অ্যানা দোকানদারদের মাতৃভাষায় গড় গড় করে কথা বলতে লাগলো। বলতে বলতে ওর চেহারা কালো হয়ে গেলো। “এদের কাছে সারাহ বা অ্যাগনেসের কোনো খবর নেই। তবে ওরা নাকি দেখেছে যে একটা জাহাজ ব্রিঞ্জোয়ানের একজন লোককে গত সপ্তাহে উদ্ধার করে এনেছে। একজন ইংরেজ নাকি। এখন দুর্গে আছে।”
“ওখানেই যাবো তাহলে,” টম বললো। “তুমি আর ফ্রান্সিস ঘাটে আরো একটু খোঁজ খবর করে দেখো কিছু জানা যায় কি না।”
চারপাশে দেয়াল ঘেরা শহরটার মাঝখানে যে দুৰ্গটা সেটা দেখে মনে হলো ব্রিঞ্জোয়ানের দুর্গটারই একটা বড়সড় প্রতিরূপ। যদিও আকারে দ্বিগুণ, আর ওটার মাঝে একটা তিনতলা সুরম্য অট্টালিকা দেখা যাচ্ছে। ওটার বাঁকানো খিলানটার নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় টমের মনে পুরনো স্মৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যখন ও ভেবেছিলো যে সব শেষ, সেই ভয়ানক সময়টার সব কিছু আবার প্রতিধ্বনিত হলো ওর মনে।
ইঞ্চবার্ডের বদৌলতে ও একটা ওয়েটিং রুমে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলো। তাকার প্যাকেটটা ধরিয়ে দিলো একজন চাকরকে। সেটা নিয়ে লোকটা চলে যেতেই ও বসে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো।
সময় বয়ে যেতে লাগলো। ঘরের গ্রান্ডফাদার ঘড়িটা ঢং ঢং করে ঘণ্টার ধ্বনি দিয়ে জানিয়ে দিলো এক ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে। টম প্রচণ্ড রেগে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো। ভাবছে সেটা খুলে ফেলবে কিনা। চেয়ারের হাতল চেপে ধরে উঠে যাওয়া থেকে বিরত রাখলো নিজেকে।
ঠিক যখন ওর মনে হলো যে আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা সম্ভব না, তখনই দরজাটা খুলে গেলো। ওকে ইশারায় ডাক দিলো দারোয়ান। প্রচুর বাতাসওয়ালা একটা ঘরে এসে ঢুকলো ও। ঘরে অনেকগুলো জানালা। দেয়াল জুড়ে আগের আমলের অস্ত্রপাতি দিয়ে সাজানো। সব দেয়ালে গেঁথে রাখা হয়েছে। মাস্কেটের একটা ছড়া, একগাদা তরবারি, আড়াআড়ি করে রাখা বল্লম। দেখে টমের হাই উইল্ডের লাইব্রেরির কথা মনে পড়ে গেলো। বহু বছর ওখানে যাওয়া হয় না ওর।
একজন লোক হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলো ওর দিকে। “উইলিয়াম ফ্রেজার,” নিজের পরিচয় দিলো লোকটা। “ফোর্ট সেন্ট জর্জের গভর্নর আমি। আপনি নিশ্চয়ই টমাস উইল্ড?”
মাথা ঝাঁকালো, টম। ফ্রেজার জোরে ওর হাতে চাপ দিলো। “তাহলে আমি আর আমার কোম্পানি দুটোই আপনার কাছে ঋণী। ক্যাপ্টেন ইঞ্চবার্ডের রিপোর্ট পড়েই বুঝেছি যে আপনার অকুতোভয় পদক্ষেপের কারণেই দুৰ্গটা হাতছাড়া হয়নি আমাদের। নইলে ওটার সাথে দুর্গের লোকজনেরও করুণ পরিণতি হতো। তারচে বড় কথা কোম্পানির সম্মান ধুলোয় মিশে যেতো। ব্যবসার কথা বাদই দিলাম, একবার যদি ঐ কালাগুলোর মাথায় ঢোকে যে ওরাও চাইলে আমাদেরকে মারতে পারে তাহলেতো এদেশে থাকাই মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে।”
টম কোনো কথা বললো না। ব্যাপারটা ওর স্বভাব বিরুদ্ধ। ও কখনো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রক্ষক হতে চায়নি। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সেটাই হয়েছে। আর বিপদও এখনো কাটেনি। কয়েক মাসের অবর্ণনীয় কষ্টের পর এরকম আরামদায়ক পরিবেশ এরকম উষ্ণ অভিবাদন পেলে বেখেয়াল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কেউ যদি ওকে চিনে ফেলে আর গাই একবার খবর পেয়ে যায়…
“আমি দুঃখিত, আপনাদের বেশি লোককে বাঁচাতে পারিনি,” নিচু কণ্ঠে বললো টম। “মিস্টার ফয় আসলে বাঁচানোর মতো কাউকে রেখে যাননি।”
“ওনার অপরিণামদর্শি আচরণের মূল্য উনি দিয়েছেন।”
‘শুধু উনি একাই দেননি। আরও অনেকেই। আর তাদের এক্ষেত্রে কিছুই করার ছিলো না।” টম টের পেলো গত কয়েক মাসের সব রাগ ভিতরে ফেনিয়ে উঠছে। ওর ইচ্ছে করেছে এই ভারী পর্দা টেনে ছিঁড়ে ফেলতে, দেয়ালের সব ছবি টেনে আছড়ে ফেলে ফ্রেজারের টেবিলের সব কাগজ পত্রও ছিঁড়ে কুটি কুটি করতে।
জোর করে নিজের রাগ সামলালো ও।
“অবরোধ শুরু হওয়ার আগে আপনাদের এক মুনশি কয়েকজন মহিলাকে নিয়ে একটা নৌকায় করে পালিয়ে আসে। ফয়-এর স্ত্রী, ক্যাপ্টেন হিকসের স্ত্রী আর আমার স্ত্রী ছিলো ওর সাথে। ওরা মাদ্রাজ আসবে বলে রওনা দিয়েছিলো।”
ফ্রেজারের চেহারা গম্ভীর হয়ে গেলো। “গত সপ্তাহেও যদি আসতেন তাহলে আপনাকে কোনো ভরসা দিতে পারতাম না। কারণ সেরকম কিছুই শুনিনি আমি। তবে এখন কিছু জানি আমি। তবে সেটা যে সুসংবাদ তা বলতে পারবো না।”
টমের বুকটা ধড়াস ধড়াস করতে লাগলো। সামলাতে ফ্রেজারের ডেস্কের একটা কোনা চেপে ধরলো ও। হাতের মুঠি সাদা হয়ে গিয়েছে। “খবরটা কি?”
“বসুন,” ফ্রেজার একটা চেয়ারের দিকে ইংগিত করলো। “খবরটা যে এনেছে তার মুখ থেকেই শুনুন নাহয়। সে এখানেই আছে।”
ফ্রেজার একটা বেল চাপলো। টম একটা পিছন দিক উঁচু চেয়ারে বসলো। পিছনে দরজা খোলার আওয়াজ পেলো ও। মাপা পদক্ষেপে এগিয়ে এলো কেউ।
“মিস্টার কাইফেন,” দারোয়ান ঘোষণা দিলো। বলে সে দরজা বন্ধ করে দিলো আবার।
ঘরের অর্ধেকটা ঢুকে টমকে চোখে পড়লো কাইফেনের। জায়গায় জমে গেলো সে। ভীত চোখে ও একবার সামনে আর একবার বের হওয়ার দরজার দিকে তাকাতে লাগলো।
‘মিস্টার উইল্ড,” শুকনো গলায় বললো ও। অবাক হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। পালানো সম্ভব না বুঝতে পেরে সামনে এগিয়ে এলো। “ঈশ্বরকে অশেষ ধন্যবাদ, আপনি বেঁচে আছেন। আমি আসলেই ভাবতে পারিনি যে আবার দেখা হবে আমাদের।”
