ওরা বিশাল ঘরটার একেক দিকে ছড়িয়ে পড়লো। টম গাই-এর ডেস্কের দিকে আগাতে গিয়ে থেমে গেলো। দেয়ালে স্যার হাল কোর্টনীর ছবি দেখে যেনো সম্মোহিত হয়ে গিয়েছে।
“বাবা,” বিড়বিড় করলো ও। হাল প্রায় বিশ বছর আগে মারা গিয়েছেন। কিন্তু এখানে এভাবে আচমকা অপ্রত্যাশিতভাবে তাকে দেখে টমের মাঝে আবারও হারানোর বেদনাটা ফিরে এলো। “এটা তো ছিলো…”
“হাই উইন্ডে, ফ্রান্সিস বললো।
টম ছবিটার নেপচুন তরবারিটার দিকে তাকিয়ে থাকলো। আঁকা ছবি থেকেও নীলাটার দ্যুতি বের হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। হতাশা দলা পাকিয়ে উঠলো ওর ভিতর। ওর উত্তরাধিকার ওর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। সারাহকে উদ্ধার করেই ও আবার ব্রিঞ্জোয়ানে ফিরে যাবে। তারপর যে তরবারিটা চুরি করেছে তাকে খুঁজে বের করবে।
কিন্তু সেসব নিয়ে পরেও ভাবা যাবে। চিন্তাটাকে সরিয়ে রাখলো ও ফ্রান্সিস ততোক্ষণে গাই-এর ডেস্ক খুঁজে দেখা শুরু করেছে। নিজের ছুরিটা দিয়ে চাড় দিয়ে ডেস্কের ড্রয়ারগুলো খুলে দেখছে। ভিতরের কাগজপত্র ছিটিয়ে পড়ছে মেঝেতে। “চাবিটা এখানেই কোথাও আছে।”
ব্যারি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। “আর বেশি সময় নাই। আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে ওরা।”
টম শুনতে পেলো কথাটা। ও জানে দ্রুত করতে হবে সব। কিন্তু ছবিটা যেনো সম্মোহিত করে রেখেছে ওকে। গাই-এর অফিসে তরবারি সমেত ওর বাবার ছবিটা এতো এতো স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে যে ওর মাথা ঘুরতে শুরু করলো।
কিন্তু দেরি করার সুযোগ নেই। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ও ছবিটা থেকে চোখ সরিয়ে নিলো। তাতেই একটা জিনিস চোখে পড়লো। ও ছবিটার দিকে এগিয়ে সোনার পাত বসানো ফ্রেমটার চারপাশে হাত বুলাতে লাগলো। একটু পরেই কাঠের উপরে দুটো শক্ত স্ফীতি হাতে বাধলো ওর।
“কবজা,” অবাক হলো টম। ও ছবির পিছনে নিজের ছুরিটা ঢুকিয়ে দিলো। দেয়াল বরাবর খানিকটা উঠতেই, কিছু একটায় আটকে গেলো ছুরির ফলাটা।
“এখানে নিশ্চিত কোনো ধরনের তালা আছে।” টম ছুরিটা ঝাঁকি দিয়ে, মুচড়িয়ে ফলাটা ছোটানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
কট করে শব্দ করে খুলে গেলে কিছু একটা। ছুরির ফলাটা ঝনাৎ করে মেঝেতে গিয়ে পড়লো সাথে সাথে। ওর পা থেকে মাত্র এক ইঞ্চি দূরে।
ফ্রান্সিস ওর পেছনে এসে দাঁড়ালো। “খোলে না?” জিজ্ঞেস করলো ও।
টম ওকে ওর ছুরির ভাঙ্গা ফলাটা দেখালো। “তালাটা খুবই শক্ত।”
ফাঁকটায় নিজের আঙুল ঢোকানোর চেষ্টা করলো ফ্রান্সিস। কিন্তু ঢুকলো না। একটু পিছিয়ে আবার ফ্রেমটা পরীক্ষা করে দেখলো ও।
“পেন-নাইফ বা লেটার ওপেনারের মতো কিছু পেয়েছো?” মেরিডিউকে জিজ্ঞেস করলো টম।
কিন্তু জবাব পাওয়ার আগেই ফ্রান্সিস সামনে এগিয়ে, ফ্রেমের স্বর্ণের বাধাইয়ের একটা অংশ জোরে চেপে ধরে অর্ধ বৃত্তাকারে মোচড় দিলো। শোনা যায় না এমন একটা শব্দ করে ফ্রেমটা নিচের দিকে খুলে গেলো।
টম প্রশংসার চোখে ফ্রান্সিসের দিকে তাকালো। “সাবাস।”
ওরা সবাই জড়ো হলো ওখানে। ছবিটার পেছনে দেওয়ালে একটা খুপরি দেখা যাচ্ছে। হিসাবের খাতাপত্র আর কাগজে ঠাসা। টম ওগুলো বের করে ‘ ব্যারি আর ফ্রান্সিসের হাতে দিলো।
ব্যারি একটা খাতার পাতা উল্টালো। “এগুল সব গাই-এর গোপন আয়ের হিসাবপত্র,” অবাক হয়ে বললো ও। “লেডেনহল স্ট্রিটের চোখ এড়িয়ে শুধু নিজের লাভের জন্যে যেসব লেনদেন করেছেন তার সবই আছে এখানে।”
“আরে রাখো ওগুলো,” উত্তেজিত স্বরে বললো টম। “যা খুঁজছি সেটা সম্ভবত পেয়ে গিয়েছি।” একটা পিতলের চাবি তুলে ধরলো ও। অনেকগুলো দাঁত ওটায়, নিশ্চিত কোনো জটিল তালার চাৰি। “এখন গোপন ঘরটা খুঁজে বের করতে হবে।”
“আমি পারবো সেটা,” ব্যারি বললো। “শুধু একবার প্রহরীগুলোর চোখ ফাঁকি দিয়ে পার হতে পারলেই হবে।”
বাইরের লোকজনের আওয়াজ শুনেই টম বুঝলো আগুন নিভে গিয়েছে। কিছুক্ষণের মাঝেই প্রহরীরা যার যার জায়গায় ফিরে যাবে। টম কোমরে হাত দিয়ে পিস্তলটা স্পর্শ করলো। আশা করছে এটা ব্যবহার করতে হবে না।
“আমাদেরকে হয়তো-”।
কথা শেষ করার আগেই অফিসের দরজাটা দড়াম করে খুলে গেলো। বোম্বে আর্মির লাল কোট আর সবুজ বেল্ট পরা প্রায় এক ডজন সৈন্য প্রবেশ করলো ঘরের ভেতর। কেউ কিছু করার আগেই সৈন্যরা দরজার সামনে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে হাতের মাস্কেট টম আর ওর সঙ্গীদের দিকে তাক করে ধরলো।
“এক চুল নড়বে না কেউ,” দলের সার্জেন্ট আদেশ করলো। “গভর্নর কোর্টনী আসার আগ পর্যন্ত এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে।”
চারজনের কেউই জায়গা থেকে নড়লো না। সিপাহীদের দিকে তাকিয়ে টম বুঝলো যে এরা আগুন নেভাতে যায়নি। পোশাক বা ঝকঝকে সাদা বুকের বেল্ট-এ কোমো কালি ঝুলি লেগে নেই বা চেহারায় তাড়াহুড়া করে আসার চিহ্ন নেই, এমনকি ওদেরকে দেখে অবাকও হয়নি। যেনো ওরা ওদের জন্যেই অপেক্ষা করছিলো।
টমের মেরুদণ্ড বেয়ে হতাশা ছড়িয়ে পড়লো। ব্যারির দিকে তাকালো ও।
“আপনি কি আমাদের সাথে বেঈমানি করেছেন?”
কিন্তু ব্যারির ভীতসন্ত্রস্ত চেহারাটা দেখেই বুঝলো যে কথাটা সত্যি না। ব্যারিও বাকিদের মতোই প্রচণ্ড অবাক হয়েছে। বরং ওকে দেখেই মনে হচ্ছে। সবচে বেশি ভয় পাচ্ছে।
এখন অবশ্য এসব কোনো ব্যাপার না। গাই যেভাবেই খবর পাক না। কেনো, ওরা ওর ফাঁদে আটকে গিয়েছে। আর গাই আসছে।
