বন্দী লোকটা করুণ সুরে ক্ষমা চাইতে শুরু করলো। একজন প্রহরী এগিয়ে এসে ওর গালে সপাটে একটা চড় বসিয়ে থামিয়ে দিলো। আংরিয়া আর ক্রিস্টোফার একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। দস্যুর চোখের দিকে তাকিয়ে ক্রিস্টোফার শুধু একটা জিনিসই দেখতে পেলো, সেটা হচ্ছে ক্ষমতার অসীম ক্ষুধা। ও জানে না যে আংরিয়াও ওর চোখের আড়ালে একই জিনিস দেখতে পেয়েছে।
“আমি একটা প্রস্তাব দিতে চাই,” আংরিয়া বললো। “তুই এখানে নিজে থেকেই এসেছিস, আমি আবার তোকে এভাবেই চলে যেতে দেবো। কোনো বাধা ছাড়াই আমার দুর্গ থেকে চলে যেতে পারবি। আর যদি এখানে থেকে আমাকে খুশি করতে পারিস, তাহলে অচিরেই প্রচুর টাকা কামাতে পারবি। কিন্তু যদি আমার সাথে বেঈমানি করিস, তাহলে এমন মূল্য দিতে হবে যে হাঙ্গরেরাও তোর গা থেকে খাওয়ার মতো কিছু খুঁজে পাবে না।”
ক্রিস্টোফার ইতস্তত করতে লাগলো। আংরিয়া ভাবলো ও বোধহয় ভয় পেয়েছে।
“যদি তোর মনে ভয়ের লেশমাত্র থেকে থাকে তাহলে এখানে কোনো জায়গা হবে না।”
ক্রিস্টোফারের ওসবের বালাই নেই। ঘরের ভিতরের ধন সম্পদ আর দেয়াল ঝোলানো জিনিসগুলো দেখেই ও বুঝে গিয়েছে যে এটাই ওর জায়গা। ও আংরিয়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। একজন চাকর এসে ওর সামনে এক বাটি দুধ আর এক থালা ভাত রাখলো। ও ভাতের সাথে দুধ মেখে চেটে পুটে খেয়ে নিয়ে আংরিয়ার শিখিয়ে দেওয়া শপথ বাক্যটা পাঠ করলো।
“আজ থেকে আমি আপনার অন্ন খাবো, আর সবসময় আপনার পায়ের কাছেই থাকবো।”
*
কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই বোষেতে পৌঁছালো টমরা। বন্দরের ঢোকার সময় থেকেই টম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সব পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। জাহাজের মাস্টার মালাবার পয়েন্টের সাতটা গাছের সোজাসুজি জাহাজ চালাতে লাগলেন। এখানকার প্রবাল প্রাচীর আর চড়াগুলোড় ফাঁক দিয়ে আগানোর জন্যে এটাই সবচে নিরাপদ গতিপথ। টম এর আগে এসব শুধু মানচিত্রেই দেখেছে সাঙ্কেন রক, দ্য ওয়েস্টার, মিডল গ্রাউন্ড। ওগুলো পেরিয়ে ওরা বোম্বের পানিতে চলে এলো। ডুঙ্গারি পাহাড়ের উপরের বিশাল দুৰ্গটার নিচে গিয়ে থেমেছে উপসাগরটা।
টম ওর জামা, পায়জামা এমনকি মোজাও খুলে ছোট পায়জামা পরে নিলো, যাতে ওকে একজন নাবিকের মতো লাগে। ডাঙায় যাওয়ার সময়, বাকিদের মতো ও-ও দাঁড় বাইলো। অ্যানা আর ফ্রান্সিস পিছনের দিকে মাস্টারের সাথে বসে রইলো। টমের এখানে কেমন যেনো নিজেকে বেপর্দা মনে হতে লাগলো, এমনকি ব্রিঞ্জোয়ানের চাইতেও এখানে ওর নিজেকে বেশি অসহায় মনে হচ্ছে। এটা গাই-এর এলাকা। কে জানে গভর্নরের বাড়ি থেকে কেউ হয়তো লুকিয়ে লুকিয়ে নজর রাখছে সবদিকে।
আশপাশের ডোবা আর পচা মাছের গন্ধে টমের নাক সুড়সুড় করতে লাগলো। নৌকা পাড়ে ঠেকতেই ও দ্রুত নিজের চেহারা ঢেকে ফেললো। বিকেল বেলা, তাই পানির ধারে তেমন কেউ নেই। কুলি আর খালাসীরা ঘাটের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছে। জাহাজ ভেড়ার পরেও ওদের মালপত্র নামানোয় খুব বেশি আগ্রহ লক্ষ্য করা গেলো না।
ফ্রান্সিস, অ্যানা আর মাস্টার কয়েকজন কোম্পানির কর্মচারীর সাথে কথা বলতে লাগলো। গাই কোর্টনীর ভাতিজা আচমকা এখানে এসে উপস্থিত হওয়ায় ওরা যারপরনাই অবাক। কপালের ঘাম মুছতে মুছতে নিজেদের মধ্যে চিন্তিত ভঙ্গিতে দৃষ্টি বিনিময় করতে লাগলো ওরা। সবাই ভাবছে যে এই নতুন আগমনে দুর্গের ক্ষমতার ভাগ কিভাবে কোনোদিকে হেলে পড়বে এখন। মুঘল সম্রাটেরা দিল্লিতে যেভাবে রাজ্য চালাতেন, গাই-ও এখানে ঠিক সেভাবেই নিজের সাম্রাজ্য বানিয়ে বসেছে। ওর অধস্তনেরাও তাই সবসময় ওর মেজাজ মর্জি বুঝে চলার চেষ্টা করে।
কোম্পানির লোকেরা ফ্রান্সিসকে গভর্নরের বাড়িতে নিয়ে গেলো। যখন টম নিশ্চিত হলো যে কেউ খেয়াল করছে না, তখন ও দুর্গের দেয়ালের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা সরাইখানাগুলোর দিকে আগালো। ভিতরে লোকজন গিজগিজ করছে। এক কোনায় একটা টেবিল খুঁজে নিয়ে বসে পড়লো টম। কয়েক মুহূর্ত পরেই মেরিডিউ নামের এক নাবিক এসে উপস্থিত হলো ওখানে। মেরিডিউ হলো কেস্ট্রেল-এর ডুবে যাওয়া আর ব্রিঞ্জোয়ানের অবরোধ দুটোই পার করে বেঁচে যাওয়া মুষ্টিমেয়দের একজন।
“কেউ আপনার পিছু নেয়নি, হুজুর। আমি দুর্গের বাইরে মাস্টার ফ্রান্সিসের জন্যে অপেক্ষা করছি গিয়ে।”
টম মাথা ঝাঁকালো। আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো কাজ নেই।
*
ফ্রান্সিস দুর্গের দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। পিছনে সশব্দে ফটকটা বন্ধ হয়ে যেতেই নিজেকে ফাঁদে আটকা পড়া পশুর মতো মনে হতে লাগলো ওর। সামনের চত্বর, প্রহরীদের থাকার জায়গা, ভাড়ার ঘরে পেরিয়ে গভর্নরের বাড়িতে যাওয়ার সিঁড়ি বেয়ে যতোই উঠতে লাগলো, ততোই দুশ্চিন্তা আরো ঘনীভূত হতে লাগলো। গভর্নরের বাড়িটা দুর্গের দক্ষিণ পাশে। সোজা বন্দরের দিকে মুখ করা।
আগেই ওর আগমনের খবর পৌঁছে গিয়েছে। ওকে সরাসরি তাই উপরের তলার গভর্নরের অফিসে নিয়ে যাওয়া হলো।
ফ্রান্সিসের সাথে ওর চাচা গাই-এর আগে কখনোই দেখা হয়নি। হাই উইন্ডের দেয়ালে অবশ্য তার একটা ছবি ঝোলানো ছিলো। কিন্তু সেটা তার বাচ্চাকালের। একটা গোলগাল বাচ্চা একটা কুকুরের বাচ্চা কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই ছেলেটার সাথে এখন বিশাল জানালাগুলোর সামনে বসে থাকা লোকটার কোনো মিলই নেই। লোকটা লম্বা আর একহারা, পরনে সবুজ কোট। এতো নিখুঁতভাবে সেলাই করা যে কেমন অস্বাভাবিক লাগছে। বসা অবস্থাতেও তার চেহারায় গৌরব আর ধূর্ততা দুটোই ফুটে উঠছে। যেনো কোনো বিড়াল ঘুমের ভান করছে। গাই কোর্টনী দেখতে সুপুরুষ, সুঠাম দেহ, মাথা ভর্তি চুল। কিন্তু তবুও চোখের দিকে তাকালে কাছে ঘেঁষতে ইচ্ছে হবে না। ফ্রান্সিস, গাই-এর চেহারায় তার যমজ ভাই টমের প্রতিচ্ছায়া খোঁজার চেষ্টা করলো কিন্তু পেলো না।
