অ্যাগনেস ঠাণ্ডা দেয়ালে হেলান দিলো আবার। এসব কথা আজ প্রথম না। দস্যুরা ধরে অ্যানার পর থেকেই বেশ কয়েকবার এসব নিয়ে তর্ক বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু আজ লিডিয়া এখানেই কথা শেষ করতে দিলো না। ও সোজা উঠে বসে হাতটা টেনে কড়াগুলো ঠিকঠাক করলো। তারপর সারাহ আর অ্যাগনেসের দিকে কুটিল একটা চাহনি দিয়ে বললো, “আপনার যে আপন বোন না, এই ভাব ধরে থাকেন কেন?”
ওদের হতভম্ব চেহারা দেখে লিডিয়া শব্দ করে হেসে দিলো। “আপনারা ভেবেছিলেন আমার কাছে থেকে লুকিয়ে রাখতে পারবেন? আমি তো আর অন্ধ না। আমি সবই দেখেই, সবই শুনি। ব্রিঞ্জোয়ান থেকে আসার আগেই আমার সন্দেহ হচ্ছিলো। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে তো এটা লুকিয়ে রাখা সম্ভবই না। আপনার দুজনের এতো যত্ন নেন; আমি ঘুমিয়ে আছে মনে করে ফিসফিস করে কতো কথা বলেন। আমি আপনাদের গোপন খবরটা জানি-আর যে ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করতে চান না, সেটাও আমার জানা আছে।”
লিডিয়া মাথা তুললো। ফলে ওর চোখা থুতনিটা ওদের দিকে তাক হয়ে থাকলো। “অস্বীকার করতে পারেন?”
যদিও এটা কোনো ব্যাপার না, তবুও অ্যাগনেসের কেনো যেনো মনে হলো ওর খুব দামি কোনো সম্পদ হাতছাড়া হয়ে গেলো। এই কয়েদখানায় নিজেদের বলতে ছিলো শুধু এই গোপন কথাগুলো। এখন সেটাও আর থাকলো না। আর ও লিডিয়াকে এক বিন্দু বিশ্বাস করে না।
“হ্যাঁ, এটা সত্য,” নির্বিকারভাবে বললো সারাহ। “অ্যাগনেস আর আমি বোন। ঘটনাক্রমে ব্রিঞ্জোয়ানে নামার আগে প্রায় বিশ বছর ওকে দেখিনি আমি।”
“তার মানে আপনিও গভর্নরের স্ত্রী ক্যারোলিন কোর্টনীর বোন?”
সারাহ মাথা ঝাঁকালো।
লিডিয়া হাতকড়াসমেত ওর হাত দুটো উপরে তুললো। “তাহলে আমাদের বন্দিকারীকে বলে দিন যে আপনারা আসলে কারা। যদি গাই কোর্টনী জানতে পারেন যে এরা তার স্ত্রীর দুই বোনকেই আটকে রেখেছে-সেই সাথে তার পরম বিশ্বস্ত বন্ধু মিস্টার ফয়-এর বিধাব স্ত্রীও আছেন-তাহলে যতো টাকাই চাক না কেন উনি দিয়ে দেবেন।”
“আপনার ধারণা ভুল,” সারাহ বললো। “গাই যদি আমার আসল পরিচয় জানতে পারে, তাহলে. ও আংরিয়াকে টাকা দিয়ে বলবে আমাদেরকে মরার আগ পর্যন্ত এখানে রেখে দিতে। আর যদি ও আমাকে মুক্ত করে নেয়, তাহলে তা করবে আংরিয়ার চাইতেও ভয়ংকর কোনো শাস্তি দেওয়ার জন্যে।”
লিডিয়া সামনে ঝুঁকে এলো? যেনো কোনো ব্লাডহাউন্ড কুকুর রক্তের ঘ্রাণ পেয়েছে। “কেন?”
দেরিতে হলেও সারাহ টের পেলো যে ও অনেক বেশি বলে ফেলেছে। দুর্বলতা আর হতাশা ওর সতর্কতা কমিয়ে দিয়েছে। সেটা তেমন কিছু না।”
“যদি এই কারণেই আমাকে এই কয়েদখানায় পচে মরতে হয়, তাহলে সেটা অবশ্যই তেমন কিছু,” লিডিয়া চার হাত পায়ে ভর দিয়ে আরো সামনে এগিয়ে এলো। “কেনো গাই আপনাকে এতো অপছন্দ করে?”
“কোনো কারণ নেই।”
“আপনাকে ভালোবাসতো নাকি?”
সারাহ শিউরে উঠলো। “কোনোদিনও না।”
লিডিয়া ভাবতে লাগলো। “উনি অ্যাগনেসকে তার পছন্দ ছাড়া বিয়ে করায় ক্ষমা করতে পারেননি। সম্ভবত আপনিও একই কাজ করেছিলেন, তাই না?”
সারাহ আর কিছু বলার সাহস করলো না।
“কিন্তু তাতে তো তার আপনাকে এভোটা ঘৃণা করার কথা না,” লিডিয়া জোরে জোরে ভাবতে লাগলো। তার মানে কাহিনি আরো আছে। আপনার স্বামীকে নিয়ে সম্ভবত। আপনার স্বামী আর গভর্নর কোর্টনীর মাঝে শক্রতা আছে নাকি?”
লিডিয়ার নাক কুঁচকে গেলো। “কিন্তু কেন উনি এতোটা রাগ করবেন? আপনার স্বামী কি করেছিলেন? ইন্টারলোপার নাকি? নাকি প্রতিদ্বন্দ্বী?”।
“ইন্টারলোপার,” অ্যাগনেস বললো। “আপনিতো জানেনই যারা কোম্পানির ব্যবসা মেরে খায় গাই তাদেরকে কতোটা ঘেন্না করে। এটাই কারণ।”
কিন্তু অ্যাগনেসের হড়বড় করে বলা কথার কারণে লিডিয়া মিথ্যেটা ধরে ফেললো। “না! সেটা আসল কারণ বলে মনে হচ্ছে না। একটা বিজয়ীর হাসিতে ওর দুই ঠোঁট ফাঁক হয়ে গেলো। আমরা যখন ব্রিঞ্জোয়ানে নৌকায় মালামাল ভরছিলাম, তখন একটা লোক আপনাকে মিসেস কোর্টনী” বলে ডাক দিয়েছিলো। এরকম কেনো করবে? আর যে ছেলেটা আপনাদের সাথে ছিলো, সে হচ্ছে গাইয়ের ভাতিজা-ফ্রান্সিস কোর্টনী। সবকিছু খুব বেশি কাকতালীয়, তাই না?”
“ভুল শুনেছেন,” সারাহ বললো।
“আমার মনে হয় না। আর আপনি যদি মিসেস কোর্টনী হন, তাহলে আপনার স্বামী নিশ্চয়ই…” এক মুহূর্ত ভাবলো লিডিয়া! “টম কোর্টনী।”
সারাহ আর অ্যাগনেসের বজ্রাহত চেহারা খেয়াল হলো লিডিয়ার। ও হেসে দিলো আবার। “আপনি হচ্ছেন মিসেস টম কোর্টনী। শুধুমাত্র গাই-এর শ্যালিকা না, তার ভাইয়ের স্ত্রী-ও। এখন বুঝতে পারছি সব। বোম্বে থাকার সময় আমি টম কোর্টনীর কথা শুনেছিলাম। সবাই বলতো যে ওরা এমন শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে যে একজন আর একজনকে খুন করতে গিয়েছিলো। একবার নাকি শুধু টমের নামটা বলার অপরাধে, গাই তার বাড়ির ছাদ থেকে কাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলো।”
“আমি এসব গুজবে কান দেই না,” অ্যাগনেস বললো।
কিন্তু লিডিয়ার কথা তখনও শেষ হয়নি। “আরো একটা কাহিনি মনে পড়ছে। এখন। এক বান্ধবীর কাছে শুনেছিলাম। ক্যারোলিন কোর্টনীর চাকরানি তাকে বলেছিলো ঘটনাটা। এই চাকরানি ইংল্যান্ড থেকেই ক্যারোলিনের সাথে এসেছিলো। সে বলেছিলো যে গাই-এর সাথে বিয়ে হওয়ার আগেই নাকি ক্যারোলিন নিজের কুমারীত্ব হারিয়েছিলো-এমনকি ওর পেটে তখন নাকি বাচ্চাও ছিলো।”
