গাই ওর দিকে শীতল চোখে তাকালো। “আমাকে আবেগতাড়িত করার চেষ্টা করে লাভ নেই। আমার বৌ গত একমাস ধরে প্রতি রাতে আমার কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করেই যাচ্ছে কিছু একটা করার জন্যে। হাত পায়ে ধরতে পর্যন্ত বাদ রাখেনি। শেষে পিটিয়ে ভূত ছাড়িয়েছি। একজন মহিলার পক্ষে ব্যবসার এতো মারপ্যাঁচ বোঝা সম্ভব না, কিন্তু তুমি…” সরু চোখে ফ্রান্সিসকে দেখতে লাগলো গাই। “তুমি এখানে এসেছে আমার আশ্রয়ে থাকতে, কোম্পানির হয়ে কাজ করতে। আমি আশা করবো তুমি অন্তত পরিস্থিতির নাজুকতা বুঝতে পারবে। লর্ড চিল্ডসকে যদি লিখে পাঠাতে হয় যে, তোমার জন্যে আমার এখানে কোনো পদ খালি নেই, তাহলে সেটা আমার জন্যেও সম্মানহানীকর।”
ফ্রান্সিস উথলে ওঠা রাগটাকে সামলালো। এতে করে ওর কোনো লাভ হবে না। “দুঃখিত, চাচা। আমি আর আপনার উপরে কখনো কিছু বলবো না। আমি এদেশে আসলাম-ই তো কয়েক মাস। তাই এখনো আসলে এখানকার পরিস্থিতির কিছুই ভালোমতো জানি না।”
“আর এ কয়মাসেই যথেষ্ট ঝড় ঝাঁপটা গেলো তোমার উপর দিয়ে।” গাই নিজের চেয়ারে হেলান দিলো। চোখ অর্ধেক মুদে রেখেছে। “ব্রিঞ্জোয়ানে যে লোকটা একাই দুৰ্গটাকে বাঁচিয়ে দিলো তার সম্পর্কে বলো দেখি। আমি অনেকের কাছ থেকেই খবর পেয়েছি। কিন্তু লোকটা যে আসলে কে সেটা কেউ বলতে পারলো না।”
ফ্রান্সিস জমে গেলো। ঝড় বইতে লাগলো মাথার ভিতর। টমের পরিচয় ফাস না করে গাইকে কি কি বলা যায় সেটা ভাবছে।
“ওনার নাম হচ্ছে টম উইল্ড। কেপ টাউন থেকে যে জাহাজটায় আসছিলাম ওটার মাস্টার ছিলেন উনি। সত্যি কথা হচ্ছে, আমিও খুব বেশি কিছু জানি না ওনার সম্পর্কে। উনি কথাবার্তা খুব কম বলতেন।”
“দুর্গে এতোগুলো মাস আটকে থাকার পরেও? আমিতো ভেবেছিলাম যারা এতোদিন একসাথে একটা অবরোধ কাটিয়ে দিয়েছে, তারা তাদের একান্ত গোপনীয় সব খবরও জেনে ফেলবে।” গাই দুই হাতের আঙুল একসাথে ভাজ করে থুতনি রাখলো তার উপর। “আমি যাদের কাছ থেকে খবর নিয়েছি তারা তো বললো তোমরা নাকি খুব ঘনিষ্ট ছিলে? তুমি বাদে আর কারো উপর নাকি সে অতোটা ভরসা করতো না।”
“সবাই-ই সবার কাজ করেছে।”
“তুমি নাকি তাকে চাচা ডাকতে?”
“ভুল করেছে ওরা। আমি ক্যাপ্টেন হিকসকে চাচা ডাকতাম। যে বলেছে সে গুলিয়ে ফেলেছে।”
ফ্রান্সিস জোর করে গাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। আশা করছে চেহারায় ওর মিথ্যাগুলো ধরা পড়বে না।
“তা এই মিস্টার উইল্ড কি তোমার সাথে বোম্বেতে এসেছেন?”
মিথ্যে বলে লাভ নেই। গাই নিশ্চয়ই এততক্ষণে জাহাজের লোকজনের তালিকাটা দেখেছে। “জ্বী, এসেছেন।”
“উনি কোথায় থাকবেন সেটা কি বলেছেন তোমাকে?”
“না।”
“সমস্যা নেই,” সন্তুষ্ট দেখালো গাই-কে। “বোষে ছোট একটা জায়গা। তাকে খুঁজে পেতে সমস্যা হবে না। এনার সাথে দেখা করতে পারলে খুব খুশি হবো আমি। একেবারে সমুদ্র থেকে উঠে এসে কোম্পানির ব্যবসা আর সম্মান দুটোই রক্ষ করেছেন। অনেক গল্প করা যাবে ওনার সাথে।”
“ওনার সাথে দেখা হলে, আপনার কথা বলবো তাহলে,” ফ্রান্সিস চলে যাওয়ার ছুতো খুঁজতে লাগলো। “মাফ করবেন চাচা, অনেক লম্বা ভ্রমণ সেরে এসেছি। আমি শহরে থাকার জন্যে জায়গা খুঁজে নেবো।”
গাই এমন ভাব করলো যেনো কষ্ট পেয়েছে খুব। “এসব কি বলো। আমার ভাতিজা তুমি-তাছাড়া যুদ্ধজয়ী বীর। আমার সম্মানিত মেহমান হিসেবে এই বাড়িতেই থাকবে তুমি। আমি নিজে তোমার জন্যে পরে বাসা খুঁজে দেবে। আমার পরিবারের কোনো সদস্যুতো আর যেন তেন জায়গায় থাকতে পারে না
ফ্রান্সিস ওর আতংক লুকানোর চেষ্টা করলো। “অনেক ধন্যবাদ চাচা,” সংকোচের সাথে বললো ও। “কিন্তু আমি এখানে আসার আগেই একটা সরাইখানায় ঘর নিয়ে নিয়েছি। আমি ওখান থেকে জিনিসপত্র নিয়ে এখুনি চলে আসছি তাহলে।”
“আমি একজনকে পাঠিয়ে তোমার জিনিসপত্র আনানোর ব্যবস্থা করছি,” গাই বললো। তারপর আবার কি ভেবে বললো, “তবে তোমার বয়স কম। আর দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রায় খুব বিরক্ত নিশ্চয়ই। বোম্বের পথঘাটে একটু ঘোরা ফেরা করে খোলা হাওয়া খেলে খারাপ লাগবে না তোমার।” বলে গাই ফ্রান্সিসের দিকে চোখ টিপলো। ওর ইংগিত ধরতে পেরে শিউরে উঠলো ফ্রান্সিস। “ঠিক আছে, যাও তাহলে। ছয়টায় রাতের খাবার খাই আমরা।”
“তখন আবার দেখা হবে। আসি, চাচা।”
ফ্রান্সিস বিদায় হতেই গাই বেল বাজিয়ে তার একজন কেরানিকে ডাকলো। নীল পোশাক পরা কমবয়সী এক ছেলে উপস্থিত হলো একটু পর। ছেলেটা একেবার তালপাতার সেপাই। মাথায় তেল চপচপ করছে। চেহারায় বসন্তের দাগ। নাম পিটার পিটার্স। গাই জানে যে নিজের পদোন্নতির জন্যে ছেলেটা যে কোনো কিছু করতে রাজি।
“ফ্রান্সিসের পিছু পিছু যাও, আর দেখো ও কোথায় কোথায় যায়,” গাই আদেশ দিলো ওকে। “কার কার সাথে কথা বলে সেটা দেখে এসে জানাবে আমাকে।”
পিটার্স জামার হাতার পিছন দিয়ে মুখ মুছে কুর্নিশ করলো। “অবশ্যই, স্যার।”
“বিশেষ করে ও টম উইল্ড নামের কারো সাথে কথা বলে কিনা সেটা খেয়াল করবে। যদি এই উইল্ড ব্যাটাকে খুঁজে পাও, তাহলে আর ওকে অনুসরণ করার দরকার নেই। সাথ সাথে ও কোথায় আছে সেটা আমাকে এসে জানাবে।”
পিটার যাওয়ার পর, গাই জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বন্দরের জাহাজগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো। একটা মাছি এসে বসলো জানালার আড়কাঠে। ব্রিঞ্জোয়ানের রহস্যময় রক্ষাকর্তার কথা শোনার পর থেকেই গাই-এর মনের ভিতর ভয়ানক একটা চিন্তা ডালপালা ছড়াচ্ছে। আর এখন লোকটা ফ্রান্সিসকে সাথে করে বোম্বেতে চলে আসায় ওর সন্দেহের গোড়ায় জল ঢালা হয়েছে। আরো।
