গোলন্দাজ বাহিনির পিছু পিছু রানির সৈন্যদলও আগাতে শুরু করেছে। নরম বালিতে একটা পরিখা খুড়ছে ওরা। টম দরজায় করা ছিদ্র দিয়ে ওদেরকে দেখতে লাগলো। ওদের সর্দারের প্রতি বিশেষ নজর ওর। কোনো সন্দেহ নেই লোকটা টুঙ্গার, টেলিস্কোপে ওর চেহারাটা এতো কাছে চলে এলো যে টমের মনে হলো হাত দিয়ে ওর মাথার কাটা দাগটা স্পর্শ করতে পারবে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে ও লোকদের নির্দেশ দিচ্ছে। ব্যালকনি থেকে পড়েও মরেনি সে। তবে আহত হয়েছে ভালোই। আর এখনো কোমরে নেপচুন তরবারিটা দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে পাশে দাঁড়ানো লম্বা লোকটার সাথে পরামর্শ করছে সে। এই লোকটা তার অদ্ভুত ইস্পাতের চাবুকটা দিয়ে হিকসকে খুন করেছে। একদম নিখুঁত উচ্চারণে ইংরেজি বলে। একজন ইংরেজ কিভাবে রানির দলে জুটলো সেটা ভেবে পেলো না টম। সম্ভবত বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।
গুলি করার জন্যে টমের হাত নিশপিশ করছিলো। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাস্কেটগুলো খুব বেশি ভালো মানের না। একদম খুব হিসেব নিকেশ করে মারতে না পারলে সেটা শুধু পাউডারের অপচয়ই হবে।
টুঙ্গারের পিছনে দেখা গেলো সৈন্যদল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পড়ছে।
“ওরা পূর্ণ শক্তিতে আক্রমণ করবে,” টম ঘোষণা দিলো। ও নিজের লোকদের জরিপ করলো একবার। ওরাও উঠোনে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রোদে ঝলসে লাল হয়ে আছে চেহারা, ঠিকমতো খেতে না পেয়ে শুকিয়ে আমসি। এদেরকে মোটেও যোদ্ধার মতো লাগছে না। আর সংখ্যায়ও এরা কতো কম।
“সবাই মাথা নিচু করে রাখবে। গুলি যেনো না লাগে।” টম ভেবেছিলো যে বলবে, “নিজদের জীবন বৃথা যেতে দিও না,” কিন্তু ভেবে দেখলো এটা আসলে একটা ফালতু কথা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এই বাতিল কুঠির জন্যে জীবন দেওয়ার কোনো মানে নেই। ওরা লড়াই করছে নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্যে।
“আমরা সবাই নিজেদের রক্ষার জন্যে লড়বো, আর সবাই মিলে এই দুর্যোগ পাড়ি দেবোই।”
টম সবাইকে জায়গামতো দাঁড় করিয়ে দিলো। নিজে দাঁড়ালো পূর্ব দিকের দেয়ালে, শক্রদলের মুখোমুখি; হাবিলদার আর আলফ উইলসন দাঁড়ালো উত্তর আর দক্ষিণে।
“তুমি উঠোনে থেকে দরজার কামানটা চালাও,” ফ্রান্সিসকে বললো ও। শুনে হতাশ হলো ফ্রান্সিস।
“চাচা, আপনি যদি আমাকে রক্ষা করার চেষ্টা করে থাকেন…”
“আমি আমাদের সবাইকে রক্ষা করার চেষ্টা করছি। তোমার দলটা হচ্ছে আমাদের শেষ ভরসা।” খেদোক্তি করলো টম। কণ্ঠে দুশ্চিন্তা আর প্রশংসা দুটোই আছে। এই বয়সে ও নিজেও কি এরকম ছিলো না? “তুমিও যুদ্ধ করার সুযোগ পাবে, নিশ্চিত থাকতে পারো।”
শত্রুর কামানগুলো চুপচাপ হয়ে আছে। তবে সৈন্যরা সবাই আড়ালে চলে গিয়েছে। টম ছিদ্র দিয়ে খেয়াল করলো, রানির লোকেরা ওদের কামানের নিচে চলে এসেছে। এতো কাছে যে ওরা চাইলেও কামানের নল এতো বেশি বাঁকা করতে পারবে না। নিজেদেরকে নিরাপদ ভেবে ওরা সামনে বাড়লো। বালির চড়াটার উপর দিয়ে দৌড়ে আসছে।
“তাড়াতাড়ি কামানের কাছে গিয়ে গোলা ছুঁড়তে থাকো,” ফ্রান্সিসকে বললো
আক্রমণকারীরা দরজায় বসানো কামানের ছিদ্রগুলো খেয়াল করেনি প্রথমে। যখন ওগুলোর ঢাকনা তুলে দুটো নাইন পাউন্ডারের লম্বা নল বেরিয়ে এলোতখন বুঝতে পারলো।
“ফায়ার, চেঁচিয়ে উঠলো ফ্রান্সিস।
এরকম পরিস্থিতির জন্যে প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছিলো টম অ্যানা পুরনো চালের বস্তা সেলাই করে ছোট ছোট ব্যাগ বানিয়ে দিয়েছিলো। আর ছেলেরা সেগুলোতে মাস্কেটের গুলি ভরে টোপলা বানিয়ে রেখেছিলো। কামান থেকে ছোঁড়ার কারণে ব্যাগগুলো ছিঁড়ে একসাথে গুলিগুলো ছুটে গেলো। সৈকতের সামনের সারির লোকগুলো পড়ে গেলো সাথে সাথে। দ্বিতীয় সারির লোকেরা টের পেলেও পিছনের লোকের চাপের কারণে সরতে না পেরে লাশের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো। ফলে আক্রমণের বেগ কমে গেলো অনেকটাই।
“রি-লোড,” ফ্রান্সিস আদেশ দিলো। তবে বলার কোনো প্রয়োজন ছিলো না। এতোদিনের যন্ত্রণা আর অপেক্ষার অবসান হয়েছে আজ। এতোদিনের প্রশিক্ষণ, হাতে ফোস্কা ফেলে তপ্ত কামানের গোলা দেগে অনুশীলন-সবকিছু প্রমাণের আজই সুযোগ। ওয়ার্ম এন্ড স্পঞ্জ, র্যাম দ্য কান্ট্রিজ। হোম! ওয়েডিং। শট। প্রিক দ্য কারররট্রিজ অ্যান্ড প্রাইম দ্য হোল। নিশানা করার দরকার হচ্ছে না কারণ লক্ষ্যবস্তু আকারে বিশাল আর ওদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে।
“ফায়ার।”
দ্বিতীয়বার আগের চাইতেও বেশি ক্ষতি হলো। সৈন্যরা সবাই ছড়িয়ে পড়েছিলো। ফলে মাস্কেটের একটা গুলিও অপচয় হলো না। ছুটোছুটির মাঝে কয়েকজন সৈন্য গুলির আওতা থেকে সরে যেতে পাশের পানিতে নেমে পড়লো। তবে তাতেও কাজ হলো না। ওদের রক্তে পানির রঙ লাল হয়ে গেলো। কয়েকজন মরলো ওদের উপর পড়া লাশের চাপে পানিতে ডুবে।
কিন্তু তবুও ওদের আসা থামলো না। দেয়ালের উপর থেকে টম দেখতে পেলো টুঙ্গার ঘোড়ার উপর বসে আছে। চেহারা সেই লম্বা শিরস্ত্রাণে ঢাকা। নেপচুন তরবারিটা দুর্গের দিকে নিশানা করে সৈন্যদেরকে আক্রমণ করতে উৎসাহ দিচ্ছে ও। একজন সৈন্য আতংকিত হয়ে পালাতে গেলো। টুঙ্গার ঘোড়ার পিঠে বসেই নিচু হয়ে এক কোপে লোকটার কাঁধ থেকে নিতম্ব পর্যন্ত ফেড়ে ফেললো। তারপর ঘোড়া দিয়ে মাড়ালো। খুবই স্বাভাবিক যে সৈন্যরা ওর মুখোমুখি হওয়ার চাইতে দুর্গের কামানের সামনে বুক পেতে দিতেই বেশি আগ্রহী।
