টম দুর্গ আর ওটার চারিপাশটা ভালো করে দেখে নিলো। প্রতি কোনায় উঁচু মিনার। দেয়ালের নিচের দিকটা শুধু পাথর কেটে বানানো। উপরের গাথুনিও এতো মজবুত যে ইউরোপের কোথাও এরকম দেখেছে কিনা মনে করতে পারলো না। খুব বেশি কামান অবশ্য দেখা গেলো না, তবে তাতে খুব বেশি কিছু আসে যায় না। দুৰ্গটার অবস্থানই ওটাকে অনাক্রম্য করে তুলেছে।
শৈল অন্তরীপটা পেরিয়ে উপকূলটা একটা গভীর উপসাগরে গিয়ে পড়লো। একটা নদী এসে মিশেছে ওখানে। টম গুণে দেখলো ওখানে প্রায় বারোটা জাহাজ নোঙ্গর করা। এর ভিতর কয়েকটা বড় আকারের গ্রাব দেখা গেলো, একেকটা প্রায় যুদ্ধ জাহাজের সমান লম্বা। তিনটা মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি একত্র করে বেঁধে উপসাগরের প্রবেশপথটা আটকে রাখা হয়েছে।
“আরো কয়েকটা পাল তোল,” মাস্টার আদেশ দিলো। দস্যুদের জাহাজের এতোটা কাছে চলে আসায় উদ্বিগ্ন বোধ করছে সে। কিন্তু গাছের গুঁড়িগুলো জায়গাতেই থাকলো আর ওদেরকে কোনো জাহাজ ধাওয়া করলো না। তার মানে আজ আংরিয়ার হাতে অন্য জরুরি কাজ আছে।
দূরে সরে যেতে যেতে টম দুর্গটার দিকে তাকিয়ে রইলো। “আমি আবার ফিরে আসবো,” প্রতিজ্ঞা করলো ও। বাতাস ওর কথাগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে গেলো সুদূরে।
৭. দুর্গের গভীরের কারাগার
দুর্গের গভীরের কারাগারে নড়েচড়ে উঠলো সারাহ কোর্টনী। উঠে বসতেই লোহার কড়াগুলোয় টান পড়ে ব্যথা করে উঠলো হাতে। সামনের অন্ধকারে তাকিয়ে রইলো ও। ঘড়ির কাটার শব্দের মতো টুপটাপ করে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ছে; অন্য বন্দিরা কেউ ফোঁপাচ্ছে, কেউ বিলাপ করছে। ও কোনো কিছুকেই পাত্তা না দিয়ে পাথরের ভিতর দিয়ে শোনার চেষ্টা করতে লাগলো। আশা করছে ব্যাপারটা যেনো একটা দুঃস্বপ্ন হয়।
ওর শরীর জুড়ে একটা কাঁপুনি বয়ে গেলো, ঠিক কোনো মোমবাতির পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে ওটার শিখার ভিতরে যেরকম কাপন হয়, সেরকম।
“কি হলো?” জিজ্ঞেস করলো অ্যাগনেস। বোনের দিকে সবসময় নজর ওর। বমি আপাতত আর হচ্ছে না; আর ওদেরকে যে সামান্য খেতে দেওয়া হচ্ছে তাতেও সারাহের তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বরঞ্চ ওর ওজন আরো বেড়েছে। কিন্তু এখন নতুন আর এক দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে, “জ্বর এসেছে আবার?”
সারাহ মাথা নাড়লো। “মনে হলো টমের গলা শুনতে পেলাম যেনো। স্বপ্নে দেখলাম যে ও আমাদেরকে উদ্ধার করতে এসেছে। নেপচুন তরবারিটা হাতে দরজা দিয়ে দৌড়ে এসে আমাদের বাঁধন কেটে দিলো।” বল দীর্ঘশ্বাস ফেললো সারাহ। তারপর হাতটা পেটের উপর রেখে বললো। “এই স্বপ্ন আর সত্যি হবে না। তরবারিটাই তো হারিয়ে গিয়েছে।”
এই কয়েদখানায় ওরা ঠিক কতোদিন ধরে আছে সেই সম্পর্কে ওর কোনো ধারণাই নেই। কয়েক সপ্তাহ তো হয়েছেই। এতো নিচে দিনের আলো পৌঁছায় না, দেয়ালে কোনো ফাটল ও নেই যা দিয়ে দিনের হিসাব রাখতে পারবে। ওরা আছে। একটা গুহার ভেতর, শৈল অন্তরীপটার একদম পেটের ভিটর গুহাটা। সারাহ মাঝে মাঝে বাইরে পাথরের গায়ে ঢেউয়ের বাড়ির শব্দ শুনতে পায়। কারাগারের দেয়ালগুলো পাথর কেটে বানানো হয়েছে। বৃষ্টি পড়লেই ওটার ধার বেয়ে পানি পড়ে, পুরো ঘরটা স্যাঁতসেতে হয়ে আছে তাতে। আর আলো বলতে আছে একমাত্র পাশের গুহার একটা কুপির সামান্য আলো সেটাতে তেল ফুরিয়ে গেলে মাঝমাঝে কয়েক দিন পার করে, তারপর প্রহরীরা তেল ভরে দিয়ে যায়।
“ও আসবেই,” অ্যাগনেস বললো। “যদি ও বাতাসে ভেসে পৃথিবীর উল্টো পাশেও চলে যায়, এমনকি যদি তোমার আর ওর মাঝে শ্রেষ্ঠ মুঘল সেনারাও বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবুও ও তোমাকে উদ্ধার করতে আসবে।”
“যদি ও বেঁচে-ই না থাকে? আমি জানিও না যে ও চিত্তিত্তিঙ্কারা থেকে। পালিয়ে আসতে পেরেছিলো কিনা।”
অ্যাগনেস সারাহের হৃৎপিণ্ডের উপর হাত দিলো। “ওর যদি কিছু হতো, তাহলে এখানে টের পেতে।” টম আর সারাহের সাথে ব্রিঞ্জোয়ানে মাত্র কয়েকদিন ছিলো অ্যাগনেস, কিন্তু তাতেই খেয়াল করেছে যে ওরা দুজন দুজনকে কতোটা ভালোবাসে। ও জানে যে টম ওদেরকে উদ্ধার করবেই।
গুহার অন্য প্রান্ত থেকে খনখনে গলায় উপহাস করে উঠলো কেউ।
“স্বামীর উপর ভরসা করে লাভ নেই। যদি বেঁচে-ও থাকে, তবে এতে দিনে ভুলেই গিয়েছে যে সে বিবাহিত ছিলো।”
“আমি ওকে পুরো ভরসা করি।”
“আমিও মিস্টার কাইফেনের উপর ভরসা করেছিলাম,” খেঁকিয়ে উঠলো লিডিয়া। “কিন্তু কাপুরুষটা সঁতরে ডাঙায় চলে গেলো। কে জানতো একজন ভদ্রলোক, তিনজন মহিলা আর সব সম্পত্তি ওই দস্যুদের হাতে ফেলে পালিয়ে যাবে?”
“টম ওরকম না,” নরম গলায় বললো সারাহ। ও সারাক্ষণই টমের কথা ভাবে, কিন্তু খুব বেশি আলোচনা করে না। কারণ অ্যাগনেস সদ্য বিধাব হয়েছে, সেখানে সারাহের নিজের স্বামীকে নিয়ে জাবর কাটাটা নিষ্ঠুর হয়ে যায়।
“আমাদেরকে বাঁচাতে পারেন একমাত্র গাই কোর্টনী, লিডিয়া বললো। “আমার আর দেরি সহ্য হচ্ছে না।” বলে ও অ্যাগনেসের দিকে তাকালো। “আপনি তো ওনার শ্যালিকা। উনি এখনো আমাদের মুক্তিপণের টাকা দিচ্ছেন না কেনো?”
“আপনি যদি ভেবে থাকেন আমার টানে গাই আমাদেরকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করবে, তাহলে ভুল করছেন,” অ্যাগনেস বললো। “তার চোখে পৃথিবীর সবচে বড় দুষ্কর্মটা করেছি আমি। তার ব্যক্তিগত লাভ হতে পারতো এমন একটা কাজে আমি সায় দেইনি। উনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক উচ্চ পদস্থ লোকের সাথে বিয়ে ঠিক করেছিলেন আমার। কিন্তু আমি বিয়ে করি ক্যাপ্টেন হিকসকে। হিকস ছিলেন দীনহীন এক সৈনিক। গাই আমাকে এই অপরাধে কখনোই ক্ষমা করেনি। আর সেজন্যেই আমাদেরকে ব্রিঞ্জোয়ানে নির্বাসন দিয়েছিলো।”
