“মানে পেইন্টিংসগুলো?” সাবধানে জানতে চাইল শাসা।
“না শুধু পেইন্টিংস নয়, ফার্নিচার, কার্পেট, রুপার তৈজসপত্র সবকিছু।” খানিক থেমে নিজেকে ধাতস্থ করে জানালেন বাকিটা, “এই এস্টেট, দুর্গ, তোমার ঘোড়া সবকিছু।”
একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল শাসা। মায়ের কথার আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারছে না। সেই চার বছর বয়স থেকেই ওয়েল্টেলেদেন আছে।
“শাসা, আমরা সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি, বাবু। সেই ডাকাতির পর থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু কিছুই করতে পারিনি। তাই ঋণ পরিশোধের জন্য ওয়েল্টেলেদেন বিক্রি করতেই হবে।” কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে ভাঙা গলায় জানালেন, “আমরা আর ধনী নই শাসা, সব ধ্বংস হয়ে গেছে।” ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন সেনটেইন। সেও বুঝি মায়ের মতই ভেঙে পড়বে। কিন্তু না, হাত বাড়িয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল শাসা।
“আমরা গরিব হয়ে গেছি শাসা” বুঝতে পারলেন ছেলে মানসিকভাবে কতটা বিশৃঙ্খলতার মাঝে পড়ে গেছে।
“তুমি জানো মা” অবশেষে মুখ খুলল শাসা, “আমি কয়েকজন গরিব লোককে চিনি। স্কুলের কয়েকটা ছেলে, ওদের বাবা-মায়ের অবস্থা তেমন ভালো না। কিন্তু তাতে কিন্তু ছেলেগুলোর কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ওরা বেশ হাসিখুশি থাকে। তাই একবার অভ্যেস হয়ে গেলে তখন আর কোনো কষ্ট হবে না।”
“আমার কখনো অভ্যাস হবে না শাসা। আমি এ অবস্থাকে ঘৃণা করি।” জানালেন সেনটেইন।
“আমিও তাই। ইশ তোমাকে যদি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারতাম।” শাসা নিজেও মনে হল ক্ষেপে গেছে।
শাসাকে রেখে আস্তে আস্তে হেঁটে চলে এলেন সেনটেইন। পথে অবশ্য দু’একবার থেমে কৃষ্ণাঙ্গ কর্মচারীদের সাথেও কথা বললেন। তার পরিবারের সদস্য হতে পেরে লোকগুলো সত্যিই খুশি। ওদের হাস্যমুখ দেখে আরো মন খারাপ হয়ে গেল। তাই আঙুর ক্ষেতের কোনায় পাথরের দেয়ালের উপর উঠে খানিক ঘুরে বেড়ালেন আঙুরের গাছের সারির মাঝখানে। থোকায় থোকায় ফুটে আছে নতুন আঙুর। হাত বাড়িয়ে ফলগুলো স্পর্শ করেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললেন। যেন বিদায় নিতে এসেছেন। সাথে কেউ না থাকায় অনেকক্ষণ একাকী দাঁড়িয়ে কাঁদলেন সেনটেইন।
হতাশা এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে তার দৃঢ় মনোবল। ব্যর্থতার ভারে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন যে মনে হচ্ছে সবকিছু নতুন করে শুরু করার শক্তিটুকু পর্যন্ত নেই। জীবনে প্রথমবারের মত হারিয়ে ফেলেছেন সামনে এগিয়ে যাবার সাহস আর ইচ্ছে। মনে হচ্ছে চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে থাকেন। আচমকা ইচ্ছেটা এত প্রবল হয়ে উঠল যে, পা চালিয়ে আর ক্ষেত থেকে বের হয়ে আসলেন। লনের উপর দিয়ে দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে চলে এলেন স্টাড়িতে। তারপর ডেস্কের কাছে গিয়ে খুলে ফেললেন ড্রয়ার।
একবার স্যার গ্যারিই এই পিস্তলটা উপহার দিয়েছিলেন। পিস্তল এসেছে। ইটালি থেকে। হাতলে হানি মাইনের হিরে।
চেক করতেই দেখা গেল প্রতিটা চেম্বারে লোড করা আছে বুলেট। সেনটেইন গভীর ভাবে দম নিয়ে পিস্তলের নল ঠেকালেন নিজের মাথায় আর আশ্চর্য যে হাত দুটো একটুও কাঁপছে না।
কিন্তু ঘুরে দাঁড়াতেই রুমের ওপাশের দেয়ালে ঝোলানো আয়নায় চোখে পড়ল নিজের প্রতিবিম্ব। দু’পাশের ফুলদানিতে বাগান থেকে আনা তাজা হলুদ ফুল থাকায় মনে হচ্ছে বুঝি ফুলে ছাওয়া কফিনেই শুয়ে আছেন।
তবে আচমকাই কেন যেন আবার প্রচণ্ড রাগ হল। মনে হল গরম কয়লার আগুনে পুড়ে যাচ্ছে গাল। “নাহ, এত সহজে পার পাওয়া যাবে না। তাই পিস্তল খুলে পিতলের কার্টিজ পুরো কার্পেটে ছড়িয়ে অস্ত্রটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন দূরে। তারপর লম্বা লম্বা পা ফেলে বেরিয়ে এলেন বাইরে।
তার রাইডিং বুটের আওয়াজ পেয়েই সুইটের কাছে এসে জড়ো হল পরিচারিকার দল। গোলাকার মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন সেনটেইন।
“লিলি আমার গোসলের পানি দিয়েছো?” তাড়াতাড়ি বাথরুমের দিকে দৌড় দিল লিলি আর দ্বিতীয় জন তার পিছু নিয়ে ড্রেসিংরুমে গেল।
“গ্লাডিস, দেখো তো লিলি পানি গরম করেছে কিনা।”
হলুদ সিল্কের রোব পরে বিশাল মার্বেল টাবের কাছে চলে এলেন সেনটেইন। চিবুক পর্যন্ত পানিতে ডুবে গিয়ে চাইলেন মনের রাগ কমাতে। কিন্তু চোখের সামনে ভেসে উঠল হিরের হাতলঅলা পিস্তল। জোর করে দৃশ্যটাকে ভুলে যেতে চেষ্টা করলেন সেনটেইন কোর্টনি।
“তুমি তো কখনো এতটা কাপুরুষ ছিলে না সেনটেইন।” গোসল সেরে সামার কালারের ড্রেস পরতে পরতেই নিজেকে জানালেন সেনটেইন। এমনকি সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় মুখটাকেও হাসি-খুশিই রাখলেন।
নিচে অপেক্ষা করছেন ডেভেনপোর্ট আর সিরিল স্নেইনি।
“অনেক সময় নষ্ট হল জেন্টেলম্যান, চলুন শুরু করা যাক।”
এত বড় প্রাসাদের প্রতিটি আইটেমের নাম্বার দেয়া, বর্ণনা লেখা, কাঙ্ক্ষিত মূল্য নির্ধারণ, ছবি ভোলা প্রভৃতি সবকিছুর ক্যাটালগ করাটা বেশ পরিশ্রমসাধ্য কাজ। দশ দিন বাদেই ইংল্যান্ডে চলে যাবেন ডেভেনপোর্ট। তার আগেই সমস্ত কাজ সমাধা করতে হবে। প্রকৃত নিলাম শুরু হবে তিনমাস পরে।
কয়েকদিন বাদে ডেভেনপোর্টের যাত্রার সময় সবাইকে অবাক করে দিয়ে জাহাজ ঘাটে যাবার আগ্রহ প্রকাশ করলেন সেনটেইন। সচরাচর এসব দায়িত্ব সিরিলই পালন করেন।
কেপটাউনবাসীর জন্য মেইল শিপ দেখা বেশ উত্তেজনাময় একটা ঘটনা। তাই প্যাসেঞ্জার আর তাদেরকে বিদায় জানাতে আসা অতিথির ভিড়ে গিজগিজ করছে বন্দর।
