টম গুলি করবে ভাবলো কিন্তু ধোয়ার কারণে টুঙ্গারের চেহারা ঢাকা পড়ে গেলো। এদিকে ঝামেলা বাধলো আর একটা। এতে প্রশিক্ষণের পরেও ফ্রান্সিসের লোকজন দ্রুত গোলা ভরাটা আয়ত্বে আনতে পারেনি। রানির লোকজন প্রায় দেয়ালের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। আর যতোই কাছে আসছে, ততোই কামানের গোলা ছোঁড়ার ক্ষেত্র কমে যাচ্ছে। সৈন্যরা দরজার দিকে আর না আগালেও, দেয়ালের দুই দিকে পানির স্রোতের মতো করে ছড়িয়ে গেলো। এর মধ্যে অনেকেই বাঁশের বানানো লম্বা মই নিয়ে এসেছে।
“কামানের সাথেই থাকো,” ফ্রান্সিসকে ডাকলো ও। যদিও এতো বড় কামানটা দেওয়ালের গায়ে সেঁটে থাকা সৈন্যদের কিছু করতে পারবে না, কিন্তু তারপরেও ওটার কারণে অন্যেরা এদিকে আসতে কিছুটা হলেও ভাববে।
আক্রমণকারী সৈন্যদল দুর্গের তিনদিকের দেয়ালের পাশে জড়ো হলো। কামানের নল রাখার ফাঁকা জায়গাটায় একটা বাশের মই দেখে গেলো। টম এগিয়ে গিয়ে, না দেখেই নিচের দিকে গুলি ছুঁড়ে মইটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। মইটা আছড়ে পড়তেই আর্তনাদ শোনা গেলো। তার পরপরেই টম আর ওর লোকেরা দেয়ালের আড়াল থেকে বেরিয়ে নিচে গুলি ছুঁড়তে আরম্ভ করলো।
টম গুলি ছোড়া মাস্কেটটা একজন ছেলেকে ধরিয়ে দিয়ে, নতুন একটা তুলে নিলো। কিন্তু গুলি করতে দাঁড়াতেই, একযোগে অনেকগুলো গুলি ছুটে এলো ওর দিকে। দেয়ালের পাথরে গর্ত খুড়ে ওর কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেলো গুলিগুলো। সাথে সাথে মাথা নিচু করে ফেললো ও।
“এতো সহজে হাল ছাড়বে না এরা, বিড়বিড় করে বললো টম। যেনো ওর কথা প্রমাণ করতেই, আরো একটা মই দেখা গেলো আর এক পাশে। এবার অবশ্য টম আক্রমণকারীদের উঠতে দিলো। একটা খালি মাথা দেখা গেলো; দুটো কালো হাত দেয়ালের কিনার আঁকড়ে ধরলো। কিন্তু লোকটা নিজেকে টেনে তোলার আগেই, ওর গলা ধরে মই থেকে টেনে তুলে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে লাগলো টম। নিচ থেকে ছুটে আসা মাস্কেটের গুলি লোকটার শরীরে লাগতেই সে ছটফট করে উঠলো, তবু টম ছাড়লো না। এই ফাঁকে টমের লোকজন মাথা তুলে নিচের সবার দিকে গুলি করা শুরু করলো।
টম ছিন্নভিন্ন লাশটাকে ফেলে দিলো নিচে। আরো একটা সৈন্য মই বেয়ে ওঠার চেষ্টা করলো কিন্তু একটা ছেলে একটা বল্লম হাতে ছুটে এসে তার হৃৎপিণ্ড এফোঁড় ওফোঁড় করে দিলো। টম মইটা ধাক্কা দিলো কিন্তু নাড়াতে পারলো না। নিচের লোকেরা মইটাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে রেখেছে।
দুর্গের ছাদের দেয়ালের এপাশে, অস্ত্রপাতি আর গোলাবারুদের পাশেই এক ডজন ওয়াইনের বোতল দেখা গেলো। ওগুলো খালি করে ভিতরে পাউডার, তারকাটা আর ভাঙা ধাতুর টুকরো ভরা। আর একটা ন্যাকড়া স্পিরিটে ভিজিয়ে মুখে মধ্য ঠেসে ভরে রাখা হয়েছে।
টম ওর খালি পিস্তলটা একটা বোতলের পাশে ধরে ট্রিগার টিপলো। চকমকি পাথরের ঘষায় ফুলকি সৃষ্টি হয়ে ন্যাকড়াটার উপর পড়তেই আগুন ধরে গেলো। দেয়ালের পাশ দিয়ে বোতলটা ঢিল মারলো ও। মইয়ের গোড়ায় পড়ে বিস্ফোরিত হলো সেটা। যারা মইয়ের গোড়ায় ধরে ছিলো তাদের সবার শরীর মোরব্বা হয়ে গেলো। কারো কারো চোখ, কান, আঙুল উড়ে গেলো। মইটাও পড়ে গেলো সাথে সাথে।
আক্রমণকারীরা দেয়াল থেকে সরে গেলো। ফলে টমের লোকদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলো এবার। ওরা বিরতিহীন ভাবে গুলি ছুঁড়ে গেলো। সৈন্যদের দিকে। ফলে আরো খানিকটা পিছিয়ে কামানের গোলার আওতায় চলে এলো তারা।
টম চারপাশে তাকালো। দুর্গের উপরে ভেসে থাকা ধোয়ার মেঘের ভিতর দিয়ে ও দক্ষিণ দিকের দেয়াল হাবিলদারের দলটাকে দেখতে পেলো। ওরাও ভালোই প্রতিরোধ করছে। কিন্তু উত্তর দেয়ালে দেখা গেলো আলফ উইলসন মরিয়া হয়ে সাহায্যের জন্যে চিৎকার করছে।
মাথা নিচু করে টম দৌড়ে গেলো সেদিকে। আলফকে কিছু বলতে হলো না, টম পৌঁছাতেই বিপদটা দেখতে পেলো। দুর্গ থেকে গজ বিশেক দূরেই একটা পাথরের কুঁড়েঘর আছে। আর ওটার জানালা থেকে অবিরাম মাস্কেটের গুলি এসে দুর্গের দেয়ালকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।
“ওদেরকে ওখান থেকে বের করতে হবে,” টম চিৎকার করে বললো। “ওরা যদি ঐ বাড়িটার দখল রাখতে পারে, তাহলে ওঁত পেতে থাকার জন্যে দারুণ একটা জায়গা পেয়ে যাবে।” ভারতীয় মাস্কেটগুলোর মান ও পাল্লা ভালো হওয়ায়, অবরোধকারীরা ওখান থেকে সহজেই দেয়ালের এদিকে গুলি চালাতে পারছে। এদিক দিয়ে মই তুলতে তাই ওদের কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে না।
এই আশংকাই করছিলো টম। ওর লোকেরা সংখ্যায় এতো কম যে, কোথাও বেশি সৈন্য লাগলে অন্য কাউকে যে ডাকবে সেই উপায় নাই।
ও চিৎকার করে উঠোনে দাঁড়ানো ফ্রান্সিসের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। ফ্রান্সিস তাকাতেই চার আঙুল তুলে দেখালো। মানে চারজন লোকসহ ফ্রান্সিসকে এদিকে আসতে ইংগিত করছে। তাতেও অবশ্য একটা কামান চালানোর জন্যে যথেষ্ট লোক দরজার কাছে থাকবে। আশা করছে এতেই আক্রমণকারীরা দরজার দিকে আগাতে দুইবার ভাববে।
ফ্রান্সিস আর ওর লোকেরা দুর্গের উপর উঠে এসে টমের পাশে হাঁটু মুড়ে বসলো। দেয়ালের গায়ে মাস্কেটের গুলি লেগে সাই সাই করে ছিটকে যাচ্ছে একেক দিকে। টম ব্যাখ্যা করলো যে কি কি লাগবে।
“কিন্তু নামবো কিভাবে?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো।
