এই অন্ধকারেও মনে হলো লিডিয়ার চেহারা জ্বলজ্বল করে উঠলো। গত কয়েক সপ্তাহের কায়ক্লেশে ওর চৌকো চেহারাটা আরো বেশি ধারালো হয়েছে, এখন ওকে দেখতে ভয়ংকর লাগে।
“সবাই বলাবলি করে যে বাচ্চাটা-মানে ক্রিস্টোফার কোর্টনী নাকি গাই এর সন্তান না। ক্যারোলিন নাকি ইংল্যান্ড থেকে আসার পথে জাহাজে ইচ্ছে মতো যার তার সাথে শুয়েছে। আর যদিও বিয়ের দিনের ওয়াইন গাই-ই খেয়েছেন, কিন্তু বোতলের মুখ প্রথম খোলার সুযোগ নাকি ওনার হয়নি। সেই সৌভাগ্য হয়েছিলো ওনার ভাই টমের।”
এই অন্ধকারেও লিডিয়ার চোখ বিজয়ানন্দে চকচক করতে লাগলো। “এ কারণেই গাই আপনাকে ঘৃণা করে।” তারপর সারাহের দিকে চেয়ে উপহাসের সুরে বললো, “তবে আমি ভেবে পাই না, নিজের বোনের সাথে এরকম করার পরেও আপনি ওর প্রতি এতো বিশ্বস্ত। আমি হলে কোনোদিন কারো শেষ পাতের খাবার হয়ে খুশি থাকতাম না।”
“এখনতো আপনি বুঝলেন যে কেনো গাইকে সারাহের আসল পরিচয় জানানো যাবে না,” অনুনয়ের সুরে বললো অ্যাগনেস। “কথাটা আর কাউকে বলবেন না।”
লিডিয়া আবার নিজের কোনায় ফিরে গেলো। সদ্য বিজয়ের শিহরণে ওর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে আছে।
“আমার উপর ভরসা করতে পারেন,” বললো লিডিয়া। “আমি কাউকে বলবো না। আর একটা ব্যাপার, যেটার কথা আপনি কাউকে বলছেন না।”
“মানে?” নিস্তেজ কণ্ঠে বললো সারাহ।
“আপনার পেটে বাচ্চা। আপনি কখনো বলছেন না, কিন্তু আপনার পেটের ফোলাটাই সাক্ষ্য দিচ্ছে সেটার। নৌকায় আপনি খাবার পেটে রাখতে পারতেন না। আর এখন এতো কম খাবার খেয়েও আপনি মোটা হচ্ছেন। আরো অনেকগুলো লক্ষণ আছে। যে কোনো মহিলাই সেগুলো ধরতে পারবে।”
সারাহ ওর হাত মুঠো করে ফেললো।
“আপনি দস্যুদেরকে বললেন না কেনো?” লিডিয়া জিজ্ঞেস করলো।
“গত পনেরো বছর ধরে আমি আর টম বাচ্চা নেওয়ার চেষ্টা করছি,” ব্যথিত কণ্ঠে বললো সারাহ। “এর মাঝে একবার মাত্র পেটে বাচ্চা এসেছিলো আমার। কিন্তু সেটাও নষ্ট হয়ে যায়। আর এখন এই অবস্থায়…” সারাহের কথা মিলিয়ে গেলো।
“দস্যুরা জানতে পারলে নিশ্চিত ওর এই দুরবস্থার ফায়দা ওঠানোর চেষ্টা করবে,” অ্যাগনেস বললো। “সেজন্যেই আমরা এটা নিয়ে কথা বলি না, আর মিসেস ফয়, আপনাকেও অনুরোধ করছি দস্যুদেরকে কিছু না জানানোর জন্যে।”
“আচ্ছা ঠিক আছে,” লিডিয়া বললো। তারপর গুটিসুটি মেরে শুয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগলো। যদিও আলোর ঘাটতি থাকার কারণে কেউ তা দেখতে পেলো না। আর আমি বলবোই বা কাকে?”
*
কয়েদখানার অনেক উপরে-দুর্গের যে অংশটা পাথরের তৈরি সেখানে-নিজের দরবারে বসে আছে দস্যু আংরিয়া। গায়ে গতরে ও বেশি তাগড়া না, কিন্তু ওর চোখের তীক্ষ্ণতা একবার যে দেখেছে সে কখনো ভুলতে পারবে না। গিট পাকানো একটা পাগড়ি মাথায় ওর, নাকের নিচে একটা জাদরেলি গোফ, সেটা প্রায় জুলফিতে গিয়ে ঠেকেছে।
ওর জন্ম আসলে নাবিক-এর ঘরে না। ওর বাবা ছিলেন একজন দেশমুখ, মানে ছোট জমিদার। ওনার দায়িত্বে ছিলো প্রায় একশোটার মতো গ্রাম। কাজের মধ্যে ছিলো কৃষকদের মধ্যকার বিবাদ মেটানো, আর চোর ডাকাতের হাত থেকে গ্রামবাসীকে রক্ষা করা। কিন্তু আংরিয়ার এই গ্রামীণ জীবনের গবাধা জীবন ভালো লাগতো না। কৃষকেরা ওর বাবার পা চাটতো, ওর বাবা আবার তার উপরওয়ালার পা চাটতো। আর তাদের জীবনের একমাত্র ধ্যান ধারণা ছিলো পরের বছরের ফসল ঘরে তোলা। এসবে কোনো গৌরব ছিলো না। জীবনে প্রথম যেবার আংরিয়া একটা জাহাজ দেখতে পায়, তখনি ও নিজের ভবিতব্য বুঝে ফেলে। জাহাজটা ছিলো একটা পর্তুগিজ বাণিজ্য জাহাজ। সবগুলো পাল তুলে উপসাগর দিয়ে ভেসে যাচ্ছিলো সেটা। ওটার মতো করে উড়ে যেতে ইচ্ছে করছিলো ওর। আগে থেকেই এই সমাজ সংসারের নানান রীতিনীতির বেড়াজাল ভালো লাগতো না; কারো নিষেধ নামহীন একটা জীবন ছিলো ওর স্বপ্ন। পঁচিশ বছর পর ও ঠিকই স্বপ্নটা পূরণ করেছে, তবে সেই সাথে কুখ্যাতিও কুড়িয়েছে প্রচুর।
এই দরবার ঘরটা ওর সাফল্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে। দেয়াল জুড়ে বিভিন্ন জাহাজ থেকে সংগ্রহ করা স্মারক ঝোলানো-ডাচ, ইংরেজ, পর্তুগীজ পতাকা, জাহাজের ঘণ্টা, বাতি, এমনকি নগ্নবক্ষা মৎস্যকুমারীর কাঠের মূর্তিও আছে। মেঝেতে পুরু কম্বল পাতা, কোথাও কোথাও তিনটা পর্যন্ত ফেলে রাখা হয়েছে। ওর লোকেরা ওটার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে থাকে বা অবসর সময়ে পাশা খেলে, আরক পান করে আর আরব থেকে আনা হুক্কা থেকে ধূমপান করে। এখন অবশ্য সবাই চুপচাপ বসে আছে। সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ আংরিয়ার সামনে দাঁড়ানো লোকটার দিকে।
আজ বিকেলে এসে পৌঁছেছে লোকটা। যে ঘোড়াটায় চড়ে দুর্গে উঠে এসেছে সেটা একসময় দুর্দান্ত একটা বাহন ছিলো বোঝা যায়, কিন্তু টানা কয়েক সপ্তাহ দুর্গম পাহাড়ি পথ চলায় এখন খোঁড়াচ্ছে। লোকটার লম্বা কালো দাড়ি, তবে মাথার চুল পুড়ে টাক হয়ে গিয়েছে। ঘোড়া থেকে নেমে লাগামটা আস্তাবলের চাকরটার হাতে ধরিয়ে দেওয়ার পরে যখন ও সোজা হয়ে দাঁড়ালো, তখন দেখা গেলো সে দুর্গের বাকি সবার চাইতে লম্বা। আংরিয়ার সাথে কথা বলতে চাইলে ও। প্রহরীরা বিনা বাক্যব্যয়েই ঢুকতে দিলো ওকে। কোমরে এরকম জবরদস্ত একটা তরবারি ঝোলানো থাকলে, তাকে ভিতরে যাওয়ার অনুমতি না দিয়ে পারা যায় না।
