বাকি চারজন অশ্বারোহী লাগাম টেনে থেমে দাঁড়িয়ে ঘোড়ার মুখ আবার ফ্রান্সিস আর ওর সিপাহীদের দিকে ফেরালো। ঠিক সেই মুহূর্তে ফ্রান্সিসের পাশের সিপাহীটা ঠিকমতো তাক না করেই দ্বিতীয় মাস্কেটটা থেকে গুলি ছুড়লো। গুলিটা সোজা একজন অশ্বারোহীর নাকের উপর গিয়ে লাগলো। সৈন্যটা দুদিকে হাত ছড়িয়ে উল্টো হয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে পিছলে পড়ে গেলো। তবে পা তখনও জিনের ফিতেয় আটকে আছে। ঘোড়াটা ভয় পেয়ে সৈকত ধরে দিলো ছুট। আর সৈন্যটার মাথা সৈকত জুড়ে ছিটিয়ে থাকা পাথরে ধুপধাপ বাড়ি খেতে লাগলো।
ফ্রান্সিস মাস্কেটের নলের সামনের দিকটায় বেয়নেট বসিয়ে প্যাঁচ মেরে আটকে দিলো। তিনজনকে কাবু করা গিয়েছে, কিন্তু এখনো তিনজন বহাল তবিয়তেই আছে। ওদের মধ্যে একজনকে দেখা গেলো পিস্তলে গুলি ভরছে।
তবে কি ভেবে সে গুলি করার বদলে আবার পিস্তলটা কোমরে খুঁজে সঙ্গীদেরকে কিছু একটা বললো। তারপর তিনজনই একসাথে ঘোড়া ছুটিয়ে, নদী পার হয়ে জঙ্গলের ভিতরে হারিয়ে গেলো।
ওরা পুরোপুরি উধাও হয়ে গেলে, তার পরে ফ্রান্সিস ঘুরে তাকালো। দুর্গের দরজা তখনও খোলা, আর মাস্কেট হাতে প্রায় এক ডজন লোক দৌড়ে আসছে ওদের দিকে। টম আছে সবার সামনে। ওরা যখন দেখলো যে ফ্রান্সিস আর বাকিরা নিরাপদ তখন আনন্দে চিৎকার করে উঠলো। টম এতোক্ষণ ফ্রান্সিস আর বাকিদের গায়ে লাগার ভয়ে বাকিদেরকে গুলি করার অনুমতি দিতে পারছিলো না। বাকিদের নিশানায় বিশ্বাস করে না ও।
টম ফ্রান্সিসের কাছে দৌড়ে গিয়ে এমনভাবে জড়িয়ে ধরলো যেন ও টমের নিজের সন্তান। “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে তুমি ঠিক আছে।”
লড়াইয়ের উত্তেজনা কমে আসতেই ফ্রান্সিসের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। টম টের পেলো ফ্রান্সিসের হাত কাঁপছে। ও ওকে শক্ত করে ধরে রইলো।
“দারুণ দেখিয়েছে, বাকি লোকগুলো যাতে শুনতে না পায় এমনভাবে বললো টম। “কতো অভিজ্ঞ লোকও এই অবস্থায় পড়লে, দিশেহারা হয়ে, উল্টোপাল্টা করে শেষে মারা পড়তো।”
ফ্রান্সিস পড়ে থাকা পিপাগুলো দেখালো। “অর্ধেকের বেশি পানি পড়ে গিয়েছে।”
“তাতে কিছুই হয়নি। চাইলেই আবার ভরে নেওয়া যাবে। কিন্তু তোমাকে হারালে পেতাম কই?”
“থ্রি চিয়ার্স ফর ইংল্যান্ড, ফ্রান্সিস বললো। “থ্রি চিয়ার্স ফর রেড, হোয়াইট অ্যান্ড ব্লম। হিপ হিপ-”।
কিন্তু উল্লাস ধ্বনিটা ওদের মুখেই আটকে রইলো। কারণ নদীর অপর পাড়ে আবার অশ্বারোহীরা আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু একটু আগে যেখানে ছিলো তিনজন, এখন সেখানে এসেছে প্রায় একশো জন। দুলকি চালে লম্বা একটা সারি করে জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে আসছে।
“দুর্গে যাও সবাই,” চেঁচিয়ে উঠলো টম। “এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না।
পিপাগুলোকে ফেলে রেখেই ওরা দরজার দিকে দৌড় দিলো। রানির অশ্বারোহী দল নদী পার হয়ে চলে এলো এপারে। তবে দুর্গের কামানের আওতায় আসার অনেক আগেই ঘোড়ার লাগাম টেনে থামিয়ে দিলো। যদি ওরা জানতো যে ভিতরে আসলেই কতো জন আছে, তাহলে হয়তো ঝুঁকিটা নিতো। কিন্তু এই মুহূর্তে ওরা কিছুই জানে না।
টম দরজার কাছে পৌঁছে এক এক করে সবাইকে ভিতরে ঢুকিয়ে সবার শেষে নিজে ভিতরে ঢুকলো। ফ্রান্সিস ওর পাশে দাঁড়িয়ে সবাইকে তাড়া দিতে লাগলো। সবাই ভেতরে ঢোকার পর কোটনীরাও ঢুকে গেলো ভিতরে। আলফ উইলসন দড়াম করে দরজাটা লাগিয়ে হুড়কো টেনে দিলো।
শত্রুর সেনাদল একটা বেষ্টনী রচনা করে ছড়িয়ে পড়লো। দুর্গের চারপাশে বেরিয়ে যাওয়ার সবগুলো পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। কয়েকজন সৈন্য গোডাউন আর গোলাঘরে ঢুকে নানা মূল্যবান মালামাল হাতে বেরিয়ে এলো। দুর্গের ভিতরের সবাই নিষ্ফল আক্রোশে চেয়ে চেয়ে দেখলো শুধু।
দিন শেষে পদাতিক বাহিনি এসে উপস্থিত হলো। সাথে একদল ষড়। প্রত্যেকে কেস্ট্রেল থেকে উদ্ধার করা একটা করে কামান টেনে নিয়ে আসছে। আরো কয়েকটা কামান আছে। কিন্তু ওগুলো খুবই পল্কা। লোহার চাকার উপর বাঁশের নল বসানো।
“ওগুলো আমাদের চাইতে ওদের গোলন্দাজদেরই সমস্যা করবে বেশি, টম মন্তব্য করলো। রানির লোকেরা সবাই জায়গামতো বসাচ্ছে কামানগুলো। ওর নিজের কামান, আর নেপচুন তরবারিটা শত্রুর হাতে পড়ায় মনে মনে ভাগ্যকে শাপ শাপান্ত করলো কিছুক্ষণ। “ওদের হাতে যদি শুধু আমাদের কামানগুলো না থাকতো, তাহলে পরের বর্ষা পর্যন্ত অবরোধে থাকলেও সমস্যা হতো না।”
“ওদের কাছে কিন্তু আপনার পাউডার নেই,” পাশ থেকে অ্যানা বললো।
“ওদের নিজেদেরই আছে।”
“ভারতীয় গানপাউডার আসলে ইংরেজদেরটার মতো অতো ভালো না। আপনার কামানের পাল্লা অনেক বেশি হবে।”
“ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, ম্যাডাম। এরকম টানটান পরিস্থিতিতে আসলে তোমার মতো মেয়েমানুষই দরকার।” বলে টম হাবিলদারকে ডাকলো।
“মিস দুয়ার্তের বিশ্বাস যে ওদের কামানের চাইতে আমাদের কামানের গোলা বেশি দূর যাবে। আমাদের লোকদেরকে সেটা একটু দেখে নিতে বলেন।”
হাবিলদার স্যালুট দিয়ে ওর লোকদের ভাকলো। ওদের কর্মচাঞ্চল্য দেখে সন্তুষ্টির হাসি ফুটলো টমের মুখে। এদের কাজে দক্ষতার অভাব থাকলেও আগ্রহের ঘাটতি নেই। পাক্কা দশ মিনিট লাগলো ওদের একটা কামানে গোলা ভরতে; সেন্টারাস বা কেস্ট্রেল-এর লোজন হলে দুই মিনিটেই একটা গোলা ছুঁড়তে পারতো।
