টুঙ্গার থালাটার একটা ভাঙা টুকরো তুলে নিয়ে হাত দিয়ে মুচড়ে গুড়োগুড়ো করে ফেললো। “আমরা এই যুদ্ধ জিতবোই,” শপথ করলো ও। “এখান থেকে চিত্তিঙ্কিারার রাস্তার দুধারে বল্লমের আগায় টুপিওয়ালাদের কাটা মুণ্ড ঝুলিয়ে দেবো। আর যখন, মহলে পৌঁছাবো, তখন তোর মাথাটা সদর দরজার পাশে ঝুলাবো। যারা রানির কান ভাঙায় তাদের জন্য শিক্ষা স্বরূপ।”
ক্রিস্টোফার কিছু বললো না। ও খুব ভালো মতোই জানে যে টুঙ্গার আর পুলার মাঝের এই দ্বন্দ্বই ওকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে। যদি যুদ্ধে পরাজয় হয়, তাহলে টুঙ্গারের গর্দান তো যাবেই, সাথে ওরটাও যাবে।
পুলা উঠে দাঁড়ালো। “আমার মনে হয় না আর কিছু আলোচনার বাকি আছে। শুভ রাত্রি।”
তাবুর পর্দাটা তুললো পুলা। বাইরের জ্বলন্ত আগুনের আচমকা উজ্জ্বলতায় আকৃষ্ট হয়ে গুবরে পোকাটা সাই করে উড়ে গেলো সেদিকে। তারপর সোজা আগুনের ভিতর গিয়ে পড়ে, পুড়ে ছাই হয়ে গেলো।
পুলা হাসলো। “দেখেছো? শত্রুদেরকে ধ্বংস করার কিন্তু অনেক উপায় আছে।”
*
পুলা চলে যাওয়ার পরে, ক্রিস্টোফার আগুনের পাশে বসে বসে ভাবতে লাগলো। ও জানে সবচে ভালো হয় জঙ্গলে পালিয়ে গেলে। কিন্তু তাহলে ওর জন্যে সব শেষ হয়ে যাবে। টুঙ্গার লোক পাঠাবে ওকে ধরে আনার জন্যে। তবে ক্রিস্টোফার ওদের হাত থেকে পালাতে পারবে।
কিন্তু তরবারিটার চিন্তা ও ছাড়তে পারছে না। তরবারিটা ওটার নীল পাথরের চোখ দিয়ে যেনো ওর দিকে জ্বলজ্বল করে তাকিয়ে থাকে সারাক্ষণ। ওর উত্তরাধিকারের কথা মনে করিয়ে দেয়। গত কয়েক মাসে কতোবার যে ও টুঙ্গারকে খুন করে তরবারিটা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু টুঙ্গারের শত্রু অনেক, তাই সর্বক্ষণ পাহারা রাখে চারপাশে। এই কয়েক মাসে ক্রিস্টোফার ওকে একটা বারের জন্যেও একা পায়নি বা তরবারিটাকেও টুঙ্গার কখনো চোখের আড়াল করেনি।
আগুনের উল্টোপাশে হট্টগোলের আওয়াজ পাওয়া গেলো। কয়েকজন শশব্যস্ত হয়ে কিছু একটা নিয়ে তর্ক করছে, একটু পরেই তিনজন প্রহরী এক লোককে ধরে নিয়ে এলো ওর কাছে। লোকটার বালি রঙের চুল না দেখলে সে যে বিদেশি সেটা বোঝা যেতো না। ক্রমাগত সূর্যের তাপে পুড়ে ওর গায়ের রঙ স্থানীয়দের মতো গাঢ় হয়ে গিয়েছে। লোকটার গাল ভাঙা, পা দুটো দেখে মনে হচ্ছে দিয়াশলাইয়ের কাঠি। শতছিন্ন জামাটার ভিতর দিয়ে হাড় জিরজিরে বুকটা দেখা যাচ্ছে।
এই লোকগুলো কিভাবে আমাদেরকে দিনের পর দিন আটকে রাখছে? ভিতরে ভিতরে রেগে গেলো ক্রিস্টোফার। ও ইংরেজদের সর্দার লোকটার দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে গেলো। এই লোকটা সমুদ্রে ডুবে মরতে মরতে বেচে ফিরে এসে ওদের সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে দিচ্ছে এখন। যদি দুর্গ দখল হয়, তাহলে লোকটা মরার আগেই তার কাছে থেকে অনেকগুলো প্রশ্নের জবাব জেনে নিতে
“এই ব্যাটা আমাদের এখানে ঢোকার চেষ্টা করছিলো,” প্রহরীদের প্রধান বললো। “এ নাকি আপনার সাথে কথা বলতে চায়।”
“আমার সাথে?” অবাক হলো ক্রিস্টোফার।
“ও নাকি শুনেছে যে আপনি টুপিওয়ালাদের ভাষায় কথা বলতে পারেন।”
ক্রিস্টোফার বন্দীর আপাদমস্তক জরিপ করলো। লোকটা চর নয়তো? একবার ভাবলো আগে একটু মারধোর করে সেটা বের করার চেষ্টা করবে কিনা।
পরে ভাবলো যে লাগলে পরেও তা করা যাবে।
“কি বলবি বল, ইংরেজিতে বললো ও। নইলে শেষ যাকে ধরেছিলাম তার মতো অবস্থা করে ছাড়বো।”
বন্দী হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো। করুন কণ্ঠে কথা বলছে। “ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুক, হুজুর। আমাকে না বললেও চলবে। আমি দেখেছি আপনি কি করেছিলেন। আমি চাইনা আমারো ওরকম হোক। আমি এখানে স্বেচ্ছায় এসেছি। আপনার জন্যে একটা প্রস্তাব নিয়ে।”
“কি প্রস্তাব?”
“আমার নাম হুজুর ইব্দুলী। আমি মিস্টার ফয়-এর হিসাবপত্র দেখতাম। আমি শুনেছি হুজুর, যে আপনাদেরকে দুৰ্গটা খুলে দেবে তাকে নাকি ছেড়ে দেওয়া হবে। আর সাথে অনেক পুরস্কারও দেওয়া হবে।”
“হ্যাঁ,”
“আমি কাজটা করতে পারবো হুজুর। আমি আপনাদের জন্যে দুর্গের দরজা খুলে দেবো।”
লোকটা জুলজুল চোখে ক্রিস্টোফারের দিকে তাকিয়ে রইলো। ক্রিস্টোফার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। একবার ভাবলো এটা কোনো ফাঁদ নয়তো। আবারও মনে হলো যে ব্যাটাকে কিছুটা কড়কে দিয়ে সত্যটা বের করবে কিনা। কিন্তু কথা হচ্ছে দুর্গে এখন লোকজন খুবই কম। তাই দুর্গপ্রধান। নিশ্চয়ই এর মাঝে ফাঁদ পাতার জন্যে তার একটা লোকের জীবনের ঝুঁকি নেবে না। কারণ ওরা জানে যে ধরা পড়লে কি পরিণতি অপেক্ষা করছে।
“কখন পারবি?”
“কাল রাতে হুজুর। কাল আমাবস্যা, ওরা আপনাদেরকে আসতে দেখবে না।” তারপর হাত জোড় করে বললো, “পুরষ্কার তো পাবো, তাই না হুজুর?”
“তোর পাওনা তুই ঠিকমতোই পাবি,” জোর করে হাসি চেপে লোকটাকে আশ্বস্ত করলো ক্রিস্টোফার।
কৃতজ্ঞচিত্তে মাথা ঝাঁকালো ইক্বলী। “আমি তাহলে তাড়াতাড়ি ফিরে যাই, হুজুর। আজ পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব আমার, পরের জন আসার সময় যদি আমাকে পাওয়া না যায় তাহলে ক্যাপ্টেন আমার খবর করে দেবে। শালা একটা হারামজাদা। প্রতিদিন আমাদের অনুশীলন করারতে করাতে অবস্থা কাহিল করিয়ে দেয়। ভাবুন হুজুর, আমি একজন হিসাব রক্ষক, আর আমাকে দিয়ে এইসব করায়,” অপমানিত হওয়ার স্বরে বললো ইল্কলী।
