টম পিছিয়ে যেতে শুরু করলো। কোমরের পিছনে হাতটা নিতেই পায়জামার ফাঁকে গুঁজে রাখা পিস্তলটার স্পর্শ পেলো।
“নড়বে না,” ধমকে উঠলো সার্জেন্ট। তার প্রর উপরে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। গাই আসার আগে একান্ত বাধ্য না হলে ও গুলি করার সাহস করবে না। টম আরো এক পা পিছিয়ে গেলো।
বাকিরাও ওর উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে পিছিয়ে গেলো এক পা। সার্জেন্ট অগ্নি দৃষ্টিতে ওদের সবার দিকে তাকাতে লাগলো। “আর এক ইঞ্চিও যদি পিছন তাহলে কিন্তু আমি গুলি করার আদেশ দেবো। গভর্নর কোর্টনীর কথা মানার দরকার মনে করবো না।”
টম সার্জেন্টের চোখে চোখে চেয়ে রইলো। তারপর আরও এক পা পিছিয়ে গেলো। গাই-এর ডেস্কের পেছনে চলে এসেছে ও। একদম পিছনের জানালার সামনে। সার্জেন্ট ব্যাপারটা দেখে কিছুটা স্বস্তি পেলো, কারণ পিছনে আর যাওয়ার জায়গা নেই।
“গভর্নর কোর্টনী আপনাদের মতো লোকের জন্যে কয়েদখানায় আলাদা একটা ঘর বানিয়েছেন,” টমকে বললো সার্জেন্ট। “আর ওখানে একবার গেলে এমন অবস্থা হবে যে গভর্নর গাই আদেশ দিলে নিজের গু-ও চেটে পরিষ্কার করবেন।”
দরজার বাইরে সিঁড়িতে একটা ভারী পদশব্দ পাওয়া গেলো। সিপাহীরা সোজা হয়ে হাতের মাস্কেট আরো সোজা করে তাক করে ধরলো।
“ওরা আর এক মুহূর্ত পরেই গুলি করবে,” টম ওর সঙ্গীদের বললো। “প্রস্তুত হও।”
“শয়তানের চেহারা আজ দেখবেন,” খেঁকিয়ে উঠলো সার্জেন্ট। “এতো আরামের মৃত্যু আপনাদের কপালে নেই।”
পদশব্দ সিঁড়ির উপরে এসে পৌঁছালো।
টম বাকিদের দিকে তাকালো। ও যা করতে যাচ্ছে তা পাগলামি ছাড়া কিছু না। কিন্তু এটাই ওদের একমাত্র আশা। যদি গাই-এর হাতে ধরা পড়ে, তাহলে গাই সারাজীবন ধরে বয়ে বেড়ানো ঘৃণার শোধ তুলবে। বিশেষ করে টমের উপরে। আর সবচে খারাপ হলো, সারাহ আর অ্যাগনেসকে উদ্ধারের আর কোনো আশা-ই থাকবে না। তবে যদি গাই টের পায় ওরা আসলে কারা, তাহলে হয়তো মুক্তিপণ দিয়ে ওদেরকে ছাড়িয়ে আনবে, তবে সেটা সম্পূর্ণরূপে শুধুমাত্র টমের উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়ানোর জন্যে।
গাইকে খুন করবো না আমি, টম মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো। বিলির সাথে যে ভুল করেছি সেটা এবার করবো না।
দরজার কাছে চলে এলো পদশব্দ। একজন ওজনদার লোকের টানা পদক্ষেপ। বোঝাই যাচ্ছে যে কোনো তাড়াহুড়া নেই। নিজের বিজয় তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে ও, মনে মনে ভাবলো টম। ও কোমর থেকে পিস্তলটা ছুটিয়ে আনলো, চেষ্টা করছে সেটা যাতে কারো চোখে না পড়ে। একটা মাত্র গুলি করার সুযোগ পাবে সে।
“ওরা সবাই-ই আছে এখানে?” বারান্দা ধরে গাই-এর গমগমে গলাটা শোনা গেলো। “অনেকদিন ধরে এই দিনটার অপেক্ষে করছি আমি।”
গাই-এর গলা শুনে টমের সারা শরীর কাটা দিয়ে উঠলো। শেষবার যখন গলাটা শুনেছিলো, তখন ও সারাহকে নিয়ে একটা ছোট ফেলুক্কা নৌকার করে জাঞ্জিবার থেকে পালাচ্ছিলো। গাই-এর প্রায় একশো লোক ওদের দিকে গুলিবর্ষণ করছিলো তখন। গাই-এর শেষ কথাগুলো এখনো ওর মাথায় গেঁথে আছে।
একদিন না একদিন সুদে আসলে সব মেটাতে হবে দেখিস। সব আদায় করে ছাড়বো আমি। কসম।
“আমি দুঃখিত,” টম বললো। বলেই কেউ কিছু বোঝার আগে ও পিস্তল তুলে সার্জেন্টের হৃৎপিণ্ড বরাবর গুলি করলো।
এর প্রতিক্রিয়াও হলো সাথে সাথেই। সিপাহীরা এমনিতেই টানটান অবস্থায় ছিলো। গুলির শব্দ কানে যাওয়া মাত্র চিন্তা ভাবনা ছাড়াই সবগুলো মাস্কেট গর্জে উঠলো একসাথে।
টম এরকমটাই আশা করেছিলো। গুলি করতে করতেই তাই ডেস্কের পেছনে বসে পড়লো ও। সাথে সাথেই মাথার উপর দিয়ে মাস্কেটের গুলিগুলো উড়ে গেলো। কান ফাটানো গুলির শব্দের সাথে যোগ হলো কাঁচ ভাঙার ঝনঝন শব্দ। উপসাগরের দিকে মুখ করে থাকা সবগুলো জানালার কাঁচ ভেঙে চুরচুর হয়ে গিয়েছে।
ঘরটা ধোঁয়ায় ভরে গেলো। টম চিৎকার করে ফ্রান্সিস আর মেরিডিউকে ডাকলো। কিন্তু গুলির শব্দে কানে তালা লেগে থাকায় নিজের আওয়াজ নিজের কানেই পৌঁছালো না ওর। ধোয়া ভেদ করে একটা অবয়ব এগিয়ে এলো–ফ্রান্সিস–চেহারায় একটা কাঁচ ছিটকে লেগে কেটে রক্ত বের হচ্ছে, এর বেশি কিছু হয়নি। মেরিডিউকেও দেখা গেলো পেছনে।
টম জানালার দিকে দেখালো। তারপর ওটার দিকে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপ দিলো নিচে। জানালা দিয়ে বের হওয়ার আগ মুহূর্তে শরীরকে ঘুরিয়ে নিলো যাতে পিঠ থাকে বাইরের দিকে। ভেঙে থাকা কাঁচের টুকরোয় টান লেগে ওর জামা ছিঁড়ে গেলো। তবে সেটা মুহূর্তের ভগ্নাংশের জন্যেই। জড়তার কারণে সহজেই জানালা পেরিয়ে বাইরের বাতাসে গিয়ে পড়লো টম।
সেদিন সকালে যখন ওদের জাহাজটা বন্দরে ভিড়ছিলো, তখনই টম দুর্গের চারপাশটা খুব ভালো করে খুটিয়ে দেখে নিয়েছিলো। সেই পর্যবেক্ষণ কাজে দিয়েছে। ও তখনই বন্দরের দিকে মুখ করে থাকা জানালাগুলো খেয়াল করেছিলো। আর ধরেই নিয়েছিলো যে গাইয়ের অফিসটাও নিশ্চয়ই এমন কোথাও হবে যেখান থেকে ও বন্দরের জাহাজের দিকে চোখ রাখতে পারবে। জানালা আর বন্দরের মাঝে আছে দুর্গের দেয়াল। গাইয়ের দৃষ্টি যাতে বাধা না পড়ে তাই দেয়ালটা উচ্চতায় তিনতলার চাইতে ছোট। আর সেটা এই জানালাগুলোর কড়িকাঠের ঠিক নিচেই এসে শেষ হয়েছে।
দেয়ালের উপর গিয়ে পড়তেই একরাশ ভাঙা কাঁচের টুকরো ঝরে পড়লো টমের উপর। ও উঠে দাঁড়াতে গেলো, কিন্তু সাথে সাথেই ফ্রান্সিস উপর থেকে ওর গায়ে এসে পড়ায় আবার পড়ে গেলো। মেরিডিউ পড়লো ওদের পাশে।
