“মাইকেল!” আতঙ্কে সেনটেইনের দাঁতে দাঁতে বাড়ি খাচ্ছে। এমন সময় অলৌকিক মুছে গেল সব দৃশ্য। পোলো ফিল্ডের ওপর চমৎকারভাবে ল্যান্ড করল ছোট্ট নীল মেশিন। ট্যাক্সিং করে স্ট্যান্ডের কাছে এসে থেমে গেল প্লেন। কেবিনের দু’পাশের দরজা খুলে মুখে একরাশ হাসি নিয়ে নেমে এল শাসা কোর্টনি.আর তার বিজয়ী তিন বন্ধু।
“সারপ্রাইজ এভরিবডি।” একসাথে চিৎকার জুড়ে দিল ছেলেরা। সাথে সাথে হাততালি দিয়ে হাস্যমুখে তাদের বরণ করে নিল সমস্ত দর্শক। এগিয়ে এসে জেনারেল স্মুটের কাছ থেকে রুপার কাপ নিল শাসা।
এতটুকু ককপিটে যে এতজনের জায়গা হয়েছে সেটা দেখেই তো সেনটেইন অবাক হয়েছেন। তার উপরে এখন আবার পাইলটের আসন ছেড়ে নেমে এল জক মারফি। তার মানে সেই হল নাটের গুরু। তিনি নিজে শাসাকে সবসময় ওড়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করে আসলেও বাবার ছবি বিছানার পাশে নিয়ে ঘুমায় তার ছেলে। তাই এরকমটা তো হওয়ারই কথা। কিন্তু একেবারে না বলে-কয়ে শাসা এরকম করবে সেনটেইন ভাবতেই পারেননি। যাই হোক, চোখ ঘুরিয়ে দেখলেন যে শাসা কাপ হাতে নিয়ে ধন্যবাদসূচক স্পিচ দিচ্ছে :
লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, আপনারা হয়ত ভাববেন যে জক মারফি পুশ মখ চালিয়েছেন। সে কিন্তু কন্ট্রোল স্পর্শই করেনি। তারপর টেকো মাথা ইনস্ট্রাকটরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল, “দেখলে, বলেছিলাম না আমি আমার বাবার মতই হব।”
সবাই আবার হাততালি দিয়ে শাসাকে উৎসাহ দিয়ে উঠলেও ধক ধক করে উঠল সেনটেইনের বুক।
***
যেমন করে এসেছিল তেমনি আচমকা ওয়েল্টেভ্রেদেনের জীবন উলট-পালট করে দিয়ে চলে গেল সকল অতিথি। পড়ে রইল কেবল হতশ্রী পোললা গ্রাউন্ড, খালি শ্যাম্পেনের বোতল, একগাদা আবর্জনা আর নোংরা টেবিলক্লথ। সেনটেইনের অস্ত্র ভান্ডারের শেষ পোলাটাও ছোঁড়া হয়ে গেছে। মনের মাঝে তাই বিষাদের আবাস।
শনিবারেই চলে এল আমন্ত্রিত কিন্তু অপ্রত্যাশিত ভিজিটরের দল। বায়োগ্রাফির কাজ করার জন্য সুটকে নিয়ে স্টাডিতে চলে গেলেন স্যার গ্যারি। প্রাতঃভ্রমণ শেষ করে এসেই লোকটার মুখোমুখি পড়ে গেলেন সেনটেইন আর শাসা। ক্ষুণ্ণ মনে এগিয়ে গেলেন সেনটেইন।
এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে ডাইনিংরুমের তৈজসপত্র পরীক্ষায় ব্যস্ত ডেভেনপোস্ট চোখ তুলে তাকালেন মা আর ছেলের দিকে।
ঠোঁট কামড়ে ধরে বিষণ্ণ মুখে এগিয়ে এলেন সেনটেইন।
“সথেবি থেকে মি. ডেভেনপোর্ট এসেছেন শাসা। উনি আমাকে আমাদের পেইন্টিংস আর ফার্নিচার সম্পর্কে কিছু পরামর্শ দিবেন।”
“ওহ, তাহলে তো ভালোই হয়।” আগ্রহী হয়ে উঠল শাসা। আপনি এটা দেখেছেন স্যার? এটা আমার মায়ের সবচেয়ে পছন্দের পেইন্টিং। মা যেখানে জন্মগ্রহণ করেছে সেই এস্টেটের ছবি।”
স্টিলের ফ্রেমের চশমা ঠিকঠাক করে সাইডবোর্ডের ওপর রাখা তৈলচিত্রটা দেখার জন্যে ঝুঁকতেই ফ্রায়েড ডিমের তেল লেগে গেল ডেভেনপোর্টের ওয়েস্ট কোটে।
“১৮৭৫ সালের সাইন করা। সিসলির শ্রেষ্ঠ সময় ছিল তখন।” নোটবুক বের করে খসখস করে কী যেন লিখে নিলেন ডেভেনপোর্ট, “এটা থেকে পাঁচশ পাউন্ড পাওয়া যাবে।”
“মাত্র পাঁচশ?” জানতে চাইলেন সেনটেইন; বোঝা গেল দাম শুনে খুশি হননি, “আমি তো এর চেয়েও অনেক বেশি দিয়েছি।” এক কাপ কফি নিয়ে টেবিলের মাথায় চলে এলেন।
“মিসেস কোর্টনি, মাত্র গত মাসেই আমরা নিলামের আয়োজনে ডি মার্লের জন্য চাহিদার চেয়ে নগণ্য এক দাম পেয়েছি। এখন ক্রেতাদের মর্জি মতন চলছে সবকিছু, বুঝলেন।”
“ওহ, চিন্তা করবেন না স্যার” প্লেটে একগাদা ডিম আর মুচমুচে বেকন নিয়ে নিল শাসা, “এগুলো বিক্রির জন্য নয়। তাই না মা?”
কোনো উত্তর না দিয়ে সেনটেইনের পাশে গিয়ে বসে পড়লেন ডেভেনপোর্ট।
“এবারে সামনের স্যালুনের ভ্যান গঁগের কথা বলি” আসার পর থেকে এই প্রথম শুঁটকি মাছ নিয়ে সত্যিকারের আগ্রহ দেখালেন; মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে বললেন,
“আমেরিকাতে ভ্যান গঁগের চাহিদা বেশি। তাই ছবি তুলে আমাদের গুরুতুপূর্ণ কয়েকজন ক্লায়েন্টের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। আশা করছি চার থেকে পাঁচ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত পাওয়া যাবে।”
হাতে কাঁটা চামচ আর ছুরি নামিয়ে রেখে মায়ের দিকে তাকাল বিস্মিত শাসা।
“মি, ডেভেনপোর্ট আমার মনে হয় এ ব্যাপারে পরে কথা বললেই ভাল হয়।” তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন সেনটেইন, “পুরো দিন পড়ে আছে। এখন আসুন নাশতাটা উপভোগ করা যাক।”
অর্ধেক খেয়েই উঠে গেল শাসা; কী হয়েছে বুঝতে পেরে সেনটেইন জানতে চাইলেন, “কোথায় যাচ্ছো?”
“আস্তাবলে। আমার ঘোড়াগুলোর খুড় বদলানো হচ্ছে।”
“চলো আমিও যাই।”
পুরোপুরি নিঃশব্দে পাশাপাশি হেঁটে চলল মা আর ছেলে। শাসা চাইছে মা কিছু বলুক আর সেনটেইন কী বলবেন ভেবেই পাচ্ছেন না। অনেক দেরি হয়ে গেছে। ছেলেকে আরো আগেই সবকিছু খুলে বললে ভালো হত।
আস্তাবলের গেইটের কাছে আসতেই ছেলের হাত ধরে আঙুর ক্ষেতের দিকে টেনে নিলেন সেনটেইন। ঝরনার কিনারে ওক বেঞ্চের ওপর বসলেন দু’জনে। ছোট্ট একটা পাথুরের গ্রোটো থেকে বেরোচ্ছে মিষ্টি পানির বুদবুদ। খাবার পাবার আশায় কিনারের কাছে চলে এল ট্রাউটের ঝাঁক।
“শাসা, সথেবী পৃথিবীর বিখ্যাত নিলাম প্রতিষ্ঠান আর ডেভেনপোর্ট আমাদের হয়ে ওয়েন্টেলেদেন বিক্রির জন্যই এখানে এসেছেন।” পরিষ্কার কণ্ঠে কথাগুলো উচ্চারণ করার সাথে সাথে নিশ্চুপ হয়ে পড়লেন সেনটেইন। হতাশার ভারে কাঁপতে কাঁপতে মনে হচ্ছে যেন পড়েই যাবেন।
