ক্রিস্টোফার লোকটার প্যানপ্যানানি মন দিয়ে শুনছিলো না। কিন্তু ওদের ক্যাপ্টেনের কথায় মনোযোগ আকর্ষিত হলো ওর।
“তোদের ক্যাপ্টেনের নাম কি?” জিজ্ঞেস করলো ক্রিস্টোফার।
“টম উইল্ড। মৌসুমের শুরুতে জাহাজডুবি হয়ে এখানে এসে উঠেছে। কেন হুজুর? চেনেন ওনাকে?”
“না কিন্তু কেমন যেনো খুব… পরিচিত মনে হয়।”
ক্রিস্টোফার ওর আশার চাইতেও বেশি জিনিস জেনে ফেলেছে। সোজা হয়ে বসে বললো, “যদি কাল দরজা খোলা পাই, তাহলে তোর ওজনের সমান স্বর্ণ পাবি।” বলে ও লোকটার চোখের দিকে তাকালো। যা দেখতে পেলো তাতে খুব খুশি হলো ওঃ লোভ, ক্ষুধা আর ভয়। “আর যদি না পাই, তাহলে স্বর্ণ গলিয়ে তোর গলা দিয়ে ভরে দেবো। সাবধান করে দিলাম।”
*
ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেলো হঠাৎ। কেন তা ও জানে না। দুর্গের এক কোনায় উষ্ণ বালিতে শুয়ে ঝিমাচ্ছিলো ও। আপনাআপনি ওর হাত পাশে শুইয়ে রাখে মাস্কেটে চলে গেলো। নতুন চাঁদ উঠবে, আকাশ তাই আলকাতরার মতো কালো হয়ে আছে। অনেক আগেই ওদের মোম আর বাতি জ্বালানোর মতো তেল শেষ হয়ে গিয়েছে।
একটা হালকা পদক্ষেপ এগিয়ে এলো ওর দিকে। উঠে বসলো ও।
“ফ্রান্সিস?” অন্ধকারের ভিতর অ্যানার গলা শোনা গেলো। রাতের মতোই। শীতল আর নরম। ফ্রান্সিসের পাশে বসে ও নিজের পোশক টানটান করতে লাগলো। ফ্রান্সিস ওকে দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু ওর শরীরের উষ্ণতা অনুভব করতে পারছে। ওর শরীর থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে।
“আমি ঘুমাতে পারছি না,” অ্যানা বললো। “দুঃস্বপ্ন দেখলাম একটা। আমি একটা বিশাল দুর্গের ভিতরে দৌড়াচ্ছি আর তোমাকে খুঁজছি। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। লোকজন ধাওয়া করছে আমাকে, একটুর জন্য ধরতে পারছে না। আর আমি জানি যে যদি আমি তোমাকে খুঁজে না পাই তাহলে ওরা তোমাকে খুন করে ফেলবে।”
কিছু না ভেবেই ফ্রান্সিস হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো অ্যানাকে। তারপর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
“স্বপ্নতো স্বপ্নই।”
অ্যানাকে নিজেকে সামলালো। “আমার আর এখানে ভালো লাগছে না।”
“এইতো আর কয়েকদিন। সূর্যাস্তের ঠিক আগেই সমুদ্রে একটা পাল দেখেছি আমি। সাগরে জাহাজ চলা শুরু হয়েছে আবার। সারাহ আর অ্যাগনেস যদি মাদ্রাজে একটা খবর পাঠাতে পারে, তাহলেই হবে। ওখানকার গভর্নর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সাহায্য পাঠাবে।”
“একটা জাহাজ যদি এসে আমাদেরকে অনেক দূরে কোথাও নিয়ে যেতো?”
অ্যানা অন্ধকার তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ তারপর সোজা হলো। ফ্রান্সিস কিছুটা লজ্জা পেয়ে ওর হাত সরিয়ে নিলো। কিন্তু অ্যানা সোজা হয়েছে ওর মুখ ফ্রান্সিসের মুখের সমান উপরে তোলার জন্যে। অ্যানা সামনে ঝুঁকলো, অন্ধকারে ফ্রান্সিসের মুখটা খুঁজছে।
অ্যানার ঠোঁটগুলো শুকনো কাগজের মতো হয়ে আছে। অ্যানা ওর ঠোঁট ফাঁক করে জিহ্বা দিয়ে ফ্রান্সিসের পুরো চেহারা ছুঁয়ে দিলো। ফ্রান্সিস ওকে জড়িয়ে ধরলো আবার। অ্যানার নরম স্তনের ছোঁয়া অনুভব করতে পারলো নিজের শরীরে। অ্যানার চুলের ভিতর আঙুল চালালো ও, তারপর
আচমকা ফ্রান্সিস নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। মন খারাপ করে অ্যানা উঠে দাঁড়ালো। “আমি ভেবেছিলাম-”
ফ্রান্সিস ওকে মুখ দিয়ে হিসস শব্দ করে চুপ করিয়ে দিলো। “গন্ধ পাচ্ছো?”
অ্যানা নাক কুঁচকে গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করলো। কেমন যেনো… সালফারের মতো গন্ধ।”
“বন্দুকের সলতের গন্ধ,” ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়ালো। মন থেকে সমস্ত প্রেমের চিন্তা উধাও। “আমরা এসব বন্দুক ব্যবহার করি না। আমরা ব্যবহার করি ফ্লিন্টলক বন্দুক (চকমকি পাথর ব্যবহার করে গুলি ছোঁড়া হয় যে বন্দুকে)। শুধু ভারতীয়রাই ম্যাচলক বন্দুক ব্যবহার করে (সলতেয় আগুন ধরিয়ে গুলি ছোঁড়া হয় যে বন্দুকে)।”
মুহূর্তেই অ্যানাও পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ফেললো। “পাহারায় কে আছে?”
“ইল্কলী।”
ফ্রান্সিস দেয়াল ধরে হাতড়ে হাতড়ে সিঁড়ি খুঁজে বের করলো। “চাচাকে ডেকে তোলো,” অ্যানাকে বললো ও। “হয়তো কিছুই না, কিন্তু…”
এতোদিনে দুৰ্গটা ফ্রান্সিসের এতো পরিচিত হয়ে গিয়েছে যে এই অন্ধকারেও দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যেতে কোনো সমস্যা হলো না ওর। সিঁড়ির শেষ মাথায় নেমেই জায়গায় জমে গেলো।
রাতটা ওর ধারণা মতো অতোটা অন্ধকার না। পশ্চিম দিকের আকাশে মেঘের ফাঁক দিয়ে তারা জ্বলজ্বল করতে দেখা যাচ্ছে; আর পূর্ব দিগন্তে একটা হালকা লালচে আভা ভোর হওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে। কিন্তু এসব দেখে ও থমকে যায়নি। ওর নিচেই, দুর্গের চারপাশের সৈকতে একগুচ্ছ কমলা বিন্দু আভা ছড়াতে ছড়াত এগিয়ে আসছে। ঠিক কামারশালায় যেভাবে আগুনের ফুলকি ছড়ায়। ও জানে ওগুলো কি। ওদের শত্রুদের ম্যাচলক বন্দুকের সলতের ধিকিধিকি আলো।
ও আবার উল্টোদিকে উঠতে যেতেই টমের সাথে ধাক্কা লাগিয়ে ফেলেছিলো প্রায়। “ওরা চলে এসেছে, হাফাতে হাফাতে বললো ফ্রান্সিস। “অনেক সৈন্য। একশোর বেশি। দরজার ঠিক বাইরেই চলে এসেছে।”
“ওদেরকে কেউ দেখেনি? ইল্কলী কোথায়?”
“জানি না। ওকে দেখিনি।”
শব্দ করে দরজা খুলে গেলো। টম আর ফ্রান্সিস ঘুরে গেলো সেদিকে। দ্রুত ভোর হচ্ছে, ক্রান্তীয় অঞ্চলে এরকমটাই হয়। হালকা আলোয় সদর দরজাটা এখন দেখা যাচ্ছে। কিছু একটা নড়ে উঠলো ওখানে।
