“সারাহ আর অ্যাগনেসকে ফিরিয়ে আনবো কিভাবে?”
ফ্রেজার অস্বস্তি নিয়ে তাকালো ওর দিকে। “যদি আংরিয়া ওদেরকে ধরে থাকে তাহলে নিশ্চিত যে ওদের মুক্তিপণের দাবি বোম্বেতে পাঠিয়েছে।”
“এখন কি হবে তাহলে?”
“গভর্নর কোর্টনী দস্যুদের সাথে কোনো প্রকার সমঝোতায় বিশ্বাসী না। ওনার মতে এতে ওদেরকে আরো উসকে দেওয়া হয়।”
“তো? উনি কি দুর্গ আক্রমণ করবেন?”
ফ্রেজার কি বলবে ভেবে পেলো না। “আংরিয়া হলো পুরো মালাবার উপকূলের সেরা দস্যু। আর গাই কোর্টনীর হাতে অতো সামরিক শক্তি নেই।”
“তার মানে উনি ওদেরকে ওখানেই পচে মরতে দেবেন? এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন অ্যাগনেস হিকস, গাই কোর্টনীর শ্যালিকা।”
“আমিতো আসলে ওনার ব্যাপার জানি না,” ফ্রেজার টমের চেহারার যন্ত্রণা খেয়লা করলো। “তবে আমি আপনাকে একটা জাহাজে করে বোম্বেতে পৌঁছার ব্যবস্থা করতে পারি। আপনি নিজে গভর্নর কোর্টনীর সাথে আলাপ করবেন নাহয়। যদি উনি আপনাকে মুক্তিপণের টাকাটা না-ও দেন, তাহলে ওখানে বা সুরাটে অনেক সওদাগর পাবেন যারা আপনাকে টাকাটা ধার দেবে।”
“কিসের বিনিময়ে?” হতাশ কণ্ঠে বললো টম। “আমার কোনো স্থাবর সম্পত্তি নেই। আর আপাতত যে হবে সেই সম্ভাবনাও নেই। আমি নিজের জীবন বাজি রেখে কোম্পানির মূল্যবান সম্পত্তি রক্ষা করেছি। আমার পুরষ্কার কি এটাই? আমার স্ত্রী এখন একটা দস্যুর কয়েদখানায় পচে মরবে?”।
ফ্রেজার দুই দিকে হাত ছড়িয়ে বললো, “আমি কিছু করতে পারলে খুশিই হতাম। আপনিতো জানেন-ই যে এই দস্যুগুলোর বিবেক বলে কিছু নেই। এদের কাছে ব্যবসাই মুখ্য, আর বন্দীরা হচ্ছে ওদের ব্যবসার পণ্য। আংরিয়া যে মুক্তিপন চাচ্ছে সেটা জোগাড় করুন, তাহলে ও আপনার সাথে কোনো ঝামেলা করবে না।”
“আর যদি না পারি?”
“তাহলে ও ক্ষতি মেনে নেবে, আর যারা ওর টাকা শোধ করতে ব্যর্থ হয়, তাদের জন্যে একটা উদাহরণ সৃষ্টি করবে।”
*
মাদ্রাজে এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হলো ওদেরকে। প্রতিদিন অ্যানা, টম আর ফ্রান্সিসকে নিয়ে বাজারে গিয়ে অ্যানার পরিচিত ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলতো। সবাই ওদের কথা শুনে দুঃখপ্রকাশ করলো, কিন্তু কারো কাছেই ধার দেওয়ার মতো টাকা ছিলো না।
“আসলে কিছুই করার নেই,” অ্যানা বললো। “ইংল্যান্ড থেকে জাহাজ এসে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত কারোই বেচা বিক্রি হবে না।”
অবশেষে ওরা রওনা দিলো। কেপ করমোরিন থেকে শুরু করে মালাবার উপকূল পর্যন্ত বাতাসের অনুকূলে এগিয়ে চললো জাহাজ। সকাল বেলা ডাঙা থেকে ধেয়ে আসতো বাতাস, ফলে সমুদ্রের গভীরে ঢুকে যেতো ওরা। বিকেলের দিকে সমুদ্রের বাতাস জোরালো হয়ে এলে ওরা আবার কূলের কাছাকাছি চলে আসতো।
ওরা ব্রিঞ্জোয়ান পার হয়ে আসলো। দিগন্তে একটা ফোঁটার মতো দেখা যাচ্ছিলো ওটাকে। সমুদ্রের মাঝ থেকে ওটার ধ্বংসলীলার কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। টম ওটাকে দেখতে পেয়ে খুশিই হলো। আরো উত্তরে আগাতেই আনা আঙুল দিয়ে কিডস আইল্যান্ড দেখালো। ওখানে নাকি দস্যু সম্রাট বিলি দ্য কিড একবার জাহাজ ভিড়িয়েছিলো।
“ওখানে কোনো গুপ্তধন লুকিয়ে রেখে যাননিতো আবার?” ফ্রান্সিস বললো। “আমাদের খুব কাজে লাগতো এখন।”
পাম গাছের সারি ভরা সৈকত শেষ হয়ে, একটা রুক্ষ, পাথুরে সৈকত শুরু হলো। দিগন্তে ঘন জঙ্গলে ভরা শৈল অন্তরীপ দেখা যেতে লাগলো একের পর এক। ওগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ঘোট ঘোট উপসাগর আর নদীর মোহনা। অনেকগুলোতে দেখা গেলো পাথরের দুর্গ দাঁড়িয়ে আছে। ওগুলোর পাদদেশে মাঝে মাঝে নির্জন ঘাটে একটা দুটো নৌকাও চোখে পড়লো।
“দেশটায় সবসময় যুদ্ধ লেগেই থাকে,” অ্যানা ব্যাখ্যা করলো। “তিরিশ বছর আগে মারাঠারা মুঘল সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নিজেদের আলাদা সাম্রাজ্য দাবি করে বসে। কিন্তু এখন ওরা নিজেদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ করছে। বুড়ো রানি তার নিজের সৎ ছেলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। এই ফাঁকে আংরিয়া নিজের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে। দুই পক্ষকেই সমান তাল দিয়ে যাচ্ছে।”
জাহাজটা মূল ভূখণ্ড পেরিয়ে আসতেই নতুন আর একটা শৈল অন্তরীপ চোখে পড়লো। ওটার গোড়ায় সাদা ফেনায় ভরা ঢেউ এসে বাড়ি খাচ্ছে। উপরে কালো পাথরের তৈরি একটা দুর্গ ছোট পাহাড়টার পুরো চূড়াটা দখল করে আছে।
“ঐতো,” অ্যানা দেখালো। “ওটাই টিরাকোলা। আংরিয়ার আস্তানা।”
টম একটা টেলিস্কোপ দিয়ে দুর্গটার জানালাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো, যদি কোনো একটায় সারাহের মুখ দেখা যায় সেই আশায়। ওর বুকটা হু হু করে উঠলো। এতো কাছে এসেও এতো দূরে থাকার যন্ত্রণা সহ্য হতে চাইলো না। এই ভয়াল দর্শন দেয়ালের ওপারেই সারাহ আর অ্যাগনেস আছে। কি অবস্থায় আছে। তা ঈশ্বরই জানেন শুধু। নিশ্চয়ই ওরা অপেক্ষা করে আছে যে টম কবে এসে ওদেরকে উদ্ধার করবে। একবার মনে হলো পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সাঁতরে পাড়ে গিয়ে পাহাড়ের ধারটা বেয়ে দুর্গে গিয়ে ওঠে।
“এটাতো একেবারে দুর্ভেদ্য মনে হচ্ছে,” নিচু কণ্ঠে বললো ফ্রান্সিস।
জাহাজের মাস্টার ওদের পাশে এসে দাঁড়ালো। “দেয়ালগুলো আঠারো ফুট পুরু। এখন পর্যন্ত একমাত্র এবং সর্বশেষ গভর্নর স্যার নিকোলাস ওয়েইট আংরিয়ার বিরুদ্ধে কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন। উনি একঝাক বোমারু জাহাজ নিয়ে একটা বহর গঠন করে এখানে নিয়ে আসেন। দেয়ালগুলো অনেক উঁচুতে হওয়ায় জাহাজ থেকে গোলা ছোঁড়া সম্ভব ছিলো না। উনি কামানের নলের ভিতর মর্টার ভরে দেন। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি। পাথরে লেগে ওগুলো ডিমের মতো ফেটে যায়, তাতে পাউডার ঝরে পড়ে ফিউজও নষ্ট হয়ে যায়।”
