“ক্যাপ্টেন ইঞ্চবার্ড?”
“আবার দেখা হলো। আর এতোদিনে আমি আমার ঋণ শোধ করতে পারলাম বলে মনে হচ্ছে।” ইঞ্চবার্ড আগ্রহের সাথে তাকিয়ে রইলো টমের দিকে। “কোন পোড়া কপালে এখানে এসে জুটেছেন?”
“লম্বা কাহিনি।”
“আপনি কতোটা কষ্ট করেছেন সেটা কল্পনাও করতে পারছি না।” ইঞ্চবার্ড দুর্গের দিকে ইংগিত করলো। “এতো এতো প্রতিকূলতার পরেও এতো দিন ধরে অবরোধ প্রতিহত করে থাকা। লেডেনহল স্ট্রিটে আপনার নামে জয়ধ্বনি করা হবে নিশ্চিত।”
“ওদের কৃতজ্ঞতার কোনো দরকার নেই আমার। আমি শুধু আমাকে আর আমার পরিবারকে রক্ষা করতে সব করেছি। যদি কোম্পানির এতো অর্থলিপ্স না থাকতো তাহলে রানির সাথে এই যুদ্ধ কোনোদিনও বাধতো না।”
“যাই হোক,” খোঁচা মেরে বললো ইঞ্চবার্ড, “লন্ডনের সওদাগরেরা নায়কদের খুবই পছন্দ করে। বিশেষ করে যারা তাদের সম্মান আর ব্যবসার মুনাফার সুরক্ষা করে।”
“আমার কাছে শেষ কথা হচ্ছে আমার স্ত্রী আর অ্যাগনেস-মিসেস হিকস। ওরা ভালো আছে তো? আসার সময় কেমন দেখে এসেছেন?”
ইঞ্চবার্ডের চেহারা কালো হয়ে গেলো। “আপনার কথা বুঝলাম না।”
“আপনারা মাদ্রাজ থেকে এসেছেন না?”
ইঞ্চবার্ড মাথা ঝাঁকালো।
“তাহলে ওদেরকে দেখেননি? নাহলে আমাদের এখানের অবস্থা সম্পর্কে জানলেন কার কাছ থেকে?”
“মাদ্রাজে এখান থেকে কেউ যায়নি। তামিল কিছু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে খবর পেয়েছি আমরা। ওরা সড়কপথে মাদ্রাজ গিয়েছে।”
“কিন্তু সারাহ আর অ্যাগনেসতো কয়েক মাস আগে রওনা দিয়েছে, আর্তনাদ করে উঠলো টম। “বহু আগেই পৌঁছে যাওয়ার কথা ওদের।”
“হতে পারে আমরা রওনা দেওয়ার পরে ওরা পৌঁছেছে।” ইঞ্চবার্ড টমের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থা দেখে নিজের স্বর নরম করলো। “এই বর্ষায় সমুদ্রের অবস্থা খুব বেশি ভালো ছিলো না। সম্ভবত ওরা কাছাকাছি কোনো বন্দরে নোঙ্গর করে আবহাওয়া ভালো হওয়ার অপেক্ষা করছিলো।”
কিন্তু টম যা বোঝার বুঝে ফেলেছে। এসবই ফাঁকা বুলি, কোনো সত্যিকার আশা নেই। চরম হতাশ হয়ে গেলো ও, একটু হলেই কেঁদে দিতো। সারাহকেই যদি আর না পাবে তো এতো কষ্ট করে অবরোধ সহ্য করে কি লাভ হলো? সারাহের নানান ভয়াল পরিণতি মাথায় আসতে লাগলো ওর। প্রত্যেকটা আগেরটার চাইতে ভয়ংকর।
এই অমানিশার মাঝের একটু হলেও আশার প্রদীপ আছে। সারাহের যদি আসলেই কিছু হতো তাহলে ও সেটা টের পেতো। সারাহ নিশ্চয়ই বেঁচে আছে।
“আমাকে ওদেরকে খুঁজে বের করতেই হবে,” টম ইঞ্চবার্ডের দিকে তাকাতেই তার চেহারায় সহমর্মিতা দেখতে পেলো। “আপনি কোম্পানির কৃতজ্ঞতার কথা বললেন। যদি কথাটা আসলেই সত্যি হয় তো আমাদেরকে মাদ্রাজ পৌঁছে দিন।”
*
টম, ফ্রান্সিস আর অ্যানা ব্রিঞ্জোয়ান ছাড়ার তিন সপ্তাহ পর গিয়ে মাদ্রাজ বন্দরে পৌঁছালো। জায়গাটা দেখে, বইতে দেখা মধ্যযুগের শহরগুলোর ছবির কথা মনে পড়লো টমের। মরিচা রঙের পাথরের বাড়িতে ছেয়ে আছে শহরটা। সুরক্ষার জন্যে অসংখ্য অর্ধচন্দ্রাকার কেল্লা আর সারি সারি কামান বসানো সমুদ্রের ধার জুড়ে। তার পিছনে অনেকগুলো সুদৃশ্য ভবন, তবে উত্তর দক্ষিণে ধীরে ধীর ভবনের উচ্চতা ক্রমান্বয়ে কমে গিয়েছে। ওদিকে সব ভাঙাচোরা বাড়ির বস্তি। কোম্পানির সাথে ছোটখাটো ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করা সওদাগরেরা থাকে সেদিকে।
জাহাজের নোঙর নামানো হলো না, তার আগেই এক ঝাঁক ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা ছুটে এলো ডাঙা থেকে। ওগুলোতে আছে নারিকেল, রাম, ফল আর মাছ। কয়েকজন মহিলা প্রায় নগ্ন অবস্থায় নাবিকদের সাথে এসে ঢলাঢলি করতে লাগলো। টম জানে ওদের কাছেও বেচার মতো জিনিস আছে।
“ওরা আপনার নাম দিয়েছে অরম্বারস,” ইঞ্চবার্ড বললো। “মানে হচ্ছে শহরে নতুন আগন্তুক। আপনার কাছ থেকে ভালো পয়সা খসানোর চেষ্টা করবে ওরা।”
“তাহলে খুবই হতাশ হবে ওরা, কারণ আমার কাছে একটা পয়সাও নেই,” টম বললো। “আপনি মালপত্র ডাঙায় পাঠাবেন কখন?”
“কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করবো আমরা,” ইঞ্চবার্ড বললো। “আগে জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে লোকজনের জন্যে কিছু বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু গভর্নর চায় যে আমি অবিলম্বে টাকার প্যাকেটটা পাঠিয়ে দেই। আপনি যদি কষ্ট করে কাজটা করতেন তাহলে কৃতজ্ঞ থাকতাম।”
টম ওর কথা বুঝতে পেরে কৃতজ্ঞ বোধ করলো। ফ্রান্সিস আর অ্যানার সাথে একটা ছোট নৌকায় চড়ে বসলো ও। নৌকার তক্তাগুলো পেরেক দিয়ে না লাগিয়ে দড়ি দিয়ে বাঁধা। ফলে ওদের ওজনে বারবার জায়গা থেকে নড়ে গিয়ে ফাঁকা জায়গা দিয়ে পানি ঢুকতে লাগলো।
“ডাঙা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে তো?” ফ্রান্সিস বললো। “নৌকাটা তো সাগরে ডুবিয়ে মারার জন্যে বানানো হয়েছে দেখি।”
“মাঝিরা জানে যে ওরা কি করছে,” টম বললো। আমাদের নৌকার মতো না এগুলো। এগুলো স্রোতের সাথে সাথে বেকে যেতে পারে। তুমি হয়তো ভিজে যাবে, কিন্তু কোনোদিনও নৌকা উল্টে মরবে না।”
আসলেই তাই। নৌকাটা ওদেরকে ভিজিয়ে দিলো, কিন্তু নিরাপদেই জেটির কাছে বন্দরের দরজায় পৌঁছে দিলো। জাহাজের কাগজপত্র দেখাতেই ওদেরকে ভিতরে ঢোকার অনুমতি দিয়ে দেওয়া হলো। দরজার পার হতেই সরাসরি বাজারে গিয়ে পড়লো ওরা। বালুতে ভরা রাস্তাগুলোর দুই পাশ ছোট ছোট দোকানে ভরে আছে। দোকানদার পাশেই দাঁড়িয়ে চিৎকার করে জিনিসপত্রের দাম বলে বলে খরিদ্দার ডাকছে। একপাশের দেয়ালে পরবর্তী জাহাজ কখন আসবে সেই কাগজ সাটানো। অ্যানাকে দেখতে পেয়ে কয়েকজন দোকানদার এগিয়ে এসে অভিবাদন জানালো। অ্যানার প্রতি ওদের মমতা দেখে খুশি হলো টম। ফ্রান্সিস ভ্রু কুঁচকে পিছনে দাঁড়িয়ে রইলো।
