টম মাথা তুলে সামনের দিকে দৌড় দিলো। পেনরোজও দৌড়ালো পিছনে। আর কেস্ট্রেল-এর বাকিরা আলফের সাথে দাঁড়িয়ে গুলি করতে লাগলো। আবারও ধোয়া ওদেরকে শত্রুদের দৃষ্টির আড়াল করে দিলো। টম সৈকত জুড়ে একেবেকে দৌড়াচ্ছে। আর সামনে যাকে পাচ্ছে তাকেই তরবারির কোপে ধরাশায়ী করছে। ধোয়ার ভিতরেও সামনের ডান থেকে গুলির আওয়াজ অবুসরণ করে আগাচ্ছে ও। ওর বোতলের বিস্ফোরণে ঘরের ভিতরের সবাই তখনও মারা পড়েনি।
ঘরটার পাশে ধোয়ার আবরণ এতই পুরু যে টম আর একটু হলেই সোজা গিয়ে ওটার গায়ে বাড়ি খেতো। ঘরটার পাশ ঘুরে এসে দেখে একটা ওক কাঠের খোলা দরজা। আধা ডজনের মতো রানির সৈন্য ওটার ভিতরে। টম ওদের দুজনকে পিস্তল দিয়ে গুলি করলো। ততীয় একজন মাস্কেট হাতে দৌড়ে এলো। টম একপাশে সরে গিয়ে লোকটার সাথে ধ্বস্তাধস্তি করে হাত থেকে অস্ত্রটা কেড়ে নিয়ে মুগুরের মতো করে লোকটার মাথায় বাড়ি দিলো। লোকটা পড়ে যেতেই, টম মাস্কেটের মাথা ঘুরিয়ে পরের লোকটার গলা বরবর সজোরে ব্যাট চালানোর মতো করে মারলো। ঘাড় ভেঙে পড়ে গেলো সে।
পেনরোজ বাকি দুজনকে সামলালো। টম দরজায় লাথি মেরে ভিতরে ঢুকে গেলো, হাতে উদ্দত তরবারি। এখানেই ওর বোতল বোমাটা কাজ সেরেছে। তিনজন লোক মেঝেতে মরে পড়ে আছে। রক্তে রঙিন হয়ে আছে ঘরের দেয়াল। আর একটা দরজা দেখা গেলো, ওটা দিয়ে ভিতরের আর একটা বড় ঘরে যাওয়া যায়। ওটার ভিতর থেকে গুলি করার, তারপর আবার গুলি ভরার আওয়াজ আসছে।
যদি একটা বোতল নিয়ে আসতো, তাহলে সেটা দিয়েই সব ঠাণ্ডা করে দেওয়া যেতো। কিন্তু ওর সাথে একটা তরবারি আর একটু আগে কেড়ে নেওয়া মাস্কেটটা বাদে আর কিছুই নেই। দুর্গ থেকে গুলির পরিমাণ কমে গিয়েছে। ফ্রান্সিসের লোজন হয় গুলি খেয়েছে, নয়তো গোলাবারুদের ঘাটতি হয়েছে। যদি আক্রমণকারীরা নিজেদেরকে এখানে নিরাপদে রেখে আবার জড়ো হতে। পারে, তাহলে আর কয়েক মিনিটেই দুর্গের পতন হবে।
ঘরের ভিতর এতো লোক গাদাগাদি করে আছে সেটা টম চিন্তাও করেনি। কয়েকজন গুলি করছে, বাকিরা গুলি ভরে দিচ্ছে। কয়েকজন পাউডার আর গুলি এনে দিচ্ছে। প্রায় অসম্ভব একটা কাজ, কিন্তু আর উপায় নেই। ও পেনরোজের দিকে মাথা ঝাঁকালো।
ওরা দুজন ঘরের ভিতর ঝাঁপিয়ে পড়লো, এতো দ্রুত এগিয়ে গেলো যে কেউ মাস্কেট তাক করার সময়টাও পেলো না। টম হাতের তরবারিটা দিয়ে সাই সাই করে কোপাতে লাগলো, আর পেনরোজের চালাচ্ছে আলফ উইলসনের কুড়ালটা। এই ছোট জায়গায় এটাই ভয়ানক হয়ে দেখা দিলো। একটু পর দেখা গেলো ওগুলোও ব্যবহার করার দরকার পড়ছে না। ঘরের ভিতর ধ্বস্তাধস্তি করার মতো জায়গা ছাড়া আর জায়গা নেই।
এই যুদ্ধে ওদের জেতার কোনো সম্ভাবনাই নেই। ধাক্কা খেয়ে পিছিয়ে পড়লো টম। পেনরোজ পেটে ছুরি খেয়ে লুটিয়ে পড়লো। সৈন্যদের পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে গেলো মুহূর্তেই। টম ওকে ধরতে গেলো কিন্তু সামনেই আগাতে পারলো না।
টম আর এক পা পেছাতেই পিঠ ঠেকে গেলো পাথরের দেয়ালে। ফাঁদে আটকা পশুর মতো অবস্থা ওর এখন। রানির সৈন্যরা একটা অর্ধবৃত্ত করে ঘিরে দাঁড়ালো ওকে। ওদের সর্দার হচ্ছে কালো পাগড়ি পরা বিশাল বপুর একটা লোক। সে সামনে বাড়লো। তারপর নিজের কমলা কোমরবন্ধ থেকে একটা লম্বা নলের পিস্তল বের করে টমের চেহারা বরাবর তাক করলো।
গুলির আওয়াজ পেতেই টম বাঁকা হয়ে গেলো, তবে চোখ খোলাই ছিলো ওর। পিস্তলের ঘোড়া জায়গা ছেড়ে নড়েনি, কিন্তু দেখা গেলো ক্যাপ্টেনের চেহারাটা একটা রক্তের মুখোশে ঢেকে গিয়েছে।
ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে আছে দরজায়, দুই হাতে দুটো পিস্তল। দুই পাশে দুর্গের দুটো লোক বেয়োনেট বসানো মাস্কেট উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হতভম্ব সৈন্যগুলো কিছু করার আগেই ফ্রান্সিসের লোকেরা আক্রমণ করে বসলো। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে টম ওদেরকে যেভাবে ছুরি চালনা শিখিয়েছে সেটা নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করে দেখালো ওরা। সৈন্যরা এতো বেশি হতবাক হয়ে গিয়েছিলো যে বলতে গেলে কোনো প্রতিরোধই করলো না। জানালা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওরা ভবন ছেড়ে পালাতে লাগলো, তাড়াহুড়ায় অস্ত্র নিতেও মনে থাকলো না।
“আমি তোমাকে আসতে নিষেধ করেছিলাম,” টম বললো ফ্রান্সিসকে। “তবে এসেছে বলে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। এখন ঝটপট কাজ শেষ করতে হবে। আমরা এখনো নিরাপদ না।”
রানির লোকেরা ঘরটাকে লম্বা সময় ধরে ব্যবহারের জন্যে প্রস্তুত করেছে। পিছনেই টম আর ফ্রান্সিস পাউডারের পিপার একটা ভাণ্ডার খুঁজে পেলো।
“এখানে যা আছে তা তো মাস্কেটের জন্যে অনেক বেশি,” টম বললো। “ওরা নিশ্চয়ই এখানে কামানও নিয়ে আসার চিন্তা করছিলো। এখন ওদের অস্ত্রকে ওদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করবো।”
ওরা পিপাগুলোকে ঘরের মাঝখানে জড়ো করে একটা ন্যাকড়া খুঁজে দিলো ভিতরে। দুর্গের পূর্ব প্রান্তে তখনও গুলির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু একদিকে, মানে উত্তর দিকে রানির লোকেরা যুদ্ধ ছেড়ে পালিয়েছে। টম পাউডারে আগুন ধরাতেই সবাই বাইরের দিকে দৌড়ে গেলো। ছোট নালাটায় নেমে এসে টম বালিতে ছাপ দেখে বুঝতে পারলো একটু আগে ওরা কোথায় লুকিয়ে ছিলো। আলফ উইলসন যেখানে পড়েছিলো সেখানে রক্তে ভরে আছে।
