আংরিয়া একদৃষ্টিতে ক্রিস্টোফারকে জরিপ করলো কিছুক্ষণ। মুখভর্তি দাড়ি, আর গোলাপি হয়ে ফুটে থাকা চামড়ার তাজা কাটা দাগগুলোর পরেও আগন্তুককে একটা বালক বলে মনে হচ্ছে। এখনো বিশ হয়নি বয়স, কিন্তু যুদ্ধ করে পাকা হয়ে গিয়েছে। সন্দেহাতীত ভাবে একজন যোদ্ধা এ। তবে বয়স খেয়াল করার আগে আংরিয়া প্রশংসার দৃষ্টিতে ওর দৈহিক গড়ন আর শক্তিমত্তা খেয়াল করলো।
“কি নাম?” জিজ্ঞেস করলো আংরিয়া।
“রুদ্র,” জবাব দিলো আগন্তুক। রুদ্র হচ্ছে ভগবান শিব-এর একজন অবতার। শিব হচ্ছেন ধ্বংসের দেবতা। ছেলেটার তারুণ্য আর চোখের খুনে দৃষ্টি দেখে। আংরিয়া যেনো শিবঠাকুরেরই এক টুকরো প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলো।
“এখানে কি চাই?”
“আপনার হয়ে কাজ করতে চাই?”
“কি কাজ পারিস তুই?”
“আমি টুপিওয়ালাদের কায়দা কানুন সব শিখেছি,” ক্রিস্টোফার বললো। “আমি ওদের সাথে জাহাজ চালিয়েছি। আমি আপনার লোককে ওদের মতো করে যুদ্ধ করা শেখাতে পারবো-আরো বেশি সুশৃঙ্খল আর দক্ষতার সাথে?”
আংরিয়া মাথা নাড়লো। “তোর বয়স যতোদিন, তার চাইতে বেশিদিন ধরে আমি টুপিওয়ালাদের সাথে লড়ছি। আমার লোকদের ওদের মতো করে যুদ্ধ করতে না জানলেও চলবে। আমার এমন লোক দরকার যে নিজের মতো করে, সাহসের সাথে যুদ্ধ করবে। একটা বাঘকে কখনো কোবরার মতো ছোবল মারা শেখানো সম্ভব না।
“কালারি-তে যুদ্ধ শিখেছি আমি। আমি বাঘ বা কোবরা, দু’ভাবেই লড়াই করতে জানি।” ক্রিস্টোফার নিজের তরবারি বের করলো। “সেটা প্রমাণ করার জন্যে আমি এখানকার যে কারো সাথে লড়তে প্রস্তুত।”
কথাটা শোনামাত্র অর্ধেক লোক দাঁড়িয়ে গেলো। হতচ্ছাড়াটাকে উচিত শিক্ষা দেয়ার জন্যে সবাই প্রস্তুত। কয়েকজন অবশ্য জায়গাতেই বসে রইলো। এরা সবাই বয়স্ক আর অভিজ্ঞ। এরা ঠিকই আগন্তুকের সামর্থ্যের আন্দাজ করতে পেরেছে, তাই আগ বাড়িয়ে ঝামেলায় যাওয়ার চিন্তা করেনি।
আংরিয়া উঠে দাঁড়িয়ে চুপ করালো সবাইকে। তারপর বেদি থেকে নেমে এসে ক্রিস্টোফারের চারপাশে এমনভাবে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো যেনো গ্রামের মেলায় সদাই করতে এসেছে।
“দারুণ তরবারি তো,” বললল ও। দরবারের আলোয় নীলাটা ঝিকিয়ে উঠছে। “তোর সাহস আসলেই অনেক বেশি, নইলে এরকম একটা তরবারি হাতে এরকম সম্পূর্ণ অচেনা একদল মানুষের মাঝে আসার সাহস করতি না।”
“আপনার উপর আমার সম্পূর্ণ ভরসা আছে,” ক্রিস্টোফার বললো।
আংরিয়া মাথা ঝাঁকিয়ে প্রশংসাটা গ্রহণ করলো।
“তবে যদি কেউ এটাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করে, তাহলে সে সাথে সাথে তার হাতটা হারাবে।”
আবার চাপা গর্জন শোনা গেলো ঘরের ভেতর। যদিও কেউ এগিয়ে এসে চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করলো না। আংরিয়া আবার ওদের চুপ করতে বললো।
“তোর পরিচয় যে সত্যি সেটা কিভাবে বুঝবো আমি? আমার শত্রুর অভাব নেই। তুইতো রাজা শাহুজি-র চর হতে পারিস। বা যে টুপিওয়ালাদের জাহাজটা লুট করেছিলাম তাদেরও পাঠানো কেউ হতে পারিস।”
ক্রিস্টোফার ওর চোখে চোখ রেখে বললো, “আপনার কোন লোকটা সম্পর্কে আপনি নিশ্চিত হতে পারেন?”
আবার কয়েকজন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেলো, হাতে ছুরি বেরিয়ে এসেছে।
আংরিয়া হাসলো। “আসল কথা হচ্ছে, একজন চর হলে তুই এসে আমার লোকদের না ক্ষেপিয়ে তেল মারার চেষ্টা করতি। তবে এটাও হতে পারে যে, তুই ইচ্ছে করে এরকম করছিস যাতে আমি উল্টোটা ভাবি।”
আংরিয়া হাত দিয়ে ইশারা করতেই পাশের একটা দরজা খুলে গেলো। চারজন প্রহরী একজন অস্থিচর্মসার লোককে টানতে টানতে নিয়ে এলো। লোকটার মাথায় চুল নেই বললেই চলে, কিন্তু মুখ ভরা দাড়ি গোঁফের জঙ্গল। গায়ে কাপড় নেই, শুধু কোমরের নিচে একটা ফালি ঝোলানো। গায়ের অসংখ্য কাটাকুটির দাগ থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে কি পরিমাণ অত্যাচার সহ্য করা লাগে লোকটার। প্রহরীরা ওকে আংরিয়া আর ক্রিস্টোফারের মাঝে ছুঁড়ে দিলো।
“এই লোকটা আমার টাকা চুরি করার চেষ্টা করেছিলো,” আংরিয়া বললো। “এর শাস্তি কি হওয়া উচিত?”
বন্দী কোঁ কোঁ করে উঠলো। ক্রিস্টোফারের বিরক্ত লাগলো খুব। “যদি আপনার ভাড়ার থেকে চুরি করে তো ওর অবশ্যই মরা উচিত।” বলে ও নিজের তরবারি বের করলো। তরবারির ফলাটার নিখুঁত চেহারা আর স্বর্ণালী ধারটা দেখে ঘর জুড়ে সবাই এবার বিস্ময় ধ্বনি করে উঠলো। “আমি কি আপনার হয়ে কাজটা করে দেবো?”
“তরবারি নামা,” আংরিয়া বললো। “এতো খুবই সহজ সাজা। আমি এরকম লোকের জন্যে একটা বিশেষ জায়গা বানিয়েছি। পানির ধারে, দুর্গের পাদদেশে। আমি ওখানে একটা লোহার গলবন্ধ ওখানকার পাথরে লাগিয়ে রেখেছি। ঠিক জোয়ারের পানি যতোটা ওঠে সেই জায়গায়। তুই না বললি তুই নাবিক ছিলি?”
প্রশ্নটায় ঘাবড়ে গেলো ক্রিস্টোফার, “একবার মাত্র।”
“বসন্তকালের জোয়ার কেমন হয় জানিস তো?”
“এক মাসে দুইবার, অমাবস্যা আর পূর্ণিমার সময়। জোয়ারের সময় স্বাভাবিকের চাইতে বেশি পানি উঠে যায়, ভাটার সময় নামেও বেশি দূর।”
আংরিয়া মাথা ঝাঁকালো। “গলবন্ধটা কারো মাথা এমন জায়গায় আটকে রাখে যেখানে বসন্তকালের জোয়ার ছাড়া পানি পৌঁছায় না। যে বাধা থাকবে সে প্রতিদিন একটু একটু করে পানিতে তলিয়ে যেতে থাকবে। আর ওখানকার পাথর ঝিনুক আর শামুকে ভরা। ঢেউয়ের ধাক্কায় ওগুলোর উপর ঘষা খাবে সে। ওগুলোর ধারালো কিনারে লেগে চামড়া ফালাফালা হয়ে যাবে। যখন পানি নেমে যাবে, তখন সূর্যের তাপে ওর গায়ের চামড়া কুঁচকে গিয়ে, পানি শুকিয়ে কাটা জায়গায় শুধু লবণ লেগে থাকবে। লবণ পানি ঢুকবে তার মুখে প্রচণ্ড পিপাসায় কাতর হয়ে থাকবে সে, কিন্তু একটা ফোঁটা খেতে পারবে না। খেলে পেট মোড় দিয়ে উঠবে। যদি পূর্ণিমার মাঝামাঝি একে ওখানে ঝুলিয়ে দেই, তাহলে দুই সপ্তাহের মতো লাগবে পানি এসে একে ডোবাতে। আর যখন ডুবে মরবে, তখন ওকে মরার সুযোগ দেওয়ার জন্যে উল্টো ধন্যবাদ দেবে আমাকে।”
