“দড়ি বেয়ে।”
“আবার উঠবো কিভাবে তাহলে?”
“সেটা ওঠার সময় কিছু একটা ব্যবস্থা করে নেবো আমি।”
“আমি মানে? আমরা না?”
“না,” টম বললো। “তুমি দেয়ালের উপর থেকে গুলি ছুঁড়ে আমাকে নামার সুযোগ করে দেবে।”
ফ্রান্সিসের চেহারা কালো হয়ে গেলো। প্রতিবাদে কিছু একটা বলতে গেলো ও। “সময় নেই এখন। যদি আমার কিছু হয়, সবাই তোমার দিকে চেয়ে থাকবে।” এক মুহূর্তের জন্যে টমের আর একটা দুর্গে আর একটা। অবরোধের কথা মনে পড়ে গেলো। এই সমুদ্রেরই অপর পাড়ে। সেবার একটা বিস্ফোরণের আঘাতে টমের বাবার পা উড়ে যায়, তখন টম দায়িত্ব নিয়েছিলো আক্রমণের।
ও ঈশ্বর, আমার ভাগ্যটা যেনো সেরকম না হয়, প্রার্থনা করলো টম।
ওরা দড়ি এনে দেয়ালের গায়ের আঙটাগুলোয় বেঁধে দিলো। টম ওর বুকের বেল্টে দুটো পিস্তল আটকে নিলো, আরও দুটো নিলো কোমরের বেল্টে। কাঁধে ঝোলালো একটা মাস্কেট। আর একটা বস্তায় ভরে নিলো আধা ডজন ওয়াইনের বোতলের বোমা।
“তোমার লোকদের ডাকো,” ফ্রান্সিসকে বললো টম। “এখনি।”
সবাই একসাথে গুলি করলো। এতো জোরে শব্দ হলো যে কানে তালা লেগে গেলো টমের। ঝলসানিতে চোখেও দেখলো না এক মুহূর্ত। গুলির চাইতে যে ধোয়াটা বের হলো সেটা বেশি কাজে দিলো ওর। দেয়ালের এপাশটা ঘোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ায় খোলা দেয়ালের উপর দাঁড়িয়ে থাকার গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকুতে নিরাপদেই থাকলো ওরা। তারপর দড়ি ধরে দিলো লাফ।
টম যাদেরকে বেছে নিয়েছে তারা সবাই কেস্ট্রেল-এর নাবিক। এরা ঘুমন্ত অবস্থায় একটা জাহাজ জ্বালিয়ে দিতে পারে। এতে দ্রুত ওরা দড়ি বেয়ে নেমে এলো যে আক্রমণকারীরা টেরও পেলো না। টম বালিতে নামেই দেরি না করে একটা গড়ান দিয়ে পায়ের উপর উঠে এলো। মাথার উপর ঠা ঠা শব্দ গর্জে উঠলো মাস্কেট। ফ্রান্সিসের লোকেরা আবারও গুলি করেছে, আক্রমণকারীরা যাতে মাখা তুলতে না পারে।
টম তরবারি বের করে ঘরটার দিকে দৌড় দিলো। আলফ উইলসন আছে ওর পাশে। হাতে একটা কুড়াল। একজন সিপাহীর পরশু-র বাট কেটে ছোট করে নিজেই বানিয়েছে এটা। আচমকা আক্রমণে দিশেহারা হয়ে রানির সৈন্যদল পিছু হটলো।
তবে কুড়েটার ভিতরের আততায়ীরাও জবাব দিতে লাগলো সমানে। এই দাঙ্গার মাঝেও টম খেয়াল করলো ওটার জানালা থেকে ধোয়া বেরুচ্ছে। গুলি নিজেদের লোকের গায়ে লাগবে কিনা সেই পরোয়া করছে না। টমের সামনে এক লম্বা ভারতীয় সৈনিক পড়ে গেলো। মাস্কেটের গুলিতে তার মাথার পিছন দিকটা উড়ে গিয়েছে। তবে সব গুলিই কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো না, টমের সাথের একজনের বাহুতে গুলি লাগলো; আর একজন চোখের মাঝে গুলি খেয়ে উল্টে পড়লো।
ওদের সামনে সৈকতটা একটা সরু নালায় গিয়ে মিশেছে। দুর্গ আর নালার মাঝ দিয়ে গিয়েছে সেটা। বাতাস বালি উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ওদিক দিয়ে। টম নালায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর লোকদেরকেও একই কাজ করতে ইশারা দিলো। ওরা যদি মাটির কাছাকাছি থাকতে পারে, তাহলে যারা দাঁড়িয়ে আছে তারাই ওদের জন্যে আড়াল হয়ে দাঁড়াবে। মাস্কেটের গুলি রানির সৈন্যদের গায়েই লাগবে। আর তাছাড়া ফ্রান্সিসের লোকগুলোও একটু পর পর গুলি করছে, ফলে শত্রুরাও মাথা বের করার সুযোগ পাচ্ছে না।
টম বস্তা থেকে তিনটা ওয়াইনের বোতল বের করলো। একজন নাবিকের দিকে ইশারা করলো ও। লোকটার বাড়ি কর্নিশ, নাম পেনরোজ। “এই তিনটা ফাটার সাথে সাথে তুমি আমার পিছু পিছু আসবে। আর আলফ তুমি গুলি করতে থাকো।” টম আলফকে নিজের দুটো পিস্তল ধরিয়ে দিলো। “প্রস্তুত?”
টম একসাথেই বোতলগুলোর ন্যাকড়ায় আগুন ধরালো। লকলকে শিখায় জ্যান্ত হয়ে উঠলো যেনো ওগুলো। যতোটা সম্ভব মাথা নিচু রেখেই দুটো বোতল বাড়িটার দিকে ছুঁড়ে দিলো। একটা বেশিদূর গেলো না, বালিতেই পড়ে নিভে গেলো। দ্বিতীয়টা বাড়িটার দেয়ালে লেগে চূর্ণ হয়ে গেলো। টম গালাগাল : করতে লাগলো। আর উপায় নেই; ঝুঁকিটা ওকে নিতেই হবে।
আলফ খেয়াল করলো টম কি করতে চাচ্ছে। সম্মতি সূচক মাথা নেড়ে ও নিজের মাস্কেট উঁচু করে গুলি করলো। ঠিক সেই মুহূর্তে টম নালাটা থেকে মাথা উঁচু করে সবচে কাছের জানালাটার দিকে ঝুঁকে সজোরে বোতলটা ছুঁড়ে দিলো।
বোতলটা খোলা জানালা দিয়ে উড়ে গেলো। ছুঁড়ে মেরেই নালায় মাথা ডুবিয়ে ফেলার কারণে টম দেখতে পেলো না ব্যাপারটা। কিন্তু চাপা বিস্ফোরণের আওয়াজে টের পেলো যে ওর নিশানা ব্যর্থ হয়নি। একদম নিখুঁত লক্ষ্যভেদ যাকে বলে। মেঝেতে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে বিস্ফোরিত হলো বোতলটা। ওটার ভিতরের প্রাণঘাতী জিনিসগুলো ছড়িয়ে পড়লো ছোট্ট ঘরটায়।
ভারী কিছু একটা আঘাত করলো টমের কাঁধে। প্রথমে ও ভেবেছিলো যে বোধহয় গুলি লেগেছে। তবে সেটা আসলে আলফ উইলসন। মাথা নিচু করতে ও টমের চাইতে সেকেন্ডের ভগ্নাংশ পরিমাণ সময় বেশি নিয়ে ফেলেছে। তাতেই সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেলো। টমের উপর ঢলে পড়লো ও। কলার বোনের ঠিক উপরের একটা ক্ষত দিয়ে গলগল করে বের হচ্ছে রক্ত।
ওকে ধরার মতো সময় নেই টমের হাতে। রানির লোকজন এর মধ্যেই আবার জড়ো হতে শুরু করেছে। ও আলফের জামার হাতাটা কেটে, বুলেটের ক্ষতটার ভিতর ঢুকিয়ে দিলো যাতে অন্তত রক্তপাত বন্ধ হয়। আপাতত এর বেশি সম্ভব না। ওরা এখানে বেশিক্ষণ লুকিয়ে থাকতে পারবে না। যদি একবার এখানে আটকে যায়, তাহলে মৃত্যু সুনিশ্চিত।
