“সুরক্ষা কেল্লায় চলে যাও সবাই,” আদেশ দিলো টম।
অবরোধের শুরু থেকেই টমের আশংকা ছিলো যে এরকম কিছু একটা হবে। সেজন্যেই ও একটা সুরক্ষা কেল্লা বানিয়ে রেখেছে আগেই। ওদের সর্বশেষ আশ্রয় বলা যায় এটাকে। ফটক থেকে সবচে দূরে, দুর্গের উত্তর পশ্চিম দিকটায় প্রচুর অস্ত্র আর গোলাবারুদ জমা করে রেখেছে টম। ও কোনো দিবাস্বপ্ন দেখেনি। জানতো যে খুব বেশিদিন টিকবে না ওরা। আর দেয়ালের কাছে থাকলে ওরা শত্রুর মাস্কেটের গুলির সহজ শিকারে পরিণত হবে। শত্রুরা দেয়াল দখল করতে পারলেই ওরা শেষ। ও শুধু চাচ্ছে ওরা ওদের আক্রমণকারীদের এমন একটা শিক্ষা দেবে যাতে ওরা লড়াই করার নাম ভুলে যায়।
“যাও সবাই,” চিৎকার করে উঠলো ও। “তাড়াতাড়ি।”
এই যুদ্ধের ডামাডোলের মাঝেও ওর কণ্ঠ শোনা যেতে লাগলো বেশ জোরেই। প্রতিবন্ধকের পিছনের লোকজন লাফ দিয়ে পিছু হটে এতো জোরে ছুট দিলো যে ওদের সাথে যারা হাতাহাতি করছিলো তারা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেলো। সামনের সারিতে যারা এতোক্ষণ প্রাণপণ লড়াই করছিলো তারা পিছনের সৈন্যদের চাপে পদপিষ্ট হয়ে মারা পড়লো।
টম গেলো সবার শেষে। তবে যাওয়ার আগে একটু থেমে ছেলে দুটো যে গর্তটা খুঁড়েছিলো সেটা থেকে বেরিয়ে থাকা সলতেয় গুলি করলো। তারপর দিলো দৌড়।
টমের পিছনে উঠোনে হুড়মুড় করে ঢুকতে লাগলো সৈন্যরা। ওরা হয়তো টমকে ধরতে পারতো, কিন্তু অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট হলো। গাদাগাদি করে দৌড়ানোর সময় বা নিজেদের মাস্কেট সোজা করতে গিয়ে ওরা একজন আর একজনকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে লাগলো। ফলে জ্বলতে থাকা সলতেটা নজরে এলো না কারো।
টম সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে আগুনটাও বালির নিচে পোরা পাউডারের কৌটায় পৌঁছে গেলো। প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে ছড়িয়ে পড়লো আগুন। সেই সাথে বালি আর রক্ত ছিটকে পড়লো চারপাশে। যেনো কোনো দৈত্যাকার হাত মাটি ফুড়ে উঠে এসেছে। এতো শক্তিশালী বিস্ফোরণ হলো যে মৃত সৈন্যগুলোর হাড়-গোড় পর্যন্ত গুলির মতো ছুটে গিয়ে আশেপাশের সৈন্যদের গায়ে বিধলো। আক্রমণকারীদের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেলো।
বিস্ফোরণের শব্দ পুরো উঠোনকে প্রকম্পিত করে তুললো। আর্তনাদের ভিতরেও টম নতুন একটা শব্দ শুনতে পেলো, প্রতিধ্বনিগুলো ঘনীভূত হয়ে মূল বিস্ফোরণটার চাইতেও জোরে পুরো দুৰ্গটাকে কাঁপিয়ে দিলো। বাড়তে বাড়তে একেবারে বজ্রপাতের মতো আওয়াজ হতে লাগলো, তারপর ধীরে ধীরে দুর্গের দেওয়ালের প্রকল্পমান পাথরে প্রশমিত হয়ে গেলো।
টম সিঁড়ির মাথায় উঠে নিচের উঠোনে তাকালো। ধোয়া আর ধুলোয় ভরে আছে বাতাস। তবে এর মাঝেও কি হয়েছে স্পষ্ট দেখতে পেলো। ফটকের চিহ্নও নেই আর। গত তিনমাস ধরেই শত্ৰুদলের গোলাগুলির সব ধকল গিয়েছে এটার উপর দিয়ে। আর আজ ওটার ঠিক পাশেই বিস্ফোরণ হওয়ার আর সহ্য করতে পারেনি। ভেঙে পড়ে জীবিত বা মৃত সবাইকে চাপা দিয়ে দিয়েছে।
তারপরেই ও ফ্রান্সিস আর অ্যানার খোঁজে চারপাশে তাকালো। দুজনেই ওখানে আছে। অ্যানা একজন লোকের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে তার ক্ষতে প্রলেপ দিয়ে দিচ্ছে। ফ্রান্সিস ওর পাশে এসে দাঁড়ালো। ও চিৎকার করে কিছু একটা বলছিলো, কিন্তু টমের কান তখনও বিস্ফোরণের শব্দের কারণে তালা লেগে থাকায় কিছুই বুঝতে পারছিলো না।
বাতাসের ধুলোবালি ঝরে পড়তে লাগলো উঠোনে। হতাশ হয়ে টম দেখলো ওর ফাটকাটা পুরোপুরি কাজে লাগেনি। বিস্ফোরণের পরেও শত্রু সৈন্যরা নিবৃত হয়নি। ফটকের সামনে জমা লাশ পেরিয়ে ওরা ছুটে এসে ওদের সুরক্ষা কেল্লায় আক্রমণ করতে এগিয়ে যাচ্ছে। আর কিছুক্ষণের মাঝেই দেখা যাবে যে ওরা দুর্গের দখল নিয়ে ফেলেছে।
টম পিস্তল তুলতে গিয়ে দেখে যে ওটা নেই। গণ্ডগোলের মাঝে কখন যে পড়ে গিয়েছে টের পায়নি। ও তরবারি তুলে নিলো। সব শেষ, মানসিক ভাবে প্রস্তুতি এই নিয়ে নিলো। কিন্তু তবুও ও হাল ছাড়বে না। ও আত্মসমর্পণ করবে না, এততদিন ও খুব আশা করে ছিলো যে আবার সারাহকে দেখতে পাবে। কিন্তু মনে হচ্ছে যে আর সময় পাওয়া গেলো না।
ফ্রান্সিস তখনও ওকে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু টম তবুও কিছু শুনছে না দেখে ও টমের কাধ ধরে সমুদ্রের দিকে মুখ ফিরিয়ে দিলো। বিচিত্র কোনো কারণে ফ্রান্সিস পাগলের মতো হাসছে।
টমও দেখতে পেলো এবার। আর এই যুদ্ধের আতংকের মাঝেও ওর চেহারায় এক অপার্থিব আনন্দ ফুটে উঠলো। ঘাটে একটা জাহাজ দেখা যাচ্ছে। পালগুলো মাস্তুলের গায়ে মেঘের মতো উড়ছে। এক গাদা কামানের মুখও দেখা যাচ্ছে পাশ থেকে। আর জাহাজের পিছনের দিকে উড়ছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লাল আর সাদা ডোরাকাটা পতাকা। ওটা থেকে একটা নৌকা ঢেউ পেরিয়ে বালিতে এসে ঠেকলো। তাতে লাল উর্দি পরা নৌবাহিনির সৈন্য।
জাহাজের একটা কামান গর্জে উঠলো। টম দেখলো গোলাটা পানি পেরিয়ে সোজা উড়ে এসে রানির সৈন্যদলের মাঝখানে একটা বিশাল রক্তে ভরা গর্তের সৃষ্টি করলো। এক বালির ঝর্নায় রূপান্তরিত হলো যেনো সৈকতটা। আর একটা কামান গর্জে উঠলো, আরও একটা। একের পর এক গোলাবর্ষণে রানির সৈন্যরা বিন্দুমাত্র অবকাশ পেলো না। মুহূর্তেই ওরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। সোজা নিজেদের শিবিরের দিকে দৌড়ে জঙ্গলে গিয়ে পালালো। নিজেদের অস্ত্র, কামান বা রসদপত্র নেওয়ার কোনো চেষ্টাই করলো না। এমনকি অফিসারেরাও পালাতে শুরু করলো, সৈন্যদেরকে ফেরানোর কোনো চেষ্টাই করলো না তারা।
