*
নদীর ধারে ফ্রান্সিস শক্ত মুখ করে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় ও এতো বেশি নিষ্ঠুরতা দেখেছে যা ওর কল্পনারও বাইরে; আর ক্ষুধা তৃষ্ণার কথা বাদই দেওয়া হলো। কিন্তু ও বুঝতে পারছিলো যে সাথের লোকগুলো ওকে খেয়াল করছে। ওর নেতৃত্বের উপর ভরসা করছে। ও জানে যে খুব বেশি কিছু ও করেনি, তবে এদের ভরসার প্রতিদান দিতে চায় খুব ভালোভাবেই। নিজেও বাকিদের সাথে হাঁটু পানিতে নেমে, ঝড়ে উড়ে আসা কাঠ আর গাছের পাতা সরিয়ে, এই স্রোতের মাঝেও পিপাগুলো শক্ত করে ধরে রাখতে সাহায্য করতে লাগলো। এটা সেটা বলে সবাইকে বিপজ্জনক পরিস্থিতিটা ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করলো। সবার নাম শিখে নিলো ও। খেয়াল করলো যে নাম ধরে ডাকলেই ওদের চোখমুখ কেমন উজ্জ্বল হয় উঠছে।
ওরা এরমধ্যেই একবার পিপাগুলো দুর্গের ভিতরে রেখে এসেছে। এখন এসেছে আরো এক সেট নিয়ে। হঠাৎ একজন লোক পানির দিকে কিছু একটা দেখালো। একটা গাছের গুঁড়ি ওদের দিকে ভেসে আসছে।
“ওটা কি?”
ফ্রান্সিস আতংকিত চোখে চেয়ে রইলো। ওটা কোনো গুঁড়ি না, একটা ভেলা। তিনটা লম্বা তক্তা সমান্তরাল রেখে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তক্তাগুলো কোনো রশি দিয়ে বাঁধা হয়নি। ওগুলোকে জোড়া দেওয়া হয়েছে একটা উলঙ্গ মানব শরীর দিয়ে। দেহটা অনেকটা ক্রুশবিদ্ধ করার মতো গজাল দিয়ে তক্তাগুলোর সাথে গেঁথে দেওয়া হয়েছে।
“এটাতো মিস্টার ফয়,” একজন আর্তনাদ করে উঠলো। লোকটা এখানকার হিসাবরক্ষক। নাম ইল্কলী।
এটা মিস্টার ফয় না বলে, এটা একসময় মিস্টার ফয় ছিলো বলা ভালো, মনে মনে ভাবলো ফ্রান্সিস। ফয়ের শরীরে নৃশংস অত্যাচারের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। মুখ হাঁ করে আছে; দেখে মনে হচ্ছে একটা গর্ত যেনো। ঘাতকেরা ওর জিহ্বা কেটে বুকের সাথে গজাল দিয়ে গেঁথে দিয়েছ।
“ওনার কথা বলার ভঙ্গিটা ওরা পছন্দ করতো না,” ইল্কলী বললো।
ভেলাটা ভেসে চলে গেলো–সর্বোচ্চ এক হাত দূর দিয়ে। কিন্তু কেউই সেটা ধরার চেষ্টা করলো না। স্রোত ওটাকে ভাসিয়ে নিয়ে একটা বাঁক ঘুরে মোহনার কাছে একটা বালুর চড়ায় গিয়ে ঠেকালো।
“আমাদের ওনাকে কবর দেওয়া উচিত,” একজন সিপাহী বললো।
ফান্সিস জোর করে দৃশ্যটা মন থেকে সরিয়ে দিলো। নিজেকে সামলাতে হবে ওর। “বাদ দিন,” নির্বিকারভাবে বললো ও। “যদি সময় পাই তো পরে দেবো নাহয়। আপাতত যারা জ্যান্ত আছে তাদেরকে নিয়ে ভাবতে হবে।”
কেউ ও রকথার প্রতিবাদ করলো না। সবাই ভালো করেই জানে যে এই দুরবস্থার জন্যে শুধু মাত্র ফয়-ই দায়ী। তার জন্যেই ওদের জীবন এখন সুতার উপর ঝুলে আছে।
“সবগুলো পিপা ভরেছে?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো। লোকেরা সম্মতি জানাতেই ওরা দুর্গের দিকে ফিরে যাওয়ার জন্যে রওনা দিলো।
দুটো কাঠের দণ্ডের উপর পিপা বসিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। দুইজনে একটা করে নেওয়ার পরেও নিতে কষ্ট হচ্ছে। পা ভার হয়ে আসতে লাগলো, কাঁধ ব্যথা করতে লাগলো। তবে ওরা থামলো না। বাচ্চা ছেলে দুটো একটা ছোট পিপা নিয়ে আসছে। তবে ওরা আনছে বালির উপর গড়িয়ে গড়িয়ে! দেখে ফ্রান্সিসের গ্রামে বাচ্চাদেরকে চাকা বানিয়ে লাঠি দিয়ে ঠেলে নেওয়া খেলার কথা মনে পড়লো।
আচমকা মাস্কেটের গুলির আওয়াজ আশেপাশের গুমোট নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিলো। একজনের হাত থেকে দণ্ডের মাথা ছুটে গেলো। ঝাঁকিতে পিপার ছিপি খুলে পানি পড়তে লাগলো। ফ্রান্সিস একবার দুর্গের দিকে তাকালো, তারপর জঙ্গলের ধারে, কিন্তু কিছুই চোখে পড়লো না।
“তাড়াতাড়ি,” তাড়া দিলো ও। ও দ্রুত করতে চাচ্ছিলো, কিন্তু পিপার ওজন এতো বেশি যে সম্ভব হচ্ছিলো না। আর বালিতে ওদের পা ডেবে যাচ্ছিলো, ঘামে ভিজে যাওয়ার কারণে হাতগুলোও পিচ্ছিল হয়ে আছে।
ফ্রান্সিস পায়ের নিচে মাটিতে কাপুনি অনুভব করতে পারলো। মাথা তুলে দেখে দুর্গের দরজা খুলে যাচ্ছে। কেউ একজন দরজার ঠিক ওপরে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে চিৎকার করে কিছু একটা বলছে। টম নাকি?
ঠিক সেই মুহূর্তে গোডাউনের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এলো ছয়জন অশ্বারোহী। ফ্রান্সিস আর সাথের লোকগুলোকে দেখতে পেয়েই ওরা ছুরি বের করে আক্রমণ করতে এগিয়ে এলো।
কাঁধ থেকে পিপা ফেলে পালাতে উদ্যত হলো সবাই। ওদের মহামূল্যবান পানি যে তাতে বালিতে মিশে যেতে লাগলো সেদিকে খেয়াল নেই।
“একসাথে থাকো সবাই,” ফ্রান্সিস চিৎকার করে ডাকলো সবাইকে। ও জানে যে একবার সবাই ছড়িয়ে পড়লে ওদেরকে পশুর মতো ধাওয়া করে মারা হবে। “আমার পাশে।”
দুটো বিশাল পিপা পাশাপাশি পড়ে আছে। ফ্রান্সিস সবাইকে ওটার পিছনে জড় করলো। ওদের কাছে মাস্কেট আছে পাঁচটা, কিন্তু মাত্র দুটোয় গুলি ভরা।
“ওগুলো আমাকে দাও,” বলে ও প্রায় ছিনিয়ে নিলো অস্ত্র দুটো। একটা নিজে নিয়ে আর একটা পাশের সিপাহীকে দিলো। অন্যগুলোতে গুলি ভরার সময় নেই এখন। “বেয়োনেট লাগিয়ে নাও,” আদেশ দিল ও।
অশ্বারোহীরা বিপজ্জনক গতিতে এগিয়ে এলো ওদের দিকে। ফ্রান্সিস সবার সামনের ঘোড়াটার বুক বরাবর নিশানা করে গুলি করলো। ওটা এতো কাছে এসে পড়েছে যে ফ্রান্সিস ওটার নাকের ফুটো পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিলো। নিরীহ প্রাণীটার জন্যে খানিকটা খারাপ লাগলো ওর। কিন্তু তাতে ওর নিশানা নড়লো না। গুলিটা হৃৎপিণ্ড বরাবর গলা দিয়ে ঢুকে গেলো। আশাপাশে বালির মেঘ উড়িয়ে সামনের পা দুটো বাকিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো ওটা। ওটার আরোহী চেঁচিয়ে উঠলো, কারণ ঘোড়ার নিচে একটা পা চাপা পড়ে ওর টিবিয়া আর ফিবুলা হাড় দুটো একসাথে ভেঙে গিয়েছে। পিছনের অশ্বারোহীরা দিক বদলে সরে গেলো। কিন্তু একজন ঠিক এটার পিছনেই ছিলো। সে সরতে পারলো না। তার পরিণতিও এর মতোই হলো।
