“আমাদের ক্যাপটেন মিস্টার উইলসন আসার আগ পর্যন্ত এখানে অপেক্ষা করা উচিত,” প্রতিবাদ করলো সে।
“আপনার শক্তপোক্ত লোকগুলোকে রেখে যান এখানে,” অ্যানা বললো। “যদি ঈশ্বরের কৃপায় ফ্রান্সিস আর টম ফিরে আসে, তাহলে ওদের কাজে আসবে। তবে টম এসে যদি শোনে যে সারাহ এভাবে সম্পূর্ণ অচেনা লোকজনের সাথে চলে গিয়েছে, তাহলে পছন্দ করবে না।” বলে ও নিচু গলায় বললো, “আমি মিসেস ফয় আর মিস্টার কাইফেনকে বিশ্বাস করি না। অন্তত যদি আপনি আর কেস্ট্রেল-এর কেউ নৌকায় থাকেন, তাহলে ওদেরকে রক্ষা করতে পারবেন।”
“মিসেস কোর্টনীকে এখানেই রেখে দিলে ভালো হয় না?”
“উনি সুস্থ্য হয়ে উঠছেন। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে সেটা আসলে-”
ওর কথা থেমে গেলো। কারণ লিডিয়া ফয় এর তাড়ায় নৌকার লোকজন এর মধ্যেই পাল তুলে দিয়েছে।
“যান, সাবধানে থাকবেন। আর সারাহের দিকে খেয়াল রাখবেন।”
হেল মাথা ঝাঁকালো। “উনি আমাদের মালকিনের মতে, মিস।” এরা। সবাই দীর্ঘদিন ধরে কোর্টনীদের হয়ে কাজ করছে। অনেকেতো টমের প্রথম সমুদ্রযাত্রা মানে সেই শেরপা জাহজেও ছিলো। নিজের মায়ের চাইতে সারাহকে ভালো চেনে। যখন ওদের ক্ষতস্থানে মলম লাগানোর প্রয়োজন হতো, যখন ডাঙায় থাকা ওদের বৌবাচ্চার কোনো সমস্যা হতো বা টাকা পয়সার দরকার হয়েছে-সারাহ সবসময় পাশে থেকেছে। ওরা সারাহকে ভালোবাসে, এমনকি জীবন দিতেও পিছপা হবে না। এইতো মাত্র কয়েক সপ্তাহ হয়েছে অ্যানা কোর্টনীদের সাথে কাটিয়েছে, তাতেই ওর নিজেরও এরকম মনে হচ্ছে।
“তুমি আসবে না?” অ্যাগনেস জানতে চাইলো।
অ্যানা মাথা নাড়লো। “ফ্রান্সিসের জন্যে অপেক্ষা করবো।”
“থাকুক ও,” মিসেস ফয় বললো। “বোকা মেয়েটা যদি নিজের ভালো না বোঝে তো আমাদের কিছুই করার নেই।”
নৌকাটা ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে এগিয়ে গেলো। তীরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে নানান দুশ্চিন্তা পাক খেয়ে উঠতে লাগলো অ্যানার ভিতরে। আবার যাতে সবাইকে নিরাপদে দেখতে পায় সেজন্যে প্রার্থনা করতে লাগলো মনে মনে।
জঙ্গলের ধারে নাড়াচাড়ার আভাস পাওয়া গেলো। রানির লোকজন কি চলে এসেছে নাকি?
আলফ উইলসন আর লোকেরা বেরিয়ে এলো জঙ্গল থেকে। কাদা মেখে ভূত হয়ে আছে সবাই; ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে। প্রথম দর্শনে অ্যানা ওদেরকে চিনতেই পারলো না।
“টম বা ফ্রান্সিসের কোনো চিহ্নই নেই,” বললো উইলসন। “যতোর সাহসে কুলিয়েছে গিয়েছিলাম আমরা।”
“অনেক করেছেন।”
“তার মানে কিন্তু এই না যে ওরা বেঁচে নেই।”
“জানি। ধন্যবাদ।”
আলফ উইলসন সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে শিষ দিয়ে উঠলো। পরিস্থিতি ধরতে পেরেছে ও।
“আমরা তাহলে থেকে যাবো বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, না?”
আলফের হাসিমুখে মেনে নেওয়াটা আজকের এই ভয়াল দিনটায় কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিলো অ্যানার মনে। আবারও ওর কোর্টনীদের প্রতি মুগ্ধতা বাড়লো, এতোগুলো বিশ্বস্ত লোক সবসময় ওদের সাথে থাকে।
“আমার মনে হয় আমাদেরকে এখানে বহুক্ষণই থাকতে হবে।”
“তাহলে মেহমানদারির জন্যে প্রস্তুতি নিয়ে ফেললে ভালো হবে।”
*
হট্টগোলের শব্দ শুনে অ্যানা আর আলফ দৌড়ে এলো কি হয়েছে শুনতে। অ্যানা গভর্নরের বাড়িতে শুয়ে ছিল; আলফ-ও একটু গড়িয়ে নিচ্ছিলো। উঠে দেখে নজর রাখতে রেখছিলো যাদেরকে তারা কেউ জায়গায় নেই। ক্ষেপে বোম হয়ে দরজার কাছে এসে দেখে টম আর ফ্রান্সিস। টম ততোক্ষণে বুড়ো দুজনের কাছ থেকে সব শুনে নিয়েছে।
“এটা যদি সেই শেরপা হতো তাহলে আমি এদের চামড়া তুলে নিতাম,” রাগে গরগর করতে করতে বললো আলফ।
“বাদ দাও,” টম বললো। ভিতরে ঢুকে, অবস্থা দেখে প্রথমে ও নিজেও ক্ষেপে গিয়েছিলো। কিন্তু যখন সবিস্তারে দেখলো সব, তখন বুঝলো যে এদেরকে আসলে বকাবকি করে লাভ নেই। জ্যেষ্ঠরা এদেরকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। দায়িত্বে অবহেলাটা এমনিতেই এসেছে তাই। এখন যদি ও চায় ওদেরকে নিয়ে ঐ ভয়ানক শত্রুদের বিরুদ্ধে এই দুর্গ রক্ষা করবে, তাহলে অবশ্যই এদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ পরিমাণ আত্মবিশ্বাস আগে ওকে ফিরিয়ে আনতে হবে।
টম প্রায় টানা এক দিন আর রাত ঘুমায়নি; মহলের ভিতর আর জঙ্গলেও মরণপণ লড়াই করেছে, আর এসে কিনা দেখে যে সারাহ নেই। ও যদি একটা নৌকাও পেতো-একটা ছোট ডিঙ্গিও যদি হতো তাহলে তখনই বেরিয়ে পড়তো। প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা হচ্ছে ওর। একটু বিশ্রাম, গরম খাবারের জন্যে জন্যে শরীর টানছে, কিন্তু মনটা পড়ে আছে সারাহের কাছে।
টম জোর করে ভাবনাগুলো সরিয়ে দুর্গের উঠোনে সবাইকে জড়ো করলো। গুটিকয়েক উপস্থিতি দেখে নিজের হতাশা লুকাতে পারলো না ও। একুশ জন কোম্পানির লোক, যার মধ্য দুই-তৃতীয়াংশই পঞ্চাশোর্ধ। আর বাকিরা চৌদ্দর নিচে। এদের সাথে আছে রানির মহল থেকে পালিয়ে আসা ঐ হাবিলদার আর তার চার সিপাহী। আলফ উইলসন আর তার চারজন লোক, ফ্রান্সিস-তার মানে টম সহ মোট বত্রিশ জন পুরুষ।
“অস্ত্রপাতি কেমন আছে?”
“গুলি আর পাউডার নিয়ে চিন্তা নেই,” আলফ বললো। ও এর মধ্যেই খুঁজে দেখে এসেছে। কোম্পানি এদেরকে প্রচুর পাঠিয়েছে। কারণ অনেক সময় মাসের পর মাস রসদ পাঠানো সম্ভব হয় না।”
“মাস্কেট?”
“বেশি নেই, তবে আমাদের দরকারের চাইতে বেশি। তরবারি আর বল্লমও আছে অনেকগুলো। ক্যাপ্টেন হিকস তার অস্ত্রপাতি ভালোই গুছিয়ে রেখেছেন। ওনার আত্মা শান্তি পাক। আর হ্যাঁ, কামানও আছে অনেকগুলো।”
