“আলোয় এসে দাঁড়াও, যাতে ভালোমতো দেখতে পারি,” গমগমে গলায় বলে উঠলো গাই। তারপর ও ফ্রান্সিসকে এমন দৃষ্টিতে জরিপ করতে লাগলো যে ফ্রান্সিসের মনে হতে লাগলো ও যেনো বিক্রির জন্যে হাটে ভোলা কোনো পশু। “হুম, তুমি আসলেই বিলির ছেলে। সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। আমি তোমার বিরুদ্ধে এ ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করবো না।”
ফ্রান্সিসের কিছু বলার সাহস হলো না। বলতে চাইলেও গলা দিয়ে বের হতো কিনা সন্দেহ। ঘরের চারপাশে তাকাতে তাকাতে দেয়ালে ঝোলানো একটা ছবির দিকে নজর গেলো ওর। ছবিটা স্যার হাল কোর্টনীর, রাজা চার্লসের আমলের পোশাক গায়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মাথায় পরচুলা, তার উপর পালক লাগানো টুপি। এক হাত অলসভাবে একটা দুর্দান্ত সুন্দর তরবারির হাতলের উপর রাখা। চিত্রকর অসম্ভব দক্ষ হাতে ছবিটা এঁকেছেন। হাতলের নীলাটার প্রতিটা খাঁজ পর্যন্ত স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
গাই ওর দৃষ্টি অনুসরণ করলো। “ছবিটা পছন্দ হয়েছে?”
“হাই উইন্ডে যখন ছিলো তখন আরো বেশি পছন্দ ছিলো,” ফ্রান্সিস বললো। কোথায় আছে ভুলে গিয়েছে যেন।
গাই একটা বাঁকা হাসি হাসলো। “চিনতে পেরেছো তাহলে। তোমার সৎ বাবার কাছে থেকে কিনেছিলাম এটা। সে তো আমাকে এটা দিতে পেরেই খুব খুশি। কারণ নগদ টাকার খুবই দরকার ছিলো তার।”
গাই হাতের পালকের কলমটা নামিয়ে রাখলো। এতোক্ষণ কিছু একটা লিখছিলো সে। “স্বীকার করছি যে আমি বিগত কয়েকমাস ধরে তোমার আসার অপেক্ষা করছি। বর্ষার আগেই আমি তোমাকে কোম্পানির কাজে নিয়োেগ দেওয়া সংক্রান্ত একটা চিঠি পেয়েছি।”
“কেপ টাউনে আটকে পড়েছিলাম আমি।”
গাই ফ্রান্সিসকে জরিপ করলো আবার। ছেলেটা লন্ডন ছাড়ার আগেই চিল্ডস গোপনে ওকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন সব। এটাও জানিয়েছেন যে টম এখনো বহাল তবিয়তে কেপ টাউনে অবস্থান করছে। আর উনি ফ্রান্সিসকে পাঠিয়েছেন টমকে মারতে। খবরটা শোনার পর থেকেই গাই-এর মেজাজ চড়ে আছে। আশা নিরাশার দোলাচালে দুলতে দুলতে বিগত কয়েক মাস পরবর্তী খবরের অপেক্ষায় বসে আছে সে।
“লর্ড চিল্ডস কেপ টাউনে তোমাকে একটা কাজ করতে দিয়েছিলেন বলে শুনেছি,” গাই বললো।
নিজের যমজ ভাইয়ের খুনের কথা কেউ এভাবে সহজভাবে করতে পারে বলে ফ্রান্সিসের ধারণা ছিলো না। দুই ভাইয়ে কি এমন হয়েছিলো সেই চিন্তাটা আবার ফিরে এলো ওর মাথায়।
“জী।”
“তা সেটা কি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে?”
ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকালো।
“আমি সেরকম কোনো খবর পাইনি।”
“আমরা লাশটা পাহাড়ে লুকিয়ে রেখেছিলাম। শিয়াল আর হায়েনা থাকে ওখানে। ওদেরকে যে আর কেউ চিনতে পারবে না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। পরে আমি এক কান্ট্রি ট্রেডারের জাহাজে উঠি, কিন্তু সেটা ব্রিঞ্জোয়ানের কাছে ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যায়। আমি ওখানকার কুঠিতে আশ্রয় নেই। এরপর কি কি হয়েছে তা তো আপনার জানা।”
“তা তো অবশ্যই।”
“আপনি নিশ্চয়ই জানতেন যে অ্যাগনেস আন্টি, আর তার স্বামী ক্যাপ্টেন হিকস ব্রিঞ্জোয়ানে ছিলেন।”
“ক্যাপ্টেনের হিকসের মৃত্যু আসলেই বড় একটা আঘাত,” নির্বিকার কণ্ঠে বললো গাই।
“আর-আমি জানিনা আপনি খবরটা পেয়েছেন কিনা-অ্যাগনেস আন্টিকে দস্যু আংরিয়া ধরে নিয়ে গিয়েছে।”
গাই ওর কলমের প্রান্ত দিয়ে নিজের থুতনিতে আঘাত করতে লাগলো। “হ্যাঁ, অনেক আগেই শুনেছি। কয়েক সপ্তাহ আগে আংরিয়ার কাছ থেকে মুক্তিপণের দাবিতে চিঠি পেয়েছি। অ্যাগনেসের সাথে সে ফয়ের বৌ এবং আর একজন মহিলাকেও আটকে রেখেছে। ইনি নাকি ক্যাপ্টেন হিকসের বোন।” গাই-এর ভ্রু কুঁচকে গেলো। “ক্যাপ্টেন হিকসের যে বোন আছে সেটাই জানতাম না আমি।”
“কেপ টাউন থেকে আমি যে জাহাজে আসছিলাম, উনিও সেই জাহাজেই ছিলেন,” ফ্রান্সিস বলে উঠলো তাড়াতাড়ি। গাই-এর সন্দেহ দূর করতে চাইছে। “ডরসেটে থাকতেন উনি। কিন্তু কিছুদিন আগে বিধাব হয়েছেন। তাই ভাইয়ের কাছে সাহায্য নিতে আসছিলেন।”
মিথ্যেয় কাজ হলো। গাই আগ্রহ হারিয়ে ফেললো।
“কিছু মনে না করলে, আংরিয়া মহিলা তিনজনের জন্যে কতো টাকা চেয়েছে, সেটা কি একটু বলা যাবে?” ফ্রান্সিস জানতে চাইলো।
“তিরিশ হাজার রুপি।”
ফ্রান্সিস হাঁ হয়ে গেলো। “তার মানে পাঁচ হাজার পাউন্ডেরও বেশি।
“প্রায় ছয় হাজার পাউন্ড,” গাই শুধরে দিলো।
গাই-এর সুস্থির দশা দেখে ফ্রান্সিস আর এক দফা অবাক হলো। “কিভাবে টাকা দেবেন? ওদের সাথে কোনো বন্দোবস্ত হয়েছে?”
“বন্দোবস্ত?” গাই এতো জোরে হেসে উঠলো যেনো বিগত কয়েক মাসে এতো মজার কিছু শোনেনি। “আমি আংরিয়াকে বলে পাঠিয়েছি যে ও আমার কাছে থেকে শুধু মাত্র সীসা পাবে, স্বর্ণ না। কামানের মুখ থেকে ছোঁড়া হবে সেটা।”
“তার মানে আপনি ওর দুর্গ আক্রমণ করতে চাচ্ছেন?”
“আরে নাহ। টিরাকোলা দুর্ভেদ্য একটা দুর্গ। আমরা যদি আক্রমণ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই, তাহলে সারা দুনিয়ার সামনে মাথা হেট হয়ে যাবে। বানটাম থেকে জাঞ্জিবার পর্যন্ত সবকয়টা জলদস্যু তখন আর আমাদের এক ফোঁটা ভয় পাবে না। তাতে ব্যবসার যা ক্ষতি হবে তা কোনোদিন আর পূরণ করা সম্ভব হবে না।”
“তাহলে কি করবেন?”
গাই কিছু না বলে কলমটা এলোমেলো নাড়তে লাগলো। একসময় ফ্রান্সিস এর অর্থ বুঝতে পারলো। “কিন্তু এভাবে ওনাদেরকে ছেড়ে দেবেন? অ্যাগনেস হিকস আমার আন্টি-আপনার শ্যালিকা।”
