এখন আর ওখানে কেউ নেই। “আলফকে কোথাও সরিয়েছে নাকি?” ফ্রান্সিসকে জিজ্ঞেস করলো টম। “এখানেই রেখে গিয়েছিলাম ওকে।”
ফ্রান্সিস মাথা নাড়লো। “আমরা যখন এসেছি তখন কেউ ছিলো না এখানে।”
ঠিক সেই মুহূর্তে কুড়েটা বিস্ফোরিত হলো। বৃষ্টির মতো চূর্ণ পাথর ঝরতে লাগলো সৈকতের উপর। এমনকি দুর্গের দেয়ালের গায়েও লেগে খন খন শব্দ হতে লাগলো। ধোয়া কাটতেই টম দেখলো ঘরটা একেবারে মাটির সাথে মিশে গিয়েছে।
“শালারা এখানে অন্তত আর কখনো কামান আনতে পারবে না,” সন্তুষ্টির হাসি হেসে বললো টম।
বিস্ফোরণের পর লড়াইয়ের সর্বশেষ ইচ্ছেটুকুও উবে গেলো আক্রমণকারীদের। দুর্গের পাশ দিয়ে সবাই সেই সরু চড়াটা দিয়ে নিজেদের শিবিরের দিকে দৌড়ে যেতে লাগলো। দরজার কামান থেকে কয়েকটা গোলা তাদের পলায়নের গতিকে বাড়িয়ে দিলো কয়েক গুণ। দুর্গের লোকদের এখনো যুদ্ধ করার খায়েশ মেটেনি।
টম হাতের মাস্কেটটার উপর ভর দিলো। সারা গায়ে ব্যথা করছে ওর। এখন আর ও যুবক নেই। ফ্রান্সিসের দিকে তাকালো ও। চুল উস্কখুস্কু হয়ে আছে, মুখ ধুলো আর ধোয়ায় ভরা, গায়ের জামা ছিঁড়ে একাকার, ঘামে ভিজে সপসপ করছে। টম যেনো নিজের ছেলের কৃতিত্বে গর্ব বোধ করতে লাগলো।
“তোমার আমাকে উদ্ধার করতে আসা উচিত হয়নি,” নিচু স্বরে বললো ও।
“আপনাকে বাঁচাতে আসিনি আমি,” ফ্রান্সিস বললো। “আমি ভেবেছিলাম আপনি মারা গিয়েছেন। আমি এসেছিলাম আপনার কাজটা শেষ করতে।”
টম ফ্রান্সিসের কাঁধের উপর হাত রাখলো। তারপর দুজন মিলে লাশের মিছিল পেরিয়ে দরজার দিকে যেতে লাগলো।
“তুমি খুবই ভালো দেখিয়েছো,” টম বললো। “কিন্তু একটা মাত্র লড়াই জিতেছি আমরা। সন্দেহ নেই খুব দ্রুতই আবার চেষ্টা করবে ওরা। আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। এখন আলফ উইলসন গেলো কোথায়?”
কিন্তু দুর্গের কেউই তাকে দেখেনি। “ও খুব আহত ছিলো,” টম কাতর স্বরে বললো। “কেউ নিশ্চয়ই ওকে নিয়ে এসেছে।”
“আমার কাছে কেউ আনেনি ওকে,” অ্যানা জানালো। ওর পায়ে একটা নোংরা এপ্রন চাপানো। হাত রক্তে লাল হয়ে আছে। ওর নিজের না, যেসব আহতের সেবা করেছে, তাদের। “দুর্গে আনলে তো আমার কাছেই আনতো।”
“তাহলে কোথায়?”
একটা অসুস্থ চিন্তা মাথায় আসতেই টমের পেট মোচড় দিয়ে উঠলো। ও দেয়ালের কাছে দৌড়ে গিয়ে চোখের উপর হাত দিয়ে সামনে তাকালো। সামনের লাশের স্তূপের ভিতর প্রয় বন্ধুর লাশ খুঁজছে। মাছি ভন ভন করছে লাশগুলোর উপর।
“দেখেন,” ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে উঠলো। “ওরা সাদা পতাকা উড়িয়েছে।”
চারজন অশ্বারোহী রক্তস্নাত বালি পেরিয়ে দুর্গের দিকে এগিয়ে এলো। একজন একটা বল্লম উঁচিয়ে রেখেছে। ওটার ডগায় একটা সাদা কাপড় বাধা। ওদের পাশেই আছে টুঙ্গার। ওদের পিছনে দুজন অশ্বারোহী একজন বন্দীকে ছ্যাচড়াতে ছ্যাচড়াতে টেনে নিয়ে আসছে। বন্দীর হাত বাঁধা, সেই দড়ির অপর প্রান্ত ঘোড়ার জিনের সাথে আটকানো। বন্দী সম্ভবত ঘোড়ার সাথে তাল মিলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গিয়েছে।
দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো দলটা। বন্দী হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে বসলো।
“ওটাতো আলফ উইলসন,” আর্তনাদ করে উঠলো ফ্রান্সিস।
“চুপ,” হিসিয়ে উঠলো টম। নিচে টুঙ্গার শুনতে পেয়েছে ফ্রান্সিসের কথা। ও শয়তানি হাসি দিলো একটা।
“এ তোর বন্ধু?” টুঙ্গার জিজ্ঞেস করলো।
“আমার দলের একজন।” টম যতোটা সম্ভব নির্বিকার থাকার চেষ্টা করছে। আশা করছে আলফ বুঝবে কেন ও এরকম নির্মম আচরণ করছে। তবে টুঙ্গার এতে বোকা বলো না।
“আমি একটা প্রস্তাব দিতে এসেছি। আত্মসমর্পণ কর। আমি সব বন্দীকে ছেড়ে দেবো।”
“তারপর? আত্মসমর্পণ করে আমরা কোথায় যাবো?”
“পাশের গ্রামে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। ওখান থেকে ট্রাভাঙ্কোর বা কোচিনের ইংরেজ কুঠিতে চলে যেতে পারবি।”
“রানির মহলে যাওয়ার পর মিস্টার ফয়কে যেভাবে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছিলি, সেরকম তাই না?”
টুঙ্গার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো অনুতপ্ত কণ্ঠে কথা বলার। “রানি এই যুদ্ধের জন্যে খুবই দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এখন উনি শুধু চান শান্তি।”
টম খুব ভালোমতোই জানে কোন ধরনের শান্তি রানি চান। তরবারির মাধ্যমে যে শান্তি আসে সেটা। ও না চাইতেও বারবার টমের চোখ আলফের দিকে চলে গেলো। আলফ মাথা তুলে মাথাটা দুর্বোধ্যভাবে নাড়তে লাগলো। আহত, প্রহৃত এবং বন্দী কিন্তু তবুও ওর চেহারা এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতায় দোদীপ্যমান। আলফ-ও টুঙ্গারের কথার আড়ালের চাতুরিতা জানে। নিজের জন্যে ও কখনোই সবার সর্বনাশের কারণ হতে চায় না।
টম এতো জোরে ওর তরবারির বাট চেপে ধরলো যে চামড়ায় দাগ বসে গেলো। শুধুমাত্র বহু বছর ধরে ওর বাবার কাছ থেকে শেখা অন্যকে সম্মান করার অভ্যাসের কারণে ও এখন এই শান্তি আলোচনা ভঙ্গ করে টুঙ্গারের দিকে গুলি ছুঁড়তে পারলো না।
“আমরা আত্মসমর্পণ করবো না,” টম ঘোষণা দিলো। “আর তুই যদি ওর একটা চুলও ছিড়িস, তাহলে আমি নিজে তোদের শিবিরে এসে তোকে এমন শিক্ষা দেবো যা বাপের জন্মেও কল্পনা করিসনি।”
টুঙ্গার তিক্ত একটা হাসি হাসলো। “আমি কি কল্পনা করতে পারি সে সম্পর্কে তোর কোনো ধারণা নেই। কিন্তু আমার প্রস্তাব না মানলে শীঘ্রই সেটা দেখার সুযোগ পাবি।”
