শেষবার যখন ওদের দেখা হয়েছিলো তখন ওরা রানির মহল থেকে জান হাতে নিয়ে পালাচ্ছিলো। মাঝের মাসগুলো ওদের কারো-ই ভালো যায়নি। কিন্তু কাইফেনের দিন যে ভয়ানক গিয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে। নাকের উপর ফোস্কা পড়ে আছে। সূর্যের তাপের ঝলসে চামড়ার রঙই বদলে গিয়েছে। চোখ দেখে মনে হচ্ছে কোটর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসবে যে কোনো সময়। হাতের আঙুল ক্রমাগত কাঁপছে।
টমের মনে অনেক প্রশ্ন ভীড় করে আছে। কিন্তু ও করলো মাত্র একটা প্রশ্ন। “আমার স্ত্রী কোথায়?”
কাইফেন শিউরে উঠলো। একটা চেয়ারের ভিতর সেঁধিয়ে গিয়ে এমনভাবে মুখ করে বসলো যেনো টম ওর চোখের দিকে তাকাতে না পারে।
“আমি যা বলবো তা আপনার পছন্দ হবে না স্যার।”
*
নৌকাটা শান্ত সমুদ্রে আগাচ্ছেই না বলা চলে। আটজন পুরুষ আর তিনজন মহিলা ওটার মাল বোঝাই খোলর ভিতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। পুরুষদের কাবো-ই কোমরের উপরে কাপড় নেই; মহিলাদের কাপড়ের অবস্থাও তথৈবচ। চারটা দাঁড় স্বচ্ছ পানিতে কোনো আলোড়ন তুলতে পারছে না, শুধু পানিতে একবার নামছে আর উঠছে। একটু পরেই ক্ষান্ত দেবে ওরা, কারণ বহু আগেই বুঝে গিয়েছে যে এই ভ্যাপসা গরমের মাঝে নৌকা বাওয়ার চেষ্টা করে কোনো। লাভ নেই।
মেঘহীন আকাশ থেকে খরতাপ ছড়াচ্ছে সূর্য। এবারের বর্ষাটা বেশ দুর্বল ছিলো। ঝড় ঝাপ্টা যা হয়েছে সব একেবারে সবসময় যখন হয়, ঠিক সেই সময়ে। কিন্তু এরপরে যে ভারী বর্ষণ হয় সেটা এবার হয়নি। ফলে কৃষকদের মাথায় হাত। ওরা মাটি খুঁড়েও পানির সন্ধান পাচ্ছে না। খরায় এবারের ফসল ভালো হবে না। আগামী মৌসুম ওদের কিভাবে চলবে জানে না কেউ। আর নৌকার ওরা জানে না যে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত টিকতে পারবে কিনা।
দশ বছর বয়স থেকে অ্যাগনেস ভারতে থাকে। ইয়র্কশায়ারের ছোট ছোট পাহাড় আর মৃদু বৃষ্টিপাতের স্মৃতি ঝাপসা আকারে মনে আছে কিছুটা, অনেক সময় মনে হয় ওগুলো বুঝি স্বপ্ন। ও প্রায় বিশ বছর এখানে টিকে আছে। বিশটা ভয়ংকর বর্ষা; বিশটা গা ঝলসানো গ্রীষ্ম। মাঝে মাঝে মনে হতো যে হাড় পর্যন্ত পুড়ে কয়লা হয়ে যাবে। পাঁচটা বাচ্চা হয়েছিলো অ্যাগনেসের, কোনোটাই তিন বছরের বেশি বাঁচেনি। দুঃখ কষ্ট কাকে বলে ভালোই জানা আছে ওর।
কিন্তু এখন যে যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে যাচ্ছে সেটা আগের সবকিছুকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। একটা তিরিশ ফুট লম্বা নৌকায়, আরো দশজন লোকের সাথে ঠাসাঠাসি করে তিন সপ্তাহ ধরে বসে আছে। নৌকাটা এতো বেশি জিনিসপত্রে ঠাসা যে কিনার পানি ছুঁই ছুঁই করছে। উপরে কোনো আচ্ছাদন নেই, কোনো গোপনীয়তা নেই। প্রথম ঝড়টা পার হওয়ার পর, লেই নামের কেস্ট্রেল-এর সারেং-টা পালের ক্যানভাস ছিঁড়ে নৌকার পিছন দিকে, উপরে আর সামনা সামনি পর্দার মতো লাগিয়ে দিয়েছে। তারপর থেকে শুধু দাঁড় বেয়েই চলতে হচ্ছে ওদের। সারাহের যত্ন করতে না হলে অ্যাগনেসও দাঁড় বায়। সেই পরিশ্রমে ওর হাত কড়া পড়ে কুঁচকুচে কালো হয়ে গিয়েছে।
“আমারও বাইতে সাহায্য করা উচিত,” এক সকালে বললো সারাহ। ওর জ্বর গিয়ে উঠে বসতে পারছে একটু। তবে তখনও খুবই দুর্বল।
“মাথা খারাপ?” অ্যাগনেস বললো। “তোমার যে অবস্থা তাতে দাঁড় তুলতেই পারবে না।”
“কিন্তু তাতে লোকগুলো আমাকে অকর্মা মনে করবে না। সবাই-ইতো একটু পরে পর করছে।”
“সবাই না,” অ্যাগনেস বললো। তারপর অগ্নি দৃষ্টিতে লিডিয়া ফয়-এর দিকে তাকালো। লিডিয়া নৌকার সামনের দিকে সিন্দুকগুলোর সাথে বসে আছে। কাইফেন বসে আছে ওর পাশে। খবরদারি করার চেষ্টা করছে। নৌকায় সবাই-ই ঠাসাঠাসি করে আছে, কিন্তু এর মাঝেও ওদের ঢলাঢলি সবার কাছে দৃষ্টিকটু লাগছে। মাথার উপর একটা ছাতি ধরা ওর। লিডিয়া ওটা আর কাউকে দেয় না।
“লোকজন সবাই জানে যে তুমি ওদেরকে কতোটা স্নেহ করো,” অ্যাগনেস সারাহকে বললো। “শুধু তোমাকে নিরাপদ কোথাও নিয়ে যাওয়ার জন্যে এতো কষ্ট করছে ওরা।”
সারাহ দুর্বলভাবে হাসলো। “তাহলেতো আমার
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই কাশতে শুরু করলো সারাহ। কাশির দমকে বমি পেয়ে গেলো ওর। নৌকার কিনারের মাথা নিতে নিতেই সকালে খাওয়া সামান্য ভাত আর শুঁটকি মাছের পুরোটাই বেরিয়ে এলো গলা দিয়ে।
অ্যাগনেস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সারাহের বমি শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত ওকে ধরে রাখলো। প্রতি সকালেই এরকম হচ্ছে।
“উনি যদি খেয়ে পেটে রাখতেই না পারে, তাহলে ওনার পিছনে খাবার নষ্ট না করলেই ভালো হবে,” কর্কশ কণ্ঠে বললো লিডিয়া ফয়। “এমনিতেই আমাদের না খেয়েই থাকতে হচ্ছে।”
“বাকি সবার মতো সারাহও ওর ভাগ পাবে,” জোর দিয়ে বললো অ্যাগনেস। নৌকার সব লোকের মাঝে একমাত্র লিডিয়াই কোনো কষ্ট করছে না বলা চলে। কম খাবারের ওর কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ওর গায়ের রঙ এখনো আগের মতোই, স্তনও পোশাকের উপর দিয়ে আগের মতো ফুলে বেরিয়ে আছে। অ্যাগনেসের ধারণা কাইফেন সম্ভবত সবার অলক্ষ্যে ওকে অতিরিক্ত খাবার দিচ্ছে-বা আরো বেশি। কয়েকদিন রাতের বেলা ও নৌকার সামনের দিকে থেকে অদ্ভুত সব শব্দ শুনতে পেয়েছে।
“আমি বোঝা বাড়াতে চাই না,” বলতে বলতে সারাহ শুয়ে পড়লো। ওর পেটটা এখনো মোচড়াচ্ছে। অ্যাগনেস এমনভাবে সরে বসলো যাতে ওর ছায়া সারাহের উপর পড়ে। তারপর এক কাপ পানি বোনের ঠোঁটে ধরলো। কাপটা চীনামটির তৈরি, গায়ে উইলো পাতার নকশা আঁকা। এই পরিস্থিতিতে এই সুন্দর জিনিসটা একেবারেই বেমানান। অ্যাগনেস যখন দেখলো যে মিসেস ফয় তার পুরো ডিনার সেটা নৌকার তুলেছে তখন আক্ষরিক অর্থেই ওর মুখ হা হয়ে গিয়েছিলো।
