ওর আত্মবিশ্বাস সবার মাঝেই সঞ্চারিত হলো। খুশি মনে সরাই থেকে বেরিয়ে গেলো সবাই। করার মতো একটা কাজ পেয়েছে অনেকদিন পর। ফ্রান্সিস আর মেরিডীউ বাকিদের খুঁজতে চলে গেলো। কেস্ট্রেল-এর বেঁচে যাওয়া আরও চারজন লোক ওদের সাথে বোম্বে এসেছে। ব্যারি, অ্যানা আর টমকে অস্ত্রপাতি আর অন্যান্য দরকারি জিনিসপত্র জোগাড় করে দিতে পারবে এমন একজনের কাছে নিয়ে গেলো। ভালোয় ভালোয় হয়তো ওরা সিন্দুক ঘরে ঢুকতে পারবে কিন্তু কোনো ঝামেলা ছাড়াই বেরিয়ে আসতে পেরবে তেমনটা মনে করে না টম।
এতো খুশির মাঝে কেউ খেয়ালই করলো না যে মুখে বসন্তের দাগওয়ালা একটা ছেলে সরাইখানার এক কোনায় অনেকক্ষণ যাবত বসে আছে। সে ওদেরকে বেরিয়ে যেতে দেখলো। তারপর নিজেও ত্রস্ত গতিতে বেরিয়ে গেলো।
*
ছয়টা বাজার কিছু আগে ফ্রান্সিস ধীর পায়ে দুর্গে এসে ঢুকলো। রাত নামতে শুরু করেছে। ফটকের প্রহরীরা খটাশ করে স্যলুট ঠুকলো ওকে। ওদের চোখে ভয় দেখতে পেলো ফ্রান্সিস। এর মাঝেই সবাই জেনে গিয়েছে যে ও গাই-এর ভাতিজা।
ও আগাতেই পিছনে ফটক বন্ধ হয়ে গেলো। চত্বরের অর্ধেকটা পেরিয়ে, ফ্রান্সিস আচমকা দিক বদলে পাশের একটা ছোট ভাড়ার ঘরে ঢুকে গেলো। কয়েক মুহূর্ত পরে সেখান থেকে বেরিয়ে তড়িঘড়ি করে আবার ফটকের দিকে এগিয়ে গেলো।
“ভুলে পানশালায় আমার টাকার ব্যাগটা ফেলে এসেছি,” হড়বড় করে বললো ও। বিব্রত হওয়ার ভান করছে। “গাই চাচা জানতে পারলে খুব রাগ করবেন।”
সিপাহীরা আবার দরজা খুলে দিলো। ওটা পুরোপুরি খুলতেই ফ্রান্সিস অর্ধেক ঘুরে কাঁধের উপর দিয়ে উঁকি দিলো।
“আরে আরে একি,” আর্তনাদ করে উঠলো ফ্রান্সিস।
চমকে উঠে ফিরে তাকালো সিপাহীরা। ভাড়ার ঘরটা থেকে ধোঁয়া বের হতে শুরু করেছে। খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসছে আগুনের লকলকে জিভ।
“আগুন!” চেঁচিয়ে উঠলো ফ্রান্সিস। বাকিরাও এবার খেয়াল করলো সেটা। এর মধ্যেই চতুরের ওদিক থেকে আতংকিত চিৎকার ভেসে আসতে শুরু করেছে। পানির বালতি আনতে ছোটাছুটি শুরু করেছে লোকজন।
এই হৈ হট্টগোলের মাঝে খোলা ফটক দিয়ে চুপিসারে ঢুকে পড়া লোক তিনজনের দিকে খেয়াল করলো না কেউ। টম, ব্যারি আর মেরিডিউ ফ্রান্সিসের পিছু পিছু গভর্নরের বাড়ির ভিতরে চলে এলো। কেউ আটকালো না ওদের। বারান্দা থেকেই ফ্রান্সিস খেয়াল করলো চাকরেরা আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশংকায় খাবার ঘরের রূপার বাসনপত্রসহ দামী সব জিনিসপত্র সরানোর কাজে ব্যস্ত।
ফ্রান্সিস পথ দেখিয়ে বিশাল সিঁড়িটা ধরে তিনতলায় নিয়ে এলো সবাইকে। তারপর স্বল্প আলোকিত বারান্দা ধরে গাই-এর অফিসে এসে উপস্থিত হলো। ফ্রান্সিস ভেবেছিলো যে ভবনের সবাই আগুন দেখতে চলে যাবে। কিন্তু ওকে হতাশ হতে হলো। একজন সিপাহী মাস্কেট কাঁধে অফিসের দরজায় পাহারা দিচ্ছে।
“হচ্ছেটা কি?” প্রহরী জানতে চাইলোর ও বাইরে থেকে চেঁচামেচি শুনতে পেয়েছে কিন্তু জায়গা ছেড়ে নড়ে কি হয়েছে দেখতে যাওয়ার সাহস হয়নি।
‘আগুন,” সংক্ষেপে বললো ফ্রান্সিস। “গভর্নর কোর্টনী আমাকে পাঠিয়েছেন তার অফিসের কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা দেখতে।” বলে নিজের চেহারা দেখাতে আলোয় এসে দাঁড়ালো ও। “আমি ওনার ভাতিজা ফ্রান্সিস কোর্টনী।”
ওদের পারিবারিক নামটা আবারও জাদুমন্ত্রের মতো কাজ করলো। প্রহরী একদিকে সরে যেতে গিয়েও থেমে গেলো আবার।
“এনারা কারা?” টম আর মেরিডিউ-এর দিকে দেখিয়ে জানতে চাইলো লোকটা। “আমিতো এদেরকে চিনলাম না।”
“টম উইল্ড। ব্রিঞ্জোয়ান বিজয়ের নায়ক।”
প্রহরী নড়লো না। “গভর্নর কোর্টনীতে আমাকে ওনার কথা কিছু বলেননি।” ও ব্যারির দিকে এক ঝলক তাকালো। নিজেকে অন্যদের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করছে সে। তারপর মাস্কেটের নল ফ্রান্সিসের দিকে সোজা করে বললো। “আমি আপনাকে ঢুকতে দিতে পারবো না।”
ফ্রান্সিস নড়লো না। আমার কাছে চাচার পাঠানো চিরকুট আছে। এটা দেখলেই সব বুঝবেন।” বলে ও নিজের কোট খুলে ভিতরে হাত ঢুকিয়ে দিলো। প্রহরী দেখার জন্যে ঝুঁকে এলো সামনে।
কোটের আড়ালে ফ্রান্সিসের হাত ঢাকা ছিলো, তাই ঘুষিটা দেখতে পেলো না প্রহরী। চোয়ালে ঘুষিটা লাগতেই ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেলো সে। আবার উঠে দাঁড়ানোর আগেই টম এগিয়ে এসে আর একটা প্রচণ্ড আঘাতে ওকে মেঝেতে শুইয়ে দিলো।
“ভালো বুদ্ধি দেখিয়েছো,” টম অজ্ঞান প্রহরীটাকে পেরিয়ে এসে দরজার উপর হাত রাখলো। নিচে চাকরদের ইতস্তত ছোটাছুটির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। গাই-এর দামি জিনিসপত্র সরানোতে ব্যস্ত। কিছুক্ষণের মাঝে সত্যি সত্যি কারো অফিসটা দেখে যাওয়ার কথা খেয়াল হবে।
কিন্তু তবুও টম ইতস্তত করতে লাগলো। যদি গাই এখনো অফিসে থেকে থাকে? হয়তো মরিয়া হয়ে ওর দরকারি কাগজপত্র গোছাচ্ছে। ওরা মুখোমুখি হয়ে গেলে ও কি করবে?
একটা পুরনো স্মৃতি ওর মনে দোলা দিয়ে গেলো। গত যে দুই বার তোমাদের দেখা হয়েছে, ও তোমাকে খুন করার চেষ্টা করেছে। তৃতীয়বার দেখা হলে নিশ্চিত থাকতে পারো যে তোমাদের কেউ একজন মারা পড়বে।
ও হাতলটা চেপে ধরে দরজায় ঠেলা দিলো।
ঘরটা খালি। টম এতো খুশি হলো যে বলার না, কিন্তু নষ্ট করার মতো সময় নেই।
“গাই ওর সিন্দুকের ঘরের চাবি এখানেই কোথাও রাখে। তাড়াতাড়ি খুঁজে বের করতে হবে সেটা।”
