একমাত্র যে লোকটা পালালো না সে হচ্ছে টুঙ্গার, ঘোড়ার পিঠে বসে চিৎকার করে ওর সৈন্যদের না পালিয়ে যুদ্ধ করতে আদেশ দিতে লাগলো। কথায় কাজ না হওয়ায় নেপচুন তরবারিটা ব্যবহার করতে লাগলো। নিজেই নিজের লোকদের কোপানো শুরু করলো। কিন্তু পলায়নরত সৈন্যরা ওকে কোনো পাত্তা দিলো না এবার। সব আদেশ নির্দেশ অবমাননা করে জঙ্গলে গিয়ে লুকালো। একজন ওকে টেনে ঘোড়ার পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু টুঙ্গার এক কোপে লোকটার চেহারা দুই ভাগ করে দিলো।
আবার জাহাজের কামান গর্জে উঠলো। গোলাটা টুঙ্গারের ঘোড়ার এতো কাছে পড়লো যে আর একটু হলেই ঘোড়ার মুণ্ডু উড়ে যেতো। জানোয়ারটা সামনে পা তুলে উঁচু হয়ে গেলো, দাঁত বেরিয়ে পড়েছে আতংকে, শুধুমাত্র টুঙ্গারে ঘোড়া সামলানোর অতিমানবীয় দক্ষতার কারণেই ও পিঠ থেকে ছিটকে বালিতে পড়লো না।
শেষে ক্রুদ্ধ একটা গর্জন ছেড়ে টুঙ্গারও ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে উল্টোদিকে ছুটে চলে গেলো। টম দেখতে পেলো যাওয়ার পথে সামনে যে পড়লো তাকেই ও নেপচুন তরবারিটা দিয়ে কোপাতে কোপাতে এগিয়ে গেলো।
টম বুঝলো যে এটাই ওর শেষ সুযোগ। টুঙ্গার যদি একবার জঙ্গলে ঢুকে যায় তাহলে আর কখনো ও এই তরবারির দেখা পাবে না। আর আলফ উইলসন আর বাকি যাদের টুঙ্গার খুন করেছে তার বদলাও নিতে পারবে না। টম সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নেমে, উঠোন পেরিয়ে ফটকের সামনে জমা পাথরের পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গেলো। বিস্ফোরণের তাপে তখনও পাথরগুলো গরম হয়ে আছে।
চোখের উপর হাত দিয়ে টম যুদ্ধক্ষেত্রে খুঁজতে লাগলো। কোথায় টুঙ্গার?
*
ক্রিস্টোফার টলতে টলতে দুর্গ থেকে সরে যেতে লাগলো। ধুলোবালিতে মুখের ভিতরটা ভরা; বিস্ফোরণের শব্দের কারণে এখনো ওর কানে তালা লেগে আছে। মাথায় হাত দিলো ও, খালি চামড়া আর রুক্তের স্পর্শ পেলো সেখানে। বিস্ফোরণে মাথার চুল পুড়ে গিয়েছে।
ফটকের একেবারে সামনেই ছিলো ও। টুঙ্গার এক প্রকার জোর করেই ওকে আক্রমণের নেতৃত্বে পাঠিয়েছিলো আজ। সন্দেহ নেই ও ইল্কলীর কথাটা বিশ্বাস করেনি। তাই ভেবেছিলো এতে করে যদি কোনো ঝামেলা হয় তাহলে মাঝখান থেকে ক্রিস্টোফার অক্কা পেয়ে ওকে বাঁচিয়ে দেবে। এবং নিখুঁতভাবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নও হতে চলেছিলো। দরজা খুলতেই ক্রিস্টোফার টম উইল্ডকে অন্যপাশে দেখতে পায়। ও ভেবেছিলো আগে আগে আক্রমণ করে রানির লোকের হাতে পড়ে জবাই হওয়ার আগেই টম উইল্ডকে ও বন্দী করবে। ঠিক সেই সময়েই ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ওকে সতর্ক করে দেয় আর ও পিছনেই থেকে যায়। ওর মা বলতো যে শয়তান তার সাঙ্গপাঙ্গদের রক্ষা করে সবসময়। ক্রিস্টোফার জানতো যে এটা হচ্ছে ভাগ্য। তরবারিটায় ওর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে একটা সুযোগ। ও আগালো না, একটু পরেই ওর লোকদের বিস্ফোরণের ধাক্কায় ছাতু হয়ে যেতে দেখলো, যারা বেঁচে ছিলো তারা দরজার নিচে চাপা পড়ে মরল, আর টম উইল্ডও ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেলো। বিস্ফোরণের ধাক্কায় মাটিতে পড়ে গিয়েছিলো ক্রিস্টোফার, কিন্তু পড়া অবস্থাতেই টের পেলো যুদ্ধের ভাগ্য উল্টে গিয়েছে। ওর লোকেরা প্রাণপণ পালাচ্ছে, তারপরই যখন কামানের গোলা একজন লোকের মুণ্ড উড়িয়ে দিলো, তখনই জাহাজটা নজরে এলো ওর। আর ওর লোকদের এরকম করার কারণটাও ধরতে পারলো।
এতে মোটেও হতাশ হলো না ও। এই সৈন্যদলের সাথে ওর কোনো সুসম্পর্ক নেই। আর এই মুহূর্তটার জন্যে ও বহুদিন যাবত অপেক্ষা করে আছে। সাথে সাথে ও টুঙ্গারের খোঁজ করতে লাগলো। একটু দূরেই টুঙ্গারকে দেখা গেলো ঘোড়ার উপর বসে আছে। চিৎকার করে লোকজনকে পালাতে নিষেধ করছে। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না।
এই যুদ্ধের গন্ডগোলের মাঝেও ক্রিস্টোফার মেরুদণ্ডে একটা শিহরণ অনুভব করতে পারলো। টুঙ্গার আজ শেষ। যদি ইংরেজদের হাতে না-ও মরে, রানির হাতে মরবে নিশ্চিত। এখন শুধু তরবারিটা দখল করতে হবে।
টুঙ্গারের দিকে দৌড় দিলো ও। আশেপাশে আহত লোকজন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পালানোর চেষ্টা করছিলো। ওদেরকে ধাক্কা মেরে আগাতে লাগলো ক্রিস্টোফার। সামনেই দেখা গেলো একজন সৈন্য টুঙ্গারের ঘোড়াটা ধরে টানছে, কিন্তু নেপচুনের এক কোপে শিক্ষা হয়ে গেলো তার। সেদিকে দেখতে থাকায় মাটিতে পড়ে থাকা বন্দুকটার দিকে খেয়াল হলো না ক্রিস্টোফারের। ওটায় পা বেধে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো ও। পিছন থেকে দুজন সৈন্য ওকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলো সামনে। কিন্তু মাথা তুলতেই ও দেখতে পেলো একটা কামানের গোলা ঠিক ওর সামনেই দুজনকে পিষে দিলো বালিতে। ও যদি আছাড় না খেতো… আবারও ও শয়তানকে ধন্যবাদ দিলো ওকে রক্ষা করার জন্যে।
কিন্তু এতোক্ষণে টুঙ্গারও বুঝে গেলো যে আর লাভ নেই। ও পালানোর জন্যে ঘুরে সোনালি তরবারিটা দিয়ে কাস্তে চালানোর মতো করে কোপাতে কোপাতে লোকজনের মাঝ দিয়ে পথ করে আগাতে লাগলো। কিন্তু ওদের শিবির আর দুর্গের মাঝের সরু বালির চড়াটায় এতো মানুষ জমে আছে যে এতো কিছুর পরেও রাস্তা করতে পারলো না। ওর ঘোড়াটাও এতো মানুষ আর সমুদ্রে জাহাজের ভেপুর আওয়াজে ভয় পেয়ে জায়গায় জমে গেলো।
ক্রিস্টোফার ভীড় ডিঙিয়ে আগাতে লাগলো ওর লক্ষ্যের দিকে। কোমর থেকে উরুমিটা খুলে নিলো, এরকম পরিস্থিতি আসতে পারে ভেবে সারাক্ষণ ওটা পরে থাকে ও। কিন্তু লোকজনের অব্যাহত চাপের কারণে ওটার প্যাঁচ খোলার জন্যে যথেষ্ট জায়গা পেলো না। একটু ফাঁকা হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলো। ভীড় কিছুটা পাতলা হলে লোকজনের মাথার উপর দিয়েই ছুঁড়ে দিলো ওটা।
