“আগে গাই আর আংরিয়ার ব্যাপারটা বলুন। তারপর চাইলে এতো মদ। কিনে দেবো যে তাতে ডুবে মরতে পারবেন।”
ব্যারি ওর টুলে নড়েচড়ে বসলো। পড়ে যাচ্ছে মনে করে টম একটা হাত বাড়িয়ে দিলো, কিন্তু ব্যারি তার আগেই আবার সোজা হয়ে গেলো। চেহারায় ধূর্ত একটা ভাব ফুটে উঠেছে।
“আংরিয়া কত চাচ্ছে?” জিজ্ঞেস করলো ব্যারি।
“তিরিশ হাজার রুপি,” বললো ফ্রান্সিস।
“হাহ!” ব্যারির থুতুর সাথে সাথে টেবিল জুড়ে অ্যালকোহলের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়লো। “তিরিশ হাজার রুপি গাই কোর্টনীর হাতের ময়লা। গভর্নরের বাড়ির নিচে, মানে দুর্গের মাটির নিচের প্রকোষ্ঠে ওনার একটা আলাদা ঘর আছে। ওখানে অনেকগুলো কাঠের সিন্দুক রাখা। প্রতিটাতে কমপক্ষে এক লাখ রুপি করে আছে। এক লাখ বোঝেন তো?” ও সামনে ঝুঁকে এলো। তারপর প্রতিটা শব্দ আলাদা আলাদা ভাবে উচ্চারণ করে বললো, “একশো হাজার রুপি।”
“তাহলে গাই মুক্তিপণ দিচ্ছে না কেন,” হতাশ কণ্ঠে বললো ফ্রান্সিস। “এই কয়টা টাকা ওনার গায়েও লাগবে না।”
“ওনার হাত থেকে যদি একটা পয়সাও কোথাও পড়ে যায়, সেটার জন্যেও গাই কোর্টনী সাতদিন আফসোস করেন। তবে এখানে ব্যাপার সেটা না। ব্যাপারটা হচ্ছে উনি দস্যুদের বিরুদ্ধে কিছু করেন না, কারণ ওনার যে পরিকল্পনা তাতে আংরিয়া থাকলেই লাভ। এতে করে সাগর পথে ত্রাসের সৃষ্টি
“এটা কোনো কথা হলো। দস্যুরা তো ওদের ব্যবসার জন্যেও হুমকি,” ফ্রান্সিস প্রতিবাদ করলো।
“ইন্ডিয়াম্যানগুলো হচ্ছে সাগরের সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে বেশি অস্ত্রসস্ত্র সজ্জিত জাহাজ। আংরিয়া ওগুলোকে ঘাটায় না। তার বদলে ও ইন্টারলোপার বা কান্ট্রি ট্রেডারদের লুট করে।”
“এভাবে গাইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী কমে যায়, আর মালপত্রের দামও যায় বেড়ে?” টম শিষ দিয়ে উঠলো। যদিও ও জানে যে ওর অবাক হওয়া উচিত না। জাহাজ নিয়ে প্রথম যেদিন সমুদ্রে নেমেছিলো, সেদিন থেকেই ও জানে যে ভারত মহাসাগর হচ্ছে পৃথিবীর সবচে দুর্ধর্ষ দস্যুদের বিচরণক্ষেত্র। কয়েক বছর আগেই, হেনরি এভারি নামের এক ইংরেজ, মুঘলদের একটা জাহাজ উদ্ধার করে। জাহাজটা মক্কায় যাচ্ছিলো হজ্ব করতে। প্রচুর সম্পদ ছিলো ওটায়। দস্যুরা তিনদিন ধরে লুট করে জাহাজটা। লুটের মাল আর কখনোই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, গাই নিজেও ঐ দস্যুগুলোর চাইতে কোনো অংশেই কম নির্মম না।
ব্যারি টেবিলে আঙুল দিয়ে তবলা বাজাতে বাজাতে বললো, “এ-তো ঘটনার অর্ধেক। শাহুজি-র কথা শুনেছেন?”
টমার ফ্রান্সিস মাথা নাড়লো।
“শাহুজি হচ্ছে সাতারা-র রাজা। মারাঠাদের রাজা আরকি,” অ্যানা বললো। “বিগত তিরিশ বছর ধরে ওরা মুঘলদের বিরুদ্ধে স্বাধীন হবার জন্যে যুদ্ধ করছে। নিজেদের আলাদা সাম্রাজ্য গড়তে চায় ওরা।”
“কিন্তু তাতে গাই চাচার কি?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো।
“মালাবার উপকূলের বেশিরভাগ বন্দর শাহুজির নিয়ন্ত্রণে,” ব্যারি বলল। “আর বন্দর থেকে যে রাস্তাগুলো বেরিয়েছে সেগুলোও ওনার দখলে বলে কোর্টনী ওনার সাথে একটা মধ্যস্ততায় আসতে চান। মানে ওনার মালামালের জন্যে নিরাপত্তা আর বন্দরে যে রাজস্ব দেওয়া লাগে সেটা একটু যাতে রাখেন সে ব্যাপারে একটা চুক্তি করতে চেয়েছিলেন। আর শাহুজির জন্য হচ্ছে আংরিয়া। গাই ভেবেছিলেন যে শাহুজির সাথে করা চুক্তির খাতিরে আংরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন, কিন্তু যেহেতু কোনো চুক্তি হয়নি, আংরিয়ার দস্যুতার কারণে শাহুজি আরো দুর্বল হচ্ছেন আর গাইয়ের শক্তি বাড়ছে।”
টম এই এলাকার গোলকধাঁধাতুল্য রাজনীতির কিছুটা অবস্থা টের গেলেন সন্দেহ নেই গাই একজন সুদক্ষ খেলোয়াড়। সারা উপমহাদেশ জুড়ে ওরা বিস্তৃত করে রেখেছে। এখন সুতোর টানে একজনের বিরুদ্ধে আর একজন খেলিয়ে খেলিয়ে নিজের আখের গোছাচ্ছে। কিন্তু টমের কাছে এসব ব্যাখ্যা কোনো গুরুত্ব নেই।
“এসব ফরমান, রাজা, মুঘলদের ব্যাপার স্যাপারে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই,” ও বললো। “আমাদের মাথা ব্যথা শুধু সারাহ আর অ্যাগনেসকে কিভাবে উদ্ধার করা যায় সেটা নিয়ে।”
“কিন্তু কিভাবে?” ব্যারি বললো। “আপনারা তো মাদ্রাজ থেকে এসেছেন। দুৰ্গটা দেখেছেন না? ওটা একেবারে দুর্ভেদ্য।”
“আমি ওটাকে দখল করতে চাই না। আংরিয়া ব্যবসায়ী লোক। তিরিশ হাজার রুপি মুক্তিপণ দিয়েই ওদেরকে ছাড়িয়ে আনবো।”
ফ্রান্সিস হতাশায় টেবিলের উপর ঘুষি বসালো একটা। ওটার উপরের থালাবাটিও সব ঝনঝনিয়ে উঠলো। “কিন্তু আমাদেরতো অতো টাকা নেই। এতো কথা বলেও আমরা ঘুরে ফিরে সেই বটের তলাতেই ফিরে এলাম।
টম দাঁত বের করে হাসলো। রক্তের মধ্যে পরিচিত এক শয়তান হাতছানি শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু আমরা এখন জানি গাই কোথায় টাকা রাখে।
বাকিরা ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। “মানে আপনি ওনার সিন্দুক ড করতে চাচ্ছেন?” ধীরে ধীরে বললো অ্যানা।
“আংরিয়ার দুর্গে ঢোকার চাইতে গাই-এর সিন্দুক ঘরে ঢোকা কিন্তু হবে না,” ব্যারি সতর্ক করলো। “ওখানের চাবি মাত্র একটা। আর সেটাকে নিজের অফিসে লুকিয়ে রাখে।”
“কিন্তু আমরা আংরিয়ার দুর্গটা না চিনলেও গাই-এর দুর্গে ঢুকতে পারবে একজন আমাদের সাথে আছে,” টম ফ্রান্সিসের দিকে ফিরলো। “বাকি লোকজন যারা আছে তাদের সবাইকে ঘাটের কাছে জড়ো করো। গাইকে এবার নিজের পরিবারকে সহায়তা করার শিক্ষা দিতে হবে।”
