ইল্কলী ওদেরকে আসতে শোনেনি। অবরোধের শুরুতে, টম ফয়-এর ভেঙে ফেলা বাড়িটা থেকে লোহার বর্গা এনে লাগিয়ে দরজাটাকে অনেক মজবুত করে বানিয়েছে। এখন তাই এই ভারী দরজাটা খুলতে ভোরের ঠাণ্ডা বাতাসেও ওর ঘাম ছুটে যাচ্ছে। ও কাজটা করার জন্যে খুব বেশি সময় পায়নি, আবার এদিকে রানির লোকজন আগে আগেই নিজেদের বন্দুকের সলতেয় আগুন লাগিয়ে ফেলেছে। প্রচণ্ড ব্যস্ততায় দরজা খোলার চেষ্টা করছে ও, কারণ শত্ৰুদলের সর্দার যদি এসে দেখে এখনো দরজা বন্ধ তাহলে যে ওর কি অবস্থা করবে সেটা ভাবতেও চাচ্ছে না। তিনমাস এই দুর্গে থেকে, ক্ষুধা তৃষ্ণায় কান্তর হয়ে ইল্কলী সব আশা হারিয়ে ফেলেছে। দুর্গের পতন হতোই। আজ হোক আর কাল হোক। ও শুধু চায় নিজেকে বাঁচাতে।
সর্বশেষ হুড়কোটাও খুলে গেলো। ইল্কলীর ঘামে ভেজা হাত থেকে ছুটে গেলো দণ্ডটা। দড়াম করে নিচে গিয়ে পড়লো সেটা। কে কে শব্দটা শুনেছে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার সুযোগ পেলো না ইল্কলী। দরজার ওপাশেই দাঁড়িয়ে আছে শত্ৰুদলের সেনাপতি। দরজা খোলামাত্র আক্রমণ করে বসলো সে।
ইল্কলী দণ্ডটা তুলে বালিতে ছুঁড়ে দিলো। তারপর দরজায় কাঁধ ঠেকিয়ে সজোরে ঠেলতে শুরু করলো। বৃষ্টিতে ভিজে মরিচা পড়েছে কজায়, আর যেহেতু ব্যবহার করা হয়, না ময়লা জমে একেবারে ভয়ানক শক্ত হয়ে এঁটে বসেছে দরজাটা। ইল্কলী আরো জোরে ঠেলা দিলো, নিজের শক্তির বহর দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেলো খুব।
কাঁধে একটা হাতের স্পর্শ পেয়ে বাই করে ঘুরে গেলো ও। টম আর ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে আছে পিছনে। দুজনের হাতেই উদ্যত তরবারি। পিছনেই দেখতে পেলো বাকি সবাই জেগে উঠছে, ফিসফিস করে টমের আদেশ একজন আর একজনকে শুনিয়ে চুপচাপ নিজেদের অস্ত্র নিয়ে জায়গামতো চলে যাচ্ছে।
“একি করছিস তুই?” বেদনাহত কণ্ঠে বলে উঠলো টম।
ইল্কলী উত্তর দিতে গেলো কিন্তু কিছু বলতে পারলো না। তোতলানো আরম্ভ হলো ওর। “আমি শুধু-”।
ততোক্ষণে অবশ্য দেরি হয়ে গিয়েছে। ওর মরিয়া প্রচেষ্টায় দরজাটা ফুটখানে ফাঁকা হয়েছিলো, কিন্তু শত্রুদল এইটুকের অপেক্ষাতেই ছিলো। ফাঁকটা দিয়ে টম দেখতে পেলো একঝাক জ্বলন্ত ফুলকি জোনাকি পোকার মতো করে বালির মধ্য থেকে উড়াল দিলো যেনো। ও দরজার দিকে দৌড় দিলো।
“ওরা আসছে,” হাবিলদার চেঁচিয়ে উঠলো। ও ততোক্ষণে দুর্গের উপরে উঠে গিয়েছে।
টম ধাক্কা দিয়ে ইন্ধলীকে সরিয়ে আবার দরজাটা বন্ধ করার জন্য ধাক্কাতে শুরু করলো। যথেষ্ট আলো এখন চারপাশে। আক্রমণকারীরা ওকে দেখে ফেললো। একটা মাস্কেট ছোঁড়ার আওয়াজ পাওয়া গেলো। টমের মাথার সামান্য উপর দিয়ে শিষ কেটে উড়ে গেলো একটা গুলি।
ফ্রান্সিস টমকে টেনে সরিয়ে নিলো। সাথে সাথে আর একটা গুলি এসে লাগলো দরজায়। দরজার লোহার চলটা উঠে ছুটে গেলো পাশ দিয়ে। এক মুহূর্ত আগে ঠিক টমের চোখ ছিলো সেখানে।
টম দরজার কামান দুটোর দিকে তাকালো। ওগুলোতে গোলা ভরে রাখা কিন্তু টাচ হোলে কোনো পাউডার নেই। টম দেয়ালে ঝোলানো একটা পাউডারের কৌটা টেনে নামিয়ে ঢেলে দিলো পুরোটা, তাড়াহুড়ায় ছড়িয়ে ফেললো খানিকটা। ফ্রান্সিস একটা দেয়াশলাই নিয়ে এলো।
আক্রমণকারীরা এর মধ্যেই দরজাটা খোলার জন্যে ধাক্কানো শুরু করেছে। টম প্রথম কামানটায় আগুনটা ছুয়িয়েই লাফ দিয়ে সরে গেলো ওখান থেকে। সাথে সাথে গর্জে উঠলো সেটা। বিস্ফোরণে দরজাটা ওটার কজা থেকে খুলে গেলো, সাথে উড়িয়ে দিলো যারা দরজা ধাক্কাচ্ছিলো তাদেরকে। দ্বিতীয় দলটা এগিয়ে এলো খোলা দরজা দিয়ে, কিন্তু টম ততোক্ষণে দ্বিতীয় কামানটার কাছে পৌঁছে গিয়েছে। আগের লাশগুলোর উপর জমা হলো এদের লাশ।
কিন্তু পিছনে আরো অনেক সৈন্য-আর কামানে আবার গোলা ভরার সময় আর নেই। যে তক্তাগুলো দিয়ে দরজাটাকে ভারী করা হয়েছিলো, টমের লোকজন সেগুলো তুলে নিয়ে দরজার সামনে তূপ করে দিলো। দরজার সামনে পড়ে থাকা লাশ, কামান আর দরজার ভাঙা অংশ, সব মিলিয়ে মোটামুটি একটা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলো। ওরা ওটার পিছনে হামাগুড়ি দিয়ে বসে লুকালো।
সবাই আচমকা ঘুম থেকে উঠলেও, গত কয়েক মাসে টম যেভাবে কড়াকড়িভাবে নিয়ম শৃঙ্খলা অনুশীলন করিয়েছে তা কাজে দিলো আজ। লোকেরা ঠিকঠাক জানে কাকে কি করতে হবে। আর টমের কামানের বিস্ফোরণ ওদেরকে সেসব করার জন্যে পর্যাপ্ত সময় এনে দিলো। অর্ধেক লোক প্রতিবন্ধকতার পিছনে লুকিয়ে গুলি করতে থাকলো। বাকিরা মাস্কেটে গুলি ভরে দিতে লাগলো। ওদের পিছনে দুটো কম বয়সী ছেলে বালির ভিতর একটা গর্ত খুড়ছে। টম দেখিয়ে দিয়েছে জায়গাটা।
কিন্তু ওদের অবিশ্রান্ত গুলি বর্ষণের পরেও শত্রুরা আসতেই থাকলো। দরজার সামনে জমে থাকা তাদের সঙ্গীদের লাশের উপর দিয়েই এগিয়ে আসছে ওরা। একটু পর এতো কাছে চলে এলো যে প্রতিবন্ধকতার এপারের লোকজন গুলি ভরার সময় পেলো না। ওরা দ্রুত বেয়নেট লাগিয়ে নিলো। একেবারে হাতাহাতি লড়াই শুরু হলো কিছুক্ষণ পর। দুই দলই রক্তে ভিজে আছে।
ছেলে দুটো টমের কথামতো গর্ত খুঁড়ে ওটার ভিতর একটা জিনিস ভরে আবার উপরে বালি ছড়িয়ে দিলো। তারপর দুটো মুগুর তুলে নিয়ে ওরাও লড়াই করতে এগিয়ে গেলো। টম ওদেরকে ইশারায় সরে যেতে বললো। ও খুব ভালোমতোই বুঝছে যে লড়াই কোন দিকে যাচ্ছে। এখন যেহেতু দুই দলই মুখোমুখি, তাই শত্রু সেনাপতির কাছে বেশি সৈন্য থাকায়, সে সুবিধা আদায় করতে পারবে সহজেই। টম ওর লোকদের পেছাতে দিচ্ছিলো না, ঠিক একটা ফুটোয় গজাল ঢোকানোর মতোই ওদেরকে সামনের দিকে ঠেলে দিচ্ছিলো। ওরা যতোই ভালো লড়াই করুক না কেনো, শত্ৰুদলের অব্যাহত চাপ খুব বেশিক্ষণ ধরে রাখা সম্ভব হবে না। কিছুক্ষণের মাঝেই হাফসে যাবে ওরা।
