ফার্স্ট ক্লাস এনট্রির কাছে এসে প্যাসেঞ্জার লিস্ট বের করে দেখলেন সেনটেইন। খুঁজে পেলেন ম্যালকমস, মিসেস ই. কেবিন এ-১৬ ম্যালকমস, মিস টি. এ-১৭ ম্যালকমস, মিস এস, এ-১৭।
তার মানে পরিকল্পনামত জাহাজে চড়েছে ম্যালকমস, পরিবার আর সেই পোলো টুর্নামেন্টের পর আর ব্লেইনের সাথে দেখাও হয়নি। তাই কর্নেলের সাথে দেখা হওয়ার আশায় জাহাজের ফার্স্ট ক্লাসের ধোয়ায় ঢাকা স্যালুন আর লাউঞ্জের মাঝে দিয়ে ঘুরে এলেন সেনটেইন।
কিন্তু নাহ, পাওয়া গেল না। তাহলে সম্ভবত ইসাবেলার কেবিনে উঠেছেন। ইচ্ছে হল তক্ষুণি ছুটে চলে যান ১৬ নম্বর কেবিনে। কিন্তু তা না করে মেইল লাউঞ্জে বসে পরিচিত কয়েকজনের সাথে কুশলাদি বিনিময় করলেন।
উপস্থিত সবাই তার প্রতি কতটা মনোযোগ দিচ্ছে দেখে মনে মনে খুশি হলেন সেনটেইন। অর্থাৎ পোলো টুর্নামেন্টে ঢালাও খরচ করে মানুষের মাঝে তার আর্থিক দৈন্যতার ফিসফাস বন্ধ করে দিতে পেরেছেন। কিন্তু শীঘই তা পালটে যাবে। ভাবতেই তিক্ত হয়ে উঠল মন। যাই হোক, বেজে উঠল জাহাজের ভে। ফাইনাল ওয়ার্নিং সুলভ বাজানো হচ্ছে এ বাঁশি।
ব্লেইনের খোঁজে এদিক-ওদিক তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালেন সেনটেইন। তারপর মি. ডেভেনপোর্টর সাথে হ্যান্ডশেক করে খাড়া গ্যাংওয়ে বেয়ে নিচে নেমে এলেন সেনটেইন।
হঠাৎ করে চোখে পড়ল ব্লেইনের বড় মেয়ে তারার উপর। বয়সে বড়সড় মেয়েটাকে গাঢুরঙা ড্রেসে চমৎকার দেখাচ্ছে। চুলগুলো আধুনিক ঢঙ্গে বাঁধা। পাশেই ওর বোন রেলিং থেকে ঝুঁকে কার উদ্দেশে যেন পাগলের মত রুমাল নাড়ছে। পেছনে ইসাবেলার হুইল চেয়ার।
আর তারপরেই তাকে দেখতে পেলেন। দৈত্যাকৃতির লোডিং ক্রেনে চড়ে উপরে উঠে যাচ্ছেন কর্নেল ব্লেইন। পরনে ট্রপিক্যাল স্যুট আর নীল-সবুজ রেজিমেন্ট টাই। ভিড় থেকে দূরে সরে এলেন সেনটেইন। যেন নিজের মত করে চেয়ে দেখতে পারেন ব্লেইনের চেহারা। “ওই হল একমাত্র যা আমি কখনো হারাব না। ওয়েন্টেলেদেন আর হানি না থাকলেও সে ঠিকই থাকবে।” ভাবনাটায় আনন্দ থাকলেও হঠাৎ করে মনে হল, “যখন আমার ধন সম্পদ কিছুই থাকবে না, সাধারণ এক নারী আর পুত্রসন্তানের মা হয়ে যাব তখনো কি ব্লেইন আমাকে ভালোবাসবে?” ভাবতেই রীতিমত যেন অসুস্থ বোধ করলেন সেনটেইন।
খানিক পরেই বেজে উঠল সাইরেন। আস্তে আস্ত চলতে শুরু করল। জাহাজ। কিন্তু ব্লেইন এখনো ক্রেনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখের ওপর হাত দিয়ে লম্বা জাহাজের খোঁজে টেবিল মাউন্টেনের দিকে তাকালেও চেহারায় নেমে এল বিষণ্ণতা। আর তারপর হঠাৎ করে মাথার টুপি খুলে ঘুরে নিচে তাকাতেই দেখলেন দাঁড়িয়ে আছেন সেনটেইন।
আচমকা নিজেকে অত্যন্ত অপরাধী বোধ করলেন সেনটেইন। ব্যক্তিগত এই মুহূর্তেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে ব্লেইনের ওপর গোয়েন্দাগিরি করছিলেন ভাবতেই লজ্জা পেলেন। কর্নেলের চেহারাও মনে হল শক্ত হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি ক্রেন থেকে নেমে টুপি মাথায় দিয়ে হেঁটে এলেন সেনটেইনের কাছে। আস্তে করে জানতে চাইলেন, “আমরা একা হতে পারি? তোমার সাথে সময় কাটানোর জন্যে আর তর সইছে না।”
সাথে সাথে কেটে গেল সেনটেইনের সমস্ত ভয় আর দ্বিধা। আনন্দে দিশেহারা হয়ে মনে হল সেই তরুণ বয়সে ফিরে গেছেন। উচ্ছ্বসিত হয়ে ভাবলেন, “ব্লেইন আমাকে সর্বদা ভালোবাসবে।”
***
হাই অফিসের কোনো রকম চিহ্নবিহীন একটা গাড়িতে চড়ে ওয়েন্টেভ্রেদেনে এলেন জেনারেল জেমস ব্যারি মুনিক হার্টজগ। লম্বা আর সুদর্শন হার্টজগ লাইব্রেরিতে ঢুকতেই সবুজ কাভার দেয়া টেবিলের ওপাশ থেকে উঠে দাঁড়ালেন জ্যান সুট।
“তো!” হাত মেলাতে গিয়ে খিটখিটে স্বরে হার্টজগ জানালেন, “আলোচনার জন্য যতটা আশা করেছিলাম মনে হয় না ততটা সময় পাওয়া যাবে।”
চোখ নামিয়ে ব্লেইন ম্যালকমস, ডেনিস রিটজ আর নিজের আরো দুজন মনোনীত প্রার্থীর দিকে তাকালেন সুট। যাই হোক, হার্টজগ আর ফিন্যান্স মিনিস্টার নিকোলাস হ্যাঁভেঞ্জা না বসা পর্যন্ত কেউ কোনো কথা বললেন না।
“আমরা এখানে নিরাপদ তো?” লাইব্রেরির মেহগনি কাঠ দিয়ে বানানো জোড়া দরজার দিকে তাকিয়ে সন্দিগ্ধ স্বরে জানতে চাইলেন হার্টজগ! চোখ বোলালেন সিলিং পর্যন্ত লম্বা সদৃশ্য কাঠের তাকে মরক্কো চামড়ায় বাঁধানো সেনটেইনের বইয়ের কালেকশনের ওপর।
“পুরোপুরি নিরাপদ।” প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করলেন জ্যান মুট, “আমি ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, এখানে আঁড়িপাতার মতন কিছু ঘটবে না।”
প্রধানমন্ত্রী মাথা নাড়তেই নিজের বক্তব্য শুরু করলেন হাভেঞ্জা, “আপিল ডিভিশন থেকে তিয়েলমান রুজ পদত্যাগ করেছেন।” সবাই ভাবত দক্ষিণ আফ্রিকাতে হার্টজগের উত্তরসূরি হচ্ছেন তিয়েলমান। কিন্তু গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে মতবিরোধ লাগাতে রাজনীতি থেকে সরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এখন সেখান থেকেও সরে গেছেন।
“উনি তো বেশ প্রভাবশালী।” সবিস্ময়ে জানালেন ব্লেইন।
“কিন্তু আমাদের নীতি নিয়ে তো কোনো সন্দেহ প্রকাশের সুযোগও দেয়া যায় না।” মন্তব্য করলেন হার্টজগ “তাই আমাদের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে গোন্ডের ক্ষেত্রে ঐকমত্য গড়ে তোলা। যেন রুজ কোনো ঘোষণা দিলেও আমরা তার চেয়ে ভালো অবস্থানে থাকতে পারি।” সরাসরি স্মুটের দিকে তাকালেন প্রধানমন্ত্রী।
