ফ্রান্সিস কথাটা শুনে অবাক হলো। “মানুষজন এখানে এতোটাই দুর্বলচিত্ত? কোনো ইংরেজ কখনো এধরনের অসম্মানের কাজ করবে না।”
“উঁহু,” টম বললো। ভাতিজার আদর্শবাদিতা দেখে অবাক হয়েছে। “কাপুরুষতা বা স্বার্থবাদিতা থেকে কোনো জাতি-ই মুক্ত নয়। ইংল্যান্ডের পুরনো ইতিহাস ঘেঁটে দেখো, আমাদের কতোগুলো দুর্গ বিশ্বাসঘাতকতা বা প্রতারণার জন্য বেদখল হয়েছে, গুণে শেষ হবে না।”
“আমার ধারণা রানি ঝামেলায় আছে,” অ্যানা বললো। “বর্ষা শেষ হওয়ার আগেই তার এই যুদ্ধ জিততে হবে। কয়েকদিন পরেই আবার ব্যবসার মৌসুম শুরু হবে। সেসময়েও যদি আমাদের সাথে যুদ্ধ চলতে থাকে তাহলে ওনার সওদাগরেরা তাদের কাপড় বা মশলা বিক্রি করার সুযোগ পাবে না। ওরা ওদের ক্ষতির জন্যে রানিকে দোষারোপ করবে, আর রানিও খুব বেশি খাজনা আদায় করতে পারবে না। পুরো রাজ্যেই সংকট সৃষ্টি হবে। রানি খুব ভালোমতোই সেটা জানে।”
টম ওর দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকালো। এই কঠিন সময়েও মেয়েটা ঠাণ্ডা মাথায় ব্যবসার কথা ভাবতে পারছে। ও ফ্রান্সিসের দিকে তাকালো। ছেলেটা সারাক্ষণ অ্যানার পিছনে ঘুরঘুর করে, যখন ওর কাজ থাকে না তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে বসে অ্যানার সাথে গল্প করে। অল্প হলেও, নিজের ভাগের ভাত বাঁচিয়ে অ্যানাকে দেয়। এরকম অবস্থাতেও ফ্রান্সিসের এতো প্রেমের নমুনা দেখে টম অভিভূত বলা যায়।
“বর্ষা শেষ হতে আর দেরি নেই।” টম এর মধ্যেই বাতাসে সেটার পরিবর্তন ধরতে পেরেছে। বাতাসের দিক বদলালেই ঠাণ্ডার একটা আমেজ পাওয়া যায় বাতাসে। কে জানে হয়তো রানি তার কর্মপন্থা বদলাতেও পারে।”
*
সোয়া মাইল দূরেই ক্রিস্টোফার বসে আছে টুঙ্গারের তাঁবুতে। তাঁবুর খোলা পর্দার ভিতর দিয়ে ও দেখতে পাচ্ছে যে নাইন-পাউন্ডের কামানগুলো সার বেঁধে ওগুলোর মাচার উপর নিস্কর্মা পড়ে আছে। দৃশ্যটা দেখে ভিতরে ভিতরে রাগ হলো ওর। এতোদিনে দুৰ্গটাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারতো ওগুলো। সাথে ওটার অধিবাসীরাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো। কিন্তু রানির পাউডার খুবই ফালতু, আর পাথরের গোলার বদলে ওকে ব্যবহার করতে হয় পাথর। সেগুলো শক্ত দেয়ালে লেগে ক্ষতি করার বদলে নিজেরাই চুরচুর হয়ে যায়।
“তোমার কর্মকাণ্ডে রানী খুবই অসন্তুষ্ট,” পুলা বললো। আজ সন্ধ্যায় কোনো খবর না দিয়েই এসে উপস্থিত হয়েছে সে। সাথে রানির পঞ্চাশজন দেহরক্ষী। ক্রিস্টোফারের চরদের দেওয়া তথ্যমতে পুলা নাকি এখন দিন-রাত রানির দরবারে পড়ে থাকে। সম্ভবত সেজন্যেই বসন্তে নতুন কুঁড়ি গজানোর মতো করেই আবার ওর দশ আঙুলে নতুন নতুন স্বর্ণের আংটি চকচক করছে।
যখন সুযোগ পেয়েছিলাম তখন তোর আঙুলগুলো কেটে ফেললেই ভালো হতো, মনে মনে ভাবলো ক্রিস্টোফার। সাথে তোর জিহ্বাও। একটা কাষ্ঠ হাসি হাসলো ও। তারপর অতিথিকে আর এক বাটি তাড়ি ঢেলে দিলো।
“দুর্গতে আরো কয়েক সপ্তাহ আগেই দখল হয়ে যেতো, ঝামেলতো বাধিয়েছে ঐ জাহাজডুবি হওয়া টুপিওয়ালাগুলো,” প্রতিবাদ করলো টুঙ্গার। “ওদের সর্দার যেনো একটা প্রেতাত্না, আস্ত শয়তান লোকটা।”
পুলা তাবুর একটা খুঁটিতে আটকানো নেপচুন তরবারিটার দিকে ইংগিত করলো। কুপির আলোয় ওটার বিশাল নীলাটার একদম গভীর থেকে আভা ছড়াচ্ছে। “যদি তুমি ওর তরবারিটা না নিতে, তাহলে মনে হয় সে আমাদের কথা-ই শুনতো। তার বদলে এখন আমাদেরকেই বাঁশ দিচ্ছে।”
“আপনি আসলে এখানে এসেছেন কেনো?” বেজার কণ্ঠে জানতে চাইলো টুঙ্গার। একটা গুবরে পোকা উড়ে এসে পুলার সামনে রাখা খেজুরের থালার উপর বসলো। শুঁড় নাড়তে নাড়তে ফলগুলোর উপর দিয়ে হাঁটতে লাগলো ওটা।
“বর্ষা প্রায় শেষ। কয়েকদিন পরেই সমুদ্র শান্ত হয়ে যাবে, আর টুপিওয়ালাদের জাহাজও কিন্তু আসতে থাকবে। যদি আমাদের তাঁতী আর কৃষকেরা তাদের মালামাল বিক্রি করার জন্যে কোনো খরিদ্দার না পায়, তাহলে কিন্তু সবাইকে না খেয়ে মরতে হবে।”
“মানে ওরা রানির খাজনা দেবে না,” চাপা স্বরে বললো টুঙ্গার।
“আর এই সৈন্যবাহিনি চালানোর টাকা আসে কোত্থেকে?” পুলা বললো। বলে ও কাশি দিলো একটা। তাড়ির মিষ্টি সুগন্ধ ভেসে এলো শ্বাস থেকে। “আমি আগেই এই যুদ্ধ বাধাতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু তোমরা রানিকে তাল দিয়েছে। যেহেতু তোমাদের কথাই থেকেছে শেষ পর্যন্ত, তার মানে এখন ব্যাপারটা যাতে ভালোয় ভালোয় শেষ হয় সেটা দেখতে হবে। যদি ব্যর্থ হও, তাহলে চিত্তিত্তিঙ্কারার মহলে আবার তোমাদেরকে স্বাগতম জানানো হবে সেরকম ভেবো না। এই অযথা যুদ্ধে রানির পুরো এক বছরের খাজনা নষ্ট হয়েছে।”
“আপনারও ভালোই পয়সা খসেছে বোঝা যাচ্ছে,” ক্রিস্টোফার বললো।
“রানি হচ্ছেন নদীর মতো, দেদারসে পয়সা বিলাতে তার কোনো সমস্যা হয় না,” বললো পুলা। “তুমি বুঝবে না।” তারপর টুঙ্গারের দিকে তাকালো। “দস্যু আর ডাকাতদের সাথে যুদ্ধ বাধালে এরকমই হয়।”
গুবরে পোকাটা তখনও খেজুরের উপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিল। আচমকা টুঙ্গার ওটাকে মারার জন্যে প্রচণ্ড জোরে থাবা দিলো। থালাটা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে সব খেজুর মেঝেতে ছড়িয়ে পড়লো। কিন্তু গুবরেটা ভো ভো করতে করতে অক্ষত অবস্থায় কুপিটার দিকে এগিয়ে গেলো।
