ইশ, যদি শুধু ওগুলো চালানোর মতো লোকবল থাকতো, টম ভাবলো। তবে নিজের দুশ্চিন্তা অন্যদের সামনে প্রকাশ করলো না। কারণ এমনিতেই ওর সাথে যারা আছে তাদের অবস্থা সঙ্গিন, আরও খারাপ করতে চায় না। ভাগ্যের ফেরে আজ ওকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠি রক্ষার জন্যে লড়তে হচ্ছে।
সবাই টমের দিকে তাকিয়ে আছে। টম বুঝলো ওরা ওর বক্তব্য শোনার জন্যে অপেক্ষা করছে। ওদের ওর বক্তব্য শোনাটা দরকার।
যে লোকগুলো নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তাদেরকে আর কি বলা যায়? কি বললে এরা সান্ত্বনা পাবে?
টম একটা পাথরে উঠে দাঁড়ালো।
“আমি জানি আপনারা এখানে লড়াই করার জন্যে আসেননি,” ও বলা শুরু করলো। কিন্তু শত্রুরা ধেয়ে আসছে, তাই হাত পা গুটিয়ে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের দেয়ালগুলো সুরক্ষিত, অস্ত্রপাতি বা গোলাবারুদের কোনো ঘাটতি নেই। সবচে বড় কথা আমরা এখনো বেঁচে আছি। সবাই মিলে যুদ্ধ করবো আমরা, আর আমরাই আমাদেরকে বাঁচাবো। ঐ রানিকে এমন শিক্ষা দেবো যে আজীবন আমাদের সাথে লাগতে আসার জন্যে আফসোস করবে। বিনা উস্কানিতে কাপুরুষের মতো সে আমাদেরকে আক্রমণ করেছিলো। তার এই বিশ্বাসঘাতকতার উপযুক্ত বদলা আমরা নিয়েই ছাড়বো।”
উপস্থিত সবাই হর্ষ ধ্বনি করে উঠলো। এরকম পরিস্থিতিতে এইটুকুই বেশি। অন্তত লড়াই করার আগেই ওরা পরাজয় মেনে নেয়নি।
*
টম সবাইকে কয়েকটা দলে ভাগ করলো। সব দলেই বুড়ো, বাচ্চা, নাবিক আর সিপাহীদেরকে রাখলো। এক দলের নেতৃত্বে থাকলো আলফ উইলসন, আর একটার দায়িত্বে ফ্রান্সিস, তৃতীয় দলটার দায়িত্বে থাকলে সুবলদারটা।
টমের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিলো পানি নিয়ে। যেখানে যতো পিপা, জগ, মগ বা বালতি পাও সব নিয়ে এসো। তারপর নদী থেকে সেগুলোয় পানি ভরে আনো,” ফ্রান্সিসকে নির্দেশ দিলো ও। “অস্ত্রপাতির চাইতে খাবার আর পানির অভাবেই বেশিরভাগ অবরোধ ভেস্তে গিয়েছে।” আর একটা দলে গেলো ভাড়ার ঘর থেকে চাল আর লবণ দেওয়া মাছের বস্তাগুলো আনতে।
টম বাকিদেরকে পাঠালো নিরাপত্তা জোরদার করার কাজে। ওরা সদর দরজার নিচের দিকে কামানের নল ঢোকানো যাবে এমন বড় করে কেটে নিলো। লোকগুলোর মধ্যে একজন ছিলো কাঠমিস্ত্রি। সে কাটা খোপটায় এমনভাবে ঢাকনা লাগিয়ে দিলো যে বাইরে থেকে বোঝার উপায় রইলো না আর। সব শেষে কামানগুলোর উপর তেরপল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো যাতে করে বৃষ্টির পানি না লাগে।
কাজ শেষ হলে টম গভর্নরের বাড়িসহ, ভিতরের যতো বাড়িতে তালপাতার ছাউনি ছিলো সেগুলো খুলে ফেলার আদেশ দিলো। শুকনো অবস্থায় ওগুলোতে যে কোনো সময় আগুন ধরে যেতে পারে।
টম দেয়ালের উপর উঠে দুৰ্গটা পরীক্ষা করে, কোনদিক দিয়ে কামান দাগলে বা আক্রমণ করলে ভালো হবে সেগুলো দেখে নিলো। ঘরের ছাউনি খুলে নেওয়ার পরে দুর্গের মাঝের জায়গাটা একটা ফাঁকা খোল-এর মতো হয়ে গেলো। বাতাসে ভেসে এসে বালি জমতে লাগলো সেখানে। যেনো সৈকত আবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে এই জায়গাটার দখল বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
বহুবারের মতো আবারও টম কোম্পানিকে তাদের অসাবধানতার জন্যে গালাগাল শুরু করলো-এই সবই ওদের অযথা ঔদ্ধত্যের বহিঃপ্রকাশ। যেনো এই উপমহাদেশে একচেটিয়া ব্যবসা করার মাধ্যমে এখানকার সব কিছুর উপরেও কর্তৃত্ববান হয়ে গিয়েছে। গোডাউনগুলো দুর্গের একদমই কাছে। ফলে অবরোধকারীরা চাইলেই ওখানে কামানের ঘাঁটি বানাতে পারবে। আরো খারাপ হচ্ছে, উত্তর দিকের দেয়ালের আড়ালে একটা কুঁড়ে আছে, একজন আততায়ী খুব সহজেই ওখানে লুকিয়ে থাকতে পারবে। লোক পাঠিয়ে ওটাকে ভেঙে ফেলতে হবে।
জঙ্গলের ধারে নাড়াচাড়া চোখে এলো ওর। রানির অশ্বারোহী বাহিনির এক ডজন সদস্যু ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে এলো জঙ্গল থেকে। পুরো সৈকতটা জুড়ে পানি ছিটাতে ছিটাতে এগিয়ে এলো ওরা। দুর্গের সামনে থেকে দুইশো গজ মতো সামনে এসে দাঁড়ালো। একজন একটা কাসার টেলিস্কোপ বের করে দুৰ্গটা পর্যবেক্ষণ করলো।
“একটা মাস্কেট আনো দেখি,” টম ডাক দিলো। ছেলেটা ত্রস্ত পায়ে দৌড়ে এনে দিলো অস্ত্রটা। গুলি ভরা আছে দেখে সন্তুষ্ট হলো টম। সবচেয়ে কাছের অশ্বারোহীর দিকে তাক করে গুলি করলো ও।
টম জানতো যে ওরা নাগালের বাইরে। গুলিটা লোকগুলোর কয়েক কদম সামনে সৈকতের বালি খুবলে নিলো। ঘোড়াগুলো ভয়ে পিছিয়ে গেলো কয়েক পা। একটাতো সামনের দুই পা এতো বেশি তুলে দিলো যে আরোহী একটু হলে পড়েই যেতো। বাকিরাও পিছিয়ে গেলো।
টম মাস্কেটটা নামিয়ে নিলো। ওদের গায়ে গুলি লাগবে সেটা আশা করেনি। শুধু ওদেরকে একটা বার্তা দিতে চেয়েছিলো যে লড়াই না করে ওরা ক্ষান্ত দেবে না। যে ছেলেটা মাস্কেটটা এনেছিলো ওকে আবার সেটা ছুঁড়ে দিলো টম।
“গুলি ভরে রেখো। তাড়াতাড়িই আবার ওটা লাগবে আমাদের।”
দুজন অশ্বারোহী ফিরে গেলে আবার। সন্দেহ নেই পিছনে যে সৈন্যদল আসছে ওদেরকে সতর্ক করতে গিয়েছে। বাকিরা অলস ভঙ্গিতে সৈকতে চক্কর দিতে লাগলো। তবে ভুলেও মাস্কেটের আয়ত্বের মধ্যে আসলো না।
“লোকজন সব ভিতরে এসেছে?”
“পানি আনতে যারা গিয়েছিলো তারা বাদে।”
“ফ্রান্সিস।” টম দৌড়ে গেলো নদীর ধারের দেয়ালটার কাছে। ফ্রান্সিস আর ওর সাথের লোকেরা নদী থেকে ফিরছে কেবল। কাঁধের পিপার ওজনের কারণে কুঁজো হয়ে আছে। গোডাউনের আড়ালে থাকার কারণে ওরা রানির সৈন্যদেরকে দেখতে পায়নি।
