“ভাগ,” চিৎকার করে উঠলো টম। “আমার ধৈর্যের বাধ ভেঙে দিস না।
টুঙ্গার দাঁত বের করে হাসলো। “কসম; আমি ওকে ছোব-ও না।”
তারপর ও ঘুরে চলে গেলো। আলফ উইলসন শেষবারের মতো দুঃখিত চোখে টমের দিকে তাকালো। সৈন্যরা আবার টানতে টানতে নিয়ে গেলো ওকে।
টম উঠোনে নেমে এলো। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। বেশ খানিকটা এগিয়ে যেতেই শুনতে পেলো ফ্রান্সিস বলে উঠছে, “ওরা আলফকে করছেটা কি?”
টম আবার দৌড়ে উঠে এলো দেয়ালের ধারে। শত্রু শিবিরের পিছনেই দেখা গেলো সৈন্যরা আলফের গায়ের কাপড় খুলে ফেলে ওকে একটা পাম গাছের সাথে বাধছে। বাধা শেষ হলে একজন সৈন্য একটা মাটির পাত্রে করে কিছু একটা নিয়ে এলো। তারপর সেই তরলটা আলফের গায়ে মেখে দিলো। সূর্যের আলোয় চকচক করে উঠলো ওর শরীর।
“এ কেমন শয়তানি?” টম অবাক হলো।
“ও ফিরে আসছে,” ফ্রান্সিস বললো। টুঙ্গার আবার ওর ঘোড়ায় চড়ে সৈকত ধরে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। বল্লমের মাথায় সাদা কাপড় বাধা। তবে এবার একা এলো ও।
“কি করেছিস তুই?” প্রচণ্ড রাগে চেঁচিয়ে উঠলো টম। “তুই কসম কাটলি যে তুই ওকে ধরবি না।”
“ধরিওনি। আমিতো শুধু প্রকৃতির হাতে ওকে ছেড়ে দিয়েছি।” ও ঘোড়াটা ঘুরিয়ে বল্লমের মাথাটা দিয়ে আলফ যে গাছে বাধা সেটার দিকে ইংগিত করলো “নারিকেল গাছে থেকে মিষ্টি একটা রস বের হয়। তাড়ি বলি আমরা। এখানকার লোকজনের তো ওটা পেলে হুশ থাকে না। আবার লাল পিপড়া, ভীমরুল এরাও খুব পছন্দ করে জিনিসটা। সকাল বেলা যখন এই রস বের হয়, তখন এসব পোকা হাজারে হাজারে এসে জড় হয় গাছের গায়ে। সূর্য মাথার উপর ওঠার পর ওরা বিদায় নেয়। পিঁপড়ারা গাছ ছেড়ে গাছের নরম শেকড়ে গিয়ে বাসা বাঁধে।” বলে হাসলো ও। “তবে হ্যাঁ, যদি যাওয়ার পথে আরো রসালো কিছু পায়, যেমন-একজন মানুষের নরম তুলতুলে মাংস, তাহলে ওরা তার শরীরেই বাসা বাধবে। আর আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি ওদের কামড় ভীমরুলের কামড়ের চাইতে কোনো অংশে কম না। আর আমি ওর শরীরে মধু লেপে দিয়েছি। সেটার লোভে ভীমরুলও আসবে।
“একটা মাস্কেট নিয়ে এসো, টম ফিসফিসিয়ে বললো ফ্রান্সিসকে। “তাড়াতাড়ি।”
“একজন মানুষের এভাবে মরতে তিন দিন পর্যন্ত লাগে,” টুঙ্গার বললো। দুর্গের বেশিরভাগ লোকই দেয়ালের পাশে এগিয়ে এসেছে শোনার জন্যে। কিন্তু টুঙ্গার এমন ভাব করলো যেনো ওদেরকে দেখেনি। ও আরো গলা চড়ালো।
“তোর লোকদের কথাটা বলে দিস। যে সবার আগে দরজা খুলে দেবে আমি তাকে জমি আর স্বর্ণ দিয়ে ভরিয়ে দেবো। আর বাকিরা সবাই মরবে-কিন্তু এমনভাবে মরবে যে সবাই ভাববে, এর চাইতে আগে মরে গেলেই ভালো ছিলো।”
“তোর এই দশা করবো আমি, আর তুই হাজারবার বেশি চাইবি,” টম ফ্রান্সিসের আনা মাস্কেটটা তাক করলো। টম ওর উদ্দেশ্য ধরতে পেরে দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে, বালি ছিটিয়ে ফিরে গেলো নিজের শিবিরে। টমের গুলি ওর পেছনের পানিতে ঢেউ তুললো।
টম আবার গুলি ছুঁড়ে আলফ উইলসনের দিকে তাক করলো। আলফ এক চুল নড়ছে না। হয় খুব কষে বাঁধা হয়েছে, নয়তো নিজের দুর্ভাগ্য সম্পর্কে এখনো টের পায়নি। তবে টুঙ্গারের অত্যাচারের কৌশলে কোনো ফাঁক নেই। ভারতীয় মাস্কেটের গুলিও এতোদূর পাড়ি দিয়ে আলফের গায়ে লাগতো না।
তাও প্রচণ্ড রাগে টম ট্রিগার টিপলো। আবারও গুলিটা গিয়ে পড়লো সাগরের পানিতে। ঢেউয়ের ফেনার মাঝে ওটা নতুন কোনো আলোড়নই তুলতে পারলো না।
“এখন কি করবো?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো। ওর চেহারা বালির মতো সাদা হয়ে গিয়েছে।
“কিছুই করার নেই,” জবাব দিলো টম।
*
আলফ উইলসন মারা গেলো তিনদিন পর। দুঃস্বপ্নের চাইতেও ভয়ংকর তিনটা দিন-কাটতেই যেনো চাইছিলো না। কেউ কিছু বললো না, দুর্গের কারো সাহস হলো না টমের চোখের দিকে তাকাতে। প্রতিদিন সন্ধ্যায়, যখন বাতাস উল্টো দিকে বইতো, তখন ওদের কানে আলফের আর্ত চিৎকার ভেসে আসতো, টম বেশ কয়েকবার ভেবেছে রাতের বেলা চুপিচুপি গিয়ে আলফকে মুক্ত করে দিয়ে আসবে। কিন্তু টুঙ্গার ওখানে দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করেছে, আর রাতের বেলায় বিশাল অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে রাখতো যাতে চারপাশের সবকিছুই ভালোমতো দেখা যায়। এমনকি আলফ মারা যাওয়ার পরেও ওকে ওভাবেই ফেলে রাখলো। একসময় ওর চেহারা বিকৃত হয়ে আর চেনা গেলো না।
পরের আক্রমণের জন্যে টম অপেক্ষা করে রইলো। যুদ্ধের জন্যে মনটা আঁকুপাঁকু করছে ওর। কারণ শুধু তা হলেই ও টুঙ্গারের উপর আলফকে হত্যা করার প্রতিশোধ নিতে পারবে। কিন্তু সেই সুযোগ আর এলো না। সেই আগের মতোই শুধু কামানের গোলা বিনিময় করেই কেটে যেতে লাগলো দিন। শুধু কামানের আওয়াজেই টের পাওয়া যেতো যে দুই পক্ষই এখনো আছে।
“ওরা আমাদেরকে না খাইয়ে মারার চেষ্টা করছে,” টম মন্তব্য করলো। ও আজ থেকে সকালের খাবার বন্ধ করে দিয়েছে। আর এখন বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি আছে মাত্র আর আধা পিপা। এর মধ্যেই লোকজনের অসন্তুষ্ট ঘ্যানঘ্যান শুনতে পেয়েছে। কয়েকদিন পরেই সবাই মরিয়া হয়ে যাবে।
“ওরা মনোবল হারিয়ে ফেলছে,” হাবিলদার বললো। “আমাদের দেশে কেউ জীবন দিয়ে অবরোধ রক্ষা করে না। কেউ তার মালিকের প্রতি এতোটা বিশ্বস্ত না যে তার জন্যে জীবন দিয়ে দেবে। দুর্গের পতন সবসময় বিশ্বাসঘাতকতার জন্যেই হয়।”
