপর পুরো শরীর টানটান করে দিলো লাফ। দেয়াল থেকে যতো দূরে সম্ভব সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
যেনো অনন্তকাল পর নিচে পড়লো ও। পানিতে পড়া মাত্র লাথি মেরে আর হাত ছুঁড়ে উপর ওঠার চেষ্টা করতে লাগলো। কোনো ডুবো পাথরে লেগে হাত পা ভেঙে যায় কিনা সেই ভয় করছে। অক্ষত অবস্থাতেই পানির উপরে ভেসে উঠলো ও। মাথা তুলতেই ফ্রান্সিস এসে পড়লো পাশে।
মেরিডিউ এলে এরপর। ভাগ্যক্রমে ও খুব দক্ষ সাঁতারু। তারপর তিনজনই দ্রুত পা ছুঁড়ে সাগরের গভীরের দিকে এগিয়ে গেলো। খুব দ্রুত নেমে এসেছে রাত, এখনই ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। ফলে উপরের প্রহরীরা ওদেরকে আর দেখতে পেলো না। থেকে থেকে মাস্কেটের গুলির শব্দ শোনা যেতে লাগলো, কিন্তুওদের ধারে কাছেও এলো না কোনোটাই।
টম সামনে কোথাও নৌকায় বাধা দাড়ের ক্যাচকোচ শব্দ শুনতে পেলো। যতোটা সম্ভব পানি থেকে মাথা তুলে স্প্যানিশ লেডিস’ গানটার সুরে শিষ বাজালো ও।
অন্ধকার ফুড়ে আনার গলা শোনা গেলো। “কি হয়েছে? আহত হয়েছেন নাকি?”
ওর কণ্ঠ টমের কানে মধু বর্ষণ করলো। পরিকল্পনা মোতাবেক, অ্যানা আর কেস্ট্রেল-এর বেঁচে যাওয়া বাকিদের একটা নৌকা নিয়ে বন্দরে অপেক্ষা করার কথা ছিলো। টমরা সিন্দুকের ঘর থেকে স্বর্ণ চুরি করে সংকেত দিলেই নৌকা নিয়ে ওরা দুর্গের দেয়ালের সমুদ্রমুখী দরজাটায় চলে আসতো। তারপর পালিয়ে যেতো। কিন্তু গুলির শব্দ শুনতে পেয়ে অ্যানা নৌকা এগিয়ে নিয়ে। এসেছে।
অ্যানা নৌকাটা ওদের দিকে আরো খানিকটা এগিয়ে নিয়ে এলো। আগে ফ্রান্সিস আর মেরিডিউকে উঠে যেতে দিলো টম, তারপর নিজেকে টেনে তুললো। “গাই জানতো যে আমরা আসবো।”
“ব্যারি কি বেঈমানি করেছে নাকি?” অ্যানা জিজ্ঞেস করলো।
“যদি করেও থাকে তাহলে জীবন দিয়ে তার দাম চুকিয়েছে।” টম মাথা ঝাঁকিয়ে কানে ঢোকা পানি বের করে দিলো। “তবে আমার সেরকম মনে হয় না। আসলে আমাদের এটা ভাবাই গাধামি হয়েছে যে আমরা বোম্বেতে এসে গাই-এর নাকের ডগা দিয়ে ঘুরে বেড়াবো আর ও কিছুই টের পাবে না।”
টম ফিরে তাকালো। দুর্গের কারণে জেটি দেখা যাচ্ছে না। তবে ও নিশ্চিত ওখানে ধুন্ধুমার লেগে গিয়েছে। “গাই জানে যে আমরা পানিতে ঝাঁপ দিয়েছি। ও আমাদেরকে খুঁজতে নৌকা পাঠাবে। আমাদের লাশটাও খুঁজে পেলে খুব খুশি হবে ও। সময় থাকতেই পালিয়ে যেতে হবে।”
“স্বর্ণের কি হবে?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো।
“অন্য কোনো দিন…” টম বললো। তবে ও ভালোমতোই জানে যে সেটা আর সম্ভব হবে না। গাই এই আশাতেই থাকবে, আর বোম্বের প্রতিটা লোক টম আর ফ্রান্সিসের খোঁজে ঘুরবে। আর যদি ওরা দুর্গে আবার ঢুকতেও পারে, তাহলেও এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে গিয়ে দেখবে কয়েকশো প্রহরী সিন্দুকগুলো পাহারা দিছে।
নৌকাটার একটা ছোট পাল আছে। মেরিডিউ আর বাকিরা মিলে সেটা খাঁটিয়ে দিলো। সন্ধ্যার হালকা বাতাসে ওটা ফুলে উঠে সমুদ্রের দিকে টেনে নিয়ে চললো নৌকাকে।
“ডোরিয়ান আর আবোলির সাথে দেখা করার চেষ্টা করলে কেমন হয়?” অ্যানা বললো। “ওরা যদি মোটামুটি লাভ করে ফিরতে পারে, তাহলে হয়তো সেই টাকা দিয়েই আংরিয়ার মুক্তিপণ মেটানো যাবে।”
“কয়েক মাস লেগে যাবে তাতে,” টম বললো। তাছাড়া লাকুইডিভায় পৌঁছানোর মতো কোনো জাহাজ নেই আমাদের। আর যদি সেটাও জোগাড় করা যায়, তাহলেও যেতে যেতে নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাবে। ডোরিয়ান আমাদের আশা ছেড়ে কেপ টাউনে রওনা দিয়ে দেবে ততোদিনে।”
“তাহলে করবো কি আমরা?” ঝট করে বললো ফ্রান্সিস।
টম সামনের দিকে তাকালো। এখনো দুর্গের আগুনটা পুরোপুরি নেভেনি। ধিকিধিকি জ্বলছে চত্বর জুড়ে। উপরের আকাশও লাল হয়ে আছে ওটার আভায়। আর তাতে নিচের গভর্নরের বাসাটাকে একটা আবছায়ার মতো লাগছে। সামনের খালটা পার হলেই জলাভূমি, তার পরেই ভারতের মূল ভূখণ্ডের খোলা সৈকত। এই উপকূল জুড়েই কোথাও সারাহ আর অ্যাগনেস ওদের অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছে। ও ওদের আশাকে মিথ্যে হতে দিতে পারবে না।
