“ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, বেঁচে গেলাম আমরা,” কাইফেন প্রায় কেঁদে দিলো। ওর পাশেই লিডিয়া সরু চোখে জাহাজটাকে দেখতে লাগলো।
“জাহাজটা কি ইংল্যান্ডের?”
“দেখে মনে হচ্ছে গ্রাব,” লেই বললো।
গ্রাব হচ্ছে ভারতীয় রীতিতে বানানো এক ধরনের জাহাজ। শব্দটা আরবি। অর্থ কাক। পাখির মতোই এগুলো সামান্য বাতাসেই উড়ে চলতে পারে। আর মাত্র দুটো পাল থাকায় ওগুলো সমুদ্রপথের এক দুর্দান্ত বাহনে পরিণত হয়েছে। তবে সবচে আলাদা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এগুলোর লেজের দিকটা কেটে ফেলে সেখানে একটা কামান বসানো হয়। ফলে কেউ যদি ধাওয়া করে তাহলে সেদিকে দিয়ে খুব সহজেই গোলা ছুঁড়ে বাধা দেওয়া যায়।
“এরা কি কান্ট্রি ট্রেডার নাকি?” অ্যাগনেস জিজ্ঞেস করলো। ভারতীয় মহসাগরের উপকূলের মধ্যে যারা ব্যবসা করে তাদেরকে কোম্পানি নাম দিয়েছে কান্ট্রি ট্রেডার।
“বছরের এই সময়ে সমুদ্রে বেরিয়ে নিজেদের মালামাল খোয়ানোর ঝুঁকি নেওয়ার সাহস খুব বেশি কারো নেই,” সন্দিহান সুরে বললো লেই।
ওদের উল্লাস থিতিয়ে পড়লো। এখন বরং জাহাজটা যতোই এগিয়ে আসতে লাগলো ততোই বাড়তে লাগলো ওদের দুশ্চিন্তা। সন্দেহের দোলাচালে দুলছে সবার মন। একবার মনে হচ্ছে উদ্ধার হবে ওরা, আবার পরমুহূর্তেই মনে হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতির চাইতেও বাজে অবস্থায় পতিত হতে যাচ্ছে।
“পতাকা তুলছে ওরা।”
একটা লাল পতাকা ওটার মাস্তুল বেয়ে উঠে গেলো। সাথে সাথে বাতাস এসে ছড়িয়ে দিলো সেটাকে। সবাই স্পষ্ট দেখতে পেলো টকটকে লাল জমিনে একটা সাপের প্রতিকৃতি।
অ্যাগনেস এর আগে পতাকাটা কখনো দেখেনি। তবে পতাকাটার ভয়ংকর কুখ্যাতি জানা আছে ওর। ব্রিঞ্জোয়ানের কোম্পানির খাবার ঘরে প্রায় রাতেই এদের কথা বলবলি হতে শুনেছে ও। এটা হচ্ছে মালাবার উপকূলের ত্রাস-জলদস্যু আংরিয়া-র পতাকা। এই এলাকার এমন কোনো সওদাগর নেই, যার জাহাজের কোনো না কোনো লোক আংরিয়ার হাতে খুন বা বন্দী হয়ে অবর্ণনীয় অত্যাচারের স্বীকার হয়নি।
“ডাঙার দিকে যাও,” আর্তনাদের মতো শোনালো কাইফেনের গলা। “পালাতে না পারলে খবর আছে।”
মাল্লারা সর্বশক্তি দিয়ে দাঁড় বাইতে শুরু করলো। ওরা সংখ্যায় মাত্র কয়েকজন, আর খুবই দুর্বল হয়ে আছে। গ্রাবটা তাই ওদের পিছু ছাড়লো না, শান্ত সাগরে মসৃণভাবে ধেয়ে এলো।
“খোদ শয়তান ওদের জাহাজ চালতে সাহায্য করে,” হাফাতে হাফাতে বললো একজন।
“চুপ,” লেই আদেশ দিলো। “কথা বলে দম নষ্ট কোরো না।”
“তীরের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলে ওরা আর আমাদেরকে ধরতে পারবে না আশা করি, কারণ তাহলে ওদের খোল চড়ায় আটকে যাবে,” আশান্বিত কণ্ঠে বললো কাইফেন।
অ্যাগনেস মাথা ঝাঁকালো। “আমি ব্রিঞ্জোয়ানের ঘাটে এরকম জাহাজ ভীড়তে দেখেছি। এগুলো কম পানিতে চলাচলের উপযোগী করে বানানো হয়।”
গ্রাবটার সামনের দিক থেকে আলোর ঝলকানি দেখা গেলো। এক সেকেন্ড পরেই কামানের বুমমম শব্দ কাঁপিয়ে দিলো চারদিক। গোলাটা উড়ে এসে ওদের নৌকা থেকে তিরিশ গজ মতো দূরে পানিতে আলোড়ন তুলে ডুবে গেলো।
“অসভ্যের দল ঠিকমতো কামানও দাগতে পারে না,” লিডিয়া ফয় বললো। এখনো ও আইভরির হাতলের পিস্তলটা ধরে আছে।
“এটা ছিলো সতর্কীকরণ,” লেই বললো। “পরেরটা কাছেই পড়বে।”
যেনো ওর কথা শুনেই গ্রাব থেকে আবার ছোঁড়া হলো গোলা। এবার গোলাটা এতো কাছে পড়লো যে ওদের গায়ে পানির ছিটে এসে লাগলো।
“আমাদের ভার বেশি,” লেই উদ্বিগ্ন সুরে বললো। “একটা লাগলেই ডুবে যাবে নৌকা। আপনি কি সাঁতরাতে পারেন মিসেস হিকস?”
“অল্পসল্প। কিন্তু সারাহকে ডাঙায় নেবো কিভাবে?”
ওরা ধেয়ে আসা জাহাজটার দিকে তাকিয়ে রইলো। এতো কাছে চলে এসেছে যে অ্যাগনেস ওটার কামানের নলের উপরে সূর্যের ঝলকানি দেখতে পেলো। সেই সাথে সামনের দিকে জড়ো হওয়া লোকজনও নজরে এলো ওর। ওরা ওদের অস্ত্রপাতি বাতাসে নাড়তে নাড়তে মুখ দিয়ে রক্ত হিম করা রণ-হুঁঙ্কার ছাড়ছে।
“কি করবো আমরা?”
*
গভর্নরের ঘরের চেয়ারে জবুথবু হয়ে বসে কাইফেন নিজের কোলের দিকে তাকিয়ে আছে। জানালা দিয়ে সূর্যাস্তের আলো এসে পড়ছে ওর চেহারায়। একবারে লাল টকটকে লাগছে ওকে।
“স্বাভাবিকভাবেই আমি দস্যুদের ঠেকানোর জন্যে যথেষ্ট চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমরা অনাহরে খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম, আর তাছাড়া সমুদ্রে অনেকদিন ধরে আছি। দস্যুরা তাই সহজেই হারিয়ে দিলো আমাদের। ওর মহিলাদেরকে বন্দী করে আমাকে একটা ছোট নৌকায় করে ভাসিয়ে দেয়। আমাকে ছেড়ে দেয়ার কারণ হলো আমাকে দিয়ে একটা খবর মাদ্রাজে পাঠাতে চায়। তা হচ্ছে বন্দিদের জন্যে মুক্তিপণ দিতে হবে। আর তারপরেই ভাসতে ভাসতে, কোনোমতে যমের দুয়ার থেকে ফিরে এখানে এসে পৌঁছেছি আমি।”
ওর গল্প শুনতে শুনতে টম নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে সারা ঘরে পায়চারি শুরু করেছিলো। কথা শেষ হতে থামলো ও। তারপর জানালার গোবরাটে ভর দিয়ে বাইরের সূর্যাস্ত দেখতে লাগলো। শহরের পশ্চিমের একটা ছোট উপহ্রদের পানিতে ডুব দিচ্ছে সূর্যটা।
“কতো?” জিজ্ঞেস করলো টম।
কাইফেন অস্বস্তিভরে নিজের চেয়ারে নড়েচড়ে বসলো। “মাফ করবেন?”
“ওরা কতো টাকা মুক্তিপণ চাইছে?”
“এইতো…” কাইফেনের মুখ ডাঙায় ভোলা মাছের মতো খাবি খেতে লাগলো। “পাঁচ হাজার রুপি।”
