ইস্পাতের ফলাটা প্যাঁচ খুলে সোজা টুঙ্গারের কবজি পেঁচিয়ে ধরলো। ক্রিস্টোফার শক্ত করে ধরে সর্বশক্তিতে টান দিলো ফলাটা। টুঙ্গারের হাতটা কেটে পড়ে গেলো মাটিতে। কাটা হাতেই নেপচুন তরবারিটা ধরা, আর ওটা থেকে তীর বেগে বের হতে লাগলো রক্ত। টুঙ্গার আর্তমাদ করে উঠলো। রক্তপ্রবাহ থামাতে ও ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে দিলো। কিন্তু ওর ঘোড়াটা সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলো। যেইমাত্র টের পেলো যে লাগাম আলগা হয়ে গিয়েছে, সাথে সাথে নিজের পিছনের পা দুটো তুলে ঝাড়া দিলো। টুঙ্গার উড়ে গিয়ে দড়াম করে আছড়ে পড়লো বালিতে। ঘোড়াটা দিলো ছুট, যাওয়ার পথে যে পড়লো সামনে তাকে মাড়িয়ে ছুটে গেলো জঙ্গলের দিকে।
ওদের পাশের ভীড় পাতলা হয়ে আসছে। বেশিরভাগ সৈন্যই বনের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে, নয়তো পৌঁছাতে গিয়ে মারা পড়েছে। ক্রিস্টোফার দেখতে পেলো যে ইন্ডিয়াম্যানটা থেকে একটা নৌকা ডাঙ্গার দিকে আসছে। লাল উর্দি পরা মেরিন সৈন্য দিয়ে ভরা। ওরা ওকে এখানে ধরতে পারলে,..
নেপচুন তরবারিটা বালির উপর শুয়ে গুপ্তধনের মতো চকচক করছে। ক্রিস্টোফার ওটার দিকে হাত বাড়ালো। এতো ধ্বংসস্তূপের মাঝেও ওর মনে হতে লাগলো ও জয়লাভ করেছে। এতোদিন যতো অবর্ণনীয় কষ্ট সয়েছে, যেসব ভয়ানক জিনিস ও করেছে বা দেখেছে, সেগুলো সবই এই তরবারিটা পাওয়ার জন্যে সওয়া যায়। তরবারিটা ওর, মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরেই পড়ে আছে ওটা।
কিন্তু আগাতেই একটা হাত ওর গোড়ালি, আঁকড়ে ধরলো। আচমকা টানে ক্রিস্টোফার ভারসাম্য হারিয়ে হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে পড়লো। ও তরবারিটার দিকে ঝাঁপ দিলো কিন্তু হাতটা প্রচণ্ড শক্তিতে ওকে আটকে দিয়ে টেনে সরিয়ে নিয়ে গেলো।
ক্রিস্টোফার শরীরটা বাকিয়ে পিছনে তাকাতেই দেখে হাতটা টুঙ্গারের। কাটা হাতটা বালিতে চেপে রেখেছে যাতে রক্তপাত বন্ধ হয়, আর বাম হাত দিয়ে ক্রিস্টোফারকে ধরে রেখেছে। একটা মাথার খুলি খচিত ছুরি দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে রেখেছে ও, এতো জোরে যে ফলায় লেগে ঠোঁটের দুই কশ কেটে গিয়েছে।
“বেঈমান,” ফলাটা চেপেই হিসিয়ে উঠলো টুঙ্গার। “তুই আমাকে হারিয়েছিস ঠিক আছে, কিন্তু আমার আগেই আমি তোকে শিবের (ধ্বংসের দেবতা) কাছে পৌঁছে দেবো।”
প্রচণ্ড ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠে ও ওর কাটা ডান হাতের উপরেই ভর করে নিজেকে টেনে তুললো। একই মুহূর্তে ও ক্রিস্টোফারের পা-টা ছেড়ে দিয়ে মুখ থেকে ছুরিটা নিয়ে এক টানে ক্রিস্টোফারের পায়ে ঢুকিয়ে দিলো।
আরও একবার কালারিতে শেখা কৌশল বাঁচিয়ে দিলো ক্রিস্টোফারকে। টুঙ্গার ছেড়ে দেওয়া মাত্র ক্রিস্টোফার সমস্ত শক্তি জড়ো করে লাফ দিয়ে পায়ের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে গেলো। টুঙ্গার ছুরি চালাতে চালাতে ও ততোক্ষণে নিজের পায়ে খাড়া হয়ে গিয়েছে। ফলে চামড়ায় আচড় কেটে বেরিয়ে গেলো ছুরির ফলা, রক্ত বের হতে লাগলেও নিচের মাংসপেশির ক্ষতি হলো না।
এবার আর কোনো উপায় রইলো না টুঙ্গারের। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো এশবার, কিন্তু ক্রিস্টোফার ওকে ঘুষি মেরে শুইয়ে দিলো। তারপর ওর হাত থেক ছুরিটা কেড়ে নিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেললো। ক্রিস্টোফার টুঙ্গারের পিঠের উপর বসে পিছন থেকে গলা চেপে ধরলো হাত দিয়ে। টুঙ্গার হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে ক্রিস্টফারে চোখে খোঁচা মারার চেষ্টা করলো কিন্তু ওর হাত সে পর্যন্ত পৌঁছালো না। ক্রিস্টোফার ওর হাত কামড়ে ধরলো। হাড় ভাঙার মট আওয়াজ পাওয়ার পর হাতটা ছাড়লো। টুঙ্গার চিৎকার করার জন্যে মুখ খুললো কিন্তু কোনো আওয়াজ বের হলো না। কারণ ক্রিস্টোফার টুঙ্গারের গলার প্যাঁচ একটুও ঢিল করেনি। টুঙ্গারের শ্বাসনালীর উপর আরও জোর বাড়ালো ক্রিস্টোফার।
টুঙ্গারের চোখ বড়বড় হয়ে গেলো। চেহারা রক্ত জমে লাল হয়ে গিয়েছে, এতোটা লাল যে ক্রিস্টোফারের মনে হলো যে বোধহয় ওর চেহারার ক্ষতটা বরাবর ফেটে মগজ বেরিয়ে আসবে। কালো কুচকুচে দাঁতের ফাঁক দিয়ে জিভ বের হয়ে গেলো ওর। বাতাসের জন্যে হাসফাস করছে।
মট করে ভেঙে গেলো টুঙ্গারের শ্বাসনালী। চোখ বেরিয়ে এলো কোটর ছেড়ে। জিভ বের করা অবস্থাতেই মাথা হেলে পড়লো এক পাশে। ক্রিস্টোফার তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্যে আরো একটা মোচড় দিলো দেহটায়। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে তরবারিটা নিয়ে জঙ্গলের নিরাপদ আশ্রয়ে দৌড় দিলো। পায়ের ক্ষতে মন দেওয়ার সময় এখন আর নেই।
মেরিনের লোকজন ডাঙায় উঠে এসেছে। ওরা ক্রিস্টোফারের দিকে চেঁচালো কিন্তু ও কান দিলো না বা ফিরেও তাকালো না; তবে আশেপাশের সৈকতে ছিটকে ওঠা বালি দেখে বুঝতে পারলো যে ওরা ওর দিকে গুলি করছে। এবার ও ফিরে তাকালো। ব্যাপারটা বুঝলো না ও, মেরিনগুলো কেন যেনো ওকে ধাওয়া করছে না। ওদের পিছনেই দুর্গের ফটকের ধ্বংসস্তূপের উপরে একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে, কেউ বলে না দিলেও ও জানে নোকটা হচ্ছে টম উইল্ড।
সে ক্রিস্টোফারকে পরাজিত করেছে। কিন্তু তরবারিটা এখন ক্রিস্টোফারের হাতে। আর তাতে ও এক নতুন উদ্যম ফিরে পেলো। এক ছুটে বনের ধারে পৌঁছে জঙ্গলের ভিতরে হারিয়ে গেলো।
*
বনের সামান্য ভিতরেই ক্রিস্টোফার টুঙ্গারের ঘোড়াটা খুঁজে পেলো। পলায়নরত সৈন্যরা ওর দিকে নজর দেয়নি। বনের ভিতর একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে ঘাস চাবাচ্ছে। সারা গা রক্ত আর ধুলোবালিতে ভরা।
