সবাই পিছিয়ে দাঁড়াতেই হাবিলদার ওর হাতের আগুনটা টাচ হোলে স্পর্শ করালো। মুহূর্ত পরেই কামান গর্জে উঠলো আর আর ধাক্কায় নিচের কাঠের কাঠামোসহ ঝাঁকি দিয়ে উঠলো কামানটা। ধোঁয়ার ভিতরেই টম দেখলো যে গোলাটা শত্রুদের কামানের উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে সৈকতের বালি টপকে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা একদল পদাতিক বাহিনির মাঝে গিয়ে পড়লো। ওরা কামানের গোলন্দাজদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসছিলো। সৈন্যগুলো গোলার আঘাতে পুতুলের মতো উড়ে গেলো একেক দিকে, কয়েকজনের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো দেহ থেকে। একটা বালিয়াড়ির ভিতর অর্ধেক ঢুকে গিয়ে অবশেষে গোলাটা থামলো। পানির স্পর্শ পেয়ে হিসহিসিয়ে বাষ্প উঠতে লাগলো ওটা থেকে।
একটু পরেই সন্তুষ্ট চিত্তে টম দেখতে পেলো রানির সৈন্যদল কামানগুলোকে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে যাওয়ার জন্যে আবার তাদের বলদের দল নিয়ে ফিরে যাচ্ছে।
৬. অবরোধের মুখোমুখি
টম এর আগে কখনোই কোনো অবরোধের মুখোমুখি হয়নি-মানে ভিতর থেকে না। সমুদ্রের কোনো লড়াইয়ে বা ওঁত পেতে থেকে আক্রমণ করা লাগলে, ও ভালোই পারতো; কিন্তু এক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু অপেক্ষা করতে করতে ওর সমস্ত সহ্য শক্তি শেষ হয়ে যেতে লাগলো। মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেলো। সারাহ থাকলে হয়তো ওকে শান্ত করতে পারতো। কিন্তু ও এখন অনেক দূরে, আর এই ভাবনাটা ওকে আরো রাগিয়ে দিচ্ছে।
এ কেমন পুরুষ আমি? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলো ও। কমপক্ষে এক হাজার শক্তিশালী লোকের একটা সৈন্যদল ঘিরে রেখেছে ওকে, প্রতিটা দিনের প্রতিটা মুহূর্তে ও জানে যে এরা ওকে খুন করার জন্যে অপেক্ষা করছে। কিন্তু ওর মধ্যে কোনো ভয় বা রাগ কাজ করছে না; ওর চরম মাত্রায় একঘেয়ে লাগছে।
প্রতিদিন ওরা কামান থেকে কয়েকটা এলোমেলো গোলা ছোড়ে, টম-রাও জবাবে ছোড়ে কয়েকটা। কিন্তু কোনোটাতেই খুব বেশি কিছু হয় না। রানির লোকেরা অবশ্য এরকম বিলম্বে কোনো সমস্যা বোধ করছিলো না। কিন্তু কয়েকদিন পরেই দেখা গেলো টম ঐ পক্ষের আক্রমণের জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। এই অচলাবস্থা ভাঙার জন্যে ও যে কোনো কিছুতেই রাজি।
তবে ও শুধু অলস বসে থাকলো না। নিজের লোকেদের মাঝেও একই রকম অবসন্নতা লক্ষ্য করে ও দ্রুত ব্যবস্থা নিলো। কারণ, জানে এখনি কিছু না করলে ঝামেলা হবে পরে। ও বৃষ্টির পানি ধরার জন্যে চৌবাচ্চা খুড়তে লাগিয়ে দিলো সবাইকে, ফয়-এর ভেঙে ফেলা বাড়ি থেকে আনা তক্তা আর পাটের দড়ি দিয়ে ওটার পাশে বেঁধে দিলো। সাগরের দিক থেকে আক্রমণ আসার কোনো সম্ভাবনা নেই দেখে, ও সাগরের দিকে তাক করিয়ে রাখে একটা কামান এনে উঠোনে বসিয়ে সবাইকে অনুশীলন করাতে লাগলো। ধীরে ধীরে সবাই কামানের নল পরিষ্কার করে আবার গোলা ভরে মাত্র দুই মিনিটেই গোলা ছুঁড়তে পারদর্শি হয়ে উঠলো। সেইদিন রাতে, যে দলগুলো বানিয়ে দিয়েছিলো তাদের মধ্যকার একাত্বতা দেখে টম খুশি হলো খুব। এরা একসাথে খায়, একসাথে পাহারাদারি করে, ফাঁকে ফাঁকে গল্পগুজব, হাসি ঠাট্টা এসব তো আছেই। কামানের গোলা ছোঁড়ায় টম ওদেরকে একে অন্যের প্রতিপক্ষ বানিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু দেখা গেলো যে দলটাই ভালো করুক না কেনো, ওরা একজনের সাফল্যে অন্যজন উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।
আমার হাতে যদি শুধু এরকম একশো লোক থাকতো, তাহলেই আমি রানির শিবির আক্রমণ করে সব কয়টাকে মহল পর্যন্ত তাড়িয়ে দিয়ে আসতাম, মনে মনে ভাবলো টম। ‘
প্রথম সপ্তাহগুলোতে ওদের সবচেয়ে বড় ঝামেলা ছিলো হচ্ছে আবহাওয়া। দিনের পর দিন সমুদ্র থেকে ঝড় ধেয়ে আসতো। আর এই ভোলা দুর্গে সেগুলো আটকানোর কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। লোকজন সবাই দেয়ালের আড়ালে গাদাগাদি করে বসে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ঠকঠক করে কাঁপতো। রানির লোকজন যদি এই অবস্থায় আক্রমণ করতো, তাহলে দুর্গ দখল করতে ওদের একটা গুলিও খরচ করতে হতো না। কয়েকদিন পর ঝড় চলে গেলেও, অব্যাহতভাবে বৃষ্টি ঝরতে লাগলো। টমের ধারণার চাইতেও বেশিদিন বৃষ্টিপাত চলতেই থাকলো। অবশেষ যখন মেঘ কেটে গিয়ে সূর্য উঁকি দিলো, তখন টম দীর্ঘদিন কারা ভোগের পর মুক্তি পাওয়া মানুষের মতো সাগ্রহে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো।
কিন্তু ওরা হাফ ছাড়ার সময় পেলো না। জামাকাপড় আর পাউডার শুকোতে না শুকোতেই ওরা টের পেলো যে বৃষ্টির চাইতে সূর্য ওদের বড় শত্রু। দিনের মধ্যভাগে দুৰ্গটা একটা গনগনে উনুন হয়ে থাকতো। সবাই একফোঁটা ছায়ার খোঁজে উত্তপ্ত পাথরের গায়ে ঠেসে থাকতেও দ্বিধা করতো না। যে চৌবাচ্চাগুলোতে কয়েকদিন আগেও পানি উপচে পড়ছিলো, এখন সেগুলো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো।
শুকনো মৌসুম অবরোধকারীদেরকেও তাতিয়ে দিলো। কাছের গোডাউনটা জ্বালিয়ে দিলো ওরা। তারপর ইটগুলো দিয়ে নিজেদের কামানের জন্যে অবলম্বন বানালো। টম ওদেরকে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু ওরা ওদের কামানগুলো এনেছিলো রাতের বেলো, আর সকালের মধ্যেই কামানগুলো বসিয়ে এমন গোলাবর্ষণ আরম্ভ করলো যে টম-রা মাথা তোলারও সুযোগ পেলো না।
“ওরা আমাদেরকে আক্রমণ করতে চায়,” ফ্রান্সিসকে বললো টম। অবরোধ শুরু হয়েছে ছয় সপ্তাহ হয়ে গিয়েছে। সবগুলো মাস্কেটে গুলি ভরে প্রস্তুত করে রাখো।”
