ক্রিস্টোফার ওর লাগামটা ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে আস্তে আস্তে কথা বলতে লাগলো। আশ্বস্ত হয়ে ওকে নিজের পিঠে উঠতে দিলো ঘোড়াটা। ও.জানে যে শীঘ্রই ধাওয়া করা হবে ওকে। সর্বশক্তি দিয়ে ঘোড়া ছোটালো তাই। সমুদ্র থেকে আসা পানির নালাগুলো পেরিয়ে আঁকাবাঁকা পথে পেরিয়ে এসে যখন নিশ্চিত হলো যে ও সম্পূর্ণ একা, তখনই থামলো।
ঘোড়াটা জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো। পেটের দুপাশ ঘামে ভিজে গিয়েছে। তবে এতো গরম যে অল্প সময়েই ঘাম বাষ্প হয়ে যাচ্ছে। ও ঘোড়াটাকে একটু বিশ্রাম দিতে জিন থেকে নেমে, লাগাম ধরে হাঁটতে লাগলো। মাথার ভিতর চিন্তার ঝড় চলছে ওর।
রানির কাছে আর ফিরে যেতে পারবে না ক্রিস্টোফার। ওর সেনাদল ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ায় আর দুর্গটা আবার ইংরেজরা দখল নিয়ে নেওয়ায় তার কূটকৌশল পুরোটাই ব্যর্থ হয়েছে। এখন তাকে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করতে হবে। আর কোম্পানিও নিশ্চয়ই এখন খুব বেশি নরম মেজাজে থাকবে না। ওরা হয়তো বলবে ক্রিস্টোফারকে ওদের হাতে তুলে দিতে যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে পারে। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বোষেতে ফিরে গিয়ে, ওর বাবার সামনে মাথা নুইয়ে প্রাণভিক্ষা চাওার ব্যাপারটা মাথায় আসতেই ওর সারা শরীর রাগে রি রি করে উঠলো।
হাঁটতে হাঁটতে একটা চৌরাস্তায় এসে পৌঁছালো ও। গাছপালার ফাঁকে কয়েকটা ছোট ছোট কুঁড়েঘর দেখা যাচ্ছে। গ্রামবাসী ওর ঘোড়ার আওয়াজ পেয়েই লুকিয়ে পড়েছে। ওরা জানে যে যখন কোনো ক্ষমতাধর তোক গ্রামে আসে তখন ভালো কিছু ঘটে না। ক্রিস্টোফার কুঁড়েগুলোয় ঢুকে খাবার দাবার যা পেলো নিয়ে নিলো। কয়েক থালা ভাত, আর সামান্য শুঁটকি মাছে। টাকা পয়সা খুঁজতে গেলো না। এদের জীবন বনের জানোয়ারদের চাইতে খুব বেশি সুবিধার না। নিজের উপর অন্য কারো দৃষ্টি টের পেলোলা ও, ঝোঁপ ঝাড়ের ভিতর থেকে নজর রেখে চলেছে ওরা। কিন্তু ও পাত্তা দিলো না। কারণ নেপচুন তরবারিটাই ওদেরকে নিরাপদ দুরত্বে রাখতে যথেষ্ট।
ক্রিস্টোফার খাপ থেকে তরবারিটা বের করলো। ওটা ধরলেই অন্যরকম একটা শিহরণ খেলে যাচ্ছে শরীরে। ও ওটা হাতে ধরে নাড়তে চাড়তে লাগলো যাতে ওটার স্বর্নালি ফলাটা গাছের ফাঁক দিয়ে আসা আলোয় চকচক করে ওঠে। হাতলের নীলাটা দেখে মনে হচ্ছে একটা চোখ যেনো ওর আত্মার দিকে তাকিয়ে আছে। ও সব হারিয়েছে-কিন্তু এই তরবারিটা পাওয়ার পর থেকে নিজেকে অজেয় মনে হচ্ছে ওর।
কিছুক্ষণ ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো ও, কি করবে ভাবছে সেটা। ত সাথে হওয়া শেষ কথোপকথনের একটা অংশ মনে এলো ওর।
মুক্ত হলে আমরা কোথায় যাবো? আমরা যদি একসাথে থাকতে তাহলে এমন কোথাও যেতে হবে যেখানে আমাদের অতীত কেউ জানে না
টিরাকোলা, তামান্না জবাব দিয়েছিলো। ওখানে আইন কানুনের নেই। ওখানে গেলে আমি আর তুমি সত্যিই মুক্ত বিহঙ্গের মতো পারবো।
একদিন না একদিন নিশ্চয়ই যাবো, ক্রিস্টোফার জবাব দিয়েছিলো
ক্রিস্টোফার আবার ঘোড়ার পিঠে চড়ে, সোজা উত্তরে রওনা দিলো
*
টম রক্তে ভেজা বালির ভিতর টুঙ্গারের দেহটা খুঁজে পেলো। ওর ডান হাত কাটা, কিন্তু মারাত্মক কোনো ক্ষত দেখা গেলো না শরীরে। খুব সাবধানে আগাতে লাগলো টম। বলা যায় না, এখনো বেঁচে থাকতে পারে।
টুঙ্গারের মুখের ভিতর থেকে একটা মাছি বেরিয়ে এলো, বেরিয়ে থাকা জিভটাও চোখে পড়লো তখন। টম বুঝলো ওর আর ভয় পাবার কিছু নেই। কয়েক কদম আগেই ও কাটা হাতটা খুঁজে পেলো। জায়গাটা ঘোড়ার খুরের ছাপ-এ ভরা। কিন্তু তরবারিটার কোনো চিহ্ন ও দেখতে পেলো না।
রানির সৈন্যদলের সবাইই ততক্ষণে সৈকত পেরিয়ে জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছে। একজনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষিত হলো; একজন লম্বা টাকমাথা লোক। দেখে চেনে চেনা লাগলো ওর। কিন্তু এতো দূর থেকে পাম গাছগুলোর আলো ছায়ার কারণে তার হাতে কোনো তরবারি আছে কিনা বুঝতে পারলো না টম।
হতাশায় ছেয়ে গেলো ওর মন-তবে কিছুক্ষণের জন্যে। নিশ্চয়ই কোনো সৈন্যই পালানোর সময় নিয়ে গিয়েছে তরবারিটা। টম তাই আশা ছাড়লো না। এরকম একটা জিনিস লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। কথা ছড়াবেই, আর টম অবশ্যই কান খোলা রাখবে সেটা শোনার জন্যে। যদি রানি তরবারিটা ফেরত দিতে না চায়, তাহলে তার মহল মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে।
“অস্ত্র নামিয়ে নাও!”
টম ঘুরে দেখলো দুই ডজন মাস্কেট সোজা তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ডাঙায় উঠে এসেছে মেরিনেরা। সূর্যের দিকে পিঠ দিয়ে এক সারি করে দাঁড়িয়ে আছে ওরা, পা-এর মোজা ঢেউয়ে লেগে ভিজে গিয়েছে।
টম সাবধানে হাত তুললো। “আরে, আমিতো আপনাদের লোক।”
টমের গলা শুকিয়ে ফ্যাসফেসে হয়ে গিয়েছে-তবে লোকগুলো ধরতে পারলো ওর কথা। ওদের সার্জেন্ট অস্ত্র নামাতে আদেশ দিলো।
“মাফ করবেন, এবার আর একজন বলে উঠলো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাপ্টেনের নীল পোশাক পরা একজন লোক সৈন্যদের সারি থেকে সামনে এগিয়ে এলো। আপনাদের দুর্দশার খবর যখন মাদ্রাজে পৌঁছালো তখন আমরা ভেবেছিলাম যে জীবিত অবস্থায় কোনো ইংরেজকে বোধহয় আর পাবো না।” বলেই থেমে গেলো লোকটা। “ও ঈশ্বর! আপনি কি…?”
টম সূর্য থেকে বাঁচতে চোখের উপর হাত চাপা দিলো। এতো ঝড় ঝাঁপটা গিয়েছে ওর উপর দিয়ে যে ক্যাপ্টেনের মুখটা চিনতে সময় লাগলো কিছুটা। পোড় খাওয়া চেহারা, ঝকঝকে নীল চোখ, সোনালি আর ধূসরে মেশালো চুল।
