“কিভাবে দিতে হবে টাকা? মহিলাদের কোথায় আটকে রেখেছে ওরা?”
কাইফেন এতো জোরে নিজের আঙুল মোচড়াতে লাগলো যে টমের মনে হলো ওগুলো ভেঙে যাবে যে কোনো সময়। “আমার মনে নেই। আসলে পরিস্থিতি… সবকিছুই এতোটা ভয়ংকর ছিলো যে, আপনি তো বুঝতেই পারছেন। আমি কোনো মতে জান নিয়ে পালিয়েছি।”
“আংরিয়ার ঘটি হচ্ছে বোম্বের দক্ষিণের টিরাকোলার দুর্গ,” গভর্নর বললো। “নিশ্চিত ওদেরকে ওখানেই নিয়ে যাওয়া হয়ছে।”
টম ওর কথায় পাত্তা দিলো না। ও জানালা থেকে ঘুরে কাইফেনের দিকে আগালো। চেয়ারের ভিতর কুঁকড়ে গেলো কাইফেন। ওর সামনে টমকে এখন দানবের মতো লাগছে।
“মিথ্যে কথা।”
বলে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই টম কাইফেনের কোটের কলার চেপে ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে এক লাথিতে ফেলে দিলো মেঝেতে। তারপর আরো এক লাথিতে দেয়ালের গায়ে আছড়ে ফেললো। ফ্রেজার ওকে থামাতে উঠে দাঁড়ালো। কিন্তু টমের আক্রোশ দেখে থমকে গেলো।
“সত্যি কথা বল,” ওকে টেনে তুলে জানতে চাইলো টম।
কাইফেন নিজের জামার ভিতর এতো বেশি সেধিয়ে গিয়েছে যে ওর চেহারা আর দেখাই যাচ্ছে না। ও বিড়বিড় করে কি কি বলতে বলতে হাত পা ছুঁড়তে লাগলো। “ছেড়ে দিন আমাকে।” চি চি করে বললো ও।
টম ছেড়ে দিলো ওকে। ধপ করে মেঝেতে আছাড় খেয়ে ব্যথায় কাতরে উঠলো কাইফেন।
“তুই একটা কাপুরুষ, একটা নরাধম তুই,” টম বললো ওকে। “তুই যদি শুধু নিজের চামড়া বাঁচানোর ধান্দা না করে আমার কথা শুনতি, তাহলে ঐ নৌকায় করে আমরা সবাই আজ পালিয়ে বাঁচতে পারতাম। এতোগুলো ভালো মানুষ আজ না মরে বেঁচে থাকতো। আর আমার বৌও থাকতো আমার সাথে।”
ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে গেলো টম; কথা বলতে বলতে আবার লাথি শুরু করলো ও। ডাক ছেড়ে কাঁদতে আরম্ভ করলো কাইফেন।
“মিস্টার উইল্ড,” ফ্রেজার ডাকলো। হতভম্ব হয়ে গিয়েছে ও। “আমি কিন্তু প্রহরীদের ডাকবো।”
টম পিছিয়ে এলো। ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে ওর। চোখে ফিরিয়ে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইলো ও। কারণ, কাইফেনের দিকে চোখ গেলে আবারো ওর ওকে পিটাতে ইচ্ছে করবে।
“দস্যুরা তোকে ছেড়ে দিয়েছে, না? তোকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছে, তাই না?” বলতে বলতে টম ঘুষি তুললো। কাইফেন কো কো করতে করতে ঘরের এক কোনায় সরে গেলো।
“মিস্টার উইল্ড,” ফ্রেজার ডাকলো ওকে।
“তুই যখন ঘরে বসে খেলনা দিয়ে খেলতি, তখন থেকে আমি সমুদ্রে দস্যুদের সাথে লড়াই করে আসছি। ওদের কাছে প্রতিটা বন্দীই হচ্ছে ব্যবসার পণ্য। একটা স্বর্ণের বস্তা পাওয়ার আগ পর্যন্ত ওরা কাউকেই ছাড়বে না। তাই আবারও বলছি, ভালোয় ভালোয় বল কি হয়েছিলো?”
কাইফেন উঠে বসলো। নাক বেয়ে রক্ত পড়ছে। ফ্রেজারের দিকে কাতর নয়নে তাকালো ও।
“আপনি ওনাকে আমার সাথে এরকম করতে দেবেন? আপনার সৈন্যদের ডাকুন-একে আটক করুন। পাগল হয়ে গিয়েছেন ইনি।”
“ওনার প্রশ্নের উত্তর দিন।”
কাইফেন টম আর গভর্নরের দিকে তাকাতে লাগলো। ওর পক্ষে কেউ নেই দেখতে পেয়ে চেহারা অন্ধকার হয়ে গেলো ওর।
“আমি দস্যুদের সাথে লড়াই করিনি,” ফিসফিস করে বললো ও।
“আর ওরা তোকে ধরেওনি, তাই না?” জেরা করলো টম।
“আমি লাফ দিয়ে নেমে পড়েছিলাম, কাইফেন কাতর কণ্ঠে বললো। “আমরা ডাঙার খুব কাছেই ছিলাম তখন। আমি সাতরাতে পারতাম। দস্যুরা তখন লুট করতে এতোই ব্যস্ত ছিলো যে আমার দিকে খেয়াল করেনি।”
“আপনি মহিলাদেরকে রেখে পালিয়ে গিয়েছিলেন?” গভর্নর জিজ্ঞেস করলো।
“হ্যাঁ,” মাথা নিচু করে বললো কাইফেন। “একশো দস্যুর বিপক্ষা আমি কি-ইবা করতে পারতাম? আমি ভেবেছিলাম কারো কাছে সাহায্য পাবো হয়তো। সবাইকে সতর্ক করে দেবো।”
“তুই এরকম কিছুই ভাবিসনি,” টম বললো। রাগ সামলাতে কষ্ট হচ্ছে ওর। “তুই শুধু নিজেকে বাঁচানোর চিন্তা করছিলি।”
কাইফেন প্রতিবাদ করলো না। আমি একটা গ্রাম খুঁজে পাই। ওরা আমাকে আশ্রয় দেয়। দস্যুরা চলে যাওয়ার পরে জেলেরা আমাকে উপকূলে নিয়ে আসে। তারপর একের পর এক গ্রাম হেঁটে পাড়ি দিয়ে অবশেষে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছি।” তারপর ভালো মানুষের মতো বললো, “বিশ্বাস করুন, এরপর থেকে এমন কোনো দিন যায়নি যেদিন আমি বেচারা মহিলাদের মুক্তির জন্যে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করিনি। আমি যদি আমার অবস্থানের সাথে ওদেরটা বদল করতে পারতাম, তাহলে খুশি মনেই তা করতাম।”
টমের অগ্নিদৃষ্টি দেখে থেমে গেলো কাইফেন। টম মেঝেতে শুয়ে থাকা নাকি কান্না করতে থাকা লোকটার দিকে তাকালো। ওর মনে পড়লো অনেক আগে কোম্পানির এক চাকর ওদের পরিবারের সাথে বেইমানি করে দস্যুদের সাথে হাত মিলিয়েছিলো। ওর বাবা হাল লোকটার সাথে কি করেছিলেন সেটাও মনে পড়লো ওর। উনি চাকরটার কাছ থেকে আগে স্বীকারোক্তি আদায় করেছিলেন, তারপর উলঙ্গ করে জানালা দিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন।
কিন্তু ফ্রেজার অনুমতি দিলেও টমের আর কাইফেনকে কষ্ট দেওয়ার মতো মানসিকতা নেই। কাইফেন আগাগোড়া একজন পুরুষ। যে দায়ে ওকে দোষী করা হচ্ছে, সেই দায়িত্ব ও নিজে থেকে নেয়নি। ওর উপরের ঠোঁটে রক্ত আর শ্লেষ্ম জমে আছে। যেনো বড় ছেলেদের হাতে ধোলাই হওয়া ছোট একটা বাচ্চা।
“আমার সামনে থেকে ভাগ,” হিসিয়ে উঠলো টম।
কাইফেন হামাগুড়ি দিয়ে পালিয়ে গেলো। আবারও টমের আঘাতের ভয়ে সারা শরীর শক্ত হয়ে আছে। ও দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতেই টম ফ্রেজারের দিকে ফিরলো।
