“সাবধানে,” লিডিয়া বললো। “আবার বৃষ্টি না হলে কিন্তু পানির টানাটানি পড়ে যাবে।”
এই নিষ্ঠুর পরিস্থিতির আর একটা নির্মম দিক হলো এটা। যখন বৃষ্টি আসে তখন এতো বেশি আসে যে নৌকা ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়। সবাই তখন দাঁড় বাওয়া ছেড়ে পানি সেঁচতে শুরু করে। কিন্তু ওদের কাছে পানি ধরে রাখার মতো কিছু না থাকায়, বৃষ্টি থেমে সূর্য উঠলেই দেখা যায় তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে মরে।
অ্যাগনেস সামনের উপকূলের দিকে তাকিয়ে থাকলো। ঘন বনের ফাঁকে ফাঁকে সৈকত দেখা যাচ্ছে। ঝড়ের পর থেকে ওরা ডুবে যাওয়ার ভয়ে সবসময় ডাঙ্গার কাছে কাছে থাকে।
“আমাদের ডাঙায় যাওয়া উচিত একবার,” অ্যাগনেস বললো। “খাবার পানি পাওয়া যেতে পারে-বা গ্রামও থাকতে পারে। ওখান থেকে কিছু খাবারও আনা যাবে।”
“খাবার?” লিডিয়া কটাক্ষ নিক্ষেপ করলো ওর উপর। “ওরা আমদেরকে কেন সাহায্য করবে? আমারতো মনে হয় আমাদের গলা কেটে মালপত্র সব লুট করে নিয়ে যাবে।”
“আমাদের কাছে যথেষ্ট স্বর্ণ আছে। কিনে নিলেই হবে।”
“গরমে মাথা গুলিয়ে গিয়েছে আপনার। আমি এই গেয়োগুলোকে আমার একটা ফানামও (তৎকালীন মাদ্রাজের মুদ্রা) দেবো না।”
“এগুলো কোম্পানির স্বর্ণ,” অ্যাগনেস মনে করিয়ে দিলো।
“এগুলো আমার স্বামীর,” লিডিয়া জোর দিয়ে বললো।
“আর যদি মরেই যান তাহলে এগুলো কোনো কাজেই আসবে না।” অ্যাগনেস ভারতে যততদিন ছিলো ততোদিন কর্তব্যপরায়ণ স্ত্রী হতে শিখেছে। গাই-এর তিরস্কার আর ওর বোন ক্যারোলিনের খোঁচা দুটোই সহ্য করে গিয়েছে বিনা প্রতিবাদে। বয়স বাড়া সাথে সাথে ক্যারোলিন আরো বেশি মোটা, আর অসুখী যেমন হয়েছে, তেমনি ওর খোঁচার ধারও বেড়েছে বহুগুণ। শুধু নিজের স্বামীর কথা ভেবে অ্যাগনেস একটা শব্দও উচ্চারণ করনি কোনোদিন।
কিন্তু এখন টের পেলো ওর সহ্যশক্তি আর আগের মতো নেই। কারণটা হতে পারে ওর স্বামী বিয়োগ বা সূর্যের উত্তাপ অথবা এই চরম পরিস্থিতি। ও আর কিছুর পরোয়া করে না। ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড রেগে গেলো ও, আর সেটা লুকানোর কোনো চেষ্টাই করলো না।
“আমার বোনের একটু ভালোমতো বিশ্রাম দরকার,” গরম কণ্ঠে বললো ও। “বাকিদেরও একটু বিশ্রাম আর ভালো খাওয়া প্রয়োজন। ওই সিন্দুকের উপর বসে বসে তা দেবেন আর আমাদের যা দরকার সেটা করতে দেবেন না, সেটা আমি হতে দেবো না।”
যারা দাঁড় বাইছিলো তারা দাঁড় তুলে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলো। লিডিয়া নৌকার কিনার ছাড়িয়ে আর এক দিকে তাকিয়ে রইলো। “আপনি কিন্তু বাড়াবাড়ি করছেন মিসেস হিকস।”
অ্যাগনেস লেই-এর দিকে ফিরলো। ও হাল ধরে নৌকার একদম পিছনে বসে আছে। “কষ্ট করে নৌকা বাম দিকে ঘোরান। আমরা ডাঙায় নামবো।”
“ঐ গেয়োগুলোর হাতে লুট হয়ে দাসিগিরি করতে?” লিডিয়া কাইফেনকে ধরে ঝাঁকি দিলো। কাইফেন এততক্ষণ তর্কে না জড়াতে আর এক দিকে তাকিয়ে ছিলো। “মিস্টার কাইফেন! আপনি এখানকার দায়িত্বে আছেন।”
কাইফেন একবার অ্যাগনেস আর একবার লিডিয়ার দিকে তাকাতে লাগলো। “মিসে ফয় ঠিক বলেছেন,” শেষে কোনোমতে বললো ও। “যেদিকে যাচ্ছেন সেদিকেই যান। ডাঙায় যাওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে।”
“মাফ করবেন ম্যাডাম, কিন্তু কোম্পানির নীল কোট পরলেই আপনি ক্যাপ্টেন হয়ে যাবেন না,” লেই বললো। তারপর ও হাল ঘুরিয়ে ফেলতেই বাকিরা আবার দাঁড় বাইতে শুরু করলো।
লিডিয়া রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলো। আমার কথা না শুনলে ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। মাদ্রাজ পৌঁছেই আমি গভর্নরের কাছে নালিশ করবো। আর উনি তোদের সব কটাকে ফাঁসিতে ঝোলাবেন।”
লেই-ও গরম চোখে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। “আগে মাদ্রাজ পৌঁছাই, তারপর দেখা যাবে।”
“মিস্টার কাইফেন,” তীক্ষ্ণ কণ্ঠে আবার চেঁচিয়ে উঠলো লিডিয়া। “আপনি এই বেয়াদবি চুপচাপ সহ্য করবেন?”
‘কখনোই না,” ঠাণ্ডা গলায় বললো অ্যাগনেস। “আপনি যেভাবে ওনার নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছেন, তাতে আপনার পোষা কুত্তা বাদে আর কিছু মনে হয় না আমার ওনাকে।”
অ্যাগনেসের নিজের কানকে বিশ্বাস হলো না। ওর মুখ থেকে এই কথাগুলো বেরিয়েছে। লিডিয়ার চেহারা রাগে সাদা হয়ে গেলো। অ্যাগনেস কাইফেনের দিকে চাইলো। কাইফেন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
গালাগাল করতে করতে লিডিয়া ওর জামার নিচে হাত ঢুকিয়ে একটা ছোট পিস্তল বের করে আনলো। পিস্তলটার বাট হাতীর দাঁতের বানানো। অ্যাগনেসের দিকে তাক করলো সেটা।
“মিস্টার লেই, আবার আগের দিকে চালান,” আদেশ দিলো লিডিয়া। পিস্তল ধরা হাতটা এক চুল কাঁপছে না ওর।
কেউ নড়লো না। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে অ্যাগনেসের দিকে তাকালো লেই। মাল্লাগুলোও ওদের দিকে চেয়ে রইলো। ঢেউ এসে নৌকার খোলে বাড়ি খাওয়ার মৃদু শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই আশেপাশে।
“জাহাজ!”
সারাহের কণ্ঠ নীরবতা ছিন্ন করলো। সবার অলক্ষ্যে ও উঠে বসেছে কখন যেনো। আর এখন সমুদ্রের দিকে দেখাচ্ছে। মুখ বিস্ময়ে হাঁ হয়ে আছে। ওর গলা এতোটাই ফ্যাসফেসে হয়ে আছে যে শব্দ বের হলো না বললেই চলে, কিন্তু নৌকার আশেপাশের সবকিছু স্তব্ধ হয়ে থাকায় শুনতে পেলো সবাই।
মুহূর্তে ঝগড়া ভুলে, সারাহ যেদিকে দেখিয়েছে সেদিকে তাকালো সবাই। দিগন্তে সাদা পালওয়ালা একটা জাহাজ ওদের চোখের সামনে এগিয়ে আসছে।
