রিভার গড

 ১. তরল রুপোর উজ্জ্বলতা

রিভার গড – উইলবার স্মিথ
অনুবাদ : মখদুম আহমেদ

উৎসর্গ

হুমায়ুন আজাদ—

জানি না, এই অনুবাদটি হাতে পেলে তিনি পড়তেন কিনা;
পড়লে হয়তো তীব্র-তীক্ষ অসাধারণ সমালোচনায় বিদ্ধ করতেন,
অথবা, হয়তো দুএক ছত্র প্রশংসাও মিলতো।
দুটোই আমার জন্যে হতো সমান আনন্দের।

.

রিভার গডের জন্যে প্রশংসা

খুব কম ঔপন্যাসিক আছেন যাদের বর্ণনাশৈলী এততটা নিখুঁত- যেনো চোখের সামনে ঘটে চলেছে ব্যাপারগুলো…স্মিথ নিঃসন্দেহে তাদের একজন। তার প্রাচীন মিশরের উপাখ্যান অত্যন্ত চমকপ্রদ।

-অ্যানিস্টন স্টার।

প্রাচীন মিশরের উঁচু মানসম্পন্ন সাহিত্যের সঙ্গে টক্কর লাগিয়েছেন স্মিথ, জন্ম নিয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ এপিক।

-দ্য লন্ডন টাইমস্ ।

চমৎকার ঐতিহাসিক চলচ্চিত্রের মতো ভালো এবং মন্দের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটেছে বইটির…. সুলিখিত, চমকপ্রদ।

-লেক্সিটন হেরাল্ড-লিডার।

প্রচন্ড শক্তিমাণ লেখক তার সমস্ত ক্ষমতা দিয়ে রচনা করেছেন উপভোগ্য অ্যাডভেঞ্চার… রিভার গড়, একটি সুলিখিত সম্পূর্ণ উপন্যাস… এমন একটি সময়ের গল্প, যখন ইতিহাস এবং কিংবদন্তি মিলেমিশে একাকার।

-স্যান ফ্রান্সিসকো ক্রনিকল।

রুদ্ধশ্বাসে পড়ার মতো।

-ডালাস মর্নিং নিউজ।

একবার শুরু করলে ছাড়তে মন চাইবে না… ষড়যন্ত্র, রোমান্স, লোভ, নিষ্ঠুরতা এবং অসাধারণ ঘটনাবলীর মিশেল… দারুণ উপভোগ্য।

-এল পাসো হেরাল্ড-পোস্ট।

.

ভূমিকা

উইলবার স্মিথের অত্যাধিক আলোচিত উপন্যাস, রিভার গড বা নদী-ঈশ্বর-এর কাহিনীর সত্যতা নিয়ে বিতর্ক আছে, আছে তুমুল জল্পনা-কল্পনা। বইয়ের সমাপ্তিতে লেখকের বক্তব্য এই বিতর্কের মূল কারণ, বইটির অসাধারণ জনপ্রিয়তার পর তিনি লিখেছেন এর সিকুয়েল। চার হাজার বছর আগের মিশরীয় ক্রীতদাসের মূল কাহিনী থেকে লেখক কতটুকু কাব্যিক স্বাধীনতা নিয়েছেন, সে বিতর্কে আমরা যাবো না। অনুবাদ প্রসঙ্গে বলতে পারি, প্রাচীন পটভূমির ভাব-গাম্ভির্য্য এবং সম্রাট-সম্রাজ্যের বর্ণনা ফুটিয়ে তোলার জন্যে আলঙ্কারিক ভাবটুকু আনা হয়েছে অনুবাদে। বহুদিন ধরেই উইলবার স্মিথের এই উপন্যাসটি অনুবাদের ইচ্ছে ছিলো, অবশেষে প্রকাশক রিয়াজ খানের নিরবচ্ছিন্ন উৎসাহ এবং সমর্থনে শেষ হলো পরিশ্রম-সাধ্য এই কাজ। আমার জানা মতে, বাঙলা ভাষায় এটিই উইলবার স্মিথের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ। চারহাজার বছর আগের পটভূমিতে রচিত হওয়ায় ভাষার আভিজাত্য উপন্যাসটির একটি বড়ো দিক। প্রচন্ড ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে অনুবাদ-কর্ম চালাতে হয়েছে; কিন্তু যে কোনো ভুল-ভ্রান্তির সবটুকু দায় আমারই। ইংরেজী শব্দ যথাসম্ভব পরিহার করে চেষ্টা করেছি বাংলা শব্দ ব্যবহারের । ভিন্ন কোনো অনুবাদ-উপন্যাসে হয়তো এর তেমন প্রয়োজন নেই- মূল ইংরেজী শব্দ বরঞ্চ অনেকক্ষেত্রে মানানসই হয় সেখানে। কিন্তু রিভার গডের বাঙলা রুপান্তরে প্রাচীন ভাব ফুটিয়ে তোলা নিতান্তই প্রয়োজনীয় ছিলো। বানানরীতি এবং বিশেষ কিছু আধুনিক শব্দ ও পংক্তির জন্যে ঋণী হয়ে রইলাম বাঙলাদেশের প্রধান প্রথাবিরোধী কবি, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিজ্ঞানী এবং গবেষক প্রয়াত হুমায়ুন আজাদের নিকট ।

সবশেষে, উপন্যাসের শেষে লেখকের বক্তব্যে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই ভূমিকার সমাপ্তি টানছি।

মখদুম আহমেদ
ধানমন্ডি, ঢাকা।
১/০৫/০৭

.

তরল রুপোর উজ্জ্বলতা নিয়ে মরুর বুক চিরে বয়ে চলেছে নীল নদ। তাপ-তরঙ্গে ঝাপসা দেখায় আকাশ নির্দয় সূর্য আগুন ঢালছে অবিরত। দাবদাহের প্রচণ্ডতায় নৃত্যরত নদীর বাঁকের রুগ্ন পাহাড়শ্রেনী, তাপ-মরীচিৎকার ভেতর কেঁপে কেঁপে উঠছে।

প্যাপিরাসের ঝোঁপ ঘেঁষে চলছিলো আমাদের নৌকো। ছোটো ছোটো ঢেউগুলো ছলকে আঘাত হানছিলো জলাভূমির পাড়ে, গলুইয়ে বসে থাকা মেয়েদের সুললিত কণ্ঠের গানের সাথে কেমন অদ্ভুত ছন্দে বেজে চলছিলো সেই শব্দ।

লসট্রিসের বয়স তখন সবে চৌদ্দ। প্রথমবারের মতো এদিন ওর শরীরে নারীত্বের ফুল ফুটেছে, একই দিনে বছরের মতো বান ডেকেছিল নীলের বুকে বিষয়টাকে দেবতাদের আশীর্বাদপুষ্ট বলে মনে করেছেন হাপির মন্দিরের পুরোহিতেরা। তারাই ওর নাম রেখেছেন লসট্রিস; অর্থাৎ জলের মেয়ে।

সেদিনের ওর কথা আমার পরিষ্কার মনে পড়ে। সামনের বছরগুলোয় আরো কমনীয়, আরো রাজকীয় আর খোলতাই হয়েছিলো তার সৌন্দর্য; কিন্তু সেদিনের সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত কুমারী শরীরের যে আভা ফুটে উঠেছিলো ওর অবয়বে, তা বোধকরি আর কখনও ঘটেনি। নৌকার প্রতিটি মানুষ, এমনকি দাঁড়-টানা যোদ্ধারা পর্যন্ত অনুভব করেছিলো সেটা। আমি তো বটেই, কেউই চোখ সরাতে পারেনি ওর উপর থেকে। এই অনিন্দ-সৌন্দর্য আমাকে নিজের অপ্রাপ্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। গভীর হাহাকার উঠে বুক জুরে। যদিও আমি একজন অপুরুষ, তথাপি নারী দেহ আস্বাদনের পরেই খোঁজা করা ছুরি চালানো হয়েছিলো আমার উপর।

টাইটা, ডাকলো সে আমাকে। আমার সঙ্গে গাও!

আমি গাইতে শুরু করতেই আনন্দে মুখ ঝলমল করে উঠলো লসট্রিসের। অন্যান্য বহু কিছুর মতো আমার কণ্ঠস্বর তার খুব প্রিয়; ওর মিষ্টি গলার সাথে বেশ মিলে যায় আমার উঁচু তানের স্বর। আমার শেখানো কৃষকের পুরোনো একটা প্রেমের গান গাইছিলাম আমরা, লসট্রিসের দারুন প্রিয়:

শরবিদ্ধ কোয়েলের মতো ছটফট করে এই প্রাণ
যখন প্রিয়তমের মুখখানি দেখি
আর আমার কপোলে লালিমা জাগায়
তার সেই হাসি–

নৌকার পেছন থেকে আর একটি কন্ঠস্বর যোগ দেয় আমাদের ঐকতানে। একজন পুরুষের গলা। গম্ভির, শক্তিশালী–আমার স্বরের স্বচ্ছতা বা শুদ্ধতা তাতে নেই। আমারটা যদি হয় সকালের ঘুমভাঙানি পাখির, তো এরটা তরুণ সিংহের।

মুখ ফিরিয়ে হাসলো লসট্রিস, নীল নদে সূর্যকিরণ জাগল যেন। যার জন্যে এই হাসি, সে যদিও আমার বন্ধু; বলা ভালো, পৃথিবীতে আমার একমাত্র সত্যিকারের বন্ধু–বুকের গভীরে ঈর্ষার জ্বলুনি ঠিকই টের পেলাম। তবুও, ট্যানাসের দিকে ফিরে জোর করে হাসলাম আমিও, যার উদ্দেশ্যে ভালোবাসার হাসি হাসছে লসট্রিস।

ট্যানাসের বাবা পিয়াংকি, প্রভু হেরাব ছিলেন মিশরের অন্যতম রাজকীয় সভাষদ; তবে তার মা ছিলেন মুক্ত এক তেহেনু দাসের কন্যা। ট্যানাসের বালক বয়সে জলাভূমির জ্বরে মারা যায় তার মা, তবে লোকমুখে শুনেছি মিশরের দুই সাম্রাজ্যে তার মতো রূপসী পাওয়া ছিলো ভার।

ট্যানাসের বাবাকে আমি অনেক আগে থেকেই চিনতাম। বেশ ভালো মনের মানুষ ছিলেন, প্রায় ফারাওয়ের সম-পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকা অবস্থাতেই সবকিছু হারিয়েছিলেন। যতোটা না সৌন্দর্য ছিলো, তার চেয়ে বেশি শক্তিমত্তা ছিলো তার। আর মনটা ছিলো একেবারে সাদা। হয়তো প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই উদার ছিলেন। তাই নিজ বন্ধুদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে ফারাওয়ের সু-নজর হারিয়েছিলেন।

বিপুল ধন-সম্পদ ছাড়া বাবা-মার সব ভালো দিকগুলো পেয়েছে ট্যানাস। শক্তি মত্তায় বাপের মতো, সৌন্দর্যে ঠিক যেনো মা। তো, আমার কর্ত্রী যদি তাকে ভালবাসে, অনুতাপ করার কী আছে আমার? আমিও তাকে ভালোবাসি মনের গভীরে ঠিকই জানি, দেবতারা যদি হঠাৎ করে ক্রীতদাসের নিচু বর্ণ থেকে আমার মর্যাদা বাড়িয়েও দেন; ওকে আমি পাবো না কোনো দিনও। নপুংসক যে আমি। এরপরেও, মানবাত্মার স্বভাবই এমন, অসম্ভবের সুখ-স্বপ্ন আমার ভেতরটা তোলপাড় করে ফেলে।

পায়ের কাছে দুটো মিশমিশে কালো দাসী মেয়েকে নিয়ে গলুইয়ের কাছে বসেছে লসট্রিস। কুশ দেশের মেয়ে ও দুটো আস্ত বজ্জাত গলার চারপাশে সোনার কলার ছাড়া উদোম গা। লসট্রস নিজেও পরিশুদ্ধ লিনেনের একটা আঁটো জামা পরে আছে কেবল, ঝকঝকে সাদা রঙ ওটারঠিক যেনো সারসের পাখার মতো। ওর শরীরে উপরিভাগের বর্ণ তেল দেওয়া সিডারের মতো রোদে পোড়া, বিব্লসের ওপারের পর্বতে জন্মায় গাছগুলো। বুক জোড়ার আকৃতি ডুমুরের মতো, ডালিম দানার মতো লালচে হয়ে আছে বৃন্ত দুটো।

রাজকীয় পরচুলা একপাশ সরিয়ে রেখেছে সে। চুলগুলো একপাশে টেনে বেণী করেছে, মোটা বাদামী দড়ির মতো একটা বুকের উপর পরে আছে সেটা। ওর চোখের জাদুকে আরো মোহনীয় করেছে উপরের পাতায় ছোঁয়ানো নীলচে-সবুজ প্রসাধনী। লসট্রিসের চোখের রঙও অবশ্য সবুজ, শুকনো মরশুমের নীল নদের জলের মতো স্বচ্ছ। দুই বুকের মাঝখানে স্বর্ণ আর ল্যাপিস লাজুলিতে কারুকার্য করা নীল-নদের দেবী হাপির অবয়বের হার পরে আছে লসট্রিস। অসাধারণ একটা শিল্পকর্ম ওটা, নিজ হাতে ওরই জন্যে তৈরি করেছি আমি।

হঠাৎই মুঠো করা হাত মাথার উপরে তুলে ধরে ট্যানাস। একইসঙ্গে দাঁড় টানা থামিয়ে নিজেদের বৈঠা উঁচু করে পানির উপর ধরে রাখে দাড়ীরা, সূর্যালোক ঝিকমিক করছে তাদের দাঁড়ের ডগা থেকে ঝরে পড়া রূপালি পানিতে। এরপরে হাল ঘুরিয়ে দেয় ট্যানাস; ওপাশের দাঁড়ীরা পেছন দিকে বাইতে থাকে। সবুজ পানিতে তোলপাড় তুলছে বৈঠার আঘাত। এ পাশের দাঁড়ীরা সামনে টানতে লাগলো প্রাণপণে। এতো দ্রুত ঘুরে গেলো নৌকার নাক, বিপদজনক ভঙিতে কাত হয়ে গেলো ওটা। কিন্তু এরপরেই সামনে ছুটলো। চোখা গলুই, দেবতা হোরাসের নীল চক্ষু অঙ্কিত; ঘন প্যাপিরাস ঝোঁপের উপর দিয়ে হিঁচড়ে নদীর মূল স্রোতধারা ছেড়ে শান্ত পানির ছোটো একটা হ্রদে পড়লো।

গান থামিয়ে, চোখের উপরটা হাত দিয়ে আড়াল করে সামনে তাকাল লসট্রিস। ওই তো! চিৎকার করে উঠলো সে, ছোট্ট-কমনীয় হাত দিয়ে সামনে দেখাচ্ছে ।হ্রদের দক্ষিণ প্রান্ত পুরো ঘিরে রেখেছে ট্যানাসের নৌবহরের অন্যান্য জলযান; মূল নদীর প্রবেশ মুখ আটকে রেখেছে।

স্বাভাবিকভাবেই উত্তরে অবস্থান নিয়েছে ট্যানাস; তার জানা আছে, এখানটাতেই হিংস্র শিকারের দেখা মিলবে বেশি। আমি প্রার্থনা করছিলাম, তা যেনো না হয়। এমন নয় যে আমি একজন কাপুরুষ; তবে কি না আমার কর্ত্রীর নিরাপত্তার কথাও তো । ভাবতে হয় আমাকে! বেশ ষড়যন্ত্র করেই হোরাসের প্রশ্বাস নৌকায় অবস্থান করে নিয়েছে সে, প্রতিবারের মতোই এবারেও এতে আমার বেশ বড় একটা ভূমিকা ছিলো। ওর বাবা যদি টের পায় শিকারে এসেছে লসট্রিস, যা তিনি পাবেনই, সেক্ষেত্রে আমার অবস্থা বেগতিক হতে পারে। আর যদি এটা জানতে পারেন, হোরাসের প্রশ্বাসে পুরো একদিন ট্যানাসের সংস্পর্শে ছিলো লসট্রিস; এমনকি আমার প্রতি তার সদয় স্নেহও বাঁচাতে পারবে না আমাকে। তরুণ ট্যানাসের সম্পর্কে তাঁর নির্দেশ নিয়ে ভুল করার কোনো অবকাশ নেই।

হোরাসের প্রশ্বাসে এই মুহূর্তে সম্ভবত আমি একমাত্র প্রাণী, যে কি না শিকার নিয়ে উত্তেজিত নই। বাকিরা রীতিমতো টগবগ করে ফুটছে। হাতের ঝাঁপটায় ইশারা করলো ট্যানাস, ধীরে স্থির হলো নৌকা। হ্রদের সবুজ পানিতে অল্প অল্প দুলছে ওটা। এতো স্বচ্ছ, শান্ত পানি উঁকি মেরে নিজের অবয়ব দেখলাম আমি তাতে। প্রতিবারের মতোই নিজের সৌন্দর্যে অবাক হতে হলো, নীলপদ্মের চেয়েও যেনো কমনীয় আমার মুখাবয়ব। নৌকার উপরের ব্যস্ততা আমার নিজ-সৌন্দর্য উপভোগে ছেদ টানলো।

ট্যানাসের অধস্তন একজন যোদ্ধা নৌকার মাস্ট হেডে পতাকা টানিয়ে দেয়। নীল কুমীরের ছবি মুখ হা, কাঁটাওয়ালা ভীষণ লেজটা খাড়া হয়ে আছে। দশ হাজারের সেরা উপাধি-প্রাপ্ত একজন সৈন্যেরই কেবল নিজস্ব প্রতীক টাঙানোর অধিকার আছে। ফারাও-এর নিজস্ব রাজকীয় বাহিনী, নীল কুমীরের নেতৃত্বের পাশাপাশি দশ হাজারের সেরা উপাধিও পেয়েছে ট্যানাস। বিশতম জন্মদিনের আগেই এতোকিছুর মালিক হয়েছে সে।

মাস্টহেডের ওই সংকেতের অর্থ হলো, শিকার শুরুর আহবান। দূর দিগন্তে বিন্দুর মতো অন্যান্য নৌকাগুলোর বৈঠা ছন্দোবন্ধভাবে উঠানামা শুরু করে, ঠিক যেনো আকাশে ভাসমান বুনো হাঁসের পাখার মতো; সূর্য রশ্মি চমকাচ্ছে তাদের বৈঠা থেকে ঝরে পরা পানিতে লেগে। নৌকাগুলোর পেছন থেকে উৎসারিত ছোটো ছোটো ঢেউগুলো ছড়িয়ে পরে শান্ত পানির উপর অনেকক্ষণ ধরে জেগে থাকে।

স্টার্ন থেকে গং টা বের করলো ট্যানাস, লম্বা-ব্রোঞ্জের একটা নল ওটা। প্রান্তটা। পানিতে ডুবিয়ে দেয় সে। একই ধাতুতে তৈরি একটা হাতুড়ির বাড়িতে যে শব্দ তৈরি হবে, পানির তলা দিয়ে তা পৌঁছে যাবে আমাদের শিকারের কাছে। শুরু হতে যাচ্ছে এক দক্ষ-যজ্ঞ ।

আমার উদ্দেশ্যে হাসলো ট্যানাস। এতো উত্তেজনার মধ্যেও আমার উদ্বেগ নজরে পরেছে তার। বর্বর এক যোদ্ধার বিচারে প্রচণ্ড অনুভব আছে ওর। এখানে এস, টাইটা! নির্দেশ করে সে। তুমি বরঞ্চ আমাদের পক্ষ থেকে গং টা বাজাও আজ। এতে করে তোমার সুন্দরী সম্পত্তির নিরাপত্তা নিয়ে অমূলক দুঃশ্চিন্তা থেকে রেহাই পাবে।

তার এহেন অভদ্রতায় আঘাত পেলেও স্টার্ন টাওয়ারের নিরাপদ আশ্রয় যেনো হাতছানি দিয়ে ডাকলো আমাকে। ওর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় খর চোখে তাকালাম। আমার মিসট্রেসের নিরাপত্তার দিকে একটু নজর রেখ। বুঝতে পারছো তো? কোনো রকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ওকে উৎসাহ দেবে না, তোমার তুলনায় কম বন্য নয় সে। ফারাও বাহিনীর বীর যোদ্ধা, দশ হাজারের সেরা উপাধিপ্রাপ্ত কারও সাথে ওই সুরে কথা বলতে পারি আমি, কেননা একদা আমার ছাত্র ছিলো সে। বহুবার শাস্তিও দিয়েছি তাকে। সেই আগের দিনগুলোর মতোই দুষ্ট হাসলো ট্যানাস।

মেয়েটাকে আমার হাতে ছেড়ে দাও, বুড়ো বন্ধু। এর চেয়ে বেশি আর কিছু কখনও চাইনি আমি, বুঝলে? টাওয়ারে উঠতে এতোটাই ব্যস্ত ছিলাম, এই বেয়াদপির উপযুক্ত জবাব দেওয়া হলো না। ওখানে দাঁড়িয়ে দেখলাম, নিজের ধনুক হাতে নিচ্ছে ট্যানাস।

ইতোমধ্যেই সেনাবাহিনীতে বেশ বিখ্যাত হয়ে গেছে ওই ধনুকটা। সত্যিই, সেই জলপ্রপাত থেকে শুরু করে সাগর পর্যন্ত নীল নদের তীরে সবাই জানে ওটার কথা। জিনিসটা আমি তৈরি করেছিলাম ওর জন্যে, প্রচলিত অস্ত্র সম্পর্কে বেশ বিরক্ত ছিলো সে। আমাদের নদী-বিধৌত উপত্যকায় পাওয়া দুর্বল কাঠের ধনুকের বদলে নতুন কোনো উপাদান দিয়ে তৈরির পরামর্শ দিয়েছিলাম প্রথমটায়। হয় হিটটিদের এলাকার অলিভ গাছের কাণ্ড, অথবা, কুশ দেশীয় কোনো গাছের শাখা থেকে। এমনকি, গন্ডারের শিং বা হাতির দাঁতের কথাও ভেবেছিলাম।

তৈরির প্রাথমিক পর্যায়ে দেখা গেলো, ওই সমস্ত বস্তু অত্যন্ত দৃঢ়, মোটেও নমনীয় নয়। না ভেঙে বাঁকানো এক কথায় অসম্ভব। কেবল মাত্র বিশাল কোনো হাতির শুড়ের পক্ষেই তীর টানা সম্ভব এমন ধরনের ধনুক থেকে। হাতির দাঁতের সাথে কিছুটা রুপা মিশিয়ে শেষমেষ একটা ধনুক অবশ্য বানিয়েছিলাম, কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো ওটা টানার মতো মানুষ পাওয়া সম্ভব নয়।

যা হোক, আমাদের নির্ধারিত চারটি বই একত্রে গেঁথে শেষমেষ বানানো হয়েছিলো অস্ত্রটা অলিভ গাছের কাণ্ড, ইবোনি, শুড় এবং আইভরি । বহুমাসের প্রাণান্ত পরিশ্রম, অনুশীলনের পরেই সম্ভব হলো সেটা; বিশেষ আঠা প্রয়োজন হয়েছিলো জোড়া লাগাতে। শক্তিশালী একটা আঠা খুঁজে পেতে দারুন বেগ পেতে হয়েছে, ধাতব তার দিয়ে বেঁধে সমাধান করা হয়েছিলো সমস্যাটার। আঠা গরম থাকা অবস্থাতে ট্যানাস সহ আরো দুইজন মুশকো জওয়ান লেগেছিলো তারটা বাঁকা করতে। ঠাণ্ডা হতে শক্তিমত্তা আর স্থিতিস্থাপকতার এক উৎকর্ষ নিদর্শন হলো ধনুকটা।

এরপরে বিশাল কালো কেশরওয়ালা এক সিংহের নাড়ি কেটে সংগ্রহ করেছিলাম আমি। মরুর এই হিংস্র জানোয়ারটাকে ট্যানাসই মেরেছিল ওর ব্রোঞ্জের বর্শা দিয়ে। রোদে শুকিয়ে, বেণী বেঁধে নাড়ির ওই ফিতে দিয়ে বানিয়েছি ধনুকের ছিলো; ফলে যে অসাধারণ শক্তিশালী অস্ত্র জন্ম নিলো, তা ব্যবহার করতে হলে একশ যোদ্ধার শক্তি প্রয়োজন।

তীর-বিদ্যার নিয়ম হলো, শিকারের দিকে মুখ করে দাঁড়াতে হবে–এরপরে ছিলা টেনে নিয়ে আসতে হয় বুকের দিকে টেনে; নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ধরে রেখে ছেড়ে দিতে হয় তীর। কিন্তু এমনকি ওই ধনুক টেনে ধরে রাখা ট্যানাসের পক্ষেও সম্ভব ছিলো না; নতুন এক ধরন আবিষ্কার করতে হলো তাকে। শিকারের মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে, পাশ ফিরে দাঁড়িয়ে তীর চালনা; প্রসারিত বাঁ হাতে ধনুকটা রেখে ক্রমাগত টেনে চলা যতক্ষণ পর্যন্ত না তীরের পালক তার ঠোঁট ছোয়; এরপরে, যেনো তাক না করেই তীর ছেড়ে দেয় সে। হাত এবং বুকের মাংস পেশীর অকল্পনীয় জোর প্রয়োজন এমন কৌশলে।

প্রথমটায় চাক ভেঙে ছুটে চলা মৌমাছির মতোই দিক-বিদিগ ছুটত ট্যানাসের ছোঁড়া তীর, কিন্তু দিনের পর দিন, মাসের পর মাস পরিশ্রম করে গেলো সে। ধনুকের ছিলার ঘর্ষণে ডান হাতের আঙুলগুলো রক্তাক্ত হলো, কিন্তু চালিয়ে গেলো সে। তীর ছোঁড়ার সময়ের ঘষায় বাঁ হাতের ভেতরের অংশ কালো হয়ে গেছিল, পরে চামড়ার একটা আবরণ বানিয়ে দিয়েছিলো আমি সেজন্যে। আর অনুশীলনের ধারা অব্যাহত রেখেছিলো ট্যানাস।

এমনকি আমি পর্যন্ত এ অস্ত্র ব্যবহারে তার পারদর্শিতা নিয়ে সন্দিহান ছিলাম, কিন্তু ট্যানাস হাল ছাড়েনি। ধীরে, খুবই ধীরে ওটার নিয়ন্ত্রণ পেতে শুরু করে সে, এক সময় এসে শূন্যে একটির পর একটি করে পরপর তিনটি তীর ছুঁড়তে শিখে যায়। তাদের মধ্যে অন্তত দুটি কী তিনটি টার্গেটে লাগতো। মানুষের মাথার আকারের তামার একটা চাকতি হলো টার্গেট, ট্যানাসের ছোঁড়ার জায়গা থেকে পঞ্চাশ গজ দূরে । এতটাই গতিবেগ ছিলো ছোঁড়া তীরগুলোর, আমার কড়ে আঙুলের সমান পুরুত্বের তামার পাত ফুটো করে বেরিয়ে যেতো ওগুলো।

ট্যানাস অস্ত্রটার নাম রেখেছে লানাটা। মজার ব্যাপার হলো, আমার কর্ত্রীর ছোটো বয়সের নামও ছিলো সেটা। আর এখন, হাতে প্রিয় ধনুক নিয়ে নৌকার পাটাতনে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে, পাশে তার মানসপ্রিয়া। কী অদ্ভুত মানিয়েছে ওদের দুজনকে। আমার মনের অশান্তি বাষ্প ছড়ায়।

চেঁচিয়ে ডাকলাম, মিসট্রেস! এখনই ফিরে আস এখানে! জলদিএমনকি কাঁধের উপর দিয়ে তাকালো না পর্যন্ত লসট্রিস; কেবল হাত দিয়ে একটা ইশারা করে দেখালো আমাকে। নৌকার সবাই দেখেছে ব্যাপারটা, জোরে হেসে ফেললো বয়োজেষ্ঠ্য কয়েকজন। ওই কালো, শয়তানের ধারী মেয়ে দুটোর কাছ থেকে নির্ঘাত এই ইশারা শিখেছে সে। নদী তীরের বর্বরদের মেয়েদের পক্ষে শোভন এমন আচরণ, প্রভু ইনটেফের মেয়ের পক্ষে নয়। একবার ভাবলাম, এটা নিয়ে তীরস্কার করবো ওকে, পরে বাদ দিলাম চিন্তাটা। আমার মিসট্রেস কখনও কখনও এ ধরনের বাজে আচরণ করে বৈকি। পরিবর্তে, মনের ঝাল মেটাতে তামার গংটা পেটাতে লাগলাম আমি।

ল্যাগুনের আয়নার মতো স্বচ্ছ পানির উপর দিয়ে ছড়িয়ে পরে কাঁপা কাঁপা, প্রতিধ্বনিত আওয়াজ। সঙ্গে সঙ্গেই বাতাসে ডানা মেলে ঝাঁকে ঝাঁকে পানকৌড়ি; নল খাগড়ার বন আর প্যাপিরাসের ঝোঁপের আড়াল থেকে–সূর্যটাকে যেনো লুকিয়ে ফেলবে পাখির মেঘ। মুক্ত পানি, ছোটো ছোটোদের উপরের বাতাসে ডানা ঝাঁপটাতে থাকে ওগুলো বিচিত্র রকমেরঃ কালো আর সাদা আইবিস এবং শকুনের মাথার মতো নদীর দেবীর সমতুল্য বলে মনে করা হয়; বুনো রাজহাঁস–বুকের ঠিক মাঝখানটায় রক্ত লাল একটা ফোঁটা সমেত; মাঝরাতের অন্ধকারের মতো বা সবজেটে নীল হিরন। সংখ্যায় এত–দর্শকের চোখে ধাঁধা লেগে যাবে।

মিশরীয় আভিজাত্যের একটি হলো বন্য-পাখি শিকার, কিন্তু আজ সেই শিকারে আসি নি আমরা। সেই মুহূর্তে, দূরে স্বচ্ছ জলের ঠিক নিচে একটা তোলপাড় লক্ষ্য করলাম আমি। বিশাল, বিরাট কোনো জg। আনন্দে বুক কেঁপে উঠল; জানি, কীসে করেছে ওটা। ট্যানাসও দেখেছে; তবে তার অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন। হিংস্র শিকারী কুকুরের মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠে সে; তার লোকেরা প্রকম্পিত চিল্কারে দাঁড় টানতে থাকে প্রাণপণে। ঠিক আকাশ কালো করে ফেলা পাখির ঝাকের মতোই যেনো উড়তে চায় হোরাসের প্রশ্বাস, আনন্দের আতিশায্যে ছোটো একটা চিৎকার করলো আমার মিসট্রেস; ট্যানাসের উন্মুক্ত বাহুতে মুঠো করা হাত দিয়ে আঘাত করছে সে।

আবারো আলোড়িত হলো সামনের পানি, ট্যানাসের ইশারায় সেই আন্দোলনকে অনুসরণ করে দাঁড় টেনে চলে যোদ্ধারা। যেনো নিজের সাহস বা ভরসা জিইয়ে রাখতেই গংটা পিটিয়ে চললাম আমি। শেষবার যেখানে আলোড়ন দেখা গেছে, পানির উপরে ঠিক সেইখানটায় পৌঁছলাম আমরা। থেমে আছে আমাদের নৌকা; পাটাতনে দাঁড়ানো প্রতিটি মানুষ তন্ন তন্ন করে পানিতে সামান্যতম আলোড়ন খুঁজছে।

একমাত্র আমি সরাসরি স্টার্নের উপর থেকে তাকালাম। নৌকার হালের ঠিক নিচে পানি একদম অগভীর, বাতাসের মতো স্বচ্ছ, পরিষ্কার। লসট্রিসের মতো করে তীক্ষ্ণ কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলাম আমাদের ঠিক নিচেই আছে দৈত্যটা!

নীল নদের দেবী হাপির বেশ নিকটাত্মীয় প্রাণী হলো জলহস্তি। কেবল তাঁর বিশেষ অনুগ্রহেই ওটা শিকার করতে পারি আমরা। সেই সকালেই অনুমতি প্রার্থনার জন্যে তার মন্দিরে বলিদান করে এসেছে ট্যানাস; লসট্রিস ছিলো তার পাশে। হাপি হলেন আমার কর্ত্রীর প্রিয় দেবী; তবে আমি নিশ্চিত, শুধু এই কারণেই প্রার্থনা অনুষ্ঠানে আগ্রহভরে যোগ দেয়নি সে।

যে জলহস্তিটা দেখেছি আমাদের নিচে, ওটা একটা বুড়ো ষাঁড়। আমার চোখে আমাদের গ্যালির মতোই বড় দেখাল ওটাকে; বিরাট একটা আকৃতি হ্রদের মেঝেতে হেলেদুলে চলেছে। স্রোতের টানে ধীর হয়ে গেছে গতিবেগ, মনে হলো যেনো দু:স্বপ্ন থেকে উঠে আসা কোনো জীব। মরুভুমির ষাড় যেমন করে দৌড়ানোর আগে খুর দিয়ে ধুলো আঁচড়ায়, তেমনি করে কাঁদার দলা গোলা পাকিয়ে উঠছে ওটার পায়ের তলা থেকে।

হাল ধরে, নৌকাটা ঘুরিয়ে নেয় ট্যানাস; বঁড়টার পেছনে ছুটতে শুরু করে হোরাসের প্রশ্বাস। কিন্তু এমনকি ধীর, হেলেদুলে চলা গতিতেও খুব দ্রুতই আমাদের নৌকা থেকে দূরে সরে যেতে থাকে ওটা। সামনে, হ্রদের গভীর সবুজ জলে হারিয়ে যায় তার অবয়ব।

টানো! সেথ –এর দুর্গন্ধময় শ্বাসের কসম, টানো! দাড়ীদের উদ্দেশ্যে গর্জে উঠে ট্যানাস। কিন্তু এক পদস্থ যোদ্ধা তার হাতে চাবুক তুলে দিতে নিঃশব্দে মানা করলো সে। প্রয়োজন ছাড়া কখনও কারো উপর চাবুক চালাতে দেখিনি ওকে।

হঠাই, সামনে পানি ছেড়ে জেগে উঠে জলহস্তি ষাড়, ফুসফুঁসের ভেতর থেকে বাষ্প ছিটিয়ে দেয় হিসহিস শব্দে। এতো দূরে আছে ওটা, এরপরেও দুর্গন্ধময় শ্বাস ধুয়ে দেয় আমাদের। এক মুহূর্তের জন্যে ওটার বিশাল পেছনটা চকচকে গ্রানাইটের মতো জেগে থাকে হ্রদের পানিতে; এরপরে, বাঁশির মতো শব্দে শ্বাস টেনে আবারো ডুব দেয়।

পেছনে লেগে থাকো! হুঙ্কার ছাড়ল ট্যানাস।

ওই তো, চিৎকার করে উঠে হাতের ইশারায় পাশে দেখালাম আমি, ফিরে আসছে ওটা!

দারুন দেখালে, বুড়োখোকা, আমার উদ্দেশ্যে হাসলো ট্যানাস, তোমাকে ঠিক ঠিক যোদ্ধা বানাতে পারবো আমরা, এখনও সময় আছে। একেবারেই বাজে কথা এটা, আমি একজন লিপিকার, গীতি-নাট্যকার বা শিল্পী হতে পারি যোদ্ধা কখনও নই। আমার যুদ্ধ চলে মনের গভীরে। এরপরেও ট্যানাসের প্রংশসায় সবসময়ের মতোই আপ্লুত হলাম। নৌকার উপরের উত্তেজনার বুঝি কোনো সীমা-পরিসীমা নেই এই মুহূর্তে।

দক্ষিণে, আমাদের বাহিনীর অন্যান্য গ্যালিগুলো যোগ দিলো শিকারে। হ্রদের পানির জলহস্তির সংখ্যা সতর্কভাবে হিসেব করে রাখে হাপির মন্দিরের পুরোহিতেরা। দেবতা ওসিরিসের উৎসবের জন্যে পঞ্চাশটি পর্যন্ত শিকার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে আমাদের। এরপরেও, প্রায় তিনশ প্রাণী থাকবে হাপির ল্যাগুনে; ফলে আগাছা এবং প্যাপিরাসের ঝোঁপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করেন মন্দিরের পুরোহিতেরা । দেবতা ওসিরিসের উৎসবের দশ দিন বাদে একমাত্র পুরোহিতেরা ছাড়া আর কেউ জলহস্তির মাংস খেতে পারে না।

পানির উপরে জটিল নৃত্যের মতো ছড়িয়ে পরে শিকার অভিযান। ঢেউয়ের তালে নাচতে লাগলো আমাদের গ্যালিগুলো; ধাওয়া করে চললো বিশাল জন্তুগুলোকে। পানিতে ডুবে আবার ভেসে উঠছে ওগুলো, শিষের মতো আওয়াজ করে পানি ছিটাচ্ছে; জান্তব হুঙ্কারে প্রকম্পিত হলো এলাকা। বারবার ডুবে আবার ভেসে উঠছে, প্রতিবার কমে আসছে পানির নিচে স্থায়িত্বকাল। ফুসফুস খালি হয়ে গেছে জল্পগুলোর, কিন্তু শ্বাস নিতে যখনই উপরে ওঠছে, আমাদের ধাওয়ারত গ্যালিগুলো চড়ে বসছে মাথার উপর বাধ্য করছে আবারো ডুব দিতে। প্রতিটি গ্যালির স্টার্ন টাওয়ারের গং বাজছে প্রচণ্ড শব্দে; দাঁড়া টানা যোদ্ধাদের অমানুষিক চিৎকারের সাথে তাল মিলিয়ে। আদিম, পাশবিক কোনো দৃশ্যের মঞ্চায়ন–এমনকি সবচেয়ে রক্তপিপাসু কোনো বর্বরের মতো উত্তেজনায়, আনন্দে আমিও চিৎকার করছি–আবিষ্কার করলাম।

প্রথমে যেটাকে দেখেছিলাম, সেই বিশালতম মদ্দাটার পেছনে লেগে আছে ট্যানাস। তীরের নাগালের মধ্যে থাকা মাদী-জন্তু আর বাচ্চাগুলোকে উপেক্ষা করছে সে। এঁকেবেঁকে, পেঁচিয়ে ডুবে, ভেসে আবার ডুবে ফাঁকি দেওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা করে চললো জটা কিন্তু প্রতিবারে আরো কাছে চলে এলো আমাদের গ্যালি। এতো উত্তেজনার মাঝেও হোরাসের প্রশ্বাস পরিচালনায় ট্যানাসের মুন্সিয়ানার প্রশংসা না করে পারলাম না; অদ্ভুত পারদর্শিতার সাথে নির্দেশনা দিয়ে চলেছে সে প্রতিটা মুহূর্ত। দাঁড়ীরাও তার আদেশ পালন করছে সুনিপুণভাবে। বোঝাই যায়, জন্ম-ভাগ্য বা পদস্থ বন্ধু-বান্ধব না থাকার পরেও কেমন করে এত কম বয়সে ফারাওয়ের বাহিনীতে আজকের উচ্চতায় পৌঁছেছে সে। সবই নিজের প্রচেষ্টায়, পরিশ্রমে–কোনোসময়ই তার পথে কাঁটা বিছানোর লোকের অভাব ছিলো না।

হঠাৎই আমাদের গলুই থেকে মাত্র তিরিশ গজ দূরে ভেসে উঠলো মদ্দাটা। সূর্যরশ্মি ঝিকমিক করছে তার চকচকে পিচ্ছিল শরীরে পরে; কালো আর বিপুল; নাকের ফুটো দিয়ে বেরিয়ে আসছে বাষ্পের মেঘ ঠিক যেনো অন্ধকার জগতের শয়তানের মতো।

চোখ ধাঁধানো দ্রুততার সাথে ধনুকে তীর জুড়েই ছুঁড়ে দিলো ট্যানাস। কঁপা, কাঁপা- মৃদু আওয়াজের সাথে ছুটল সেটা লানাটা থেকে, চোখে ঠাওর হয় না, এতো দ্রুত। প্রথম তীরটা বাতাসে ভাসমান অবস্থাতেই ছুটল দ্বিতীয়টা; এরপরে আরো একটা। ধনুকের ছিলো যেনো কোনো বাদ্য-যন্ত্র, বাঁশির মতো শব্দ করে চলেছে ঘন ঘন। পর পর আঘাত করলো তীরগুলো জন্তুটার বিশাল পেছনটায়, পুরোটা সেঁধিয়ে গেছে; আর্তনাদ করে উঠে আবার ডুব দিলো মদ্দাটা।

বিশেষত আজকের অভিযানের জন্যে ভিন্ন তীর প্রস্তুত করেছিলাম আমি। পালকের পাতাগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে সেগুলো থেকে, তার বদলে জেলেরা তাদের জালে যে বেওয়াব গাছের কাঠের ছোটো টুকরো ব্যবহার করে, সেরকম লাগানো হয়েছিলো। তীরের মাথা থেকে এমনভাবে বেরিয়ে থাকে ওগুলো, গতিপথে কোনো পরিবর্তন আসবে না; কিন্তু একবার সেঁধিয়ে গেলে ছড়িয়ে পড়বে জন্তুটার শরীরে। ব্রোঞ্জের মাথার সাথে লিনেনের সুতা দিয়ে বাঁধা জন্তুটা পানিতে তলিয়ে যেতেই কাঠের টুকরোগুলো ভেসে উঠে আমাদের জানিয়ে দিলো ওটার অবস্থান। উজ্জ্বল হলুদ রঙে ওগুলোকে রাঙিয়েছিলাম আমি, এতে করে পানির উপরে স্পষ্টই দৃশ্যমান হয়েছে। মদ্দাটার অবস্থান প্রতিনিয়ত জানতে পারছি আমরা, যদিও ল্যাগুনের গভীর পানির তলায় রয়েছে ওটা।

জলহস্তির শেষ আক্রমনের সবকিছুই পর্যবেক্ষণ করা এখন সহজ হয়ে গেছে ট্যানাসের জন্যে। প্রতিবার যখনই ভেসে উঠলো জটা, আগে থেকেই অবস্থান নিয়ে তার চকচকে পিঠে তীর গেঁথে দিতে লাগলো সে। হোরাসের প্রশ্বাস ও সেইমতো পিছু ধাওয়া করে চললো। এতক্ষণে লাল হতে শুরু করেছে ল্যাগুনের পানি। ট্যানাসের ছোঁড়া তীর আঘাত করেছে জায়গামত। এত উত্তেজনার মধ্যেও প্রতিবার উপরে ভেসে ওঠা জন্তুটার জন্যে মায়া অনুভব করলাম আমি। যতবার উপরে উঠল, ঝাকের পর ঝাক মারণ-তীর আশ্রয় করে নিল তার বিশাল শরীরে। আমার এই সহানুভূতি কিন্তু এতটুকু দেখা গেলো না আমার কীর আচরণে; বরঞ্চ উত্তেজনায় টান টান, থেকে থেকে তীক্ষ্ণ কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠছে সে।

আবার ভেসে উঠলো মদ্দাটা; কিন্তু এবারে আমাদের গ্যালির মুখোমুখি । এতো বড় হা করা মুখ, গলার ভেতরে অনেকদূর দেখতে পেলাম। যেনো লাল মাংসের একটা সুড়ঙ্গ, সহজেই আস্ত একটা মানুষ গিলে খেতে পারবে। চোয়ালের তীক্ষ্ণ দাঁতগুলো দেখে গা শির শির করে উঠলো আমার। নিচের চোয়ালে কাস্তে আকৃতির দাঁতগুলো প্রয়োজন হয় প্যাপিরাসের শক্ত নল ছিঁড়ে চিবুতে। উপরের চোয়ালে ঠিক আমার কবজির সমান চওড়া সাদা দাঁত; হোরাসের প্রশ্বাসে এর হাল-পাটাতন এমন সহজ ভাবে কেটে ফেলতে পারবে, যেমন করে পিঠা খাই আমরা। সম্প্রতি নদীর ধারে প্যাপিরাসের ঝোঁপ কাটার সময় এক জলহস্তিকে ভড়কে দেওয়া হতভাগ্য কৃষাণীর দেহাবশেষ দেখেছি; মাত্রই বাচ্চার জন্ম দিয়েছিল মাদী জটা; এমনভাবে দুই ভাগ হয়ে গেছিল মেয়েটার শরীর, যেনো ব্রোঞ্জের ফলা দিয়ে কাটা হয়েছে।

আর এখন, এই ক্ষ্যাপা জটা চকচকে দাঁত বের করে বিশাল হা সমেত চড়ে বসতে চাইছে আমাদের উপর; স্টার্ন টাওয়ারের সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থানে থেকেও ভয়ে, আতঙ্কে ঠিক দেবতাদের মূর্তিগুলোর মতোই স্থির, বাকরুদ্ধ হয়ে রইলাম আমি।

আরো একটা তীর ছুঁড়লো ট্যানাস; সোজা মদ্দাটার হাঁ করা মুখের ভেতরে ঢুকে গেলো সেটা। কিন্তু ইতোমধ্যেই এতটা যন্ত্রণা সয়েছে ওটা, নতুন করে কিছু অনুভব করছে না। যদিও এবারের আঘাতটা নিঃসন্দেহে প্রাণঘাতি। কোনো রকম অস্বস্তি ছাড়াই হোরাসের প্রশ্বাসের গলুইয়ে চড়ে বসল ওটা। আঘাতপ্রাপ্ত গলার গভীরে কোথাও একটা ধমনী ছিঁড়ে গেছে; মরণ-চিৎকারে খোলা চোয়ালের ফাঁক দিয়ে গরম রক্তের ধারা যেনো বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়লো। ঝকঝকে সূর্যালোকে লাল একটা মেঘের মতো জেগে রইলো বাতাসে; একইসঙ্গে কী মোহনীয় আর আতঙ্ক-জাগানিয়া। আর এরপরেই, সোজা আমাদের গলুইয়ের উপর আছড়ে পড়লো জটা।

দ্রুত ধাবমান গ্যাজেল হরিণের গতিতে ছুটছিল আমাদের গ্যালি; কিন্তু রাগে উন্মাদ, মৃত্যু-যন্ত্রণায় কাতর মদ্দাটার বিশাল আকারের সঙ্গে প্রচণ্ড সংঘর্ষ ঘটলো হোরাসের প্রশ্বাসের। দাঁড়-টানা বেঞ্চের থেকে এদিক-সেদিক নিক্ষিপ্ত হলো যোদ্ধারা; স্টার্ন টাওয়ারের মাথা থেকে রেইলিংয়ের উপর এতো জোরে আছড়ে পড়লাম আমি, বুকের ভেতরের সমস্ত বাতাস বেরিয়ে গেলো এক পলকে নিঠুর যন্ত্রণা এখন সেখানে।

কিন্তু, এমনকি নিজের এই অবস্থাতেও আমার মূল দুঃশ্চিন্তা আমার মালকীনের জন্যে। চোখের পানিতে ঝাপসা দৃষ্টি; এরমধ্যেই দেখলাম সংঘর্ষের প্রাবল্যে ছিটকে সামনে পরে গেছে সে! হাত বাড়িয়ে ওকে ধরতে যথেষ্টই চেষ্টা চালাল ট্যানাস, কিন্তু সে নিজেও সংঘর্ষের কারণে টালমাটাল; বা হাতে ধরা ধনুকটাও বাধা হয়ে দাঁড়াল তার প্রচেষ্টায় । লসট্রিসের অধঃগতি কেবল কিছু সময়ের জন্যে রোধ করতে সক্ষম হলো সে; এরপরে হাত-পা ছড়িয়ে রেইলের উপর পড়লো লসট্রিস, পিঠ বাঁকা করে টপকে গেলো ওটা।

ট্যানাস, আতঙ্কে চেঁচালো মেয়েটা, এক হাত বাড়িয়ে ট্যানাসের হাত ধরতে চাইছে। মুহূর্তের মধ্যে দড়াবাজের কৌশলে ভারসাম্য ফিরে পেলো ট্যানাস, ধরতে চাইল হাতটা। এক পলকের জন্যে ওদের আঙ্গুল চুল পরস্পরকে, তারপর যেনো টেনে সরিয়ে নেওয়া হলো লসট্রিসকে।

সবার উপরে, স্টার্ন টাওয়ারে দাঁড়িয়ে লসট্রিসের পতন দেখতে পেলাম আমি। ঠিক বিড়ালের মতো শূন্যে মোচড় খেল সে, সাদা স্কার্ট কোমরের উপরে উঠতে দৃশ্যমান হলো এক জোড়া অসাধারণ উরু। মনে হলো যেনো এক জনম ধরেই পড়ছে সে, আমার হতাশ চিৎকারের সাথে মিশে গেছে ওর দারুন আর্তনাদ।

আমার ছোট্ট সোনা! কেঁদে ফেললাম আমি, আমার মিসট্রেস! নিশ্চিত জানি, ওকে হারিয়েছি আমরা। ওর পুরো জীবনটা যেনো এক লহমায় ভেসে উঠলো চোখের সামনে। বাচ্চা বয়সে ওর কান্না, দুষ্টামি; আমার সাথে যত খুনসুটি সব মনে পরে গেলো একে একে। তরুণী হয়ে উঠতে দেখেছি আমি ওকে; ওর প্রতিটি আনন্দে, যন্ত্রণায় আমার চেয়ে কাছাকাছি আর কে ছিলো? গত চৌদ্দটি বছরে ওকে যতোটা ভালোবেসেছি; আজ ওকে হারাবার দিনে যেনো তার চেয়ে বেশি ভালোবাসি মনে হলো।

বিশাল, রক্ত-চর্চিত মরণাপন্ন মদ্দাটার পিঠে আছড়ে পড়লো লসট্রিস; এক মুহূর্তের জন্যে হাত-পা ছড়িয়ে পরে থাকলে সেখানে; যেনো কোনো ধর্মের বলি হিসেবে ফেলে রাখা হয়েছে মূর্তির সামনের বেদীতে। পাক খেয়ে শূন্যে ভেসে উঠলো জলহস্তি, বিশাল, আক্রান্ত ঘাড় ঘুরিয়ে নাগাল পেতে চাইছে তার। রক্তাক্ত, শূকরের মতো ছোটো ছোটো চোখ দুটো রাগের সাথে পাল্লা দিয়ে জ্বলল, চোয়াল হাঁ হয়ে আছে।

কেমন করে যেনো নিজেকে ধরে রেখেছে লসট্রিস; জটার বিশাল পেছন থেকে বের হওয়া তীরের মাথা ধরে আটকে রেখেছে শরীরটা। হাত-পা ছড়িয়ে পরে আছে সে। এখন আর আর্তনাদ করছে না, বেঁচে থাকার জন্যে ব্যস্ত সময় কাটছে প্রতিটি প্রচেষ্টায়। প্রতিবার মনে হলো, যেনো এক চুলের জন্যে তার নাগাল পেলো না জলহস্তির হাঁ করা মুখ।

নৌকার সামনে, নিজেকে দ্রুত ফিরে পেলো ট্যানাস। এক মুহূর্তের জন্যে ওর মুখটা দেখতে পেলাম আমি, রাগে উন্মত্ত। একপাশে এই মুহূর্তে অকার্যকর ধনুকটা সরিয়ে রাখলো সে; পরিবর্তে আঁকড়ে ধরলো তলোয়ারের বাঁট। কুমীরের চামড়া দিয়ে তৈরি খাপ থেকে মুক্ত হলো ফলা, প্রায় তার হাতের সমান লম্বা সেটা; তামার তৈরি চকচকে।

এক লাফে গলুইয়ে চড়ল সে; নিজেকে স্থির করে নিয়ে তাকাল নিচের পানিতে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর জন্তুটার দিকে। এরপরে, দুই হাতে তলোয়ার নিচু করে ধরা অবস্থায় বাজ পাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো শূন্যে।

মদ্দাটার বিশাল ঘাড়ের উপর খাড়া হয়ে নামলো ট্যানাস, যেনো বিশাল প্রাণীটাকে পানিতে ডুবিয়ে দেবে। নিজের শরীরের ওজন, এতো উঁচু থেকে লাফের শক্তি–সবই ছিলো তলোয়ারের পেছনে। ঘাড়-মাথার সংযোগস্থলে পুরো অর্ধেক ফলা সেঁধিয়ে গেলো; উপরে চড়ে বসা ট্যানাস তার শক্তিশালী দুই কাঁধের জোরে খুঁচিয়ে আরো ভেতরে নিয়ে যেতে লাগলো সেটা। ল্যাগুনের জল ছেড়ে প্রায় পুরোটা শরীর শূন্যে নিক্ষিপ্ত হলো প্রাণীটার; এপাশ-ওপাশ দুলছে মাথা, পানির ভারী পশলা এত উপরে ছিটকে আসছে যে, আমাদের গ্যালিতে পর্দার মতো আড়াল তৈরি করে ফেললো নিচের রোমাঞ্চকর দৃশ্য থেকে।

এত কিছুর ভেতর দিয়েও, জন্তুটার পিঠে অসহায়ভাবে এক জোড়া মানুষকে দুলতে দেখছি আমি। হাতের একটা তীরের মাথা ছুটে যেতে প্রায় পরে যেতে বসেছে লসট্রিস। তেমনটি ঘটলে, তীক্ষ্ণ দাঁতে ওকে ফালাফালা করে ফেলবে মরণাপন্ন জলহস্তি। পেছনে ঝুঁকে এক হাতে লসট্রিসের পতন ঠেকালো ট্যানাস; ডান হাতে অবিরত খুঁচিয়ে চললো তলোয়ারের ফলাটা জানোয়ারটার শরীরের গভীরে সেঁধিয়ে যাচ্ছে আরো।

ওদের নাগাল না পেয়ে দাঁত খিচাল জটা; গলার দুধারে মারাত্মক ক্ষত দেখা দিয়েছে ওটার গ্যালির পঞ্চাশ গজমত দূরের প্রতিটি প্রাণী, লসট্রিস এবং ট্যানাসের পা থেকে মাথা পর্যন্ত রক্তের ধারায় ভিজে গেলো । লাল পর্দার আড়াল থেকে কেবল চকচকে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে চোখদুটো।

মদ্দাটার মরণ-আস্ফালন গ্যালির পাশ থেকে বেশ খানিকটা দূরে ঠেলে নিয়ে গেছে ওদের; একমাত্র আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম সবার আগে। দাড়ীদের উদ্দেশ্যে চেঁচালাম, অনুসরণ কর ওটাকে! যেনো পালিয়ে যেতে না পারে! চমকে উঠে কাজে লেগে পরে তারা, সচল হয় হোরাসের প্রশ্বাস।

ঠিক সেই সময়েই, ট্যানাসের ব্রোঞ্জের ফলা সম্ভবত জন্তুটার ঘাড়ে মেরুদণ্ডের, সংযোগস্থল খুঁজে পায়, সেঁধিয়ে পরে ছিঁড়ে ফেলে মস্তিষ্কের সঙ্গে যোগাযোগ। বিশাল শরীরটা যেনো জমে গেলো জায়গায়। শক্ত করা চার পা লম্বা করে চিৎ হয়ে পড়লো ওটা, ল্যাগুনের পানিতে লসট্রিস আর ট্যানাস সমেত তলিয়ে গেলো।

গলা দিয়ে উঠে আসা হতাশার চিৎকারটা রোধ করলাম আমি; হুঙ্কার দিয়ে নির্দেশ দিতে লাগলাম নৌকার পাটাতনে দাঁড়ানো হতবুদ্ধ কর্মীদের। পেছনে টানো! ওদের উপরে চড়ে বসো না! গলুইয়ের সাঁতারুরা ঝাঁপিয়ে পর! নিজের কণ্ঠস্বরের শক্তিমত্তা এবং দায়িত্বে এমনকি আমি নিজেও চমকে গেছি।

গ্যালির সম্মুখ-যাত্ৰা রোধ হলো। কী করছি বুঝে উঠার আগেই পাটাতনের উপর দিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় যোদ্ধার দলের মাঝখান দিয়ে ছুটলাম। অন্য কাউকে নৌকা থেকে পরে যেতে দেখলে হয়তো আমোদ পেত এরা, কিন্তু তাদের বীর সেনাপতি ট্যানাসকে দেখে নয়।

আমি স্কার্ট খুলে ফেলেছি ইতোমধ্যেই সম্পূর্ণ নগ্ন এই মুহূর্তে। ভিন্ন কোনো সময়ে চাবুকের একশ ঘা দিয়েও এটা করানো যেত না আমাকে দিয়ে, সাম্রাজ্যের জল্লাদের অনেক কাল আগে করা কীর্তি মাত্র আর একজন মানুষকে দেখেছে; মূলত সেই ব্যক্তিই খোঁজা করার উদ্দেশ্যে ছুরি ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিলেন আমার উপর। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, পৌরুষের তেজদীপ্ত অঙ্গহারা নিজেকে অন্যদের দৃষ্টির সামনে প্রদর্শন করতে এতটুকু ভাবলাম না।

খুব ভালো সাঁতারু আমি, হয়তো অন্য কোনো সময়ে এ ধরনের আচরণকে বোকামীর চোখে দেখতাম; কিন্তু আমি সত্যিই বিশ্বাস করি রেইল টপকে রক্তাক্ত পানিতে ঝাঁপিয়ে পরে সম্ভবত আমার মিসট্রেসকে উদ্ধার করতে পারবো এ যাত্রায় । যাই হোক, জাহাজের রেইলে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রস্তুত করছিলাম; ঠিক আমার নিচের পানি ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো দুটো মাথা এত কাছাকাছি যেনো পরস্পর মিলিত হয়ে আছে। একটা মাথা কালো, অপরটি পরিষ্কার, কিন্তু ও দুটোই আমার কাছে সবচেয়ে অভাবিত আচরণ করছিল। হাসছিলো ওরা। উত্তেজনা, আনন্দ আর রোমাঞ্চে হাসছে লসট্রিস আর ট্যানাস; জাহাজের পাশ ঘেঁসে ভেসে থেকে পরস্পরকে এতটা জোরে আঁকড়ে ধরে আছে, সন্দেহ হলো ডুবে না যায়।

সাথে সাথেই আমার যত উদ্বেগ পর্যবসিত হলো রাগে–এই উন্মাদনার প্রতি। নিজের প্রায় করতে যাওয়া নির্বুদ্ধিতার জন্যেও রাগ হচ্ছিলো খুব। হারানো সন্তানকে ফিরে পাওয়া মায়ের মতোই তীরস্কারে ব্যাপৃত হলাম; নিজের কণ্ঠস্বরে আর আগের দায়িত্ব নেই, আছে স্বস্তি মিশ্রিত উপহাস। ডজনখানেক উদ্বেল হাত যখন পানি থেকে ওদের দুজনকে টেনে তুললো জাহাজে, তখনও আমার মিসট্রেসকে তীরস্কার করছিলাম আমি।

তুমি অসাবধানী, পরিচর্যা না করা জংলী! ওর উদ্দেশ্যে ক্ষোভের স্বরে বলছিলাম, নির্বোধ! স্বার্থপর, অবাধ্য কোথাকার! প্রতিজ্ঞা করেছিলে আমার কাছে! দেবীদের কুমারীত্বের নামে কসম কেটেছিলে

দৌড়ে এসে আমাকে গলার দুধারে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো লসট্রিস। ওহ টাইটা! বলে উঠল, এখনও হাসছে আনন্দে। তুমি দেখেছ ওকে? দেখেছ, কেমন করে আমাকে উদ্ধার করেছে ট্যানাস? তোমার শোনা সবচেয়ে বীরত্বপূর্ণ কাজ ছিলো না ওটা? তোমার গল্পগুলোর সেই নায়কদের মত?

আমি নিজেও যে একই ধরনের নায়কোচিত একটা কাজ করবার প্রাক্কালে ছিলাম, সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হলো ব্যাপারটা। আমার মেজাজটা আরো খারাপ হলো তাতে। হঠাৎ টের পেলাম, পানিতে ওর স্কার্ট হারিয়েছে লসট্রিস; ঠান্ডা আর ভেজা আমার দেহের সাথে লেপ্টে থাকা শরীর সম্পূর্ণ নগ্ন ওর। যোদ্ধাদের কর্কশ দৃষ্টির সামনে পুরো মিশরের সবচেয়ে সুদর্শন, কমনীয় জোড়া-পুচ্ছ প্রদর্শন করছে সে এই মুহূর্তে।

কাছের একটা ঢাল তুলে নিয়ে আমাদের দুজনের শরীরই আড়াল করলাম আমি, দাসী মেয়েগুলোকে চিৎকার করে বললাম লসট্রিসের জন্যে আরেকটি স্কার্ট নিয়ে আসতে। ওদের খিলখিল হাসি আমার রাগ আরো বাড়িয়ে দিল; শেষমেষ আমি এবং লসট্রিস দুজনেই ভদ্রস্থ অবস্থা ফিরে পেতে ট্যানাসের উদ্দেশ্যে বললাম:

আর তুমি! অসাবধান বর্বর! আমার প্রভু, ইনটেফের কাছে তোমার ব্যাপারে বলব আমি! তোমার পাছার ছাল যদি না তুলে নেওয়া হয়েছে–

তুমি এমন কিছু করবে না, হেসে বললো ট্যানাস। শক্তিশালী দুই হাতে মতো জোরে জড়িয়ে ধরলো আমাকে, প্রায় শূন্যে উঠে গেলো পুরো শরীর। কেননা, সত্যিই স্বানন্দে আমার পাছার ছাল তুলে নেবেন উনি; যাই হোক, তোমার উদ্বেগের জন্যে ধন্যবাদ, বুড়ো বন্ধু।

দ্রুত ঘুরলো সে, এক হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে ভুরু কোঁচাকালো। বাহিনীর অন্যান্য জাহাজগুলো থেকে আলাদা হয়ে গেছে হোরাসের প্রশ্বাস, এতক্ষণে অবশ্য শিকার অভিযান শেষ হয়েছে। আমাদেরটা ছাড়া অন্য সবগুলো গ্যালি পুরোহিতদের নির্দেশিত পরিমাণ নিয়ে ফেলেছে।

মাথা নাড়ল ট্যানাস। আমরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারি নি, তাই না? হতাশার ধ্বনি বেরুলো তার গলা থেকে; বাহিনীকে ফিরে আসার জন্যে নতুন বার্তা সম্বলিত পতাকা উত্তোলনের নির্দেশ দিলো সে।

জোর করে হাসলো এরপরে আমার উদ্দেশ্যে। চল, এক জগ সুরা পাণ করা যাক। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, বেশ তৃষ্ণা পেয়ে গেছে। গলুইয়ের কাছে, যেখানে দাস-মেয়েগুলো গুজুড়-গুজুড় করছিল লসট্রিসের সাথে, সেই দিকে হেঁটে গেলো সে। প্রথমটায় এতো রেগে ছিলাম আমি, ভাবলাম এই পিকনিকে যোগ দেব না। স্টার্নের উদ্দেশ্যে হেঁটে যেতে থাকলাম দৃষ্টিতে বিরক্তি নিয়ে।

ওহ, ওকে কিছুসময় একা থাকতে দাও, ইচ্ছাকৃত জোরাল শব্দে ট্যানাসের কানে ফিসফিস করছে লসট্রিস; শুনতে পেলাম। ওর পাণ-পাত্র ভরে দিচ্ছে মেয়েটা। বুড়ো প্রিয়তমা আজ বেশ ভয় পেয়ে গেছে। তবে খিদে পেলে ঠিক হয়ে যাবে ও। খাওয়া ভালবাসে সে।

এই হলো আমার মিসট্রেসের বিচার; আমি মোটেও পেটুক নই, আর সেই সময় আমার বয়স ছিলো মাত্র ত্রিশ বছর। অবশ্য চৌদ্দ বছরের বালিকার পক্ষে ত্রিশ বছরের কাউকে বুড়ো মনে হতেই পারে, সেটা আমি মানি; তবে এটা সত্যি, খাওয়া-দাওয়ার বেলায় আমার রুচি একটু উঁচুই । বুনো হাঁসের ঝলসানো মাংস, ওটা এখন শোভা পাচ্ছে ওর থালায়, আমার খুব প্রিয় সেটা; বোধকরি, লসট্রিসও জানে এটা।

আরো কিছুক্ষণ ওদেরকে শাস্তি দিলাম আমি। শেষমেষ ট্যানাস নিজে এসে একটা পাত্রে সুরা বাড়িয়ে ধরে আহ্বান করতে ওর সাথে যোগ দিতে এগুলাম। এরপরেও, বেশ খানিকটা আড়ষ্ট বোধ করছিলাম, তবে লসট্রিস আমার দুই গালে চুমো খেতে বরফ গললো একটু; সবাইকে শুনিয়ে সে বললো, মেয়েরা আমাকে বলেছে, ঠিক বয়োজেষ্ঠ্য যোদ্ধার মতোই জাহাজের নির্দেশ দিয়েছিলে তুমি; আর একটু হলে নাকি নিজেই লাফিয়ে পানিতে পড়তে, আমাকে উদ্ধার করতে । ওহ টাইটা, তোমাকে ছাড়া কেমন করে চলতো আমার? কেবলমাত্র এই কথার পড়েই ওর এগিয়ে দেওয়া হাঁসের মাংস নিলাম আমি, হাসলাম একটু। দারুন ছিলো খাবারটা, আর সুরাটাও প্রথম শ্ৰেণীর। খুব কম করেই খেলাম, নিজের স্বাস্থ্যের দিকেও তো নজর রাখতে হবে– আমাকে। আর তাছাড়া, আমার ক্ষুধা সম্পর্কিত লসট্রিসের কিছুক্ষণ আগের উপহাসও ভূমিকা রাখলো এতে।

ল্যগুনের চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছিলো ট্যানাসের বাহিনী। এতক্ষণে একত্র হতে কে করেছে জাহাজগুলো। কিছু কিছু গ্যালি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে–লক্ষ করলাম। শিকারের উত্ততায় মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটেছিল দুটো জাহাজের; বাকি চারটে আক্রান্ত হয়েছে জলহস্তির দ্বারা। যাই হোক, দ্রুতই একত্র হয়ে ফিরে যেতে উদ্যত সব কয়টা। হোরাসের প্রবাসের সমান্তরালে আসতে হর্ষ ধ্বনি করলো নাবিকেরা। মুঠি বদ্ধ হাত উঁচিয়ে অভিবাদনের প্রতুত্তর জানাল ট্যানাস; আমাদের মাস্ট হেডে শোভা পাচ্ছে নীল কুমীর বাহিনীর প্রতীক। হয়তো একটু ছেলেমানুষি কিন্তু সামরিক বাহিনীর উদ্যাপনের প্রকার তো এমনই।

প্যাডল এবং হালের অপূর্ব সমন্বয়ে জাহাজগুলো ধীরে নিজ নিজ অবস্থানে চলে এলো; মৃদু-মন্দ নীল নদের বাতাসের বিপরীতে। শিকার করা জলহস্তির কোনো চিহ্ন অবশ্য দেখা যাচ্ছে না, প্রতিটি গ্যালি কমপক্ষে একটি ক্ষেত্র বিশেষে দুই কি তিনটি করে জন্তু মেরেছে। ভারী মৃতদেহগুলো হারিয়ে গেছে হ্রদের গভীর জলের তলায়। আমি জানি, ট্যানাস মনে মনে অনুতাপ করছে, হোরাসের প্রশ্বাস শিকার অভিযানে সবচেয়ে সফল না হওয়ায়। আসলে, মদ্দাটার সাথে আমাদের যুদ্ধে বেশ খানিকটা সময় চলে যাওয়ায় কেবল ওই একটি জানোয়ার মারতে সক্ষম হয়েছি আমরা। নিজের জন্যে সর্বোচ্চ স্থান সব সময় ট্যানাসের আরাধ্য। হোরাসের প্রশ্বাসের জখমি হাল মেরামতের তদারকি করতে চললো সে।

মদ্দাটার আক্রমণে পানির তলায় কাঠের পাটাতন দারুন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে; চামড়ার বালতি দিয়ে সেঁচেও জাহাজে পানি উঠা ঠেকানো যাচ্ছে না। দাঁড়টানা যোদ্ধাদের নিজ নিজ কাজ ফেলে এটা করতে হচ্ছে বলে সময়ও নষ্ট হচ্ছে প্রচুর। নিশ্চই এর থেকে মুক্তির কোনো না কোনো উপায় আছে, নিজের মনেই ভাবলাম আমি।

নিহত জন্তুগুলোর দেহ ভেসে উঠার অপেক্ষায় আছি আমরা, একটা দার্স মেয়েকে ডেকে পাঠালাম আমার লেখার সরঞ্জাম ভর্তি পাত্র নিয়ে আসার জন্যে। এরপরে, মনে মনে ভেবে রাখা একটা প্রক্রিয়া এঁকে নিতে লাগলাম; যুদ্ধ-গ্যালির পাটাতনে উঠা পানি কৌশলে সরিয়ে নেওয়ার একটা উপায়, যাতে করে অর্ধেক যোদ্ধার প্রয়োজন হবে না এ কাজে। বারো জনের বদলে মাত্র দুইজনকে দিয়ে কাজটা করা সম্ভব বলেই আমার ধারণা।

আঁকা শেষ হতে গ্যালির অবস্থা পর্যবেক্ষণে গেলাম আমি। ইতিহাস বলে, ভূমির যুদ্ধের মতোই জলপথেও গ্যালি নিয়ে যুদ্ধের কৌশলগত পার্থক্য সামান্যই। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর চালনা। এরপরে, কাছাকাছি এসে অন্য জাহাজের দখল নিয়ে তলোয়ারের মাধ্যমেই ফয়সালা করা হয়। পরস্পর সংঘর্ষ থেকে দারুনভাবে সতর্ক থাকতে হয় গ্যালির প্রধান নাবিককে; মুখোমুখি ধাক্কা খাওয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক বলে মনে করা হয়।

কিন্তু যদি–হঠাৎই একটা ভাবনা উঁকি দিলো আমার মনে; ভিন্ন রকম ভাবে সজ্জিত নতুন এক ধরনের গলুইয়ের ছবি আঁকলাম প্যাপিরাস ফ্রোলে। পরিকল্পনা ডালাপালা ছড়াতে লাগলো পানির সমান্তরালে গন্ডারের শিং-এর মতো একটা স্থাপনা যোগ করে দিলাম আমি। চেলাকাঠ থেকে তৈরি, ব্রোঞ্জের মাথাওয়ালা। সামনের দিকে বাঁকানো; এতে করে সামনের কোনো জল্যানের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটলে ওটাকে ছিঁড়ে ফেঁড়ে ফেলা যাবে। এতটাই তন্ময় হয়ে ছিলাম, কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে ট্যানাস, টের পাইনি। আমার হাত থেকে প্যাপিরাসের স্ক্রোলটা ছিনিয়ে নিল সে; মনোযোগ দিয়ে দেখছে।

আমি কি ভাবছি, এটা অবশ্য সাথে সাথেই বুঝেছে সে। ওর বাবা সর্বস্ব হারিয়ে যখন পথের ভিখারী, বহু সাধ্য-সাধনা করে একজন ধনী লোকের সাহায্যে ওকে কোনো একটি মন্দিরে অন্তত: শিক্ষানবিস লিপিকারের কাজে ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিলাম; এতে করে কাজের পাশপাশি পড়া-শোনাটাও চালিয়ে নিতে পারতো সে। নিজের ছাত্র সম্পর্কে আমার ধারণা খুবই উঁচু, আমি মনে করি, সাঁকোয়ারাহ্–এ নির্মিত প্রথম পিরামিডের কারিগর ইমহোটেপের মতোই মিশরের ইতিহাসের অন্যতম সেরা বুদ্ধিজীবি হওয়ার সামর্থ্য তার আছে। এক হাজার বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিলো ওটা।

কিন্তু, স্বাভাবিকভাবেই সেটা সম্ভব হয় নি। ট্যানাসের বাবার বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো, তাদেরই অনেকে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ওর পথে। দেশের একজন ব্যক্তি, তাকে সাহায্য করতে প্রস্তুত ছিলো না। বাধ্য হয়ে ওকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বলেছিলাম। দুঃখের বিষয়, যেদিন থেকে প্রথম দাঁড়াতে শিখেছিল, যোদ্ধা হওয়া ছিলো তার ধ্যান-জ্ঞান।

সেথ্‌–এর পাছার বিষফোঁড়ার নামে কসম! বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলো ট্যানাস, আমার আঁকাগুলো দেখতে দেখতে। তুমি আর ওই লেখনী দশ বাহিনীর সমান আমার কাছে!

পরাক্রমশালী দেবতা সেথকে নিয়ে ট্যানাসের এই ধরনের উপহাস বরাবরই ভাবিয়ে তোলে আমাকে। আমি বা সে, যদিও আমরা দুজনেই দেবতা হোরাসের উপাসক, এরপরেও মিশরের ঐতিহাসিক দেবদেবীর কাউকে নিয়ে ঠাট্টা করা সমীচীন নয়। যেকোনো মন্দিরে গেলেই কোনো না কোনো প্রার্থনা বা কোরবানী দেওয়া আমার স্বভাব, তা সে যে দেবতারই হোক না কেন। আমার মতে, ওটা হলো নিরাপত্তার কবচ। মানবসমাজেই যথেষ্ট শত্রু আছে আমাদের, অযথা দেবতা পর্যায়ে সেরকম কিছু তৈরি করা অবিবেচকের পরিচয়। বিশেষতঃ দেবতা সেথ-এর আক্রোশ নিয়ে বহু উপকথা প্রচলিত আছে। আমি অবশ্যই ভয় পাই তাঁকে। হয়তো ট্যানাসের এটা জানা আছে বলেই আমাকে বিরক্ত করার জন্যে বারবার উপহাস করে। যাই হোক, প্রশংসার জলে ভিজে আমার রাগ দূর হয়ে গেলো।

কেমন করে করো এগুলো? জানতে চায় ট্যানাস। আমি হলাম যোদ্ধা। আজ যা যা ঘটেছে, তোমার মতো আমিও দেখেছি। কিন্তু এই ভাবনাগুলো আমার মাথায় কেন এলো না?

আমার আঁকা ছবিগুলো নিয়ে আলোচনায় মগ্ন হলাম দুজন। কিছুসময়ের মধ্যেই লসট্রিসও যোগ দিলো সাথে। দাসী মেয়েগুলো ওর চুল মুছে বেঁধে দিয়েছে, মুখেও প্রসাধনী ব্যবহার করেছে খানিকটা। মনোযোগ বজায় রাখাটা মুশকিল হয়ে পড়ল, বিশেষত যখন একটা হাত আনমনে আমার কাঁধে ফেলে রেখেছে সে। জনারণ্যে কোনো পুরুষ মানুষের দেহে এভাবে হাত রাখবে না লসট্রিস, ভদ্র-আভিজাত্যে সেটা সাজে না। কিন্তু আমি তো আর পুরুষ মানুষ নই; আর সারাটা সময় ট্যানাসের মুখেই সেঁটে থাকলো ওর চোখ দুটো।

ট্যানাসের প্রতি ওর এই মোহ সেই যখন ও বুঝতে শিখেছে, তখন থেকে। দশ বছরের বালক ট্যানাসের পেছন পেছন টলোমলো পায়ে হাঁটতে লসট্রস, সবসময় নকল করত তার ভাবভঙ্গি। ট্যানাস থুতু ফেলেছে, তো তারও ফেলতে হবে। ট্যানাস যদি কোনো বিষয়ে বিরক্তি প্রকাশ করলো; তো তারও করা চাই। শেষমেষ বিরক্ত হয়ে বালক আমার কাছে বিচার নিয়ে আসতো, ওকে আমার পিছ-ছাড়া করতে পারো না, টাইটা? একটা পুঁচকি। মজার ব্যাপার, আজ আর তেমন কোনো অভিযোগ ট্যানাস করছে না।

গলুইয়ের সামনে ভেসে ওঠা একটা শবদেহ আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেয়। প্রথম মৃত-জলহস্তির দেহ ভেসে উঠেছে ল্যাগুনের জলে। পেট উপরে দিয়ে ভাসছে ওটা, নাড়ি-ভুঁড়ির ভেতরের গ্যাসের কারণে অমনটা ঘটেছে। চার পা শক্তভাবে ছড়িয়ে ভাসছে এখন। একটা গ্যালি এগিয়ে গিয়ে দায়িত্ব নেয় দেহটার। বিশাল দেহের উপরে লাফিয়ে নেমে দড়ি বেঁধে গ্যালির সাথে সংযোগ করলো একজন যোদ্ধা। কাজ শেষ হতেই, ভাসমান দেহটা টেনে নিয়ে তীরের দিকে চললো ওটা।

এতক্ষণে আমাদের চারপাশের পানিতে ভেসে উঠতে শুরু করেছে জলহস্তির প্রাণহীন দেহ। গ্যালিগুলো ওগুলোকে বেঁধে টেনে নিয়ে চললো । আমাদের জাহাজের সাথে দুটো জানোয়ারের দেহ আঁটকে নিলো ট্যানাস; দাঁড়ীরা প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় বেয়ে চললো হোরাসের প্রশ্বাস।

তীরের কাছাকাছি এসে পড়তে হাত উঁচিয়ে রৌদ্র আড়াল করে সামনে তাকালাম। মনে হলো যেনো উচ্চ-মিশরের সকল নারী, পুরুষ আর শিশু জড়ো হয়েছে নদীর পারে। বহু লোক; নাচছে, গাইছে স্তুতি করে চলেছে শিকারী যোদ্ধাদের। তাদের পরিহিত সাদা আলখাল্লা পতপত করে উড়ছে বাতাসে, যেনো কোনো ঝড়ের প্রস্তুতি।

পাড়ের কাছাকাছি চলে আসতে, কেবল কোমরে এক টুকরো কাপড় পরা মানুষজন কাধ-সমান পানিতে নেমে এসে ভাসমান প্রাণীগুলোর শবদেহে দড়ি বেঁধে দিতে থাকে। উত্তেজনার প্রাবল্যে মনেই নেই, হ্রদের সবুজ জলের তলায় ঘাপটি মেরে আছে হিংস্র কুমীরের দল। প্রতি বছর আমাদের বহু লোক প্রাণ হারায় এই ভয়ঙ্কর জম্ভর হাতে। কোনো কোন সময় এতটাই সাহসী হয়ে উঠে, নদী পাড়ে খেলতে থাকা শিশু কিংবা কাপড় ধুতে থাকা মেয়েলোক বা পানি নিতে আসা মহিলাদের পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায় কুমীর।

এখন, মাংস-ক্ষুধায় কাতর লোকগুলোর মনে নেই অন্য কিছুর কথা। দড়ি ধরে টেনে পারের দিকে নিয়ে চলে তারা নিহত জানোয়ারগুলোকে। পাড়ের কাঁদাটে মাটিতে ঝড়ে পড়ে নিহত জলহস্তির দগদগে ঘায়ে মুখ বসানো ছোটো ছোটো মাছের দল। চকচকে রুপোর মতো দেখায় ওগুলোকে, মাটির উপর তড়পাচ্ছে যেনো আকাশের খসে পড়া তারা।

পুরুষ বা নারী প্রত্যেকে ছুরি বা কুঠার বহন করছে; পিলপিলে পিঁপড়ের মতোই শবদেহগুলো ঘিরে আসে তারা। লোভের আতিশায্যে উন্মত্ত হায়েনা বা শকুনের মতোই পরস্পরের উদ্দেশ্যে বকে চলে, একের পর এক আঘাত করতে থাকে জলহস্তির বিশাল নিথর দেহে। ছুরি বা কুঠারের কোপে বাতাসে ছিটকে আসে রক্ত আর হাড়ের কণা। সেই সন্ধায় আহত লোকের কোনো অভাব হবে না মন্দিরে; কাটা আঙুল বা অসাবধান কোপের চিকিৎসা দরকার হবে এদের।

আমি নিজেও সম্ভবত অর্ধেক রাত জেগেই কাটাতে বাধ্য হবো। চিকিৎসক হিসেবে কোনো কোন মহলে বিশেষ নাম আছে আমার, ক্ষেত্রবিশেষে ওসিরিসের মন্দিরের পুরোহিতদের চেয়ে বেশি। বিনয়ের সাথেই বলছি, এই যশ অযাচিত নয়; আর হোরাস জানেন, পুরোহিতদের তুলনায় আমার অর্থ-দাবি অযৌক্তিক নয় মোটেও। আমার মালিক, প্রভু ইনটে, চিকিৎসাকর্ম থেকে প্রাপ্ত আয়ের তিন ভাগের এক ভাগ আমাকে দিয়ে থাকেন। দাস হতে পারি, তবে কিছুটা হলেও সম্মান আমার আছে বৈকি।

হোরাসের প্রশ্বাসের স্টার্ন টাওয়ারে দাঁড়িয়ে মানব-চরিত্রের উন্নাসিকতা অবলোকন করতে লাগলাম আমি। ঐতিহ্যগতভাবে, তীরে থাকা অবস্থায় নিজের ভাগের মাংস খেতে পারে জনতা। আমাদের এই নদী-বিধৌত, উর্বর জনপদে মানুষজন ভুখা থাকে না। তবে আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য; মাসের পর মাসে কেটে যায়, মাংসের স্বাদ আমাদের লোকজন পায় না। আর তাছাড়া, উৎসবের সময় সব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়; দেহজ ভোগ-বিলাস, খাদ্য, পানীয়-সবক্ষেত্রেই চলে অতি-উপভোগের অনুশীলন। বিষাক্ত পেট, মাথাব্যথায় কাতর লোকের দল আজ আসতেই থাকবে মন্দিরে; উৎসবের প্রথম দিনে ক্ষুধা মেটে না এদের।

পা থেকে মাথা পর্যন্ত রক্ত আর চর্বিতে মাখামাখি এক মেয়ে, বুক পর্যন্ত নগ্ন; বেরিয়ে আসে জলহস্তির পেটগহ্বর থেকে, হাতে ঝুলছে কলিজার একটা বড় টুকরো, নিজের সন্তানের হাতে দৌড়ানোর উপরই ওটা ছুঁড়ে দেয় সে। শবদেহ ঘিরে আস্ফালনে রত তার অন্যান্য বংশধরেরা। আবারো নিহত প্রাণীটার শরীরের অভ্যন্তরে হারিয়ে যায় সে; ওদিকে তীর ঘেঁষে তৈরি করা শতাধিক আগুনের কুণ্ডলির উদ্দেশ্যে হাতের মাংসপিণ্ড নিয়ে ছুটে যায় শিশুটা। ওর হাত থেকে কলিজার বড় অংশ ছিনিয়ে নিয়ে জ্বলন্ত কয়লায় ছুঁড়ে ফেলে তার বড় ভাই; বাকিরা আগ্রহের আতিশায্যে ঘিরে আসে তাকে ঠিক যেনো একপাল কুকুরছানা।

একটা কাঠি দিয়ে আধা-সেদ্ধ কলিজার কিছু অংশ খুবলে নেয় বয়োজৌষ্ঠ ছেলেটা, তার ভাইবোনেরা মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাবড়ে দেয় ওটা। শেষ হতে না হতেই, আরো পাওয়ার দাবিতে শোরগোল তোলে ওরা; রস আর তরল চর্বি গড়িয়ে পড়ছে চিবুক বেয়ে। এদের মধ্যে অনেকেই জীবনে কখনও জলহস্তির মাংসের স্বাদ পায়নি। বেশ সুস্বাদু, নরম–তবে বেশিরভাগ অংশই চর্বি গরু বা বুনো গাধার গোশের চেয়ে পরিমাণে অনেক বেশি। হাড়ের মজ্জা অবশ্য এমনকি দেবতা ওসিরিসের প্রিয় খাদ্য। আমাদের লোকেরা পশুর চর্বি কালেভদ্রে খেতে পায়, ওটার স্বাদ তাদের পাগল করে ফেলে। প্রাণভরে খাবে ওরা আজ, এটা তাদের অধিকার আজকের দিনে।

এই উদ্দাম জনতার কাছ থেকে দূরে থাকতে পেরে যার-পর-নাই আনন্দিত আমি। জানি, আমার মনিব, ইনটেফের লোকেরা এসে গোশতের সেরা অংশটুকু এবং হাড় মজ্জা নিয়ে যাবে প্রাসাদের রসুইখানায়; আমার পছন্দের মতো করে বিশেষভাবে রান্না করা হবে খাবার। রাজ-উজিরের প্রাসাদে আমার অবস্থান বেশ উঁচুতে, এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে আমার মালিকের একান্ত ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর চেয়েও; যদিও সে মুক্ত মানুষ, আমার মতো দাস নয়। কেউ এ বিষয়ে খোলাখুলিভাবে বলে না, তথাপি আমার বিশেষ অবস্থান নিয়ে কারও রা করার সুযোগটি নেই।

প্রাসাদের লোকেরা চলে এসেছে; স্টার্ন টাওয়ারে দাঁড়িয়ে ওদের কাজ দেখতে লাগলাম আমি। আমার মনিব, প্রশাসক এবং মিশরের উচ্চ সাম্রাজ্যের রাজ-উজিরের অংশ দাবি করতে এসেছে তারা। অতি অনুশীলনে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে হাতের লাঠি দিয়ে সামনে দাঁড়ানো উন্মুক্ত পশ্চাৎদেশে আঘাত করে পথ করে নেয় ওরা, চিৎকার করে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রয়াস পায়।

নিহত জন্তুর দাঁত উজিরের সম্পত্তি। সতর্কতার সাথে তার প্রত্যেকটি সংগ্রহ করে তাঁর প্রতিনিধিরা। জলপ্রপাতের ওপারে, সেই কুশ দেশ হতে আসা হাতির দাঁতের চেয়ে কোনো অংশে কম মূল্যবান নয় সেগুলো। মন্দিরের হায়ারোগ্লিফিক্সের কথা অনুযায়ী আজ থেকে এক হাজার বছর পূর্বে শেষবারের মতো হাতি শিকার করা হয়েছিলো আমাদের এই মিশরে, চতুর্থ বংশ পরম্পরার ফারাওয়ের শাসনামলে। স্বাভাবিকভাবেই, শিকারের সেরা অংশ থেকে প্রাপ্ত পুরস্কারের অধিকাংশ হাপির মন্দিরের পুরোহিতদের তুষ্টিতে ব্যয় করবেন আমার মালিক, পবিত্র এই প্রাণীর রাখাল তো তারাই। অবশ্য উপঢৌকনের পরিমাণ নিয়ে চিন্তার অবকাশ আছে; প্রাসাদের হিসাবরক্ষক হিসেবে আমি জানি, সিংহভাগ সম্পদ কোথায় যায়। আমার মালিক, ইনটেফ অযাচিত উদারতায় বিশ্বাসী নন; তা এমনকি কোনো দেবীর প্রতিও নয়।

আর জলহস্তির চামড়াগুলো সেনাবাহিনীর অধিকারে যাবে, গার্ড বাহিনীর সৈন্যদের ঢালে ব্যবহৃত হবে সেগুলো। প্রায় বেদুইনের তাঁবুর সমান এক-একটি চামড়াকাটা তদারকি করছে সেনাবাহিনীর কসাই।

ভোজন শেষে তীরে পড়ে থাকা অবশিষ্ট মাংস আঁচার করে, নয়তো রোদে শুকিয়ে নেওয়া হবে। সেনাবাহিনীর সদস্য, আইনের লোকজন, মন্দির আর রাজ্যের কর্মীদের ভোজনে ব্যবহৃত হবে সেটা। তবে, আদপে এর বেশ কিছু অংশ বিচ্ছিন্নভাবে বিক্রি হবে, স্বাভাবিকভাবেই রাজ-উজির, আমার মালিক ইনটেফের কোষাগারে যাবে সেই অর্থ। আগেই বলেছি, স্বয়ং ফারাওয়ের পরে আমার মালিক ইনটেফ হলেন উচ্চ মিশরের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। প্রতিদিন আরো বাড়ছে তার সম্পদের পরিমাণ।

একটা শোরগোল শুনছি পেছন থেকে, দ্রুত ফিরে তাকালাম। এখনও কাজে মত্ত ট্যানাসের বাহিনী। যুদ্ধের মতো করে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে প্রতিটি গ্যালি; তীরের সাথে সমান্তরালে পঞ্চাশ গজ দূরে গভীর পানিতে রয়েছে সবকয়টা। রেইলে দাঁড়িয়ে হারপুন হাতে ল্যাগুনের জলে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে যোদ্ধারা।

রক্ত আর তাজা মাংসের গন্ধ আকৃষ্ট করেছে কুমীরের দলকে। শুধু ল্যাগুনের পানিতে নয়, সেই নীল নদের প্রধান শাখা থেকে এসে ভোজে জড়ো হয়েছে জানোয়ারগুলো। হারপুন শিকারীরা তৈরি। প্রতিটি হারপুনের ডগায় কাঁটাওয়ালা ব্রোঞ্জের মাথা রয়েছে।

হারপুন শিকারীদের দক্ষতা সত্যিই অপূর্ব। লম্বা, অশুভ ছায়ার মতো পানির তলা থেকে ভেসে উঠে একটা সরীসৃপ; কাঁটাওয়ালা ভীষণ লেজটা মসৃণভাবে নেড়ে ঘাপটি মেরে থাকে। হারপুন শিকারীরাও এ সুযোগের অপেক্ষাই থাকে। গ্যালির নিচ দিয়ে ওটাকে যেতে দেবে তারা, তারপর যখন ওপাশে চলে যাবে; হালের আড়াল থেকে ছুঁড়বে প্রাণঘাতি বর্শা।

চরম আঘাত ঠিক নয়, বরং সুতীক্ষ একটা খোঁচা বলা যায়। শল্যবিদের সুঁইয়ের মতোই ধারালো হয় হারপুনের তামার তৈরি ডগা; সরীসৃপের শক্ত আঁইশঅলা দেহের গভীরে পুরোটা গেঁথে যায় ওটা। ঘাড়ের পেছনের জায়গাটা টার্গেট করে হারপুন শিকারীরা, এক পলকে ছিন্ন করে ফেলে স্পাইনাল কর্ড।

তবে, একটি-দুটি আঘাত ব্যর্থ হতে উদ্দাম আস্ফালনে জল তোলপাড় করে শয়তান জন্তগুলো। ডগার ব্রোঞ্জের মাথাটা সরীসৃপের দেহে অদৃশ্য হতে তার সাথে সংযুক্ত দড়ি ধরে টেনে চলে যোদ্ধার দল, নিয়ন্ত্রণ করে প্রাণীটির প্রতিটি নড়াচড়া। বড় কুমীর হলে অনেক সময় চারজন মানুষের সমান হয় একেকটা গ্যালির গানওয়েলের সঙ্গে জড়িয়ে বেঁধে রাখা হয় দড়ির প্রান্ত।

সেরকম দ্বন্দ্ব-যুদ্ধে তীরে দাঁড়ানো মানুষজন চেঁচিয়ে উৎসাহ যুগিয়ে চলে যোদ্ধাদের; একবার কোনমতে কুমীরের মুখটা নিজেদের দিকে যদি করা যায়, গভীর পানিতে সাঁতরে ফিরে যেতে পারে না ওটা। জাহাজের পাশের পানিতে ফেনা আর সাদা পানির আলোড়ন তোলাই সার হয় ওগুলোর; রেইলে দাঁড়ানো যোদ্ধারা খুঁচিয়ে ভেঙে ফেলে খুলির শক্ত হাড়।

কুমীরের শবদেহ যখন নদী তীরে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো, ওগুলোকে পরীক্ষা করতে চললাম আমি। ট্যানাস বাহিনীর কসাইরা ততক্ষণে চামড়া সংগ্রহের কাজে লেগে গেছে।

আমাদের বর্তমান রাজার পিতামহ, তার বাহিনীর নাম নীল কুমীর রক্ষীবাহিনী বলে অনুমোদন করেছিলেন; নীল কুমীর হলো তাদের পদমর্যাদা। ওদের যুদ্ধ-ঢাল নির্মিত হয় এই ভীষণ সরীসৃপের শক্ত চামড়া থেকে। সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হলে এমনকি শত্রুর ছোঁড়া তীর বা বর্শার আঘাত দিব্যি ঠেকিয়ে দেয় ওগুলো। ধাতবের চেয়ে অনেক হালকা, মরুভূমির গরমে পরিধানের পক্ষেও ঠাণ্ডা। কুমীরের চামড়ায় তৈরি ট্যানাসের হেলমেট অসট্রিচের পালকে সজ্জিত; বুকের আচ্ছাদনও কুমীরের চামড়ার, চকচকে পালিশ করা–তামার ফুলের কারুকার্য খচিত। শত্রুর চোখে আতঙ্ক জাগানোর জন্যেই এই প্রস্তুতি। কিংবা কুমারী হৃদয়ে কাপন তোলার জন্যে।

দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ মেপে দেখতে লাগলাম আমি; কসাইরা তাদের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে। জলহস্তি শিকারে যে সামান্য মায়াও জেগেছিল মনে, এই নির্মম প্রাণিগুলোর জন্যে আমার কাছে তার ছিটেফোঁটাও নেই। বিষাক্ত সাপ ছাড়া এরচেয়ে নিঠুরতম প্রাণি আমার কাছে আর কোনোটিই নয়।

আমার ঘৃণা আরো বাড়ল যখন দেখতে পেলাম, এক কসাইয়ের ছুরির পোঁচে পেট কেটে যেতেই বিশাল সরীসৃপের ভেতর থেকে বেরুল অর্ধ-পাচিত একজন হতভাগ্য মেয়ের দেহাবশেষ। শরীরের পুরো উপরিভাগ আস্ত গিলে খেয়েছিল জানোয়ারটা; কোমরের উপর থেকে। গলার চারধারে একটা নেকলেস রয়েছে হতভাগিনীর, হাড় জিরজিরে হাতে পরে আছে লাল-নীল সিরামিকের অদ্ভুত সুন্দর বাজুবন্ধ।

এই খবর রটে যেতেই দুঃখ আর আতঙ্কের মর্মান্তিক চিল্কারে ভারী হয়ে আসে বাতাস। ভীড়ের মধ্য থেকে ঠেলে-ধাক্কিয়ে সৈন্যদের সরিয়ে বিভৎস দেহটার পাশে আছড়ে পড়ল একটা মেয়েমানুষ। শোকের মাতমে স্থির হয়ে থাকে চরাচর।

আমার মাণিক! আমার মেয়ে! গত দিনই প্রাসাদে এসে ওর মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর জানিয়েছিল মহিলা। প্রাসাদের রক্ষীরা তাকে বলেছিল, হয়তো অপহরণের পরে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছে তাকে দস্যুর দল। শহরের দ্বারে দিনে-দুপুরে এখন চলে এই দস্যুদের রাজত্ব; বিরাট একটা শক্তি হয়ে মাথাচাড়া দিয়েছে এরা। প্রাসাদের রক্ষীরা মহিলাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল, ওর মেয়েকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। দেশের আইন-কানুনের উর্ধে চলে গেছে এই দস্যুদের কর্মকাণ্ড।

অন্তত একবারের জন্যে হলেও সেই অনুমান ভুল প্রমাণিত হলো। হতভাগ্য লাশের থেকে স্বর্ণালঙ্কারগুলো নিয়ে নেয় মহিলা। খুব খারাপ লাগছে আমার, শূন্য একটা সুরার পাত্র আনতে পাঠালাম আমি। দেহাবশেষগুলো সুরার পিপে হতে স্থানান্ত রের সময় চোখের পানি আটকে রাখা সম্ভব হলো না আমার পক্ষে।

বুকের কাছে হতভাগিনী মেয়ের দেহাবশেষ সমেত পাত্রটা আঁকড়ে ধরে হেঁটে চলে মা টা; একটা ব্যাপার ভেবে দুঃখবোধ প্রবল হলো আমার। যত প্রার্থনা করা হোক না কেন, যত আচার পালন করা হোক; এমনকি, এই হত-দরিদ্র মহিলা যদি তার সন্তানের যেন-তেন একটা মমি পর্যন্ত প্রস্তুত করেও ফেলে, মৃত্যুর পরের জীবনে কখনও মুক্তি পাবে না মেয়েটার আত্মা। সেরকম হতে হলে, শব প্রস্তুতির আগে অক্ষত থাকতে হয় মৃতদেহ। নিরুপায় মায়ের জন্যে কেঁদে উঠে আমার মন। এ আমার এক ধরনের দুর্বলতা; জগতের সকল অন্যায্য আর দুঃখ বড় বেশি বুকে বাজে। বরং শক্ত হৃদয় হওয়াটা জরুরি।

সবসময়ের মতোই, দুঃখবোধ ভুলে থাকতে আমার তুলি আর প্যাপিরাস স্ক্রোল তুলে নিলাম। আমার চারপাশে চলতে থাকা ঘটনাবলি লিখে নিতে লাগলাম; সবকিছু সেই হারপুন শিকারী, হতভাগ্য মা, চামড়া সংগ্রহ, জলহস্তি বধ, কুমীর নিধন আর আমার লোকজনের পৈশাচিক ভোজ সবকথা দৃশ্যমান হতে থাকল আমার তুলির আঁচড়ে।

ইতিমধ্যেই মদ আর মাংসে আকণ্ঠ পরিপূর্ণ জনতার যে যেখানে ঢলে পড়েছে, সেখানেই ঘুমাচ্ছে নাক ডেকে। এখনও যারা দাঁড়িয়ে আছে দু পায়ের উপর, তাদের কেউই লাথি-গুতো আমলে নেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। তরুণ, নির্লজ্জ ছেলেমেয়েরা আলিঙ্গন আর আদরে ভরিয়ে তুলছে পরস্পরকে; ঘনায়মান অন্ধকার আর হালকা ঝোঁপের ছায়ায়, প্যাপিরাসের বিছানায় মত্ত হয়েছে আদিম কামনায়। এদের অশ্লীল আচরণ পুরো জাতির ঝিমিয়ে পড়া অবস্থানের রূপক বলা যায়। এর কিছুই হতো না, যদি আমাদের একজন ইস্পাত-দৃঢ় ফারাও থাকতেন। শক্ত চরিত্রের, মনোবল আর অনুশাসনের বান্ধব কেউ যদি হতেন সিংহভাগ থিবেস নগরীর প্রভু। সাধারণ জনতা ঊর্ধস্তনদের থেকেই তো শিক্ষা নেয়।

যা ঘটেছে, যদিও আমি এর কিছুই অনুমোদন করি না, তথাপি প্রতিটি ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিপিবদ্ধ করে যেতে লাগলাম। লেখা আর আঁকার ফাঁকে কেমন করে যেনো পেরিয়ে গেলো একটি ঘণ্টা; টের পাই নি। হোরাসের প্রশ্বাসের চালকের প্রকোষ্ঠে বসে লিখছিলাম এতটা সময়। পশ্চিমে ঢলে পড়েছে সূর্য, যেনো বিশাল নদী গহ্বরে ডুবে যেতে চাইছে; তামাটে অবয়ব রেখে যাচ্ছে পানিতে। আর আকাশে তারই ধোয়াটে উজ্জ্বলতা, যেনো আগুন লেগেছে প্যাপিরাসের ঝরে।

বেলাভূমির জনতা আরো বেপরোয়া, আরো অধৈৰ্য্য হয়ে উঠছে প্রতি ক্ষণে। একজন মাতাল নাবিক, আর শান্ত-সৌম্য পোশাকের মন্দির-পরিচর্যাকারিনীকে দেখলাম অগ্নিকুণ্ডের ওপাশের ছায়ায় হারিয়ে যেতে। নিজের আঁটো জামা খুলে মেলে ধরলো মেয়েটা; হাঁটু গেড়ে বসে বিশাল পেছনটা উপরে উঁচিয়ে রাখলো। যেনো কোনো কামার্ত কুকুরের মতোই উল্লাসের আনন্দে চিৎকার করে ওর উপর চড়ে বসে নাবিক; কিছুসময়ের মধ্যেই তার মতোই জোর শীৎকারে কেঁপে উঠে মেয়েটা। ওদের আলিঙ্গনবদ্ধ ছবিটা এঁকে নিতে লাগলাম আমি, কিন্তু আলো কমে আসছিল দ্রুত; তাই সেই দিনের মতো ক্ষান্ত দিতে হলো।

স্ক্রোলগুলো একপাশে রাখতে গিয়ে মনে পড়ল, বাচ্চা মেয়েটার মৃতদেহ। আবিষ্কারের পর থেকে আমার মিসট্রেসকে দেখছি না। আতঙ্কে চট করে দাঁড়িয়ে গেলাম। কেমন করে এতটা বেখেয়াল হতে পারলাম? আমার মিসট্রেস কঠোর অনুশাসনের মধ্যে বড় হয়েছে, আমি নিজে নিশ্চিত করেছি সেটা। সৎ আর শুভ্র মেয়ে ও; আইন এবং আচার তার উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছে, সে সম্পর্কে সচেতন। ওর বাবার রাগের সামনে আমি যতোটা অসহায়, লসট্রিস তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অবশ্যই আমি ওকে বিশ্বাস করি।

নারী সত্তা লাভের মতো আবেগী দিনে, আজ, এই উন্মত্ত চরাচরে, আঁধার রাতে, সুপুরুষ এবং একই রকম তেজ-দীপ্ত কোনো সৈনিকের বাহুলগ্না হয়ে সে কী সীমা লঙ্ঘন করতে পারে না? আর তাছাড়া, ওকে তো সে ভালোবাসে।

যতোটা না আমার মিসট্রেসের কুমারীত্বের জন্যে, তার চেয়ে নিজের ভাগ্য নিয়ে শঙ্কিত হলাম আমি। সকালে কারনাকে, আমার মালিক ইনটেফের প্রাসাদে যখন যাব, তার কানে ঠিকই পৌঁছুবে আমার দায়িত্ব পালনে অযোগ্যতার কথা।

আমার মালিকের গুপ্তচরের অবাধ বিচরণ সমাজের প্রতিটি স্তরে, আমাদের ভূমির প্রতিটি কোণে; এমনকি, খোদ ফারাওয়ের প্রাসাদে পর্যন্ত। আমার চেয়ে অনেক লম্বা তাঁর হাত, অবশ্য দেওয়ার মতো এতো অর্থও নেই আমার। তবে তার এবং আমার গুপ্তচরেরা ক্ষেত্রবিশেষে একই লোক। লসট্রিস যদি আমাদের সবাইকে অপমান করেই ফেলে, সকালের আগেই সেটা জেনে যাবেন আমার মালিক; জানব আমিও।

জাহাজের একমাথা থেকে অপর মাথায় দৌড়ে চললাম আমি, খুঁজছি ওকে। স্টার্ন টাওয়ারে চড়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফিরলাম বেলাভূমি। ট্যানাস বা লসট্রিস কারও চিহ্ন মাত্র নেই। আমার আশঙ্কা আরো দৃঢ় হয়।

এই উন্মাদ-রাতে কোথায় খুঁজব আমি ওদের? হতাশার প্রাবল্যে হাত ঝাঁপটাচ্ছি, নিজেকে স্থির করার প্রয়াস পেলাম। সবসময়ই নিজের অবয়বে নারীর প্রকাশভঙ্গি ঝেড়ে ফেলতে সচেষ্ট আমি। নপুংসক নয়, বরঞ্চ একজন পুরুষ মানুষ হিসেবে নিজেকে পরিবেশনের চেষ্টা করি।

প্রাণান্ত চেষ্টায় নিজেকে শান্ত করলাম, শান্ত-যুক্তিতে বিচার করতে চাইলাম পরিস্থিতি; যুদ্ধের প্রচণ্ডতায় ট্যানাসকে এমন করতে দেখেছি বহুবার। মাথা ঠাণ্ডা হতে যুক্তি ফিরে এলো আমার মধ্যে। কী রকম ব্যবহার করতে পারে আমার মিসট্রেস, ভাবতে বসলাম। ওকে আমি অন্তরঙ্গভাবে জানি। চৌদ্দটি বছর ধরে তো ওকে দেখেই আসছি। মনে হলো, লসট্রিসের মধ্যে অনুশাসন আর নিজের উঁচু বংশপরিচয়ের বোধ এতো প্রবল; উন্মত্ত রাতে, বেলাভূমির অবর্ণনীয় লালসায় ও নিজেকে ভাসিয়ে দেবে না; ঝোঁপের আড়ালে মিলিত হবে না কামার্ত কুকুরীর মতো। একটা ব্যাপার নিশ্চিত, ওদের দুজনকে খুঁজে বের করতে কারো সাহায্য নেওয়া যাবে না। তার অর্থ হবে আমার মালিক ইনটেফের কানে কথাটা পৌঁছে দেয়া। নিজেকেই করতে হবে, যা কিছু করার আছে।

কোন গোপন স্থানে নিজেকে নিয়ে যেতে দেবে লসট্রিস? এই বয়সের যে কোনো– তরুণীর মতোই আবেগী ভালোবাসার ধারণায় পরিপূর্ণ ওর মন। ওই দুটো বজ্জাত কালো দাসী মেয়েও ভালোবাসার শারীরিক ব্যাপার সম্পর্কে তাকে প্রলুব্ধ করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। আমি নিজেও অবশ্য একবার চেষ্টা করেছিলাম এ সম্পর্কিত কিছুটা জ্ঞান দিতে, ওটা আমার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে, যাতে করে নিজেকে ভবিষ্যতে রক্ষা করতে পারে সে; কিন্তু তেমন আগ্রহ দেখায় নি লসট্রিস।

বুঝতে পারছি, এমন কোথাও খুঁজতে হবে ওকে, যার সাথে তার আবেগী মনের মিল আছে। হোরাসের প্রশ্বাসে কোনো ব্যক্তিগত কক্ষ থাকলে, সেখানেই আগে ছুটে যেতাম। কিন্তু আমাদের যুদ্ধ গ্যালিগুলো ছোটো, গতি এবং নিয়ন্ত্রণের জন্যে বিলাসিতা বর্জন করা হয়েছে ওগুলো থেকে। খোলা পাটাতনে ঘুমায় নাবিকেরা, এমনকি জাহাজের অধিনায়ক পর্যন্ত কিছুটা আড়াল করা একটা স্থানে রাত কাটায়। এখন, এমনকি কোনো আড়ালও নেই ডেকে, গোপনে মিলিত হওয়ার কোনো উপায় অন্তত হোরাসের প্রশ্বাসে নেই।

কারনাকে, আমাদের প্রাসাদ এখনও অর্ধেক দিনের পথ। উৎসবরত জনতার থেকে একটু তফাতে, ছোটো একটা দ্বীপ-মতো জায়গায় মাত্র তাঁবু খাড়া করা হচ্ছে আমাদের জন্যে। দাসগুলো নিশ্চই উৎসবে নিজেদের ভাসিয়ে দিয়েছিল, না হলে এতো দেরি হওয়ার কথা নয় তবু তৈরিতে। মশালের আলোতে দেখতে পেলাম বেশ টলছে ওদের কেউ কেউ, দড়ি-দড়া হাতে। লসট্রিসের বিলাসবহুল, ব্যক্তিগত তবু এখনও তৈরি করা হয় নি যে, কার্পেট, দামী পর্দা আর লিনেন চাদরের সুখ হাতছানি দিয়ে ডাকবে প্রেমিক যুগলকে। তাহলে কোথায় যেতে পারে তারা?

ঠিক সেই মুহূর্তে নরম, হলুদ একটা আলো আমার মনোযোগ কেড়ে নিল । ল্যাগুনের ওপাশ থেকে আসছে আলোটা। সাথে সাথেই আমার অতিন্দ্রীয় সাড়া দেয়। আমার মিসট্রেসের সাথে দেবী হাপির যোগাযোগের কথা মনে হতে বুঝতে পারলাম, ল্যাগুনের ঠিক মধ্যিখানে দ্বীপের উপর তৈরি ছবির মতো সুন্দর তার মন্দির হাতছানি দিয়ে ডেকেছে তাকে। ওখানে যাওয়ার কোন উপায়ের খোঁজে তীরে চোখ বোলালাম আমি। মন্দিরে যাওয়া-আসার জন্যে ছোটো নৌকা আছে বটে, তবে মাঝিরা সবাই মাতাল, পড়ে আছে বেহুশ হয়ে।

ক্ৰাতাসকে দেখতে পেলাম তীরে। শিরস্ত্রাণের অস্ট্রিচের পালক সাধারণ জনতার মাথার উপরে গর্বিত ভঙ্গিতে উঁচু হয়ে আছে।

ক্ৰাতাস! চিৎকার করে ডাকতেই আমার দিকে ফিরে হাত নাড়ে সে। ক্ৰাতাস হলো ট্যানাসের ডান হাত; আর সম্ভবত আমি বাদে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠজন। অন্ধের মতো ওকে বিশ্বাস করতে পারি আমি।

একটা নৌকা জোগাড় কর! ওর উদ্দেশ্যে চেঁচালাম। যে কোনো একটা! আমার স্বরের তাগিদ ঠিকই পৌঁছুল কাতাসের কানে। অহেতুক প্রশ্ন করা বা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগার মানুষ নয় সে। তীরের সবচেয়ে কাছাকাছি ফেলুচার দিকে এগুল। মরার মতো ঘুমোচ্ছিল মাঝি। ঘাড়ের কাছের জামা ধরে শূন্যে তুলে তাকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলল ক্ৰাতাস। ঠিক যেমন করে পড়লো, সেইভাবেই ঘুমিয়ে রইল বেচারা; সস্তা চোলাই মদের নেশায় বুদ। নিজেই নৌকাটা চালিয়ে হোরাসের প্রশ্বাসের পাশে এনে ভেড়াল ক্ৰাতাস। টাওয়ারের মাথা থেকে লাফিয়ে ছোটো নৌকাটার উপরে পড়লাম আমি।

মন্দিরে নিয়ে চল, ক্ৰাতাস! তাড়াতাড়ি! কোনো রকমে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম। দেবী হাপি, আমাদের যেনো খুব বেশি দেরি হয়ে না যায়?

সন্ধার বাতাসে তেকোণা পাল পতপত করে উড়ে, মুহূর্ত পরেই কালো পানি পেরিয়ে মন্দিরের পাথরের ঘাটে ভীড়লো নৌকা। খুঁটির সাথে জলযানটা বেঁধে আমাকে পথ দেখাতে উদ্যত হয় কাতাস; আমি থামালাম ওকে।

আমার নয়, ট্যানাসের খাতিরে, বললাম আমি, দয়া করে অনুসরণ কোর না।

এক মুহূর্তের জন্যে অস্বস্তিতে ভুগলো ক্ৰাতাস, শেষমেষ মাথা নেড়ে সায় দেয় । প্রয়োজন হলে ডাক দিয়ো। নিজের তরবারিটা খুলে হাতল এগিয়ে দিলো আমার দিকে। এটা প্রয়োজন হতে পারে।

মাথা নাড়লাম আমি। সে ধরনের কোনো বিপদ নয়। আর তাছাড়া, ছুরি আছে সঙ্গে। আমাকে বিশ্বাস করার জন্যে ধন্যবাদ। ওকে সেখানে ফেলে রেখে মন্দিরের গ্রানাইটের সিঁড়ি বেয়ে প্রবেশপথের দিকে ছুটলাম।

উঁচু প্রবেশ মুখের বাঁকানো পথে জ্বলন্ত মশালগুলো এক অপার্থিব আলো ছড়াচ্ছে, যেনো দেওয়ালে খোদাই করা মূর্তিগুলো এখনই হেসে উঠবে। দেবী হাপির প্রতি আমি বিশেষ অনুরক্ত। মূলত, তিনি না দেবতা, না দেবী অদ্ভুত অবয়ব তার; দাঁড়ি-মুখো, উভলিঙ্গিক, বিশাল পুংজননেন্দ্রীয় এবং নারী যোনী উভয়ই আছে। আর রয়েছে বিপুল আয়তন বক্ষযুগল আমাদের সকলকে দুধ বিলোয় সেটা। তিনি হলেন নীল নদের প্রতিরূপ, চাষ-কার্যের দেবী। মিশরের দুই রাজ্যের সকল অধিবাসী বিশাল এই নদীর পর্যাক্রম বন্যার জন্যে তারই অনুকম্পার উপর নির্ভর করে। যখন ইচ্ছে তখন নিজের লিঙ্গ পরিবর্তন করতে সক্ষম উনি, আমাদের এই মিশরের অন্যান্য বহু দেব-দেবীর মতো পারেন যে কোনো প্রাণীর আকার ধারণ করতে। তবে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় অবয়ব হলো জলহস্তির। এহেন ঘোলাটে লিঙ্গ পরিচয় হওয়া সত্ত্বেও আমার কর্ত্রী, লসট্রিস সবসময় তাকে নারী বলেই মনে করে; আমি নিজেও তাই করি। হাপির মন্দিরের পুরোহিতেরা অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন।

পাথরের দেওয়ালে তাঁর ছবিগুলো বিশাল, মাতৃ-তুল্য। লাল, নীল এবং হলুদের মৌলিক রঙে আঁকা, জলহস্তি সদৃশ মুখ নিয়ে নিচে দৃষ্টিপাত করে আছেন, প্রকৃতির সবকিছুকে যেনো সঙ্গমে আহ্বান করছেন। আমার বর্তমান উদ্বেগের সাথে অবশ্য এই আহ্বান ঠিক যায় না! ভয় হতে লাগল, হয়তো আমার অপরিণত মিসট্রেস এখন দেবীর নির্লজ্জ আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেহজ সুখে মত্ত।

পার্শ্ব-বেদীতে বসে ঝিমোচ্ছিল একজন নারী পুরোহিত, দৌড়ে তার কাছে চলে এলাম আমি, মাথার টুপির কিনারা ধরে ঝাঁকালাম অধৈৰ্য্য ভঙিতে । পবিত্র ভগিনী, আমাকে বলুন, রাজ-উজিরের কন্যা লসট্রিসকে দেখেছেন? উচ্চ-মিশরের খুব কম লোকই আছেন, যারা দেখামাত্র আমার মিসট্রেসকে চিনবে না। তার সৌন্দর্য্য, শিশুতোষ আগ্রহ আর চমৎকার মিষ্টি ব্যবহারের জন্যে দোকান, রাস্তা যেখানেই যাক, সবাই ঘিরে রাখে লসট্রিসকে।

ফোকলা দাঁতে আমার উদ্দেশ্যে হাসলো বুড়ি। এক হাত দিয়ে নাকের পাশে এমন ধরনের একটা ভঙ্গি করে দেখাল, আমার চরম আশঙ্কা সত্যি বলে মনে হলো।

এবারে কর্কশভাবে আঁকালাম বুড়িকে। কোথায় সে, বুড়ি মা? বলুন আমাকে! কিন্তু চোখদুটো কোটরের ভেতর ঘুরিয়ে হাসলো সে।

গ্রানাইটের চাতাল ধরে দৌড়ালাম আমি, পায়ের চেয়ে যেনো দ্রুত চলছে হৃদপিণ্ড; কিন্তু এতো কিছুর মাঝেও আমার মিসট্রেসের সাহস নিয়ে ভাবছিলাম। যদিও উচ্চ বংশীয় হওয়ার কারণে যে কোনো পবিত্র স্থাপনায় তার প্রবেশাধিকার আছে, কিন্তু পুরো মিশরেও ভালোবাসার এমন একটি স্থান নির্বাচনের সাহস কার আছে?

মঠ-এর প্রবেশ মুখে থমকে দাঁড়ালাম। আমার অতিন্দ্রীয় সত্যি কথাই বলেছে। ওই তো ওরা দুজন, ঠিক যেমনটা আশঙ্কা করেছিলাম। প্রায় চিৎকার করে উঠেছিলাম, জোর করে শান্ত করলাম নিজেকে।

স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি আড্র আমার মিসট্রেস; ওর বুক জোড়া ঢাকা, মাথার উপর নীল উলের একটা শাল ফেলে রেখেছে। দেবী হাপির বিশাল মূর্তির সামনে উঁবু হয়ে রয়েছে সে।

পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ট্যানাস। নিজের অস্ত্র এবং ঢাল একপাশে সরিয়ে রেখেছে। মঠের সামনে ওগুলোকে দেখে এসেছি আমি। লিনেন কাপড় আর খাটো টিউনিক পরনে, পায়ে স্যান্ডল। হাতে হাত ধরে আছে প্রেমিক যুগল, ফিসফিস করে কথা বলছে, প্রায় জোড়া লেগে আছে দুটো মাথা।

আমার প্রকৃত সন্দেহ তিরোহিত হলো, লজ্জা আর অপরাধবোধ ঘিরে ধরছে এখন। কেমন করে আমার মিসট্রেসকে সন্দেহ করতে পারলাম? ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগলাম। পার্শ্ব-বেদীর সামনে এসে ধন্যবাদ জানালাম দেবীকে, নীরবে দেখছি ওদের দুজনকে।

সেই মুহূর্তে, উঠে দাঁড়িয়ে দেবীর মূর্তির উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগলো লসট্রিস। ওর তরুণী দেহের সৌন্দর্য্যে এতটাই বিমোহিত হলাম, নড়তে পারছি না আমি।

গলার চারধারে ঝোলানো ল্যাপিস-লাজুলির ছবি আঁকা আমার দেওয়া উপহারটা খুলে নিল ও। বেদনার সাথে বুঝলাম, সে হয়তো দান করতে যাচ্ছে ওটা। ওর প্রতি আমার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে নেকলেসটা তৈরি করেছিলাম, অন্য কোথাও ওটাকে আমি সহ্য করতে পারব না। পায়ের পাতার উপর দাঁড়িয়ে মূর্তির গলায় ওটা পরিয়ে দেয় লসট্রিস। এরপরে নিচু হয়ে চুমো খায় পাথুরে পদতলে। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল ট্যানাস।

উঠে দাঁড়িয়ে ট্যানাসের দিকে যাচ্ছিল সে, আমাকে দেখে ফেলল দরোজায়। ছায়ায় মিশে যেতে ইচ্ছা হলো আমার, এতো আবেগঘন মুহূর্তে ওদের চুপিসারে দেখছি বলে লজ্জিত। কিন্তু, আমি পালিয়ে যাওয়ার আগেই আনন্দে ঝলমল করে উঠলো লসট্রিসের চোখ-মুখ, দৌড়ে এসে আমার হাত আঁকড়ে ধরলো ও।

ওহ, টাইটা! তুমি এখানে, কী যে খুশি লাগছে আমার! সত্যি, তোমারই অভাব ছিলো! হাত ধরে টেনে স্যাঙ্কটাম-এর দিকে নিয়ে যায় সে আমাকে। উঠে দাঁড়িয়ে আমার উদ্দেশ্যে স্মিত হাসলো ট্যানাস, অপর হাতটা ধরলো।

এখানে আসার জন্যে ধন্যবাদ । জানি, তোমার উপর সবসময় ভরসা করা যায়। যদি সত্যিই আমার উদ্দেশ্য এতটা খাঁটি হোত, যা ওরা ভাবছে। নিজের অপরাধদগ্ধ হৃদয় আড়াল করতে স্নেহের হাসি হাসলাম।

নিচু হও! লসট্রিস আদেশ করে আমাকে। শোনো, আমরা যা কিছু বলব, সব শোনো। দেবী হাপি আর মিশরের সব দেবতাদের সামনে তুমি আজ সাক্ষী হয়ে থাকবে। আমাকে হাঁটু ভাঁজ করে দাঁড়াতে চাপ দেয় সে, পরস্পরের হাত ধরে দেবীর মূর্তির সামনে চোখে চোখে তাকায় ওরা।

লসট্রিস বলে উঠে প্রথমে। তুমি আমার সূৰ্য্য, ফিসফিস করে বলে ও। তুমি ছাড়া আমার দিনগুলো অন্ধকার।

তুমি আমার হৃদয়ের নীল নদ, শান্ত স্বরে প্রত্যুত্তর করলো ট্যানাস। তোমার ভালোবাসার জল আমাকে পবিত্র করে।

এই জীবনে, আর যত জীবন আছে সবসময় তুমিই আমার মনের মানুষ।

তুমি আমার নারী, তোমাকে প্রার্থনা করছি, প্রিয়। হোরাসের রক্ত আর প্রশ্বাসের নামে কসম। পরিষ্কার, মুক্ত কন্ঠে বলে ট্যানাস, পাথুরে দেওয়ালে প্রতিধ্বনি তোলে তার আওয়াজ।

তোমার আবেদন মঞ্জুর করলাম, এর বিপরীতে সহস্রগুন ফেরত দেব, বলে চলে লসট্রিস, আমাদের মধ্যে কখনও কেউ আসতে পারবে না, কোনো কিছুই পারবে না আমাদের বিচ্ছেদ করতে। চিরজীবনের জন্যে আমরা এক হলাম।

মুখ উঁচিয়ে দয়িতের উদ্দেশ্যে মেলে ধরে লসট্রিস। ধীরে, গভীরভাবে চুমো খায় ওরা। আমার জানা মতে, এ হলো প্রেমিক যুগলের প্রথম চুম্বন। এতে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত অবলোকন করতে পেরে সম্মানিত বোধ করলাম।

ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন আলিঙ্গনাবদ্ধ হলো ওরা, ল্যাগুন থেকে ভেসে আসা এক পশলা ঠাণ্ডা বাতাস মন্দিরের স্বল্পালোকিত ঘরটাকে এলোমেলো করে ফেলল; মশালের শিখা কেঁপে উঠে নিভু নিভু হলো, এক মুহূর্তের জন্যে আমার চোখের আড়াল হয়ে গেলো প্রেমিক যুগল, আর দেবীর অবয়ব যেনো কেঁপে উঠে কিছু একটা বলতে চাইলো। যেমন করে এসেছিল, হঠাৎই চলে গেলো হাওয়া, কিন্তু বিশাল পাথুরে স্তম্ভের আড়ালে তার কানাকানি চললো অনেকক্ষণ; মনে হলো, যেনো দূরাগত প্রচণ্ড হাসিতে ভেঙে পড়ছেন দেব-দেবীরা। অতিন্দ্রিক আবেগে কেঁপে উঠলাম আমি।

দেবতাদের কাছে অতি-দাবি সবসময়ই বিপদজনক, আর এইমাত্র অসম্ভবের কামনা করেছে লসট্রিস। বহুদিন থেকেই এই দিনটির ভয় করে আসছিলাম আমি, নিজের মৃত্যু দিনের চেয়েও এ আমার কাছে অনেকগুন আতঙ্কের। যে প্রতিজ্ঞা এইমাত্র পরস্পরের প্রতি করেছে ট্যানাস আর লসট্রিস, তা কখনই টিকে থাকবে না। যত গভীর ভাবেই ওরা বলুক না কেন, এ হওয়ার নয়। শেষমেষ, ওরা যখন ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে আমার দিকে ফিরল, মনে হলো, বুকটা যেনো ভেঙে যাবে আমার।

তুমি এতো দুঃখিত কেন, টাইটা? আনন্দে ঝলমল মুখে জানতে চায় লসট্রিস। আমার সাথে হাস না। আজ যে আমার জীবনের সেরা দিন।

জোর করে একটু হাসলাম আমি, কিন্তু কোনো কথা জোগাল না মুখে। হৃদয়ে তোলপার, ঠোঁটে হাসি নিয়ে এই পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষ দুজনের দিকে তাকালাম ।

উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে আলিঙ্গন করলো ট্যানাস। আমার পক্ষ থেকে প্রভু ইনটেফের সঙ্গে কথা বলবে তুমি, তাই না? দাবি জানায় সে।

হ্যাঁ, টাইটা, লসট্রিস যোগ দেয় এই আবেদনে। বাবা তোমার কথা শুনবেন। এক তুমিই আছো, আমাদের জন্যে পারবে এটা করতে। করবে না, টাইটা? জীবনে কখনও আমাকে না কর নি তুমি, আমার জন্যে করবে না এটা?

কি বলব আমি ওদের? নিঠুর সত্যি কথাটা কেমন করে বলব? এই সজিব ভালোবাসাকে কী বলে মানাবো? ওরা অপেক্ষা করছে আমার উত্তরের জন্যে, চাইছে। আমি আনন্দ প্রকাশ করি, প্রতিজ্ঞা করি, সাহায্য করবো ওদের। কিন্তু বোবার মতো বসে রইলাম, শুষ্ক মুখে কথা সরছে না।

টাইটা, কী হলো? আমার মিসট্রেসের প্রিয় কমনীয় মুখে যেনো সন্ধার আঁধার ঘনালো। আমাদের সাথে আনন্দ করছ না কেন?

তোমরা জানো, তোমাদের দুজনকেই ভালোবাসি আমি, কিন্তু কথা শেষ করতে পারছি না আমি।

কিন্তু? কিন্তু কি, টাইটা? উদ্বিগ্ন লসট্রিস জানতে চাইল, আমার জীবনের সবচেয়ে সুখী দিনে অমন করছ কেন তুমি? রেগে যাচ্ছে ও, বুঝলাম; একইসঙ্গে বিন্দু বিন্দু অশ্রু জমা হচ্ছে চোখের কোণে। আমাদের সাহায্য করবে না তুমি? এতো বছর ধরে এতো অসংখ্যবার তাহলে এমনি প্রতিজ্ঞা করেছিলে আমার কাছে? আমার সামনে এসে মুখোমুখি দাঁড়াল ও, দৃষ্টিতে রোখ ।

মিসট্রেস, ওভাবে কথা বলো না। এমন ব্যবহার আমার পাওনা নয়। শোনো, আমার কথা! ওর ঠোঁটে আঙুল রেখে আরো একটা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ আঁকলাম । আমি নই, তোমার বাবা, আমার মালিক প্রভু ইনটেফ–

ঠিক তাই। অধৈৰ্য্য লসট্রিস হাতের এক ঝাঁপটায় আমার হাতে সরিয়ে দেয় ওর মুখের উপর থেকে। আমার বাবা! তুমি তার কাছে গিয়ে আমাদের ব্যাপারে কথা বলবে, সবসময় যেমন করে বল। সবকিছু তাহলে ঠিক হয়ে যাবে।

লসট্রিস, শুরু করলাম আমি। এ আমার হতাশার বহিঃপ্রকাশ, সাধারণত ওর নাম ধরে সম্বোধন করি না। তুমি এখন আর শিশু নও। বাচ্চাদের মতো কল্পনায় নিজেকে ভাসিয়ে দিও না। তুমি জানো, তোমার বাবা কখনও সম্মত হবেন না

ও আমার কথা শুনবে না। সবচেয়ে সত্যি কথাটা শুনতে ও প্রস্তুত নয়, কথার তোড়ে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইল সে। আমি জানি, ট্যানাসের অত ধন সম্পদ নেই। কিন্তু ওর সামনে দারুন ভবিষ্যত পড়ে আছে। একদিন, সমগ্র মিশরের সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেবে ও। তুমি দেখো, একদিন ওর নেতৃত্বে যুদ্ধে মিশরের দুই সাম্রাজ্য এক হবে, আমি সেদিন থাকব ওর পাশে।

মিসট্রেস, দয়া করে আমার কথা শোনো। ট্যানাসের ধন-সম্পত্তি নিয়ে কোনো কথা নেই। এরচেয়ে অনেক, অনেক বড় ব্যাপার।

তাহলে নিশ্চই ওর বংশধারা আর জন্ম নিয়ে কথা? ওটাই তো তোমার সমস্যা, না টাইটা? ভালো করেই জানো, আমাদের মতো ওরাও উচ্চ বংশীয়। পিয়াংকি, প্রভু হেরাব ছিলেন আমার বাবার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, তার সম মর্যাদার। ও আর আমার কোনো কথা শুনবে না। ও জানে না, কোনো ট্রাজেডির দ্বারপ্রান্তে এখন আমরা। ট্যানাস বা সে; ওরা কেউই জানে না। পুরো সাম্রাজ্যে সম্ভবত একমাত্র আমিই জানি সত্যিটা।

এতদিন ধরে ওর কাছ থেকে এই সত্যি গোপন রেখেছিলাম আমি, আর ট্যানাসকেও বলতে পারি নি কখনও। এখন কেমন করে ওকে বোঝাবো? কেমন করে ওকে বলব, তরুণ ট্যানাসের প্রতি তার বাবার গভীর ঘৃণার কথা? অপরাধবোধ আর ঈর্ষা থেকে জন্ম সেই ঘৃণা, হয়তো সে জন্যেই খুব বেশি স্থায়ী।

তবে, আমার প্রভু ইনটেফ খুবই চৌকস এবং চতুর মানুষ। চারপাশের লোকজনের কাছ থেকে সযত্নে আড়াল করে রেখেছেন তার অনুভূতি। তাঁর জিঘাংসা, ঘৃণাবোধ–সব লুকিয়ে রেখে হাসিমুখে চুমো খেয়েছেন তাঁরই হাতে ধ্বংস হওয়া কারো প্রতিনিধিকে। নদীর ধারে, পানির নিচে কাদায় লুকিয়ে থাকা কুমীরের মতো তাঁর ধৈৰ্য্য, সময় হলেই ঝাঁপিয়ে পড়বেন অসতর্ক গ্যাজেলের উপর। প্রয়োজন হলে দিনের পর দিন, এমনকি দশক পার করে ফেলবেন; কিন্তু সুযোগ এলেই ছোবল মারবেন বিষাক্ত সরীসৃপের মতো তড়িৎ গতিতে।

বাপের এই বিষাক্ত স্পৃহা সম্বন্ধে একেবারে অজ্ঞ লসট্রিস। ও এমনকি বিশ্বাস করে তার বাবা পিয়াংকি, প্রভু হেরাবকে ভালবাসতেন। কিন্তু, ও জানবেই বা কেমন করে? এতদিন ধরে সত্যিটা তো আমিই গোপন রেখেছিলাম তার কাছে থেকে। নিষ্পাপ লসট্রিসের ধারণা, কেবল বংশ পরিচয় আর ধন-সম্পদ-ই ট্যানাস আর ওর মিলনের পথে একমাত্র বাধা।

তুমি জানো, এটা সত্যি, টাইটা। আভিজাত্যের তালিকায় ট্যানাস আমাদের সমান। মন্দিরের বেদীতে সবকিছু লেখা আছে। কেমন করে আমার বাবা না মেনে থাকবেন? তুমিই বা কেমন করে অমান্য করবে?

এটা মানা বা না মানার ব্যাপার নয়, মিসট্রেস–

তাহলে তুমি আমার বাবার কাছে যাচ্ছ, আমাদের ব্যাপারে কথা বলতে, তাই না টাইটা? বল, যাবে তুমি; যাবে না?

দৃষ্টির হতাশা আড়াল করে মাথা ঝাঁকালাম আমি।

*

কারনাকের উদ্দেশ্যে ফিরতি যাত্রায় চললো আমাদের জাহাজ বহর। কাঁচা চামড়া আর লবল দেওয়া মাংসের ভারে প্রতিটি গ্যালির পাটাতন পানি ছুঁই ছুঁই করছে। নীল নদের বিপরীতমুখী শক্তিশালী স্রোতের কারণে যাওয়ার সময় যেমনটা হয়েছিলো, তার তুলনায় ধীরে চলছে; তবে আশঙ্কায় জর্জরিত আমার হৃদয়ে দ্রুতই

মনে হতে লাগলো সেটা। সদ্য-ঘোষিত তরুণ প্রেমের উন্মাদনায়, পরস্পরের মিলনের পথে সব বাধা হটিয়ে দেওয়ার প্রত্যয়ে যেনো ভেসে যাবে প্রেমিক-যুগল। এই সুখ-স্বপ্নে বাগড়া দিতে মন সায় দিলো না, কারণ আমি নিঃসন্দেহে জানি, অন্তরঙ্গভাবে পরস্পরকে পাওয়ার দিন ওদের শেষ হতে চললো বলে। যদি সঠিক শব্দ বা সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারতাম, আমার মনে হয়, ওদের সত্যিকার মিলনে উৎসাহিত করতাম আমি; যা নিয়ে এতো ভয় পেয়ে গেছিলাম কাল রাতে। আর কখনও এমন সুযোগ পাবে না ওরা, যদি ইনটেফকে মূল ঘটনা জানাই। একবার ব্যাপারটা জানাজানি হলেই চিরদিনের মতো ওদেরকে আলাদা করে ফেলার বন্দোবস্ত করে ফেলবেন তিনি।

তাই, যতোটা পারি, ওদের মতোই হাসলাম আর আনন্দে মেতে থাকলাম; নিজের আশঙ্কা লুকিয়ে রাখলাম বহু চেষ্টায়। ভালোবাসায় এতটাই অন্ধ হয়ে আছে ওরা, কোনো সমস্যাই হলো না তা করতে; অন্য কোনো সময় হলে আমার মিসট্রেস খুব সহজেই ধরে ফেলতো আমার অনুভূতি। ওকে যতোটা জানি আমি, আমাকে ঠিক ততটাই ভালোভাবে চেনে সে।

গলুইয়ে বসে আমরা তিনজনে উৎসবের আকর্ষণ, ওসিরিসের গীতিনাট্য নিয়ে আলোচনা করছিলাম। নাটকের সঞ্চালক হিসেবে আমাকে মনোনীত করেছেন আমার মালিক প্রভু ইনটেফ, প্রধান চরিত্রের জন্যে ট্যানাস এবং লসট্রিস দুজনকেই নিয়েছি আমি।

প্রতি দুই বছরে একবার করে হয় এই উৎসব, ওসিরিসের পূর্ণিমায়। একটা সময়ে বছরে একবার করে হোত। কিন্তু, খরচ এবং প্রশাসনিক ঝামলোর কারণে মহান ফারাও, দুই উৎসবের মধ্যবর্তী ব্যবধান বাড়ানোর সমন জারি করেছেন। প্রতি উৎসবে সেই গজ-দ্বীপ থেকে থিবেস-নগরীতে স্থানান্তর করতে হয় রাজকার্য ।

গীতিনাট্যের চিন্তা সাম্প্রতিক আশঙ্কা থেকে খানিকটা হলেও রেহাই দিলোলা আমাকে। প্রেমিক যুগলকে তাদের নিজস্ব অংশ মুখস্ত করাতে লাগলাম। ওসিরিসের স্ত্রী, আইসিস-এর চরিত্র অভিনয় করবে লসট্রিস; আর প্রধান চরিত্র, হোরাসের ভূমিকায় ট্যানাস। লসট্রিসের ছেলের ভূমিকায় ট্যানাসের অভিনয়ের সম্ভবনায় ওরা দুজন হেসে খুন হয়, আমি বোঝালাম, দেব-দেবীদের বয়স বলে কিছু নেই, নিজের সন্তানের চেয়ে তাই তাদের বয়স কম দেখানোটা অস্বাভাবিক নয় বৈকি!

প্রায় এক হাজার বছর ধরে অভিনীত হয়ে আসা গীতি পুনলিখন করেছি আমি। বর্তমান দর্শকের কাছে আগের নাট্যের বচন বেশ আলঙ্কারিক এবং দুর্বোধ্য বলে মনে হবে। উৎসবের শেষ রাতে, ওসিরিসের মন্দিরে অভিনীত হবে গীতিনাট্যটি; মহান ফারাও থাকবেন প্রধান অতিথি হিসেবে। সে কারণেই বিশেষভাবে চিন্তিত আমি। প্রাজ্ঞ এবং পুরোহিতদের কাছ থেকে ইতিমধ্যেই নাট্যাংশ পুনর্লিখনের জন্যে আপত্তি উঠেছে। কেবল আমার মালিক, প্রভু ইনটেফের হস্তক্ষেপেই তাদের আপত্তি ধোপে টেকে নি।

আমার মালিক মোটেও ধার্মিক মানুষ নন, অন্য সময়ে হলে ধর্মীয় তত্ত্বকথায় বিতর্কে যেতেন না। তবে কিনা, কিছু বাক্যে তাঁকে স্তুতি করা হয়েছে। একটা ছুতো ধরে সেই বাক্যগুলো তাঁকে আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলাম, এমনও বলেছিলাম, এটা প্রচারে প্রথম বাধা আসবে ওসিরিসের মন্দিরের বুড়ো পুরোহিতের কাছ থেকে। একবার, ছোটো বালকের অধিকার নিয়ে আমার মালিক ইনটেফের সাথে বিরোধ হয়েছিলো তার। আমার প্রভু, এই সমস্ত বাধা ক্ষমার চোখে দেখে অভ্যস্ত নন।

তো, আমার সংস্করণ প্রথমবারের মতো অভিনীত হতে যাচ্ছে। কুশীলবেরা যদি যথার্থভাবে আমার কাব্যের গৌরব ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, শেষবারের মতও প্রদর্শিত হবে নাটকটি।

ট্যানাস এবং লসট্রিস–ওদের দুজনের কণ্ঠস্বর যথেষ্ট শ্রুতিমধুর, ওদেরকে সাহায্য করার আমার প্রতিশ্রুতির পুরস্কার দিতে দুজনেই বদ্ধপরিকর। নিজেদের উজার করে দিলো ওরা, প্রতিটি শব্দে, বাক্যে আবেগের এমনই পরিস্ফুটন; নিজেকেই যেনো ভুলে গেলাম আমি।

হঠাৎই, গ্যালির সামনের কারো চিৎকারে দেবতাদের কল্পলোক থেকে বাস্তব দুনিয়ায় ফিরে এলাম। নদীর শেষ বাঁক ঘুরছে আমাদের নৌবহর, সামনেই দেখা গেলো যমজ নগরী কারনাক এবং লুক্সর, দুটিতে মিলে তৈরি করেছে আমাদের মহান থিবেস নগরী। মুক্তোর কোনো নেকলেসের মতোই ঝলমল করছে তরুণ মিশরীয় সূর্যালোকে। নাটকের চমৎকার অবতরণিকা শেষ হয়ে গেছে, কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে এখন আমাদের। পায়ের উপর দাঁড়াতে আমার স্পৃহা যেনো টলমল করে উঠল।

ট্যানাস, আমি এবং লসট্রিসকে অবশ্যই ক্ৰাতাস-এর গ্যালিতে যেতে হবে; শহর কাছে চলে এসেছে। আমার মালিকের চরেরা সেই দূর থেকে নজর রাখছে। আমাদের একসঙ্গে দেখাটা ঠিক হবে না।

একটু দেরি হয়ে গেলো না? ট্যানাস হেসে বলে। আরো আগেই সেটা ভেবে রাখা উচিত ছিলো তোমার।

এমনিতেও আমার বাবা সবকিছু জানবেন, লসট্রিস এগিয়ে আসে প্রেমিকের কথার সমর্থনে। এতে করে বরঞ্চ তোমার কাজ আরো সহজ হয়ে গেলো।

যদি আমার চাইতে তোমার জ্ঞান বেশি হয়ে যায়, তবে যা ইচ্ছা করতে পারো; আমি আর এর মধ্যে নেই। কঠোর মুখাবয়ব ধারণ করলাম, সাথে সাথে কাজ হলো এতে।

ক্ৰাতাস-এর গ্যালিকে ইশারায় আমাদের পাশে নিয়ে এলো ট্যানাস, বিদায় জানাবার জন্যে অল্প কিছু সময় পেলো ওরা দুজন। অর্ধেক নৌবহরের সামনে আলিঙ্গনাদ্ধ হলো না বটে, কিন্তু ওদের পরস্পরের প্রতি দৃষ্টিপাত আর কোমল স্বরের ফিসফিসানি জানিয়ে দিলো সবাইকে, যা জানার ছিলো।

ক্রাতাস-এর জাহাজের স্টার্ন টাওয়ারে দাঁড়িয়ে হোরাসের প্রশ্বাসকে বিদায় জানালাম আমরা, ঠিক চঞ্চল ফরিঙের মতো প্যাডল ঝাঁপটে লুক্সর নগরের সম্মুখের ঘাটের দিকে এগুল ওটা। নদীর উজানে, উজিরের প্রাসাদের উদ্দেশ্যে ভেসে চললো আমাদের জাহাজ।

*

প্রাসাদের ঘাটে নোঙর করতে না করতেই আমার মালিকের খোঁজ খবর করে একটু হলেও আশ্বস্ত হলাম। নদীর ওপারে নির্মাণাধীন ফারাওয়ের সমাধি এবং শেষকৃত্য-মন্দিরের কাজ তদারকি করতে গেছেন তিনি। গত বারো বছর ধরেই রাজার সমাধি এবং মন্দির নির্মাণ কাজ চলছে, ঠিক যেদিন থেকে দুই রাজ্যের সাদা এবং লাল রঙের মুকুট আরোহণ করেছেন আমাদের মহান ফারাও। প্রায় শেষ হয়ে এসেছে কাজ, ওটা পরিদর্শনের জন্যে নিঃসন্দেহে উন্মুখ হয়ে আছেন ফারাও; ওসিরিসের উৎসব শেষ হতে না হতেই তা করবেন তিনি। আমার মালিক, ইনটেফ চাইছেন তাঁকে যে কোনো প্রকারে সন্তুষ্ট রাখতে। আমার মালিকের বহু পদবির মধ্যে একটি হলো, রাজকীয় সমাধির অভিভাবক; নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

তাঁর এই অনুপস্থিতি আরো একদিন সময় করে দিলো আমাকে, কিছু একটা ভেবে-চিন্তে বের করার জন্যে। কিন্তু, প্রেমিক যুগল আমার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিয়েছে, প্রথম সাক্ষাতেই তাদের কথা বলতে হবে।

হারেমে আমার মিসট্রেস নিরাপদে পৌঁছুতেই প্রাসাদের এক কোণে, উজিরের নিকটজনের জন্যে তৈরি করা নিজের প্রকোষ্ঠে ফিরে চললাম তরিঘরি করে।

তাঁর অন্যান্য কার্যাবলির মতোই আমার মালিকের পারিবারিক আয়োজনও বেশ চতুর। আটজন পত্নী আছে তার, প্রত্যেককেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক সুবিধা বা মোটা উপঢৌকনের বদৌলতে বিবাহ-শয্যায় নিয়েছেন তিনি। তবে তার মধ্যে তিনজনই কেবল সন্তান উপহার দিতে পেরেছে তাকে, আমার মিসট্রেস, লসট্রিস ছাড়াও দুই ছেলে আছে ইনটেফের।

যতদূর জানি, প্রাসাদের ভেতর-বাইরের সবকিছু আসলে আমার জানা, গত পনেরো বছরে একবারো হারেমে জান নি আমার মালিক। লসট্রিসের জন্ম ছিলো তার সর্বশেষ বৈবাহিক দায়িত্ব পালনের উদাহরণ। তার শয্যা-অভিরুচি ভিন্ন ধাতের। প্রাসাদে আমার অংশে বসবাস করে আমার মালিকের বিশেষ সঙ্গীরা; সমগ্র উচ্চ রাজ্যের সুদর্শন দাস-বালকের দল। বিগত একশ বছর ধরেই মহান মালিকদের তুষ্টিতে ওরা ভূমিকা পালন করে আসছে। আমাদের অসাধারণ সুন্দর জনপদের রুগ্ন ধারার এ ও একটি উদাহরণ বলা যায়।

দাস বালকদের সংগ্রহশালায় আমি ছিলাম বয়োজ্যেষ্ঠ। অতীতের বহু দাসের ভাগ্যে যা ঘটেছে, বয়সের কারণে সৌন্দৰ্য্য কমে যাওয়ার কারণে মুক্ত বাজারে বিক্রি হয়ে যাওয়া, আমার ক্ষেত্রে সেটা ঘটে নি। কেবল শারীরিক সৌন্দৰ্য্য নয়, আমার অন্যান্য গুণের কদর করেন আমার মালিক। এমন নয় যে, আমার রূপ তিরোহিত হয়েছে, বরঞ্চ তা বেড়েছে, বয়সের সাথে সাথে আরো খুলেছে বলা যায়। ভাবতে পারেন, এ আমার অতিকথন; কিন্তু এই লিপিতে মিছে কিছু লিখবো না বলে প্রতিজ্ঞা করেছি আমি।

সাম্প্রতিক কালে আমার মালিক তার শারীরিক তুষ্টির জন্যে খুব বেশি ডাকেন না আমাকে, বলা যায়, তার এই অনাগ্রহের জন্যে সত্যি আমি আনন্দিত। যখন ওটা করেন তিনি, আমার জন্যে একটা শাস্তি ছাড়া আর কিছু নয় তা। ভালো করেই জানা আছে তাঁর, শারীরিক যন্ত্রণা আর অপমানবোধ কতটা প্রখর আমার। অবশ্য, সেই বালক বয়স থেকেই নিজের অনুভূতি আড়াল করে আনন্দের ধ্বনি আরোপ করতে শিখেছিলাম বিশেষ সময়ে; কিন্তু কখনই আমার মালিককে ধোকা দিতে পারি নি।

আশ্চৰ্য্য, আমার এই অনাগ্রহ কখনও তাঁর উপভোগে বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি। বরঞ্চ এতে করে আরো বেড়েছে তার আমোদ। ভদ্র তো ননই, একটু মায়াও নেই আমার মালিক, ইনটেফের। কত শত বার বিগত দিনগুলোয় ক্রন্দনরত বালক ছেলেগুলোকে পরিচর্যা করেছি আমার মালিকের ভালোবাসার পর, ইয়ত্তা নেই। যতোটা সম্ভব, মানসিক সহায়তা দিয়েছি ওদের। হয়তো এ কারণেই দাসদের প্রকোষ্ঠে ওরা আমাকে আকহ্-কা বা বড় ভাই বলে ডাকে।

এখন আর আমার মালিকের শয্যাসঙ্গী হয়তো নই, তবে অন্যান্য কারণে আমার কদর করেন তিনি। আমি আরো বিশেষ কিছু তাঁর কাছে কবিরাজ এবং শিল্পী, সুরকার এবং লিপিকার, স্থপতি এবং বই-পুস্তকের সগ্রাহক; উপদেষ্টা ও প্রকৌশলী-তার মেয়ের পরিচর্যাকারী। এতটা বোকা আমি নই যে, ভেবে বসব আমাকে তিনি বিশ্বাস করেন বা ভালবাসেন, তবে মাঝে-মধ্যে মনে হয় বেশ পছন্দ করেন তিনি আমাকে। এ কারণেই লসট্রিস এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছে আমার উপর।

বিবাহের ক্ষেত্রে ফায়দা লোটার ব্যাপার ছাড়া একমাত্র কন্যার আর কোনো কিছু নিয়ে মাথাব্যথা নেই ইনটেফের। ওই দায়িত্বটাও আমার উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। কখনও কখনও এমন হয়, নীল নদীর বছর পরিক্রমায় একবারও মেয়ের সাথে কথা হয় না ইনটেফের । তার প্রশিক্ষণ বা অধ্যয়ন সম্পর্কিত আমার প্রতিবেদনও মনোযোগ দিয়ে শোনেন না কখনও।

লসট্রিসের প্রতি আমার সত্যিকারের অনুভূতি তার কাছে সযত্নে আড়াল করে রাখি আমি। জানি, প্রথম সুযোগে আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে সেটা। সবসময় ভাব করি, যেনো লসট্রিসের পড়াশোনা বা পরিচর্যা আমার জন্যে বিরক্তিকর একটা কাজ, সুযোগ পেলেই বাদ দেব। নারীদেহের প্রতি আমার মালিকের মতোই অভক্তি আছে। আমার, সময়ে সময়ে এমনও বলে থাকি। আমার ধারণা, এমনকি নপুংসক করার পরেও বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আমার স্বাভাবিক আকর্ষণের খবর ইনটেফের জানা নেই।

মেয়ের কর্মকাণ্ডে আমার মালিকের এই অমনোযোগিতা কোনো কোনো সময়, অবশ্যই লসট্রিসের চাপাচাপিতে, সাহসী কাজ করতে ইন্ধন জোগায় আমাকে; ঠিক যেমন হোরাসের প্রশ্বাসে করে শিকার অভিযানে অংশগ্রহণ। পার পেয়ে যাওয়ার একটা সুযোগ বোধহয় আছে এবারেও।

সেই বিকেলে, নিজের বাসস্থানে কাজ শেষ করে আমার প্রিয় সঙ্গীদের খাবার দেওয়া এবং আদর করতে চললাম। পশুপাখির প্রতি বিশেষ অনুরক্ত আমি, এতটা বুঝি ওদেরকে, মাঝে-মধ্যে নিজেও অবাক হয়ে যাই। এক ডজন বিড়ালের সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুও আছে আমার, কেউ ওদের মালিক হতে পারে না। অপরদিকে, একটা সুন্দর কুকুরের পালের মালিক আমি। মরুর বুকে বিশাল গ্যাজেল হরিণ আর সিংহ শিকারের সময় ওদের ব্যবহার করি আমি এবং ট্যানাস।

বুনো পাখিগুলো উড়ে এসে বসে চাতালে। আমার কাঁধ বা হাতে রাখা পিচ ফল খেতে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু করে। সবচেয়ে সাহসীগুলো আমার দুই ঠোঁটের মাঝখান থেকে কিরে খায়। পোষ মানানো গ্যাজেল হরিণগুলো আশেপাশেই ঘুরঘুর করছে, ঠিক পোষা বেড়ালের মতোই। আর চাতালে নিজেদের অবস্থান থেকে আমার উদ্দেশ্যে কর্কশ কণ্ঠে ডাকতে থাকে বাজপাখি দুটো। মরুর শিকারী ওরা, বিশাল, হিংস্র, সুন্দর। সময় পেলে ওদের নিয়ে মরুভূমির গরমে ঘুরে আসি ট্যানাস এবং আমি। শিকারের পানে ওগুলোর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর চোখ ধাঁধানো গতি দারুন আনন্দ দেয় আমাকে। আমি ছাড়া আর কেউ অবশ্য আদর করতে চাইলে লম্বা-হলুদ ঠোঁটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হতে হবে; আমার কাছে ওরা পোষা চড়ই।

আমার পোষ্যদের পরিচর্যার পালা শেষ হতে একজন দাস ছেলেকে ডেকে নিজের খাবার আনতে বললাম। নীল নদীর বিশাল সবুজ বিস্তারের অপূর্ব দৃশ্যের সামনে, চাতালে বসে মধু আর ছাগ-দুগ্ধ দিয়ে রান্না করা বুনো কোয়েলের মাংস খেলাম তৃপ্তির সাথে; প্রাসাদের প্রধান রাঁধুনি কেবল আমার জন্যেই তৈরি করেছে খাবারটা। ওখানে বসে নদীর ওপার থেকে আমার মালিকের ফিরে আসার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলাম। ছোট্ট, চৌকোণা পালে লেগে ঝকমক করছে মিশরীয় সূর্যাস্তের অপরূপ আলো; তার জলযানের প্রত্যাবর্তন আমার ভেতরে ভয়ের এক পশলা ঠাণ্ডা হাওয়া বইয়ে দিতে লাগল। হয়তো আজ সন্ধাতেই আমাকে ডেকে পাঠাবেন তিনি, কিন্তু এখনই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যে প্রস্তুত নই আমি।

এরপরেই, স্বস্তির সাথে শুনলাম, প্রাসাদের প্রধান রক্ষী, র‍্যাসফার চিৎকার করে দশ বছর বয়সী এক বেদুঈন দাস বালককে ডাকছে; এ মুহূর্তে আমার মালিকের প্রথম পছন্দ। কিছু সময়ে পরেই আমার দরোজার সামনে দিয়ে আতঙ্কে বিবশ ছেলেটাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে চললো র‍্যাসফার; পর্দার আড়ালে উজিরের ব্যক্তিগত প্রকোষ্ঠে। অনেক, অনেকবার শুনেছি; তবুও কেন যেনো শিশুদের আর্ত চিৎকার সহ্য হয় না আমার। করুণায় মন ভরে গেলো। তবে, অন্তত এও স্বস্তির, যে আমাকে ডেকে পাঠানো হয় নি। রাতে ভালো ঘুম প্রয়োজন, সকালে পরিচ্ছন্ন অবস্থায় মোকাবেলা করতে হবে আমার মনিবকে।

ভারী মন নিয়ে সকালের সূর্য উঠার আগেই ঘুম ভাঙল। প্রতিদিনের মতো নীলের বরফ ঠাণ্ডা পানিতে স্নানও কোনো পরিবর্তন আনল না। দ্রুত নিজের প্রকোষ্ঠে ফিরে গেলাম; ওখানে দুই দাস ছেলে আমার শরীরে তেল মেখে, চুল আঁচড়ে দিতে লাগল। রাজপরিবারে প্রসাধনী ব্যবহারের যে প্রচলন, আমি তার বিরুদ্ধে। আমার দেহের বর্ণ বা চামড়ার যে উজ্জ্বলতা, তাতে এসবের কোনো প্রয়োজন নেই; কিন্তু আমার মনিব চান তার দাসেরা তা ব্যবহার করুক। আর আজকের দিনে তাকে সন্তুষ্ট করতেই হবে আমাকে।

তামার আয়নায় নিজের অবয়ব আশ্বস্ত করে আমাকে, কিন্তু খিদের অভাবে নাস্তা করতে পারলাম না। সভাসদদের মধ্যে সবার আগে আমিই পৌঁছলাম জলের বাগানে; প্রতিদিন সকালে ওখানেই বসে কাৰ্যসভা।

সভাসদের আগমনের অপেক্ষায় বসে মাছরাঙাদের কাজ দেখতে লাগলাম। জলের বাগানে যে ভবন তৈরি করা হয়েছে, তার ছক এবং নির্মাণ তদারকি আমি করেছি। বেশ কটি খাল এবং হ্রদের এক অপূর্ব সমন্বয় এটি, একটি থেকে অপরটিতে প্রবাহিত হয় জল। রাজ্যের প্রতিটি অংশ থেকে, এমনকি রাজ্যের বাইরে থেকেও নিয়ে আসা হয়েছে ফুল গাছ, কী অদ্ভুত বর্ণিল তাদের রঙ। নীল নদে যত প্রকারের মাছ আছে, তার সবই পাওয়া যাবে জল-বাগানের হ্রদে। তবে মাছরাঙাদের কারণে প্রতিনিয়তই নতুন করে জোগান দিতে হয় ওগুলো।

ল্যাপিস-লাজুলি পাথরের মতোই মুক্ত আকাশে পাখি ওড়া দেখতে পছন্দ করেন আমার মনিব, ইনটেফ; তারপর এক ঝলকে নিচে নেমে ছোঁ মেরে যখন ওরা লম্বা ঠোঁটে তুলে নেয় ছটফটে রুপালি শিকার তাঁর আনন্দ আর ধরে না। আমার মনে হয়, নিজেকে ওদের মতোই পরভোজী ভাবেন তিনি, মানুষ-শিকারী নিজেকে মনে করেন পাখির সখা। কখনওই পাখিদের বিরক্ত করা পছন্দ করেন না তিনি, মালীদের নিষেধ করা আছে এ ব্যাপারে।

ধীরে ভরে উঠছে সভা-প্রাঙ্গন। বেশিরভাগই এখনও ঘুমের আতিশায্যে লম্বা হাই তুলছে। আমার মনিব, ইনটেফ সাত সকালে ঘুম ভেঙে উঠেন, রৌদ্র চড়ার আগেই প্রাসাদের প্রাত্যহিক কাজ-কর্ম শেষ করে ফেলতে ভালবাসেন। সকালের প্রথম সূর্য। রশ্মিতে ভিজে তার আগমনের অপেক্ষায় বসে থাকি আমরা।

আজ মালিকের মন ভালো, ফিসফিস করে বলে রাজপরিচর্যক, আমার পাশেই আসন নেয় সে। আশার ছোটো একটা আলো যেনো দেখতে পেলাম আমি। লসট্রিসকে করা আমার অযাচিত প্রতিজ্ঞার ফলাফল হয়তো অত খারাপ নাও হতে পারে।

প্যাপিরাসের ঝারে কাঁপন তুলে বয়ে যায় নদী থেকে আসা বাতাস, ইনটেফের আগমনে গুঞ্জন উঠে সভাসদদের মধ্যে।

রাজকীয় তার হাটার ধরন, সম্মান আর ক্ষমতার বিচ্ছুরণ তাতে স্পষ্ট। গলার চারধারে প্রশংসার স্বর্ণ-শেকল পরে আছেন তিনি; খনি থেকে সংগ্রহীত লাল সোনার একটা হার ওটা, স্বয়ং ফারাও পরিয়ে দিয়েছেন তাকে নিজ হাতে। ইনটেফের আগে আগে হাঁটছে তাঁর বাণী-বন্দনাকারী, বাঁকা পায়ের এক বামন; তীক্ষ্ণ গলায়, নাকী সুরে গাইছে। সুন্দরই হোক বা কিম্ভুতকিমাকার, কৌতূহল উদ্দিপক সৃষ্টিতে নিজের চারপাশ ভরে রাখতে ভালবাসেন আমার মনিব।

জাগো, মিশরের জনতা! নীল নদীর জলের অভিভাবককে সেলাম জানাও! মহান ফারাওয়ের সতীর্থের সামনে নিচু হও! এ সমস্তই ইনটফকে দেওয়া রাজার অভিধা, প্রতিটি বিশেষ বিশেষ দায়িত্বভার ন্যস্ত করেছে তার উপর। যেমন, নীল নদির জলের অভিভাবক হিসেবে প্রতি মৌসুমেই বন্যা এবং পানির উপরিতলের গভীরতা জানতে হয় তাকে; বলাবাহুল্য, তার হয়ে সেই দায়িত্ব পালন করে চলেছে বিশ্বস্ত ছোটলোক কৃতদাস টাইটা।

অর্ধেক বছর ধরে প্রকৌশলী আর গণিতজ্ঞদের নিয়ে খেটেছি আমি, আসুয়ানের পাথুরে চূড়ার উচ্চতা মেপেছি যাতে করে বন্যার সময়ে পানির উচ্চতা নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা যায়। সেই হিসাব থেকে ফসল তোলার মৌসুমের আগাম ঘোষণা করা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে, খরা এবং ভরা মৌসুমের পূর্বাভাস করাও যায় এ দেখে । আমার কাজে দারুন সন্তুষ্ট ফারাও আরও সম্মান এবং পুরস্কার দিয়েছেন আমার মালিক, ইনটেফকে।

কারনাকের সম্রাটের সামনে মাথা নত করুন, নেক্রোপলিসের প্রভু, রাজকীয় সমাধির রক্ষণাবেক্ষণকারীকে সেলাম! এই অভিধার বদৌলতে আমার মালিক বর্তমান ফারাও এবং পূর্ববর্তী সকল সম্রাটের মূর্তি তৈরি, প্রস্তুতি এবং পরিচর্যার দায়িত্ব পেয়েছেন। এবারেও, সমস্ত কাজের ভার ন্যস্ত হয়েছে বহু-ব্যবহারে ক্লান্ত ক্রীতদাসের কাঁধে। ওসিরিসের গেলো বছরের উৎসবের পর গতকালই কেবল ইনটেফ পরিদর্শন করেছেন নির্মাণাধীন রাজসমাধি। গরম আর ধুলোর মাঝে সব সময় আমিই গিয়েছি শ্রমিকদের কাজ তদারকিতে, রাজমিস্ত্রি আর প্রস্তরশিল্পীদের তাগিদ দিতে। মাঝে মধ্যে নিজের মতো গুণাবলির কথা মনিবকে জানতে দিয়েছি বলে আফসোস হয় বৈকি।

অনায়াসে আমাকে ভীড়ের মধ্য থেকে আলাদা করে ফেললেন তিনি। বুনো চিতার মতো হলদে চোখে তাকালেন আমার দিকে, সামান্য ঝাঁকালেন মাথা। ধীরে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম, প্রতিবারের মতোই বিস্মিত হলাম তাঁর উচচতা আর কাঁধের বিস্তারে। লম্বা, সুগঠিত হাত-পা, শক্ত মেদহীন পেটের একজন দারুন সুদর্শন মানুষ আমার মনিব। সিংহের মতো গর্বোদ্ধত মস্তক, ঘন চুলের অরণ্য মাথায়। তখন চল্লিশ বছর মতো ছিলো তাঁর বয়স, বিশ বছর ধরেই আমি তার দাস।

বাগানের কেন্দ্রে অবস্থিত বারাজ্জার উদ্দেশ্যে চললো সভা, চারদিকে কোনো দেয়াল নেই স্থাপনাটির, মাথার উপরে পাতার আচ্ছাদন; নদী থেকে বয়ে আসা স্নিগ্ধ বাতাস শরীর জুরায়। নিচু টেবিলের উপর পা ভাজ করে বসেন ইনটেফ, তার পায়ের কাছে পড়ে রয়েছে রাজ্যের কার্যাবলি সম্বলিত স্ক্রোলগুলো। সবসময়ের মতো আমি বসলাম তার পেছনে। দিনের কার্যসূচি শুরু হলো।

সেই সকালে দুইবার ইনটেক মাথা সামান্য হেলিয়ে আমার দিকে ফিরিয়েছিলেন। ঘাড় ফেরান নি, এমনকি একটি শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করেন নি, কিন্তু আমি জানি, আমার পরামর্শ চেয়েছিলেন তিনি। ঠোর্ট প্রায় না নড়িয়ে, এতো নিচু স্বরে কথা বললাম আমি; কেউ সেভাবে বুঝতেই পারে নি কিছু বলেছি তাকে।

একবার বিড়বিড় করে বললাম, ও মিছে বলছে, আর দ্বিতীয়বার, এই পদের জন্যে রেতিক যোগ্য লোক, আর তাছাড়া আমার মালিকের ব্যক্তিগত কোষাগারে পাঁচটি স্বর্ণের আংটি উপহার হিসেবে দিতে চেয়েছে সে। যে কথাটা বলি নি, তা হলো, কাজ হয়ে গেলে বাকি আর একটি আংটি আমাকে উপহার দেবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছে সে।

দুপুর নাগাদ রাজকীয় সভা সমাপ্তি ঘোষণা করে খেতে চাইলেন ইনটেফ। প্রথমবারের মতো একা হলাম আমরা দুজন, কেবল মাত্র প্রাসাদের প্রধান রক্ষী এবং প্রধান জল্লাদ র‍্যাসফার ছাড়া। বারাজ্জার দৃষ্টিপথের বাইরে, দূরে দরোজায় অবস্থান নিল সে।

ইশারায় আমাকে কাছে ডাকলেন ইনটেফ, তাঁর সামনে রাখা সুস্বাদু মাংস আর ফলমূলের থেকে খেতে বললেন। আমার উপর সম্ভাব্য বিষক্রিয়ার প্রভাবের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে সেদিন সকালের রাজকার্য নিয়ে আলোচনা চালিয়ে গেলাম আমরা।

এরপরে হাপির হ্রদে আমাদের অভিযান এবং জলহস্তি শিকার সম্বন্ধে জানতে চাইলেন ইনটেফ। সবকিছু বর্ণনা করে গেলাম আমি; জলহস্তির মাংস, চামড়া আর দাঁত থেকে কি পরিমাণ লাভ হতে পারে, তার একটা ধারণাও দিলাম। সম্ভাব্য লাভের পরিমাণটা একটু বাড়িয়ে বলতেই হাসি ফুটল আমার মালিকের মুখে। প্রাণখোলা, মনমুগ্ধকর তার হাসি। এ থেকে কিছুটা অনুমান করা যায় ইনটেফের মানুষ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। এমনকি আমি পর্যন্ত বোকা বনেছিলাম অন্তত একবার ।

জলহস্তির মাংসের তৈরি রান্নায় ইনটেফ মগ্ন হতেই, সাহস সঞ্চয় করে বলতে শুরু করলাম আমি। আমার মালিক তো জেনে গেছেন, অভিযানে আপনার কন্যাকে সাথে নেয়ার অনুমতি দিয়েছিলাম আমি। তার চোখের দৃষ্টি বলে দিল, এ তার জানা ছিলো; দেখছিলেন আমি ব্যাপারটা আড়াল করতে চাই কি না।

আমার অনুমতি নেওয়া দরকার বলে মনে হয় নি তোমার? মৃদুকণ্ঠে বললেন ইনটেফ, তার চোখের দৃষ্টি এড়িয়ে একটা আঙুর ছিঁড়তে লাগলাম আমি। আমরা রওনা হওয়ার ঠিক আগে যেতে চেয়েছে লসট্রিস। আপনি তো জানেন, দেবী হাপি তার রক্ষক, তাই তাঁর মন্দিরে পূজো দিতে চেয়েছে সে।

তাও আমাকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন হয় নি? আবার বললেন ইনটেফ, আঙুরটা তার দিকে এগিয়ে দিলাম আমি। ঠোঁট ফাঁক করে ওটা মুখের ভেতরে যেতে দিলেন তিনি। এর অর্থ হচ্ছে, এখনও আমার উপর ততটা বিরাগ নন, অতি অবশ্যই ট্যানাস এবং লসট্রিস সম্পর্কিত সত্যিটা তার কাছে পৌঁছে নি।

আসূনের সম্রাটের সঙ্গে সভায় ব্যস্ত ছিলেন আপনি সেই সময়ে। বিরক্ত করার সাহস করি নি। আর তাছাড়া, এতে কোনো ক্ষতি ছিলো না। সাধারণ একটা সিদ্ধান্ত, মালিকের পক্ষ থেকে মাঝে-মধ্যেই নিই আমি।

কী সহজ তুমি, তাই না, আমার প্রিয় টাইটা? মুচকি হাসলেন ইনটেফ। আর সুন্দরও বটে। চোখের পাতায় যে রঙ করেছ, ভালো লাগছে আমার। আর কি সুগন্ধি লাগিয়েছ শরীরে?

বুনো ভায়োলেটের পাঁপড়ির নির‍্যাস, উত্তরে বললাম। আপনার ভালো লেগেছে জেনে আমি আনন্দিত। এক পাত্র উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছি আমি। আমার থলের ভেতর থেকে পাত্রটা বের করে কুর্নিশ করে তার পদতলে রাখলাম আমি ওটা। আমার চিবুকের নিচে এক আঙুল রেখে মুখ উঁচু করলেন ইনটেফ, চুমো খেলেন ঠোঁটে । বাধ্যগতের মতো আমি প্রত্যুত্তর করলাম তাঁর চুম্বনের, শেষে ঠোঁট সরিয়ে গালে হালকা করে আদর করে দিলেন ইনটেফ।

যা কিছু কর না কেন, তুমি এখনও অনেক আকর্ষণীয়, টাইটা। এতো বছর পরেও আমাকে আনন্দ দিতে পার তুমি। এখন বলো তো, লসট্রিসের খেয়াল নাও ঠিকমতো? এক মুহূর্তের জন্যেও তোমার দৃষ্টিসীমার বাইরে বা যত্নের বাইরে থাকে সে?

না, মালিক। সজাগ আমি বললাম ।

তো, ওর ব্যাপারে আলাদা করে কোনো কিছু বলতে চাও না আমাকে? আছে নাকি তেমন কিছু?

তখনও হাঁটুর উপরে দাঁড়িয়ে আমি, কথা সরছিল না মুখে। শুকিয়ে গেছে গলা।

আমার সামনে ঢোক গিলো না, প্রিয়, হাসলেন ইনটেফ। পুরুষ মানুষের মতো কথা বল, যদিও তুমি তা নও। নিষ্ঠুর একটা কৌতুক এটা, দারুন বাজল আমার বুকে।

সত্যিই, একটা ব্যাপার আমার মালিকের গোচরে আনতে চাই, বললাম আমি। আর ব্যাপারটা অবশ্যই লসট্রিসকে নিয়ে। আগেই জানিয়েছি, আপনার কন্যা প্রথমবারের মতো ঋতুমতী হয়েছে এ বছরের বন্যার সময়ে। এরপর থেকে প্রতিমাসেই। জোরালোভাবে হচ্ছে সেটা।

বিতৃষ্ণায় ঠোঁক বাঁকালেন ইনটেফ, নারী শরীরের জৈবিক কার্যাবলি ঘৃণা করেন তিনি। ব্যাপারটা আজব লাগে আমার কাছে, শারীরিক সুখে যিনি মত্ত থাকেন পুরুষ দেহ নিয়ে তার আবার কিসের ঘৃণা।

আমি বলে চলি, লসট্রিস এখন বিবাহযোগ্যা । আবেগী এবং কোমল মন ওর । আমার ধারণা, যত দ্রুত সম্ভব তার জন্যে-একজন পুরুষ খুঁজে বের করা জরুরি।

নির্ঘাত কোনো পরামর্শ আছে তোমার কাছে? শুষ্ক কণ্ঠে জানতে চাইলেন ইনটেফ, সায় দিয়ে আমি বললাম, সত্যিই একজন পাণিপ্রার্থী আছেন, মালিক।

একজন নয়, আমার ধারণা আরও একজনের কথা বলছ তুমি, টাইটা। ছয় জনের কথা ইতিমধ্যেই জানি আমি, আয়ূনের সম্রাট এবং স্বটের প্রশাসক রয়েছেন তাদের মধ্যে। প্রস্তাব দিয়েছেন তারা সবাই।

আর একজনের কথা বলেছি আমি, মালিক; এমন একজন লসট্রিস যাকে মনোনীত করেছে। আপনার হয়তো মনে পড়বে, সম্রাটকে মোটা ব্যাঙ আর প্রশাসককে বুড়ো ছাগল বলে সম্বোধন করেছিল সে।

মেয়ের আপত্তি বা অনুমতির আমার কাছে কোনো অর্থ নেই। মাথা নেড়ে হেসে আমার গাল টিপে দিলেন ইনটে। কিন্তু বলে যাও, টাইটা। এই প্রেম-পাগল পাণিপ্রার্থীর নাম শোনাও আমাকে, মিশরের সর্বোচ্চ পণের বিনিময়ে যে আমার আত্মীয়তা পেতে চায়। দম নিয়ে বলতে যাচ্ছিলাম আমি, কিন্তু আমাকে থামিয়ে দিলেন ইনটেফ। না, থাম! আমাকেই অনুমান করতে দাও

ধূর্ত আর কুটিল হাসিতে পাল্টে যায় তার মুখাবয়ব, বুঝতে পারলাম পুরোটা সময় আমাকে নিয়ে খেলছিলেন তিনি।

লসট্রিসের পছন্দ হলে তাকে হতে হবে তরুণ, সুদর্শন, অভিনয় করছেন ইনটেফ, আর তুমি তার পক্ষ হয়ে বলছ যেহেতু, সে নিশ্চই তোমার বন্ধু এবং সুহৃদ। নিঃসন্দেহে তার দাবি আমার কাছে পৌঁছানোর জন্যে তোমার সাহায্য কামনা করার সুযোগ পেয়েছে সে। কোথায় এবং কখন এমনটি করতে পারে সে? ভাবছি। হয়তো, মাঝরাত্তিরে হাপির মন্দিরে, হতে পারে না? আমি ঠিক বলছি তো, টাইটা?

বিবর্ণ হয়ে গেছি আমি । কেমন করে এতো কিছু জানেন ইনটেফ? আমার ঘাড়ের পেছনে হাত নিয়ে জড়িয়ে ধরলেন তিনি, হালকা করে চাপড় দিচ্ছেন। বেশিরভাগ সময়েই দেহজ সুখে মত্ত হওয়ার আগে এমনটা করেন ইনটেফ। হালকা করে চুমো খেলেন আমার ঠোঁটে ।

তোমার মুখ দেখে বুঝতে পারছি, সত্যির খুব কাছাকছি বলেছি। একগাছি সুন্দর চুল আঙুলে জড়াতে লাগলেন। এখন কেবল নাম বলাটা বাকি আছে এই মহান প্রেমিকের। সেকি ডাক্কা নাকি? না, না, ডাক্কা এতো গর্দভ নয় যে আমার আক্রোশে পড়বে। ধীরে জোর বাড়াচ্ছেন ইনটেফ আমার চুলের গাছিতে, ব্যথায় চোখে পানি চলে এলো। তাহলে কি ক্ৰাতাস? সুদর্শন আর বোকা সেও। চুলের মুঠিতে জোর বাড়াতে শব্দ করে ছিঁড়ে গেলো ক গাছি, গলা দিয়ে উঠে আসা আর্তনাদ গিলে ফেললাম আমি।

উত্তর দাও, প্রিয় টাইটা, ওটা কি ক্ৰাতাস? নিজের কোলে আমার মুখ চেপে ধরলেন ইনটেফ।

না, মালিক, ব্যথায় ফিসফিস করে বললাম। তাকে সম্পূর্ণ উত্তেজিত দেখে এতটুকু অবাক হলাম না। তাকে মুখের ভেতরে নিতে বাধ্য করলেন ইনটেফ, ওভাবেই ধরে রাখলেন আমাকে।

ক্রাতাস নয়? তুমি নিশ্চিত? হতবুদ্ধ হওয়ার ভান করছেন ইনটেফ। যদি ক্ৰাতাস হয়, তবে এই বেকুব, প্রাণের মায়াহীন, হতভাগা কে হতে পারে আমি বুঝতে পারছি না; উচ্চ মিশরের রাজ উজিরের কুমারী কন্যার দাবি করতে পারে, এতো ধৃষ্টতা!

আচমকাই, স্বর উঁচালেন ইনটেফ। র‍্যাসফার! চেঁচিয়ে ডাকছেন। আমার মুখ বাঁকা হয়ে ছিলো তার কোলে, তাই রাসফারকে আসতে দেখছিলাম।

আসূনের গজ-দ্বীপে, ফারাওয়ের চিড়িয়াখানায় বিশাল এক কালো ভালুক ছিলো একসময়; পুবের ব্যবসায়ী ক্যারাভান থেকে কেনা হয়েছিলো। সেই বিভৎস, দাগপড়া বর্বরটাকে মনে করিয়ে দেয় আমার মনিবের প্রধান রক্ষী র‍্যাসফার। ওদের দুটিরই বিশাল, বিকৃত দেহ আর বুনো শক্তি রয়েছে যা দিয়ে খালি হাতে কাউকে মেরে ফেলতে পারে। তবে, চেহারা সৌন্দৰ্য্য আর আচরণে সেই ভালুক র‍্যাসফারের চাইতে অনেক বেশি কাম্য।

ভীষণ, গাছের গুঁড়ির মতো পায়ে প্রায় ছুটে এগুল সে, তাকে দেখে সেদিনের কথা মনে পড়ে গেলো যেদিন পুরুষত্বের নিদর্শন কেড়ে নেওয়া হয়েছিলো আমার শরীর থেকে।

এত মিল সেদিনের সাথে আজকের, যেনো জোর করে আবারো সেই ভয়ঙ্কর দিনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আমাকে। প্রতিটি খুঁটিনাটি এতো পরিষ্কার মানসপটে, আশঙ্কায় সিঁটিয়ে গেলাম। বহুকাল আগের সেই ট্রাজেডির কুশীলব একই আছে। দানব র‍্যাসফার, আমার মনিব আর আমি। কেবল সেই মেয়েটা নেই।

ওর নাম ছিলো এলাইদা । আমার মতোই বয়সী, ষোড়ষি এক মিষ্টি মেয়ে। দাসী হিসেবে প্রাসাদে থাকতো। আমার মনে হয়, অত্যন্ত সুন্দরী ছিলো এলাইদা, কিন্তু এমনও হতে পারে, স্মৃতি হয়তো প্রতারণা করছে আমার সাথে; কেননা, অত রূপ থাকলে মহান বাড়ির হারেমে ওর স্থান হোত, রান্নাঘরে নয়। একটা ব্যাপার জানি, ওর ত্বকের বর্ণ আর অনুভব ছিলো পালিশ করা তৈলস্ফটিকের মতো হলদেটে; উষ্ণ আর নরম। এলাইদার শরীরের ছোঁয়া আমি কোনোদিনও ভুলে যেতে পারব না, কারণ সে রকম আর কিছু কোনোদিন উপভোগ করার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে আমার কাছ থেকে। দুঃখের দিনগুলোতে আমরা পরস্পরের কাছে খুঁজে পেয়েছিলাম স্বাচ্ছন্দ্য আর সুখ। কখনও বুঝতে পারি নি, কে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল সেদিন। আমি প্রতিশোধপরায়ণ নই, কিন্তু মাঝেমাঝে মনে হয় যদি একবার সেই ব্যক্তির দেখা পেতাম!

সেই সময়ে আমি ছিলাম ইনটেফের সবচেয়ে প্রিয়, তার বিশেষ পছন্দের। যখন বুঝতে পারলেন, আমি তার প্রতি অবিশ্বস্ত ছিলাম, তার আত্মগরিমায় এতো লেগেছিল ব্যাপারটা, রাগে পাগল হয়ে উঠলেন।

র‍্যাসফার এসেছিল আমাদের নিয়ে যেতে। এক জোড়া মুরগির ছানার মতোই দুই হাতে দুজনকে ধরে হাজির করেছিল ইনটেফের ব্যক্তিগত প্রকোষ্ঠে। ওখানে সমস্ত কাপড় ছিঁড়ে ফেলে নগ্ন করা হলো আমাদের; আমার মনিব আধশোয়া হয়ে দেখছিলেন পুরোটা সময়, এখন যেমন দেখছেন। কাঁচা চামড়ার ফিতে দিয়ে এলাইদার দুই হাত পা বেঁধে দিয়েছিল র‍্যাসফার। আতঙ্কে বিবশ, কাঁপছিল ও; কিন্তু কাঁদোনি একটুও। আমার ভালোবাসা কিংবা ওর সাহসের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সেই মুহূর্তে যেনো আরো বেড়ে গিয়েছিল ।

ইশারায় আমাকে তাঁর সামনে উবু হতে বলেছিলেন আমার মনিব । চুলের মুঠি ধরে ফিসফিস করে কানে কানে বলছিলেন, তুমি কি আমাকে ভালবাসো, টাইটা? হয়তো ভেবেছিলাম, মিথ্যে বলে এলাইদাকে বাঁচাতে পারব, তাই বলেছিলাম, জ্বী।

আর কাউকে ভালবাসো তুমি, টাইটা? মসৃণ স্বরে বলেছিলেন তিনি। কাপুরুষ আর বিশ্বাসঘাতক আমি, উত্তরে বলেছিলাম, না, মালিক। আমি কেবল আপনাকেই ভালোবাসি। কেবল তখনই আমি শুনতে পেলাম, এলাইদা কাঁদছে। আমার জীবনে শোনা সবচেয়ে করুণ শব্দ ছিলো সেই কান্নার ।

র‍্যাসফারকে ডেকেছিলেন ইনটেফ, এখানে নিয়ে আসো মাগীটাকে। এমনভাবে রাখো, যেনো নিজেদের দেখতে পায় ওরা। ওকে নিয়ে কী করা হচ্ছে, তার সবকিছু যেনো পরিষ্কার দেখতে পায় টাইটা।

আমার দৃষ্টিপথে এলাইদাকে নিয়ে আসতে দেখলাম, দাঁত বের করে হাসছে র‍্যাসফার। এরপরে স্বর উঁচু করলেন ইনটেফ, ঠিক আছে, রাসফার। এবারে শুরু করতে পারো তুমি।

এলাইদার কপালের উপর দিয়ে পাকানো দড়ির ফাঁস রেখেছিল র‍্যাসফার। কিছু দূরত্ব পরপর গিঁট বাঁধা সেটায়। ওর পেছনে দাঁড়িয়ে ছোটো, শক্ত অলিভ কাঠের একটা ব্যাটন পেঁচালো সে চামড়ার ফিতেটায়; মোচড় দিতে লাগলো যতক্ষণ পর্যন্ত না এলাইদার মসৃণ, নরম ত্বকে সেঁটে আসে। কর্কশ চামড়ার গিটগুলো এলাইদার ত্বকে চাপ দিতেই ব্যথায় গুঙিয়ে উঠেছিল ও।

ধীরে, র‍্যাসফার, ইনটেফ বলে উঠেছিলেন, এখনও অনেক সময় বাকি আছে।

র‍্যাসফারের বিশাল, লোমশ হাতে খেলনার মতো লাগছিল অলিভ কাঠের ব্যাটনটা। খুব সতর্কতার সাথে, ধীরে মোচড় দিতে লাগলো সে ওটায় । গিঁটগুলো যতই চেপে বসছিল, এলাইদার মুখ হা হচ্ছিল ক্রমশ, কাশির দমকে বেরিয়ে যেতে লাগলো ফুসফুঁসের সমস্ত বাতাস। ত্বকের রঙ সরে গিয়ে মরা ছাই ধারণ করেছিল মুখাবয়ব।

হাসতে হাসতেই, ব্যাটনে শেষ একটা মোচড় দিতে দড়ির গিঁটগুলো দেবে গেলো এলাইদার কপালে । মাথার আকার পাল্টে গেলো তার। দড়ির প্রতিটি মোচড়ের সাথে সাথে ক্রমেই লম্বা হয়ে যাচ্ছিল এলাইদার মাথা। ওর একটানা চিৎকার ছুরিকার মতো বিঁধছিল আমার বুকে। যেনো চিরকাল ধরে চলছিল সেই মুহূর্তগুলো।

এরপরে ফেটে গেলো মাথার হাড়। মৃদু শব্দটা ঠিকই শুনতে পেয়েছিলাম আমি। হঠাৎ থেমে যায় সেই ভয়ঙ্কর, হৃদয় বিদীর্ণ করা চিৎকার, র‍্যাসফারের হাতে শিথিল হয়ে পড়ে এলাইদার দেহ।

যেন একযুগ পর, আমার মুখ তুলে ধরে চোখে চোখে তাকালেন ইনটেফ। দুঃখের সাথে বললেন, ও চলে গেছে, টাইটা। শয়তানী ছিলো একটা, তোমাকে নষ্ট করে গেছে। আর যেনো এমন না ঘটে, নিশ্চিত করতে হবে আমাকে। আরো কোনো শয়তানীর হাত থেকে বাঁচাতে হবে তোমাকে।

আবারো র‍্যাসফারকে ইশারা করলেন ইনটেফ, এলাইদার নগ্ন প্রাণহীন দেহ। পা ধরে টেনে চাতালে নিয়ে গেলো সে। তুবড়ে যাওয়া মাথার পেছনটা ঘন ঘন বাড়ি খেতে লাগলো সিঁড়ির ধাপে, চুলগুলো হেঁচরে যাচ্ছে মাটিতে। শক্তিশালী কাঁধের ব্যবহারে বহুদূরে, নদীতে ছুঁড়ে ফেলল র‍্যাসফার নিহত এলাইদাকে। শূন্যে পাক খেল ওর নিপ্রাণ, ধবধবে হাত-পা; পানিতে আছড়ে পড়লো। দ্রুতই তলিয়ে গেলো দেহটা, চুলগুলো ছড়িয়ে পড়ল পানিতে, নদীর আগাছার মতো।

ঘুরে দাঁড়িয়ে চাতালের শেষ মাথার দিকে চললো র‍্যাসফার, ওখানে দুজন লোক গনগনে কয়লায় কি যেনো পড়াচ্ছিল। পাশেই কাঠের পাটাতনে রাখা ছিলো পুরোদস্তুর শল্যবিদের যন্ত্র। সেদিকে এক পলক তাকিয়ে অনুমোদনের হাসি হেসেছিল র‍্যাসফার । ফিরে পঁড়িয়ে, মনিব ইনটেফের সামনে মাথা ঝোকাল সে। সবকিছু তৈরি।

এক আঙুলে আমার কান্না-চর্চিত মুখ পরিষ্কার করেছিলেন ইনটেফ, এরপরে আঙুলটা চুষলেন, যেনো আমার বেদনার স্বাদ নিচ্ছেন। এদিকে এসো, আমার সুন্দর সঙ্গী, ফিসফিস করে বলেছিলেন তিনি। পায়ের উপর দাঁড় করিয়ে চাতালে নিয়ে এলেন আমাকে। কান্নার দমকে এতো অন্ধ ছিলাম আমি, নিজের সর্বনাশের কোনো ইশারা তখনও পাই নি। দুজন সৈনিক জেঁকে ধরেছিল আমার কাঁধ। টেরাকোটা ছকের মেঝের উপর চিৎপাত করে ধরে রেখেছিল ওরা আমাকে, কবজি আর গোড়ালিতে বজ্রকঠিন মুঠোতে। শুধু মাথা নাড়তে পারছিলাম ।

আমার মাথার কাছে ঝুঁকে এসেছিলেন ইনটেফ। রাসফার বসেছিল ছড়ানো দুই পায়ের মাঝে।

ওই শয়তানী তুমি আর কখনও করবে না, টাইটা। কেবলমাত্র তখন আমি টের পেলাম, র‍্যাসফারের ডানহাতে রয়েছে একটা তামার তৈরি শল্যবিদের ছুরি । আমার মনিব ইশারা করতেই মুক্ত হাত দিয়ে আমার বিশেষ অঙ্গ টেনে ধরেছিল র‍্যাসফার ।

কী অসাধারণ এক জোড়া ডিম আছে! দাঁত বের করে হেসে হাতের ছুরিটা আমাকে দেখিয়েছিল র‍্যাসফার । কিন্তু আফসোস, ওগুলো কুমীরের খাদ্য হবে, তোর মাগীর মতোই। ফলাটাকে চুমো খায় সে।

দয়া করুন, মালিক, আমি প্রার্থনা করেছিলাম। দয়া করুন। কিন্তু আমার আবেদন তীক্ষ্ণ আর্তনাদে পর্যবসিত হয়েছিলো, সেই মুহূর্তেই ছুরি চালিয়ে দিলো র‍্যাসফার। মনে হলো যেন, গনগনে লাল লোহার কাঠি কেউ ঢুকিয়ে দিয়েছে আমার পেটের ভেতর।

ওগুলোকে বিদায় বলো, ছোকরা, বিষণ্ণ, ভজ পরা চামড়ার দুটো থলে আর ওগুলোর ভেতরের জিনিস দেখালো আমাকে রাসফার। উঠে দাঁড়াতে গিয়েছিল সে, আমার মনিব বাধা দিয়েছিলেন। এখনও শেষ হয় নি, শান্তভাবে তাকে বললেন ইনটেফ। পুরোটা চাই আমার।

প্রথমটায় বোকার মতো তাঁর দিকে চেয়ে রইল র‍্যাসফার, নির্দেশটা বুঝতে পারেনি। এরপরে হাসির দমকে কেঁপে উঠে তার বিশাল পেট। হোরাসের রক্তের শপথ, গর্জে উঠে সে, এখন থেকে আমাদের ছোকরাকে মেয়েদের মতো বসে পেচ্ছাব করতে হবে! আবারো ছুরি চালায় সে, আঙুলের মতো বিচ্ছিন্ন অঙ্গ আমাকে দেখিয়ে হাসিতে ফেটে পড়ে।

এখন থেকে নিজেকে অনেক হালকা বোধ হবে তোর। হাসির দমকে কাঁপতে কাঁপতে চাতালের প্রান্তে যায় সে, ছুঁড়ে নদীতে ফেলবে ওটা। কিন্তু আবারো আমার মনিব তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ডেকে থামায় তাকে।

ওগুলো আমাকে দাও! তাঁর নির্দেশে বাধ্যগতের মতো রক্তাক্ত খণ্ডগুলো হাত বদল করে রাসফার। ক মুহূর্তের জন্যে দারুন মনোযোগর সাথে ওগুলো পরীক্ষা করে দেখেন ইনটেফ, এরপরে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, এত সুন্দর পুরস্কারের থেকে তোমাকে আমি চিরতরে বঞ্চিত করতে পারি না, প্রিয়। এগুলো শব প্রস্তুতকারীদের কাছে পাঠাবো আমি, ওরা ফিরিয়ে দিলে মুক্তো আর ল্যাপিস-লাজুলির সাথে গলার হারে পড়বো। ওসিরিসের আগামী উৎসবে ওটাই হবে আমার পক্ষ থেকে তোমার উপহার। এতে করে, কবরে যাওয়ার দিনে ওগুলো দেওয়া যাবে সাথে; দেবতারা সদয় হলে হয়তো পরের জীবনে ব্যবহার করতে পারবে ওটা।

শব প্রস্তুতির তরল দিয়ে আমার রক্তপাত বন্ধ করার সাথে সাথেই শেষ হওয়ার কথা ছিলো সেই অধ্যায়ের, কিন্তু আজ, এখন, আবারো সেই দুঃস্বপ্নে আটকে গেছি আমি। আবারো ঘটছে সেটা। কেবল এলাইদা নেই এবারে, আর খোঁজা-করা ছুরির বদলে র‍্যাসফারের লোমশ হাতে শোভা পাচ্ছে জলহস্তির চামড়ার চাবুক।

প্রায় ব্যাসফারের হাতের সমান লম্বা চাবুকটা, প্রান্তে এসে তার কড়ে আঙুলের মতো চিকন। ওটা প্রস্তুত করতে দেখেছি আমি ওকে। তৈলস্ফটিকের মতো রঙ ওটার, র‍্যাসফারের আদুরে পালিশে কাঁচের মতো ঝকঝক করছে। কতশত হতভাগ্যের রক্ত যে ওতে শুকিয়েছে দানবটা, তার কোনো হিসেব নেই।

একজন শিল্পী যেনো সে, ওই অস্ত্র হাতে। নিজের কাজ ভালবাসে গ্যাসফার, তার সমস্ত হিংসা আর নীচ মন নিয়ে ঘৃণা করে আমাকে; মনিবের আনুকূল্য আর সুদর্শন অবয়বের জন্যে।

আমার নগ্ন পিঠে চাপর দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ইনটেফ। মাঝে মধ্যে এতো চতুর তুমি, প্রিয় টাইটা। যার প্রতি তোমার এতো ঋণ, তাকেই প্রতারিত করতে চাও। না, না, কেবল ঋণ নয়, তুমি বেঁচে আছে যার দয়ায়। আবারো দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ইনটেফ। এই বাজে কাজটা করতে কেন আমাকে বাধ্য কর তুমি? উন্মাদের কাজ ওটা, এই প্রস্তাব আমি অবশ্য জানি, কেন এটা করলে তুমি। বাচ্চাদের মতো আবেগ তোমার বহু দুর্বলতার মধ্যে একটা। কোনদিন হয়তো ওটাই তোমার কাল হবে। যাই হোক, এক সময় ভেবেছিলাম তোমাকে ক্ষমা করে দেব, কিন্তু যে দায়িত্ব আমি তোমাকে দিয়েছি, এতে করে বরখেলাপ করা হলো তার। আমার মুখ ঘুরিয়ে নিজের দিকে ফেরালেন তিনি। এ জন্যেই তোমাকে শাস্তি দিতেই হবে। বুঝতে পারছো?

জ্বী, মালিক, ফিসফিস করে বললাম। চোখের কোণা দিয়ে ব্যাসফারের হাতের চাবুকটা দেখছি। আবারো তার কোলে আমার মুখ চেপে ধরলেন ইনটেফ, ডাকলেন র‍্যাসফারকে।

তোমার সেরা কাজ চাই, র‍্যাসফার। চামড়া যেনো না ফাটে। এতো সুন্দর পেছনটা দাগ পড়ে যাক, চাই না। দশটা দিলেই চলবে, জোরে গুনো যাতে আমরা শুনতে পাই।

একশ বা তার অধিক হতভাগ্যকে এই শাস্তি পেতে দেখেছি আমি, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলো বীর যোদ্ধা। রাসফারের চাবুকের তলায় কেউ শান্ত থাকতে পারে নি। আমি নিজেও তা চাই না, নীরবতাকে ব্যক্তিগত অপমান বলে মনে করে সে। ওটাতো আমি জানিই। যে কোনো রকম বোকা গর্ব গিলে ফেলে তার কাজের প্রশংসা উচ্চ স্বরে করার প্রস্তুতি হিসেবে ফুসফুস ভরে বাতাস নিলাম।

এক! হুঙ্কার করে উঠলো র‍্যাসফার, বাঁশির মতো শব্দ করে আঘাত হানল চাবুক। সন্তান জন্মদানের সময় কাতর মহিলাদের চেয়েও জোরে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি, ব্যথার প্রাবল্য চমকে দিল।

তুমি ভাগ্যবান, প্রিয় টাইটা, আমার কানে নিচু স্বরে বললেন ইনটেফ। ওসিরিসের পুরোহিতেরা কাল পরীক্ষা করে দেখেছে ওকে, এখনও অক্ষত আছে সে। তার কোলে আঁতকে উঠলাম আমি। কেবল ব্যথায় নয়, ওই বুড়ো ছাগলের দল আমার ছোট্ট সোনার সবকিছু খুঁচিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে–এই আফসোসে।

প্রতিবার আঘাতের পর বারাজ্জার চারপাশে ঘুরে ঘুরে নিজেকেই যেনো প্রশংসা করে রাসফার । শিকারকে আঘাত অনুধাবন করতে দেওয়ার এ তার বিশেষ কায়দা। উৎসবের তলোয়ারের মতো করে মাথার উপরে ধরে রাখে চাবুকটা। বৃত্ত পূর্ণ করে আবারো আঘাত হানতে ফিরে আসে সে, উঁচিয়ে ধরে চাবুকের হাতল।

দুই! চেঁচিয়ে উঠলো সে, তীক্ষ্ণ চিৎকার করে এলিয়ে পড়লাম আমি।

*

আমার প্রকোষ্ঠের প্রবেশমুখের চওড়া চাতালে অপেক্ষায় বসেছিলো লসট্রিসের একটা দাসী মেয়ে, বাগানের ধাপ টপকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে উঠলাম আমি।

আমার মনিব এখনই আপনার সঙ্গ চাইছেন, মেয়েটা জানাল

আমাকে। তাকে গিয়ে বলল, আমি অসুস্থ, সমন এড়িয়ে যেতে চাইলাম আমি। আঘাতগুলো পরিচর্যার জন্যে চিৎকার করে দাস বালকদের ডাকতে ডাকতে ঢুকে পড়লাম আমার প্রকোষ্ঠে । এই মুহূর্তে লসট্রিসের মুখোমুখি হতে পারব না, কিছুতেই ব্যর্থতার কথা বলা যাবে না তাকে। কেমন করে তাকে ট্যানাসের প্রতি তার ভালোবাসার অসারত্ব বোঝাবো? কালো দাসী মেয়েটা অনুসরণ করে ভেতরে ঢুকে পরেছে, উন্মুক্ত পিঠের দারুন আঘাতগুলো এখন দেখছে আতঙ্ক নিয়ে।

যাও, তোমার মনিবকে গিয়ে বলো আমি আঘাতপ্রাপ্ত, এখন তার সাথে দেখা করতে পারব না, কাঁধের উপর দিয়ে তিক্তস্বরে বললাম।

তিনি আমাকে বলে দিয়েছেন, আপনি নানা অজুহাতে আসতে চাইবেন না; আমি যেনো সাথে করে নিয়ে যাই আপনাকে।

তুমি একটা বেয়াদব মেয়ে, ভর্ৎসনা করে বললাম মেয়েটাকে। একজন দাস বালক আমারই তৈরি মলম লাগিয়ে পরিচর্যা করতে লাগলো পিঠের আঘাতগুলোয়।

হ্যাঁ, ঝলমলে হাসির সাথে মেনে নিল সে। আপনিও তাই। আমার একটা অর্ধ চড় অনায়াসে এড়াল মেয়েটা। দাসী-পরিচর্যাকারীদের প্রতি লসট্রিস দারুন সদয় ।

যাও, গিয়ে বলো আমি আসছি, এবারে বললাম।

উনি বলে দিয়েছেন, আমি যেনো অপেক্ষা করে দেখি আপনি যান কিনা।

তো, হারেমের রক্ষীদের অতিক্রম করে যাওয়ার সময় একজন প্রহরী হয়ে মেয়েটা রইল আমার সাথে। রক্ষীরা সবাই আমারই মতো খোঁজা; তবে ব্যতিক্রম হলো এরা সবাই মোটা এবং উভলিঙ্গিক। দেহের বিশাল আকৃতির কারণেই হয়তো, দারুন শক্তিশালী মানুষ ওরা, ভীষণ হিংস্র। যাই হোক, আমার প্রভাব বলে এদের কাছ থেকে সম্মান আদায় করে নিতে সমর্থ হয়েছি, মেয়েদের প্রকোষ্ঠে একটা সালামের সাথে ঢুকতে দেওয়া হলো আমাকে।

দাস বালকদের থাকার জায়গার এতো আরামদায়ক বা পরিচ্ছন্ন নয় হারেম, বোঝাই যায় আমার মনিবের আগ্রহ কোনো দিকে। কাদার ইটে তৈরি ছোট্ট কুঁড়েঘর, উঁচু কাঁদায় তৈরি দেয়ালে ঘেরা। একমাত্র বাগান বা সাজ বলতে লসট্রিস আর তার দাসীদের হাতে তৈরি বাগান, আমার সহায়তায় করা হয়েছে সেটা। উজিরের পত্নীরা সবাই অলস আর স্কুল; হারেমের ষড়যন্ত্র, কেলেঙ্কারী নিয়েই তাদের যত মাতামাতি ।

প্রধান ফটকের কাছেই লসট্রিসের বাসভবন; সুন্দর পদ্ম-ফোঁটা পুকুর চারদিকে। বাঁশের খুঁচায় বিচিত্র স্বরে গাইছে পাখির দল। কাঁদার দেয়ালে নীল নদের উজ্জ্বল দৃশ্যাবলি আঁকা; মাছ, পাখি আর নদীর দেবীর ছবি–ওকে আঁকতে সাহায্য করেছিলাম আমি।

প্রবেশমুখে বিষণ্ণ দলে জড়ো হয়ে বসে আছে লসট্রিসের দাসী মেয়েদের দল; অনেকেই কাঁদছে। কান্নার জলে মুখ ভেজা তাদের। ওদের ঠেলে সরিয়ে অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা, অন্ধকারাচ্ছন্ন ভেতরে প্রবেশ করলাম আমি। কোনো একটা কক্ষ হতে কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে আমার মিসট্রেসের। দ্রুত এগুলাম, ওকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছি বলে লজ্জা লাগছে এখন।

নিচু একটা বিছানায় মুখ নামিয়ে কাঁদছিলো লসট্রিস, কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছে পুরো শরীর; কিন্তু আমার ঢোকার শব্দ শুনে ঘুরে, এক ঝটকায় বিছানা ছেড়ে নেমে দৌড়ে এলো সে।

ওহ, টাইটা! ওরা ট্যানাসকে দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। ফারাও কাল কারানাকে আসবেন, আমার বাবা তাকে অনুরোধ করতে যাচ্ছেন ট্যানাসকে যেনো বাহিনী সহ নদীর উজানে, সেই গজ-দ্বীপ আর জলপ্রপাতের ওপারে পাঠানো হয়। ওহ, টাইটা! প্রথম জলপ্রপাত এখান থেকে বিশদিনের পথ। আর কখনও ওকে দেখতে পাবো না আমি। মরে যাওয়াও ভালো ছিলো এর থেকে। নীল নদির পানিতে ঝাঁপিয়ে কুমীরের খাবার হব আমি। ট্যানাসকে ছাড়া বেঁচে থেকে কী হবে একসঙ্গে বলে থামল লসট্রিস।

আস্তে, ছোট্ট সোনা, আলিঙ্গনের ভেতর ওকে অল্প অল্প দোলালাম। এত ভয়ঙ্কর সবকথা তুমি জানলে কেমন করে? এগুলো তো নাও হতে পারে।

ওহ, ঘটবে, টাইটা। ট্যানাস একটা বার্তা পাঠিয়েছে আমাকে। বাবার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের মধ্যে কাতাসের ভাই আছে। সে-ই শুনেছে রাসফারের সঙ্গে এই নিয়ে আলাপ করছিলেন বাবা । জানি না কেমন করে, আমার আর ট্যানাসের সবকিছু বাবা জেনে গেছেন। উনি জানেন, হাপির মন্দিরে একা ছিলাম আমরা। ওহ টাইটা, বাবা মন্দিরের পুরোহিতদের পাঠিয়েছিলেন আমাকে পরীক্ষা করে দেখতে। ওই নোংরা বুড়োগুলো ভীষণ কাজ করেছে আমার সাথে। ব্যথা পেয়েছি আমি, অনেক।

আস্তে করে ওকে আলিঙ্গন করলাম। এমন নয় যে সবসময় এটা করার সুযোগ পাই আমি, কিন্তু আজ সজোরে আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রত্যুত্তর করলো লসট্রিস। নিজের আঘাতের থেকে প্রেমিকের দিকে বয়ে গেলো তার চিন্তাধারা।

আর কোনোদিন আমি ট্যানাসকে দেখতে পাবো না, কেঁদে ফেলল লসট্রিস। কত ছোটো মেয়েটা এখনও, শিশুই বলা যায়, ক্ষোভে-দুঃখে ভগ্ন-হৃদয়। বাবা ওকে শেষ করে দেবে।

এমনকি তোমার বাবাও পারবে না সেটা, ওকে প্রবোধ দিতে চাইলাম। ফারাও এর নিজস্ব রাজকীয় রক্ষী বাহিনীর সেনাপতি ট্যানাস। রাজার লোক সে। কেবল মাত্র ফারাওয়ের কাছ থেকে নির্দেশ নেয় ট্যানাস, মিশরের দ্বৈত-মুকুটের সমস্ত সম্মান তার প্রাপ্য। ওকে বললাম না, সম্ভবত এই কারণেই এখনও ইনটে ধ্বংস করে দেয় নি তাকে। বলে চললাম, ট্যানাসকে আর দেখবে না কী বলছো, গীতিনাটকে ওর বিপরীতেই তো অভিনয় করছো তুমি । দৃশ্যের বিরতিতে তোমরা দুজন যেনো একা কথা বলতে পারো, সে ব্যবস্থা আমি করবো।

বাবা কিছুতেই নাটক হতে দেবেন না।

কোন উপায় নেই তাঁর হাতে, ফারাও-এর কু-নজরে যদি পড়তে না চান, তবে অবশ্যই আমার নাট্যগীতি তাঁকে দেখতেই হবে। এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকো।

ট্যানাসকে বাইরে পাঠিয়ে, অন্য কাউকে দিয়ে হোরাস-এর ভূমিকায় অভিনয় করাবেন তিনি, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে লসট্রিস।

অন্য একজন অভিনেতার অনুশীলন করার সময় নেই। ট্যানাসই দেবতা হোরাসের ভূমিকায় থাকবে। আমার মনিব, ইনটেফকে এ বিষয়ে বলবো আমি। তুমি আর ট্যানাস কথা বলার সুযোগ পাবে। তোমাদের জন্যে একটা উপায় বের করবো আমি।

কান্না গিলে ফেলে সম্পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে আমার দিকে মুখ তুলে চাইল লসট্রিস। ওহ, টাইটা! আমি জানি, একটা না একটা উপায় তুমি বের করবেই। সবসময় তাই করো আচমকা থেমে গেলো সে, মুখভঙ্গি পাল্টে গেছে। আমার পিঠে ঘুরছে তার হাত, র‍্যাসফারের চাবুকের আঘাত যে ক্ষত তৈরি করেছে, তার প্রান্তে লেগেছে আঙুল।

আমি দুঃখিত, মিসট্রেস। ট্যানাসের প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যেমনটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তোমাকে। আর এ সব কিছুই আমার গাধামীর ফল।

আমার পেছনে এসে দাঁড়াল ও, হালকা লিনেনের টিউনিকটা উঁচু করে ধরল–ওটা দিয়ে আড়াল করে রেখেছিলাম আঘাতের চিহ্ন। আঁতকে উঠে লসট্রিস। এটা র‍্যাসফারের কাজ। ওহ, প্রিয় টাইটা, আমাকে কেন আগে বলে নি, আমার আর ট্যানাসের প্রতি বাবার এতে ক্ষোভ?

এহেন বাজে অভিযোগে উত্তর না করতে মনস্থ করলাম আমি, কতবার বলতে চেয়েছি কথাটা যে, ইনটেফ মোটেও ভালো চোখে দেখবেন না ট্যানাসকে? দারুন দপদপ করছে পিঠের ক্ষতগুলো, তবু চুপ করে রইলাম।

আমার এই বাহ্যিক আঘাতে অন্তত লসট্রিস কিছু সময়ের জন্যে হলেও ভুলে গেছে নিজের দুর্দশা । বিছানায় বসার জন্যে আদেশ করলো সে, আমি পালন করতে টিউনিক খুলে নিয়ে পরিচর্যা শুরু করলো ক্ষতের। খাঁটি ভালোবাসা আর আবেগশূন্য স্থান পূরণ করলো তার অপরিণত প্রচেষ্টার। নিজের দুঃখের কথা এখন ভুলে গেছে মেয়েটা। কিছু সময়ের মধ্যেই কলকল করতে লাগলো সে, কেমন করে তার বাবার রাগ পেরিয়ে ট্যানাসের সঙ্গে মিলিত হবে–এইসব।

এর কিছু কিছু পরিকল্পনা তার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিল, বাকিগুলো মূলত তারুণ্য আর দুনিয়ার তাবৎ দুষ্ট-অভিজ্ঞতায় অনভিজ্ঞতার কথাই যেনো প্রমাণ করলো। গীতি নাট্যে আইসিস-এর ভূমিকায় এতো সুন্দর অভিনয় করবো, এক পর্যায়ে এসে বললো লসট্রিস, ফারাও এতো খুশি হবেন, আমি যা চাই–তাই মেনে নেবেন। এরপর, ট্যানাসকে আমার স্বামী হিসেবে তাঁর কাছে প্রার্থনা করবো আমি, আর তিনি বলবেন এবারে রাজার ধীরলয়ের গুরুগম্ভীর উচ্চারণ এমন দক্ষতার সাথে নকল করলো সে, না হেসে পারলাম না আমি। তিনি বলবেন–লর্ড হেরাব, পিয়াংকির পুত্র ট্যানাসের সাথে উজির কন্যা, লেডি লসট্রিসের বিবাহের ঘোষণা দিচ্ছি আমি। আর আমার বিশ্বস্ত ভৃত্য, ট্যানাসকে মিশরের মহান সিংহ উপাধিতে ভূষিত করলাম, এর ফলে আমার সমস্ত বাহিনীর সেনাপতি হলো সে। আরও ঘোষণা করছি, তার বাবা, পিয়াংকি, লর্ড হেরাবের সমুদয় সম্পত্তি তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক এখানে এসে থেমে যায়, আমার আঘাতের পরিচর্যা শেষে গলা জড়িয়ে ধরলো লসট্রিস।

এমনকি হতে পারে না, টাইটা? বলো না, পারে না এমন হতে!

কোন স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে তোমাকে অবজ্ঞা করা সম্ভব নয়, মিসট্রেস, ওর বোকামীতে হাসলাম আমি। এমনকি মহান ফারাও পর্যন্ত নন। তখন যদি জানতাম, সত্যির কত কাছাকাছি বলে ফেলছি, নির্ঘাত জ্বলন্ত কয়লার টুকরো রাখতাম নিজের জিভে।

আশায় উজ্জ্বল হয়ে উঠলো লসট্রিসের মুখ। আমার জন্যে এর বেশি আর কি চাইবো, টিউনিকটা পরে নিয়ে ওর পরিচর্যায় ইতি টানলাম।

কিন্তু, এখন, মিসট্রেস; যদি সত্যিই অপরূপা আর অপ্রতিরোধ্য একজন আইসিস হতে চাও, তোমাকে বিশ্রাম নিতে হবে। লাল শেপেনের পাতা থেকে তৈরি ঘুমের গুড়ো নিয়ে এসেছিলাম সাথে করে, পুবের কোনো দূরদেশ থেকে এই ফুলের বীজ নিয়ে এসেছিল ব্যবসায়ী ক্যারাভান। আমার বাগানে এখন এই লাল-ফুলের চাষ করি, ঝরা পাতা থেকে স্বর্ণের তৈরি কাঁটা দিয়ে নেড়ে আমার নিজস্ব উপায়ে তৈরি করি গুড়ো। ঘুম আনে এই দ্রব্য, ব্যথা দূর করে, অদ্ভুত সব স্বপ্নও দেখায়।

আমার সাথে কিছুক্ষণ থাকো না, টাইটা, ঘুমকাতুর মুরগির ছানার মতো বিছানায় কুঁকড়ে আসে লসট্রিস, ঘুম পাড়িয়ে দাও, বাচ্চা ছিলাম যখন, তখনকার মতো করে। ও তো এখনও একটা বাচ্চা, কোলে নিতে নিতে মনে মনে ভাবলাম আমি।

সব ঠিক হয়ে যাবে, তাই না টাইটা? ফিসফিস করে বললো সে। সুখে-শান্তিতে চিরকাল বাস করবো আমরা, ঠিক তোমার গল্পের মত, করবো না, বলো টাইটা?

ও ঘুমিয়ে গেলে, কপালে নরম করে চুমো খেলাম আমি। পশমের একটা চাদর দিয়ে গা ঢেকে চুপি চুপি বেরিয়ে এলাম ওর কক্ষ ছেড়ে।

*

ওসিরিসের উৎসবের পঞ্চম দিনে গজ-দ্বীপে, নিজের প্রাসাদ ছেড়ে নদীর উজানে কারনাকে এলেন ফারাও; দ্রুতগামী গ্যালিতে দশ দিনের পথ পাড়ি দিয়ে। সমস্ত রাজকীয় সভাসদ সঙ্গে করে নিয়ে আসেন তিনি, যাতে করে পূর্ণ মর্যাদায় পালিত হয় উৎসব।

তিন দিন আগেই কারনাক ত্যাগ করেছে ট্যানাসের বাহিনী, নদীর উজানে দ্রুত এগিয়ে মিলিত হয়েছে রাজকীয় নৌবহরের সাথে, যাত্রার শেষভাগে পাহারা দিয়ে নিয়ে এসেছে ফারাওকে। হাপির ল্যাগুনে সেই জলহস্তি শিকারের পর থেকে আমি বা লসট্রিস, কেউ তার দেখা পাই নি। শক্তিশালী স্রোত আর মরুর বাতাসে প্রায় উড়ে নদীর শেষ বাঁক ঘুরে যখন দৃশ্যমান হলো তার জাহাজ, খুশি ধরে রাখতে পারলাম না আমি এবং লসট্রিস। দক্ষিণ দিক হতে রাজকীয় নৌবহরের নেতৃত্ব দিয়েছে হোরাসের প্রশ্বাস।

রাজ-উজিরের নিজস্ব ধারায় দুই ভাই, মেনসেট এবং সোবেকের পেছনে দাঁড়িয়েছে লসট্রিস। সুদর্শন, ভালো ব্যবহার দুজনেরই; তবে বাপের খুব বেশি প্রভাব দুটোতেই। বড় জন, মেনসেটকে বেশি অবিশ্বাস করি আমি। ছোটোটাও গিয়েছে বড়টার পথেই।

আরো পেছনে, ক্রীতদাস এবং অনুচরের সারিতে দাঁড়িয়েছি আমি, এতে করে একই সঙ্গে লসট্রিস এবং ইনটেফ দুজনের দিকেই নজর রাখতে পারছি। হোরাসের প্রশ্বাসের স্টার্ন টাওয়ারে ট্যানাসের সুগঠিত, লম্বা অবয়ব চোখে পড়তে আনন্দে ঝলমল করে উঠলো আমার মিসট্রেসের ঘারের পেছনটা। ট্যানাসের ব্রেস্টপ্লেটে কুমীরের চামড়ার আঁশগুলো চমকাচ্ছে সূর্যরশ্মি পড়ে, মাথার হেলমেটের অসট্রিচের পালক উড়ছে গ্যালির গতির সাথে তাল মিলিয়ে।

আনন্দের আতিশায্যে মাথার উপরে দুই হাত তুলে নাচাতে লাগলো লসট্রিস, কিন্তু ফারাওকে স্বাগত জানাতে নীল নদের দুই পারে আগত জনতার গর্জনে হারিয়ে গেলো তার উল্লাস। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় নগরী হলো আমাদের এই থিবেস, মনে হয়, বহু আত্মা আজ হাজির হয়েছে রাজাকে সম্মান প্রদর্শন করতে।

খোলা তরবারি স্যালুটের ভঙিতে ধরে সোজাসুজি সামনে তাকিয়ে রয়েছে ট্যানাস, ডানে-বাঁয়ে কোনো দিকে ফিরছে না। পাখির উড়ার ঢঙে ট্যানাসের বাহিনীর বাকি জাহাজগুলো অনুসরণ করছে হোরাসের প্রশ্বাসকে। তাদের প্রতীক, যুদ্ধে অর্জিত সম্মান সবকিছু যেনো রঙধনুর রঙে সজ্জিত আজ, উল্লাসে ফেটে পড়া জনতা পাগলের মতো হাত নাচাতে লাগল।

এর বেশ অনেক পরে রাজকীয় বাহিনীর প্রথম জাহাজ নদীর বাঁক ঘুরল। রাজার সফরসঙ্গী, ভদ্রমহিলা আর মহান পুরুষলোকে বোঝাই ওটা। এরপরে এলো আরো একটি জাহাজ, তাকে অনুসরণ করে ছোট, বড় নানা জলযানের অবিন্যস্ত কাফেলা। যেনো ঝাক বেঁধে এলো ওগুলো; প্রাসাদের চাকর-বাকর, দাস এবং তাদের সমস্ত ব্যক্তিগত আসবাব, বস্ত্রসহ। রসুইঘরের জন্যে বার্জ ভর্তি গাই, ছাগল এবং মুরগি; স্বর্ণপাতে মোড়া, রঙ করা জলযানগুলোতে আরো এলো প্রাসাদের আসবাব এবং ট্রেজার, হোক তা মহান লোকেদের বা তাদের অধস্তনের; সব এক ভীষণ বিশৃঙ্খল অ নাবিকসুলভ ভঙ্গিতে সাজানো। দ্রুতগামী নীল স্রোতে জ্যামিতিক সুশৃঙ্খলতার যে উদাহরণ ট্যানাস এবং তার বাহিনী দেখাল, তা এর পাশে কত মনোজ্ঞ।

শেষমেষ ফারাও-এর রাজকীয় জলযান দারুন আড়ষ্ট, টালমাটাল ভঙ্গিতে নদীর বাকে পৌঁছুল। জনতার আর্তনাদ যেনো আকাশ বিদীর্ণ করে দেবে। বিশাল সেই জলযান, মানুষের তৈরি করা সবচেয়ে বড়, ধীরে এগুতে লাগলো উজিরের প্রাসাদের নিচের ঘাটের উদ্দেশ্যে; যেখানে তাঁকে স্বাগত জানাতে দাঁড়িয়ে আছি আমরা।

যথেষ্ট সময় নিয়ে ওটার আকৃতি পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম, আমাদের এই মিশরের বর্তমান দশা এবং শাসনের অবস্থা যেনো ফুটে উঠছে জাহাজের নকশা এবং আকারে। মাতৃভূমি মিশর, ফারাও ম্রাট মামোসের শাসনের বারোতম বছরে দাঁড়িয়ে এখন, অষ্টম সম্রাট তিনি ওই বংশপরম্পরার, বলা যায় দুর্বল এবং টালমাটাল সাম্রাজ্যে তারচেয়েও দুর্বলতম শাসক তিনি। পাঁচটি যুদ্ধ গ্যালি পরপর সাজালে যতটুকু হবে, তার সমান লম্বা রাজকীয় জাহাজ; কিন্তু তার উচ্চতা এবং বিস্তার এতো অসমানুপাতিক–আমার শৈল্পিক অনুভবে আঘাত লাগল। যুগের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী যুদ্ধের রঙে রাঙানো হয়েছে হাল, গলুইয়ে আঁকা দেবী ওসিরিসের মুখাবয়ব সত্যিকারের স্বর্ণ পাতায় মোড়া। আমাদের আরো কাছাকাছি আসতে বোঝা গেলো, রেইলের ওপারে উজ্জ্বল রঙ চটে গেছে জায়গায় জায়গায় যেখানে বর্জ্য গড়িয়ে পড়েছে নাবিকদের।

পাটাতনের উপর দাঁড়িয়ে লম্বা ডেক-হাউস, মূল্যবান সিডার কাঠে তৈরি মহান ফারাও-এর ব্যক্তিগত প্রকোষ্ঠ ভারী আসবাবে একদম বোঝাই হয়ে আছে, জাহাজের ভারসাম্যে কোনো অবদান রাখছে না সেটা। সেই বিচিত্র স্থাপনার উপরে, তাজা পদ্মে সজ্জিত রেইলের ওপাশে দারুন ট্যান করা গ্যাজেল হরিণের চামড়ায় তৈরি দেব দেবীদের মুখচ্ছবি অঙ্কিত, আচ্ছাদনের নিচে বসে আমাদের ফারাও। রাজকীয় নিঃসঙ্গতা তার অবয়বে। স্বর্ণের স্যান্ডল, গায়ের খাঁটি লিনেনের তৈরি আচকান ভরা গ্রীষ্মের আকাশে ধবধবে সাদা মেঘের মতো চমকাচ্ছে। মাথায় পরেছেন দীর্ঘ দ্বৈত মুকুট; শকুনী দেবী নেখবেট-এর অবয়বের সাদা রঙের উচ্চ সাম্রাজ্যের মুকুট, সাথে দেবী ডেল্টার লাল রঙের মুকুট।

মাথার শোভাবর্ধনকারী ওই ডেল্টা মুকুট মূলত একটা প্রহসন, দশ বছর আগেই সেই ভূখণ্ড হারিয়েছি আমরা। এই অবিন্যস্ত সময়ে নিম্ন-রাজ্যে শাসন করছেন আরো একজন ফারাও, তিনিও একটি দ্বৈত-মুকুট বা তার নিজস্ব সংস্করণ পরিধান করেন। আমাদের সাম্রাজ্যের ভয়ঙ্কর শত্রু তারা, উচ্চ এবং নিম্ন-রাজ্যের মধ্যে চলমান যুদ্ধে কত শত তরুণ যোদ্ধার প্রাণহানি হচ্ছে, ক্ষতি হয়েছে কত সম্পদের তার কোনো ইয়ত্তা নেই। অন্তৰ্গত কলহ দুভাগ করে ফেলেছে মিশরকে। আমাদের মাতৃভূমির এক হাজার বছরের ইতিহাসে এমনটা হয়ে এসেছে যখনই কোনো দুর্বল ফারাও শাসন করেছেন। চির বিবদমান দুই সাম্রাজ্যকে একত্রে ধরে রাখতে হলে কঠোর, শক্তিশালী এবং চতুর সম্রাট প্রয়োজন।

প্রাসাদের ঘাটে ভীড়তে হলে টলায়মান জাহাজের চালকের উচিত ছিলো দূরের তীরের দিকে ঘেঁষে আসা, এতে করে স্রোতে পরে ভেসে আসতো জাহাজ। তেমনটি করলে নদীর পুরো প্রস্থ বরাবর ওটাকে ঘোরানো যেত বাকে। নিঃসন্দেহে বাতাস এবং স্রোতের শক্তি ঠিকমত ঠাওর করতে পারে নি চালক, মাঝ নদীতে এসে ঘুরতে শুরু করলো সে। প্রথমটায় শক্তিশালী স্রোতে পরে নাক ঘুরে গেলো জাহাজের, এরপরে উঁচু ডেক-হাউসে কামড় বসালো মরুর তীব্র বাতাস। দাড়ীদের উন্মুক্ত কাঁধে সপাসপ করে আঘাত হানা চাবুকের শব্দ মতো দূর থেকেও শোনা গেলো।

উন্মত্তের মতো দাঁড় টানতে লাগলো তারা, হালের চারপাশের পানি যেনো সাদা ফেনা; কিন্তু ছন্দোবদ্ধভাবে না টেনে বিচ্ছিন্নভাবে কাজটা করা হলো। ওদের গালি গালাজ আর অভিশাপের সাথে মিলেমিশে গেছে স্টার্নে দাঁড়ানো চালকের নিষ্ফলা নির্দেশ। ওদিকে, পুপ-ডেকে বসে অক্ষম আক্রোশে সাদা দাঁড়িতে হাত বোলাচ্ছেন রাজকীয় নৌবাহিনীর প্রধান নেমবেট।

এই জগাখিচুরীর উপরে বসে আমাদের মহান ফারাও, নিশ্চল, ঠিক যেনো মন্দিরের মূর্তিগুলোর মতোই; বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন। হায়, এ-ই হলো আমাদের মিশর।

এরপরে বন্ধ হয়ে জাহাজের ঘূর্ণন, বাতাস এবং স্রোতের বিপরীতমুখি টানে পরে সোজা তীরের দিকে ছুটতে লাগলো ওটা। চালক বা নাবিকেরা কেউই কিছু করতে পারছে না, না পারছে পুরো ঘুরে গিয়ে জাহাজটাকে স্রোতের মধ্যে ফেলতে, না পারছে গলুই উঁচু করতে যাতে করে প্রাসাদের পাথুরে ঘাটে তার মুখোমুখি সংঘর্ষ না ঘটে।

আসন্ন দুর্ঘটনার কথা টের পেয়ে গেছে নীল নদের তীরে দাঁড়ানো জনতা, হর্ষ ধ্বনি থেমে গেছে, অদ্ভুত নিরবতা বিরাজ করছে এই মুহূর্তে । মাঝি-মাল্লাদের চিৎকার, চালকের কঠোর নির্দেশ সবকিছু পরিষ্কার ভেসে এলো ফারাও-এর জল্যান থেকে।

এরপরে, হঠাৎই, জনতার চোখ সরে গেলো নদীর ভাটিতে; বাহিনীর কাছ থেকে সরে উজানে যেনো উড়ে আসছে হোরাসের প্রশ্বাস। অদ্ভুত ছন্দের সাথে উঠা-নামা করছে তার দাঁড়গুলো, পানিতে পড়ে, কেটে আবার একসাথে ভেসে উঠছে উপরে। তড়িৎগতিতে রাজকীয় জাহাজের গলুইয়ের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেলো হোরাসের প্রশ্বাস, জনতার দম আটকে যাওয়ার শব্দ পরিষ্কার ভেসে এলো প্যাপিরাসের ঝোঁপের উপর দিয়ে। সংঘর্ষ যেনো অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু শেষ মুহূর্তে মাথার উপরে মুঠি-বদ্ধ হাত তুলে সংকেত দিলো ট্যানাস। সঙ্গে সঙ্গে পেছন দিকে দাঁড় টানতে লাগলো দাঁড়ীরা, চালক স্থির ধরে রেখেছে চাকা।

থেমে পরে, রাজকীয় জলযানের আওতার বাইরে রইল হোরাসের প্রশ্বাস। কুমারীর চুমোর মতো আলতো করে পরস্পরকে স্পর্শ করলো দুটো বাহন, এক মুহূর্তের জন্যে হোরাসের প্রশ্বাসের স্টার্ন টাওয়ার এক সমানে থাকল রাজকীয় জাহাজের প্রধান পাটাতনের।

সেই মুহূর্তেই, স্টার্ন টাওয়ারের কাঠামোতে নিজেকে শক্ত করে আঁটকালো ট্যানাস। ঢাল, স্যান্ডল, অস্ত্রশস্ত্র একপাশে সরিয়ে রেখেছে সে। কোমরের চারপাশে একটা দড়ি বাধা। দুই জলযানের মধ্যবর্তী দূরত্ব একলাফে অতিক্রম করলো, দড়ি উড়ছে পেছনে।

যেন ঘোর ভেঙে নড়েচড়ে বসে জনতা। তাদের মধ্যে একজনেরও যদি ট্যানাসের পরিচয় অজানা থাকে, তো আজ দিন শেষের আগে জানা হয়ে যাবে–এতে কোনো সন্দেহ নেই। অবশ্যই, নিম্ন রাজ্যের বিরুদ্ধে জল-যুদ্ধে ট্যানাসের বীরত্বের কথা ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পরেছে। কিন্তু কেবলমাত্র তার নিজস্ব বাহিনী দেখেছে সেটা। নিচের চোখে দেখা আর শোনাকথার ওজন তো আর এক নয়!

আর এখন, ফারাও-এর দৃষ্টির সামনে, রাজকীয় নৌবহর এবং কারনাকের সমস্ত জনতাকে প্রত্যক্ষদর্শী রেখে ক্ষিপ্র চিতার মতোই এক জাহাজের পাটাতন থেকে অপরটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল ট্যানাস।

ট্যানাস! আমি নিশ্চিত, প্রথম চিৎকারটা দিয়েছিল আমার মিসট্রেস, লসট্রিসই। কিন্তু তারপরেই আমি ডেকে উঠলাম।

ট্যানাস! হাহাকার করে উঠলাম আমি, এরপরে প্রবল চিৎকারে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দেয় জনতা। ট্যানাস! ট্যানাস! ট্যানাস! যেনো কোনো নতুন দেবতার স্তুতি করছে তারা।

রাজকীয় জলযানের পাটাতনে পড়তেই ঘুরে দাঁড়িয়ে গলুইয়ের উদ্দেশ্যে ছুটল ট্যানাস, দুই হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে দড়ির প্রান্ত । ওটার অপর প্রান্তে জাহাজ নোঙরের শক্ত, মোটা দড়ি ধরে রেখেছিল ট্যানাসের নাবিকেরা, এবারে ওটা হস্তান্তর করলো তারা ট্যানাসের কাছে। কাধ এবং পিঠের পেশি ঘামে চকচক করছে, ওটাকে টেনে নিয়ে চললো সে।

এতক্ষণে, রাজকীয় জাহাজের নাবিকেরা বুঝতে পেরেছে কী ঘটতে চলেছে, ট্যানাসের সাহায্যে এগিয়ে আসে তারা। তার নির্দেশে গলুইয়ে তিনবার পেঁচিয়ে বাঁধল তারা মোটা দড়িটা। বাধা শেষ হতেই নিজের গ্যালিকে সংকেত দেয় ট্যানাস।

স্রোতে ভেসে পরে হোরাসের প্রশ্বাস, দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করে। দড়ি টানটান হয়ে যেতেই বিশালাকায় রাজকীয় জলযানের টানে থেমে, পানিতে চেপে বসে তার খোল। একটা ভয়ঙ্কর মুহূর্তের জন্যে আমার মনে হলো এই বুঝি তলিয়ে গেলো ওটা; কিন্তু আগেই বুঝতে পেরে নাবিকদের পিছন দিকে দাঁড় টানার সংকেত দেয় ট্যানাস, প্রচণ্ড টান প্রশমিত হলো খানিকটা।

এত নিচুতে নেমে গেছে হোরাসের প্রশ্বাসের খোল, নীল নদের সাবজেটে পানি উঠতে লাগলো তার উপর, কেঁপে কেঁপে, ভেসে-ডুবে শেষ পর্যন্ত দড়ি ধরে রাজকীয় জলযানকে টেনে রাখলো ওটা। বেশ লম্বা মুহূর্ত ধরে কিছুই ঘটল না। বিশাল জাহাজের উপর গ্যালির সামান্য ওজন কোনো প্রভাবই রাখতে পারছে না। কুমীরের চোয়ালের ফাঁকে আটকে ধরা বুড়ো ষাড়ের মতো এক হয়ে রইল দুটো জলযান। এবারে রাজকীয় জলযানের অবিন্যস্ত নাবিকদের মুখোমুখি হয় ট্যানাস। তার দায়িত্বপূর্ণ ভাবভঙ্গিতে বেশ একটা পরিবর্তন আসে তাদের মধ্যে। ওর নির্দেশের অপেক্ষায় এখন তারা।

ফারাও বাহিনীর সকল নৌবহরের প্রধান হলেন নেমবেট, মিশরের সাহসী সিংহ তাঁর উপাধি। অনেক কাল আগে শক্তিশালী একজন মানুষ ছিলেন তিনি, কিন্তু এখন বুড়ো, দুর্বল। ঠিক নদীর স্রোত কিংবা বাতাসের মতোই তার কতৃত্ব সহজে নিজের হাতে নিয়ে নিল ট্যানাস, আর নৌবহরের নাবিকেরাও নির্দ্বিধায় মেনে নিল সেটা।

টানো! পোর্টের দিকের দাড়ীরা প্রাণপণে টানতে লাগল, পিঠ বাঁকা হয়ে গেছে তাদের।

পেছনে টানো! স্টারবোর্ড দিকের দাঁড়ীদের উদ্দেশ্যে মুষ্টিবদ্ধ হাত নাচায় ট্যানাস, দাঁড়ের চোখা মাথা দিয়ে টানতে থাকে তারা। রেইলের কাছে ছুটে গিয়ে হোরাসের প্রশ্বাসের নাবিকদের যুগপৎ নির্দেশ দেয় সে। এখনও তীরের পাথুরে ঘাটের দিকে চলছে রাজকীয় জলযান, সামান্য একটু ফাঁকা জল আছে জাহাজ এবং তীরের মাঝে।

কিন্তু, এবারে, ধীরে-ধীরে সাড়া দেয় ওটা। গ্যালির টানে ধীরে স্রোতের দিকে ফিরতে থাকে রঙ-চঙ গলুই। আবারো হর্ষধ্বনি কেটে গিয়ে আশঙ্কার আওয়াজ বেরোয় আমাদের মুখ থেকে, শেষপর্যন্ত কী পাশাপাশি তীরে আছড়ে পরে চুরমার হবে রাজকীয় জাহাজ? তেমনটি হলে ট্যানাসের ভাগ্যে কী ঘটবে, বলার অপেক্ষা রাখে না। বুড়ো নেমবেটের কাছ থেকে কর্তৃত্ব ছিনিয়ে নিয়েছে সে, তার যে কোনো ভুলের মাশুল এখন ট্যানাসকেই দিতে হবে। যখন সংঘর্ষের প্রাবল্যে সিংহাসন থেকে ছিটকে পড়বেন ফারাও, তাঁর মর্যাদার প্রতীক দ্বৈত-মুকুট লুটাবে পাটাতনে; আর রাজকীয় জলযান পানিতে তলিয়ে গেলে যখন সমস্ত মিশরের সম্মুখে ভেজা কুকুরছানার মতো পানি থেকে উদ্ধার করা হবে তাকে; তখন নৌবাহিনী প্রধান নেমবেট এবং আমার মনিব, ইনটেফ দুজনের মন্ত্রণায় ফারাও-এর আক্রোশ এই টগবগে যোদ্ধার উপরে পড়তে বাধ্য।

অসহায় অবস্থায় তীরে দাঁড়িয়ে বন্ধুর জন্যে কাঁপছিলাম আমি, প্রার্থনা করে চলেছি একটা অসম্ভবের। দ্রুত ধাবমান পাথুরে ঘাটের মতো কাছাকাছি এখন জাহাজ, ট্যানাসের স্বর পরিষ্কার শুনতে পেলাম আমি। মহান হোরাস, সাহায্য কর! চেঁচিয়ে বললো সে।

মানবের ঘটনাচক্রে কখনও কখনও হস্তক্ষেপ করেন দেবতারা, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই আমার মনে। ট্যানাস হলো হোরাসের উপাসক, আর হোরাস বায়ুর দেবতা।

দক্ষিণে, সাহারা মরুর নির্জন বুক হতে তিন দিন, তিন রাত ধরে বয়ে চলেছে বাতাস। তীব্রতা নিয়ে ছুটেছে তা এই কদিন, কিন্তু এখন ধরে এলো সেটা। কমে গেলো না, একেবারে বন্ধ হয়ে গেলো। নদীর বুকে নৃত্যরত ছোটো ছোটো ঢেউগুলো সমান হয়ে আসে, তীরের পাম গাছগুলোর পাতা থেমে যায়। যেনো হঠাৎ বরফে পরিণত হয়েছে।

বাতাসের ধাবা থেকে মুক্তি পেতেই সোজা হয়ে, হোরাসের প্রশ্বাসের টানে সমর্থন জানায় রাজকীয় জাহাজ। বিশালাকায় গলুই স্রোতের টানে পরে পার্থরে ঘাটের সমান্তরালে চলে আসে; পাশটা আলতো ঘষা খায় সজ্জিত পাথরে, ঠিক সেই মুহূর্তে নীলের জল সামনের শান্ত পানিতে ঠেলে দেয় তাকে।

শেষ একটা নির্দেশ দেয় ট্যানাস, জাহাজ পেছনের দিকে যাওয়ার আগেই নোঙরের দড়ি দ্রুত বেঁধে ফেলা হলো পাথুরে স্তম্ভের সাথে। হালকা পালকের হাঁসের মতোই পানিতে ভাসতে থাকে জাহাজ; রাজকীয় জলযান নিরাপদে ভীড়ে তার ঘাটে, সিংহাসনে আসীন ফারাও কিংবা তাঁর মস্তকে শোভাবর্ধনকারী দীর্ঘ মুকুট কোনোটিই একচুল স্থানান্তরিত হয় না।

আমরা, যারা তীরে দাঁড়িয়ে অবলোকন করছিলাম, প্রশংসার গর্জনে ফেটে পড়ি; ফারাও নয়, আমাদের ঠোঁটে ছিলো ট্যানাসের নাম। বিনয়ের সাথে, কিন্তু যথেষ্ট বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে আমাদের প্রশংসা ধ্বনি গ্রহণ করার কোনোরকম চেষ্টা চালাল

ট্যানাস। রাজাকে অভ্যর্থনা জানাতে সমাগত জনতার মনোযোগ এমন করে কেড়ে নেওয়াটা মারাত্মক হতে পারে, আজকে যতটুকু রাজকীয় আনুকূল্য সে অর্জন করেছে, তাতে করে সেটা তিরোহিত হওয়ার আশঙ্কা ছিলো। নিজের রাজকীয় মর্যাদার। ভাগাভাগিতে ফারাও খুবই ঈর্ষান্বিত হতে পারেন। বদলে, নিরবে হোরাসের প্রশ্বাসকে কাছাকাছি আনার সংকেত দিলো ট্যানাস। জাহাজের বিশাল কাঠামোর আড়ালে হোরাসের প্রশ্বাস হারিয়ে যেতে ওটার পাটাতনে লাফিয়ে নেমে যায় সে, তারই জন্যে প্রস্তুত মঞ্চ দান করে যায় মহান ফারাওকে।

যা হোক, নেমবেটের চেহারায় ক্রোধ এবং অসন্তুষ্টির ছায়া ঠিকই দেখতে পেয়েছি আমি। মিশরের সাহসী সিংহ, প্রাজ্ঞ নৌ-প্রধান যখন মহান ফারাও-এর পিছুপিছু তীরে নেমে এলেন; আমি নিশ্চয় করে বুঝতে পারলাম আরো একজন প্রভাবশালী শত্রু তৈরি করেছে ট্যানাস।

২. প্রতিজ্ঞা পালন

সেই সন্ধাতেই লসট্রিসকে করা আমার প্রতিজ্ঞা পালন করতে সক্ষম হলাম, আমার গীতিনাট্যের কুশীলবদের একত্র করে অনুশীলনের সময়। কাজ শুরু করার আগে কম করে হলেও এক ঘন্টা সময় একা পেয়েছিল প্রেমিক যুগল।

ওসিরিসের মন্দির প্রাঙ্গনে নির্ধারণ করা হয়েছে নাটকের মঞ্চ, প্রধান সকল চরিত্রের পোশাক পরিবর্তনের জন্যে বেশ কিছু তাবু ফেলা হয়েছে ওখানে, আমার নির্দেশে। ইচ্ছাকৃতভাবেই লসট্রিসের তাঁবুটা বাকি সবার চেয়ে একটু তফাতে তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছিলাম আমি, মন্দিরের ছাদের অবলম্বন, ভারী একটা থামের আড়ালে। তাঁবুর প্রবেশমুখে পাহারায় রইলাম, অপরদিকের কাপড় সরিয়ে ভেতরে ঢুকল ট্যানাস।

পরস্পরকে দেখার মুহূর্তে ওদের আনন্দধ্বনি কিংবা ফিসফিসানি, চাপা হাসি বা ভালোবাসাবাসির মুহূর্তের কামনা-তপ্ত ছোট্ট গোঙানির আওয়াজে কান পাততে চাই নি আমি, কিন্তু শুনতে হলো। যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোনো কিছুতেই বাধা দিতাম না, কিন্তু আমি নিশ্চিত, ভালোবাসার চূড়ান্ত পরিণতি, শারীরিক মিলনে যায় নি ওরা। এরও অনেক পরে, লসট্রিস এবং ট্যানাস দুই জনেই পৃথকভাবে আমার কাছে স্বীকার করেছিল এটা। নিজের বিয়ের দিনে কুমারীই ছিলো আমার মিসট্রেস। যদি আমাদের কারো জানা থাকতো, কত কাছাকাছি রয়েছে সে দিনটা; কী ভিন্নভাবেই আচরণ করতাম আমরা তখন।

পুরোটা সময় সতর্ক ছিলাম আমি, জানতাম ওদের দুজনকে একত্রে তাঁবুতে কেউ দেখে ফেলার পরিণতি কী হতে পারে; কিন্তু এরপরেও আলাদা করতে মন সায় দিচ্ছিল না। যদিও আমার পিঠে এখনও আছে র‍্যাসফারের চাবুকের দগদগে ঘা, যদিও আমার মনের গহিন কোণে–যেখানে সমস্ত অযাচিত অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখি আমি ঈর্ষার আগুনে পুড়ছিলাম, তবুও যতোটা উচিত ছিলো, তার চেয়ে বেশি সময় ওদের একা থাকতে দিলাম ।

আমার মনিব, ইনটেফের আগমন টের পাই নি। খুবই নরম চামড়ার স্যান্ডল পরেন তিনি, ভূতের মতোই নিঃশব্দ তাঁর চলাচল। প্রাসাদের ভেতরে বেফাঁস কথা বলে বহু সভাসদ এবং দাস আমার মনিবের ফাঁসি-কাষ্ঠ বা রাসফারের চাবুকের শিকার হয়েছে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে ছায়ার ভেতর থেকে আমার মনিবের আগমনের আগেই ইন্দ্রিয়বলে সেটা অনুভব করার ক্ষমতা অর্জন করেছি আমি। সাধারণত এই অনুভূতি আমার সাথে প্রতারণা করে না, কিন্তু সেই সন্ধায় আমাকে চমকে দিলেন ইনটে। ঘুরে দাঁড়াতেই প্রায় টক্কর লেগে গেলো তাঁর সাথে; মন্দিরের উঁচু খিলানের মতো লম্বা, পাতলা বিষাক্ত কোব্রার মতো ফনা ভোলা ।

হুজুর, ইনটেফ! জোরে চেঁচিয়ে উঠলাম। আমাদের অনুশীলন দেখতে এসেছেন, কী সম্মানের কথা! আপনার কোনো মতামত, হুজুর–নিজের ভেতরের দ্বিধা আড়াল করে প্রেমিক যুগলকে সতর্ক করতে চাইলাম।

উভয় ক্ষেত্রেই বেশ সফল হলাম, বলা যায় । পেছনের তাঁবুতে হঠাৎ খসখস শব্দ করে বিচ্ছিন্ন হলো ওরা, এরপরেই তাঁবুর পেছনের কাপড় তুলে ট্যানাসের প্রস্থানের শব্দ পেলাম।

অন্য কোনো সময় হলে এতো সহজে ফাঁকি দেওয়া যেত না আমার মনিব, ইনটেফকে। মন্দিরের দেয়ালে লেখা হায়ারোগ্লিফিক্স যেমন সহজে পড়ি আমি, কিংবা আমার প্যাপিরাস স্ক্রোলের বর্ণমালা; ঠিক ততটা সহজে আমার মুখের অপরাধবোধ পড়ে ফেলতেন তিনি। কিন্তু নিজের ক্রোধ আর আক্রোশে অন্ধ হয়ে ছিলেন ইনটেফ । রাগে উন্মত্ত হয়ে চিৎকার করার মানুষ নন তিনি। নম্র-স্বর আর মসৃণ হাসি তাঁর সবচেয়ে বিষাক্ত অবস্থার পরিচয় দেয়।

প্রিয় টাইটা, প্রায় ফিসফিস স্বরে বললেন, আমি শুনেছি, আমার হুকুম সত্ত্বেও নাটকের প্রথম অঙ্কে পরিবর্তন করেছ তুমি। ভাবতে পারি না, কেমন করে এতটা সাহসী হলে। এই গরমে এতদূর পথ এসেছি শুধু সত্যিটা জানতে।

জানি, ভান করে বা উপেক্ষা করে কোনো লাভ নেই, তাই যন্ত্রণাক্লিষ্ট চেহারায় মাথা কেঁকালাম তার সম্মুখে। হুজুর, পরিবর্তন আমি করি নি, ওটা করেছেন ওসিরিসের মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ।

অধৈর্য্যের মতো বাধা দিলেন ইনটেফ, হ্যাঁ, অবশ্যই সে করেছে, কিন্তু কেবলমাত্র তোমার প্ররোচনায় । তোমার কী ধারণা তোমাকে বা ওই বুড়োভামকে আমি চিনিনা? কোনোদিনও ওর মাথায় একক চিন্তা ছিলো না তোমার মতো।

হুজুর! বলে উঠলাম আমি ।

কোন চতুর চাল এটা তোমার, টাইটা? ওই যে, মাঝে-মধ্যে দেবতারা তোমার কাছে যে দৈব বাণী পাঠায় সেরকম কিছু? জানতে চাইলেন ইনটেফ। তার স্বর পাথরের মেঝের উপর দিয়ে চলার সময় মন্দিরের পবিত্র কোব্রার সৃষ্ট শব্দের মতো নরম।

হুজুর! এহেন অভিযোগে বজ্রাহত হওয়ার মতো ভঙি করলাম, যদিও আদতে আমিই মন্দিরের বুড়ো পুরোহিতকে বর্ণনা করেছি, কেমন করে কালো কাকের ছদ্মবেশে ওসিরিস আমার স্বপ্নে এসেছিল; মন্দিরে রক্তপাতে তাঁর আপত্তি জানিয়েছিল।

এর আগ পর্যন্ত ফারাও-এর মনোরঞ্জনের জন্যে আমার মনিবের করা রক্তপাতের আয়োজনে কোনো আপত্তি করেন নি পুরোহিত। তাকে বাধা দেয়ার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতেই কেবল স্বপ্নের সাহায্য নিয়েছি আমি। নাটকের প্রথম অঙ্কে আমার মনিবের আয়োজন করা ব্যবস্থা ঘৃণ্য মনে হয়েছে আমার কাছে। আমার জানা আছে, পুবের কোনো কোনো দেশে দেব-দেবীদের প্রার্থনায় বলি দেওয়া হয়। শুনেছি, সেই ক্যাসাইটসে, ইউফ্রেতিস এবং টাইগ্রিস নদীর ওপারে নব জাতকদের অগ্নি-কুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়। সুদূর থেকে আসা ক্যারাভান মালিকদের কাছে জেনেছি ফসল ভালো হওয়ার অভিপ্রায়ে কুমারী মেয়ে বলি দেওয়া হয়, এমনকি যুদ্ধবন্দীদের জবাই করা হয় মৃতীর সম্মুখে।

যা হোক, আমরা মিশরীয়রা সভ্য মানুষ, জ্ঞানী এবং সদয় দেব-দেবীর পূজো করি, রক্ত-পিপাসু দানবের নয়। আমার মনিবকে এটাই বোঝাবার বহু চেষ্টা করেছি। এর আগে কেবল মাত্র একজন ফারাও নরহত্যা করেছিলেন; সেথ্‌-এর মন্দিরে সাত দস্যু রাজকুমারের গলা কেটেছিলেন রাজা মেনোটেপ, শবদেহগুলো মমি করে পাঠিয়েছিলেন বিভিন্ন রাজ্যে সতর্ক করে দেয়ার জন্যে। বিতৃষ্ণার সাথে সেই কথা স্মরণ করা হয় আজও। রক্তপিপাসু রাজা বলে দুর্নাম আছে মেনোটেপ-এর ।

এটা নরবলি নয়, আমার মনিব বলেছিলেন। কেবল একটা যৌক্তিক শাস্তি, মহৎ আয়োজনে করা হবে এই যা। তুমি নিশ্চই এটা বলতে চাইছ না, প্রিয় টাইটা, যে মৃত্যুদণ্ড আমাদের বিচারকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে না? টড একটা চোর। রাজকীয় কফিন থেকে চুরি করেছে সে, মরাই উচিত তার। অন্যদের জন্যে ভালো একটা উদাহরণ হবে।

বেশ যুক্তিপূর্ণ কথা, কিন্তু আমি জানি বিচারে নয়, তাঁর উৎসাহ নিজের ধন-সম্পত্তি আগলে রেখে ফারাও-কে মুগ্ধ করার দিকে, নাটক দারুন ভালবাসেন তিনি। তো, স্বপ্ন দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না আমার। আর এখন, হাসির ভঙিতে ঠোঁট বেঁকে গেছে ইনটেফের, তার সুগঠিত ঝকঝকে সাদা দাঁত আমার রক্ত যেনো ঠাণ্ডা করে দেয়। ঘারের পেছনের চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেলো।

তোমার জন্যে একটা উপদেশ, আমার মুখের সামনে এসে ফিসফিস করে বললেন ইনটেফ, আজ রাতে আবারো একটা স্বপ্ন দেখবে তুমি। ঠিক যে দেবতা শেষবার দেখা দিয়েছিল, সে আবার এসে অন্য কথা বলবে; যাতে করে আমার আয়োজনে কোনো বাধা না থাকে। তা না ঘটলে, র‍্যাসফারের জন্যে একটা কাজ বরাদ্দ করতে হবে আমাকে এটা তোমার কাছে আমার প্রতিজ্ঞা। ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুটে চলে গেলেন ইনটেফ, আনন্দ আর হতাশার মিশ্র অনুভূতি খেলে গেলে আমার মনে।

যা হোক, ইনটেফ চলে যেতে আমাদের অনুশীলন দারুন হলো। ট্যানাসের সাথে সাক্ষাতের পর আনন্দে ঝলমল করছিল লসট্রিস, ওর রূপ যেনো স্বর্গীয়, আর শৌর্য বীর্যে উদ্ধত ট্যানাস যেনো সত্যিকারের হোরাস।

আমার কাব্যনাট্যে ওসিরিসের প্রবেশ নিয়ে দারুন শঙ্কায় আছি, এখন তো জানা হয়ে গেছে কী ঘটতে যাচ্ছে হতভাগ্য অভিনেতার ভাগ্যে। সুদর্শন, মধ্য-বয়স্ক একজন জামিন-প্রাপ্ত আসামী, টড অভিনয় করছে দেবতার ভূমিকায়।

রাজকীয় বিচারকার্য শেষে মৃত্যুর দিন গুনছিল সে, আমার মনিব কাব্যনাট্যে অভিনয়ের জন্যে জেল থেকে মুক্তি দিয়েছেন তাকে। সন্তোষজনকভাবে অভিনয়ে সফল হলে তার শাস্তি মওকুফ করা হবে বলে ঘোষণা করেছেন ইনটেফ। হতভাগা টড বিশ্বাস করেছে সেই কথা, দারুন মনোযোগের সাথে অনুশীলন করেছে সে; মনে আশা-ভালো কাজ দেখালে ক্ষমা পাবে। সে জানে না, এরই মধ্যে গোপনে তার মৃত্যু পরোয়ানায় সই করে দিয়েছেন আমার মনিব, স্ক্রোলটা তুলে দিয়েছেন ব্যাসফারের হাতে। রাসফার শুধু প্রধান জল্লাদই নয়, আমার কাব্যনাট্যে সেথ-এর ভূমিকায়ও সে-ই অভিনয় করছে। মহান ফারাও-এর সম্মুখে একই সঙ্গে দুইটি কাজ সমাধা করার অভিপ্রায় আমার মনিবের । সেথ্‌-এর চরিত্রের জন্যে র‍্যাসফার অত্যন্ত যথাযথ, কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, টড-এর সঙ্গে তাকে অনুশীলন করতে দেখে আতঙ্কে শিউড়ে উঠলাম কী পৃথকই না হবে আসল দিনের অভিনয় আজকের অনুশীলন থেকে।

অনুশীলন শেষ হতে আমার মিসট্রেসকে হারেমে ফিরিয়ে দিয়ে এলাম। কিছুতেই আমাকে ছাড়বে না সে, আজকের দিনের অসাধারণ ঘটনাবলিতে ট্যানাসের ভূমিকার কথা বারবার শুনতে হলো।

দেখেছ, টাইটা, ও কেমন করে হোরাসকে ডাকলো, আর কেমন করে দেবতা তার সাহায্য করলো, দেখেছ? আমাদের কোনো ক্ষতি হোরাস হতে দেবেন না, তাই টাইটা?

বিচ্ছেদ, আত্মহত্যা–এগুলোর কথা ভুলে গেছে আমার মিসট্রেস; ওর মন জুড়ে এখন কেবল কল্পলোকের রঙিন দৃশ্যাবলি। তরুণ প্রেমের হাওয়া কত দ্রুতই না। পাল্টায়।

আজ ট্যানাস যা দেখাল, যেমন করে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাল রাজকীয় জলযানকে, নিশ্চই মহান ফারাও-এর আনুকূল্য পেয়ে গেছে সে; তুমি কি বলো, টাইটা? দেবতা আর ফারাও-এর কৃপাদৃষ্টি পেলে আমার বাবা কিছুতেই তাকে নির্বাসনে পাঠাতে পারবে না, পারবে, বলো টাইটা?

ওর মনের সমস্ত আনন্দের কথায় আমাকে সমর্থন জানাতেই হলো। হারেম ছাড়ার আগে কম করে হলেও এক ডজন সংখ্যক বার বিভিন্নভাবে ওর ভালোবাসার বার্তা ট্যানাসের কাছে ব্যক্তিগতভাবে পৌঁছানোর জন্যে প্রতিজ্ঞা করতে হলো।

শেষমেষ, ক্লান্ত হয়ে যখন পৌঁছুলাম আমার ব্যক্তিগত প্রকোষ্ঠে, সেখানেও স্বস্তি নেই। আনন্দে উন্মুখ হয়ে আছে প্রায় সব দাস বালক, আমার মিসট্রেসের মতোই অপেক্ষায় বসে ছিলো আমার জন্যে। দিনের ঘটনাবলির উপর আমার মতামত তাদেরও শোনা চাই, ট্যানাসের বীরত্বের ফলাফল কী হতে পারে–এইসব। নদীর উপরে, চাতালে বসে আমার পোষ্যদের খাবার দেয়ার ফাঁকে শুনলাম ওদের সবার কথা ।

বড় ভাই, এটা কি সত্যি, ট্যানাস দেবতাকে ডেকেছে আর হোরাস সাথে সাথে তার সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল? আপনি এটা দেখেছেন? অনেকে বলে, দেবতা নাকি তার শকুনের ছদ্মবেশে এসেছিলেন, ডানা ছড়িয়ে রেখে ছায়া দিয়েছেন ট্যানাসকে? এগুলো সত্যি?

এটা কি সত্যি, জ্ঞানের দেবতা, তথ, ট্যানাসের জন্যে ভবিষ্যতবাণী করেছেন, সে নাকি মিশরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা হবে, আর একদিন ফারাও তাঁকে সবচেয়ে বেশি সম্মান দেবেন? আজ যখন এই কথাগুলো মনে করি, অবাক লাগে, কেমন করে অদ্ভুত সেই সত্য লুকিয়ে ছিলো ওদের বাক্যে। কিন্তু তখন অবশ্য বাচ্চাদের কথার মতো অবজ্ঞায় উড়িয়ে দিয়েছিলাম ওদের কথাগুলো।

ঘুমোনোর আগে ভাবলাম, লুক্সর এবং কারনাকের সমস্ত জনতার হৃদয় জয় করে নিয়েছে ট্যানাস; কিন্তু এই মর্যাদা ওর জন্যে বোঝাস্বরূপ। যশ এবং খ্যাতি উচ্চপর্যায়ে হিংসার আগুন জ্বালাবে, আর কে না জানে, জনতার পূজা অর্চনা ক্ষণস্থায়ী। ঠিক যেমন করে মর্যাদার আসনে কাউকে সমাসীন করে তারা, ততোধিক আনন্দে তাকে ছুঁড়ে ফেলে।

বরঞ্চ, পর্দার অন্তরালে থেকে যাওয়া অনেক বেশি নিরাপদ, চিরকাল যেখানে থাকবার চেষ্টা করে এসেছি আমি।

*

উৎসবের ষষ্ঠ দিনে, কারনাক এবং ক্সরের মাঝামাঝিতে অবস্থিত নিজের রাজকীয় ভিলা ছেড়ে পাথুরে সিংহের মূর্তি-সজ্জিত চওড়া আভেন্যু ধরে নীল নদের তীরে, ওসিরিসের মন্দিরে এলেন মহান ফারাও, রাজকীয় ভাবগাম্ভির্য্য তার অবয়বে।

যে বিশাল স্লেজে চড়ে গেলেন তিনি, সেটা এতোটাই উঁচু, আভেন্যুর দুই ধারে সমবেত জনতা ঘার বাঁকা করে তাকাল স্বর্ণ-মণ্ডিত তাঁর সিংহাসনের দিকে। মাথার শিংয়ে ফুল সাজানো, বিরাট-পেশিবহুল বিশটি ষাড় টেনে নিয়ে চললো স্লেজটা। পায়ে হাঁটা পাথুরে পথে দাগ ফেলে দিলো তার বাহন।

একশ বাদক নেতৃত্ব দিলো এই যাত্রায়, লিয়ার এবং হার্প বাজিয়ে চললো তারা; সিবেল এবং ঢাকের শব্দ তাল মেলালো তার সাথে, ছন্দোবদ্ধ আওয়াজে বেজে উঠলো সিস্ট্রাম; ওরিক্স হরিণ এবং বুনো ছাগলের বাঁকানো শিংয়ে ফুঁ দিয়ে একটানা সুর তুলতে লাগলো বাদকেরা। মহান ফারাও এবং দেবতা ওসিরিসের প্রশংসাসূচক বাণী গাইল মিশরের শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পীরা। স্বাভাবিকভাবেই আমি নেতৃত্ব দিলাম তাঁদের। আমাদের পেছনে ট্যানাসের নেতৃত্বে নীল কুমীর বাহিনীর একটা দল সম্মান জানাল মহান ফারাওকে। বর্ম এবং যুদ্ধের সাজে সজ্জিত ট্যানাসকে দেখে কাপন জেগেছিল সেদিন কুমারী হৃদয়ে; দু চারজন হয়তো জ্ঞানও হারিয়েছিল। এমনই প্রিয় হয়ে উঠেছে সে।

নীল কুমীর বাহিনীর পরে এলেন রাজ্যের উজির, তার সভাসদদের সঙ্গে করে। এরপরে, মহৎ ব্যক্তিবর্গ, তাদের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে; তারপর বাজপাখি বাহিনীর একটা দল; সবশেষে মহান ফারাও-এর অতিকায় শ্লেজ। উচ্চ রাজ্যের কয়েক হাজার সম্পদশালী এবং প্রভাবশালী লোক জড়ো হয়েছে উৎসবে।

ওসিরিসের মন্দিরের নিকটবর্তী হতে প্রধান পুরোহিত তাঁর সঙ্গী-সাথীদের সাথে নিয়ে ফারাও মামোসকে অভিবাদন জানাতে নেমে এলেন সিঁড়ি কোঠায়। নতুন করে রঙ করা হয়েছে মন্দির, সূর্যাস্তের সোনালি আভায় চকচক করতে লাগলো বাইরের দেওয়ালের তামার কারুকার্যগুলো। লম্বা স্তম্ভের মাথায় উড়ছে রঙ-বেরঙের তোরণ।

সিঁড়ি কোঠার সামনে নিজের স্লেজ থেকে নেমে পড়লেন মহান ফারাও; একশ ধাপের প্রথমটিতে পা রাখলেন। দুইপাশের সিঁড়িতে তার সঙ্গী হলো কণ্ঠশিল্পীর দল। পঞ্চাশতম ধাপে দাঁড়িয়ে আমাদের মহান ফারাওকে পর্যবেক্ষণ করলাম কিছু সময়।

তাঁকে অবশ্য আমি আগে থেকে জানি, তিনি আমার অন্যতম একজন রোগী ছিলেন, কিন্তু আজ মনে হলো আমি ভুলে গেছিলাম, তিনি কত ক্ষুদ্র অন্তত একজন দেবতার পক্ষে তো বটেই। এমনকি আমার কাধ পর্যন্তও লম্বা নন তিনি, অবশ্য উঁচু দ্বৈত মুকুটে অনেকটা ঢাকা পড়ে গেছে তার উচ্চতা। ভাবগাম্ভির্যের সাথে বুকে হাত বেঁধে রেখেছেন, তাতে শোভা পাচ্ছে মিশরের সাম্রাজ্যের প্রতীক-চিহ্ন। আগের মতোই এবারেও লক্ষ করলাম, তার হাতে কোনো লোম নেই; মসৃণ, মহিলাদের মতো কোমল ও দুটো। পা দুটোও বেশ ছোটো এবং পরিচ্ছন্ন। হাত এবং পায়ের আঙুলে আংটি পরেন মহান ফারাও, কবজিতে রয়েছে বাজুবন্ধ। বুকের বিশালাকায় বর্মে শোভা পাচ্ছে সত্যের পালক হাতে দেবতা তথ–এর বিভিন্ন রঙিন চিত্র; লাল সোনায় খচিত। প্রায় পাঁচশ বছরেরও পুরোনো ওটা, আমাদের মহান ফারাও-এর আগেও আরো সত্তরজন পরেছেন।

দ্বৈত মুকুটের নিচে তার মুখাবয়ব নিহতের মতো সাদা দেখায় প্রসাধনীর কারণে। চোখে ঘন কালো কাজল, ওষ্ঠে লাল রঙ করা। প্রসাধন-চর্চিত তার মুখ চিন্তাক্লিষ্ট, ঠোঁট দুটো বেঁকে আছে বিরক্তিতে। চোখে আত্মবিশ্বাসের ছিটে-ফোটও নেই ।

আদতে, আমাদের এই মহান জন্মভূমির ভিত্তিমূল ধ্বসে গেছে! সমগ্র রাজ্য আজ বিচ্ছিন্ন পাপাচারে টালমাটাল। আজ, এমনকি একজন দেবতার মুখও চিন্তাক্লিষ্ট। একটা সময়ে সুদূর সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো তার সাম্রাজ্য, ডেল্টার সাত মাথা পেরিয়ে, দক্ষিণে সেই আসূন আর প্রথম জলপ্রপাত পর্যন্ত তিনি ছিলেন জগতের শ্রেষ্ঠতম সম্রাট। কিন্তু তিনি বা তাঁর উত্তরাধিকারীরা সব নষ্ট করেছেন, আজ তারই সংকুচিত সীমারেখায় মাথা উঁচায় শত্রুরা; হায়েনা, শেয়াল আর শকুনের মতো আক্রমণ করে মিশরের শবদেহে।

দক্ষিণে আছে আফ্রিকার দস্যুর দল, উত্তরে, সাগরের ধার ঘেঁষে বাস করে জলদস্যুরা; আর নীল নদের নিচের প্রান্ত জুড়ে রাজত্ব করছে ভুয়া ফারাও। পশ্চিমে লিবিয়ার শয়তান বেদুঈনের ঘাটি, পুবে প্রতিদিন মাথাচাড়া দেয় নতুন দস্যু দল; পরাজিত, হতোদ্যম জাতির বুকে কাঁপন জাগায়। আসিরিয়রা এবং মেদেসীয়রা, ক্যাসাইটস্ এবং হারিয়রা, এবং হিটটিরা–এদের সংখ্যার কোনো শেষ নেই।

যদি বয়সের ভারে ন্যুজ আর দুর্বলই হয়ে পড়বে, তবে কি সুবিধা রইল এই প্রাচীন সভ্যতার? লোভ, ধ্বংস আর উন্নাসিকতায় মত্ত বর্বরদের কেমন করে ঠেকাবো আমরা? আমি নিশ্চিত, বর্তমান ফারাও বা তার সাম্প্রতিক পূর্বসুরিদের কারও ক্ষমতা নেই মিশরকে সেই আগের স্বর্ণযুগে ফিরিয়ে নেওয়ার। উনি এমনকি একটি পুত্রসন্তানও জন্ম দিতে সক্ষম হন নি।

রাজ্য হারানোর শঙ্কার বদলে ছেলে বংশধর জন্ম না দিতে পারার দুঃখ তাকে ভারাক্রান্ত করে। এই পর্যন্ত বিশজন পত্নী নিয়েছেন তিনি। কন্যাসন্তান হয়েছে তাদের, পুত্র নয়। এতো দ্রুত তবুও নিজের দোষের কথা মেনে নেবেন না আমাদের ফারাও। উচ্চ সাম্রাজ্যের সমস্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন, গিয়েছেন সব মন্দির আর গুরুত্বপূর্ণ শ্রাইন-এ।

এ সবই আমার জানা, কেননা তাঁর ডেকে পাঠানো চিকিৎসকদের একজন ছিলাম আমি। স্বীকার করি, সেই সময়ে একজন দেবতাকে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছি বলে খানিকটা আপুত ছিলাম, ভেবে অবাক হয়েছিলাম একজন দেবতার কেন প্রয়োজন পড়বে আমার মতো সামান্য মানবকে। যাই হোক, ষাঁড়ের অণ্ডকোষ খেতে উপদেশ দিয়েছি তাকে, মধুর সঙ্গে মিশিয়ে; পরামর্শ দিয়েছি মিশরের শ্রেষ্ঠতম রূপসী কুমারী মেয়েকে তার রজঃচক্রের প্রথম বছরেই ফুল-শয্যায় নিতে।

নিজের চিকিৎসায় খুব একটা আস্থা ছিলো না আমার; অবশ্য, আমার প্রস্তুত। প্রক্রিয়ায় রাঁধা হলে সঁড়ের শুক্রাশয় অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার। ভেবেছিলাম, রূপসী কুমারীর খোঁজে পুরো সাম্রাজ্য চষে ফেলার ব্যাপারটা ফারাও-এর কাছে বেশ উপভোগ্য হবে। মূলত, একজন রাজা যদি ক্রমাগত তরুণী মেয়েদের শয্যাসঙ্গিনী করতে থাকেন, তাহলে কোনো একজনের গর্ভে পুত্রসন্তান জন্ম নেওয়া খুবই স্বাভাবিক।

আমি অবশ্য নিজেকে এই বলে সান্তনা দেই, অন্যান্য ব্যবস্থাপত্র দানকারীদের তুলনায় আমার চিকিৎসা অতটা ভয়ঙ্কর নয়, বিশেষত ওসিরিসের মন্দিরের পুরোহিতদের চেয়ে তো নয়ই। যদি কাজ নাও হয়, আমার ব্যবস্থায় কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা ছিলো না। আমি তাই বিশ্বাস করতাম। যদি জানতাম, ভাগ্যের পরিহাসে কী বিপরীত ভূমিকা নেবে ফারাও-কে দেওয়া আমার উপদেশ, কাব্যনাট্যে টড-এর জায়গা আমিই নিতাম।

ফারাও আমার পরামর্শ মেনে তার রাজ্যের প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই এলো আমারনা থেকে জলপ্রপাত পর্যন্ত দেশের সমস্ত তেজী ষাঁড়ের শুক্রাশয় সংগ্রহ করতে; তাদের প্রতি আরো নির্দেশ রয়েছে রূপসী কুমারীদের খবর জোগাড় করে আনার। এসব জেনে দারুন আপ্লুত হয়েছিলাম। রাজপ্রাসাদে আমার দূত মারফত খবর পেয়েছি, ইতিমধ্যেই রাজ্যের সবচেয়ে রূপসী কুমারী কন্যা হিসেবে অন্তত একশ জনের আবেদন বাতিল হয়ে গেছে।

আর এখন, আমার সামনে দিয়ে হেঁটে মন্দিরে প্রবেশ করলেন মহান ফারাও। হাঁটু গেড়ে বসা পুরোহিতরা অভ্যর্থনা জানাল তাঁকে। রাজ-উজির এবং তার সভাসদবর্গ অনুসরণ করলো, পেছনে অবিন্যস্ত, পরিমরি জনতার কাফেলা সবাই চাইছে ভালো একটা অবস্থান থেকে নাটক উপভোগ করতে। মন্দিরের ভেতরে স্থান খুবই অপ্রতুল; কেবল মাত্র প্রভাবশালী, মহান লোকজন এবং যারা পুরোহিতদের ঘুষ দিতে সমর্থ হয়েছে তারা জায়গা পেলেন ভেতরে। অন্যদের বাধ্য করা হলো, মন্দিরের প্রবেশদ্বারের বাইরে থেকে দেখতে। বেশিরভাগ লোকজন দারুন হতাশ হলো এই আচরণে, কাব্যনাট্যের ধারাবিবরণী শুনেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে তাদের। এমনকি, নাটকের পরিচালক হয়েও আমাকে পর্যন্ত বেগ পেতে হলো জনতার ভীড় ঠেলে ভেতরে যেতে। তাও সম্ভব হলো ট্যানাসের কারণে, আমার দুর্দশা দেখে তার দুজন সৈনিককে পাঠিয়ে পথ করে দেয়ার ব্যবস্থা করলো সে।

কাব্যনাট্য শুরুর আগে অবিরাম শুভেচ্ছাবাণী শুনতে হবে আমাদের, প্রথমে স্থানীয় প্রশাসকদের তরফ থেকে, পরবর্তীতে স্বয়ং রাজ-উজিরের নিকট থেকে। এই শুভেচ্ছা বাণীর হিড়িক কাজে লাগালাম আমি, শেষ মুহূর্তের ঠিকঠাক সেরে নিলাম। তাবুতে তাঁবুতে ঘুরে সব অভিনেতার প্রসাধনী, পোশাক পরখ করে দেখলাম, শেষ মুহূর্তের অস্বস্তি দূর করার চেষ্টা চালালাম সাধ্যমত।

হতভাগা টড ভাবছে, তার অভিনয় ইনটেকে সম্ভষ্ট করতে পারবে কি না। ওকে আশ্বস্ত করে জানালাম, নিশ্চই সে সক্ষম হবে। শেষমেষ লাল শেপেনের পাতা থেকে তৈরি গুঁড়ো খেতে দিলাম, এতে করে সামান্য হলেও লাঘব হবে তার মৃত্যু-যন্ত্রণা।

র‍্যাসফারে তাবুতে এসে দেখি, প্রাসাদের দুই সঙ্গীকে নিয়ে মদ্যপান করছে সে, ছোটো ব্রোঞ্জের তলোয়ার পাশে রাখা। প্রসাধনীর মাধ্যমে আরো বিকট দেখানোর চেষ্টা করেছি তাকে, যদিও বেশ কষ্টকর কাজ ছিলো সেটা। কালো দাঁতে হেসে যখন আমার উদ্দেশ্যে মদ বাড়িয়ে দিলো সে, বুঝলাম, সফল হওয়া গেছে সেই কাজে।

পেছনটা এখন কেমন ব্যথা করে, ছোট্ট সোনা? এই নাও, পুরুষ মানুষের পানীয় খাও! হয়তো এতে করে আবার বিচি ফেরত পাবে! তার এ ধরনের নির্মম কৌতুকে অভ্যস্ত হয়ে গেছি আমি, পাত্তা দিলাম না। বললাম, আমার মনিব, প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ বাতিল করেছেন, কাজেই আগের পরিকল্পনা মতো হবে প্রথম অঙ্ক।

মনিব ইনটেফের সঙ্গে কথা হয়েছে। তলোয়ার হাতে তুলে নেয় র‍্যাসফার। দ্যাখো, কত ধারালো এটা, ব্যাটা খোঁজা। কী মনে হয়? ওকে রেখে চলে এলাম আমি ।

দ্বিতীয় অঙ্কের আগে মঞ্চে আসবে না ট্যানাস, তবুও পোপাশাক পরে ফেলেছে সে। হেসে কাঁধ চাপড়ে দিলো আমার। কি হলো, বন্ধু, এই তো তোমার সুযোগ। আজকের সন্ধার পরে পুরো মিশরে নাট্যকার হিসেবে নাম ছড়িয়ে পড়বে তোমার।

ঠিক তোমার মতো। সবাই বলছে তোমার কথা। আরো বলতে চাইলাম আমি, কিন্তু বিনয়ের হাসি হেসে উড়িয়ে দেয় ট্যানাস। শেষের বক্তব্য তৈরি করেছ তো, ট্যানাস? জানতে চাই আমি, আমাকে এখন শোনাও ওটা।

ঐতিহ্যগতভাবে, হোরাসের ভূমিকায় অভিনয়কারী ব্যক্তি নাটক শেষে ফারাও-এর কাছে বার্তা দেয়, দেবতাদের পক্ষ থেকে। যদিও আসলে সেগুলো তারই বক্তব্য। অতীতে, যেসব ঘটনা সাধারণ সময়ে মহান ফারাও-এর কানে পৌঁছুতে ব্যর্থ হয়েছে, এই দিন হোরাসের রূপদানকারী অভিনেতার মাধ্যমে সেটাই করা হয়। তবে শেষ বংশধারার ফারাও-এর আমলে নিয়ম পরিবর্তন করা হয়েছে, এখন শেষ বক্তব্য দাঁড়িয়েছে মহান ফারাও-এর স্তব-স্তুতিতে।

গত কয়েক দিন থেকেই ট্যানাসকে তার বক্তব্য আমাকে শোনানোর জন্যে বলছি। প্রতিবারই এতো তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে এড়িয়ে গেছে সে, এখন রীতিমত সন্দেহ হতে লাগলো আমার। এ-ই শেষ সুযোগ। বলো, জোর করলাম, কিন্তু ট্যানাস হাসে প্রত্যুত্তরে ।

ফারাও-এর কাছে যেমন মনে হবে, তোমার কাছেও ঠিক একই রকম চমক হিসেবে থাক ওটা। দুজনেই মজা পাবে সেক্ষেত্রে। আর কোনো কিছু বলে লাভ নেই। এক একটা সময় আমার দেখা সবচেয়ে একরোখা বর্বর বলে মনে হয় ট্যানাসকে। ঝড়ো গতিতে ওর ভঁবু ছাড়লাম।

লসট্রিসের তাবুর প্রবেশমুখ ঠেলে ভেতরে ঢুকে চমকে গেলাম। যদিও ওর পরনের পোশাকটা আমারই নকশা করা, ওর প্রসাধনীর কথাও আমি বলে দিয়েছিলাম দাসী মেয়েদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা স্বর্গীয় অবয়বের জন্যে ঠিক প্রস্তুত ছিলাম না। এক মুহূর্তের জন্যে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হলো, দেবী সত্যিই মর্ত্যে নেমে এসেছেন, অশরীরী কোনো দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে। শ্বাস আটকে আসতে চাইল, নিজের অজান্তেই নতজানু হলাম; আমার মিসট্রেসের খিলখিল হাসি চমক ভাঙ্গালো।

কী মজা, তাই না টাইটা? পুরোদস্তুর পোশাকে ট্যানাসকে দেখার জন্যে তর সইছে না। ওকে নির্ঘাত দেবতাদের মতোই লাগছে। ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর পোশাক দেখার সুযোগ তরে দিলো লসট্রিস, হাসলো কাঁধের উপর দিয়ে তাকিয়ে।

তোমার চেয়ে বেশি স্বর্গীয় কিছু হতে পারে না, মাই লেডি, বিড়বিড় করে বললাম আমি।

কথন শুরু হবে নাটক? অধৈর্যের মতো বলে উঠে লসট্রিস। আর বসে থাকতে ইচ্ছা হয় না।

তাঁবুর দেওয়াল কান পেতে প্রধান কামরার বক্তৃতায় মনোযোগ দেওয়ার প্রয়াস পেলাম। শেষ হয়ে এসেছে প্রায়, যে কোনো মুহূর্তে আমার মনিব, ইনটেফ অভিনেতাদের নাটক শুরু করার নির্দেশ দেবেন।

লসট্রিসের হাতে নিজের হাতে তুলে নিলাম আমি। আলতো করে চাপ দিলাম। বেশ বিরতি দিয়ে কথা বলা আর অভিজাত ভঙির কথা মনে থাকবে তো? মনে করিয়ে দিতে চাইলাম ওকে। হালকা করে আমার কাঁধে ঘুষি মারে সে।

আরে, থামো তো! যত বকবক! দেখো, দারুন হবে সবকিছু। ঠিক সেই মুহূর্তে শুনলাম, ইনটেফ তার স্বর উঁচালেন।

পবিত্র দেবতা, ফারাও মামোস, মিশরের মহান স্রষ্টা, সাম্রাজ্যের অধিকারী, ন্যায় বিচারক, মহান যিনি সবকিছু দেখেন এবং জানেন, দয়ার আধার অভিধা এবং স্তুতি চলতেই থাকল; ওদিকে লসট্রিসের তাঁবু থেকে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে কেন্দ্রীয় খিলানের নিচে, আমার নিজের জায়গায় অবস্থান নিলাম। খিলানের চারদিকে উঁকি মেরে দেখি, মন্দিরের ভেতরের স্থান লোকে-লোকারণ্য হয়ে গেছে। ফারাও এবং তার বয়োজ্যেষ্ঠ পত্নীরা বসেছেন সামনের সারির নিচু সিডার কাঠের কেদারায়, থেকে থেকে চুমুক দিয়ে চলেছেন ঠাণ্ডা শরবত; নয়ত মিষ্টান্ন দ্রব্যে।

বেদীর নিচে, উঁচু একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে তাদের উদ্দেশ্যে বলছেন আমার মালিক, ইনটেফ; ওটাই আমাদের মঞ্চ। লিনেনের পর্দা দিয়ে আড়াল করে রাখা হয়েছে মূল মঞ্চ। শেষবারের মতো ওটা একবার দেখে নিলাম, অবশ্য এখন আর কোনো কিছু পরিবর্তনের সুযোগ নেই।

পর্দার আড়ালে; দৃশ্যপট প্রস্তুত করা হয়েছে পাম এবং একাশিয়া গাছে সাজিয়ে, প্রাসাদের মালীরা আমারই নির্দেশে ওগুলো স্থাপন করেছে। পাথুরে শিল্পীদের ফারাও এর সমাধি নির্মাণ কাজ থেকে সরিয়ে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ প্রকোষ্ঠ। মন্দিরের পেছনের সেই প্রকোষ্ঠ থেকে পানি প্রবাহিত করা যাবে মঞ্চে, নীল নদের প্রতীক হিসেবে।

মঞ্চের পেছনে, ছাত থেকে মেঝে পর্যন্ত টানটান লিনেনের পর্দায় অসাধারণ ছবি এঁকেছেন নেক্রোপলিসের শিল্পীরা। সূর্যাস্তের ক্রমক্ষয়িষ্ণু আলো আর মশালের শিখার কাঁপন অদ্ভুত আবহ তৈরি করেছে তাতে, যেনো এক লহমায় অতীতের কোনো সময়ে নিয়ে যাবে সবাইকে।

ফারাও-এর মনোরঞ্জনের জন্যে আরো কিছু ব্যবস্থা রেখেছি আমি। খাঁচার পশু পাখি আর প্রজাপতি ছেড়ে দেওয়া হবে বিশেষ সময়ে, দেবতা আমন রার সৃষ্টি পৃথিবীকে ফুটিয়ে তোলার জন্যে। মশালের শিখা জ্বলবে লাল এবং সবুজ রঙে; বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর রয়েছে বন্যা, সঙ্গে অদ্ভুতুরে ধোয়ার মতো মেঘ ঠিক অন্ধকার জগতের মতো, যেখানে বসবাস করেন দেব দেবীরা।

মামোস, রার পুত্র, আপনি চিরজীবী হোন! আমরা, আপনার প্রতিপালিত থিবেস নগরীর অধিবাসীরা আপনার মনোযোগ কামনা করছি এই নগণ্য কাব্যনাট্যে। এ আপনার উদ্দেশ্যে হে সকল সম্মানের মালিক।

আমার মনিব, ইনটেফ তাঁর স্বাগত বক্তব্য শেষে নিজের আসনে বসে পড়লেন। সুরের ধ্বনির সাথে মঞ্চে প্রবেশ করে, খিলানের আড়াল থেকে বেরিয়ে দর্শকদের মুখোমুখি দাঁড়ালাম আমি। শক্ত পাথরের মেঝেতে বসে থেকে বক্তব্য শুনে বিরক্ত হয়ে গেছে বেশিরভাগ লোকজন, উপভোগের জন্যে মুখিয়ে আছে এখন। দারুন হর্ষধ্বনির সাথে আমাকে স্বাগত জানায় জনতা। এমনকি মহান ফারাও-এর ঠোঁটেও স্মিত হাসি ফুটে উঠেছে।

হাত উঁচু করে নিরবতা কামনা করলাম। সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে আসে জনতা, সূচনা বাণী শুরু করলাম আমি।

নীলের তীরে নলখাগড়ার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের শব্দ শুনে শুনে বড় হয়েছি আমি, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ছিলো আমার অবয়বে। তখন বুঝি নি সেই আওয়াজের মর্ম, কিন্তু কোনো ভয় ছিলো না মনে। মাত্রই পৌরুষত্ব অর্জন করেছিলাম তখন।

সেই সুর ছিলো বয়ে যাওয়া এক সৌন্দৰ্য্য। বাদকতে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম আমি, জানতাম না, সে ছিলো মৃত্যু স্বয়ং, সুরে সুরে প্রলুব্ধ করতে চাইছিল আমাকে। আমরা, মিশরীয়রা মৃত্যু দ্বারা আবেগ তাড়িত হই, সঙ্গে সঙ্গেই উপস্থিত দর্শকের মনোযোগ গম্ভীর হলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেঁপে উঠে তারা।

মৃত্যু আমাকে ছিনিয়ে নিল, তাঁর কঙ্কালসার হাতে নিয়ে চললো সূর্যের দেবতা আমন রার কাছে। তার সাদা আলোর অধিকারে চলে গেলাম আমি। দূর থেকে শুনি, আমার প্রিয়তমা কাঁদছে; কিন্তু তাকে দেখতে পাই না। আমার দিনগুলো শূন্য মনে হয়। জনতার সম্মুখে এই প্রথম উচ্চারিত হচ্ছে আমার গদ্য, সাথে সাথেই বুঝতে পারলাম, তাদের মনোযোগ পেয়েছি; সবার মুখাবয়বে সাগ্রহ উত্তেজনা। পিন-পতন নিরবতা সমগ্র মন্দির জুড়ে।

এরপর, উঁচু একটা স্থানে আমাকে নিয়ে গেলো মৃত্যু, যেখান থেকে আমার পৃথিবীকে দেখতে পেলাম। দুনিয়ায় বেঁচে থাকা সব মানুষ আর পশু-পাখিদের দেখতে পেলাম। শক্তিশালী নদীর মতো আমার সামনে উল্টো বয়ে যেতে থাকে সময়। হাজার বছর ধরে আমি দেখতে থাকি তাদের যন্ত্রণা, মৃত্যু। মৃত্যু থেকে শুরু করে নিজেদের শিশুকাল আর জন্মকালে ফিরে যেতে দেখি তাদের। আরো পেছনে যেতে থাকে সময়, আমি দেখতে পাই প্রথম নারী এবং পুরুষকে। তাদের জনুক্ষণ, তারও অতীতের সময়ে ফিরে চললাম। যখন কোনো মানুষ নয়, বাস করতো শুধু দেবতারা।

কিন্তু, দেবতাদের সময় ছাড়িয়ে আরো পেছনে যেতে থাকে কাল, সেই নাদের সময়ে-অন্ধকার আর প্রাগৈতিহাসিক বিশৃঙ্খলায়। আর পেছনে যেতে পারে না সময়ের নদী, পথ ঘুরিয়ে নেয় সে। আবার সামনে প্রবাহিত হতে থাকে, যেমনটা আমি জানি, জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত; দেবতাদের আবেগে আলোড়িত হই। আমাদের সাম্রাজ্যের ধর্ম-ইতিহাসে দারুন দখল আছে জনতার, কিন্তু রহস্যের অবগুণ্ঠন খোলার এমন আধুনিক প্রক্রিয়ার কথা তাদের জানা ছিলো না। নিচুপ, বিমুগ্ধ জনতা এক চুল নড়ে না।

নানযুগের বিশৃঙ্খলা আর অন্ধকারের ভেতর থেকে জন্ম নিলেন আমন রা, যিনি নিজেই নিজের স্রষ্টা। আমি দেখলাম, নিজের জননেন্দ্রীয়তে আলোড়ন তুলছেন তিনি, স্বমেহন করছেন; ছড়িয়ে দিচ্ছেন তার ঔরস কালো আকাশের বুকে, যাকে আমরা আকাশগঙ্গা বলে জানি। সেই বীজ থেকেই জন্ম নিল জেব এবং নাট, স্বর্গ এবং পৃথিবী।

বাক্‌-হার! একটি একাকী কণ্ঠ ভেঙে ফেলে মন্দিরের অসাধারণ নিরবতা। বাক হার! আমেন! নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নি প্রধান পুরোহিত, আমার সৃষ্টি রহস্যের বর্ণনায় আন্দোলিত হয়েছেন। তার এহেন আচরণে এতো অবাক হলাম, আর একটু হলেই ভুলে গিয়েছিলাম পরবর্তী বাক্যগুলো। তখন পর্যন্ত তিনিই ছিলেন আমার কঠোরতম সমালোচক। তার হৃদয় জয় করে নিয়েছি আমি, আনন্দে আরো প্রবল হয়ে উঠলো আমার কণ্ঠস্বর।

জেব এবং নাট মিলিত হলো সঙ্গমে, ঠিক মানব-মানবীর মতোই। সেই অসাধারণ মিলন থেকে জন্ম নিল দেবতা ওসিরিস এবং সেথ্‌ আর দেবী আইসিস এবং নেফথিস।

আমার ইশারায় ধীরে সরে গেলো লিনেনের পর্দা, উন্মোচিত হলো আশ্চর্য এক জগত। সমগ্র মিশরে এরকম কোনো কিছু আর দেখে নি কেউ আগে, বিস্ময়ে শ্বাস আঁকালো জনতা। পরিকল্পিত মাপা পদক্ষেপে পিছু হটলাম আমি, মঞ্চে আমার জায়গা নিল দেবতা ওসিরিস। মাথায় লম্বা, বোতলের মতো পাগড়ি, বুকের উপরে হাত দুটো বাধা সাথে সাথেই তাকে চিনতে পারল দর্শক। প্রায় সব পরিবারই ওসিরিসের মূর্তি রাখে নিজেদের প্রার্থনার ঘরে।

প্রত্যেকের গলা দিয়ে উঠে আসে অবিশ্বাসের ধ্বনি। টডকে যে সম্মোহনি ওষুধ দিয়েছি, কাজ করছে সেটা; সত্যিই তার চোখে ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত, চকচকে দৃষ্টি । পরাবাস্তব জগতের দেবতার মতো দেখাচ্ছে। হাতের প্রতীক চিহ্ন হাতে রহস্যময় ইঙ্গিত দেয় ওসিরিস, বজ্র কঠিন কণ্ঠস্বরে আদেশ করে, জাগো, হে নদী!

আবারো হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ে জনতা, নীল নদের আগমনী বার্তা টের পেয়েছে তারা। নীল নদই হলো মিশর, পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল।

বাক্-হার! বলে উঠে আরও একটি কণ্ঠস্বর, খিলানের আড়ালে আমার লুকানো জায়গা থেকে কে বলেছে টের পেয়ে আনন্দে, বিস্ময়ে আপ্লুত হলাম। স্বয়ং ফারাও। আমার কাব্যনাট্যে বাস্তব এবং পরাবাস্তব দু ধরনের উপাদানই রেখেছি, এখন আমি নিশ্চিত, আজ থেকে আমার সংস্করণটিই অভিনীত হবে। এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো আগের নাটক আজ থেকে বাতিল হবে। অমরত্ব অর্জন করেছি আমি, শতকে শতকে স্মরণ করা হবে আমাকে।

আনন্দের সাথে প্রকোষ্ঠের দিকে ইঙ্গিত করলাম, ওখান থেকে মঞ্চে আসতে লাগলো জলের প্রবাহ। প্রথমটায় ব্যাপারটা অনুধাবন করতে পারল না দর্শক। ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারল, মহান নীল নদের জন্ম দেখছে তারা; হাজার কণ্ঠের গর্জন কাঁপিয়ে দেয় বাতাস, বাক্-হার! বাক্-হার!

পানি, তুমি জেগে উঠো! আহ্বান জানাল ওসিরিসি। বাধ্যগতের মতো বন্যার জলে ফুলে-ফেঁপে উঠে নদী।

পানি নেমে যাক! এবারে ঘোষণা করেন দেবতা, তার আদেশে নেমে যায় পানির স্তর। আবারো জাগো!

মন্দিরের পেছনে, প্রকোষ্ঠের ভেতর থেকে পানি প্রবাহিত হওয়ার আগে রঙ মেশানোর ব্যবস্থা করেছিলাম আমি। প্রথমে সবুজ রঙ, খরা মৌসুমের কম পানি চিত্রিত করার জন্যে; কিন্তু পরে আবারো যখন জেগে উঠলো পানির স্তর, বন্যার পলিমিশ্রিত গাঢ় রঙের পানি প্রবাহিত হতে থাকল।

এখন, জাগো, কীটপতঙ্গ আর পাখিরা! এসো, পৃথিবীর বুকে! আদেশ দিলেন ওসিরিস, মন্দিরের পেছনের খাঁচার দরোজা খুলে যেতে কিচিরমিচির করতে করতে বুনো পাখির মেঘ এবং বর্ণিল প্রজাপতি ভরে ফেলল মন্দির।

একদম শিশুর মতো হয়ে গেছে দর্শক। অবাক, আনন্দিত, থেকে থেকে হাতের মুঠোয় ধরে ফেলছে প্রজাপতি, আবার ছেড়ে দিতেই মন্দিরের উঁচু খিলানের ফাঁকে উড়তে থাকল ওগুলো। সাদা, সিনামন আর কালো রঙের ডোরাকাটা অসাধারন একটা হুপো পাখি এসে বসল ফারাও-এর মুকুটে, নির্ভয়ে ।

খুশিতে আন্দোলিত হয় জনতা। একটা ইশারা! চেঁচায় তারা। রাজার জন্যে আশীর্বাদ। তিনি চিরজীবী হোন! হেসে উঠলেন মহান ফারাও।

ব্যাপারটা অবশ্য একটু চালাকি হয়ে গেছে, পরবর্তীতে আমার মনিব, ইনটেফের কাছে বলেছি, পাখিটাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ফারাও এর মুকুটে বসিয়েছি আমি। মজার ব্যাপার, এই অসম্ভব কথাটা বিশ্বাস করেছেন তিনি। পশুপাখির সাথে আমার যোগাযোগ নিয়ে এমন কথাও লোকে বিশ্বাস করে।

মঞ্চে, নিজের তৈরি স্বর্গে ঘুরে ফিরছেন ওসিরিস। নাটকীয় মুহূর্তের জন্যে সম্পূর্ণ তৈরি আবহাওয়া। রক্ত হীম করা চিৎকারের সাথে মঞ্চে প্রবেশ করলো সেথ। সবাই তার আগমনের অপেক্ষায় ছিলো, এরপরেও তার কর্কশ উপস্থিতি চমকে দিলো দর্শকদের। চিৎকার করে মুখ ঢেকে ফেলে, কাঁপা-কাঁপা আঙুলের ফাঁকে দিয়ে দেখতে লাগলো মহিলারা।

একি করলে, ভাই? হিংসায় হুঙ্কার দিয়ে উঠে সেথ। আমিও কি দেবতা নই? সব সৃষ্টি যদি তোমার হবে, আমি তোমার ভাই হয়েও কিছু পাবো না?

শান্তস্বরে উত্তর দেয় ওসিরিস, তার মর্যাদাপূর্ণ কণ্ঠস্বর দূরাগত শোনাল ওষুধের প্রভাবে। আমাদের পিতা, আমন রা এ সবই দিয়েছেন আমাদের দু জনকে। অবশ্য তিনি আমাদেরকে পছন্দ করার স্বাধীনতা দিয়েছেন মন্দ বা ভালো যে কাজে ব্যবহার করি, দেবতার মুখে আমারই রচিত বাক্য প্রতিধ্বনি তোলে মন্দিরের ভেতরে। আমার লেখা সবচেয়ে উকৃষ্ট গদ্য এটা, যেনো গিলতে থাকে জনতা। কেবল আমি জানি, কী ঘটতে যাচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যে; তিক্ততায় বিষিয়ে গেলো মন।

কথার শেষে পৌঁছে গেছে ওসিরিস। এটা আমার সৃষ্টি দুনিয়া। যদি শান্তি এবং ভালোবাসায় উপভোগ করতে চাও, তোমাকে স্বাগতম। কিন্তু যদি যুদ্ধের মতো উন্মত্ত আচরণ কর, যদি ঘৃণা আর নষ্ট তোমার হৃদয় অধিকার করে রাখে, তবে এখান থেকে চলে যাও। সাদা লিনেনে মোড়া হাত তুলে স্বর্গোদ্যান ত্যাগের নির্দেশ দেয় ওসিরিস।

ঠিক ষাঁড়ের মতোই ভীষণ লোমশ কাঁধ ঝাঁকায় সেথ, প্রচণ্ড হুঙ্কারে কেঁপে উঠে মন্দির। ব্রোঞ্জের তলোয়ারটা মাথার উপরে ঘুরিয়ে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। কখনই অনুশীলন করা হয় নি এটা, একদম বোকা বনে গেলো ওসিরিস। ডান হাত প্রসারিত রেখে হতবুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে, বাতাস কেটে প্রচণ্ড আঘাতে নেমে এলো তলোয়ারের ফলা। আমার চাতালের লতাগুল্ম যেমন করে ছিঁড়ে আনি কাণ্ড থেকে, ঠিক তেমনি সহজে কেটে গেলো হাতটা কবজি থেকে। ওসিরিসের পায়ের কাছেই পড়ল সেটা, থেকে থেকে লাফাচ্ছে আঙুলগুলো।

ঘটনার আকস্মিকতায়, তলোয়ারের প্রচণ্ড ধারের কারণেই হয়তো, কয়েক মুহূর্ত নড়ল না ওসিরিস, কেবল পা কেঁপে উঠলো তার। দর্শকরা ভাবল, এ-ও কোনো ধরনের মঞ্চ খেলা, কেটে যাওয়া হাতটা হয়তো নকল। সাথে সাথে রক্তপাত না হওয়ায় তাদের চিন্তা আরো জোরালো হলো। সতর্ক নয়, আরো মনোযোগী হলো তারা; কিন্তু হঠাৎই কাটা হাত আঁকড়ে ধরে কেঁদে উঠলো ওসিরিস। পড়ে গেলো। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে আঘাত থেকে, ভিজিয়ে লাল করে ফেলছে সাদা আচকান। হাত আঁকড়ে ধরে টলোমলো পায়ে দাঁড়াল ওসিরিস, মঞ্চের উপরে তীব্র চিৎকারে আবেদন করে চললো । তীব্র, তীক্ষ্ণ সেই চিৎকার এতো মর্মস্পর্শী, ঘোর ভাঙল জনতার। প্রথমবারের মতো তারা বুঝতে পারল, এটা নাটক নয়; আতঙ্কে নিচুপ হয়ে গেলো সবাই।

মঞ্চের প্রান্তসীমায় পৌঁছুবার আগেই দ্রুত পায়ে দৌড়ে ওসিরিসকে ধরে ফেলল সেথ। কাটা হাত ধরে টেনে মঞ্চের মাঝখানে নিয়ে এলো তাকে, ছুঁড়ে ফেলল পাথরের মেঝেতে। মাথার মুকুট খুলে যেতে দীর্ঘ কালো চুল বেরিয়ে পড়ল ওসিরিসের, নিজের রক্তের পুকুরে পড়ে রইল সে।

দয়া কর, ক্ষমা কর আমাকে! আবেদন জানাল ওসিরিস, তার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে হো হো হাসিতে ফেটে পড়ল সেথ। গভীর, নিঘাদ আনন্দ প্রকাশ পেলো তার হাসিতে। রাসফার এখন সেথ হয়ে গেছে, দারুন ভাবে উপভোগ করছে প্রতিটি মুহূর্ত। সেথ এর বন্য হাসিতে চমক পুরো ভাঙে জনতার। তাদের কেউই এখন বিশ্বাস করে না, নাটক চলছে এখানে; চরমধর্মী এই কর্মকাণ্ড এখন তাদের কাছে উপভোগ্য বাস্তব। তাদেরই দেবতার হত্যাদৃশ্য দেখে শিউরে উঠে মেয়েরা, পুরুষেরা গর্জন করে রাগের আতিশায্যে।

ছেড়ে দাও তাকে! মহান দেবতা, ওসিরিসকে ছেড়ে দাও! তারা চিৎকার করে, কিন্তু একজনও নিজের আসন ছেড়ে মঞ্চে এসে ভয়ঙ্কর এই ট্রাজেডি থামাবার কোনো চেষ্টাও করে না। দেবতাদের আবেগ আর বিরাগ তো তাদের হস্তক্ষেপের বাইরে, তাই না?

অবশিষ্ট এক হাতে সেথ এর পা আঁকড়ে ধরে ওসিরিস। তখনও হাসছিল সেথ, টেনে লম্বা করে দেখল সে হাতটাকে ঠিক যেমন জবাই করার আগে জম্ভগুলোকে পরখ করে কসাই।

কেটে ফেল! রক্তের নেশায় পাগল কোনো কন্ঠ বলে উঠে জনতার ভেতর থেকে। পাল্টে গেছে তাদের ভাবাবেগ।

মেরে ফেল তাকে! চেঁচিয়ে বলে আরেকটি কণ্ঠ। রক্ত-দর্শন আর হত্যা এমনকি সবচেয়ে শান্ত মানুষটিকেও কেমন করে ক্ষেপিয়ে তোলে, ব্যাপারটা সব সময়ই ভাবিয়েছে আমাকে। চরম এই দৃশ্যে আমি পর্যন্ত নড়ে গেছি, অসুস্থ এবং আতঙ্কিত বোধ হচ্ছে সত্যি; কিন্তু ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা দানা বাঁধছে আমারও।

তলোয়ারের নিরাসক্ত কোপে বাহুটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলল সেথ, তার লাল মুঠোয় ধরা প্রত্যঙ্গ ফেলে এলিয়ে পড়লো ওসিরিস। পায়ের উপর দাঁড়াতে চাইছে সে, হাতের অবলম্বন না থাকায় পারছে না। থেকে থেকে ছুঁড়ছে পা জোড়া, মাথা নড়ছে এপাশ ওপাশ; চেঁচিয়ে চলেছে সে। ভয়ঙ্কর এই দৃশ্য থেকে চোখ সরিয়ে নিতে চাইলাম আমি, পারলাম না।

কবজি এবং কনুইয়ের কাছ থেকে তিন টুকরো করলো সে হাতটাকে। এক এক করে খণ্ডগুলো ছুঁড়ে ফেলল দর্শকসারিতে। বাতাসে ভেসে যেতে যেতে রক্তের ধারা ঝরাল ওগুলো। ফারাও-এর চিড়িয়াখানায় আটক, ক্ষিধেয় উন্মত্ত সিংহের মতো হাত বাড়ায় তারা দেবতার দেহবশেষের দখল নিতে কাড়াকাড়ি শুরু করে।

অদ্ভুত মনোযোগর সাথে কাজ করে চলে সেথ। গোড়ালি বরাবর খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলে ওসিরিসের পা জোড়া। এরপরে, হাঁটু বরাবর এবং সবশেষে, কোমরে এসে খণ্ড করে উরু। দেহাবশেষগুলো ছুঁড়ে ফেলে দেয় রক্ত-তৃষ্ণার্ত জনতার উদ্দেশ্যে। আরো দাবি করতে থাকে তারা।

সেথ এর উপহার! গর্জে উঠে একটা কণ্ঠ। আমাদেরকে সেথ এর উপহার দাও? এই আবেদন জোরালো রূপ নিল মুহূর্তেই। এ হলো সেথ্‌-এর তালিসমান। কিংবদন্তি অনুযায়ী, তালিসমান হলো সকল জাদুকরী ক্ষমতার মূল। যে ব্যক্তি তা পাবে, অন্ধকার জগতের শক্তিগুলো তার অধীন হবে। ওসিরিসের শরীরের চৌদ্দ খণ্ডাংশের মধ্যে কেবল একটি খণ্ড খুঁজে পায় নি আইসিস এবং তার বোন নেফথিস। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে সেগুলোকে ছড়িয়ে রেখেছিল সেথ। র‍্যাসফার আমার যে অঙ্গ কেটে ফেলেছে, সেটাই ছিলো সেথ-এর তালিসমান। আমার মনিব, ইনটেফের গলার হারে শোভা পাচ্ছে যা ।

সেথ্‌-এর তালিসমান দাও আমাদের! জনতার রোষ চরমে উঠে। লাল রক্তে ভিজে যাওয়া আচকান ধরে দেহকাণ্ডটা উঁচু করে সেথ। তখনও হাসছিল সে। নির্দয় সেই আওয়াজ কাঁপিয়ে দেয় আমাকে। করুণার সাথে উরুসন্ধির সেই আগুনে ক্ষত মনে পড়ে গেলো আমার, ইতিমধ্যেই শিকারের রক্তে ভিজে যাওয়া লোমশ হাতে দেহাকাণ্ড থেকে তলোয়ারের কোপে সেই অঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে সে; উল্লাসে উন্মত্ত জনতাকে উঁচু করে দেখায়।

আবেদনে ফেটে পড়ে দর্শককুল। আমাদের দাও ওটা! ভিক্ষে চায় তারা। তালিসমান-এর ক্ষমতা দাও আমাদের! জংলী জানোয়ারে পরিণত হয়েছে তারা।

এই আবেদনে কান দেয় না সেথ। একটি উপহার! চিৎকার করে উঠে সে। একজন দেবতা শুধু আর একজন দেবতাকেই উপহার দিতে পারে! আমি, অন্ধকারের দেবতা, সেথ, এই তালিসমান উপহার দেব-দেবতা ফারাওকে, মহান মামোসকে! শক্তিশালী পায়ে সিঁড়ি বেয়ে মঞ্চ থেকে নেমে ফারাও-এর পায়ের কাছে ওটা রাখে সেথ।

অবিশ্বাসের সাথে দেখলাম, নিচু হয়ে সেটা কুড়িয়ে নিলেন ফারাও। তার প্রসাধন চর্চিত মুখাবয়বে বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠে, এ যেনো সত্যিই কোনো দেবতার দেহাবশেষ । আমি নিশ্চিত, সেই মুহূর্তে এটাই ভাবছিলেন তিনি। সবার সম্মুখে ডান হাতে ধরলেন তালিসমান।

তার উপহার গৃহীত হতে ছুটে মঞ্চে ফিরে এলো সেথ, কাজ শেষ করতে। হতভাগ্য সেই ওসিরিস তখনও সজাগ, প্রতিটি ব্যথার ঢেউ বোধ করতে পারছে। জানি, আমার দেওয়া ওষুধ এ নিদারুন কষ্টে কোনো উপকারেই আসছে না। নিজের রক্তের পুকুরে শুয়ে শরীরের একমাত্র সঞ্চালনক্ষম অংশ, মাথা নাড়ছিলো সে এপাশ-ওপাশ। দৃষ্টিতে অনন্যসাধারণ কষ্ট।

চুলের গোছা ধরে যখন মাথাটা আলাদা করে ফেলল সে, দারুন স্বস্তিবোধ করলাম আমি । এরপরেও, জীবনের শেষ পলক পর্যন্ত কোটরের ভেতরে অস্থির নড়াচড়া করে গেলো চোখের মণিদুটো। শেষমেষ ঘোলাটে হয়ে এলো সেই দৃষ্টি, ধীরে নিভে গেলো উজ্জ্বলতা। জনতার উদ্দেশ্যে মাথাটা ছুঁড়ে দিলো সেথ।

আর এভাবেই, মন্দিরের পাথুরে স্তম্ভের ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দেওয়া হর্ষধ্বনির মধ্য দিয়ে শেষ হলো আমাদের কাব্যনাট্যের প্রথম অঙ্ক।

*

দাস বালকেরা মঞ্চ থেকে বীভৎস হত্যাকাণ্ডের নিদর্শনগুলো সরিয়ে নিয়ে গেলো দৃশ্য-বিরতিতে। আমি বিশেষ চিন্তিত ছিলাম। লসট্রিসকে নিয়ে, সে যেনো টের না পায় ঠিক কী ঘটে গেছে কিছুক্ষণ আগে। মনে আশা, হয়তো ও ভাবছে সবকিছু অনুশীলনের মতোই হয়েছে। ওকে তাঁবুতেই রেখে, ট্যানাসের একজন লোককে পাহারায় রেখেছিলাম; আরো নজর রেখেছি কুশ দেশীয় দাসী মেয়েগুলো যেনো উঁকি মেরে কী ঘটছে দেখে আবার লসট্রিসকে গিয়ে বলতে না পারে। বিলক্ষণ জানি, কী ঘটেছে টের পেলে আর অভিনয়ে রাজী করানো যাবে না তাকে। বালতি ভর্তি পানি দিয়ে মঞ্চের বীভৎস দাগ মুছে ফেলল বালকেরা, ছুটে আমার মিসট্রেসের তাঁবুতে পৌঁছুলাম ওকে সাহস দিতে।

ওহ টাইটা, আমি লোকের চিৎকার শুনেছি, আনন্দে উদ্বেল লসট্রিস স্বাগত জানায়। আমাকে। সবাই পছন্দ করেছে তোমার নাটক । তোমার জন্যে কী যে খুশি লাগছে। এটা তোমার প্রাপ্য ছিলো। ষড়যন্ত্রির মতো মুচকি হাসলো ও, শুনে মনে হলো, ওরা বুঝি ভেবেছে ওসিরিসের মৃত্যু সত্যি ঘটেছে; যাঁড়ের রক্ত দেখে মনে করেছে আসলে টড-এর রক্ত ওগুলো!

তা-ই, মিসট্রেস, আমাদের চালাকি ওরা বুঝতে পারে নি। সম্মত হলাম আমি। মাত্রই দেখা নির্মম দৃশ্যাবলি এখনও আচ্ছন্ন করে রেখেছে আমাকে।

কিছুই টের পায় নি লসট্রিস। মঞ্চে পৌঁছে দিলাম ওকে, মেঝের দাগগুলোর দিকে ফিরেও তাকালো না সে। উদ্বোধনী দৃশ্যের জন্যে ওকে দাঁড় করিয়ে দিলাম জায়গামতো, মশালের আলো ঠিক করে নিলাম। যদিও তার সৌন্দর্য্যে আমি অভ্যস্ত, কিন্তু এই মুহূর্তে যেনো গলায় জমে যাচ্ছে শব্দ ওর রূপের ছটায়।

লিনেন পর্দার ওপাশে আড়ালে থাকল লসট্রিস। দর্শকের সামনে এসে দাঁড়ালাম আমি। এবারে আর উন্নাসিক কোনো কণ্ঠস্বর ব্যঙ্গ করলো না। উপস্থিত প্রত্যেকে, মহান ফারাও থেকে শুরু করে সবচেয়ে নিচু বর্ণের লোকটি পর্যন্ত আচ্ছন্ন হয়ে আছে আমার কথার জাদুতে। ধীর লয়ের গদ্যে আমি বর্ণনা করতে লাগলাম ভাইয়ের মৃত্যুতে আইসিস এবং তার বোন নেফথিস-এর শোকের কথা।

আমার বলা শেষ হতে একপাশে সরিয়ে নেওয়া হলো পর্দা, শোকাবহ আইসিস এর অনিন্দ্য সৌন্দর্য্যে দম আঁকালো জনতা। প্রথম অঙ্কের রক্ত আর হত্যাদর্শনের পর এই তার এই উপস্থিতি আরো অসাধারণ হয়ে উঠল।

মৃত ভাইয়ের শোকে আচ্ছন্ন আইসিস গাইতে লাগল, মন্দিরের বিষণ্ণ দেওয়াল যেনো শিউরে উঠলো সে সুরে। তার নড়াচড়ার সাথে সাথে মশালের আলোয় সরে গিয়ে পড়ল সেই সুন্দর মুখশ্রীতে, মাথার চকচকে মুকুট যেনো সোনা ছড়াতে লাগল।

পুরোটা সময় ফারাও-কে লক্ষ্য করলাম আমি । একবারের জন্যে তার চোখ সরলো লসট্রিসের উপর থেকে, সহানুভূতিতে আর্দ্র-হৃদয়, আইসিসের সঙ্গে নিঃশব্দে গাইতে লাগলেন তিনি।

ব্যথাতুর বিবশতা আমাকে পীড়ণ করছে
আমার হৃদয় এক আহত হরিণী
দুঃখের হিংস্র থাবায় ক্ষত-বিক্ষত—

শোকে আচ্ছন্ন আইসিসের গানে সঙ্গী হলেন মহান ফারাও এবং তার সভাসদ।

মধু-রাজ্যে আর মিষ্টি নেই,
গন্ধ নেই কোনো মরুভূমির ফুলে।
আমার হৃদয় আজ শূন্য মন্দির এক,
ভালোবাসার দেবতা ছেড়ে গেছে যাকে।

সামনের সারিতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ফারাও-এর পত্নীদের কয়েকজন, কেউ লক্ষ্যও করলো না সেদিকে।

হাসি-মুখে মৃত্যুর চোখে চোখে তাকিয়েছি আমি।

তার পিছু পিছু যেতে কোনো দ্বিধা নেই আর,
যদি এমন করে পৌঁছে যাই তাঁর পানে–

এতক্ষণে কেবল রাজার পত্নীই নয়, সমস্ত মেয়েরা কাঁদতে লাগল, বহু পুরুষের চোখেও দেখলাম অশ্রু। লসট্রিসের কণ্ঠস্বর, তার রূপ হৃদয় ছুঁয়ে গেছে সবার। একজন দেবতার পক্ষে সাধারণ মানুষের মতো আবেগ প্রদর্শন করা অসম্ভব বলে মনে হতে পারে, কিন্তু আমাদের মহান ফারাও-এর প্রসাধন-চর্চিত গাল বেয়ে নামলো পানির ধারা; কাজল দেওয়া, পেঁচার মতো চোখে আমার মিসট্রেসের দিকে চেয়ে রইলেন তিনি।

নেফথিস তার বোনের সঙ্গে যোগ দিলো দ্বৈত-সংগীতে। হাতে হাত রেখে দুই দেবী মিলে খুঁজে ফিরতে লাগলো তাদের প্রাণপ্রিয় ভাইয়ের দেহাবশেষ।

অবশ্যই, টড-এর সত্যিকারের দেহখণ্ডগুলো মঞ্চে রাখি নি আমি। বিরতির সময়ে, আমার নির্দেশে হতভাগ্য টড-এর দেহাবশেষ নিয়ে যাওয়া হয়েছে শব-প্রস্তুতকারীদের কাছে। নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করবো আমি ওর শেষকৃত্যে। তার হত্যায় আমার ভূমিকার এতে করে যদি কিছুও লাঘব হয়। যদিও ফারাও-এর হাতে রয়েছে শেষ দেহখণ্ডটি, আমার বিশ্বাস, অন্তত একবারের জন্যে হলেও নিজেদের নিয়মের অন্যথা করে অঙ্গবিহীন টড-এর আত্মাকে অজানা রাজ্যে যেতে দেবেন দেবতারা; হয়তো আমাকে অতটা খারাপ চোখে দেখবে না সে সেখানে। বন্ধু থাকা জরুরি, তা সে এখানে, এই পৃথিবীতে হোক বা অজানা রাজ্যে।

দেবতা ওসিরিসের দেহ হিসেবে নেক্রোপলিসের শিল্পীদের দিয়ে চমৎকার একটা নকল তৈরি করেছিলাম আমি। তেরোটি খণ্ডে কাটা হয়েছে সেই দেহ, ঠিক শিশুদের খেলনার মতো জোড়া লাগানো সম্ভব।

প্রতিটি খণ্ড কুড়িয়ে নেওয়ার সময় গেয়ে চললো দুই বোন। দুই হাত, দুই পা, তার দেহকাণ্ড, শেষমেষ তার পবিত্র মস্তক।

এ এমন চোখ, যেনো স্বর্গের মিটমিটে তারা,
চিরকাল জ্বলে যাবে।
মৃত্যুর শক্তি নেই একে ম্লান করে,
শবাধারের নেই স্থান
একে ধরে।

শেষপর্যন্ত দুই দেবী মিলে জড় করে ফেললো ওসিরিসের সম্পূর্ণ দেহ, কেবল সেই হারিয়ে যাওয়া তালিসমান ছাড়া। তারা আলোচনা করে চললো কিভাবে ফিরে পাবে সেটা।

যে কোনো মঞ্চ-নাটক জনপ্রিয় করে তোলার অনুষঙ্গ হিসেবে একটা সুযোগ ছিলো এটা আমার। আমাদের সবার ভেতরেই বাস করে অতৃপ্ত কামনা, কাব্য বা নাটক রচনার সময়ে এ কথাটা মাথায় থাকলে অমরত্ব পেতে পারেন একজন কবি বা নাট্যকার। সাধারণ জনতার মনে দাগ কাটতে হলে এর বিকল্প নেই।

একটি মাত্র উপায় আছে আমাদের প্রিয় ভ্রাতাকে জগতে ফিরিয়ে আনার। কথাকটা দেবী নেফথিস-এর মুখ দিয়ে বলিয়েছিলাম আমি। তার খণ্ড-বিখণ্ড দেহের সাথে আমাদের কাউকেই পালন করতে হবে সৃষ্টির খেলা, একমাত্র এতে করেই জীবন ফিরে পাবে সে।

এই পরামর্শে আগ্রহে সামনে ঝুঁকে বসে দর্শক। সবচেয়ে শিল্পরসবোধহীন যিনি, এমনকি শব-বলাকারী পর্যন্ত উদ্দিপ্ত হবে এমন অনুষঙ্গে।

কিংবদন্তির এই ওসিরিস-পুনরুত্থান কেমন করে দেখাবো–এই নিয়ে বহু বিন্দ্ৰি রজনী কেটেছে আমার। আমাকে অবাক করে দিয়ে লসট্রিস সম্মত হয়েছিলো পুরো অভিনয়টুকু করে দেখাতে। এমনকি, দুষ্ট হেসে এমনও বলেছিল, এতে করে মূল্যবান কিছু জিনিস শেখা হবে তার। আমি জানি না, সে কি মজা করছিল নাকি সত্যিই করতো কাজটা; কিন্তু এতো বড় ঝুঁকি তো আর নিতে পারি না! তার পারিবারিক মর্যাদা হেলাফেলা করার মতো কোনো ব্যাপার নয়।

তো, আমার ইশারায় পর্দা টানা হলো, তড়িৎ মঞ্চ ত্যাগ করলো লসট্রিস। বন্দরের কাছেই, এক মধুকুঞ্জের উঁচু দরের রূপোপজীবনী তার জায়গা নিল। বহু মেয়ের মধ্য থেকে বেছে তাকে নিয়েছি আমি, অসাধারণ একটা শরীর আছে এর–আমার মিসট্রেসের সঙ্গে বেশ মেলে। অবশ্যই, মুখশ্রীতে আমার মিসট্রেসের ধারে-কাছেও নয় সে, তবে ওর মতো সুন্দরী আর কে-ই বা আছে?

প্রতিস্থাপিত দেবী তার অবস্থানে যেতেই, মঞ্চের পেছনের মশালগুলো জ্বলে উঠল, যেনো পর্দায় তার ছায়া পড়ে। ইঙ্গিতপূর্ণ ভঙিতে কাপড় ছাড়তে লাগলো সে। আধো অন্ধকার, আধো ছায়ায় তার এই আন্দোলনে হর্ষধ্বনিতে মুখর হলো পুরুষেরা। এই উল্লাসের কারণেই কিনা কে জানে, আরো বেশি আবেদনময়ী হয়ে উঠলো মেয়েটার অভিনয়।

এবারে নাটকের এমন অংশে এসে পড়েছি আমরা, যা নিয়ে বেশ ভাবনা-চিন্তা করতে হয়েছে আমাকে। সন্তান জন্মের ঘটনা কেমন করে প্রদর্শন করতে পারি আমি? মাত্রই ওসিরিসকে অঙ্গ-হারা হতে দেখেছি আমরা। শেষ পর্যন্ত সেই পুরোনো মঞ্চ নাটকের সাহায্য নিতে হয়েছিলো আমাকে, দেব-দেবীদের অত্যাশ্চর্য ক্ষমতার দোহাই দিয়ে।

ভেতর থেকে কথা বলে উঠলো লসট্রিস; তার দেহের ছায়া পড়ল ওসিরিসের মমি করা দেহে, ইঙ্গিত করতে লাগলো সেটা। প্রিয় ভ্রাতা, আমাদের পিতামহ, আমন রার দেওয়া অত্যাশ্চর্য ক্ষমতার বলে তোমাকে আমি ফিরিয়ে দিচ্ছি সেই অংশ, যা থেকে নির্মম সেথ তোমাকে বঞ্চিত করেছিল।

মন্দিরের ছাদে সংযুক্ত একটা পুলির সাহায্যে লিনেনের সুতায় তুলে ধরা সম্ভব, এমন একটা বস্তু রেখেছিলাম ওসিরিসের দেহে। আইসিসের কথায়, স্বর্গীয় দেবতার জম্ম থেকে উঠে দাঁড়াল কাঠের জননাঙ্গ; প্রায় আমার হাতের সমান দীর্ঘ সেটা, সম্পূর্ণ উদ্ধত! মুগ্ধতায় গুঙ্গিয়ে উঠলো জনতা।

আইসিস আদর করতেই সুতার টানে নড়ালাম আমি ওটাকে। দর্শক আরো আনন্দ পেলো যখন দেবতার শায়িত শরীরে চড়ে বসল আইসিস। লসট্রিসের বদলী মেয়েটা অসধারণ কাজ দেখাল এবারে, শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেলো ব্যাপারটাকে। শিষ দিয়ে, হর্ষধ্বনির মাধ্যমে তাকে উৎসাহ যোগাল দর্শক। পরামর্শের বন্যা ধেয়ে যাচ্ছে তার দিকে।

পুলকের চরম শিখরে পৌঁছে গেছে আইসিস, ঠিক তখনই নিভে গেলো সমস্ত আলো । ঘুটঘুঁটে অন্ধকার এখন মন্দির জুড়ে। এই সুযোগে লসট্রিস চলে এলো মঞ্চে, আবার যখন জ্বলল মশাল, এক নবজাতককে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেলো আইসিসকে। মাত্র কয়েকদিন আগেই প্রাসাদের একজন রাধুনি সন্তান জন্ম দিয়েছে, তার কাছ থেকে একে ধার নিয়েছি আমি।

আমি তোমাদের দিলাম ওসিরিসের নবজাতক সন্তান, অজানা রাজ্যের দেবতা যিনি; এবং আইসিস-এর সন্তান যিনি চন্দ্র-তারার দেবী। নবজাতক ছেলেকে উঁচু করে ধরলো লসট্রিস, সামনের জনসমুদ্র দেখেই কিনা কে জানে, ভীষণ কান্না জুড়ে দিলো বাচ্চাটা!

তার চিৎকার ছাপিয়ে বলে চললো লসট্রিস, তরুণ দেবতা হোরাসকে স্বাগত জানাও! যিনি আকাশ, বাতাস আর স্বর্গের বাজপাখির দেবতা! দর্শকদের মধ্যে অর্ধেকই হোরাসের উপাসক, তাঁর প্রতি তাদের আনুগত্য সীমাহীন। গর্জনে ফেটে পড়ে পায়ের উপর দাঁড়িয়ে গেলো তারা। আমাকে আনন্দের বন্যায় ভাসিয়ে, আর তরুণ দেবতার আতঙ্কের মধ্য দিয়ে শেষ হলো দ্বিতীয় অঙ্ক। পরে জানা গেছে, ভয়ে কাপড় ভিজিয়ে ফেলেছিলো বেচারা শিশু-হোরাস!

*

হোরাসের বাল্যকাল এবং যৌবনে পদার্পণের বর্ণনা আবৃত্তির মাধ্যমে শুরু হলে কাব্যনাট্যের শেষ অঙ্ক। তার উপরে অর্পিত পবিত্র দায়িত্বের কথা বললাম আমি নেপথ্যে, ঠিক তখনই পর্দা সরে যেতে মঞ্চে দেখা গেলো আইসিসকে।

দাসীদের সঙ্গী করে নীল নদে স্নান করছেন দেবী। ভেজা কাপড়টা সেঁটে আছে তার শরীরে, ত্বকের হলদেটে আভা ফুটে বেরুচ্ছে অবয়ব থেকে। কুমারী স্তনের সুডৌল আকৃতির কুঁড়োয় উদ্ধত গোলাপী বৃন্ত।

হোরাসরূপী ট্যানাস প্রবেশ করলো মঞ্চে। চকচকে বর্ম-সজ্জিত তার অবয়বে যোদ্ধার গর্ব, লসট্রিসের অসাধারণ সৌন্দর্য্যের যোগ্য সঙ্গী। জল যুদ্ধে তার অর্জিত বহু সম্মান এবং সাম্প্রতিক রাজকীয় জলযান উদ্ধারের ঘটনা দেশবাসীর মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে গেছে তাকে। আজ, এই মুহূর্তে, ট্যানাস পুরো মিশরের প্রিয়তম ব্যক্তি। সে মুখ খোলার আগেই হর্ষধ্বনিতে মুখর হলো জনতা, এতো দীর্ঘ সময় ধরে চললো সেই উচ্ছ্বাস, অভিনয় থামিয়ে নীরবে অপেক্ষা করতে লাগলো কুশীলবেরা।

চারিদিকে যখন এই উল্লাস-উচ্ছ্বাস, দর্শক সারিতে উপবিষ্ট কিছু মুখের ভাবাবেগ দেখলাম মনোযাগ দিয়ে। মিশরের সাহসী সিংহ, নেমবেট তাঁর দাড়ির আড়ালে বিড়বিড় করে অভিশাপ দিচ্ছেন, কোনো চেষ্টা নেই ভাবাবেগ গোপন করার। স্মিত হেসে সামান্য মাথা ঝাঁকালেন ফারাও, তার পেছনে বসা সভাসদদের উৎসাহ তাতে বাধ্য হয়ে চড়ল। আমার মনিব, ইনটেফ, কখনই বাতাসের বিপরীতে যাওয়ার লোক নন, তার সবচেয়ে মসৃণ হাসি হাসলেন তিনি, ফারাও-এর অনুকরণে মাথা ঝাঁকালেন। কিন্তু তার চোখের খুনে দৃষ্টি আমার নজর এড়াল না।

কোলাহল কমে আসতে মুখ খুলল ট্যানাস, কিন্তু যতবারই বাক্যে বিরতি পড়ছিল, তুমুল হট্টগোলে ফেটে পড়ছিল জনতা। অবশেষে আইসিস তার সুমিষ্ট গলায় গাইতে শুরু করতে নীরবতা নেমে এলো মন্দির জুড়ে।

তোমার পিতার সুতীব্র যন্ত্রণা,
দুঃসহ যে কালো মেঘ ভেসে আছে আমাদের মস্তকের উপরে
এর সবই ফিরিয়ে দিতে হবে।

পদ্যে আইসিস সতর্ক করে দিচ্ছেন তার মহান পুত্রকে, হাত উঁচিয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন–

সেথ্‌-এর অভিশাপ আমাদের ঘিরে আছে, শুধু তুমি পারো তা ভেঙে ফেলতে। খুঁজে বের করো ওই পাষণ্ডকে; তার ঔদ্ধত্য আর হিংস্রতায় তুমি চিনবে তাঁকে। তাকে জানো, আঘাত করো। শৃঙ্খলিত করো, বেঁধে ফেলো তোমার ইচ্ছাশক্তি দিয়ে; ওই বর্বরের হাত থেকে মুক্ত করো সকল দেবতা আর মানবকে।

গাইতে গাইতে মঞ্চ ত্যাগ করলেন দেবী, তার পুত্রকে রখে গেলেন অজানা যুদ্ধে। বিপুল আগ্রহের সাথে পরবর্তি ঘটনাবলির জন্যে অপেক্ষা করে আছে দর্শক।

উন্মত্ত সেথ প্রবেশ করলো মঞ্চে; ভালো এবং মন্দ, সৌন্দৰ্য্য এবং পঙ্কিলতা, সম্মান এবং অসম্মানের মধ্যে চলে আসা চিরকালীন লড়াই শুরু হবে এবার। দর্শক অধীর আগ্রহে তৈরি এর জন্যে। স্বয়ংক্রিয় ঘৃণার প্রকাশে জনতা স্বাগত জানাল তাঁকে। মঞ্চে, আস্ফালনরত রাসফার হিংস্র মুখভঙ্গি করলো দর্শকের উদ্দেশ্যে; উরুসন্ধি চেপে ধরে কোমড় নাচিয়ে অশ্লীল ইশারা করলো দর্শকের দিকে, ক্ষেপে আগুন হলো জনতা।

মেরো ফ্যালো ওকে, হোরাস! হুঙ্কার দিয়ে উঠে তারা। কুৎসিত মুখটা থেতলে দাও!।

সেথ্‌ নেচে চলে তাদের সম্মুখে।

মহান ওসিরিসের খুনীকে মেরে ফ্যালো! ঘৃণায়, আক্রোশে উন্মাদ হয়ে গেছে দর্শক।

ওর মুখটা থেতলে দাও!

নাড়ি-ভূড়ি ছিঁড়ে বের করো!

মাথাটা ফেলে দাও! চিৎকার করে তারা।

মারো ওকে, মারো!

শেষমেষ সেথ যেনো প্রথমবারের মতো দেখতে পেলো তার ভ্রাতুস্পুত্রকে। কালো দাঁতের মাঝখান থেকে জিহ্বা বের করে ভেঙচি কাটল, রুপালি লালা ঝরে পড়ছে মুখের দুই কোনো বেয়ে। কখনও ভাবি নি, নিজেকে আরো বেশি বমিজাগানিয়া প্রমাণ করতে পারে রাসফার, কিন্তু আজ আমার সেই ভুল ভাঙল।

এই পুঁচকিটা কে রে? জানতে চায় সে। পুরো একটা দুর্গন্ধময় শ্বাস ছাড়ে ট্যানাসের মুখের উপর। সম্পূর্ন অপ্রস্তুত ছিলো ট্যানাস এটার জন্যে, নিজের অজান্তেই এক পা পেছাল সে; র‍্যাসফারের মদমত্ত পেটের বিশ্রী গন্ধ সহ্য করা মুশকিল।

দ্রুতই নিজেকে ফিরে পেলো ট্যানাস। নিজের প্রথম বাক্য বলল। আমি হোরাস, ওসিরিসের পুত্র।

অট্টহাসিতে ফেটে পরে সেথ। কি চাও হে তুমি? মরা দেবতার বাচ্চা ছেলে?

আমি প্রতিশোধ নিতে এসেছি। আমার বাবা, মৃত দেবতা ওসিরিসের মৃত্যুর বদলা চাই।

তাহলে আর খুঁজে লাভ নেই, চিৎকার করে উঠে সেথ। আমিই সেথ, তারা খেকো, পৃথিবী ধ্বংসকারী।

নিজেদের তলোয়ার খাপমুক্ত করে দুই দেবতা ঝাঁপিয়ে পরে পরস্পরের উদ্দেশ্যে। মধ্য-মঞ্চে ঝনঝন শব্দে মিলিত হয় তাদের ধারালো ফলা। আহত হওয়ার আশঙ্কায় তামার বদলে কাঠের তলোয়ার ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিলো আমার, কিন্তু তাদের দুইজনের কেউই রাজী হয় নি। র‍্যাসফারের আবেদনে সাড়া দিয়েছেন ইনটেফ। তিনি আদেশ জারি করেছেন, সবাই যেনো আসল অস্ত্র ব্যবহার করে। বাধ্য হয়ে আমাকে তা মেনে নিতে হয়েছে। অবশ্য, এতে করে বাস্তবতা এসেছে দৃশ্যে; আর এখন, তলোয়ারের ফলা দিয়ে একে অন্যেরটা আটকে রেখে চোখে চোখে চেয়ে আছে দুই অভিনেতা।

দারুন বৈপরীত্য তাদের অবয়বে, এতটা ভিন্ন, নাটকের মূল ভাবই যেনো প্রকাশ করে চলেছে। ভালো এবং মন্দের চিরকালীন যুদ্ধ এটা। ট্যানাস লম্বা, সুদর্শন, সভ্য। সেথ দুর্ধর্ষ, ভারী-বাকা পায়ের বর্বর। একদমই দৃশ্যমান তাদের বৈপরীত্য। দর্শকের মনোভাব এই মুহূর্তে যুদ্ধংদেহী।

একই সঙ্গে পরস্পরকে পিছনে ঠেলে দেয় তারা, আবার মিলিত হয়। বাতাসে কাটছে ফলা, মাথা নিচু করে, কোপ মেরে পাশ কাটাচ্ছে পরস্পরের আঘাত। ওরা দুজনেই ফারাও-এর সেনাবাহিনীর চৌকষতম তলোয়ারবাজ যোদ্ধা।

মশালের আলোয় পাক খেয়ে চমকাতে লাগলো তাদের অস্ত্র, নীল নদের অস্থির উপরিতল থেকে ধেয়ে আসা বাতাসের নাচনে অপার্থিব মনে হতে লাগলো সেটা। দ্বৈত-যুদ্ধের সেই শব্দ যেনো মন্দিরের শূন্য, বিষণ্ণ ছাতে ঝটপট ডানা ঝাঁপটানো পাখির আওয়াজ, কিন্তু যখন মিলিত হলো তাদের তলোয়ার সেটা প্রচণ্ড, যেনো হাতুরি পিটছে কেউ।

দর্শকের কাছে যেটা মনে হচ্ছে সত্যিকারের মরণপণ যুদ্ধ, সেটা আসলে সতর্কভাবে অনুশীলন করা একটা নাটক বৈ আর কিছু নয়। দুজনেই জানে, ঠিক কিভাবে কতটুকু আঘাত করতে হবে তাদেরকে। অসাধারণ দুইজন যোদ্ধার এক জীবনের পারদর্শিতার কারণেই হয়তো, দারুন সহজ মনে হতে লাগলো তাদের আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ।

যখন সেথ তলোয়ার চালাল, ঠিক শেষ মুহূর্তে সরে গেলো ট্যানাস, তার বর্মে দাগ কেটে গেলো তলোয়ারের ফলা। আর যখন হোরাস আক্রমণ শানালো, তার তলোয়ারের মতো নিচু দিয়ে উড়ে গেলো যে ক গাছি চুল হারালো সেথ্‌ তার মাথা থেকে। মন্দিরের নাচিয়েদের মতোই জটিল এবং অভিজাত তাদের পায়ের কাজ, বাজপাখির মতো ক্ষিপ্র, শিকারী চিতার মতো খুনে।

দর্শকের মতো আমিও বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম সেই লড়াইয়ে। এরপরেই, সম্ভবত কোনো গভীর অতিন্দ্রিয় আমাকে সতর্ক করে দিল, হতে পারে, কোনো দেবতারই কাজ সেটা; কে বলতে পারে? যাই হোক, কেননা যেনো যুদ্ধ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনের সারিতে উপবিষ্ট ইনটেফের দিকে চাইলাম আমি।

এবারেও, জানি না এটা কি অতিন্দ্রিক কোনো ক্রিয়া নাকি ইনটে সম্বন্ধে আমার গভীর জ্ঞানের কারণে, নাকি ট্যানাসকে রক্ষাকারী দেবতার ইশারায়, চিন্তাটা ঢুকে গেলো আমার মাথায়। হয়তো তিনটি ব্যপার মিলে যাওয়ার কারণেই, সাথে সাথেই পুরো ঘটনা দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে গেলো আমার কাছে। ইনটেকের ওই নেকড়ে-হাসির একটা মাত্র অর্থ আছে।

এখন আমি জানি, কেন সেথ্‌-এর চরিত্রে র‍্যাসফারকে নিয়েছেন তিনি। এখন আমি জানি, কেন হোরাসের ভূমিকা থেকে ট্যানাসকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো চেষ্টা তিনি করেন নি। যখন তিনি জানতেন লসট্রিসের সাথে ওর সম্পর্কের কথা। বুঝলাম, কেননা সত্যিকারের অস্ত্র ব্যবহারে তিনি উৎসাহ দিয়েছেন। জানি, কেন এই মুহূর্তে হাসছেন ইনটেফ। আজকের সন্ধার সত্যিকারের নাটক এখনও শেষ হয় নি। আরো ঘটবে। এই অঙ্ক শেষ হওয়ার আগেই কাজ সমাধা করে ফেলবে র‍্যাসফার।

ট্যানাস! সামনে এগিয়ে চিৎকার করে ডাকলাম। সাবধান! এটা একটা ফাঁদ! ওরা জনতার হুঙ্কারে তলিয়ে গেলো আমার কথা। এক পা এগোতেই পেছন থেকে একটা হাত জড়িয়ে ধরলো আমাকে। বহু চেষ্টা করেও ছাড়া পেলাম না, র‍্যাসফারের বর্বর সহযোগীরা টেনে সরিয়ে নিয়ে চললো আমাকে। ঠিক এই ধরনের কাজের জন্যেই রাখা হয়েছে ওদের, যেনো কেউ সতর্ক করতে না পারে ট্যানাসকে।

হোরাস, শক্তি দাও! ওদের বাধা দেওয়ার বদলে পেছনে হেলে পড়লাম, যেদিকে টানা হচ্ছিল আমাকে। এক মুহূর্তের জন্যে ভারসাম্য হারাল তারা, এক ঝটকায় মুক্ত হলাম আমি। আবার ধরে ফেলার আগেই মঞ্চের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম দৌড়ে।

হোরাস, গলায় জোর দাও! প্রার্থনা করে চলেছি; শেষমেষ সবটুকু শ্বাস নিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, ট্যানাস, সাবধান! ও তোমাকে মেরে ফেলতে চাইছে।

এবারে জনতার চিৎকার ছাপিয়ে আমার কণ্ঠস্বর পৌঁছুল ট্যানাসের কানে। ওর চোখের কুঞ্চন এবং ঘারের শক্ত হয়ে যাওয়া নজর এড়ালো না আমার। রাসফারও শুনতে পেয়েছে আমার কথা। সাথে সাথেই, অনুশীলনের পদক্ষেপ ভেঙে সামনে বাড়ল সে। নিচ থেকে উপরে ধেয়ে যাওয়া তার জোরালো কোপে বাহু সমান উচ্চতায় থরথর করে কাঁপতে লাগলো ট্যানাসের তলোয়ার ।

অবাক করে না দিতে পারলে কখনই এই ফাঁক পেতো না সে ট্যানাসের প্রতিরক্ষায়। বিশাল দুই কাঁধের শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল র‍্যাসফার এবারে। ট্যানাসের মাথার আচ্ছাদনের এক ইঞ্চি মতো নিচে, ডান চোখের বরাবর তলোয়ার শানাল সে। চোখ গেলে দিয়ে, করোটি এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয় এমন আঘাত।

কিন্তু আমার চিৎকার এক মুহূর্তের সুযোগ এনে দিয়েছিল ট্যানাসকে, দারুনভাবে রক্ষণ-কৌশল ব্যবহার করলো সে। তলোয়ারের হাতল দিয়ে ঠেকিয়ে রাসফারের কবজিতে প্রতিআক্রমণ করলো। তলোয়ার ধারী হাত একটু নেমে গেলো র‍্যাসফারের, সেই মুহূর্তে তার চিবুক এবং মুখে ঘুষি হাঁকালো ট্যানাস। এতে করে অবশ্য মূল আঘাত পুরোপুরি ঠেকানো গেলো না। যে আঘাতে তার চোখ গেলে গিয়ে পাকা তরমুজের মতো ফেটে যাওয়ার কথা ছিলো করোটি, সেটা কেবল তার জ কেঁটে হাড় পর্যন্ত গভীরে পৌঁছে গেলো।

সাথে সাথেই রক্তের একটা স্রোত এসে ঢেকে ফেলল ট্যানাসের মুখ। ডান চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছে না সে। পরে যেতেই র‍্যাসফার চড়াও হলো তার উপর। মুক্ত হাতে চোখের রক্ত পরিষ্কার করে দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাওয়ার প্রয়াস পেলো ট্যানাস। নিজেকে সে সম্ভবত আর রক্ষা করতে পারছে না; প্রাসাদের রক্ষীরা আমাকে ধরে না রাখলে কোমরের ছুরি বের করে ঝাঁপিয়ে পড়তাম ওর সাহায্যে।

প্ৰথম খুনে আক্রমণটা সামলে নিতে পারল ট্যানাস। আরো দুটো আঘাত ধারণ করলো শরীরে, বাম উরুর উপরে একটা, অস্ত্রধারী হাতের পেশিতে আরো একটা ছোট্ট কাটা। পেছনে সরে, মাথা নিচু করে ঠেকিয়ে চললো সে। রাসফার কোনো সুযোগ দিচ্ছে না, ভারসাম্য বা সম্পূর্ণ দৃষ্টি শক্তি কোনোটাই ফিরে পায় নি ট্যানাস এখনও। হাপরের মতো উঠানামা করছে র‍্যাসফারের ঘাম-চর্চিত বুক, মশালের আলোয় চকচক করছে, কিন্তু তার গতি বা আক্রমণের প্রচণ্ডতা এতটুকু কমে নি।

আমি যদিও তলোয়ারবাজ নই, শিল্পের বোদ্ধা আমি। বহুবার অনুশীলনে দেখতে দেখতে র‍্যাসফারে ভঙ্গিমা জানা হয়ে গেছে আমার। তার আক্রমণ ভঙ্গির নাম খামসিন, অর্থাৎ মরুর বাতাস। তার বিশাল দেহ এবং শক্তিমত্তার সাথে দারুনভাবে খাপ খায় এই ভঙ্গিমা। বহু শতবার তাকে এটা অনুশীলন করতে দেখেছি আমি, এখন তার পায়ের নড়াচড়া দেখে বুঝতে পারলাম–প্রস্তুতি নিচ্ছে সেটার জন্যে। শেষ এক আঘাতে সবকিছুর সমাপ্তি টানতে চাইছে ।

প্রহরীদের সাথে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে চেঁচিয়ে উঠলাম ট্যানাসের উদ্দেশ্যে। খামসিন! তৈরি থাকো! জনতার গর্জনে আমার চিৎকার চাপা পড়ে গেলো বলে ভেবেছিলাম, ট্যানাসও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। পরে সে অবশ্য আমাকে বলেছিল, আমার কথা শুনেছিল সে; দৃষ্টির বাধা সত্ত্বেও আমার সতর্কবাণী বাঁচিয়েছিল তাকে।

এক ধাপ পেছালো র‍্যাসফার, খামসিন-এর ধ্রুপদী ভঙিমা, এক মুহূর্তের জন্যে ঢিল দিয়ে প্রতিপক্ষের উপর চড়াও হওয়া। শরীরের ভার বদল করে বাঁ পা সামনে চলে এলো। সমস্ত ভরবেগ এবং শক্তি ডান পায়ের উপর চাপিয়ে আক্রমণে গেলো র‍্যাসফার, যেনো কোনো দানবপাখি উড়বার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুই পা যখন মাটি ছুঁল, তার তলোয়ারের চোখা মাথা ট্যানাসের গলা বরাবর ধরা। অবর্ণনীয় শক্তিমত্তার বহিঃপ্রকাশ ছিলো সেটা। কোনো কিছুই পারবে না একে ঠেকিয়ে দিতে কেবল একটি বিশেষ দক্ষতা ছাড়া বন্ধ-ঘাত।

ঠিক যখন আঘাত করবার প্রাক্কালে রয়েছে র‍্যাসফার, সমান শক্তির বিচ্ছুরণ দেখিয়ে সামনে বাড়ল ট্যানাস। ছেড়ে দেওয়া তীরের মতোই প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে ছুটে গেলো সে। শূন্যে, র‍্যাসফারের ফলার সাথে সংঘর্ষ ঘটল ট্যানাসেরটার, ওটাকে নামিয়ে আনতে সক্ষম হলো সে; হাতলের কাছে এসে জমে গেলো সেই মরণ-আঘাত । নিখুঁত একটা বন্ধ-ঘাত।

দুই যোদ্ধার ভর এবং গতি ন্যস্ত হলো রাসফারের মুঠোয় ধরা তলোয়ারের ফলায়। আঘাতের প্রাবল্য সহ্য করতে পারল না সেটা, দুইভাগ হয়ে গেলো। বুকে বুকে সেঁটে আছে এখন ওরা দুজন। যদিও ট্যানাসের অস্ত্র এখনও অক্ষত, সেটা ব্যবহার করতে পারছে না সে। তার অস্ত্রধারী হাত রাসফারের দেহের পেছনে সেঁটে আছে, আটকে রেখেছে দানবটাকে শরীরের সাথে।

মিশরীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যেক সদস্যের দক্ষতা আছে কুস্তিতে। পরস্পরকে ঝাঁপটে ধরে এখন মঞ্চে ঘুরছে দুই মল্লযোদ্ধা। চোখে চোখে তাকিয়ে, মাথার আচ্ছদনের আঘাতে আঘাতে, পায়ের গোড়ালির প্যাঁচে ফেলে দিতে চাইছে পরস্পরকে। শক্তি আর প্রতিজ্ঞায় সমানে সমান।

দর্শক বেশ আগেই টের পেয়ে গেছে, কোনো ভুয়া-লড়াই নয় এটা, এতে পরাজয় মানে মৃত্যু। ভেবেছিলাম আজকে সন্ধার মতো রক্ত-তৃষ্ণা মিটে গেছে তাদের, কিন্তু তা সত্যি নয়। আরো, আরো রক্তের জন্যে চিৎকার করছে তারা।

শেষপর্যন্ত ট্যানাসের বাহুপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করে ফেলল র‍্যাসফার। ভাঙা তলোয়ারের ডগা দিয়ে ট্যানাসের আহত ভুডুতে আক্রমণ শানালো। মাথা সরিয়ে নিয়ে ওটা এড়াল ট্যানাস। শিকারের চতুস্পার্শ্বে প্যাঁচ ছাড়ানো অজগরের মতো র‍্যাসফারের বুকে পেঁচিয়ে ধরলো সে। এতে প্রচণ্ড ছিলো সেই বেষ্টনী, র‍্যাসফারের অবয়ব যেনো ফুলে-ফেঁপে উঠল, রক্ত জমা হতে লাগলো মুখে। বুকের বাতাস বেরিয়ে যাওয়ায় হাঁস ফস করতে লাগলো সে। দৃশ্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে র‍্যাসফার। প্রচণ্ড চাপে ফেটে গেছে র‍্যাসফারের পিঠের একটা ফোঁড়া, পুঁজ গড়িয়ে এসে জমা হচ্ছে তার কোমরের কাছে।

দম বন্ধ করা বেষ্টনীর ভেতরে ব্যথায় গুঙিয়ে উঠলো র‍্যাসফার। আরো সেঁটে ধরলো ট্যানাস। কাঁধ একটু নিচু করে প্রতিপক্ষকে গোড়ালির উপর নামতে বাধ্য করলো সে। ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে দানব, পেছাতে শুরু করেছে। বিশাল একটা থামের দিকে চলেছে দুই যোদ্ধা। তলোয়ার আড়াআড়ি রেখে র‍্যাসফারকে বিশাল সেই স্তম্ভের সাথে ঠেসে ধরলো ট্যানাস। প্রচণ্ড শব্দে গুঙিয়ে উঠে দুই হাত ছড়িয়ে পরে র‍্যাসফারের, ভাঙা অস্ত্রটা হাত থেকে মাটিতে পরে পাথরের মেঝেতে শব্দ তুলে সরে যায়।

হাঁটু ভেঙে নেতিয়ে পড়ে র‍্যাসফার, ট্যানাসের আলিঙ্গনে। কোমর বাঁকিয়ে মাথার উপর দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে ট্যানাস তাকে। প্রচণড শব্দে মাটিতে আছড়ে পরে সে। ঠিক আগুনে পোড়া পলকা কাঠির মতোই মটমট শব্দে ভাঙতে শুনলাম আমি রাসফারের কয়েকটি বুকের হাড়। মরুর তরমুজের মতো মাথাটা পাথরের মেঝেতে শব্দ করে বাড়ি খায়।

যন্ত্রণায় কাঁদছে র‍্যাসফার । হাত তুলবার শক্তিও অবশিষ্ট নেই। যুদ্ধের উন্মত্ততায়, দর্শকের একটানা হুঙ্কারে ট্যানাসও পশু হয়ে গেছে। ধরাশায়ী র‍্যাসফারের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাতে তলোয়ার উঁচু করলো সে। ভয়ঙ্কর সেই দৃশ্য। চোখের আঘাত রক্তের মুখোশে ঢেকে ফেলেছে তাকে, ঘাম এবং রক্ত ভিজিয়ে ফেলেছে বুকের লোম, কাপড়।

মারো! মেরে ফ্যালো শয়তানটাকে!

ট্যানাসের তলোয়ারের ডগা নিশানা করেছে র‍্যাসফারের বুকের মধ্যিখানে, এখনই নেমে আসবে ওটা, শেষ হবে জানোয়ারটার ভবলীলা। আমি মনে-প্রাণে চাইছিলাম, তাই করুক ট্যানাস। দেবতারা জানেন, কী ভীষণ ঘৃণা করি আমি তাকে। এই নির্মম দৈত্যটা খোঁজা করেছিলো আমাকে।

কিছুই হলো না। আমার বোঝা উচিত ছিলো, ট্যানাস কখনও আত্মসমর্পণকারী শত্রুকে মেরে ফেলবে না। ওর চোখের উন্মত্ততা ফিকে হয়ে এলো। মাথাটা একটু আঁকালো সে, যেনো বাস্তবে ফিরিয়ে আনল নিজেকে। এরপর, আঘাত করার বদলে র‍্যাসফারের বুকে একটু ছোঁয়ালো সে তলোয়ারের ডগা। র‍্যাসফারের বুকের লোমের অরন্যে এক বিন্দু রক্ত উজ্জ্বল হয়ে জ্বললো। আর তারপর, নাটকের বাক্য আবৃত্তি করতে লাগলো ট্যানাস।

এভাবেই নিজের ইচ্ছা শক্তিতে আমি বাধলাম তোকে, আলো থেকে নির্বাসন দিলাম। অন্ধকার জগতের আনাচে-কানাচে ঘুরে ফির তুই চিরকাল। যা কিছু মহৎ, যে মানুষরূপী দেবতা আছেন, তাদের কারো চেয়ে বেশি ক্ষমতা তোর থাকবে না। চোর এবং কাপুরুষ, প্রতারক এবং লম্পট, মিথ্যুক এবং খুনী, সমাধি-চোর আর ধর্ষাকামী, ছলনাময় এবং অবিশ্বস্তদের অধিকার থাকবে তোর হাতে। আজ থেকে, তুই মন্দের দেবতা। চলে যা এখান থেকে, হোরাস এবং তার পুনরুত্থিত পিতা, ওসিরিস-এর অভিশাপ তোর সঙ্গী হলো।

ব্ল্যাসফারের বুক থেকে অস্ত্র সরিয়ে নিয়ে একপাশে ফেলে দেয় ট্যানাস। পাথরের মেঝেতে ঝনঝন আওয়াজ তোলে সেটা। ছুটে গিয়ে আমাদের সৃষ্ট নীল নদের পানিতে হাঁটু গেড়ে বসে সে, এক আজলা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলে মুখের রক্ত। কোমরের কাপড় ছিঁড়ে বেঁধে ফেলে হাতের আঘাত।

আমাকে ছেড়ে র‍্যাসফারের দুই বর্বর সঙ্গী ছুটে গিয়ে উঠে বসতে সাহায্য করলো তাদের আহত মনিবকে। ওদের সাহায্যে টলোমলো করে পায়ের উপর দাঁড়াল র‍্যাসফার, কষ্ট করে শ্বাস টানছে, আহত জন্তুর মতো শব্দ করছে মুখ দিয়ে। আমার ধারণা, ভীষণভাবে আহত হয়েছে সে। মঞ্চ থেকে টেনে-হিঁচড়ে তাকে নিয়ে গেলো দুইজন, দর্শকের বিদ্রূপ-উপহাস ছুটে গেলো পিছুপিছু।

আমার মনিব, ইনটেফের মুখের ভাবাবেগে এই মুহূর্তে কোনো খাদ নেই। আমার লেশমাত্র সন্দেহও এবারে তিরোহিত হয়। এভাবেই ট্যানাসের উপর প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন তিনি সমগ্র জনতার সামনে তার মেয়ের সামনে; ওকে মেরে ফেলে শাস্তি দিতে চাইছিলেন লসট্রিসকে।

ইনটেফের হতাশা এবং অসন্তুষ্টি দারুন আনন্দের খোরাক যোগালো আমার মনে, র‍্যাসফারের জন্যে কী অপেক্ষা করছে ভেবে ভালো লাগছে। ট্যানাসের দেওয়া মারের চেয়েও বেশি কিছু দিতে চাইবেন ইনটেফ তাকে, এই ব্যর্থতার জন্যে-সন্দেহ কি! ব্যর্থ কারো জন্যে আমার মনিবের এতটুকু মায়া-দয়া নেই।

দ্বৈত-যুদ্ধের শ্রান্তিতে তখনও হাঁপাচ্ছিলো ট্যানাস, বড় করে শ্বাস টেনে মঞ্চের সম্মুখে এগুলো সে, কাব্যনাট্য শেষের ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জনতার মুখোমুখি হতেই নীরবতা নেমে এলো, রক্ত-ঘামে-রাগে আবৃত ট্যানাস এই মুহূর্তে দর্শনীয় ব্যক্তিত্ব।

দুই হাত মন্দিরের ছাতের দিকে তুলে জোরালো শব্দে বলে উঠে ট্যানাস, আমন রা, আমাকে কণ্ঠস্বর দাও! বলবার ক্ষমতা দাও! বক্তার চিরাচরিত রীতি এটা।

তাকে কণ্ঠস্বর দাও! বলুক ও! চেঁচিয়ে উঠে জনতা, সাম্প্রতিক দৃশ্যাবলিতে উন্মত্ত ।

ট্যানাস এক অদ্ভুত মানুষ, ঠিক যতোটা পারদর্শী অস্ত্রবাজীতে, ততটাই দক্ষতা তার আছে ভাষায়, পরিকল্পনায় । আমি জানি, সে হয়তো ঠিকই স্বীকার করবে বেশিরভাগ পরিকল্পনার বীজ তার মধ্যে বপন করেছে সেই তুচ্ছ দাস, টাইটা। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই, তার ভঙ্গিমা অপূর্ব।

বাগ্মীতায় ট্যানাসের বিকল্প পাওয়া ভার। যুদ্ধ শুরুর আগে নিজের বাহিনীর উদ্দেশ্যে তার ঘোষণা কিংবদন্তি হয়ে আছে। আমি তার সবগুলো শুনি নি, তবে ট্যানাসের বিশ্বস্ত সহচর কাতাস সবই মুখস্ত করে রেখেছে। অনেকগুলো মূল্যবান বক্তব্য তার কাছ থেকে শুনে শুনে সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে আমার প্যাপিরাসের স্ক্রোলে।

এমনকি সাধারণ জনতার হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আছে ট্যানাসের। আমার মনে হয় সহজাত স্বতঃস্ফুর্ততা এবং স্বচছ সতোর কারণেই ওটা পারে সে। ট্যানাসের আহ্বানে হাসিমুখে মৃত্যুকে পর্যন্ত বরণ করে নিতে প্রস্তুত বহুজন।

সদ্য সমাপ্ত দ্বৈত-যুদ্ধের মত্ততা আর ইনটেফের ফাঁদ টপকে ট্যানাসের বেরিয়ে আসার চিত্র তখনও ঘুরপাক খাচ্ছিল মনে, আমার কোনোরকম সাহায্য ছাড়া ওর বক্তব্য শুনতে বেশ আগ্রহী হয়ে অপেক্ষা করছিলাম। সত্যি বলতে, আমার সহায়তা নেয় নি বলে কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে আছি, বেফাঁস কিছু না আবার বলে বসে ট্যানাস! চাতুর্য্য কিংবা ধূর্ততা ট্যানাসের মহৎ গুণাবলির মধ্যে পড়ে না।

মিশরীয় রাজ্যের প্রতীক হাতে ইঙ্গিত করলেন ফারাও, মাথা ঝাঁকিয়ে অনুমতি দিলেন বক্তব্য পেশ করার। আগ্রহের আতিশায্যে সামনে ঝুঁকে বসে জনতা, কেউ কোনো শব্দ করছে না।

আমি, শকুন-মস্তকধারী হোরাস বলছি, শুরু করে ট্যানাস, জনতা উৎসাহ জোগায় তাকে। হা-কাহ-টাহ, মিশরের বর্তমান নাম যে আদি-শব্দ থেকে এসেছে, সেটাই উচ্চারণ করলো ট্যানাস। দশ হাজার বছরের প্রাচীন এই জন্মভূমির হয়ে কথা বলছি আমি, দেবতাদের শিশুকাল থেকে যা আমাদের মাতৃভূমি। এমন দুই রাজ্যের হয়ে বলছি, যারা মূলত এক ও অভিন্ন।

মাথা নেড়ে নিজের সম্মতি জানালেন মহান ফারাও।

হায়, কৃষ্ণভূমি! বাৎসরিক বন্যায় নীল নদের পলিমিশ্রিত পানি কালো বর্ণ ধারণ করে। এই মাতৃভূমির কথা বলছি আমি, আজ যা সন্ত্রস্ত, দ্বিধাবিভক্ত; গৃহযুদ্ধে টালমাটাল, রক্তাক্ত এবং সম্পদহারা। আমার মতোই উপস্থিত জনতা থমকে যায় । অশ্রুত সত্য কথা বলছে ট্যানাস। ইচ্ছা হলো দৌড়ে মঞ্চে গিয়ে ওর মুখ চেপে ধরি। অসহায় মনে হতে লাগলো নিজেকে।

হায়, টা-মেরি! আরো একটি ভূতপূর্ব নাম যার অর্থ প্রিয় জন্মভূমি। আমার তত্ত্বাবধানে ইতিহাস ভালোই রপ্ত করেছে ট্যানাস। বুড়ো, অথর্ব সেনাপতিগণ, যারা ব্যর্থ হয়েছেন শত্রুকে রুখে দিতে; আমি তাদের কথা বলছি। প্রাচীন, অযোগ্য বুড়ো যারা নির্দ্বিধায় অপচয় করেন তরুণ রক্ত–আমি সেইসব লোকেদের কথা বলছি।

দ্বিতীয় সারিতে বসা মিশরের সাহসী সিংহ উপাধিপ্রাপ্ত নেমবেট, রাগে-আক্রোশে দাঁড়িতে হাত চালালেন। অন্যান্য বয়োজ্যেষ্ঠ সেনাপতিরা ভুড় কুঁচকে, অস্ত্রের খাপে আঘাত করে নিজেদের মনোভাব প্রকাশ করলেন। আর তাদের সবার মাঝখানে বসে উল্লাসের হাসি হাসছেন আমার মনিব ইনটেফ। এক ফাঁদ থেকে বেঁচে ফিরে আবারো নিজেকে ফাঁদে ফেলছে ট্যানাস।

আমাদের প্রিয় জন্মভূমি আজ শত্রুর অভয়ারণ্য, আজ তার মহতী সন্তানেরা তলোয়ার হাতে তুলে নেওয়ার বদলে নিজেদের বিকলাঙ্গ করে ফেলে, দ্বিতীয় সারিতে বাপের দুপাশে বসা লসট্রিসের দুই ভাই মেনসেট আর সোবেকের উদ্দেশ্যে কঠোর চোখে তাকালো ট্যানাস।

রাজার দেওয়া প্রত্যাদেশ অনুযায়ী কেবলমাত্র বিকলাঙ্গরা সেনাবাহিনীতে যোগদান থেকে ক্ষমা পায়, সেই কারণেই দক্ষ শল্যবিদের সাহায্যে নিজেদের বুড়ো আঙুল কেটে ফেলেছে দুই ভাই। এতে করে তলোয়ার ধরা বা ধনুক টানা কোনোটিই সম্ভব নয় তাদের পক্ষে। কর্তিত অঙ্গ প্রদর্শনে কোনো লজ্জা নেই তাদের, গর্বিত চিত্তে নদীর ধারের ছাপড়ায় জুয়া খেলে তারা।

তরুণদের জীবন নিয়ে বুড়োদের ছিনিমিনি খেলাই হলো যুদ্ধ, লসট্রিসের ভাইদের বলতে শুনেছি আমি। দেশপ্রেম ফালতু কথা। যার ইচ্ছা মরুক, আমরা যুদ্ধে যাবো না। এই হলো উন্নাসিক দুই ভাইয়ের মনোভাব।

এখন, ট্যানাসের তীর্যক মন্তব্যে অপ্রস্তুত হয়ে নিজেদের বাম হাত কাপড় দিয়ে আড়াল করে তারা। যদিও তারা দুজনেই ডানহাতি, ঘুষের বদৌলতে বাম-হাতি বলে নিজেদের পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বিশাল উন্মুক্ত অংশের পেছনে বসা সাধারণ জনতা মেঝেতে পা ঠুকরে নিজেদের সম্মতি জানায় ট্যানাসের বক্তব্যে। যুদ্ধ নৌকার দাঁড় তো টানে এদেরই সন্তানেরা, এদের সন্তানেরাই মরুর প্রখর রোদে প্রহরা দেয়।

মঞ্চের পেছনে হতাশায় মুষরে পড়লাম আমি। এতক্ষণের বক্তব্যে কম করে হলেও পঞ্চাশজন প্রভাবশালী শত্রু তৈরি করেছে ট্যানাস। সামনের সারির অতিথি তাঁরা সবাই। একদিন এরাই উচ্চ-রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হবেন। মনে-প্রাণে চাইছি, এবারে থেমে যাক ট্যানাস, কিন্তু সে বলে চলে।

হায়, দেবতাগণের ভূমি! আমি বলছি সেই বর্বর আর ডাকাত দলের কথা, যারা আজ ওত পেতে আছে প্রতিটি ঝোঁপের আড়ালে, পাহাড়ের চূড়ায়। আজ কৃষককে কাজ করতে হয় বর্ম পাশে রেখে, পথিক ভ্রমণ করে অস্ত্র হাতে।

সাধারণ জনতা আবারো সমর্থন জানায় ট্যানাসের কথায়। দস্যুদলের অত্যাচারে সমগ্র মিশর আজ অতিষ্ঠ। শহরের কাদার তৈরি দেওয়ালের ওপারে আমরা সবাই অরক্ষিত। শ্রাইক নামধারী এই দস্যুরা নির্মম। আইনের কোনো বালাই নেই তাদের কাছে ।

ঠিক জনতার মনের কথা বলেছে ট্যানাস, হঠাই আমিও এক আবেগে কেঁপে উঠি। এমন আবেগেই তো যুগে যুগে ঘটেছে অভ্যুত্থান, ধ্বসে পড়েছে বহু সম্রাটের সাম্রাজ্য। ট্যানাসের পরবর্তী বাক্যে আমার সন্দেহ সত্যি হলো।

খাজনা আদায়কারীর চাবুকের তলায় কেঁদে ফিরছে গরিবেরা, আর মহৎ ব্যক্তিরা কেবল নিজেদের আরাম-আয়েশে ব্যয় করেন সময়-দর্শকসারীর পেছন থেকে একটা হুঙ্কার ওঠে, ভয়ের বদলে উত্তেজনা বোধ করতে থাকি আমি। এ কী কোনো পরিকল্পিত আচরণ? আমার জানার বাইরে ধূর্ত এবং চতুর ট্যানাস?

হোরাসের কসম! নিজের রক্তে যেনো ডাক শুনতে পাই। আমাদের জন্মভূমি এখন অভ্যুত্থানের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে। নেতৃত্ব দানে ট্যানাসের চেয়ে যোগ্য আর কে হতে পারে? মন খারাপ হলো এই ভেবে তার পরিকল্পায় আমাকে নেয় নি ট্যানাস। যতোটা চাতুর্যের সাথে আমি গীতি লিখি বা নকশা করি, জাগরণের জন্যে কী সেই রকম বাক্য আমি তৈরি করতে পারতাম না?

দর্শকের মাথার উপর দিয়ে সাগ্রহে তাকালাম, মনে মনে আশা করছি যে কোনো মুহূর্তে নিজের বাহিনী নিয়ে প্রবেশ করবে ক্ৰাতাস। ফারাও-এর মাথা থেকে দ্বৈত-মুকুট ছিনিয়ে নিয়ে ট্যানাসের রক্তাক্ত মস্তকে বসাচ্ছে ক্ৰাতাস–এই দৃশ্য কল্পনা করে আমার ঘারের ছোটো চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেলো। কতই না উত্তেজনায় তখন চিৎকার করে উঠতাম আমি, ফারাও দীর্ঘজীবী হোন! রাজা ট্যানাস দীর্ঘজীবী হোন!

ট্যানাস তখনও বলে চলেছে। ঘোরের ফেরে আমি দেখতে লাগলাম, অভ্যুত্থান হয়েছে মরুভূর বুকে। আমার ছোট্ট সোনা লসট্রিসকে পাশে নিয়ে আমাদের এই মিশরের সিংহাসনে বসে ট্যানাস, রাজ-উজিরের পদে আসীন আমি দাঁড়িয়ে তার ঠিক পেছনে। কেন যে আমাকে অন্তর্ভুক্ত করলো না সে এই পরিকল্পনায়!

তার পরবর্তী বাক্যে এই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম। আমার সৎ, সাধারণ, মহৎ হৃদয় ট্যানাসকে ভুল বুঝেছিলাম আমি। চাতুৰ্য্য আর প্রতারণার স্থান যার কাছে নেই।

কোনো পরিকল্পনা ছিলো না এই ভাষণের পেছনে। এ হলো নির্ভীক ট্যানাসের মনের কথা। সাধারণ জনতার উদ্দেশ্যে এবারে অনলবর্ষণ শুরু করলো সে।

আমার কথা শোনো, হে মিশর! এ কেমন দেশ, যেখানে নষ্টরা অধিকার করে আছে সমস্ত চরাচর? যেখানে দেশপ্রেমিকেরা দণ্ডিত, যেখানে প্রাজ্ঞ লোকেদের অবহেলা করা হয়? যেখানে হিংসুটে, মগজহীনেরা ছিঁড়ে ফেলতে চায় সত্যভাষীর জিভ?

কোনো শব্দ বেরোয় না কারো মুখ ফুটে। ধনী-নির্ধন, মহান-তুচ্ছ সবার মনোযোগ অধিকার করে আছে কেবল আমার ট্যানাস। কেন যে আমার সাথে পরামর্শ করলো না ও! আমি জানি কেন করে নি। সে জানতো, আমি বাধা দিতাম তাকে।

এ কেমন সমাজ যেখানে পিতাকে অবজ্ঞা করা হয়? এমন সমাজ কী চাই আমরা, যেখানে একজন ক্রীতদাস অধিকার করে রাখুক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ? মূল্যবান সম্পদ যাক অযোগ্যের হাতে, আমরা কী এটাই চাই?

হে হোরাস, তিক্ততার সাথে ভাবলাম, আজ আর কারো নিস্তার নেই ওর ধারালো কথার কোপ থেকে। নিজে যা সত্যি এবং সঠিক মনে করছে, নিরাপত্তার কথা না ভেবে তাই বলে চলেছে ট্যানাস।

অন্তত একজন খুবই উৎফুল্ল তার এই সত্য-ভাষণে। আমার পাশে এসে হাত চেপে ধরলো লসট্রিস।

ও কী সুন্দর, তাই না টাইটা? শ্বাসের তলায় বলে সে, প্রতিটি বর্ণ সত্য। আজ রাতে ও অবশ্যই একজন তরুণ দেবতা!

ওর মন্তব্যে সায় জানানোর মতো মানসিক অবস্থা বা ইচ্ছা কোনোটাই ছিলো না আমার, দুঃখের সাথে মাথা নিচু করে শুনতে লাগলাম ট্যানাসের কথা ।

ফারাও, আপনি আমাদের পিতা। প্রতিরক্ষা আর নিরাপত্তার জন্যে আপনার কাছে দাবি জানাই আমরা। যোগ্য এবং কৌশলী লোকের হাতে দিন প্রশাসনিক কাজের ভার। গর্দভ এবং চাটুকারদের চলে যেতে বলুন তাদের আস্তকুঁড়ে। অবিশ্বাসী পুরোহিত আর ষড়যন্ত্রী শাসকদের ফিরিয়ে নিন, যারা আজ পরভোজীর মতো খেয়ে ফেলছে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি।

হোরাস জানেন, আমি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি পুরোহিতদের। কিন্তু কেবল মাত্র একজন চরম সাহসী বা বোকা লোকের পক্ষেই সম্ভব তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা, তাঁরা অত্যন্ত প্রভাবশালী, হিংসুটে। আর চাটুকার আর ষড়যন্ত্রীর কথা যদি বলি, আমাদের এই মাতৃভূমির শত বছরের ইতিহাসে তারা ছিলো, আর ইনটে তাদের শিরোমণি। করুণায় মন ভরে গেলো আমার প্রিয় বন্ধুর জন্যে, পুরো সামাজিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করার উপায় বলে যেতে লাগলো সে ফারাও-এর উদ্দেশ্যে।

প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তির কথা শুনুন! হে মহান সম্রাট, শিল্পী এবং লিপিকারের যোগ্য সম্মান দিন! সাহসী যোদ্ধা এবং বিশ্বস্ত ভত্যকে পুরষ্কৃত করুন। মরুর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলুন দস্যুর দল। সাধারণ লোকের জন্যে উদাহরণ তৈরি করুন, তাদের জীবনাচরণের সঠিক পথ দেখান। কেবলমাত্র তাহলেই আমাদের এই মিশর আবারো সুখে-শান্তিতে মহান হবে।

মঞ্চের মাঝখানে হাঁটু গেলে বসে পরে ট্যানাস, দুই হাত প্রসারিত করে বলতে থাকে। হে ফারাও, আপনি আমাদের পিতা । আমাদের সমস্ত ভালোবাসা আপনার উদ্দেশ্যে। আমাদের এই ভালোবাসার প্রতিদান দিন। আমরা প্রার্থনা করি, আমাদের দাবি পূরণ করুন।

সেই মুহূর্ত পর্যন্ত আমার ট্যানাসের নির্বোধ বাগীতায় বিভোর হয়ে ছিলাম। সংবিৎ ফিরে পেতে তাড়াতাড়ি ইশারা করলাম যেনো পর্দা টেনে দেওয়া হয়। ধীরে ভেসে উজ্জ্বল সাদা পর্দা আড়াল করে ফেললো ট্যানাসকে। অবিশ্বাসের বজ্রাঘাতে নিঃশব্দে বসে থাকে জনতা, যেনো তারা চলৎশক্তিহীন হয়ে গেছে।

স্বয়ং ফারাও ভাঙলেন এই বিভোর। দাঁড়ালেন তিনি, প্রসাধন-চর্চিত তার মুখ ভাবাবেগহীন। ধীরে, সভাসদদের সঙ্গী করে মন্দির ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। মাথা ঝুঁকিয়ে তাঁকে সম্মান জানানোর পূর্ব মুহূর্তে আমার মনিব ইনটেফের দিকে চেয়ে দেখলাম। তার চোখে-মুখে ছিলো নিঃশব্দ উল্লাস।

*

সেই রাতে মন্দির থেকে পাহারা দিয়ে ট্যানাসের বাসস্থানে দিয়ে এলাম ওকে, বন্দরের কাছে নিজের বাহিনীর সঙ্গে থাকে সে। পুরোটা সময় ওর পাশে থেকে কোমরের অস্ত্রে সতর্ক হাত রেখে চললাম, যে কোনো সময় আক্রমণের আশঙ্কা করছি। ট্যানাস কিন্তু নির্বিকার। আসলেই নিজের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে যে বিপদ হতে পারে, সে সম্পর্কে সে এতটুকু সচেতন নয়।

সময় হয়ে এসেছিলো, কেউ একজনকে অবশ্যই উঠে দাঁড়িয়ে বলতে হতো কথাগুলো, কি বলো টাইটা? অন্ধকার গলিপথে জোরালো প্রতিধ্বনি তুলছে তার কণ্ঠস্বর । যেনো ওত পেতে থাকা আততায়ীকে আহ্বান জানাচ্ছে। কোনো প্রত্যুত্তর করা থেকে বিরত রইলাম আমি।

নিশ্চই এটা আশা কর নি তুমি, তাই না টাইটা? সত্যি করে বল । একদম অবাক হয়ে গিয়েছিলে না?

আমরা সবাই অবাক হয়েছিলাম, এবারে সম্মত হলাম ওর কথায়। এমনকি ফারাও পর্যন্ত।

কিন্তু উনি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন, টাইটা। সব কিছু। দারুন দেখালাম যা হোক, কী বলো?

যখনই র‍্যাসফারের পরিকল্পিত আক্রমণে ইনটেফের যোগসাজশ নিয়ে বললাম, উড়িয়ে দিলো ট্যানাস। এটা অসম্ভব, টাইটা। তোমার কল্পনা ওটা। ইনটেফ ছিলেন আমার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি কেমন করে এটা করতে চাইবেন? আর তাছাড়া, আমি তার মেয়েজামাই হতে যাচ্ছি, তাই না? আহত শরীর নিয়েও প্রাণখোলা হাসিতে রাতের নৈশব্দ ভাঙে ট্যানাস।

তুমি ভুল ভেবেছিলে, বলে চলে সে। র‍্যাসফার নিজেই বড়াই করে মার খেলো। উচিত সাজা পেয়েছে। এতো জোরে আমাকে আলিঙ্গন করলো ট্যানাস, ব্যথা পেলাম। তুমি আজ রাতে দুই বার বাঁচিয়েছে আমাকে। তোমার কথা না শুনলে র‍্যাসফার এতক্ষণে মেরে ফেলতো আমাকে। কেমন করে এগুলো পারো তুমি? আমি নিশ্চিত, তুমি আসলে জাদু জানো, ভবিষ্যত দেখতে পাও। আবারো জোরে হেসে উঠে সে।

এই আনন্দে আমি কেমন করে বাধা দিই? ছোট্ট একটা বালকের মতো ও, কঠোর, বিশালদেহী বালক। ওকে ভালো না বেসে পারা যায় না। নিজেকে, এবং তার প্রিয়জনদের কী বিপদে সে ফেলেছে আজ, এটা এখন তাকে বোঝানো সম্ভব নয়।

থাক, আজ সে আনন্দে বিভোর থাকুক; কাল যুক্তি দিয়ে ওকে বোঝানোর একটা চেষ্টা করে দেখবো। বাড়ি ফিরে মাথার কাটাটা সেলাই করে দিলাম, অন্যান্য ক্ষতগুলোও পরিচর্যা করতে হলো। পচনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে আমার নিজের তৈরি মধু এবং লতাগুল্মের মিশ্রণ লেপে দিলাম ক্ষতমুখে। সবশেষে, রাতের জন্যে লাল শেপেনের কড়া-মাত্রা খেতে দিয়ে ক্রাতাসের প্রহরায় রেখে এলাম তাকে।

মধ্যরাতের বহু পরে আমার প্রকোষ্ঠে ফিরে দেখি দুইজন ডাক পাঠিয়েছে আমাকে: আমার মিসট্রেস, লসট্রিস আর মুমূর্ষ র‍্যাসফার। র‍্যাসফারের দুই সঙ্গী মিলে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চললো আমাকে। ঘামে জবজব কাপড়ের উপর শুয়ে অভিশাপ আর গালাগাল বকে চলছিলো সে; সেথ এবং অন্যান্য দেবতাদের ডাকছে তার এই করুণ অবস্থা দেখে যাওয়ার জন্যে।

ওহে, টাইটা! বহুকষ্টে এক কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে মাথা একটু উঁচালো র‍্যাসফার আমাকে দেখে। এত ব্যথা-বিশ্বাস করবে না! আমার বুকে আগুন জ্বলছে। দেবতাদের কসম, সবগুলো হাড় ভেঙে গেছে, মাথায় এতো ব্যথা মনে হয় ছিঁড়ে যাবে!

চিকিৎসকই বলুন আর ক্ষত-নিরাময়কারী; একটা ব্যাপার আমি দেখেছি, আপনার সামনে কেউ কাতরাতে থাকলে সাহায্য না করে পারা যায় না, তা সে যতই র‍্যাসফারের মতো বমিজাগানিয়া জন্তু হোক না কেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চামড়ার তৈরি থলে থেকে আমার চিকিৎসাবিদ্যার সরঞ্জাম খুলে কাজে লেগে পড়লাম।

র‍্যাসফারের নিজস্ব নির্ণয় সঠিক দেখে দারুন ভালো লাগলো; প্রচুর নীলা-ফোলা আর অগভীর কাটা-ছেঁড়া ছাড়াও কমপক্ষে তিনটে বুকের হাড় ভেঙেছে তার, মাথার পেছনে প্রায় আমার মুঠোর সমান একটা ফোলা। বুকের একটা হাড় এমনভাবে ভেঙে সরে গেছে, ফুসফুঁসে ঢুকে যাওয়ার আশঙ্কা ছিলো। দুই বর্বর সঙ্গী ধরে রাখলো র‍্যাসফারকে, ওদিকে আমি আগের জায়গায় বসলাম ভেঙে যাওয়া হাড়টা, গুঙ্গিয়ে, হুঙ্কারে, কান্নায় আস্ফালন করে চললো র‍্যাসফার। শেষমেষ, ভিনেগারে ভিজিয়ে একটা লিনেনের পট্টি বেঁধে দিলাম বুকের চারধারে। এতে করে, ভিনেগার শুকিয়ে গেলে সংকুচিত হয়ে কাপড়টা সেঁটে থাকবে বুকে।

মাথার যেখানটায় আঘাত লেগেছিলো পাথরের মেঝেতে, সেটা দারুন ফুলে গেছে। দেবতারা মাঝে-মধ্যেই দারুন উদারতা দেখান। আলোটা তুলে র‍্যাসফারের চোখ পরীক্ষা করে বুঝলাম বড় হয়ে গেছে তার চোখের মণি। এই মুহূর্তে কী চিকিৎসা প্রয়োজন তার, বুঝতে বাকি রইলো না আমার। বিশ্রী ওই করোটির ভেতরে রক্ত জমে গেছে বর্বরটার । আমার সাহায্য না পেলে আগামী সূর্যাস্ত আর দেখা হবে না তার । কুচিন্তা যে মাথায় আসে নি তা নয়, তবে শেষপর্যন্ত একজন শল্যবিদের দায়িত্বে অবহেলা করতে পারি নি।

করোটির ভেতরের আঘাত সারাতে পারেন, সমগ্র মিশরে এমন মাত্র তিনজন শল্যবিদ আছেন। নিজের কথা বাদ দিলাম, বাকি দুজনের উপরে কোনো ভরসা নেই আমার। এবারেও র‍্যাসফারের পাষণ্ড সঙ্গীরা তাকে মুখে চেপে ধরে রাখলো মেঝেতে, বোঝাই গেলো প্রভুর প্রতি গাঢ় মায়া-দরদ নেই এদের।

র‍্যাসফারের মাথার ফোলার উপর অর্ধবৃত্তাকারে কাটলাম আমি। হাড়ের উপর থেকে চামড়ার বেশ বড় একটা চাপড়া তুলে ফেলতে হলো। দুইজন পাষণ্ড মিলেও ধরে রাখতে পারছে না রাসফারকে, ব্যথার আতিশায্যে হুঙ্কার ছাড়তে লাগলো সে, রক্তের ফোয়ারা ছাতে লেপ্টে গেলো। আমাদের সবার জামাকাপড় ভিজে একশা, যেনো লাল পক্স ধরেছে। বাধ্য হয়ে তার হাত-পা চামড়ার ফিতে দিয়ে খাটের সাথে বেঁধে রাখতে নির্দেশ দিলাম দুই বর্বরকে।

ওহে, টাইটা! কী ব্যথা, তুমি বুঝবে না। তোমার ওই ফুলের রস একটু খেতে দাও, বন্ধু। দয়া কর । বহু কষ্টে বললো র‍্যাসফার ।

হাত-পা বাঁধা হতে পরিষ্কার করে বললাম তাকে, তোমার কেমন লাগছে, আমি বুঝি। যখন আমার শরীরে ছুরি চালিয়েছিলে একটু ফুলের রস আমারও দরকার ছিলো। কিন্তু বন্ধু, আমার ওষুধের সংগ্রহ শেষ হয়ে গেছে। আগামী এক মাসেও পুব থেকে কোনো ক্যারাভান আসবে না। সানন্দে মিথ্যে বললাম। খুব কম লোকে জানে বাগানে আমি নিজেই লাল-শেপেনের চাষ করি। ব্যথার এখনও কিছুই দেখে নি র‍্যাসফার। হাড় ফুটো করার সরঞ্জাম হাতে তুলে নিলাম।

সত্যি বললে, মানুষের মস্তিষ্কের বেশিরভাগ ব্যপারই আমার কাছে বোধগম্য নয়। ইনটেফের নির্দেশে দণ্ডপ্রাপ্ত সমস্ত আসামীর শবদেহ পাঠানো হয় আমার কাছে। ট্যানাসও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহু নমুনা নিয়ে এসেছিলো আমার জন্যে। ওগুলোকে কেটে ছিঁড়ে পরীক্ষা করেছি আমি। কোনদিক দিয়ে খাবার ঢোকে আর কোনদিক দিয়েই বা বেরোয় আমি এখন জানি। ফ্যাকাসে ফুসফুঁসের থলির মাঝখানে বসবাস করে আমাদের হৃদয়। রক্ত যেইসব নদীপথ দিয়ে পুরো শরীরে ভ্রমণ করে, আমি সেগুলোকে চিনেছি; এমনকি মানুষের আবেগ-নিয়ন্ত্রণকারী দুই রকমের রক্ত আমি চিনেছি।

এক আছে উজ্জ্বল, উজ্জ্বল রক্ত, ফিনকি দিয়ে ছোটে যেটা, ঝলকে ঝলকে। ওটা ভালোবাসা আর সুন্দর ভাবনার রক্ত। আরেক আছে গাঢ়, বিষণ্ণ রক্ত–ওতে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। এ হলো ক্রোধ আর দুঃখের রক্তকুচিন্তার তরল।

আমার এই সমস্ত পর্যবেক্ষণ একশ প্যাপিরাসের ক্কোলে লিখে রেখেছি। জ্ঞানের এই ব্যপ্তি আর কারো নেই দুনিয়ায়, মন্দিরের ওই হাতুড়ে কবিরাজগুলোর তো নেইই। দেবতা ওসিরিসের পূজো আর মোটা উপঢৌকন ছাড়া কিছুই বলতে পারে না তারা। বিনয়ের সাথেই বলছি, এমন কোনো মানুষ আমি দেখি নি আমার চেয়ে মানুষের শরীর সম্পর্কে যার জ্ঞান বেশি। কিন্তু মস্তিষ্কের ব্যপার এখনও রহস্যময় আমার কাছে। স্বাভাবিকতা থেকে আমি বুঝি, চোখ দেখে; নাক গন্ধ নেয়, মুখ স্বাদ নেয় এবং কান শোনে কিন্তু নরম-ফ্যাকাসে যে বস্তু আমাদের মাথার ভেতরে আছে তার কাজ কী হতে পারে?

আমি ভেবে বের করতে পারি নি, এমন কাউকে পাই নি যে জানে। কেবল ট্যানাস একবার একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছিলো। সারারাত ধরে মদ গিলেছিলাম দু জন সেদিন। সকালে ঘুম ভেঙে উঠে মাথার ব্যথায় কাতর ট্যানাস বললো, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে সেথ ওটা ঢুকিয়ে দিয়েছে আমাদের মাথার ভেতরে।

একবার, সেই ইউফ্রেতিস আর টাইগ্রিসের ওপার থেকে ক্যারাভান নিয়ে আসা এক জ্ঞানী ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। অর্ধ-বছর ধরে দুনিয়ার যত রহস্য নিয়ে তর্ক করেছিলাম আমরা দুজনে। তিনি বলেছিলেন, আমাদের অনুভূতি আসলে হৃদযন্ত্র থেকে নয়, আসে মাথার ভেতরের নরম অংশ থেকে। এমনকি, তার মতো জ্ঞানী ব্যক্তিও এতো শোচনীয় ভুল করতে পারে!

যারা একবার দেখেছেন আমাদের শরীরের মাঝখানে বসে থাকা হৃদপিণ্ডকে; যা নিজেই নিজের স্পন্দন জোগায়, যাকে ভরে তুলেছে রক্তের নদীপথ; হাড়ের আচ্ছাদন যাকে রক্ষা করে, তারা জানেন আমাদের সমস্ত চিন্তা এবং আবেগের উৎস এই ঝর্ণাধারা। জীবনেও কী আপনি অনুভব করেননি মনোরম সুরে বা কোমল মুখশ্রী দেখে অথবা সুন্দর শব্দ-বাক্য-বর্ণে আপনার হৃদয় দ্রুততর হয়েছে? কখনও মাথার ভেতরে কিছু নড়তে শুনেছেন? আমার এই অকাট্য যুক্তির কাছে পূবের সেই জ্ঞানী ব্যক্তি হার মেনেছিলো।

কোনো যুক্তিবাদী মানুষই বিশ্বাস করবে না, রক্তবিহীন এক দলা দই, একলা মাথার খাঁচায় পরে থেকে থেকে রচনা করে চলেছে কাব্য; তৈরি করছে পিরামিডের নকশা। ভালোবাসায় মানুষকে, না হয় যুদ্ধে প্ররোচিত করে। এমনকি শবদেহ প্রস্তুতকারীরা পর্যন্ত মৃতদেহ থেকে ওই বস্তু বাদ দেয়।

কিন্তু একটা অবাক ব্যপার আছে। যখনই এই অবিন্যস্ত বস্তুতে এতটুকু আঘাত লাগে, তা সে মাথার ভেতরে জমা হওয়া সামান্য তরলের চাপ হোক না কেন মানুষ বাঁচে না। তাই যে থলিতে ওগুলো জমা থাকে, তার এতটুকু অসুবিধা না করে করোটি ফুটো করতে দারুন দক্ষতার প্রয়োজন। আমার আছে সেটা।

প্রচণ্ড চিৎকার করে চললো র‍্যাসফার। ধীরে ওর মাথায় ফুটো করে হাড়ের কণা, নোংরাগুলো ধুয়ে দিতে লাগলাম ভিনেগার দিয়ে। ভিনেগারের জ্বলুনি র‍্যাসফারের চিৎকারে ইন্ধন জোগালো ।

ছোট্ট গোল একটা ছিদ্র তৈরি হতে গরম রক্তের ধারা ছিটকে বেরিয়ে আমার মুখে লাগলো। সাথে সাথেই শান্ত হলো র‍্যাসফার । দুঃখের সাথে বুঝলাম, এই যাত্রা বেঁচে যাবে অমানুষটা। মাথার ফুটোটা বন্ধ করতে করতে ভাবছিলাম এই নমুনাটাকে বাঁচিয়ে রেখে মানবজাতীর কতটা ক্ষতি করলাম আমি।

মাথায় কাপড়ের পট্টি বেঁধে রেখে এলাম রাসফারকে। ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিলাম আমি। আজকের দিনের উত্তেজনা এবং বিস্ময় আমার সমস্ত শক্তি শুষে নিয়েছে। কিন্তু নিস্তার নেই আমার। চাতালের ধাপে পা রাখতেই লসট্রিসের বার্তাবাহক তাগাদা দিতে লাগলো তার কাছে যাওয়ার জন্যে। কেবল র‍্যাসফারের রক্ত ধুয়ে একটু সাফ-সুতরা হয়ে নেওয়ার সময় পাওয়া গেলো।

প্রাণান্ত কষ্টে, পা টেনে টেনে যখন পৌঁছুলাম লসট্রিসের আঙ্গিনায়; ভীষণ চেহারা, রক্তচক্ষু নিয়ে চাইলো লসট্রিস। কোথায় লুকিয়েছিলেন আপনি, প্রভু টাইটা? সেই দ্বি প্রহরে আপনাকে আনতে লোক পাঠিয়েছি, আর এখন তো প্রায় সকাল হয়ে এলো । কত বড় সাহস তোমার? মাঝে-মধ্যে নিজের অবস্থান ভুলে যাও। অবাধ্য দাসের শাস্তির কথা জানো তুমি–এতক্ষণ অপেক্ষার কারণে রাগে ফুঁসছিলো লসট্রিস। অসামান্য রূপসী তার রাগ, পা মাটিতে ঠুকে যে জেদ প্রকাশ করলো, তা একান্তই তার ভঙ্গিমা। ভালোবাসা উথলে উঠতে লাগলো আমার হৃদয়ে।

ওখানে দাঁড়িয়ে বোকার মতো হেসো না! জ্বলে উঠলো সে, এত রাগ করেছি, তোমাকে শূলে চড়াতে পারি। আবারো মাটিতে পা ঠুকলো লসট্রিস, অনুভব করলাম আমার সমস্ত ক্লান্তি কেটে গেছে। কেবল ওর উপস্থিতি আমাকে নতুন জীবনীশক্তি দেয়।

মিসট্রেস, কী অসাধারণ অভিনয় করলে তুমি আজ! আমাদের সবার মনে হচ্ছিলো যেনো সত্যিকারের দেবী এসেছেন।

চালাকি করো না, তৃতীয়বারের মতো মাটিতে পা ঠুকলো লসট্রিস, তবে এবারে রাগ পড়ে এসেছে তার। এতো সহজে পার পাবে না আজ।

সত্যি, মিসট্রেস, মন্দির থেকে প্রাসাদে ফেরার সময় শুনেছি; রাস্তার সবার মুখে কেবল তোমার কথা। ওরা বলছিলো, এতো সুন্দর গান কখনও শুনে নি। মুগ্ধ হয়ে গেছে তারা।

একটা বর্ণও বিশ্বাস করি না, ঘোষণার সুরে বললো লসট্রিস। রাগ ধরে রাখতে পারছে না। আমার তো মনে হয়, আজ রাতে আমার গলা সবচেয়ে বিশ্রী ছিলো। অন্ততঃ একবার স্বর উঠাতে পারছিলাম না।

তা নয়, মিসট্রেস। এতো ভালো কখনও ছিলো না কারো কণ্ঠস্বর । আর সৌন্দর্য্য। পুরো মন্দিরে যেনো আলো জ্বেলে দিয়েছিলে । লসট্রিস যত রাগই করুক, ও তো শেষ পর্যন্ত একটা মেয়ে।

তুমি জঘন্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো সে। সত্যি, এবার তোমাকে শাস্তি দেবো ভেবে রেখেছিলাম। এখন আমার পাশে বসে আজকের সব কথা শোনাও। ওহ, মনে হয় আরো এক সপ্তা ঘুমাতে পারবো না। আমার হাত ধরে টেনে বিছানার দিকে এগুলো লসট্রিস। বকবক করে চলেছে, কেমন করে সত্য-নির্ভিক ভাষণে এমনকি ফারাও-কে মুগ্ধ করে ফেলেছে ট্যানাস, সবাই তো ভালবাসে তাকে, কেমন করে শিশু-হোরাস তার কাপড় ভিজিয়ে ফেলেছিলো, সত্যিই কী আমি মনে করি ও অসাধারণ কাজ করেছে এইসব।

শেষমেষ ওকে থামালাম আমি। মিসট্রেস, সকাল হয়ে এলো বলে। আগামীকাল রাজার সঙ্গে নদীর ওপারে যেতে হবে, সমাধি-নির্মাণ কাজ দেখবেন তিনি। এতো

গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে অতি অবশ্যই দারুন দেখাতে হবে তোমাকে।

কিন্তু আমার তো ঘুম আসছে না, টাইটা, প্রতিবাদ করলে লসট্রিস। বকবক করতে করতে কিছুসময় পর আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো।

ধীরে, ওর মাথাটা বিছানায় রেখে পশম দিয়ে ঢেকে দিলাম আমি। চুমো খেলাম কপালে । সাথে সাথেই যেতে পারলাম না, বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। চোখ না খুলেই বিড়বিড় করে বললো লসট্রিস, কাল কী রাজার সঙ্গে আমি একটু কথা বলতে পারবো? উনি পারবেন বাবাকে বাধা দিতে যেনো ট্যানাসকে দূরে না পাঠান তিনি।

কোনো সদুত্তর জোগালো না ঠোঁটে। আমার বিমুগ্ধ দৃষ্টির সামনে ঘুমে তলিয়ে গেলো লসট্রিস।

*

সকাল হতে বহুকষ্টে নিজেকে টেনে তুলতে হলো, যেনো এই মাত্র বিছানায় পিঠ লাগিয়েছিলাম। সবার শেষে যোগ দিলাম ফারাও-এর শোভাযাত্রায়, কিন্তু এমনকি লসট্রিসও লক্ষ্য করলো না আমার দেরিতে আগমন। রাজকীয় জলযানের পাটাতনে অবস্থান নিয়েছে সে। স্থির দাঁড়িয়ে ওকে দেখলাম কিছুক্ষণ।

আজ রাজকীয় মহিলাদের সঙ্গে বসেছে সে, রাজার পত্নী, তাঁর বহু উপপত্নী এবং কন্যাদের সাথে। হামাগুড়ি দেওয়া শিশু থেকে শুরু করে বিবাহযোগ্য কন্যা আছে। আমাদের ফারাও-এর, এরাই মূলত তাঁর মনোকষ্টের কারণ। ছেলে ছাড়া কেমন করে তাঁর রাজকীয় রক্তধারা রক্ষিত হবে?

আমারই মতো লসট্রিসও এক কি দুই ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারে নি, কিন্তু আশ্চর্য হলো, আমার বাগানের মরু-ফুলের মতো মিষ্টি আর সজিব দেখাচ্ছে তাকে। বেছে

বেছে পছন্দ করা ফারাও-এর পত্নী, উপপত্নীদের মাঝে ও যেনো অতিমাত্রায় সুন্দর।

ট্যানাসের খোঁজে সামনে দৃষ্টি বোলালাম । ফারাও-এর নদী অতিক্রম পাহারা দিতে ইতিমধ্যে সামনে চলে গেছে তার গ্যালি। উদিয়মান সূর্যের প্রতিবিম্ব পড়েছে নদীর বুকে, চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয় যেন। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে হলো।

ঢাকের শব্দের সাথে ফারাও-এর জলযানে আগমন ঘোষিত হলো। আজ সকালে সোনার চওড়া পট্টি সমেত হালকা মুকুট, নেমেস পরেছেন ফারাও। উৎসব হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মুখে কোনো প্রসাধনের চিহ্ন নেই, সকালের কড়া সূর্যের আলোয় দারুন সাধাসিধা দেখাচ্ছে তাঁকে। চিন্তাক্লিষ্ট, বিশালবপু, বয়স্ক একজন ক্ষয়িষ্ণু দেবতা।

আমার দাঁড়ানোর স্থান অতিক্রম করার সময় মৃদু মাথা ঝাঁকালেন ফারাও, তার ইঙ্গিতে পাথরের হাঁটা-পথে উঠে এলাম। নিচু হয়ে তিনবার মাথা ঠেকালাম পবিত্র পদ যুগলের কাছে।

তুমিই কী সেই টাইটা, কবি? মেয়েদের মতো তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জানতে চাইলেন ফারাও।

আমি ক্রীতদাস টাইটা, মহান ফারাও, উত্তরে বললাম। তবে আমি একজন মামুলি লিপিকারও বটে।

হুম, ক্রীতদাস, কাল তোমার মামুলি লিপি মুগ্ধ করেছিলো আমাদের। কোনো গীতিনাট্যে এতো মজা আর কখনও পাই নি। আজ থেকে তোমার নাটকের সংস্করণই হবে রাজ্যের আনুষ্ঠানিক সংস্করণ।

সবার শোনার মতো করে জোরে কথা কটা উচ্চারণ করলেন ফারাও, এমনকি আমার মনিব ইনটেফ পর্যন্ত আন্দোলিত হলেন এই ঘোষণায়। যেহেতু আমি তার দাস, সম্মান তার আমার চেয়ে বেশি-বই-কম নয়! কিন্তু কথা এখনও শেষ করেন নি ফারাও।

তুমিই কী সেই শল্যবিদ টাইটা নও, যে আমাকে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছে?

জ্বী, মালিক, আমিই সেই দাস যে মাঝে-মধ্যে ওষুধের অনুশীলন করে থাকি।

বলো তো, কবে থেকে তোমার ব্যবস্থা কাজ শুরু করবে? গলা নামিয়ে বললেন ফারাও। কেবল আমি শুনতে পেলাম কথাটা।

মালিক, আমার দেওয়া ব্যবস্থা পুরোপুরি পালন করা হলে নয় মাস সময় লাগবে এতে, যেহেতু এই মুহূর্তে চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কে আছি ফারাও-এর সাথে, আমি যোগ করলাম, আমার নির্দেশিত খাবার খাওয়া হচ্ছে?

আইসিস-এর বিরাট বুক-জোড়ার কসম! চোখে আনন্দের ঝিলিক খেলে গেলো রাজার। এ-ত ষাঁড়ের বিচি খেয়ে ফেলেছি, একেকবার মনে হয় প্রাসাদের কোনো গাভীর পাল দেখে না ডাক দিয়ে বসি!

তার এহেন মানসিকতায় আমিও একটু তামাশা করার লোভ সামলাতে পারলাম না। আমার বর্ণনা মতো মেয়ে পেয়েছেন?

হায়, এতো যদি সহজ হতো। সুন্দর ফুলের গন্ধে মৌমাছি একটু তাড়াতাড়ি আসে । তুমি তো বলেছো মেয়ে যেনো পুরোপুরি অনাঘ্রাতা হয়,তাই না?

কুমারী এবং অনাঘ্রাতা, রজঃচক্রের প্রথম বছরের মধ্যেই, দ্রুত যোগ করলাম, যতোটা সম্ভব কঠিন করতে চাইছি আমার ব্যবস্থা। এমন কাউকে খুঁজে পেয়েছেন, মালিক, যার সাথে বর্ণনা মেলে?

পাল্টে গেলো ফারাও-এর মুখাবয়ব। চিন্তান্বিতভাবে হাসলেন তিনি। বিষণ্ণ অবয়বে কেমন অদ্ভুত দেখালো হাস্যমুখর মুখ। দেখা যাক, বিড়বিড় করে আউড়ালেন ফারাও। ঘুরে দাঁড়িয়ে রাজকীয় জল্যানে উঠার ধাপে পা রাখলেন। আমার মনিব, ইনটেফের ইশারায় আমিও সঙ্গী হলাম তাদের পিছুপিছু।

রাতে ধরে এসেছে বাতাস, গাঢ় তেলতেলে দেখাচ্ছে পানির রঙ, কেবল মাছরাঙা আর পাখিদের হঠাৎ আলোড়ন ছাড়া সম্পূর্ণ শান্ত নীল নদ। এমনকি নেমবেট-এর পক্ষেও এ অবস্থায় নদী পারাপার কোনো সমস্যা নয়। এরপরেও ট্যানাস রয়েছে। প্রহরায়, যেনো কোনো অযাচিত বিপদে উদ্ধার করতে পারে।

পাটাতনে পৌঁছুতে আমাকে কাছে টেনে নিলেন ইনটেফে। এখনও মাঝে-মাঝে আমাকে অবাক করে দাও তুমি, প্রিয়, ফিসফিস করে বলে আমার হাত মুচড়ে দিলেন। তোমার বিশ্বস্ততা নিয়ে ঠিক যখন সন্দেহ করছিলাম, চমকে দিলে।

তার এহেন ভালো আচরণে অবাক না হয়ে পারলাম না। রাসফারের চাবুকের ক্ষত এখনও দগদগ করছে আমার পিঠে । যাই হোক, মাথা ঝুঁকিয়ে ভাবাবেগ গোপন করে অপেক্ষায় রইলাম, কী বলতে চান ইনটেফ–বোঝার চেষ্টা করছি। অবশেষে মুখ খুললেন তিনি।

ফারাও-এর সামনে বলার জন্যে এরচেয়ে ভালো ঘোষণা মনে হয় চাইলে আমিও তৈরি করতে পারতাম না। ট্যানাসের কথা বলছি। গর্দভ র‍্যাসফারের কারণে বরবাদ হতে যাওয়া রাতটা তুমিই রক্ষা করলে। এতক্ষণে সবকিছু পরিষ্কার হতে শুরু করেছে আমার কাছে। ইনটেফের ধারণা ট্যানাসের জ্বালাময়ী বক্তৃতা আমি প্রস্তুত করেছি, তার সুবিধার জন্যে। মন্দিরের কোলাহলের কারণে ট্যানাসের উদ্দেশ্যে আমার সতর্কবাণী শুনতে পান নি।

আপনি খুশি হয়েছেন জেনে আমি আনন্দিত, মালিক। ফিসফিস করে প্রত্যুত্তরে বললাম। স্বস্তি বোধ করছি। আর যাই হোক, আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় নি। কিন্তু নিজের কথা নয়, আমি ট্যানাস আর লসট্রিসের প্রেমের পরিণতি নিয়ে ভাবছিলাম। সামনের দিনগুলোতে আমার সাহায্য বড়ো বেশি প্রয়োজন ওদের। অন্তত কিছু সাহায্য করার সামর্থ এখনও আছে আমার চিন্তাটা স্বস্তি জাগালো মনে।

এতো আমার দায়িত্ব ছিলো, মালিক।

তথ্‌-এর মন্দিরের পেছনে, খালের ওপাশের জায়গাটার কথা মনে আছে? একবার আলাপ করেছিলাম ওটা নিয়ে? বললেন ইনটেফ।

জ্বী, মালিক। গত দশ বছর ধরে ওটার মালিকানা পাওয়ার জন্যে প্রাণ আঁই-ঢাই করছিলো আমার। লেখালিখির জন্যে ওর চেয়ে সেরা জায়গা আর হয় না। বুড়ো বয়সে বিশ্রামের জন্যেও আদর্শ।

ওটা এখন থেকে তোমার। সময় করে কাগজ নিয়ে এসো, স্বাক্ষর করে দেবো। কল্পনাপ্রসূত ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণের কারণে এতো বড় পুরস্কার পেয়ে যাবো আমি কখনও ভাবি নি। এক মুহূর্তের জন্যে উপহার ফিরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা হয়েছিলো। কিন্তু ওই এক মুহূর্তের জন্যেই। সংবিৎ ফিরে পেতে দেখলাম, ফারাও মামোসের নির্মাণাধীন সমাধিক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে নদীর ও মাথার খালের কাছে চলে এসেছি।

এখানেই মমি করা হবে মহান ফারাও-এর শবদেহ। স্থপতিদের সাহায্য না নিয়ে আমি নিজে নকশা করেছি নীল নদ থেকে আসা খালগুলোর। আমার ধারণা, গজ-দ্বীপে নিজের আলিশান প্রাসাদে মৃত্যুর পর রাজকীয় জলযানে করে নিয়ে আসা হবে মহান ফারাও-এর শবদেহ। তাই বিশাল এই জলযানের আকৃতির কথা মনে রেখে চওড়া করে কাটা হয়েছে খালগুলো।

আমার ছোরার ফলার মতো সোজাসুজি সমভূমির ভেতর দিয়ে চলে গেছে খাল, দুই হাজার ফুট সামনে সেই কঙ্কালসার সাহারা প্রদেশের পাহারশ্রেণীর পাদদেশ পর্যন্ত । বহু বছর ধরে, বহু শ্রমিকের ঘাম-ঝরা প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছে এই পাথর বাঁধানো জলপথ। দুই পাশের পাড়ে দাঁড়িয়ে জাহাজে বাধা দড়ি ধরে টেনে নিয়ে চললো দাস বাহিনী; করুণ সুরের গান তাদের কন্ঠে । দুই ধারের জমিতে কাজ করতে থাকা কৃষকের দল ছুটে এলো ফারাও-কে অভ্যর্থনা জানাতে। অবশেষে, নিখুঁতভাবে জাহাজ ঘায় ভীড়লো রাজকীয় জলযান।

ইনটেফের আহ্বানে তাঁর জন্যে তৈরি কাঠের বিশাল বাহনে চড়ে বসলেন ফারাও। স্বর্ণ-মণ্ডিত এই অতিকায় বাহনে করেই বহন করা হবে তাঁর রাজকীয় শবাধার। অবুঝের মতো চকচক করছে ফারাও-এর চোখ; খুশিতে, উত্তেজনায়। তার বিষণ্ণ জীবনে হয়তো এটাই একমাত্র আনন্দের খোরাক–অন্ততঃ এই মুহূর্তে। দুঃখ হলো তার জন্যে। জীবনের সমস্ত শক্তি, প্রচেষ্টা দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করার পূর্ব পরিকল্পনায় মত্ত আমাদের মহান নেতা।

যেন ঘোরের বসেই, ইনটেফ-কেও তাঁর রাজকীয় বাহনে ডেকে নিলেন ফারাও। এরপরে মুখ নিচু করে কিছু একটা বললেন রাজ-উজিরের কানে।

হেসে, লসট্রিসের উদ্দেশ্যে ইশারা করলেন ইনটেফ। স্পষ্টতঃই, লজ্জায়, উত্তেজনায় লাল হয়ে গেছে লসট্রিস। খুবই অদ্ভুত ব্যপার, সাধারণত নিজেকে অপ্রস্তুত অবস্থায় খুব কমই আবিষ্কার করেছে মিসট্রেস। অবশ্য দ্রুতই সামলে নিতে পারলো ও, মৃদু হাসির সাথে তার লম্বা পায়ের মোহনীয় ভঙ্গিমায় এগিয়ে গিয়ে চড়ে বসলো ফারাও-এর পালকিতে।

রাজার সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে তিনবার মাথা ঠুকলো তাঁর পায়ের কাছে। এরপর, তাবৎ সভাসদ আর মন্দিরের সমস্ত পুরোহিতের সামনে অদ্ভুত একটা আচরণ করলেন ফারাও। নিচু হয়ে লসট্রিসের হাত নিজের হাতে তুলে নিলেন তিনি, ধরে বসিয়ে দিলেন নিজের পাশে। মহান ফারাও-এর রাজকীয় আচরণের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এটা। তার মন্ত্রীরা সবাই মুখ চাওয়া-চাউয়ি শুরু করে দিয়েছে।

আরও কিছু ঘটেছিলো ওখানে সেদিন, যা কেউ টের পায় নি। আমার বাল্যকালে, বধির একজন দাসের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিলো। ও আমাকে শিখিয়েছিলো কেমন করে শব্দ না শুনে কেবল ঠোঁটের নড়াচড়া দেখেই মানুষের কথা আঁচ করা যায়। অসাধারণ জ্ঞান এটা আমি আত্মস্থ করেছিলাম পুরোপুরি।

আর এখন, আমি জানি ফারাও গলা নামিয়ে আমার মিসট্রেসকে বলছেন, মন্দিরের মশালের আলোয় আইসিস যেমন স্বর্গীয়, আজ সূর্যালোকেও তুমি ঠিক তাই।

যেনো ঘুষি খেলাম পেটে। আমি কী অন্ধ ছিলাম, না আহাম্মক হয়ে গেছি? একটা গর্দভও বুঝতে পারতো আমার দেওয়া ব্যবস্থা ফারাও-কে কোন দিকে চালিত করছে।

নিঃসন্দেহে, আমার পরামর্শ লসট্রিসের দিকে মনোযোগ সরিয়ে দিয়েছে ফারা এর। রাজ্যের সবচেয়ে সুন্দরী নারী, রজঃচক্রের কেবল প্রথম বছর চলছে যার–এ যে লসট্রিস স্বয়ং। আর কাব্যনাট্যে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করতে দিয়ে দারুন উপাদেয়রূপে রাজার সামনে তাকে উপস্থাপন করেছি আমি।

হঠাৎ বুঝলাম, যা ঘটতে চলেছে তার দায়ভার সম্পূর্ণই আমার। কিছু করার নেই আর । হতবাক, নির্বোধ আমি দাঁড়িয়ে রইলাম সূর্যালোকে।

অবশেষে যখন ঘর্মাক্ত কলেবরে পুরোহিতেরা কাঁধে তুলে নিলেন রাজার পালকি, চমক ভাঙল আমার । কিছু বোঝার আগেই দেখি সমাধি-মন্দিরের আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে আছি। রাজকীয় সমাধি-স্থানের দরোজায় ঠেলেঠুলে জায়গা করে নিয়ে পালকির পাশে এসে থামলাম। পুরোহিতদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে লসট্রিসের অবস্থানের ঠিক নিচে চলে এলাম। ইচ্ছে করলে ওর হাত ছুঁতে পারি এখন। ওর সব কথা পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি। নিজেকে পুরোপুরি সামলে নিয়ে এখন রাজার সঙ্গে স্বতস্ফুর্ত হাসি আর বাক্যলাপে মগ্ন লসট্রিস। মনে পড়লো, গত রাতে ঠিক এ-ই করতে চাইছিলো সে; ফারাও-কে মুগ্ধ করে তার এবং ট্যানাসের পরিণয়ের রাস্তা তৈরি করা। হায় অপরিণত মন! আজ, এই মুহূর্তে, গত রাতের মতো ওর পরিকল্পনা উপেক্ষা করতে পারছি না। অবুঝ মেয়েটা জানে না, কোন বিপদজনক পথে হাঁটছে সে। অসাধারণ যে কাহিনী বলছি আপনাদের, তাতে যদি শুরুতেই জানিয়ে দিতাম, লসট্রিসের কাঁচা মনে কেবল আবেগী হাওয়া বয়–তবে ঐতিহাসিক হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করা হতো না। আমি সত্যের অপলাপ করবো না বলে পণ করেছি, কিছুতেই ভাঙবো না এই প্রতিজ্ঞা। এতো অল্প বয়সেও লসট্রিস ছিলো অত্যন্ত বিচক্ষণ মেয়ে। আমাদের মিশরের মেয়েরা নীলের জলে-বাতাসে দ্রুত বেড়ে উঠে। লসট্রিস শুধু মনোযোগী ছাত্রী নয়, উজ্জ্বল মনের অনুসন্ধিৎসু একজন নারীও বটে। আমি, টাইটার পরিচর্যাতেই বিকশিত হয়েছে। ওর সমস্ত গুণাবলি।

আমার তত্ত্বাবধানে ও এমন অবস্থানে পৌঁচেছে, ইচ্ছে করলেই মন্দিরের বিজ্ঞ পুরোহিতদের সাথে ধার্মিক তত্ত্ব নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা করতে পারে। প্রাসাদের গ্রন্থাগারের প্রায় প্রতিটি স্ক্রোল পড়ে ফেলেছে ও, তার মধ্যে আমার রচিত প্রায় এক হাজারেরও বেশি স্ক্রোল আছে। চিকিৎসাবিদ্যা সংক্রান্তই হোক বা নৌযুদ্ধের কৌশল; অথবা জোতির্বিজ্ঞান, তীর-চালনা, তলোয়ার চালনা বিষয়ক সবকিছুই আগ্রহ নিয়ে পড়েছে লসট্রিস। এমনকি, আমার স্থাপত্য-কৌশলের সঙ্গে মহান ইমহোটেপ-এর কৌশলের তুলনা পর্যন্ত করতে পারঙ্গম আমার মিসট্রেস।

কাজেই, ফারাও-কে মুগ্ধ করবার মতো সব বিষয়েই অনর্গল বলতে পারে সে। ওর শব্দ-ভান্ডার বিশাল; ধাঁধা, কৌতুক আর ছন্দ্য-বাক্যে ফারাও মোহাবিষ্ট হয়ে রইলেন পুরোটা সময়। মিসট্রেসের সুললিত কণ্ঠ, তার মাদক হাসি যে কোনো পুরুষকে প্রলুব্ধ করবে। কী দেবতা, কী মানব কোথাও নেই এমন সুষম সৌন্দর্য । আর যখন ক্ষয়িষ্ণু একজন মানুষের কাছে পুত্র সন্তানের উত্তরাধিকারের মতো আরাধ্য ব্যপার অর্জিত হতে পারে তার মাধ্যমে প্রলোভন সামলানো অসম্ভব বইকি।

যেমন করেই হোক ওকে সতর্ক করতে হবে। কিন্তু একজন তুচ্ছ দাস কেমন করে অসীম উচ্চতার মানুষজনের আলাপে বিঘ্ন ঘটাতে পারে? লসট্রিসের কিন্নর কণ্ঠ শুনতে শুনতে চিন্তাক্লিষ্টভাবে হেঁটে চললাম আমি।

প্রায় দুপুর গড়িয়ে এলো ফারাও-এর সমাধি-মন্দিরের কাজ পরিদর্শন শেষ হতে। মন্দিরের আঙ্গিনায় সবার জন্যে উন্মুক্ত ভোজের আয়োজন করা হয়েছে।

এসো, এখানে কাছে এসে বসো, নক্ষত্ররাজি নিয়ে কথা বলবো আমরা! আবারো রাজকীয় আচরণ লঙ্ঘন করে তার জেষ্ঠ স্ত্রীকে সরিয়ে দিয়ে লসট্রিসকে পাশে বসালেন ফারাও। খাবারের পুরোটা সময় তার মনোযোগ অধিকার করে রাখলো লসট্রিস। রাজা তো বটেই, আশেপাশের সবাই তন্ময় হয়ে শুনলো তার কথা।

দাস হওয়ায় ভোজে অংশগ্রহণের যোগ্য নই আমি। লসট্রিসকে সতর্ক করার আর কোনো উপায় রইলো না। পাথরের একটা সিংহের মূর্তির পদতলে বসে সবার দিকে নজর রাখলাম পুরোটা সময় । আমি একা নই, নিজের বিছানো জালের কেন্দ্রে বসে থাকা মাকড়শার মতোই নিরাসক্তভাবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলেন ইনটেফ। অদ্ভুত রকম জ্বলছিলো তার চোখ দুটো।

খাবারের এক পর্যায়ে এসে লম্বা, হলুদ ঠোঁটের একটা চিল মাথার উপরে ডেকে উঠেছিলো। যেনো উপহাসের তীক্ষ্ণ হাসি হাসছিলো ওটা। খারাপ শক্তির বিপরীতে চিহ্ন আঁকলাম বুকে। কে বলবে, কোন্ দেবতা ওই চিলের ছদ্মবেশে এসে কী অভিশাপ দিয়ে গেলো?

ভোজের পর এক ঘন্টা বিশ্রাম করাই রীতি, আর বছরের এই সময়ে তো সেটা অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এতটাই তরতাজা বোধ করছিলেন মহান ফারাও, সেটা পর্যন্ত নিতে অস্বীকার করলেন। ধন-সম্পদ দেখবার বাসনা প্রকাশ করলেন তিনি। মুকুট লাভের পর থেকেই, গত বারো বছর ধরে সমাধির জন্যে সম্পদ সংগ্রহ করা হচ্ছে তার জন্যে। এর সবই রক্ষিত আছে ছয়টি বিরাট প্রকোষ্ঠে।

প্রথম প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করলেন ফারাও। এতে রয়েছে যুদ্ধ আর শিকারে ব্যবহৃত সমস্ত অস্ত্রাদি। নিজের সঙ্গে করে ওগুলোকে পরজগতে নিয়ে যাবেন মহান ফারাও, যদি তার প্রয়োজনে লাগে সেখানে। ইনটেফের নির্দেশে নিচু কাঠামোর উপরে এক এক করে সেগুলোকে সাজিয়ে রেখেছি আমি, যাতে করে ভালোভাবে দেখতে পান ফারাও।

ওগুলো পরিদর্শনের সময় এতো বেশি কৌশলগত প্রশ্ন করছিলেন তিনি, মন্দিরের পুরোহিত আর রাজকীয় সভাসদেরা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে এদিক-সেদিক চাইতে লাগলেন, যেনো আশা করছেন তাদের হয়ে কেউ ফারাও এর প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেবে। শেষমেষ আমাকে ডেকে পাঠানো হলো। হন্তদন্ত হয়ে সামনে ছুটে গেলাম আমি, রাজার প্রশ্নবানের সামনে।

হুমম, আমাকে দেখে কপট তামাশার ভঙ্গিতে ভুড় কুঁচকালেন ফারাও। আরে, এ যে দেখছি সেই বিশ্বস্ত দাস, যে কিনা আবার নাটক লেখে রোগও সারায়! বলো দেখি, আমার জন্যে তৈরি করা যুদ্ধ ধনুকের ছিলো কোন বস্তু দিয়ে তৈরি?

মহান ফারাও, এক ভাগ তামা পাঁচ ভাগ রুপা আর চারভাগ সোনা দিয়ে তৈরি ওটা। কেবলমাত্র লট-এর খনিতে, সেই পশ্চিমের মরুতে পাওয়া যায় এই লাল সোনা। আর কোনো বস্তুই এতো ঘাতসহ, স্থিতিস্থাপক নয়, জনাব।

আচ্ছা! দুষ্ট বাচ্চাদের মতো সায় দিলেন ফারাও। কিন্তু ওটা এতো সরু করে তৈরি করলে কিভাবে? ঠিক আমার মাথার চুলের মতো?

মালিক, বিশেষভাবে নকশা করা পেন্ডুলামের মধ্য দিয়ে ধাতুটাকে গলিয়ে করা হয়েছে কাজটা। মালিক চাইলে পরে আপনাকে পুরো ব্যবস্থা দেখানো যাবে।

এর পর থেকে পরিদর্শনের বাকি সময় রাজার পাশে থাকার সুযোগ হলো আমার, কিন্তু লসট্রিসের সাথে একা কথা বলার কোনো উপায় পেলাম না।

অস্ত্রশালার বিপুল পরিমাণ বিচিত্র অস্ত্রের সবটুকু দেখলেন ফারাও। এর অনেকগুলো তাঁর পূর্বপুরুষের ব্যবহৃত। বিখ্যাত বহু যুদ্ধের সময়ে কাজে লেগেছিলো। আর বাকিগুলো সদ্য তৈরি, কখনই কোনো যুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না। প্রত্যেকটি বস্তুই গুণে অনন্য, একজন অস্ত্র বিশারদের শ্রেষ্ঠ কাজ। তামা, সোনা আর রুপার তৈরি মাথার আচ্ছাদন, বুকের বর্ম; হাতির দাঁতের হাতলওয়ালা তলোয়ার মূল্যবান পাথরে সজ্জিত; রাজার বিশেষ বাহিনীর প্রধানের পোশা; জলহস্তি এবং কুমীরের চামড়ায় তৈরি বর্ম প্রতিটি বস্তু স্বর্ণ-খচিত । অসাধারণ এক প্রদর্শনী।

অস্ত্রশালা ছেড়ে এবারে আসবাবপত্রের প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করলেন ফারাও। ওখানে একশ জন আসবাব-শিল্পী সিডার, একাশিয়া আর মূল্যবান ইবোনি কাঠের তক্তা দিয়ে ফারাও-এর শেষযাত্রার জন্যে বিছানা তৈরি করছে। আমাদের এই উর্বর জনপদে বৃক্ষ জন্মে খুব কম, কাঠ আমাদের জন্যে বিলাসী দ্রব্য দারুন মূল্যবান। নিঃসন্দেহে এখানকার প্রতিটি কাঠের গুঁড়ি এসেছে সুদূর কোথাও হতে; মরুর ওপার থেকে, নয়তো দক্ষিণের ওই রহস্যময় এলাকা থেকে। উঁচু করে জমা করা হয়েছে কাঠের গুঁড়ি গুলো, যেনো খুবই সহজলভ্য একটি বস্তু ওটি। কাঠের গুঁড়োর গন্ধে মৌ মৌ করছে পুরো প্রকোষ্ঠ ।

আমাদের সম্মুখেই শ্রেষ্ঠ মুক্তো দিয়ে ফারাও-এর অন্তিম-শয্যার মাথার অংশের কাজ শেষ করলেন শিল্পী। বাকিরা মিলে কেদারা এবং বসার অন্যান্য আসবাবের অলঙ্করণের কাজ করে চললো। রুপার সিংহ আর সোনার বাজপাখি দিয়ে সজ্জিত হতে লাগলো প্রতিটি আসবাব। এমনকি গজদ্বীপে, রাজপ্রাসাদেও এতো নিখুঁত বস্তু নেই।

আসবাবপত্রের প্রকোষ্ঠ ছেড়ে এবারে ভাস্কর্যের প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করলাম আমরা। মার্বেল, গ্রানাইট আর স্যান্ডস্টোনের খন্ড নিয়ে কাজ করে চলেছেন ভাস্করেরা। তাদের ছেনি, হাতুরি, বাটালের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে পাতলা ধুলো ভাসছে বাতাসে। মুখে কাপড় বেঁধে চলছে পাথর খোদাই-এর কাজ। পাতালা, সাদাটে ধুলোয় আপাদস্তক ঢাকা একেকজন শুষ্ক কাশি কাসছেন থেকে থেকে। এ রোগ সাড়বে না। ত্রিশ বছর ধরে ভাস্করের কাজ করা এক ব্যক্তির দেহ কেটে দেখেছি আমি; তার ফুসফুঁসে পাথরের কণা জমা হয়ে গিয়েছিলো। যত দ্রুত সম্ভব সরে এলাম ওখান থেকে।

তাদের কাজ অসাধারণ, সন্দেহ নেই। ফারাও এবং অসংখ্য দেব-দেবীর মূর্তিগুলো দেখে মনে হয়, যেনো এখনই কথা বলে উঠবে। সিংহাসনে উপবিষ্ট ফারাও, হেঁটে চলেছেন; কী দেবতার বেশে, কী মানবের রুপে মহান ফারাও-এর অসংখ্য বিশালাকায় মূর্তি রয়েছে সেখানে। লম্বা যে গলিপথ চলে গেছে সেই কালো পাহাড় পর্যন্ত, তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়েছে মূর্তিগুলো। তাঁর মৃত্যুর পরে স্বর্ণ মন্ডিত কাঠের বাহন টেনে নেবে একশ সাদা ষড়। বিশাল শবাধারের ওজন টানে, এমন সাধ্যি কোনো মানুষের নেই।

পাথুরে শবাধারের নির্মাণ এখনও শেষ হয়নি পুরোপুরি। ভোলা কক্ষের মাঝখানে রয়েছে সেটা। আসুনের খনি থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিলো গোলাপী গ্রানাইটের এই একক খন্ডটি। বিশেষ জলযানে করে নিয়ে আসা হয়েছিলো তখন। পাঁচশো দাস লেগেছে তীর থেকে টেনে ওটাকে ভেতরে নিয়ে আসতে। এখন এই বিশাল গ্রানাইটের খন্ড খোদাই করা হচ্ছে যাতে করে ফারাও-এর কফিন এটে যায় ভেতরে। মোট সাতটি কফিন নির্মাণ করা হবে এর ভেতরে, সাত একটি পবিত্র সংখ্যা বলে গণ্য করা হয়। সবচেয়ে ভেতরের কফিনটি হবে সম্পূর্ণ সোনায় নির্মিত। পরবর্তীতে সেটার নির্মাণও দেখেছিলাম আমরা ।

মূর্তির এই মেলায় একটা অসাধারণ সংযোজন হলো উশব তি। প্রকোষ্ঠের পেছন দিকে নির্মাণ করা হয়েছে ফারাও-এর অন্তিম যাত্রায় তাঁকে পাহারা দেওয়া দাস এবং ভৃত্যদের নকল। এই জীবনে, এবং বাকি যতো জীবন আছে সবসময়ে রাজার সেবায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যারা; মিশরীয় সমাজের সমস্ত পেশার মানুষের কাঠের পুতুল তৈরি করা হয়েছে। নির্দিষ্ট পেশার মানুষের পোশাক, যন্ত্রপাতি সমেত পুতুলগুলো খুবই চমকপ্রদ। এখানে রয়েছে কৃষক এবং মালী; সৈনিক এবং খাজনা-আদায়কারী; জেলে এবং মুদি; মদ-প্রস্তুতকারী এবং চাকরানি; লিপিকার এবং বর্বর, হাজার হাজার তুচ্ছ শ্রমিক প্রত্যেকের উশব তি। বলা তো যায় না, পরের জীবনে কাকে কখন প্রয়োজন পরে মহান ফারাও-এর।

এই ছোট্ট পুতুলগুলোর নেতৃত্বে রয়েছে আমার মনিব, ইনটেফের একটি কাঠের পুতুল। ওটা হাতে তুলে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখতে লাগলেন ফারাও। পুতুলের পেছনের খোদাই করা লেখাগুলোও পড়লেন।

আমি জমিদার ইনটেফ, উচ্চ-রাজ্যের রাজ-উজির। ফারাও-এর সবসময়ের সঙ্গী, তিনবার প্রশংসার স্বর্ণ উপাধি জয়ী। রাজার হয়ে জবাব দিতে আমি প্রস্তুত আছি।

পুতুলটা ইনটেফের হাতে দিয়ে ফারাও মন্তব্য করলেন, আপনি কী সত্যিই অতটা পেশীবহুল, হে উজির? মাথা নিচু করলেন ইনটেফ।

ভাস্কর ঠিক আমাকে ফুটিয়ে তুলতে পারে নি, মহান ফারাও।

আজকের দিনের শেষ পরিদর্শন হিসেবে ফারাও এবারে গেলেন স্বর্ণকারদের প্রকোষ্ঠে। অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে নিচু আসনে বসে কাজ করছে তারা। চুল্লীর গনগনে আগুন কেমন অপার্থিব আলো ছড়াচ্ছে সেখানে। যোগ্য শিক্ষা দিয়েছি আমি ওদের। ফারাও-এর প্রবেশক্ষণে হাঁটুর উপরে নিচু হলো তারা সবাই, এরপর আবারো নিরবে কাজে লেগে পরলো।

এতো বড় প্রকোষ্ঠ, অথচ চুল্লীর গরমে সেখানে শ্বাস নেওয়া দায়। নিমিষেই ঘামে ভিজে গোসল হয়ে গেলো আমাদের। কিন্তু তাঁর সামনের সম্পদে এতটাই মোহাবিষ্ট হয়ে পরেছেন ফারাও, গরম গ্রাহ্যই করলেন না। প্রকোষ্ঠের মাঝখানে, যেখানে সোনার কফিনের কাজ করছে শিল্পীরা, প্রায় ছুটে সেখানে চললেন তিনি। চকচকে ধাতুতে ফারাও-এর মুখাবয়ব চমৎকার ফুটিয়েছে তারা। সহজেই মহান ফারাও-এর পট্টি-বাঁধা মুখে এটে যাবে মৃত্যু-মুখোশটা। অবিসিডিয়ান এবং পাথুরে-ক্রিস্টালে তৈরি চোখ, মাথার উপরে ফনা তোলা গোখরোর ছবি অঙ্কিত ইউরিয়াস মুকুট। আমি নিশ্চিত, হাজার বছরেও কোনো স্বর্ণকার এমন একটি জিনিস তৈরি করে নি কখনও। অনাগত দিনগুলোর মানুষজন একদিন অবাক বিস্ময়ে দেখবে এই সৃষ্টি।

দেখেও যেনো আশ মিটছিলো না আমাদের সম্রাটের । দিনের বাকি সময় ওটার পাশে পার করে দিলেন, সাদা রঙের নিচু একটা আসনে বসে। তার সামনে পরে রইলো সিডার কাঠের বাক্সের পর বাক্স ভর্তি স্বর্ণ-রত্ন।

এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, এতো বেশি পরিমাণ সম্পদ কখনও একত্র করা সম্ভব হয়েছিলো। কেবলমাত্র তালিকা তৈরি করে এর ব্যপকতা এবং বিচিত্রতা বোঝানো বোধ করি অসম্ভব। যা হোক, আপনাদের একটা ধারণা দেওয়ার জন্যে বলছি, ইতোমধ্যেই ছয় হাজার চারশ পঞ্চান্ন খন্ড সিডার বাক্সে ভরে গেছে। প্রতিদিন আরো একটু একটু করে যোগ করছে স্বর্ণকারেরা।

ফারাও-এর হাত এবং পায়ের আঙুলের জন্যে রয়েছে আংটি। রয়েছে বাজুবন্ধ, হার। দেব-দেবীদের স্বর্ণের প্রতিরূপ। বুকের আচ্ছাদন, কোমরবন্ধ–যাতে অলংকৃত করা আছে বাজপাখি, শকুন থেকে শুরু করে দুনিয়ার সমস্ত প্রাণীর ছবি। ল্যাপিস লাজুলি আর গারনেট, এজেট, কারণেলিয়ান, জেসপারসহ পৃথিবীর তাবৎ মূল্যবান পাথরে সজ্জিত মুকুট।

বিগত এক হাজার বছরের শিল্পের প্রতিফলন এই সম্পদ। ইতিহাস বলে, জাতীর ক্রান্তিলগ্নে নাকি তৈরি হয় তার শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম। সাম্রাজ্যের শুরুর দিকে গঠনের দিকে লক্ষ্য থাকে সবার। ঠিক যখন একটি কাঠামো তৈরি হয়ে যায়, কিছুটা বিশ্রামে যেতে পারে মানুষ; মনের খোরাক হিসেবে তখনই সৃষ্টি হয় শিল্প-সাহিত্য। এবং অতি অবশ্যই, ধনবান এবং প্রভাবশালী ব্যক্তির সমর্থন প্রয়োজন শিল্প-সৃষ্টিতে।

সমস্ত স্বর্ণ-রত্নের ওজন ইতোমধ্যে পাঁচশ টাখ ছাড়িয়ে গেছে। নিশ্চই পাঁচশ সমর্থ লোক প্রয়োজন হবে এগুলো তুলতে। আমি হিসেব করে দেখেছি, বিগত এক হাজার বছরে তৈরি হওয়া সমস্ত ধন-সম্পদের ওজনের দশ ভাগের একভাগ ওজন এই সমাধি-সম্পদের। আর এই সমস্তই নিজের সঙ্গে করে কফিনে নিয়ে যাবেন মহান ফারাও।

একজন সম্রাটের মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে নিয়ে যাওয়া সম্পদের মূল্য হিসেব করার আমি কে? কেবল এটুকু বলি, এতো ধন-সম্পদ একত্র করতে গিয়ে, একই সঙ্গে নিম্ন রাজ্যের সাথে যুদ্ধের ব্যয় হিসেবে ধরলে, ফারাও একাই আমাদের এই মিশরকে ভিক্ষুকের ঝুলিতে পরিণত করে ফেলেছেন।

ট্যানাস যে তার আবেদনে খাজনা-আদায়কারীদের দৌরাত্নের কথা বলেছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। খাজনা-আদায়কারী এবং রাজ্যের কোণে কোণে রাজত্ব করা দস্যুদের অত্যাচারে আমরা আজ জর্জরিত। এ থেকে বাঁচতে হলে এদের নাগপাশ ছিঁড়ে বেরুতে হবে। নিজের কারণে যখন আমাদের রাজা ভিক্ষুকে পরিণত করছেন পুরো জাতিকে, আমরা যারা এই সমস্ত অবলোকন করেও চুপ আছি তারা সবাই দোষী। ধনী-নির্ধন, মহান বা নিচু বর্ণের আমাদের মধ্যে খুব কম লোকই আছে, যারা রাতে ভালো ঘুমায়। আশঙ্কায় দিন গুনি আমরা, কখন দরোজায় কড়া নাড়বে খাজনা আদায়কারী ।

হায় দুর্ভাগা, নির্যাতিত মাটি, আর কতকাল আর্তনাদ করে যাবে তুমি?

*

নীলনদের পশ্চিম তীরে, কালো কঙ্কালসার পাহাড়শ্রেণীর পাদদেশে নিজের অন্তিম-বাসস্থানের কাছেই নেক্রোপলিসে তৈরি করা হয়েছে ফারাও-এর আলিশান অস্থায়ী আবাস।

মৃতের নগরী, নেক্রোপলিস আয়তনে কারনাকের মতোই বিশাল। সমাধি-মন্দির এবং রাজকীয় শবের নির্মাণ এবং পরিচর্যায় নিয়োজিত লোকজনের ভিটে এখানে। সম্পূর্ণ একটি রাজকীয় বাহিনী সবসময় মোতায়েন রাখা হয়; কেননা উত্তরের দস্যুদের ধন-সম্পদের প্রতি লালসা আমাদের রাজার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ওদিকে, মরুর ডাকাতদল দিন দিন আরো সাহসী হয়ে উঠছে। সমাধি মন্দিরের ধন-সম্পদ যে কারো জন্যেই লোভনীয় একটা শিকার–তা সে যে রাজ্যের লোকই হোক না কেন।

রক্ষীরা বাদে, শিল্পী এবং কারিগরদের পরিবারও বাস করে এখানে। এদের সবার খাবার-দাবার এবং খরচাপাতি হিসেবের দায়িত্বে ছিলাম আমি। সঠিকভাবেই তাই জানা আছে, ঠিক কত জন লোকের বাস এখানে। শেষবারের মজুরি মিটানোর দিনে চার হাজার আটশ এগারো জন ছিলো। এছাড়াও, প্রায় দশ হাজার দাস তো রয়েছেই।

প্রতিদিন এদের খাবারের জন্যে কতটি ষাঁড় বা ভেড়া জবাই করতে হয়, সে হিসেব দিয়ে নিজেকে উদ্বিগ্ন করতে চাই না। নীলনদ থেকে কত মাছের সরবারহ আনা হয় এখানে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। চাবুকের তলায় নিয়ত পরিশ্রমরত এই জনগোষ্ঠীর পিপাসা মিটাতে চোলাই করা হয় হাজার হাজার পাত্র মদ।

যেহেতু নেক্রোপলিস একটি নগরী, ফারাও-এর বসবাসের জন্যে প্রাসাদ আছে এখানেও। দিনের শেষে ক্লান্ত আমরা প্রবেশ করলাম সেখানে। কিন্তু একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পেলাম না এবারেও।

লসট্রিসের নাগাল পেতে যেয়ে ব্যর্থ হতে হলো। কালো দাসী মেয়েটা প্রথমবারে জানালো স্নানাগারে আছে সে; এরপরে বিশ্রাম নিচ্ছে। ধৈর্য্য ধরে তবুও বসে ছিলাম ওর কামরার অভ্যর্থনা অংশে, ঠিক সেই সময় তলব এলো ইনটেফের তরফ থেকে । আর দেরি করা সম্ভব নয়, ছুটে গেলাম।

আমি তার কক্ষে প্রবেশ করতেই অন্য সবাইকে চলে যেতে বললেন ইনটেফ। একা হতে চুমো খেলেন ঠোঁটে। তার এমন দয়া-পরবশ আচরণে বিস্মিত না হয়ে পারলাম না। খুব কমই এমন উচ্ছল থাকেন আমার মনিব।

ধন-সম্পদ আর ক্ষমতার রাস্তাটা মাঝে মধ্যে কী বিচিত্র ভাবেই না মিলে যায়। আমাকে একটু সোহাগ করে নিয়ে হেসে বললেন ইনটেফ। এবারে, ওই পথ এক মেয়েমানুষের উরুর মাঝখানে লুকিয়ে ছিলো, ভাবতে পারো? না বোঝার ভান করো না, প্রিয়, তোমার ধূর্ত মাথাটার কথা আমার জানা আছে। ফারাও আমাকে জানিয়েছেন, তুমিই এই পথে প্ররোচিত করেছে তাকে, ছেলে সন্তানের উত্তরাধিকারের কথা প্রতিজ্ঞা করে। সেথ্‌-এর কসম, তোমার ধূর্ততার তুলনা হয় না। আমাকে কিছু না জানতে দিয়ে কী অসাধারণ পরিকল্পনা করলে!

আবারো হেসে উঠে দুই আঙুলের ফাঁকে আমার চুলের গাছি জড়াতে লাগলেন ইনটেফ। নির্ঘাত শুরু থেকেই এটা তোমার মনে ছিলো, আমাকে কিছু বলে নি। নিজে থেকে উদ্যোগ নিয়ে কাজ সমাধা করলে। অবশ্যই, এসব আমাকে না বলার জন্যে তোমাকে শাস্তি দেওয়া উচিত। আমার চোখে পানি চলে আসা পর্যন্ত চুলের গাছি আঙুলে পেচালেন ইনটেফ। কিন্তু কেমন করে তোমাকে শাস্তি দিই, যখন দ্বৈত-মুকুট আমার ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে নিয়ে এসেছো তুমি? চুলের গাছি ছেড়ে দিয়ে আমাকে চুমো খেলেন ইনটেফ। মাত্রই রাজার ওখান থেকে এলাম। দুই দিন পরে, উৎসবের শেষ দিনে, আমার কন্যা লসট্রিসের সাথে তার সম্বন্ধের ঘোষণা দেবেন তিনি। অনুভব করলাম, একটা অন্ধকার যেনো ছেয়ে এলো আমার চারপাশে, বরফ-ঠাণ্ডা শিশির যেনো ত্বক স্পর্শ করলো।

সেদিনই, উৎসবের সমাপ্তির পরপরই বিয়ে হবে। আমিই তাড়াহুড়ো করেছি ওটা নিয়ে, বেতাল কিছু ঘটার আগে ভালোয় ভালোয় হয়ে যাক বিয়েটা–আমি তাই চাই।

এতো দ্রুত কোনো রাজকীয় বিবাহ সম্পন্ন হওয়া অস্বাভাবিক, তবে অশ্রুত নয়। রাজনৈতিক কোনো সুবিধা অর্জনের জন্যে বা কোনো ভূ-খণ্ডের অধিকার পাওয়ার জন্যে এ ধরনের তড়িৎ বিয়ের নজির রয়েছে। প্রথম মামোস- যিনি আমাদের বর্তমান ফারাও-এর পিতা; যুদ্ধক্ষেত্রে একজন হারিয়ান দলনেতার কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু আমার চরমতম দুঃস্বপ্নের সত্যি হওয়ার ঘটনায় সেই উদাহরণ কোনো স্বস্তি জোগালো না।

আমার এই অস্বস্তি ইনটেফ লক্ষ্য করলেন না। সামনের দিনগুলোর সুখ-স্বপ্নে বিভোর তিনি, কথা বলে চললেন। রাজার প্রস্তাবে আনুষ্ঠানিক সম্মতি দেওয়ার আগে আমি বলে নিয়েছি, যদি আমার কন্যার গর্ভে তার কোনো পুত্র সন্তান হয়, তবে প্রধান পত্নী এবং রাণীর মর্যাদা লসট্রিস পাবে। খুশির আতিশায্যে হাততালি দিলেন ইনটেফ।

নিশ্চই বুঝতে পারছো, এর অর্থ কি। যদি আমার নাতি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই ফারাও মারা যান, সেক্ষেত্রে তার দাদা হিসেবে এবং সবচেয়ে নিকট পুরুষ-আত্মীয় হওয়ার কারণে শাসনভার পেয়ে যাবো হঠাৎই কথা থামিয়ে আমার চোখে চেয়ে রইলেন ইনটেফ। আমি জানি তার মাথায় এখন কী চলছে। মনের কথা উচ্চারণ করে ফেলেছেন একজন মামুলি দাসের সামনে। নিখুঁত ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছেন তিনি। যদি লসট্রিসের গর্ভে ফারাও-এর কোনো পুত্র সন্তান হয়, তবে বেশিদিন বাঁচতে দেওয়া যাবে না ফারাওকে। আমরা দুইজনেই বুঝেছি ইনটেফের মনোবাঞ্ছ। আমার মনিব এইমাত্র রাজার মৃত্যু-পরোয়ানা ঘোষণা করেছেন। আর একমাত্র জীবিত মানুষ, যে ওটা উচ্চারিত হতে শুনেছে, সে হলাম আমি, টাইটা–একজন মামুলি ক্রীতদাস। পরস্পরকে পরিষ্কার বুঝতে পারলাম আমরা সেই রাতে।

মালিক, ঠিক যেভাবে আমি সবকিছু পরিকল্পনা করেছিলাম, সেভাবে সবকিছু হওয়ায় আমি কৃতজ্ঞ। এখন স্বীকার করছি, ইচ্ছে করেই আপনার কন্যাকে রাজার যাত্রা পথে ঠেলে দিয়েছিলাম আমি। আমিই ফারাও-কে বলেছি, সে হতে যাচ্ছে রাজার পুত্র সন্তানের জননী। গীতি-নাট্যে ইচ্ছে করেই তার সম্মুখে উপস্থাপন করেছি লসট্রিসকে। কিন্তু সফল হওয়ার আগ পর্যন্ত এসব কথা আপনাকে বলার সাহস করে উঠতে পারিনি। কিন্তু এখনও অনেক কাজ বাকি আছে। সঙ্গে সঙ্গেই একটা বিরাট তালিকা বলে যেতে লাগলাম; মিশরের সোনালি মুকুট পরিধানের আগে আর কী কী সমস্যা ইনটেফের হতে পারে সেই বিষয়ে। কৌশলে জানালাম, আমাকে এখনও কত প্রয়োজন তাঁর। ধীরে ধীরে শিথিল হলেন ইনটেফ। বুঝলাম অন্তত নিকট ভবিষ্যতের জন্যে আমার জীবন নিরাপদ।

এরও বেশ অনেকক্ষণ পরে ইনটেফের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে লসট্রিসের প্রকোষ্ঠের উদ্দেশ্যে ছুটলাম। কী ভয়ানক বিপদে তাকে ফেলেছি আমি, জানাতেই হবে ওকে। কিন্তু হঠাৎই থেমে দাঁড়ালাম ওর দরোজার সামনে। কী হবে ওকে সতর্ক করে? কেবল মানসিক অশান্তি, এমনকি আত্মহত্যা প্রবণতা উৎসাহিত করা হবে তাতে। ঘটনাবলির করুণ পরিণতি এড়াতে হলে দ্রুত কাজ করতে হবে এখন আমার ।

মাত্র একজন মানুষ এই মুহূর্তে সাহায্য করতে পারে আমাকে।

নেক্রোপলিস ছেড়ে চাঁদের আলোয় আলোকিত হাঁটা-পথ ধরে নদী তীরের উদ্দেশ্যে ছুটলাম আমি। ওখানেই আস্তানা গেড়েছে ট্যানাসের বাহিনী। পূর্ণিমার আর মাত্র তিন দিন বাকি, পশ্চিম দিগন্তের এলোমেলো পাহাড়ের সারি ঠাণ্ডা হলুদ আলো ছড়াচ্ছে, তাদের গাঢ় ছায়া পড়ছে নিচের সমভূমিতে। যেতে যেতে ভাবছিলাম আসছে দিনগুলোয় কী বিপদ অপেক্ষা করে আছে ট্যানাস, আমার আর লসট্রিসের জন্যে। নদী তীরে পৌঁছার অনেক আগেই ভিজে একশা হয়ে গেলাম।

নীল নদের তীরে, খালের মুখে সহজেই খুঁজে পাওয়া গেলো ট্যানাসের আস্তানা । যুদ্ধ গ্যালিগুলো একে একে নোঙড় করে রাখা হয়েছে খালের প্রবেশমুখে। আস্তানায় ঢোকার মুখে আমাকে বাধা দিলো পাহারাদার, পরে চিনতে পেরে পথ ছাড়লো। সোজা ট্যানাসের তাবুর উদ্দেশ্যে চললাম আমি।

ক্রাতাস এবং আরও চারজন বিশ্বস্ত সঙ্গীর সাথে রাতের খাবারে বসেছিলো ট্যানাস। হাসিমুখে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে স্বাগত জানালো সে, হাতের সুরার পাত্র বাড়িয়ে ধরলো। অবাক করলে, বন্ধু। এসো, পাশে বসে আরাম করে; তোমার জন্যে খাবার আনা হচ্ছে। তোমাকে কেমন যেনো অসুস্থ মনে হচ্ছে–

বুনো রাগে উন্মত্ত আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, সেথ্‌-এর সঙ্গে তুমিও একটা সত্যিকারের গর্দভ! কী উভয়সংকটে তুমি ফেলেছে আমাদের, জানো? তুমি আর তোমার ওই বড়ো মুখ! আমার মিসট্রেসের নিরাপত্তা কিংবা ভালো থাকা না থাকার কোনো মূল্য নেই তোমার কাছে! এতটা বলতে চাই নি আমি, কিন্তু একবার মুখের অর্গল খুলে যেতে এক নাগারে কথা ক টা বলে থামলাম। জানি, এসব কিছুর জন্যেই ট্যানাস দায়ী নয়।

এক হাত উঁচু করে যেনো নিজেকে আড়াল করলো সে। আরোপা একেবারে চমকে দিয়েছে। এ রকম আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্যে কেনো অস্ত্র এই মুহূর্তে নেই আমার কাছে। বলতে বলতে ঠোঁটের হাসি ধরে রেখে এক হাতে হিড়হিড় করে টেনে আমাকে তাবুর বাইরের অন্ধকারে নিয়ে এলো ট্যানাস। যেনো ছোট্ট একটা বাচ্চার মতো ঝুলতে লাগলাম তার শক্তিশালী হাতের উপর ।

এবারে খুলে বলো সবকিছু! ধীর লয়ে আদেশ করে ট্যানাস। কী এমন ঘটেছে, সবার সামনে এ ধরনের একটা আচরণ করলে?

এখনও রেগে আছি আমি, তবে রাগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়। সারা জীবন ধরেই তোমাকে তোমার গাধামোর হাত থেকে রক্ষা করে করে আমি ক্লান্ত। তুমি কী কখনও বুঝতে শিখবে না? গত রাতের নির্বোধ আচরণের পর তোমার ধারণা, তোমাকে এমনি এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে?

গীতি-নাট্যে আমার ঘোষণার কথা বলছো তুমি? বোকা বোকা দেখালো ট্যানাসকে। আমাকে মুঠো থেকে ছেড়ে দিলো সে। কেমন করে ওটাকে নির্বোধ আচরণ বলতে পারলে তুমি? আমার সব সৈনিকেরা, যার সাথেই আমি কথা বলেছি সবাই দারুন খুশি ওই ঘোষণায়–

আরে গাধা, তোমার সৈনিক আর বন্ধু-বান্ধবের মতামতের এক কানা-কড়ি মূল্যও নেই। অন্য যে কোনো শাসকের দিনে হলে এতক্ষণে মরে পচে যেতে, বন্ধু। কিন্তু, এমনকি আমাদের দুর্বল ফারাও পর্যন্ত তোমাকে ছাড়বে না। তার সিংহাসনের মায়া আছে। তোমাকে চরম মূল্য চুকাতে হবে, ট্যানাস, প্রভু হেরাব। হোরাস জানেন, কতো ভয়ঙ্কর হবে সেই হিসেব।

তুমি হেয়ালি করে বলছো, পাল্টা অভিযোগ করে ট্যানাস। আমি রাজার প্রতি দারুন অনুগত। উনার চারপাশে কেবল ভাঁড়েদের আনাগোনা, তারা রাতদিন মিছে কথা বলে তাঁকে। আমি তাকে সত্যি জানিয়েছি, আর আমি জানি, তিনিও ব্যপারটা চাইছিলেন। আমার প্রতি তার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

এহেন সোজাসুজি, নিখাদ সরল বিশ্বাসের সামনে আমার রাগ যেনো উবে গেলো। ট্যানাস, প্রিয় বন্ধু, কী বোকা তুমি! বিষাক্ত সত্য গলধঃকরণের পর কেউ কারও প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করে না। কিন্তু, ওটা বাদ দিলেও, ইনটেফের জালে নিজেকে ধরা পরতে দিয়েছো তুমি।

ইনটেফ? কঠোর চোখে আমার দিকে চাইলো ট্যানাস। ইনটে আবার কী করলেন? এমনভাবে বলছে, যেনো উনি আমার শত্রু। রাজ-উজির আমার বাবার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ছিলেন। আমি জানি, বিপদে-আপদে উনি আমার পাশে আছেন। বাবার মৃত্যু-শয্যায় তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।

টের পেলাম, আমার সাথে এতো দিনের বন্ধুত্ত সত্ত্বেও জীবনে এই প্রথমবারের মতো আমার উপর রেগে গেছে সে। ভালো করেই জানি, ট্যানাসের রাগ ভয়ঙ্কর।

ওহ, ট্যানাস, শেষমেষ আমার রাগের আগুনে ছাইচাপা দিলাম। আমি তোমাকে সত্যি বলি নি। অনেক কিছু বলা উচিত ছিলো, কিন্তু কখনও বলে উঠতে পারি নি। তুমি যা ভাবছো, তার কিছুই ঠিক নয়। কাপুরুষের মতো আচরণ করেছি আমি। কখনও তোমাকে বলিনি, ইনটেফ ছিলেন তোমার বাবার জানের শত্রু।

তা কী করে হয়? মাথা নাড়লো ট্যানাস। তারা দুজন বন্ধু ছিলেন, খুবই নিকটজন। ছোটো বয়সের কথা মনে পরে, দুজন কেবল একসাথে হাসতেন। বাবা বলেছিলেন, আমি ইনটেফের উপর আমার জীবন পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারি।

মহৎ পিয়াংকি, প্রভু হেরাব তাই বিশ্বাস করতেন। এই ভুল বিশ্বাসের কারণে সবকিছু হারিয়েছিলেন তিনি, শেষপর্যন্ত জীবনও দিয়েছেন।

না, না, এটা হতে পারে না। তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে। আমার বাবা অনেকগুলো দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছেন

তার প্রতিটি দুর্ভাগ্যের পেছনে ইনটেফের সযত্ন হাত ছিলো। তোমার বাবার জনপ্রিয়তা আর গুণাবলির জন্যে ইনটেফ হিংসা করতেন তাঁকে। তার ধন-সম্পদ এবং ফারাও-এর সুনজরের জন্যেও ঘৃণা করতেন। তিনি জানতেন, প্রভু হেরাবকে তার আগেই রাজ-উজিরের পদ দেওয়া হবে। এসব কারণেই তাঁকে দারুন ঘৃণা করতেন ইনটে।

আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। কিছুতেই না। দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে আমাকে নাকচ করে দিলো ট্যানাস। রাগের শেষ ভাবটুকুও উবে গেলো আমার।

আজ সব বলবো তোমাকে, আরও অনেকদিন আগেই উচিত ছিলো বলা। কী প্রমাণ চাও তুমি? সব বোঝাবার সময় এখন নেই। আমাকে বিশ্বাস কর। ঠিক তোমার বাবার মতো তোমাকেও মনে-প্রাণে ঘৃণা করেন প্রভু ইনটেফ। তুমি জানো না, লসট্রিস এবং তুমি মহাবিপদে আছো এই মুহূর্তে। না, না, প্রাণঘাতি কিছু নয়; কেবল পরস্পরকে চিরতরে হারাতে যাচ্ছ।

তা কী করে সম্ভব, টাইটা? আমার কথায় একটু নড়ে গেছে ট্যানাস। আমার তো ধারণা ছিলো, ইনটে আমার প্রস্তাবে সম্মত হয়েছেন। তুমি কথা বলো নি তার সাথে?

বলেছি, চিৎকার করে উঠে ট্যানাসের একটা হাত আমার জামার নিচে গলিয়ে দিলাম। এই ছিলো তার উত্তর। দেখেছো, চাবুকের আঘাতগুলো দ্যাখো! কেবল তোমাদের কথা বলার কারণে এই শাস্তি। তোমাকে এতোটাই ঘৃণা করেন ইনটে।

নির্বাক ট্যানাস আমার পানে চেয়ে রইলো, এতক্ষণে আমার কথা বিশ্বাস করেছে সে বুঝলাম। এবারে, যে ভয়ঙ্কর সংবাদ তাকে দিতে এসেছি আমি, তা বলতে পারবো বলে মনে হলো।

আমার কথা শোনো, ট্যানাস, প্রস্তুত হও, সরাসরি বলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমার হাতে; বিপরীত কোনো ক্ষেত্রে ট্যানাস নিজেও তাই করতো। আজ রাতে ইনটেফ তার মেয়ের বিয়ের ব্যপারে সম্মত হয়েছেন। খুব শীঘ্রই মহান ফারাও, মামোসের সঙ্গে তার বিয়ে; তাঁকে ছেলে সন্তান জন্ম দিতে পারলে লসট্রিস প্রধান পত্নী এবং রাণী হবে। ওসিরিসের উৎসবের শেষে রাজা স্বয়ং এই ঘোষণা দেবেন। সেই সন্ধাতেই বিয়ে সম্পন্ন হবে।

কেঁপে উঠলো ট্যানাস। চাঁদের আলোয় ছাই বর্ণ ধারণ করলো তার মুখাবয়ব। বহুক্ষণ কথা বলতে পারলাম না আমরা কেউই; অবশেষে আমাকে একা রেখে দূরের ফসলের গাদার কাছে নিচুপ দাঁড়িয়ে রইলো সে। পিছু পিছু এগুলাম আমি, বেশ কিছু সময় পর কালো একটা পাথরের উপরে বসলো ট্যানাস। যেনো এই কয়েক মুহূর্তে কয়েক দশক বেড়ে গেছে তার বয়স। ইচ্ছে করেই চুপ থাকলাম আমি। অবশেষে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত স্বরে জানতে চাইলো ট্যানাস, লসট্রিস রাজী হয়েছে এই বিয়েতে?

প্রশ্নই উঠে না। ও সম্ভবত এসবের কিছুই জানে না। কিন্তু রাজার ইচ্ছার কাছে ওর মতামতের কোনো মূল্য নেই।

আমাদের কী করা উচিত, টাইটা?

করুণায় মন ভরে গেলো আমার। আমাদের সামনে আরো একটা খারাপ সংবাদ আছে, ওকে সতর্ক করে দিয়ে বললাম। যেদিন নিজের বিয়ের ঘোষণা দেবেন ফারাও, ঠিক সেদিনই তোমাকে আটক করা হবে। হতে পারে, তোমার মৃত্যু পরোয়ানা ঘঘাষিত হবে। ইনটেফ, রাজার কান ভারী করে রেখেছেন। আর কারণও আছে, সত্যিই তোমার বক্তব্য দেশদ্রোহীতার সামিল।

লসট্রিসকে ছাড়া আমার বেঁচে থেকেই কী লাভ। ফারাও যদি ওকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়েই নেন, তবে তাঁর বিয়ের উৎসবে আমার গর্দান যাবে উপহার হিসেবে। এতো সহজ, সাধারণভাবে কথাটা বললো ট্যানাস, ওর উপরে রাগ ফিরিয়ে আনতে বেগ পেতে হলো।

অসহায় নারীর মতো কথা বলছো তুমি, যেনো কিছু করার নেই। কেমন ভালোবাসা তোমার, ওর জন্যে লড়তে পর্যন্ত পারবে না!

কার সঙ্গে লড়বো, একজন রাজা–একজন দেবতার সঙ্গে? শান্ত-স্বরে প্রতুত্তর করে ট্যানাস। একজন রাজা যার প্রতি তুমি একান্ত অনুগত; একজন দেবতা যিনি সূর্যের মতোই ধ্রুব?।

রাজা হিসেবে কোনোরকম আনুগত্য পাবার অধিকার হারিয়েছেন তিনি। তোমার ঘোষণায় কী তুমি তাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাও নি? একজন দুর্বল, ক্ষয়িষ্ণু মানুষ আমাদের ফারাও। তাঁরই জন্যে আজ আমাদের টা-মেরি ভেঙে পরেছে, রক্ত ঝরছে।

আর একজন দেবতা হিসেবে? আবারো অচঞ্চল কন্ঠে জানতে চায় ট্যানাস, যেনো এর উত্তরে ওর কোনো আগ্রহ নেই। বহু বীর যোদ্ধার মতো ট্যানাসও ধার্মিক, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মানুষ ।

দেবতা? কন্ঠে ব্যঙ্গের সুর যোগ করে বললাম। তোমার তলোয়ারধারী হাতে বহু দেবতা-ঈশ্বর আছেন যা বোধকরি তার ছোট্ট-নরম শরীরেও নেই।

কী করতে বলো তুমি? নিরাসক্ত ম্রতায় বললো ট্যানাস। আমি কী করতে পারি এখন?

বড়ো করে শ্বাস টেনে বিস্ফোরণ ঘটালাম আমি, তোমার সৈনিক আর সহচরেরা শেষমুহূর্ত পর্যন্ত তোমার সাথে আছে । তুমি সাহসী, সম্মান দিতে জানো সবাই পছন্দ করে তোমাকে–থেমে গেলাম আমি। চাঁদের রহস্যময় আলোয় ট্যানাসের মুখের অভিব্যক্তি আর কিছু বলতে উৎসাহ যোগালো না।

বিশটি দ্রুত হৃদস্পন্দন কেটে গেলো, রা করলো না ট্যানাস। অবশেষে নরম কণ্ঠে সে বললো, বলে যাও।

ট্যানাস, হাজার বছর ধরে তোমার মতো একজন ফারাও চাইছিলো আমাদের এই মাতৃভূমি। লসট্রিসকে পাশে নিয়ে, তুমি বসবে সিংহাসনে আবার আমাদের লোকেদের ফিরিয়ে দেবে সেই সময়, যখন মিশর ছিলো মহান। ডাকো তোমার যোদ্ধাদের, প্রাসাদ থেকে বিতারিত কর অযোগ্য ফারাওকে। আগামী সূর্যোদয়ের আগে তুমিই হবে আমাদের উচ্চ-রাজ্যের ফারাও। আগামী বছর এই সময়ে তোমার নেতৃত্বে দুই রাজ্য এক করবো আমরা। পরাজিত হবে যতো অপশিক্ত। ঝটকা মেরে দাঁড়িয়ে ট্যানাসের মুখোমুখি হলাম আমি। ট্যানাস-প্রভু হেরাব, তোমার নিয়তি, তোমার ভালোবাসা অপেক্ষায় আছে। এই দুটো শক্তিশালী যোদ্ধার হাতে তুলে নাও ওগুলো!

যোদ্ধার হাত হ্যাঁ, ঠিক বলেছো। বিড়বিড় করে বলে আমার মুখের সামনে হাত দুটো তুললো ও। এই হাত দিয়েই তো মিশরের জন্যে লড়েছি, রক্ষা করেছি তার অভিভাবককে। আমাকে মন্ত্রণা দিলে তুমি, বুড়ো বন্ধু। এগুলো বিশ্বাসঘাতকের হাত নয়। এই হৃদয়ও নয় ছলনায় পরিপূর্ণ। একজন দেবতার অপমান করে তার রাজ্য এই হৃদয় অধিকার করবে না।

হতাশায় গুঙ্গিয়ে উঠলাম আমি। পাঁচশো বছরের মধ্যে সেরা ফারাও হবে তুমি। তোমাকে দেখা হতে হবে না সেজন্যে। আমার কথা শোনো, যা বলছি কর; আমাদের এই মাতৃভূমি মিশরের জন্যে; আমরা দুজনেই যে নারীকে ভালোবাসি, তার জন্যে।

একজন বিশ্বাসঘাতককেও কী একইভাবে ভালবাসবে লসট্রিস, যেমন করে একজন দেশপ্রেমিক যোদ্ধাকে ভালবাসতো? মাথা নেড়ে নিজেই উত্তর দিয়ে দিলো ট্যানাস, না, বাসবে না।

যাই ঘটুক না কেননা, সে তোমাকে–আমাকে থামিয়ে দিলো ট্যানাস।

মিছে বলো না, টাইটা। লসট্রিস যোগ্য নারী। বিশ্বাসঘাতকতা আর চুরি করলে আমি ওর যোগ্য থাকবো না। এরচেয়েও বড়ো কথা, আমি আর নিজেকেও সম্মান করতে পারবো না। ওর নিষ্পাপ প্রেমের যোগ্য নয় একজন বিশ্বাস ঘাতক। আমাদের বন্ধুত্বের নামে বলছি, এ ব্যপারে আর কথা বলো না। দ্বৈত-মুকুটের উপরে আমার কোনো অধিকার নেই, কোনো দিন থাকবেও না। হোরাস, তুমি আমার কথা শুনছো–কোনোদিন এই প্রতিজ্ঞা ভাঙলে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিও আমা হতে।

এ ব্যপারে কথা শেষ, ওকে আমি এতো ভালো করে চিনি–কোনো সন্দেহ নেই আর। যা বলছে, তার প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে বিশ্বাস করে ট্যানাস।

কী করবে তাহলে, হতচ্ছাড়া বোকা, রাগে জ্বলে উঠলাম আমি। আমার কোনো কথারই মূল্য নেই তোমার কাছে। নিজেই যদি সব বোঝো, তবে একাই কর। হঠাৎ করেই যদি তোমার জ্ঞান এতো বেশি হয়ে থাকে যে আমাকে তোমার আর প্রয়োজন নেই, তাহলে আর কি করা।

তোমার পরামর্শ আমি ততক্ষণ পর্যন্ত নেবো, যতক্ষণ তা আমার কাছে অর্থবহ মনে হবে। হাত ধরে টেনে তার পাশে আমাকে বসালো ট্যানাস। দয়া করে আমাদের সাহায্য করো, টাইটা। লসট্রিস আর আমার এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তোমাকে। সম্মানজনক একটা উপায় বাতলাও আমাদের।

আফসোস, সেরকম কিছু আর সম্ভব নয়, জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বললাম। যদি মুকুটের দখল নেওয়ার কোনো অভিপ্রায় না থাকে, তাহলে আর এখানে থাকার সাহস করো না। লসট্রিসকে নিয়ে কোথাও পালিয়ে যাও।

চন্দ্রালোকিত সেই রাতে স্তব্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো ট্যানাস। মিশর ছেড়ে চলে যাবো? নিশ্চই তামাশা করছো তুমি। এটা আমার মাটি, আমার আর লসট্রিসের জন্মস্থান।

না! জোর গলায় বললাম। আমি তা বোঝাতে চাইনি। মিশরে আরো একজন ফারাও আছেন। শক্ত লোক আর যোদ্ধার বড়ো প্রয়োজন তার। তোমাকে বরণ করে নেবে সে। এখানে, এই কারনাকের মতো নিম্ন-রাজ্যেও তোমার সুখ্যাতি আছে। হোরাসের প্রশ্বাসে করে লসট্রিসকে নিয়ে উত্তরে চলে যাও। কোনো জাহাজের সাধ্যি নেই তোমার নাগাল পায়। এই বাতাস আর স্রোত পেলে দশ দিনের মধ্যেই মেমফিস এ, লাল ফারাও-এর প্রাসাদে পৌঁছে যাবে। তাকে–

হোরাসের কসম, আমাকে বিশ্বাস ঘাতক বানিয়ে ছাড়বে তুমি! আমাকে থামিয়ে বলে উঠে ট্যানাস। কার আনুগত্য স্বীকার করবো, একজন জবরদখলকারির? ফারাও মামোসকে যে প্রতিজ্ঞা করেছি, তার কি হবে তাহলে? এর কোনো মানে নেই তোমার কাছে, তাই না? যদি একজন রাজা আর একজন দস্যর প্রতি একই প্রতিজ্ঞা করি তাহলে কি রকম মানুষ হলাম আমি? প্রতিজ্ঞা ভেঙে ফেলার জন্যে করা হয় না, টাইটা, এক জীবনে একবারই করা যায়। আমি সত্যিকারের ফারাও মামোসের অনুগত।

তোমার সেই সত্যিকারের ফারাও-ই কিন্তু ছিনিয়ে নেবে তোমার প্রেম, এবং গলায় ফাঁসির দড়ি পরানোর আদেশও তিনিই দেবেন, নিষ্ঠুরভাবে চোখে আঙুল দিয়ে সত্যিটা ওকে দেখিয়ে দিলাম আমি। এবারে ট্যানাসও যেনো একটু ভড়কালো।

ঠিকই বলছো। কারনাকে থাকা ঠিক হবে না আমাদের। কিন্তু আমি কখনই প্রতিজ্ঞা ভাঙতে পারবো না, আমার এই তলোয়ার কখনও ফারাও-এর বিরুদ্ধে চলবে না।

তোমার ভাবাবেগের এক বিন্দু অর্থ নেই আমার কাছে। গলার স্বরে ভর্ৎসনা লুকিয়ে রাখতে পারলাম না। আমি যা বুঝি, সব ভেস্তে যাবে। কী করবে নিজেকে, লসট্রিসকে ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের হাত থেকে রক্ষা করতে?

জানি, বুড়ো বন্ধু, আমার উপর রাগ করার অনেক কারণ আছে। আমিই তোমার কাছে পরামর্শ চেয়েছিলাম, আবার আমিই তোমাকে নাকচ করছি। একটু ধৈর্য ধরো, টাইটা। আর কিছু সময় অন্তত আমাকে সাহায্য কর। উঠে দাঁড়িয়ে ফারাও-এর চিড়িয়াখানায় বন্দী চিতার মতো এদিক-সেদিক পায়চারী করতে লাগলো ট্যানাস। বিড়বড়ি করে নিজেকেই কি যেনো বলছে, থেকে থেকে মুঠো পাকাচ্ছে। ঘুষি মারছে হাতে।

শেষমেষ আমার সামনে এসে দাঁড়ালো সে। বিশ্বাসঘাতক আমি হতে পারবো । কিন্তু ভারাক্রান্ত মন নিয়ে নিজের উপর জোর খাঁটিয়ে কাপুরুষের ভূমিকায় খেলতে রাজী আছি। যদি লসট্রিস রাজী থাকে, তবে ওকে নিয়ে পালিয়ে যাবো আমি। এইখান থেকে দূরে কোথাও চলে যাবো আমরা। কোথায়? আমি জানতে চাইলাম।

জানি, নদী ছেড়ে থাকতে পারবে না লসট্রিস। হাপির সঙ্গেই থাকবো আমরা। একটাই মাত্র জায়গা আছে যাওয়ার, শক্তিশালী হাত উচিয়ে চাঁদের আলোয় দক্ষিণ দিক নির্দেশ করে ট্যানাস। নীলনদের গতিপথ ধরে দক্ষিণের গভীরে, আফ্রিকার গহীনে চলে যাবো আমরা সেই কুশ দেশের ওপারে। জলপ্রপাত পেরিয়ে চলে যাবো, যেখানে আজ পর্যন্ত কোনো সভ্য মানুষের পা পরেনি। ওখানে, দেবতারা সহায় হলে, হয়তো নিজেদের জন্যে আরো একটা টা-মেরি তৈরি করে নেবো আমরা।

তোমার সঙ্গী হবে কারা?

ক্ৰাতাস, অবশ্যই; আর আমার লোকেদের মধ্যে যারা শিকার আর বন্যপ্রাণী ভালবাসে, তারা যাবে। আজ রাতেই ওদের ডেকে নিয়ে সুযোগ দেবো আমি। পাঁচটা জাহাজ, আর ওগুলো চালানোর মতো যোদ্ধা হলেই চলবে। সূর্যোদয়ের আগেই যাত্রা শুরু করতে হবে আমাদের। তুমি নেক্রোপোলিসে গিয়ে আমার কাছে নিয়ে আসতে পারবে এখন লসট্রিসকে?

আর আমি? শান্ত স্বরে জানতে চাইলাম। আমাকে নেবে সঙ্গে?

তুমি যাবে? হাসিতে ভেঙে পরলো ট্যানাস। সত্যিই কী তোমার বাগান, তোমার বই, গীতিনাট্য, মন্দির নির্মাণ ছেড়ে আসতে পারবে? বিপদজনক পথ ওটা, পদে পদে জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সত্যিই কী আসতে চাও, টাইটা?

আমার পরিচর্যা ছাড়া তোমরা টিকতে পারবে না। আমি না থাকলে না জানি নির্বোধের মতো কত বিপদে ফেলবে তুমি মিসট্রেসকে।

এসো তাহলে! আমার পেছনে চাপড়ে দিয়ে বললো ট্যানাস। আমি জানতাম, তুমি আসবেই। এও জানি, লসট্রিস কখনও তোমাকে ছেড়ে আসবে না। অনেক কথা হয়েছে! এখন দ্রুত কাজ করতে হবে আমাদের। প্রথমে, ক্ৰাতাস এবং অন্যদের সুযোগ দেবো আমরা। এরপরে, নেক্রোপোলিসে গিয়ে লসট্রিসকে নিয়ে আসতে হবে তোমাকে। এদিকে আমি যাত্রার প্রস্তুতি শেষ করছি। বারোজন সেরা যোদ্ধা দিচ্ছি। তোমার সাথে, তাড়াতাড়ি করো। মাঝরাত পেরিয়ে গেছে সেই কবে।

এতো বোকা আমি, ওর উত্তেজনা আমাকেও স্পর্শ করেছিলো সে রাতে; মন্দিরের নিচে ট্যানাসের বাহিনীর কাছে ছুটে চললাম দুজনে। এতোটাই উল্লসিত ছিলাম, বিপদের কোনো আভাস পাইনি। চাঁদের আলোয়, আমাদের সামনে অশান্ত নড়াচড়া ট্যানাসের চোখেই প্রথম ধরা পরলো। হাত ধরে টেনে একটা গাছের আড়ালে নিয়ে গেলো ও আমাকে।

সশস্ত্র যোদ্ধার দল, ফিসফিস করে বললো ট্যানাস। চাঁদের আলোয় চকচক করছে বর্ষার ডগা। ত্রিশ কি চল্লিশ জনের বিশাল একটা দল।

দস্যু মনে হয়, না হয় নিম্ন-রাজ্যের লুটেরার দল, গর্জে উঠলো ট্যানাস। সামনের লোকগুলোর লুকোচুরি সুলভ আচরণে আমি পর্যন্ত অবাক হলাম। পথ ধরে না এসে, ট্যানাসের আস্তানার চারদিকের ফসলের মাঠের উপর দিয়ে গুঁড়ি মেরে আসছে তারা।

এই দিক দিয়ে এসো! অভিজ্ঞ যোদ্ধার চোখে একটা ঢালের উপর দিয়ে কোণাকুণি পথ দেখালো ট্যানাস। ঢালের উপরে উঠে গড়িয়ে সোজা ট্যানাসের আস্তানার চৌহদ্দির মধ্যে প্রবেশ করলাম আমরা। হুঙ্কার দিয়ে উঠে সবাইকে সতর্ক করে দিলো ট্যানাস।

অস্ত্র হাতে নাও, সাহসী যোদ্ধার দল! আমার সঙ্গে এসো! এক লহমায় প্রাণ ফিরে এলো নীল কুমির বাহিনীর যোদ্ধাদের মধ্যে। আগুনের ধারে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমাতে থাকা লোকগুলো পর্যন্ত চকিতে অস্ত্র হাতে তৈরি হলো। তাবুর দরোজা ঠেলে বেরিয়ে এলো সতর্ক সৈনিকেরা। তলোয়ার হাতে যে যার অবস্থানে পৌঁছে গেছে।

মুহূর্ত পরেই বাহিনীকে এগুতে নির্দেশ দিলো ট্যানাস। তার নির্দেশে প্রতিরক্ষা নয়, পাল্টা আক্রমণে চললো যোদ্ধার দল। সম্ভবত ভয়ানক এই অগ্রযাত্রা ভড়কে দিয়েছিলো সামনের দলটাকে, কাঁপা কাঁপা স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো একজন ওপাশ থেকে। আমরা ফারাও-এর লোক, রাজ-কাজে এসেছি। থামো!

থামো, সাহসী যোদ্ধারা! একগুঁয়ে অগ্রযাত্রা থামালো ট্যানাস। তারপর যোগ করলো, কোন্ ফারাও-কে সেবা কর তোমরা; লাল-জবরদখলকারি নাকি সত্যিকারের ফারাও-এর?

আমরা সত্যিকারের রাজা, উচ্চ এবং নিম্ন রাজ্যের শাসক, দেবতা মামোস-এর সেবক। আমি তার দূত।

রাজার দূত সামনে এসে দাঁড়াও, চোরের মতো চুপি চুপি কোথায় চলছিলে? সামনে দাঁড়িয়ে তোমার বার্তা জানাও! আহ্বান জানায় ট্যানাস, কিন্তু শ্বাসের নিচে ক্ৰাতাসকে বলে, শয়তানীর জন্যে তৈরি থেকো। ভাবগতিক সুবিধার ঠেকছে না আমার। আগুন উস্কে দাও, আলো প্রয়োজন।

ক্রাতাসের নির্দেশে শুষ্ক পাতার স্তূপ ফেলা হলো অগ্নিকুন্ডে, কিছু সময় পরেই উজ্জ্বল শিখায় অন্ধকার দূর হলো অনেকটা। অদ্ভুত দলটার বার্তাবাহক সামনে এসে দাঁড়ায়। আমার নাম নেতের, দশ হাজারের-সেরা উপাধিপ্রাপ্ত। ফারাও-এর দেহরক্ষীদের নেতা আমি। ট্যানাস, লর্ড হেরাবকে আটক করার অনুমতি সম্বলিত বাজপাখির প্রতীক আছে আমার কাছে।

হোরাসের কসম, মিথ্যে বলছে ও, চাপা কণ্ঠে গর্জে উঠে ক্ৰাতাস। আপনি কী আসামী নাকি, আটক করবে। আমাদের সবাইকে অপমান করেছে নেতের। অনুমতি দিন, বাজপাখির প্রতীক ওর পেছন দিয়ে ঢুকিয়ে দেবো!

থামো! ট্যানাস বাধা দেয়। ও কী বলতে চায়, আগে শুনি। স্বর উচায় সে। প্রতীকটা আমাদের দেখাও, নেতের।

চকচকে নীল রাজকীয় বাজপাখির প্রতীকচিহ্ন উঁচু করে দেখায় নেতের। বাজপাখির প্রতীক হলো রাজার বিশেষ ক্ষমতার অনুমোদন। ওটা বহনকারী, স্বয়ং ফারাও-এর ক্ষমতা এবং যথার্থতা ভোগ করে। যে কোনো কারণেই হোক, কোনো ব্যক্তির অধিকার নেই এই প্রতীক বহনকারীর কাজে বাধা দেয়। এই প্রতাঁকের বাহক কেবল রাজার কাছে মুখাপেক্ষী।

আমি ট্যানাস, লর্ড হেরাব, বলে ট্যানাস। বাজপাখির প্রতাঁকের প্রতি আমি অনুগত।

মাই লর্ড, মাই লর্ড! জরুরি ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলে ক্ৰাতাস। রাজার কাছে যাবেন না। নির্ঘাত মেরে ফেলবে। অন্যদের সাথে কথা বলেছি আমি। পুরো বাহিনী আপনার পেছনে আছে। আপনি অনুমতি দিন, আগামী সূর্যোদয়ের আগে আপনাকে রাজার আসনে বসাবো আমরা।

একবার বলেছো, ঠিক আছে, নরম স্বরে তাকে বললো ট্যানাস, আর একবার ওই কথা তোমার মুখে শুনলে আমি নিজে তোমাকে রাজার হাতে তুলে দেবো; মেয়ডেসের পুত্র কাতাস।

আমাকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে এরপর ট্যানাস বললো, দেরি হয়ে গেলো, বন্ধু। দেবতারা আমাদের উপর রুষ্ট । রাজার শুভ-বুদ্ধির কাছে এখন নিজেকে সমর্পণ করা ছাড়া উপায় নেই। যদি সত্যিই তিনি দেবতা হন, তবে আমার হৃদয়ের নিষ্কলুষতা তার চোখে ধরা পড়বে। আলতো করে আমার হাত স্পর্শ করলো সে, লসট্রিসকে জানিয়ে, কী ঘটেছে। বলল, আমি ওকে ভালোবাসি; যাই ঘটুক না কেন, এই জীবন আর পরবর্তি যতো জীবন আছে–আমি ভালবাসবো ওকে। বলো, প্রয়োজন হলে চিরকাল অপেক্ষা করবো আমি।

এরপর অস্ত্র খাপবন্দী করে বাজপাখির প্রতীক বাহকের উদ্দেশ্যে এগুলো ট্যানাস। রাজার আহ্বানে আত্মসমর্পণ করলাম আমি।

পেছনে, অস্ত্রের অসহিষ্ণু নড়াচড়ায়, হিসহিস শব্দে নিজেদের অননুমোদন প্রকাশ করলো তার যোদ্ধারা, কিন্তু পিছনে ফিরে তীব্র ভু-কুটিতে তাদের নিবৃত্ত করলো ট্যানাস। নেতেরের নির্দেশে রাজার রক্ষীরা ওকে ঘিরে ধরে খালের পাশের হাঁটা-পথ ধরে রওনা হয়ে গেলো নেক্রোপোলিসের উদ্দেশ্যে।

অসহিষ্ণু যোদ্ধার দলকে পেছনে ফেলে একটু দূরত্বে আমিও অনুসরণ করে চললাম রাজকীয় রক্ষীদের। মৃতের নগরীতে পৌঁছে সোজা লসট্রিসের প্রকোষ্ঠের উদ্দেশ্যে ছুটলাম। নেই ও। দাস মেয়েগুরো সিডার কাঠের বড়ো একটা বাক্সে কাপড় গোছাচ্ছে।

তোমাদের মনিব কোথায়? আমার প্রশ্নের উত্তরে সবচেয়ে বড় মেয়েটা নাক উঁচু করে বললো, যেখানে তুমি তার নাগাল পাবে না, ব্যাটা খোঁজা।

আমার প্রতি লসট্রিসের পক্ষপাতিত্বে এরা সবাই দারুন ঈর্ষান্বিত।

সোজা করে উত্তর দাও, না হয় মেরে পাছার ছাল তুলে নেবো। এহেন অভব্য হুমকিতে কাজ হলো, মসৃণ গলায় সে জানালো, ওরা তাকে ফারাও-এর হারেমে নিয়ে গেছে। কিছুই করার নেই তোমার ওখানে। শুনেছি, এমনকি খোঁজা ব্যাটাদেরও হারেমের ভেতরে যেতে দেয় না ওখানকার পাহাড়াদারেরা।

ঠিকই বলেছে সে, কিন্তু আমাকে তো চেষ্টা করতেই হবে। আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এখন মিসট্রেসের। যা ভেবেছিলাম, রাজার হারেমের রক্ষীরা খুব কড়া। ওরা চেনে আমাকে, কিন্তু তাদের উপর নির্দেশ আছে এমনকি লসট্রিসের নিকটাত্মীয়দেরকেও যেনো প্রবেশ করতে দেওয়া না হয়।

একটা স্বর্ণের আংটির বিনিময়ে আমার বার্তা লসট্রিসের কাছে পৌঁছানোর বন্দোবস্ত করলাম। প্যাপিরাসের টুকরোয় উৎসাহব্যঞ্জক কিছু কথা লিখে নিলাম দ্রুত। ট্যানাসের ভাগ্যে কী ঘটেছে–এসব কিছুই জানানোর সাহস হলো না। দুঃখের বিষয়, পরে জেনেছিলাম সেই বার্তা কখনও পৌঁছেনি লসট্রিসের কাছে। এই দুনিয়ায় কী কাউকেই বিশ্বাস করার যো নেই?

ওসিরিসের উৎসবের শেষ দিনের আগে ট্যানাস বা মিসট্রেসের সাথে আর দেখা হয়নি আমার।

৩. দেবতার মন্দিরে

দেবতার মন্দিরে শেষ হলো ওসিরিসের উৎসব। সমগ্র বিবেসের অধিবাসীরা জড়ো হয়েছিলো মন্দির প্রাঙ্গনে, ভীড়ের চাপে শ্বাস নেওয়া দায়।

শোকে-চিন্তায় পরপর তিনরাত ঘুমাইনি আমি, একে তো ট্যানাসের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সেই চিন্তা, তার সাথে ইনটেফের নির্দেশে লসট্রিসের বিয়ের আয়োজনের চাপ যোগ হয়েছে। মিসট্রেসের সাথে আমাকে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি এই কয় দিনে। দাস বালকেরা কেউই এমন উদভ্রান্ত, চিন্তিত অবস্থায় কখনও দেখেনি আমাকে।

ফারাও-এর ভাষণ শুনতে গিয়ে অন্তত দুই বার টলে পরে যাচ্ছিলাম। শেষমেষ, ধরে রাখতে পেরেছিলাম নিজেকে। ওদিকে অর্ধ-সত্য আর কল্পনাপ্রসূত ধ্যান-ধারণা নিয়ে বলে চললেন রাজা।

এটা সত্যি, নিজস্ব অচেতন ঢঙ্গে বলছিলেন তিনি, কিন্তু একটা ব্যাপার কিছুটা হলেও আনন্দ দিলো আমাকে; ট্যানাসের বলা কথাগুলো মনে দাগ কেটেছে তার। ভাষণে ঘুরে-ফিরে ট্যানাসের নির্দেশিত অসামাঞ্জস্যগুলোর কথা আসছিলো বারবার।

সৈন্য বাহিনীতে যোগদান থেকে অব্যহতি পাবার জন্যে ইচ্ছাকৃত বিকলাঙ্গতা দারুণভাবে নিরুৎসাহিত করা হবে এখন থেকে, বলে চললেন ফারাও, যে কোনো তরুণ সৈন্য বাহিনীতে যোগদান থেকে ক্ষমা চাইলে তার কারণ খতিয়ে দেখা হবে। অন্তত একবার সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ফারাও, ক্লান্ত হাসির সাথে ভাবলাম। মেনসেট আর সোবেক কোনো অভিজ্ঞ যোদ্ধার সামনে নিজেদের বিকলাঙ্গতা নিয়ে জবাবদিহি করছে-ভাবনাটা দারুন আনন্দ দিলো আমাকে। এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা জরিমানা করা হবে, যদি ইচ্ছাকৃত অঙ্গহানীর অভিযোগ প্রমাণিত হয়। সেথ্‌ এর বিশাল বপুর কসম, এবারে অন্তত আমার মনিব ইনটেফের দুই বদমাশ ছেলের উপযুক্ত শাস্তি হবে।

এতো চিন্তার মধ্যেও ফারাও-এর ভাষণ শুনতে শুনতে কিছুটা ভালো বোধ করলাম, ওদিকে রাজা বলে চললেন, এখন থেকে, কোনো বেশ্যা মেয়ে নিজেদের এলাকার বাইরে ব্যবসা করতে পারবে না। দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা জরিমানা হবে এর অন্যথা ঘটলে। এইবারে, বহু কষ্টে অট্টহাসিতে ভেঙে পড়া থেকে বিরত রাখলাম নিজেকে। ভাবছি, নদী-ফেরত নাবিকেরা কেমন ভাবে নেবে এই সিদ্ধান্ত। ফারাও একেবারে সীমা ছাড়িয়ে ফেলেছেন, কোনো পুরুষ মানুষই নিজের উপভোগের রাস্তায় বাধা পছন্দ করে না।

দারুন উত্তেজনা বোধ করছি। ট্যানাসের ঘোষণার সবদিক বিশেষভাবে ভেবে নজর কেড়েছে ফারাও-এর, এটা এখন পরিষ্কার। এখন কী ট্যানাসকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে শাস্তি দিতে পারেন তিনি? জানি না।

ফারাও-এর কথা তখনও শেষ হয়নি। আমি জেনেছি, আমার কিছু পদস্থ লোকেরা তাদের প্রতি আমার বিশ্বাস এবং আস্থার বরখেলাপ করেছে। খাজনা আদায় এবং সাধারণ মানুষের অর্থ নিয়ে এদের কার্যকলাপ খতিয়ে দেখা হবে। দোষী হলে, ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হবে তাদের। অবিশ্বাসের ধ্বনিতে মুখর হয় জনতা, রাজা কী সত্যিই তার খাজনা-আদায়কারীদের বাধা দিতে সক্ষম হবেন?

ঠিক সেই সময় পেছন থেকে কে যেনো বলে উঠলো, ফারাও মহান। তিনি চিরকাল বেঁচে থাকুন! পুরো মন্দিরে ছড়িয়ে পরে সেই চিৎকার। সম্ভবত ফারাও স্বয়ং, স্বতস্ফূর্ত এই প্রশংসাধ্বনি প্রত্যাশা করেন নি। এতো দূর থেকেও পরিষ্কার বুঝলাম, আনন্দে ঝলমল করছে তার চোখ। চিন্তাক্লিষ্ট অবয়ব যেনো একটু হলেও দূর হলো, দ্বৈত-মুকুট যেনো একটু হালকা হয়ে বসে রইলো তার শিরে। এসব কিছুই ট্যানাসের ভাগ্যে মৃত্যুর সম্ভাবনা হ্রাস করছে।

প্রশংসা ধ্বনি শেষ হতেই নিজস্ব ঢঙ্গে এতক্ষণের সমস্ত ঘোষণায় জল ঢেলে দিলেন ফারাও। আমার বিশ্বস্ত উজির, মহৎ ইনটেফকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। আজ থেকে সমস্ত তদন্ত, আটক করা খতিয়ে দেখবেন তিনি। এবারে আর হুঙ্কার নয়, নরম একটা ধ্বনি বেরুলো জনতার মুখ চীরে। বহুকষ্টে হতাশার বহিঃপ্রকাশ আঁকালাম আমি। মুরগির খোয়ার পাহাড়া দেওয়ার জন্যে হিংস্র চিতাকে দায়িত্ব দিয়েছেন ফারাও। রাজকীয় সম্পদ আর খাজনার সিংহভাগ এবারে কোথায় যাবে, বলার অপেক্ষা রাখে না।

স্বতস্ফূর্ত ভাবাবেগে নিদারুন আঘাত করে ভেঙে-চুরে তছনছ করার বিরল ক্ষমতা আছে আমাদের মহান ফারাও-এর। না জানি ভাষণ শেষ করার আগে আরো কতো তামাশা শুনবো। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না।

বেশ অনেকদিন ধরেই আমাদের উচ্চ-রাজ্যের আইনের শাসনের অভাব নিয়ে আমি চিন্তান্বিত ছিলাম। আমাদের লোকেদের জান-মাল আজ ভয়ানক বিপদে। সঠিক সময়ে এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি। কিন্তু, খুব সাম্প্রতিক অতীতে এমন ভাবে কিছু কথা উপস্থাপন করা হয়েছে আমার কাছে যা দেশদ্রোহিতার সামিল। অসময়ে, ওসিরিসের উৎসবের মধ্যে উচ্চারিত হয়েছে কথাগুলো। তবে, সেই ঘোষণা ব্যক্তি ফারাও এবং দেশের উপর আক্রমণের উদ্দেশ্যে করা হয়নি। নাটকীয় ঢঙ্গে বিরতি নিলেন ফারাও। বোঝাই যাচ্ছে, ট্যানাসের কথা বলছেন তিনি। তার ক্ষয়িষ্ণুতার প্রমাণ এখানেও পাওয়া গেলো, একজন শক্তিশালী ফারাও কখনও নিজের সিন্ধান্তের কার্য কারণ ব্যাখ্যায় যাবেন না, কেবল ঘোষণা করবেন।

অবশ্যই ট্যানাস, লর্ড হেরাবের কথা বলছি আমি, ওসিরিসের নাটকে প্রভু হোরাসের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলো যে। দেশ-দ্রোহিতার অভিযোগে আটক করা হয়েছে তাকে। আমার পরামর্শকেরা তার শাস্তি নিয়ে দ্বিধা-বিভক্ত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন, যারা ট্যানাসের মৃত্যুদন্ড চাইছেন ইনটেফের পানে তাকালাম আমি, তার চোখে মুখে ফুটে আছে মনের কথা। আর, অপর এক দল ভাবছেন, তার বক্তব্য দেবতাদের নিজস্ব; ট্যানাস, লর্ড হেরাবের মনের কথা নয়। এ ছিলো সত্যিকারের হোরাসের কথা। যদি তাই হয়ে থাকে, তবে তাকে দোষী সাব্যস্ত করার কোনো কারণ নেই।

অবশ্যই, ফারাও-এর যুক্তি সঠিক। কিন্তু দ্বৈত-রাজ্যের মুকুটধারী সম্রাটের কী দায় পড়েছে দুনিয়ার অশিক্ষিত কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক-দাস এদের সামনে তাঁর বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণের? ইতোমধ্যেই সস্তা মদের নেশায় ঢুলছে জনতা। সিংহাসনের নিচে দাঁড়ানো রাজকীয় বাহিনীর প্রধান, নেতেরের উদ্দেশ্যে ইশারা করলেন ফারাও। কেতাদুরস্ত ভঙিতে চলে গেলো সে, কিছু সময় পরে বন্দী-প্রকোষ্ঠ থেকে ট্যানাসকে নিয়ে হাজির হলো।

আমার বুকের ভেতরটা লাফিয়ে উঠলো তাকে দেখে, আরো আশান্বিত হলাম যখন বুঝলাম ওর পায়ে কোনো শেকল নেই। কোনো রকম অস্ত্র বা সম্মানসূচক প্রতীক পরিধান করে নেই সে, সাধাসিধা কাপড় গায়ে। পায়ে সেই তেজদ্বীপ্ত ছন্দ। কপালে র‍্যাসফারের আঘাতের চিহ্ন শুকিয়ে এসেছে, তবে তাকে নির্যাতন করা হয়নি বন্দী দশায়। আমার আশার পালে হাওয়া লাগলো। তার মানে, ওরা তাকে দন্ডিত বলে মনে করছে না!

এক মুহূর্ত পরেই সমস্ত আশার বাতি নিভে গেলো। সিংহাসনের সামনে এসে কুর্নিশ করলো ট্যানাস, এরপরে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। নির্দয়, নির্মম কণ্ঠে তার উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন ফারাও, ট্যানাস, লর্ড হেরাব, দেশদ্রোহিতা এবং অবমাননার জন্যে অভিযুক্ত তুমি। এই দুই অভিযোগেই তুমি আমার চোখে দোষী। বিশ্বাসঘাতকের চিরন্ত ন শাস্তি, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করলাম আমি তোমাকে।

দণ্ডিত আসামীকে চিহ্নিত করবার রীতি অনুায়ী ট্যানাসের গলার চারধারে ফাঁসের দড়ি পরালো নেতের। হালকা গুঞ্জন উঠলো জনতার মধ্যে থেকে। জোরে কেঁদে উঠলো একটা মেয়ে, মুহূর্ত পরেই কান্না-অনুতাপে ভারি হয়ে উঠলো মন্দিরের বাতাস। মৃত্যু দন্ড ঘোষণায় এমন প্রতিক্রিয়া আর কখনও হয়নি মিশরের ইতিহাসে। ট্যানাসের প্রতি মানুষের ভালোবাসা এমনই স্বতন্ত্র। তাদের অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম আমি নিজেও জানি না, কখন চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে এসেছিলো।

রক্ষীরা তাদের অস্ত্রের বাটের আঘাতে নিবৃত্ত করতে চাইলো শোকাহত জনতাকে। কোনো কাজ হলো না তাতে। সবার গলা ছাপিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি, দয়া করুন, মহান ফারাও! মহৎ ট্যানাসকে ক্ষমা করুন!

একজন রক্ষী অস্ত্রের বাট দিয়ে আঘাত করলো আমার মাথার পাশে, ছিটকে পরে গেলাম আমি। কিন্তু আমার আবেদন শুনছে জনতা। দয়া করুন, মহান মামোস! রক্ষীদের প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় কিছুটা স্তিমিত হলো হুঙ্কার, কিন্তু শব্দ করে তখনও কেঁদে চললো মেয়েরা।

অবশেষে ফারাও-এর উচ্চ স্বরে থামলো কোলাহল। অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনের শাসনের ব্যর্থতার কথা উচ্চারণ করেছে। সিংহাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে, দস্যুর হাত থেকে এই মাটিকে রক্ষা করতে। সে একজন বীর কামনা করেছে। সবাই জানে, সে নিজেও একজন শক্তিশালী যোদ্ধা। যদি তাই হয়, তবে তার দাবিগুলো পূরণে সেই হতে যারে উপযুক্ত ব্যক্তি।

এবারে দ্বিধান্বিত হয়ে পরে জনতা। আস্তিনের কাপড় দিয়ে চোখ মুছলাম আমি। তন্ময় হয়ে শুনতে লাগলাম ফারাও-এর কথা। সেই কারণে, মৃত্যুদন্ড দুই বছর পর্যন্ত মুলতুবির ঘোষণা করছি। যদি সত্যিই দেবতা হোরাসের প্ররোচনায় দেশদ্রোহী বাক্য উচ্চারণ করে থাকে ট্যানাস, তাহলে আমার অর্পিত দায়িত্ব পালনে দেবতারা অবশ্যই সাহায্য করবে তাকে।

অসহনীয় নিরবতা নেমে এলো মন্দির জুরে। কী শুনছে, কেউ বুঝতে পারলো না। আশা-নিরাশার দোলাচলে বন্দী তখন আমরা।

ফারাও-এর ইঙ্গিতে তাঁর একজন উচ্চ-মন্ত্রী ছোট্ট একটা পাত্র এগিয়ে দেয়, নীল একটা মৃর্তি রাখা আছে তাতে। ওটা তুলে ধরে ফারাও বলে উঠেন, লর্ড হেরাবকে বাজপাখির প্রতীক অনুমোদন করলাম। এর ক্ষমতা বলে আজ থেকে, তার কাজের প্রয়োজনে যতো জন সৈনিক, যে বস্তু তার প্রয়োজন তা সে পেতে পারে। যে কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে সে, কারও কাছে জবাবদিহিতার প্রয়োজন নেই। কেউ তাকে প্রশ্ন করতে পারবে না। আগামী পূর্ণ দুই বছর, সে শুধু মাত্র রাজার লোক, শুধুমাত্র তাঁরই কাছে মুখাপেক্ষী। সময় শেষ হলে, আগামী ওসিরিসের উৎসবের শেষ দিনে, আবারো এই সিংহাসনের সামনে দাঁড়াবে সে। গলায় থাকবে ফাঁসির দড়ি। যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, আজ ঠিক যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেইখানে, তার গলায় ফাঁসির রশি এঁটে দেওয়ার হুকুম দেবো আমি। আর যদি সে সক্ষম হয় তার কাজে, আমি, ফারাও মামোস, নিজ হাতে ওই ফাঁসির দড়ি সরিয়ে তার গলায় স্বর্ণের হার পরিয়ে দেবো।

আমরা যেনো নড়তেও ভুলে গেছি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ফারাও-এর পানে চেয়ে রইলাম, রাজকীয় প্রতীক হাতে ইশারা করলেন তিনি। ট্যানাস, লর্ড হেরাব, উচ্চ-রাজ্য থেকে যাবতীয় বর্বর, লুটেরাদের নির্মূল করার দায়িত্ব দিলাম আমি তোমাকে। আগামী দুই বছরের মধ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করো এই উচ্চ-সাম্রাজ্যে। ব্যর্থ হলে তোমার জন্যে অপেক্ষা করবে মৃত্যু।

পাথুরে দেয়াল কাঁপানো হুঙ্কারে ফেটে পরলো জনতা। ওরা আনন্দ করছে না। বুঝেই, দুঃখের সাথে ভাবলাম আমি। যে দায়িত্ব ফারাও আজ অর্পণ করলেন ট্যানাসের উপর, কোনো মরণশীল মানুষের পক্ষে তা অর্জন করা সম্ভব নয়। মৃত্যুর ছায়া এখনও সরে যায় নি তার উপর থেকে। আমি জানি, আজ থেকে দুই বছর পরে ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে আছে; সেই খানে,আজকের মতোই তেজদীপ্ত, গর্বোদ্ধত যোদ্ধা ট্যানাসের গলায় এঁটে বসবে ফাঁসির দড়ি।

*

পরিত্যক্ত, নিঃসহায়ের মতো তার চারদিকের ব্যস্ততার মাঝে স্থির দাঁড়িয়েছিলো ও, সামনের এক-সমুদ্র মুখের দিকে একবারো তাকালো না।

গোড়ালি ছুঁই-ছুঁই শুভ্র পোশাকে যেনো ঘোষিত হচ্ছিল কুমারীত্বের নিষ্কলুষতা। চুল ভোলা ওর। নরম, গাঢ় স্রোতের মতো কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা সেই চুলের রাশি ঝলমল করছিলো সূর্যালোকে। জল-পদ্মের তৈরি মুকুট মাথায়। স্বর্গীয় নীল সেই ফুলের ফাঁকে ফাঁকে বিশুদ্ধ স্বর্ণের সুতো।

এতো ফর্সা তার মুখশ্রী, যেনো দেবী আইসিস স্বয়ং দাঁড়িয়ে ছিলেন। বড়ো বড়ো, কালো দুই চোখে এখনও কিশোরীর ভীরুতা। হৃদয় ভেঙে যেতে চাইলো আমার; কতকাল দুঃস্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠা এই কিশোরীকে ঘুম পাড়িয়েছি আমি তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু, আজ আর ওর জন্যে কিছু করতে পারবো না; অন্তত একবারের মতো সত্যি হতে যাচ্ছে ওর দুঃস্বপ্ন।

এমনকি কাছে পর্যন্ত যেতে পারছি না, পারি নি বিগত বেশ কয়েক দিনেও। ফারাও-এর বাহিনীর পুরোহিতেরা দিন রাত পাহারা দিয়ে রেখেছিলো ওকে। আমি জানি, চিরদিনের জন্যে আমার কাছ থেকে দূরে চলে গেছে লসট্রিস, কোনোদিনও আর কাছে পাবো না তাকে।

নীলে র তীরে বিয়ের মন্ডপ তৈরি করা হয়েছে। তার নিচে হবু-স্বামীর অপেক্ষায় বসেছিলো লসট্রিস। পাশে দাঁড়িয়ে তার বাবা ইনটেফ, প্রশংসার স্বর্ণ-শেকল গলায়; গবোদ্ধত, ঠোঁটে কোব্রার হাসি।

অবশেষে রাজকীয় বরের আগমন ঘঘাষিত হলো ঢাকের গুরুগম্ভির ধ্বনি এবং গ্যাজেল হরিণের শিঙ্গায় ফুয়ের মাধ্যমে। আমার কাছে এ হলো পুরো পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম ধ্বনি।

নেমেস মুকুট পরেছেন ফারাও, কিন্তু এতো জাঁকজমক, আভিজাত্য ফুঁড়েও বেরিয়ে পড়ছে তার আসল রূপ-ছোট-খাটো আকৃতির, বিশাল-বপু বিষণ-মুখো একজন মানুষ। যদি দেবতারা একটু সহায় হতেন, তাহলে ওই মন্ডপে, আমার লসট্রিসের পাশে আজ একজন বীর্যবান পুরুষের থাকার কথা ছিলো।

ফারাও-এর সভাসদ, মন্ত্রীরা ঘিরে রেখেছে তাকে, আমার চোখের সামনে থেকে আড়াল হয়ে গেলো মিসট্রেস। যদিও এই বিয়ের সমস্ত আয়োজন, খুঁটি-নাটি তদারক করেছি আমি, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় যাওয়ার অনুমতি নেই আমার। অনুষ্ঠান চলাকালে কেবল দুই-এক ঝলক দেখতে পেলাম লসট্রিসের।

নীলনদ থেকে সদ্য-ভোলা পানি দিয়ে বর-কনে উভয়ের হাত ধুয়ে দিলেন ওসিরিসের মন্দিরের পুরোহিত, এ হলো আসন্ন-বৈবাহিক সম্পর্কের বিশুদ্ধতার প্রতীক। প্রথা অনুযায়ী গমের তৈরি রুটি ছিঁড়ে এক টুকরো ভাবী বধূর উদ্দেশ্যে বাড়িয়ে ধরলেন ফারাও, এ হলো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব। যেনো এক টুকরো পাথর মুখে নিয়েছে; টুকরোটা চাবালো বা গিলে ফেললো না লসট্রিস।

আবারো আমার চোখের আড়ালে চলে গেলো সে। এর কিছু সময় পরে সুরার খালি পাত্র ভাঙার শব্দ শুনতে পেলাম, তলোয়ারের এক কোপে ওটা ভাঙতে হয় কনেকে। সাঙ্গ হলো যতো আচার, বুঝলাম চিরকালের জন্যে ট্যানাসের নাগালের বাইরে চলে গেছে মিসট্রেস।

উঁচু মঞ্চের উপরে তার সদ্য-বিবাহিত কনের হাত ধরে এগিয়ে এলেন মহান ফারাও, জনতার উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করলেন তাকে। গগনবিদারী চিৎকারে লসট্রিসের প্রতি তাদের ভালোবাসা প্রকাশ করলো জনতা।

এই ভীড় ছেড়ে বেরিয়ে ট্যানাসের কাছে যেতে চাইছিলাম আমি। সে এখন মুক্ত, কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠানে আসে নি ট্যানাস। সমগ্র থিবেসে সম্ভবত সেই একমাত্র ব্যক্তি যে আজ নদী তীরে সমবেত হয় নি অন্যদের সাথে। জানি, যেখানেই থাকুক না কেননা, আমাকে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তার। হোরাস জানেন, আমারও এই মুহূর্তে প্রয়োজন তাকে। কিন্তু ভীড় ছেড়ে বেরুনো সম্ভবপর হলো না। নির্দয় মুহূর্তগুলো দেখতে হলো আমাকে।

এই পর্যায়ে প্রভু ইনটেফ কন্যার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিতে এলেন। জনতা নিরব হতে মেয়েকে আলিঙ্গন করলেন তিনি।

তাঁর আলিঙ্গনে লসট্রিস যেনো জীবন্ত একটা লাশ। দেহের পাশে শিথীলভাবে ঝুলে রইলো তার হাত, মুখ মৃতের মতো বিবর্ণ। আলিঙ্গন শেষে তার একটা হাত ধরে এবারে জনতার মুখোমুখি হলেন ইনটফে, প্রথা অনুযায়ী মেয়েকে এবারে বিদায়ী উপহার দিতে হবে তাকে। নিয়ম হলো, বরকে দেওয়া পণের অর্থের চেয়ে বেশি হতে হবে এই উপহার। কনের জন্যে এক ধরনের নিরাপত্তা এটা।

আজ তুমি আমার আবাস এবং নিরাপত্তা ছেড়ে তোমার স্বামীর বাড়ি চলে যাবে; এই বিচ্ছেদের কালে আমার ভালোবাসার চিহ্ন স্বরুপ বিদায়ী উপহার দিতে চাই তোমাকে। কী ভুল কথা, ভাবলাম আমি। জীবনে নিজেকে ছাড়া আর কাউকে ভালবাসেন নি আমার মনিব, ইনটেফ। যা হোক, প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী বলে চললেন তিনি, যে কোনো কিছু চাইতে পারো তুমি, প্রিয়। আজকের দিনে কোনো কিছুই প্রত্যাখান করা হবে না।

প্রচলিত ব্যবস্থা অনুযায়ী অনুষ্ঠানের আগেই বাবা-মেয়েতে মিলে ঠিক করে রাখেন, কী উপহার দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে অবশ্য মেয়েকে কিছু বলে রাখেন নি ইনটে। তাকে নিজের সিদ্ধান্ত জানানোর আগে, গতকাল রাতে অবশ্য এই নিয়ে আলাপ করেছিলেন আমার সাথে, অতিরঞ্জন করার দরকার নেই, আবার ফারাও-এর সামনে কৃপণ হিসেবে পরিচিতি পেতে চাই না, বলেছিলেন তিনি। ধরো, পাঁচ হাজার স্বর্ণের আংটি; আর পঞ্চাশ ফেদান জমি অবশ্যই নদীর ধারে নয় । এরকম হলে কেমন হয়?

শেষমেষ অবশ্য আমার চাপাচাপিতে পাঁচ হাজার স্বর্ণের আংটি এবং নদী তীরের উর্বর এক হাজার ফেদান জমি দিতে সম্মত হয়েছেন তিনি। তার নির্দেশে ইতোমধ্যেই দলিলপত্র ঠিক করে রেখেছি আমি; তাঁর ব্যক্তিগত গোপন ভান্ডার থেকে স্বর্ণও আলাদা করেছি।

সবকিছু তৈরি। সমগ্র অতিথি এবং বরের সামনে এখন কেবল লসট্রিসের চাওয়ার অপেক্ষা । কিন্তু বিবর্ণ, নিপ, মূক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো লসট্রিস, কিছুই যেনো শুনছে না সে, কিছুই তাকে স্পর্শ করছে না।

বলো, কন্যা; কী চাও তুমি আমার কাছে? ইনটেফের পিতৃসুলভ স্বর কষ্টার্জিত শোনাতে লাগলো, এক হাতে ঝুঁকি মেরে যেনো মেয়েকে জাগাতে চাইলেন তিনি। বলো, কিভাবে আজকের দিনে তোমাকে আরো সুখী করতে পারি?

যেনো ভয়ানক এক দুস্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠলো লসট্রিস। নিজের চারপাশে তাকাতে লাগলো সে, অশ্রুবিন্দু টলমল করছে চোখে, পাতা উপচে পরার হুমকি স্পষ্ট। কিছু একটা বলার জন্যে মুখ খুলল ও, কিন্তু শরবিদ্ধ পাখির আর্তনাদের মতো আওয়াজ বেরুল কেবল কণ্ঠ থেকে। ঢোক গিলে নিরবে মাথা নাড়লো লসট্রিস।

কথা বলো, মেয়ে আমার। পিতৃসুলভ বাৎসল্য দেখাতে স্পষ্টতঃই দারুন কষ্ট হচ্ছে ইনটেফের। বলো, কী উপহার চাও আমার কাছে? যা চাও, তা-ই পাবে। বলো।

এতো দূর থেকেও পরিষ্কার টের পেলাম, কতোটা চেষ্টা করে মুখ খুলতে পারলো লসট্রিস; কিন্তু যখন কথা বলে উঠলো সে, স্পষ্ট-দ্বিধাহীন শোনালো তার কণ্ঠস্বর। উপস্থিত প্রত্যেকে পরিষ্কার শুনতে পেলো প্রতিটি শব্দ।

বিয়ের উপহার হিসেবে ক্রীতদাস টাইটা-কে চাই আমি।

যেনো পেটে ছুরি খেয়েছেন, চট করে এক পা পিছিয়ে গেলেন ইনটেফ। অবাক বিস্ময়ে মুখ হাঁ-বোবার মতো নিজের মেয়ের দিকে চেয়ে রইলেন তিনি কথা সরছে

মুখে। সম্ভবত কেবল ইনটেফ আর আমি জানি, কতো বড়ো উপহার চেয়েছে লসট্রিস। এক জীবনে যতো ধন-সম্পদ গড়েছেন ইনটেফ, তার সবকিছুর বদলেও এই দাবি মেটানোর সামর্থ্য নেই তার।

দ্রুতই নিজেকে ফিরে পেলেন ইনটেফ। মুখাবয়ব শান্ত, কোমল কিন্তু ঠোঁটের কোণ বেঁকে গেলো তার। তুমি খুবই কম চেয়ে ফেলেছো, কন্যা। মহান ফারাও-এর স্ত্রীর বিদায়ী উপহার একজন তুচ্ছ ক্রীতদাস? এ-ও কী হতে পারে?, না, এতটা ছোটো হতে পারবো না আমি। বরঞ্চ সত্যিকারের মূল্যবান কিছু তোমাকে দিতে চাই আমি, যেমন ধরে পাঁচ হাজার স্বর্ণের আংটি আর।

বাবা, আপনি সব সময়ই আমার প্রতি সদয় ছিলেন, কিন্তু আমার শুধু টাইটা-কে চাই।

ঝকঝকে হাসি হাসলেন ইনটেফ; ভীষণ উজ্জ্বল, ঠিক তার রাগের মতোই। টের পেলাম, ঝড়ের গতিতে কাজ করছে তার মাথা।

নিঃসন্দেহে আমি তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। কেবলমাত্র বিভিন্ন বিষয়ে আমার অসামান্য প্রতিভার জন্যেই নয়, তার চেয়ে বড়ো কথা, তাঁর সমস্ত জটিল, কুটিল কু-কর্মের সবকিছু আমি জানি। তার সমস্ত গুপ্তচরকে চিনি; ইনটেফ যাদেরকে আজ পর্যন্ত ঘুষ দিয়েছেন বা যাদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা আদায় করেছেন ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেককে জানি আমি। কোন্ কোন্ কাজ সমাধা হয়ে গেছে, কয়টিই বা বাকি আছে–এ সবই আমার জানা।

ইনটেফের শত্রুদের বিশাল তালিকা আমার নখদর্পণে। তাঁর বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীদের অপেক্ষাকৃত ছোট্ট তালিকাও আমার অজানা নয়। বিশাল সম্পদের যে পাহাড় তিনি চুরি করে গড়েছেন, তার প্রতিটি স্বর্ণ-খণ্ডের হদিশ বলে দিতে পারি। ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে কত জমি-জমা, মূল্যবান পাথর, যে তিনি অধিকার করেছেন, আমি ছাড়া আর ক জনই বা জানে সেটা? নিঃসন্দেহে এগুলো জানাজানি হলে তার সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবেন মহান ফারাও।

আমার ধারণা, আমার সাহায্য ছাড়া নিজের সম্পদের সঠিক হিসেব ইনটেফ নিজেও উদ্ধার করতে পারবেন না। তার গোপন জগতের সমস্ত হিসাব-নিকাশ আমি করে থাকি, নিজেকে সব কিছুর উর্ধ্বে রেখেছেন তিনি। সবকিছুই আমার হাতে ন্যস্ত।

হাজার হাজার অন্ধকার গোপনীয়তা, ভীতিকর ব্যবসা, ডাকাতি এবং হত্যাকান্ডের এতো কিছু জানি আমি, রাজ-উজিরের পদে আসীন কাউকেও শেষ করে দিতে পারে এই সমস্ত তথ্য।

না, আমাকে ছাড়া চলবে না ইনটেফের। আমাকে উপহার হিসেবে দেওয়া সম্ভব নয় তার পক্ষে। কিন্তু, স্বয়ং ফারাও এবং মহান থিবেসের সমস্ত অধিবাসীর সামনে লসট্রিসকে ফিরিয়ে দেবেন কেমন করে?

আগেই বলেছিলাম, ইনটেফ মহা চতুর লোক। নির্ঘাত দেবতা সেথ-এরও এতো ঘৃণা আর ক্রোধ নেই। কিন্তু এমন উভয় সংকটে তাকে কোনোদিন পড়তে দেখিনি।

ক্রীতদাস টাইটা সামনে এসে দাঁড়াক, ডেকে উঠলেন ইনটেফ। দ্রুত ঠেলে ধাক্কিয়ে মঞ্চের সামনে এসে দাঁড়ালাম আমি, চতুর কোনো পরিকল্পনার জন্যে সময় দিতে চাইছি না তাকে।

আমি হাজির, মালিক, বললাম। দৃষ্টিতে জিঘাংসা নিয়ে আমার পানে চাইলেন ইনটেফ। এতো দিন ধরে আমরা জানি পরস্পরকে, উচ্চারিত কোনো শব্দ ছাড়াও কেবল মুখের ভাব দেখে বুঝতে পারি আমি তাঁকে, তিনি আমাকে। নিরবে তাকিয়ে থাকলেন ইনটেফ, ভয়ের প্রাবল্যে পাখির মতো ডানা ঝাঁপটাতে লাগলো আমার হৃদয়। শেষমেষ নরম প্রায় আদুরে সুরে বলতে লাগলেন ইনটেফ, টাইটা, সেই শিশুকাল থেকে তুমি আমার কাছে আছে। দাস নয়, তোমাকে ঠিক আপন ভাইয়ের মতো জেনে এসেছি আমি। আমার কন্যার অনুরোধ তুমি শুনেছো। আমি দয়ালু মানুষ, এতদিন পরে তোমার ইচ্ছার বিপরীতে কোনোকিছু করা অন্যায় হবে। জানি, কোনো বিষয়েই কিছু বলার অধিকার নেই একজন দাসের, কিন্তু তোমার কথা আলাদা। বলো, টাইটা। যদি এতোদিন ধরে যেখানে থেকে এসেছে–যেটা তোমার একমাত্র বাড়ি সেখানে থেকে যেতে চাও; তাহলে তোমাকে চলে যেতে বলতে পারি না আমি; এমনকি আমার মেয়ে চাইলেও না। ভয়ঙ্কর হলদেটে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন ইনটে। কাপুরুষ নই আমি, কিন্তু নিজের নিরাপত্তার কথাও তো ভাবতে হবে। মনে হলো, যেনো সরাসরি মৃত্যুর চোখে তাকিয়ে আছি। গলায় স্বর খুঁজে পেলাম না ।

ইনটেফের দিক হতে দৃষ্টি সরিয়ে লসট্রিসের দিকে তাকালাম। এতো ভীষণ করুণ অনুনয় তার দৃষ্টিতে, এতো একাকিত্ব আর ভয়, আমার নিজের নিরাপত্তা তার কাছে কিছুই নয়। ওকে একা ছেড়ে দিতে পারি না আমি, যে কোনো মল্যে, চাই-কি নিজের

জীবনের বিনিময়ে হলেও।

মহান ফারাও-এর স্ত্রীর ইচ্ছাকে একজন তুচ্ছ দাস কেমন করে প্রত্যাখান করতে পারে, হুজুর? আমার নতুন মিসট্রেসের সাথে যেতে তৈরি আমি। জোরে, সবাইকে শুনিয়ে বললাম।

এদিকে এসো, ক্রীতদাস! আমার নতুন মনিব নির্দেশ দিলেন। আমার পেছনে এসে দাঁড়াও।

মঞ্চে উঠার সময় ইনটেফের পাশ ঘেঁষে যেতে হলো। তাঁর সাদা, ফ্যাকাসে ঠোঁট খুব সামান্যই নড়লো, কিন্তু স্পষ্ট শুনতে পেলাম, তিনি বলছেন, বিদায়, প্রিয়। তুমি মরে গেছে।

কেঁপে উঠলাম, যেনো বিষাক্ত একটা কোব্রা হেঁটে গেছে আমার পথে। দ্রুত আমার মিসট্রেসের পেছনে জায়গা করে নিলাম, যেনো ওখানে সম্পূর্ণ নিরাপদ আমি।

*

উত্সবের বাকি সময় সর্বক্ষণ লসট্রিসের পাশে পাশে থাকলাম আমি। খাবারের সময় চেষ্টা করলাম যেনো মিসট্রেস অন্তত কিছু একটু মুখে তোলে। আমি জানি, বিগত কয়েকদিন কিছুই খায়নি সে। এতো দুর্বল হয়ে পরেছে তাই।

বহু সাধ্য-সাধনার পর পানি মেশানো একটু মদ মুখে তুললো। সে, কিন্তু ও-ই, আর কিছু নয়। ফারাও-এর কাছে এ হলো তার সদ্য-বিবাহিত স্ত্রীর আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। নিজের স্বর্ণের পাত্র থেকে এবারে কিছুটা নির্জলা মদ খেতে আহ্বান জানালেন তিনি। নিজেও পান করলেন। দারুন উল্লাসে স্বাগত জানালো জনতা।

টাইটা, এক পাশে বসা ইনটেফের দিকে রাজার মনোযোগ সড়তেই আমাকে ডাকলো লসট্রিস, মনে হয়, বমি করে ফেলবো। এখানে থাকা সম্ভব নয়। দয়া করে আমার প্রকোষ্ঠে ফিরিয়ে নিয়ে চলো।

ভীষণ এক ঘটনা হতো মিসট্রেসের এই হঠাৎ অন্তর্ধান, কিন্তু চিকিৎসক সুখ্যাতির বদৌলতে খুব সহজেই কাজ হাসিল করলাম আমি। হাঁটুর উপর ভর করে এমন ভাবে ফারাও-এর কানে কানে বললাম কথাটা, অতিথিরা কেউ টেরই পেলো না।

পরে বুঝেছিলাম, মূলত বেশ দয়ালু প্রকৃতির মানুষ ছিলেন ফারাও মামোস। সেদিনই তার প্রমাণ দিয়েছিলেন তিনি। মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনে হাততালি দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন অভ্যাগত অতিথিদের। রাতের প্রস্তুতির জন্যে আমার স্ত্রী এবারে তার প্রকোষ্ঠে ফিরবেন। তার এই ঘোষণায় আনন্দ, হুলোড় আর আমোদের ঝড় বয়ে গেলো।

আমার সাহায্য ছাড়াই উঠে দাঁড়িয়ে রাজাকে কুর্নিশ করলো মিসট্রেস, এরপরে ভোজ-সভা ত্যাগ করলো। প্রকোষ্ঠে ফিরতে না ফিরতেই উগড়ে দিলো পেটের মদ, বিধ্বস্ত অবস্থায় লুটালো বিছানায় ।

আমি ট্যানাসকে ছাড়া বেঁচে থাকতে চাই না, দুর্বল স্বরে বললল লসট্রিস, কিন্তু গলার জেদ পুরোপুরি অটুট।

ট্যানাস বেঁচে আছে, ওকে সান্ত্বনা দিতে চাইলাম, সে তরুণ, শক্তিমান আরো অন্তত পঞ্চাশ বছর বাঁচবে। তোমাকে ভালবাসে সে; বলেছে প্রয়োজন হলে সারা জীবন অপেক্ষা করতে পারে। রাজা তো বুড়ো মানুষ, কয় দিনই আর বাঁচবেন–

পশমের চাদরের উপরে উঠে বসলো লসট্রিস। তার কণ্ঠস্বরে আরো বেশি রোখ এখন। আমি ট্যানাসের মেয়ে মানুষ। আর কোনো পুরুষ আমাকে পাবে না, তারচেয়ে বরং মরে যাবো আমি।

আমরা সবাইই একসময় মারা যাবো, মিসট্রেস, জানি, বিয়ের প্রথম কিছুদিন যদি ওর মন সান্ত্বনা দিয়ে রাখতে পারি, তবে কাজ হাসিল হবে। কিন্তু আমাকে হাড়ে হাড়ে চেনে এই মেয়ে।

কিছু বলল না, টাইটা; তোমার ওই সুন্দর কথায় কিছুই হবে না। আমি মরে যাবো। এক পাত্র বিষ তৈরি করে আনো আমার জন্যে এ আমার নির্দেশ।

মিসট্রেস, বিষ তৈরির বিদ্যা আমার জানা নেই যে, বাজে একটা অযুহাত, ফোঁস করে উঠলো লসট্রিস।

বহুবার আমি দেখেছি, আহত জীবগুলো ওই বিষ দিয়েছো তুমি। কানে বিষফোঁড়া সমেত তোমার কুকুরটাকে ভুলে গেছো; আর চিতার থাবায় ক্ষত-বিক্ষত সেই গ্যাজেলে র কথা কী বলবে? তুমিই বলেছিলে, ওই বিষে কোনো ব্যথা নেই, একদম ঘুমের মতো মরণ হয়। আমিও তাই চাই, ঘুমের ভেতর মরে গিয়ে মমি হয়ে চলে যাবো অন্য রাজ্যে । ওখানে অপেক্ষায় থাকবো ট্যানাসের।

আরো অযুহাত ছিলো আমার। কিন্তু তাহলে আমার কি হবে, মিসট্রেস? কেবল আজই আমার মালিকানা পেলে তুমি, এখনই ফেলে রেখে যাবে? আমার উপর একটু দয়া কর। একটু যেনো থমকালো লসট্রিস, মনে হতে লাগলো পেয়ে গেছি ওকে; কিন্তু চিড়ে ভিজলো না।

তোমার কিছু হবে না, টাইটা। আমার বাবা হাসিমুখে তোমাকে ফিরিয়ে নেবেন।

ছোট্ট সোনা, শোনো, শেষ অস্ত্র হিসেবে ওর বাল্যকালের একটা ডাক ব্যবহার করলাম। সকালে না হয় কথা বলবো আমরা, দেখো তখন সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিছুই ঠিক হবে না, নাছোড়বান্দা লসট্রিস। ট্যানাসের থেকে দূরে চলে যাবো আমি, আর ওই বুড়ো ব্যাটা বিছানায় জঘন্য কাজ করবে আমার সাথে! এতো উচ্চস্বরে কথা বলছে সে, আমার আশঙ্কা হলো রাজার হারেমের বাকি সদস্যরা না আবার শুনে ফেলে। সৌভাগ্যবশত তারা সবাই এখন উৎসবে।

লসট্রিসের স্বরে উন্মাদনা ক্রমশই বাড়তে লাগলো। এখন, এই মুহূর্তে ওই বিষ তৈরি কর আমার সামনে! আমি নির্দেশ করছি তোমাকে। অবাধ্যতার ফল ভালো হবে না। এবারে এতো জোরে বলতে লাগলো সে, ভয় হলো প্রাসাদের দ্বাররক্ষীর কান পর্যন্ত না পৌঁছে যায়।

ঠিক আছে, তাই করছি। আমার ওষুধের বাক্সটা নিয়ে আসতে হবে সেজন্যে।

বাক্স নিয়ে ফিরে এসে দেখি, অদ্ভুত জ্বলজ্বলে চোখে কক্ষের এ-মাথা ওমাথায় পায়চারী করছে লসট্রিস।

আমি নজর রাখছি তোমার উপর। কোনোরকম চালাকি করে লাভ নেই, লাল কাঁচের বোতল থেকে গুঁড়ো নিয়ে বিষ তৈরির সময় বললো সে।

তৈরি শেষ হতে নির্ভয়ে বোতলটা হাতে নিলো লসট্রিস। একটু থেমে চুমো খেলো আমার গালে। তুমি আমার কাছে প্রিয় ভাই, বাবার মতো। শেষ এই দয়ার জন্যে ধন্যবাদ। আমি তোমাকে ভালোবাসি, টাইটা। সবসময় বাসতাম। দুই হাতে বোতলটা উঁচু করে ধরে সে। ট্যানাস, প্রিয়, ওরা কখনই তোমার কাছ থেকে নিয়ে যেতে পারবে

আমাকে। আবার আমাদের দেখা হবেই হবে! এক চুমুকে পুরো বোতল নিঃশেষ করে ওটা ছুঁড়ে ফেলে লসট্রিস। কিছু সময়ের মধ্যেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে লুটিয়ে পরে বিছানায়।

আমার পাশে এসে বসো না, টাইটা। মরতে খুব ভয় লাগছে।

খালি পেটে খুব দ্রুতই কাজ করলো বিষ। কেবল আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে একটা কথা বলতে পারলো সে, ট্যানাসকে বলো, কত ভালোবাসি ওকে। মরণের আগেও, পরেও অপেক্ষায় থাকবো ওরই জন্যে। এরপরে চোখ মুদল আমার মিসট্রেস।

এতোটাই ফ্যাকাসে আর স্থির দেখালো ওকে, এক মুহূর্তের জন্যে আশঙ্কায় শিউড়ে উঠলাম। তবে কি প্রাণঘাতি ধুতুরার বদলে লাল শেপেনের যে গুঁড়ো দিয়েছিলাম, তার মাত্রা কড়া হয়ে গিয়েছিলো? ছোটো একটা আয়না মিসট্রেসের মুখের সামনে রাখতেই আশ্বস্ত হলাম না, শ্বাস ফেলছে সে। যত্ন করে চাদরে মুড়ে দিলাম ওকে, মনে আশা হয়তো সকালে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে বেঁচে থাকার জন্যে আমাকে ক্ষমা করবে।

ঠিক এই সময় প্রকোষ্ঠের বাইরের অংশের দরোজায় কড়াঘাতের শব্দ হলো। রাজ-পরিচর্যক, আতন ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি চাইছে। সে-ও একজন অপুরুষ ফারাও শাসনের আরও একজন সেবক। আমি তাকে ভাই বলেই জানি, দ্রুত স্বাগত জানাতে এগিয়ে গেলাম।

টাইটা, রাজার ভোগের জন্যে তোমার ছোট্ট কর্ত্রীকে নিয়ে যেতে এসেছি আমি, বিশাল দেহের তুলনায় দারুন বেমানান তীক্ষ্ণ, মেয়েলী স্বরে বললো আতন। যৌবন প্রাপ্তির আগেই নপুংসক করা হয়েছিলো তাকে। সে তৈরি তো?

একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে, ব্যাখ্যা করে বললাম। শেষমেষ ঘুমন্ত লসট্রিসের কাছে নিয়ে গেলাম তাকে।

ওর অবস্থা দেখে ভীষণ দুশ্চিন্তায় প্রসাধন-চর্চিত গাল ফোলাতে লাগলো আতন । ফারাও-কে কী বলবো এখন? প্রায় কেঁদে ফেললো সে। উনি মারবেন আমাকে। আমি এটা বলতে পারবো না। এই মেয়ে তোমার দায়িত্বে আছে, রাজার সামনে তুমি গিয়ে বলো তার অবস্থা। আমি পারবো না।

এমন নয় যে এই দায়িত্ব সানন্দে পালন করছি আমি, কিন্তু আতন সত্যিই ভয়ে সিঁটিয়ে গেছে। আর চিকিৎসক হিসেবে আমার পরিচয় বেশ কাজ দেবে বলে ধারণা করলাম । নিতান্তই অনিচ্ছাসত্ত্বে রাজকীয় শয্যাকক্ষের দিকে রওনা হলাম, আতনকে সঙ্গে করে। অবশ্য যাওয়ার আগে বৃদ্ধা একজন দাসীর পাহারায় রেখে এলাম লসট্রিসকে।

পরচুলা এবং মুকুট খুলে রেখেছেন ফারাও। অসট্রিচের ডিমের মতোই চকচকে টাক তার মাথায়। এমনকি আমি পর্যন্ত থমকে গেলাম, না জানি এটা দেখলে আমার মিসট্রেসের কি অনুভূতি হতো ।

আমাকে দেখতে পেয়ে ঠিক একই রকম চমকে গেলেন রাজা। হাঁটুগেড়ে বসে মাথা ঝোকালাম তার সামনে।

কী হয়েছে, দাস টাইটা?

দয়ার সাগর, মহান ফারাও; আমার কী লুসট্রিসের পক্ষ থেকে আপনার উপলব্ধি এবং ক্ষমা চাইতে এসেছি আমি। এরপরে, লসট্রিসের অবস্থার ভয়ঙ্কর বিবরণ দিয়ে গেলাম। চিকিৎসাবিদ্যা সংক্রান্ত এক গাদা ধোয়াটে কথাবার্তা বলে ব্যাখ্যা করতে চাইলাম কেননা এই মুহূর্তে রাজার ভোগ-বিলাসের উপযুক্ত নয় সে। দুঃখিত চেহারায় আমার পাশে দাঁড়িয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে গেলো আতন।

যুবক কোনো পুরুষ হলে এই সব কথায় ভুলতো না আমি নিশ্চিত, কিন্তু ফারাও হলেন বুড়ো ষড়। গত ত্রিশ বছরে যে সুন্দরী রমণীদের সেবা দিয়ে এসেছেন, তার একটা ফলাফল তো থাকবেই। সম্ভবত, সমগ্র থিবেস নগরকে একশ বা তার অধিক বার ঘিরে রাখার মতো তাদের সংখ্যা।

মহান ফারাও, শেষপর্যন্ত বলে উঠে আতন। আপনি অনুমতি দিলে, আজকে রাতের জন্যে অন্য একটা মেয়েকে নিয়ে আসতে পারি আমি। ওই যে, সেই ছোট্ট হারিয়ার মেয়েটা–

না, না, বাধা দিয়ে বললেন রাজা। আমার স্ত্রী সুস্থ হলে এর জন্যে অনেক সময় পাওয়া যাবে। এখন তুমি বিদায় হও, পরিচর্যক। কিছু ব্যাপার নিয়ে চিকিৎসক মানে, ক্রীতদাস টাইটার সাথে কথা আছে আমার।

আমরা একা হতে কাপড় তুলে নিজের বিশাল পেট দেখালেন রাজা। এর কারণ কী, টাইটা? তাঁর উন্মুক্ত পেটের দানা দানা লালচে দাগগুলো পরীক্ষা করে দেখলাম আমি। সাধারণ ছত্রাক সংক্রমণ। নির্ঘাত নিয়মিত স্নান করে না, এমন কোনো মেয়ের শরীর থেকে ওই রোগ ধরেছে ফারাও-কে। আমি জানি, দারুন চুলকানি হয় এই রোগে।

সারাতে পারবে তুমি? ভয় আমাদের সবার কাছেই একই রকম। যে কোনো কাতর রোগীর মতোই এই মুহূর্তে ব্যবহার করছেন ফারাও।

তার অনুমতি নিয়ে আমার প্রকোষ্ঠ থেকে ওষুধের বাক্সটা নিয়ে এলাম। নিজের স্বর্ণ এবং আইভরি মন্ডিত বিছানায় শুয়ে রইলেন ফারাও, তাঁর লালচে ক্ষতে মল লাগিয়ে দিলাম আমি। আমার নিজের আবিস্কৃত এই মলমে তিন দিনে ঠিক হয়ে যান। এই রোগ–আশ্বস্ত করে জানালাম তাকে।

এই যে একটা বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করেছি, তা অনেকাংশে তোমার কারণে, বলে চললেন ফারাও। তোমার মলমে হয়তো এই রোগ সারবে, কিন্তু তোমার কর্ত্রী কী ছেলে সন্তান দিতে পারবে আমাকে? জানতে চাইলেন তিনি। ভীষণ দুঃশ্চিন্তায় আছি। আরো এক বছরের মধ্যেই পুত্র-সন্তান চাই আমার । সমগ্র সাম্রাজ্য আজ মহাবিপদে রয়েছে।

আমরা, চিকিৎসকেরা, নিজেদের ব্যবস্থায় আরোগ্য লাভ সম্পর্কে সাধারণত কোনো রকম নিশ্চয়তা দিতে চাই না। ঠিক আইনজ্ঞ বা জোতিষীদের মতোই। কিন্তু আমার পথ খুলে দিলেন ফারাও স্বয়ং।

আমি এখন আর যুবক নই, টাইটা। তুমি একজন চিকিৎসক, তোমার কাছে লুকাবো না। বহু যুদ্ধে ক্ষয়ে গেছে আমার অস্ত্র। আগের মতো আর ধার নেই তার ফলায়। সাম্প্রতিক সময়ে আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে ওটা। তোমার বাক্সে কী এমন কিছু নেই, যা পদ্মের নরম ডাটাকে দৃঢ় করে দিতে পারে?

ফারাও, সমস্ত কিছু খুলে বলার জন্যে আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কোনো কোনো সময় দারুন অদ্ভুত রকম ভাবে কাজ করেন দেবতারা বলে চললাম আমি, আমার কুমারী কর্ত্রীর সঙ্গে আপনার প্রথম রাত সুসম্পন্ন হতে হবে। যে কোনো রকম দ্বিধা, বক্রতা; আপনার পৌরুষের নিদর্শন তুলে ধরতে যে কোনো রকম ব্যর্থতার ফলাফল ভালো হবে না। একটাই মাত্র সুযোগ আছে, প্রথম বারেই সফল মিলন প্রয়োজন। যদি দ্বিতীয়বার চেষ্টা করতে হয়, দেবতা না করুন, আবারো কন্যা সন্তান জন্মানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

তর্জনী উঁচিয়ে ধরলাম আমি। যদি আজ রাতে আমরা চেষ্টা করতাম, আর বাকিটুকু না বলে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে তর্জনী নামালাম। না, আমরা আসলেই অতি ভাগ্যবান। দেবতারা আর একটা সুযোগ দিয়েছেন আমাদের।

কী করা উচিত এখন? উদ্বিগ্ন স্বরে জানতে চাইলেন ফারাও। বেশ কিছু সময় নিরবে তার পাশে হাঁটুগেড়ে বসে রইলাম আমি।

হ্যাঁ, মহামান্য ফারাও, কিছু তো অবশ্যই করার আছে আমাদের। তবে এতে সময় লাগবে। এই চামড়ার রোগ সারানোর মতো সহজ হবে না সেটা। ঝড়ের বেগে চলছিলো আমার মস্তিস্ক। এই সুযোগ থেকে সবটুকু সুবিধা আদায় করে নিতে হবে আমাকে। খুব কড়া-কড়ি ভাবে খাদ্য গ্রহণ করতে হবে, মালিক।

আর যাঁড়ের বিচি নয়, তোমাকে মিনতি জানাই, কবিরাজ।

না, আমার ধারণা, ওগুলো যথেষ্ট খেয়েছেন আপনি। কিন্তু, আপনার রক্ত গরম করতে এবং ঔরস মিঠে করতে হবে আমাদেরকে, নতুবা চেষ্টা করে লাভ নেই। গরম ছাগ-দুগ্ধ এবং তিনবেলা মধু খেতে হবে; এবং অবশ্যই আমি যে মিশ্রণ তৈরি করে দেবো সেটাও। গন্ডারের শিং-এর গুঁড়ো আর ম্যানড্রেকের গুল্ম থেকে তৈরি হবে সেই রস।

একটু আশ্বস্ত হলেন ফারাও। তুমি নিশ্চিত, এতে কাজ হবে?

এই ব্যবস্থা কখনওই ব্যর্থ হয় নি। তবে আরও একটা বিষয় আছে।

কী সেটা? স্বস্তি উবে গেলো ফারাও-এর, শঙ্কিত ভঙ্গিতে বিছানায় বসলেন তিনি।

ভোগ-বিলাস থেকে সম্পূর্ণ বিরতি। অবশ্যই রাজকীয় সদস্যের পূর্ণ শক্তি এবং ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্যে সময় দিতে হবে আপনাকে। হারেমের সমস্ত সম্ভোগ ত্যাগ করতে হবে। অন্তত কিছু সময়ের জন্যে হলেও। চিকিৎসকের ভাব-গাম্ভির্য নিয়ে বললাম আমি। বিলক্ষণ জানি, লসট্রিসকে অনাঘ্রাতা রাখার এ-ই একমাত্র উপায় । কিন্তু রাজার প্রতিক্রিয়া কী হবে ভেবে ভয় লাগছে। এমনও তো হতে পারে, দাম্পত্য সুখে বাধা পেয়ে ক্ষেপে গেলেন তিনি? আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারেন, সেক্ষেত্রে এতক্ষণের অর্জিত সমস্ত সুবিধা কোনও কাজে আসবে না। কিন্তু আমার মিসট্রেসের জন্যে এই ঝুঁকি নিতে হবে আমাকে, যতক্ষণ সম্ভব রক্ষা করতে হবে তাকে।

রাজার প্রতিক্রিয়ায় অবাক হলাম। বিছানায় মাথা রেখে আশ্বস্ত ভঙ্গিতে মৃদু হাসলেন ফারাও। কতো দিন? বেশ হাসিখুশি ভাবে জানতে চাইলেন। চরম বিস্ময়ের সাথে বুঝতে পারলাম, আমার এই নিষেধাজ্ঞা বেশ স্বস্তির হয়ে এসেছে তার জন্যে।

আমার কাছে নারীর দেহ-সম্ভোগ যেখানে অসম্ভব এক স্বপ্ন একজন ফারাও-এর কাছে অতি-ব্যবহারে পুরোনো একটা বিষয় সেটা।

সেই সময়ে, কম করে হলেও তিনশ পত্নী এবং উপ-পত্নী ছিলো ফারাও-এর হারেমে; আর কিছু এশীয় মেয়ে আছে, যাদের রয়েছে অতৃপ্ত তৃষ্ণা। রাতের পর রাত, বছরের পর বছর ঠিক একজন দেবতার মতো এই অক্লান্ত ভালোবাসায় কতোই না শক্তি ক্ষয় হয়েছে মহান ফারাও-এর ভেবে করুণা হলো।

নব্বই দিন, অবশেষে বললাম আমি।

নব্বই দিন? চিন্তান্বিত ভাবে বললেন ফারাও। দশ দিন করে ধরলে, নয়টি মিশরীয় সপ্তাহ?।

কম করে হলেও, শক্ত মুখে বললাম।

ঠিক আছে, সহজ ভঙ্গিতে মেনে নিয়ে বিষয় পরিবর্তন করলেন রাজা।

আমার পরিচর্যকের কাছে শুনলাম, তুমি নাকি আমাদের এই মিশরের সেরা তিনজন জোতিষী র একজন?

কেন যে অমন মন্তব্য করলো আতন-ভেবে পেলাম না। আমি ছাড়া বাকি দু জন আবার কারা? বিনয়ের সাথে কুর্নিশ করলাম, সে একটু অতিরঞ্জন করেছে, মহান ফারাও। তবে হয়তো স্বর্গীয় আত্মাদের কিছু ব্যপার আমার জানা আছে।

আগ্রহের আতিশায্যে উঠে বসলেন ফারাও। এখনই একটা ভবিষ্যদ্বানী কর আমার জন্যে।

এখন? দারুন বিস্ময়ে বললাম।

এখন! কেন নয়? তোমার কথা অনুযায়ী, এখন তো রাতে তেমন কিছু করার নেই আমার। তাঁর অপ্রত্যাশিত হাসি সত্যিই মিষ্টি; যদিও ট্যানাস এবং লসট্রিসের জীবনে তিনিই দুঃখ বয়ে নিয়ে এসেছেন–তাঁকে আমার ভালোই লাগলো।

প্রাসাদের গ্রন্থাগার থেকে কিছু স্ক্রোল নিয়ে আসতে হবে আমাকে সেজন্যে।

সারারাত পরে আছে। যা কিছু খুশি, নিয়ে এসো।

রাজার সাগ্রহ দৃষ্টির সামনে তার প্রথম দফা কুষ্ঠি তৈরি করলাম। ঠিক আমার পর্যবেক্ষণের মতোই তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিজস্ব নক্ষত্র দ্বারা চালিত। সেই রক্ত লাল ভবঘুরে তারা, যেটাকে আমরা সেথ্‌-এর চোখ বলে জানি তার ভাগ্য দখল করে আছে। এ হলো সংঘর্ষ এবং অনিশ্চয়তা; দ্বিধা-ভারাতুরতা এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ; দুঃখ এবং দুর্ভাগ্য, এবং সবশেষে, অপঘাতে মৃতুর ইঙ্গিতবাহী নক্ষত্র।

কেমন করে তাকে এই সমস্ত কথা বলবো আমি?

তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া বহু ঘটনার বিবরণ দিয়ে গেলাম, এমনকি অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কিছু বিষয়ের কথাও বললাম আমার গুপ্তচরদের কাছ থেকে যেগুলো জেনেছিলাম। এর অনেকগুলো অবশ্যই আতন জানিয়েছিলো আমাকে। এরপরে, সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘজীবনের নিশ্চয়তা দিলাম তাকে সব মানুষই এটা শুনতে চায়।

দারুন প্রভাবিত হলেন রাজা। এতো গুণ তোমার, আমার প্রত্যাশা বেড়ে চলেছে টাইটা।

ধন্যবাদ, মহান ফারাও। আপনার সেবায় আসতে পেরে আমি খুশি। স্ক্রোল আর প্রায় সকাল হয়ে এসেছে, ইতোমধ্যেই। প্রাসাদের দেয়ালের ওপারে সকালের পাখিদের ডাক শুনতে পাচ্ছি।

দাঁড়াও, আমি তোমাকে যাওয়ার অনুমতি দেই নি। যা জানতে চাই, তার কিছুই তুমি আমাকে বলনি। আমার কী পুত্র-সন্তান হবে? বংশধারা রক্ষা পাবে?

হায়, মহান ফারাও; ওই সব ব্যপার নক্ষত্র দেখে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। কেবল আপনার জীবনের সাধারণ নির্দেশনা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সামান্য কিছু অনুমান করা যায় নক্ষত্র থেকে–

আহ, আমাকে থামিয়ে দিলেন তিনি। কিন্তু ভবিষ্যত দেখার তো আরও উপায় আছে, নয় কি? কথার ধারা কোনদিকে যাচ্ছে ভেবে সতর্ক হলাম আমি, চলে যেতে পারলে বাঁচি। কিন্তু রাজা ছাড়বেন না।

আমি তোমার সম্পর্কে কৌতূহলি, টাইটা, তোমার ব্যপারে সব খোঁজই আছে আমার কাছে। আমন রার ইন্দ্রজাল তোমার সাধ্যের মধ্যেই, আমি জানি। মুষড়ে পড়লাম আমি। কেমন করে রাজা জানলেন এ কথা? খুব কম লোকেরই জানা আছে, এই ঐশ্বরিক শক্তির অধিকারী আমি। আমি চাই নি, সবাই জানুক এটা। চুপ করে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই এখন।

তোমার ওষুধের বাক্সের তলায় রার ধাঁধা আছে, আমি দেখেছি, বললেন ফারাও। মিথ্যে বলে যে ধরা খেয়ে যাই নি, দেবতারা সহায় । জানি, এরপরে কী বলবেন ফারাও।

ইন্দ্রজাল তৈরি কর, আমাকে বল, আমার বংশধারা রক্ষিত হবে কি না। আমি কী পুত্র সন্তানের পিতা হতে পারবো না?

কুষ্ঠি হলো এক মামুলি ব্যাপার; কেবল নক্ষত্রের গতিপথ এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জানা থাকলেই ভবিষ্যদ্বাণী করা যায়। আর, আমন রার স্বর্গীয় ইন্দ্রজাল সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। জীবনী শক্তি শুষে নেয় এটা, আত্মার গভীরে পুড়ে যায় প্রচুর অনুভূতি। ভীষণ দুর্বল হয়ে পরে মানুষ এটা করার পরে ।

আজকাল এ সব থেকে দূরে সরে থাকতে চাই আমি। হয়তো, কখনও কখনও আমন রার ধাঁধা অনুশীলন করতে বাধ্য হই; কিন্তু এরপর বহুদিন মানসিক এবং শারীরিক ক্লান্তি ঘিরে রাখে আমাকে। এমনকি, আমার কর্ত্রী লসট্রিস পর্যন্ত জানে আমার এই ঐশ্বরিক শক্তির কথা; এ-ও দেখেছে, কতটা দুর্বল হয়ে যাই এটা অনুশীলন করলে। তাই ওই কার্যে আমাকে বারণ করেছে সে।

কিন্তু, একজন রাজাকে তুচ্ছ ক্রীতদাস কী করে ফিরিয়ে দেবে? দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওষুধের বাক্সের নিচ থেকে আমন রার ধাঁধা বের করলাম আমি। বাক্সটা একপাশে সরিয়ে রেখে লতাগুল থেকে মিশ্রণ তৈরিতে মগ্ন হলাম, আত্মার চোখ খুলে দেয় ওটা–ভবিষ্যতে নিয়ে চলে। তৈরি শেষ হতে মিশ্রণটা পান করে নিলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিচিত সেই অনুভূতি দেহ ছেড়ে আত্মার নিগমণ টের পেলাম। তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পরছি ক্রমশই, মনে হলো বাস্তব জগৎ থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছি। বাক্স থেকে আমন রার ধাঁধাগুলো হাতে নিলাম।

দশটি আইভরি চাকতি ধারণ করে আছে ধাঁধাগুলো । দশ হলো শুদ্ধতম জ্ঞানের প্রতীক। মানবের অস্তিত্বের এক একটি অংশ ধারণ করে ভিন্ন ভিন্ন চাকতি। ওগুলো নাড়াচাড়া করতে আমার সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হতে লাগলো । দ্রুত আমার হাতে গরম ঠেকতে লাগলো চাকতিগুলো, যেনো আমার দেহের তাপ শুষে নিচ্ছে। ফারাও কে একটি করে চাকতি হাতে নিতে বললাম আমি, আঙুলের ফাঁকে ঘষে ঘষে সম্পূর্ণ মনোযোগ এক করতে বললাম। একই সঙ্গে উচ্চস্বরে প্রশ্ন করে করতে লাগলেন তিনি, আমার কী পুত্র সন্তান হবে? বংশধারা রক্ষিত হবে?

সম্পূর্ণ শিথীল শরীরে দেহের ভেতরে ঐশ্বরিক শক্তিকে আমন্ত্রণ জানালাম। যেনো অন্তর্ভেদি গোলার মতো ফারাও-এর প্রশ্নগুলো ভেঙে ভেঙে ঢুকে পরলো আমার অভ্যন্তরে ।

বাঁশির আওয়াজে মোহমুগ্ধ কোব্রার মতো এদিক ওদিক দুলতে শুরু করেছি আমি। ঔষধের প্রভাব এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ। যেনো আমার দেহের কোনো ভর নেই, শূন্যে ভেসে চলেছি। অনেক দূর থেকে যেনো বলে উঠলাম আমি, কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনি তুলছে মাথার ভেতর।

অন্ধকারের ভেতর থেকে ছায়ামূর্তি তৈরি হতে থাকলো আমার সামনে, অদ্ভুত আওয়াজে কান ভরে উঠলো। অর্থবহ কোনো ধ্বনি নয়, কেবলই বিশৃঙ্খল শব্দমালা। চোখ জ্বলছে আমার। আরো শূন্যে উঠে পরছি আমি ক্রমশই, মহাশূন্যে পৌঁছে গেছি যেনবা ।

মাথার ভেতরের শব্দমালা এবারে অর্থবহ হতে থাকে, চোখের সামনে তৈরি হয় পরিষ্কার ছবি।

নবজাতকের কান্না শুনতে পারছি আমি, কণ্ঠস্বর ভেঙে গেলো আমার।

ছেলে? মাথার ভেতরে যেনো দপদপিয়ে উঠলো ফারাও-এর কণ্ঠস্বর ।

ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে আসে আমার দৃষ্টি। দীর্ঘ একটা সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় আলোর একটু রেখা যেনো দেখতে পাই আমি। হাতেধরা আইভরি ধাঁধাগুলো যেনো আগুন-গরম–তালুতে ছ্যাঁকা দিচ্ছে ।

নাড়িতে পেঁচানো অবস্থায়, আলোর বৃত্তের মাঝে একটি শিশুকে দেখতে পেলাম আমি, মাতৃজঠরের তরলে সর্বাঙ্গ ভেঁজা।

একটা শিশু দেখছি আমি, কঁকিয়ে উঠলাম।

ছেলে শিশু? আমার চারপাশ ঘিরে থাকা আঁধারের ভেতর থেকে বলে উঠেন ফারাও।

কেঁদে উঠে শূন্যে পা ছেড়ে শিশুটি, ওর পায়ের ভাঁজে বসে থাকা ছোট্ট অঙ্গ দেখতে পেলাম আমি।

ছেলে, বলতে গিয়ে পরাবাস্তব জগতের এই নবজাতকের প্রতি আমার স্নেহের প্রাবল্যে অবাক হলাম। এগিয়ে গিয়ে একটু ধরতে চাইলাম ওকে, কিন্তু আমার দৃষ্টি ক্রমশই ঝাপসা হয়ে আসে–বাচ্চাটার কান্না দূরাগত হতে হতে মিলিয়ে যায় অন্ধকারে।

বংশধারা? আমার বংশধারার কী হবে? টিকবে ওটা? রাজার কণ্ঠস্বর আমার কান পর্যন্ত পৌঁছল, এরপর বিভিন্ন শব্দের শোরাগোলে হারিয়ে গেলো সেটা। যুদ্ধের ধ্বনি শুনতে পেলাম আমি, মরণপণ যুদ্ধরত সৈনিকের হুঙ্কার, ধাতুর সঙ্গে ধাতুর সংঘর্ষ শুনতে পেলাম। আমি দেখলাম, মাথার উপরের আকাশ ছেয়ে গেছে তীরের ঝাঁকে।

যুদ্ধ! ভীষণ নৃশংস এক যুদ্ধ দেখতে পারছি আমি যা পুরো দুনিয়া পাল্টে দেবে, রণ-হুঙ্কার ছাপিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলা

আমার বংশধার টিকে থাকবে? উদ্বিগ্ন শোনালো রাজার গলা, পাত্তা দিলাম না আমি। মরুর ঝড় অথবা নীল নদের জলপ্রপাতের আওয়াজ যেনো ভেসে এলো আমার কানে। দেখলাম, আমার দিগন্ত ঝাপসা করে রেখেছে অদ্ভুত এক টুকরো হলুদ মেঘ। তারই মাঝে হঠাৎ হঠাৎ চমকে উঠছে সূর্যরশ্মি।

আমার বংশধারার কী হবে? ফারাও-এর আর্তনাদে আমার দৃষ্টি ফিকে হয়ে আসে। মাথার ভেতরে এখন নিদারুন নিস্তদ্ধতা। নদীর ধারে একটা বৃক্ষ দেখতে পেলাম আমি। বিশাল এক একাশিয়া গাছ, পাতা বহুল-ফলে ফলে ভরে উঠেছে তার ডাল। সবচেয়ে উঁচু শাখায় বসে কর্কশ কন্ঠে ডেকে উঠে রাজকীয় বাজপাখি, কিন্তু আমার চোখের সামনে রঙ, আকৃতি পাল্টে গেলো তার। মিশরের লাল এবং সাদা দ্বৈত মুকুটে পরিণত হলো সেটা। এরপর, পাঁচবার নীলনদের পানির উত্থান-পতন দেখলাম আমি।

আমার তীব্র দৃষ্টির সামনে একাশিয়া গাছের মাথা ঢেকে ফেললো কীট-পতঙ্গের এক বিশাল মেঘ। প্রচুর কীট অধিকার নিলো গাছটির, একদম ঢেকে গেছে ওটা। পোকাগুলো সরে যেতে দেখলাম, কেবল কাণ্ড ছাড়া আর কিছু নেই, কোনো সবুজ অবশিষ্ট নেই গাছটার । একটি পাতাও নেই। এরপর, কেঁপে উঠে মাটিতে লুটিয়ে পরে সেটা। ডালপালার সঙ্গে ভেঙে টুকরো টুকরো হয় মিশরের দ্বৈত-মুকুট। খন্ডগুলো ক্রমেই পরিণত হয় ধুলোয়, বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায় সেগুলো। কিছু নয়, কেবল বাতাস আর মরুর ধুলো অধিকার করে রাখে চরাচর।

কি দেখছো তুমি? জানতে চাইলেন ফারাও। সব মিলিয়ে যায় আমার চোখের সামনে থেকে, নিজেকে রাজার শয্যাকক্ষে আবিষ্কার করি আমি। ফুঁপিয়ে উঠে শ্বাস ফেলছি, যেনো কতদূর পথ দৌড়ে এসেছি। কপালে লেপ্টে আছে ঘামের পুরু স্তর। গায়ের জামা ভিজিয়ে দেহের পাশে ছোটখাটো একটা পুকুর তৈরি করে ফেলেছে ঘামের ধারা। প্রচণ্ড জ্বরে কাঁপুনি উঠে গেলো, পেটের ভেতরে সেই পরিচিত অসুস্থ অনুভূতি, আমি জানি যা আরো কিছুদিন সঙ্গী হবে আমার ।

এক দৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন ফারাও, এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্যের বিবরণ কেমন করে দেবো তাকে? কি দেখেছো তুমি? ফিসফিস করে জানতে চাইলেন তিনি। আমার বংশধারা টিকে থাকবে?

সত্যি কথা বলা সম্ভব নয়, তাই ভিন্ন একটা গল্প তৈরি করতে হলো। আমি দেখেছি, সবুজে ছাওয়া একটা বন আমার দৃষ্টিসীমা অধিকার করে রেখেছিলো সেটা। এতো বৃক্ষ কোনো শেষ নেই তার; আর প্রতিটি গাছের শিখরে একটি করে দ্বৈত মুকুট।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন ফারাও। নিঃশব্দে বসে রইলাম আমরা। তাঁর প্রতি করুণায় মন আর্দ্র হলো আমার।

শেষমেষ, নরম স্বরে মিছে কথা বললাম তাঁকে। যে বন আমি দেখেছি, তা আপনার বংশধরদের। ফিসফিস করে বললাম। সময়ের শেষ পর্যন্ত আছে তারা, প্রত্যেকের শিরে রয়েছে মিশরের দ্বৈত-মুকুট।

মুখ উঁচু করে তাকালেন ফারাও। তাঁর আনন্দ আর কৃতজ্ঞতা করুণ দেখালো । ধন্যবাদ, টাইটা। নিজের চোখে দেখলাম, কতটা কষ্ট হয় তোমার। যাও, বিশ্রাম নাও। আগামীকাল আমরা গজ-দ্বীপে ফিরে যাবো। তোমার এবং তোমার কীর জন্যে ভিন্ন একটা গ্যালির ব্যবস্থা করা হবে। আমার অমরত্বের বীজ যে বহন করবে, জীবন দিয়ে হলেও ওকে রক্ষা কর তাকে।

এতো দুর্বলবোধ করছিলাম, বিছানার কিনারা ধরে উঠে দাঁড়াতে হলো। দরোজার কাছে পৌঁছে চৌকাঠ ধরে নিজেকে সামলালাম। কিন্তু মিসট্রেসের প্রতি আমার দায়িত্ব ভুলি নি।

ফুল শয্যার চাদরের কী হবে? মানুষ ওটা দেখতে চাইবে, মনে করিয়ে দিলাম ফারাওকে। আপনার এবং আমার কর্ত্রীর সম্মানের প্রশ্ন এটা।

তুমি কি বলো, টাইটা? এতো দ্রুত আমার উপর নির্ভর করতে শুরু করে দিয়েছেন তিনি। কিছু সময় আমার কথা শুনে মাথা ঝাঁকালেন, ঠিক আছে!

ফুল-শয্যার চাদর গুটিয়ে নিলাম আমি। পুব থেকে আসা মসলিনের সুতোয় বোনা বিশুদ্ধ লিনেনের কাপড় ওটা। শান্ত, ঘুম কাতর প্রাসাদের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চাদর সমেত হারেমে প্রবেশ করলাম আমি। তখনও অন্ধকার ভালোভাবে কাটেনি।

এখনও মরার মতো ঘুমাচ্ছে মিসট্রেস। যতটুকু লাল শেপেনের গুঁড়ো দিয়েছি তাকে, তাতে করে আজকের দিন তো বটেই, আগামী সন্ধে পর্যন্ত ঘুমাবে সে। ওর বিছানার পাশে বসে রইলাম কিছু সময়। আমার সবটুকু শক্তি, স্পৃহা যেনো শুষে নিয়েছে আমন রার ইন্দ্রজাল। কিন্তু যে দৃশ্য দেখেছি তাতে আমার মনের অশান্তি আরো জোড়ালো হয়। একটা ব্যপারে আমি নিশ্চিত, যে বাচ্চাটা দেখেছি ওটা আমার মিসট্রেসেরই; কিন্তু বাকি যা দেখলাম তার কি ব্যাখ্যা? এই ধাঁধার কোনো উত্তর বের করতে না পেরে কাজে লেগে পড়লাম।

লসট্রিসের পাশে, চাদরটা বিছিয়ে দিলাম মেঝেতে। ছুরির ডগা দিয়ে সামান্য খোঁচা দিতেই রক্ত ঝরতে লাগলো আমার বাহু থেকে ফোঁটা গুলো চাদরের উপর ঝরতে দিলাম আমি। যখন সন্তুষ্ট হলাম যে, উদ্দেশ্যে হাসিল হয়েছে; হাতটা বেঁধে নিলাম লিনেনের ফালি দিয়ে। রক্তের দাগ পরা চাদরটা ভাজ করে দলা পাকিয়ে রাখলাম।

বাইরের কক্ষে এখনও পাহারায় রয়েছে সেই দাসী মহিলা। তাকে জানালাম, লসট্রিসকে যেনো কোনোরকম বিরক্ত করা না হয়। আদেশ পালিত হবে নিশ্চিত হয়ে মই টপকে হারেমের বাইরের দেয়ালের উপর চড়ে বসলাম।

তখনও পুরো ফোটেনি সকালের সূর্য। তারপরেও, বৃদ্ধা এবং উৎসুক জনতা ভীড় করে আছে হারেমের চৌহদ্দিতে। মেঘের মতো সাদা লিনেন চাদরে ঠিক ফুলের মতো ফুটে থাকা রক্তের দাগ দেখে উল্লাসে ফেটে পরে জনতা, আমার কর্ত্রীর কুমারী দেহের প্রমাণে উদ্বেলিত হয়। মনে আশা–এর জঠরেই ফারাও-এর পুত্র সন্তানের জন্ম হবে।

জনতার শেষ সারিতে দাঁড়িয়ে সবকিছু অবলোকন করছিলো দীর্ঘ একটি অবয়ব। দাগ অলা পশমের কাপড়ে মাথা ঢাকা। আমার দিকে মুখ ফেরাতে চিনতে পারলাম, ওই সোনালি চুলের মালিক আর কে-ই বা হতে পারে?

ট্যানাস! চিৎকার করে ডাকলাম আমি। আমার কথা শোনো!

দেয়ালের ওপার হতে আমার পানে চাইলো সে। এতো বেদনা তার দুচোখে, হৃদয় ভেঙে যেতে চাইলো আমার। চাদরের ওই দাগ ট্যানাসের জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছে। ভালোবাসা হারানোর ব্যথা বুঝি আমি, এতোগুলো বছরেও সেই স্মৃতি এখনও অম্লান। ট্যানাসের আহত হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ চলছে, আমি জানি, যুদ্ধ ক্ষেত্রের কোনো আঘাতই তাকে এতো ব্যথা দেয়নি কখনও।

বেঁচে থাকতে হলে আমার সাহায্য এই মুহূর্তে বড়ো প্রয়োজন ওর।

পশমের শাল দিয়ে মুখ-মাথা ঢেকে ফিরে চলে ট্যানাস। ঠিক মাতাল লোকের মতোই এলোমেলো পদক্ষেপে ।

ট্যানাস! বৃথাই পেছন থেকে চিৎকার করে ডাকলাম। একবারো না তাকিয়ে গতি বাড়িয়ে হেঁটে চললো সে।

যতক্ষণে দেয়াল বেয়ে নিচে নেমে প্রধান ফটকের কাছে পৌঁছলাম আমি, শহরের গলি-ঘুপচি আর কাঁদায় লেপা কুঁড়ের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে ট্যানাস।

.

অর্ধেকটা সকাল ট্যানাসের খোঁজে ঘুরে ফিরলাম, কিন্তু তার তাবুতে কেউ নেই, কেউ এমনকি দেখেওনি তাকে।

শেষমেষ, হাল ছেড়ে দিয়ে দাস বালকদের প্রকোষ্ঠে ফিরতে হলো। দক্ষিণে হলো । দক্ষিণে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে রাজকীয় নৌ বহর। আর দেরি না করে নিজের বাক্স-পেটরা গুছিয়ে নিতে হবে আমাকে। ভারাক্রান্ত মনে এতোদিন ধরে আমার একমাত্র বাসস্থান ত্যাগের গোছ-গাছ শুরু করলাম।

এমনকি আমার পোষ্যরা পর্যন্ত কী করে যেনো বুঝে গেছে, অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটতে চলেছে। শিষ দিয়ে, কিচির-মিচির শব্দে আমার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালালো ওরা। বন্য পাখিরা ডানা ঝাঁপটালো বাইরের চাতালে। নিজেদের অবস্থান থেকে আমার উদ্দেশ্যে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ডেকে চললো শিকারী বাজ পাখি । প্রিয় গ্যাজেল, বিড়াল আর কুকুরগুলো কেবলই পায়ে পায়ে ঘষটে হেঁটে চললো গোছগাছে যেনো বাধা দিতে চায় আমাকে।

বিছানার পাশে একটা জগে টক ছাগ-দুগ্ধ রয়েছে– লক্ষ্য করলাম। আমার খুব প্রিয় পানীয় দাস বালকেরা সব সময় পূর্ণ করে রাখে পাত্রটা। আমার পোষ্যরাও খুব ভালবাসে এই পানীয়, অনেকটা ওগুলোকে তাড়ানোর জন্যেই চাতালে গিয়ে মাটির পাত্রে ঢেলে দিলাম দুধটুকু। পড়িমড়ি করে ছুটে এলো পশু-পাখির দল কে কার আগে খাবে, তার দখল নিতে চায়। নিজের কাজে ফিরে চললাম আমি।

এক জীবনে, এমনকি একজন তুচ্ছ দাসেরও কতো কিছুর মালিকানা থাকে–ভেবে অবাক হতে হয়। কাজ শেষ হতে, পুরো এক দেয়াল জুড়ে উঁচু হয়ে রইলো আমার বাক্স-পেটরা। এতটা সময়ে আমার বিমর্ষভাব অনেকটা বেড়েছে, কিন্তু পরিবেশের নিরব ভাবটুকু ঠিকই ধরা পরলো কানে। কক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সতর্কভাবে শুনতে লাগলাম। একমাত্র শব্দ বলতে আমার শিকারী বাজ-এর গলায় ঝোলানো ঘন্টার আওয়াজ। আর কিছু নেই। অন্য কোনো পশু বা পাখি একটি শব্দ পর্যন্ত করছে না ।

জানালার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে দিতেই ঝকঝকে সূর্যালোক যেনো অন্ধ করে দিতে চাইলো। এরপরে, দৃষ্টি ফিরে আসতেই আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। প্রতিটি পশু-পাখি নিথর বিছিয়ে রয়েছে আমার চাতালে, বাগানে।

ঠিক যে যেখানে পরেছে, ওভাবেই মৃত্যুর কথা ঘোষণা করছে নিঃশব্দে। ছুটে গেলাম আমি, কেঁদে উঠে এক এক করে ডেকে চলেছি আমার প্রিয় পোষ্যদের নাম ধরে খুঁজে বের করতে চাইছি জীবনের এতটুকু চিহ্ন। এক বিন্দু নড়লো না একটি প্রাণীও। পাখিগুলোর শরীর দারুন হালকা, ছোট্ট কাগলো আমার হাতে।

মনে হলো, বিমর্ষ-ক্লান্ত এ হৃদয় বুঝি আর সইবে না। হাঁটুগেড়ে বসে ডুকরে কেঁদে উঠলাম আমি।

আরও অনেকক্ষণ পরে, এই নির্মম মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ভাবার কথা মাথায় এলো। মেঝেতে পরে থাকা শূন্য মাটির পাত্রটা তুলে নিলাম। গন্ধ শুঁকে দেখলাম দারুন শক্তিশালী বিষ দেওয়া হয়েছিলো আমাকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে। যদিও টক দুধের গন্ধ অন্য যে কোনো ঘ্রাণ আড়াল করে ফেলেছে; আমি নিশ্চিত, দ্রুত কার্যকর বিষ ছিলো ওতে।

কোনো সন্দেহ নেই আমার মনে। কার নির্দেশে এই কাজ করা হয়েছে আমি জানি। বিদায়, প্রিয়। তুমি মরে গেছে, ইনটেফ বলেছিলেন আমাকে। একটুও দেরি করেননি তিনি।

উন্মাদ-রাগ আমাকে অধিকার করে নেয়। গতরাতের ধকল আর বিমর্ষ মন আরও ঘি ঢালে সেই অনুভূতির আগুনে। অভূতপূর্ব রাগে সর্বশরীর কাঁপছে আমার টের পেলাম। কোমর থেকে খুলে নিলাম ছোরাটা, নগ্ন ফলা হাতে উন্মত্তের মতো চাতালের ধাপ টপকে রওনা হলাম। জানি, সকালের এই সময়ে জল-বাগানে থাকবেন ইনটে। তাঁর এতো দিনের সমস্ত আচরণ, আমার প্রতি সমস্ত অন্যায়, অপমান যেনো প্রবল হয়ে উঠেছে। আঘাতে আঘাতে শেষ করে দেবো আমি তাকে, খুলে নেবো তার হৃদপিণ্ড।

জল-বাগানের দরোজা দৃশ্যমান হতে আমার ভেতরে যুক্তি ফিরে এলো। ছয় জন প্রহরী রয়েছে সেখানে, ভেতরে তো আরো আছেই। আমাকে দু টুকরো করে ফেলার আগে কিছুতেই ইনটেফের নাগাল পাবো না। রাগ নিয়ন্ত্রণে এনে ঘুরে দাঁড়ালাম। কাপড়ের আড়ালে ছোরাটা লুকিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করবার প্রয়াস পেলাম। চাতালে ফিরে একে একে তুলে নিলাম নিথর দেহগুলো।

আমার বাগানের সীমানা বরাবর সিকামোর গাছের সারি লাগানোর ইচ্ছে ছিলো, সে কারণেই বেশ অনেকগুলো গর্ত তৈরি করা হয়েছিলো। এখন যখন আমি আর থাকবো না এখানে, গাছ লাগাবার প্রশ্নও উঠেনা–গর্তগুলোতে আমার প্রিয় পশু পাখিগুলোর কবর দিলাম। প্রায় বিকেল ঘনিয়ে গেছে। মাটি চাপা দেওয়া শেষ করেছি, কিন্তু আমার রাগ তখনও দমে নি পুরোপুরি। যদি সম্পূর্ণ না-ও পারি, কিছুটা হলেও প্রতিশোধ নিতেই হবে আমাকে।

তখনও আমার বিছানার পাশের জগে কিছুটা টক দুধ ছিলো। ওটা হাতে নিলাম আমি, চিন্তার ঝড় চলছে মাথায় কেমন করে রাজ-উজিরের রান্নাঘরে ঢুকবো। জানি, এই পরিকল্পনা সফল হওয়ার নয়। বিষ এবং অন্য যেকোনো বস্তু সম্পর্কে সচেতন ইনটেফ। আরো ধৈর্য ধরতে হবে আমাকে। যদি তাকে না-ও মারতে পারি এখন, অন্তত কিছু একটা করতে হবে আমাকে।

দুধের জগ হাতে নিয়ে দাস বালকদের প্রকোষ্ঠে ছেড়ে রাস্তায় নেমে এলাম। কিছুদূর যেতেই এক গোয়ালার দেখা পেয়ে গেলাম, তার সঙ্গেই রয়েছে ছাগীর দল। অপেক্ষায় রইলাম, ওদিকে আমার জগ কানায় কানায় পূর্ণ করে দিতে লাগলো সে। যেনো প্রস্তুত করে থাকুক, এতো তীব্র ছিলো সেই বিষ–অর্ধেক কারনাক-কে মেরে ফেলার জন্যে যথেষ্ট। জানি, এখনও জগে যেনো পরিমাণ বিষ আছে, আমার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে যথেষ্ট।

র‍্যাসফারের প্রকোষ্ঠ পাহারা দিয়ে রেখেছে ইনটেফের একজন দেহরক্ষী। তার মানে, এখনও রাসফারকে মূল্যবান মনে করছেন তিনি। সেক্ষেত্রে র‍্যাসফারের মৃত্যু হতে পারে আমার যোগ্য বদলা ।

আমাকে দেখতেই কক্ষে ডেকে নিলো প্রহরী। নিজের ঘামে ভেঁজা, স্যাঁতসেঁতে বিছানায় শুয়ে কোঁকাচ্ছে র‍্যাসফার। আমি অবশ্য দেখেই বুঝলাম, তার শল্যচিকিৎসা সফল হয়েছে। চোখ খুলে বিড়বিড় করে আমাকে অভিশাপ দিলো র‍্যাসফার।

কোথায় ছিলি তুই, বিচি ছাড়া বলদ? আমার উদ্দেশ্যে গুঙ্গিয়ে উঠে সে। তুই চলে যাওয়ার পর থেকে ব্যথায় মরে যাচ্ছি। কেমন চিকিৎসা করিস–

তার কথা উপেক্ষা করে মাথার পট্টি খুলতে লাগলাম। ব্যথার জন্যে অন্তত কিছু দে আমাকে! আমার জামার সামনের অংশ আঁকড়ে ধরতে চাইলো র‍্যাসফার, ঝট করে সরে বসলাম।

লবণের গুঁড়ো নিয়ে কিছু করার ভান করলাম প্রথমে, তারপর র‍্যাসফারের পানির পাত্র কানায় কানায় ভরে দিলাম সদ্য দোয়ানো দুধ দিয়ে।

ব্যথা খুব বেশি হলে, এটা খেয়ে দেখো কমে যাবে, তার হাতের নাগালের মধ্যেই রাখলাম পাত্রটা। সরাসরি হাতে দিতে কোথায় যেনো বাঁধলো।

কনুইয়ের উপর উঁচু হয়ে এক থাবায় ওটা ধরতে চাইলো র‍্যাসফার । কিন্তু সে নাগাল পাবার আগেই পা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলাম আমি। রাসফারে যন্ত্রণায় হিংস্র আমোদ পাচ্ছি, যতোটা সম্ভব দীর্ঘায়িত করতে চাইছি ওর কষ্ট। কঁকিয়ে উঠে সে, ওহে টাইটা, দয়া করে দাও ওটা; না হয় পাগল হয়ে যাবো ব্যথায়।

চলো, বরং কিছুক্ষণ আলাপ করে নেই। তুমি কী জানো, লসট্রিস আমাকে উপহার হিসেবে চেয়ে নিয়েছে, তার বাবার কাছ থেকে?

এতো ব্যথার মধ্যেও হেসে উঠলো র‍্যাসফার। যদি মনে করে থাকো, ইনটেফ তোমাকে যেতে দেবেন তা হলে তুমি একটা গাধা। মরে গেছো তুমি, খোঁজা।

একই কথা বলেছিলেন ইনটেফ। আমার জন্যে শোক করবে না, র‍্যাসফার? কাঁদবে নাকি? মুচকি হেসে বললাম, চোখ দুধের পাত্রে।

আমি তো সব সময়ই তোমার ভক্ত হে, রাসফার বলে উঠে, এখন পাত্রটা দাও।

এততাই ভক্ত খোঁজা করে দিলে আমাকে? কেমন লেগেছিলো সেদিন? এই কথায় আমার পানে চেয়ে রইলো র‍্যাসফার।

এতো আগের কথা নিশ্চই মনে রাখো নি তুমি। সে তো বহু আগের কথা। আর তাছাড়া, ইনটেফের নির্দেশ কেমন করে অমান্য করতাম আমি?

তুমি হাসছিলে তখন। কেন হেসেছিলে, রাসফার? খুব মজা পেয়েছিলে, তাই না?

নড়ে উঠতেই ব্যথায় দম আঁকালো সে। আমি তো সবসময়ই হাসি। বন্ধু, ক্ষমা করে দাও, দয়া করে। ওই পাত্রটা দাও আমাকে।

পা দিয়ে পাত্রটা ঠেলে দিতেই প্রায় ছিনিয়ে নেয় র‍্যাসফার। ঠোঁটের উপর উঁচু করে ধরে।

জানি না, কী করছিলাম; কিছু বোঝার আগেই দেখি, পায়ের এক লাথিতে দুধের পাত্রটা ফেলে দিয়েছি আমি। দেওয়ালে দুধ ছিটিয়ে মাটিতে গড়িয়ে শান্ত হয় ওটা।

পরস্পরের দিকে অপলকে চেয়ে রইলাম আমরা। নিজের নির্বুদ্ধিতায় চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করলো আমার। বিষের যন্ত্রণায় নীল হয়ে মৃত্যু হোত এর যথার্থ শাস্তি। কিন্তু আমার পোষ্যদের বিকৃত দেহের কথা মনে হতেই বুঝলাম, কেন পারি নি রাসফারকে বিষ খেতে দিতে। একমাত্র একজন কাপুরুষই পারে এটা করতে।

র‍্যাসফারের রক্তবর্ণ দৃষ্টিতে ছায়া ঘনায়। বিষ! ফিসফিস করে বললো সে। দুধে বিষ ছিলো।

ওটা প্রভু ইনটেফ পাঠিয়েছিলেন আমায়, জানি না, কেন এইসব বলছিলাম ওকে। হয়তো, কাল রাতের ইন্দ্রজালের প্রভাবে এখনও দুর্বল আমি। কেঁপে উঠে দরোজার দিকে রওনা হলাম।

পেছনে, অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে র‍্যাসফার। তার হাসির দমকে দেওয়ালগুলো যেনো কেঁপে উঠে।

তুই একটা গর্দভ, ব্যাটা খোঁজা, পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলে চলে সে, আমাকে মেরে ফেলাই উচিত ছিলো তোর। আর কখনও এমন সুযোগ পাবি না! আর, এবার, আমি তোকে মারবো-দেখিস, কোনো সন্দেহ নেই–আমি খুন করবো তোকে।

লসট্রিসের প্রকোষ্ঠে ফিরে দেখি, এখনও ঘুমিয়ে আছে সে। ওর পায়ের কাছে ঘুম ভাঙার অপেক্ষায় বসে রইলাম। গত রাত এবং আজকের দিনের ধকল আর সইতে পারলো না শরীর, ঠিক অসহায় কুকুরছানার মতোই মেঝেতে শুয়ে পড়লাম; ক্রমশই অন্ধকার হয়ে আসছে চারিদিক।

*

কিছু একটার আঘাতে ঘুম ভেঙে গেলো। মাথার এক পাশ দপ দপ করছে, পুরো জেগে উঠার আগেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। সঙ্গেই সঙ্গেই বাড়ি লাগলো কাঁধে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলাম। যেনো মৌমাছি কামড়েছে ওখানটায়।

আমাকে ঠকিয়েছো তুমি! চিৎকার করছে লসট্রিস, মরতে দাও নি! হাত-পাখাটা দিয়ে আবারও আঘাত করতে উদ্যত হলো সে। অস্ত্র হিসেবে মোটেও হেলাফেলা করা যায় না ওটাকে বাঁশের তৈরি লম্বা হাতল, অসট্রিচের পালকে তৈরি দাঁতওয়ালা ভীষণ শক্ত। ভাগ্যই বলতে হয়, ঘুমের ওষুধের প্রভাবে এখনও টলছে লসট্রিস, নিজের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। ওর হাঁকানো আঘাতের নিচে মাথা নামিয়ে নিতেই ভারসাম্য হারিয়ে বিছানায় পড়ে গেলো সে।

কান্নার দমকে ফুলে ফুলে উঠছে পিঠ। আমি তো মরতেই চাই; কেনো এমনটা করলে, টাইটা?

ধীরে ওর কাছে গিয়ে এক হাতে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম। ব্যথা লেগেছে, টাইটা? জানতে চাইলো লসট্রিস। কখনও তোমাকে মারি নি এর আগে।

প্রথমবারের চেষ্টাটা ভালোই ছিলো, ওকে স্বাগত জানিয়ে বললাম। এতো ভালো, মনে হয় আর অনুশীলন করার প্রয়োজন নেই! করুণ চেহারায় মাথা ডলতে লাগলাম, যেখানে লেগেছিলো আঘাতটা। কান্নার ভেতরেও হেসে ফেললো মিসট্রেস।

আহারে! সত্যি, বেশ খারাপ ব্যবহার করি তোমার সাথে। কিন্তু দোষ তোমার–মরতে দিলে না কেনো আমাকে? আমার আদেশ পর্যন্ত অমান্য করলে।

দ্রুত বিষয় পরিবর্তন করার প্রয়াস পেলাম। মিসট্রেস, দারুন খবর আছে তোমার জন্যে। কিন্তু, আগে আমাকে প্রতিজ্ঞা করো, কাউকে–এমনকি তোমার দাসীদেরকেও বলবে না কথাটা। কথা শেখার পর থেকে কোনো খবর কোনোদিন পেটে রাখতে পারে নি লসট্রিস; কিন্তু কোন মেয়েই বা পারে? প্রতিজ্ঞার কথায় বরাবরই আপুত হয় সে, এবারেও তার অন্যথা হলো না ।

এতো কান্না, ভগ্ন-হদয়েও ওর চোখে কৌতূহল ঝিলিক দিয়ে উঠলো। কান্না গিলে ফেলে সাগ্রহে উঠে বসলো সে, বলো আমাকে!

কিছু সময় চুপ থেকে কথা গুছিয়ে নিলাম। আমার পশুপাখির মৃত্যু বা ট্যানাসের দর্শন-লাভ–এসব কিছু বলা যাবে না ওকে। এমন কিছু বলতে হবে, যাতে করে ওর উৎসাহ বাড়ে।

গত রাতে ফারাও-এর শয্যাকক্ষে সারারাত কথা বলেছি তার সাথে।

দেখতে দেখতে কান্না উপচে পড়তে লাগলো লসট্রিসের চোখ থেকে। ওহ টাইটা! আমি ঘৃণা করি তাঁকে। কুৎসিত এক বুড়ো, তার সাথে–তার সাথে আমি—

দ্রুত বলে যেতে লাগলাম আমি, তার আদেশে ইন্দ্রজাল ব্যবহার করেছিলাম রাতে। সঙ্গে সঙ্গে মনোযোগী হলো লসট্রিস। ঐশ্বরিক শক্তি তার খুব প্রিয় বিষয়। ইন্দ্রজাল অনুশীলনে যদি আমার শারীরিক কষ্ট না হতো, তবে প্রতিদিনই আমাকে দিয়ে ওটা করিয়ে নিতো সে।

কী দেখলে? বলো না! আবার উৎসাহ ঝিলিক দিতে লাগলো ওর চোখে। এখন আর মরার বাসনা নেই সেখানে, সব দুঃখ ভুলে গেছে মেয়েটা। এতো নিষ্পাপ, এতো সরল ও–প্রতারক মনে হতে লাগলো নিজেকে।

অসাধারণ সব জিনিস দেখেছি, মিসট্রেস। কোনোদিন এতো পরিষ্কার ছবি দেখি নি এর আগে। এতো সুন্দর, এতো গভীর–

আরে বলোই না!

কিন্তু প্রথমে প্রতিজ্ঞা করো, কাউকে বলবে না। আর কেউ যেনো এইসব কথা না জানে।

কসম! সত্যি, কাউকে বলবো না!

মানে, এতো হালকাভাবে বললে তো চলবে না–

এক্ষণ বলো, কী দেখেছো! আমার সাথে চালাকি করে লাভ নেই। এখন বলো, না হলে–না হলে–হাতের মুঠো পাকালো লসট্রিস। আবার মারব তোমাকে!

আচ্ছা, আচ্ছা। বলছি, শোনো। আমি দেখলাম, নীল নদের তীরে বিশাল একটা গাছ। তার ছুঁড়োয় বসে রয়েছে মিশরের মুকুট।

ফারাও! ওই গাছটা হলো রাজা! দ্রুতই বুঝে নিলো লসট্রিস। বলো, টাইটা! আর কী দেখেছো?

আমি দেখলাম, পাঁচবার নীল নদে বন্যা এলো। পানির স্তর উঠলো-নামলো ঠিক পাঁচবার।

পাঁচ বছর–তার মানে, পাঁচ বছর পেরুলো! খুশির আতিশায্যে হাততালি দিয়ে উঠলো লসট্রিস। ধাঁধার সমাধাণ তার অত্যন্ত প্রিয়।

এরপর, কীট-পতঙ্গ গাছটির অধিকার নিলো; মুকুট লুটালো ধুলোয়। সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলো।

অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে চেয়ে রইলো লসট্রিস, মুখে কথা নেই। আমি বলে চললাম, পাঁচ বছর পর মারা যাবেন ফারাও। তুমি মুক্ত হবে, মিসট্রেস। তোমার বাবার অধিকার থেকেও। তখন ট্যানাসের কাছে যেতে আর কোনো বাধা থাকবে না।

মিথ্যে বলো না আমাকে, টাইটা! পরে যদি দেখি–এসব মিথ্যে কষ্টে মরে যাবো।

এগুলো সত্যি, মিসট্রেস। কিন্তু আরো আছে। আমি দেখলাম, একটা নবজাতক ছেলে! সাথে সাথেই দারুন ভালোবাসা বোধ করলাম ওর প্রতি, আমি জানি, ওই বাচ্চাটার মা হবে তুমি।

কিন্তু, ওর বাবা কে, টাইটা? বলো না!

আমি একদম নিশ্চিত, ওর বাবা ট্যানাস। এখানে এসে প্রথমবারের মতো সত্যের অপলাপ করতে হলো, কিন্তু এ সবই তো ওর ভালোর জন্যে এই ভেবে মনে সান্ত্বনা পেলাম।

বেশ কিছু সময় নিরবে বসে রইলো লসট্রিস। এক অপার্থিব আভা তার চোখে মুখে–এর বেশি আর কী চাওয়ার আছে আমার? শেষমেষ, ফিসফিস করে ও বললো, পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে পারবো আমি। সারাজীবন অপেক্ষা করতেও রাজী ছিলাম। কষ্ট হবে, কিন্তু আমি পাঁচ বছর ট্যানাসের অপেক্ষা করবো। তুমি ঠিক করেছো, টাইটা সরতে দাও নি আমাকে। দেবতারা রুষ্ট হতেন তাহলে।

স্বস্তিতে ভেসে গেলাম, এখন আমি জানি, সামনের দিনগুলোয় ওকে সান্ত্বনা দিয়ে মানিয়ে নিতে পারবো।

*

দিন সকালে কারনাক ছেড়ে রওনা হলো রাজকীয় নৌবহর। তাঁর প্রতিজ্ঞা মতো, লসট্রিস এবং তার যাত্রা-সঙ্গীদের জন্যে আলাদা একটা ছোট্ট গ্যালির বন্দোবস্ত করেছেন রাজা; দক্ষিণের বাহিনীর সাথে।

বিশেষত লসট্রিসের জন্যেই পাটাতনের উপর তৈরি করা একটা প্রকোষ্ঠে ওর সাথে বসে রইলাম। আমরা দু জনেই পেছন ফিরে তাকিয়ে আছি দিনের প্রথম হলদেটে সূর্যরশ্মি যেনো আদরের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে এতোদিনের প্রিয় কারনাক নগরীকে।

ও যে কোথায় গেলো, কে জানে। আমাদের জাহাজ-বহর পাল তোলার পর থেকে এই নিয়ে অনেকবার ট্যানাসের কথা বলেছে লসট্রিস। ভালো ভাবে খুঁজে দেখেছো তুমি? সবখানে?

সব জায়গায় খুঁজে দেখেছি, নিশ্চয়তা দিয়ে বললাম । সারাটা সকাল ধরে শহরতলী আর বন্দরে খুঁজেছি। নেই ও একেবারে মিলিয়ে গেছে বাতাসে। তবে, কাতাসের কাছে তোমার বার্তা পৌঁছে দিয়েছি। চিন্তা নেইক্ৰাতাস ঠিকই বলবে ট্যানাসকে।

পাঁচ বছর–ওকে ছাড়া পাঁচ বছর কেমন করে কাটবে, বলো তো টাইটা?

*

নদীর উজানে ভেসে চললো আমাদের জাহাজ বহর। অলস, আরামদায়ক দিনগুলো কেটে যেতে লাগলো আমার মিসট্রেসের সাথে হাস্যে-গল্পে। ভবিষ্যত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলাম আমরা, কী ঘটতে পারে সামনে, কী আশা করা উচিত এইসব।

রাজ্যসভার সমস্ত আচার, সম্ভাষণ, আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে তাকে অবগত করলাম আমি। ফারাও-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শত্রু-মিত্র সব বিষয়েই কিছু না কিছু বললাম। এ ব্যপারে অবশ্য বন্ধু আতনের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। রাজ-পরিচর্য হওয়ায় বহুকিছু তার জানা। বিগত বারো বছরে গজ-দ্বীপ থেকে কারনাকে আসা প্রতিটি জাহাজে আমার জন্যে চিঠি পাঠাতো সে কেমন করে রাজ সভা চলে, কার কী উদ্দেশ্য, ক্ষমতা, অভিপ্রায় প্রায় সবকিছু নিয়ে আমাকে বিস্তারিত জানাতো আতন। অবশ্য, কৃতজ্ঞতার প্রকাশস্বরূপ একটা করে স্বর্ণমুদ্রা উপহার হিসেবে প্রতিবারেই পেতো সে আমার তরফ থেকে। লসট্রিসও মনোযোগী শ্রোতা। সমস্ত কথা হৃদয়ঙ্গম করে নিতে লাগলো সে।

খুব দ্রুতই একটা ব্যাপার বুঝে ফেললাম আমি। যে কোনো বিষয়ে লসট্রিসের মনোযোগ পেতে হলে এতটুকু বললেই যথেষ্ট যে, এইসব কিছু এক সময় ট্যানাসের উপকারে আসবে। যদি রাজসভায় তোমার ভালো ক্ষমতা থাকে, তো ওকে রক্ষা করতে পারবে তুমি। আমি বলেছি ওকে, অসম্ভব একটা কাজ দিয়েছেন রাজা তাকে। সফল হতে হলে আমাদের সাহায্য প্রয়োজন ওর; আর যদি ব্যর্থও হয়–এক তুমিই পারবে ওকে বাঁচাতে।

ওর কাজে সফল হওয়ার জন্যে আমরা কী করতে পারি, টাইটা? ট্যানাসের কথা বলতেই লসট্রিসের পূর্ণ মনোযোগ পেতাম। একটা সত্যি কথা বলে আমাকে, কোনো মানুষের পক্ষেই কি শ্রাইক-দের নির্মূল করা সম্ভব? এমনকি, ট্যানাসের মতো বীরের জন্যেও তো এটা অসম্ভব কাজ।

উচ্চ-রাজ্যে ত্রাস সৃষ্টিকারী দস্যুদল নিজেদের শ্রাইক বলে পরিচয় দেয়। আমাদের মিশরীয় ঘুঘুর চেয়েও ছোটো একটা পাখি আছে এই নামে; অন্য পাখির নীড়ে হানা দিয়ে ছিঁড়ে ফালাফালা করে দেহগুলোকে একাশিয়া গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখে এরা। সেই কসাই পাখির নামেই নিজেদের পরিচিত করে উচ্চ-রাজ্যের দস্যুরা।

তোমার কী মনে হয়, বাজপাখির প্রতাঁকের কারণে সফল হবে ট্যানাস? লসট্রিস বলে চলে, আমি শুনলাম, উচ্চ-রাজ্যের সমস্ত শ্রাইকদের নেতৃত্ব দেয় একজন দস্যু–ওরা তাকে ডাকে আকহ্-সেথ নামে। এটা সত্যি, টাইটা?

আমিও সে রকমই শুনেছি, চিন্তান্বিত স্বরে বললাম। সে রকম হলে, ট্যানাস যদি এই আকহ্-সেথকে ধ্বংস করে দিতে পারে শ্রাইকদের মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে। এ জন্যেই আমার সাহায্য বড়ো বেশি প্রয়োজন তার।

চোখ ছোটো করে আমার পানে চাইলো লসট্রিস। তুমি কী করে সাহায্য করবে? আর এইসব বিষয়ে তুমি কি-ই বা জানো?

বেশ চতুর মেয়ে আমার কর্ত্রী, ওকে ফাঁকি দেওয়া মুশকিল বটে। আমি যে কিছু একটা লুকোচ্ছি, এটা সে সাথে সাথেই বুঝে গেছে। আবারো পুরোনো অস্ত্র প্রয়োগ করতে হলো।

ট্যানাসের মঙ্গলের খাতিরেই এর বেশি আর জানতে চেয়ো না। কেবল, ওর সাহায্যার্থে যে কোনো কিছু করার অনুমতি দাও আমাকে।

নিশ্চই। বলো, আমি কিভাবে সাহায্য করবো ওকে?

গজ-দ্বীপে রাজপ্রাসাদে, তোমার সাথে নব্বই দিন থাকবো আমি, এরপরে ট্যানাসের কাছে যাওয়ার জন্যে ছুটি দিতে হবে আমাকে–

না, না–বাধা দিয়ে বলে ওঠে লসট্রিস, ট্যানাসকে সাহায্য করতে হলে এখনই রওনা হয়ে যাও তুমি।

নব্বই দিন, একগুঁয়ের মতো বললাম। এই সময় তো আমিই চেয়ে নিয়েছি ফারাও-এর কাছ থেকে। এখনই হঠাৎ করে রাজপ্রাসাদে এক ছেড়ে দেওয়া যাবে না লসট্রিসকে। একজন অভিভাবক প্রয়োজন ওর ।

এখনই নয়, তবে ওর কাছে যাবো আমি। ক্ৰাতাস আমার পথ চেয়ে বসে থাকবে। কিন্তু এই নব্বই দিনে, আমি কারনাকে ফেরার আগে যা যা করা দরকার সব বলে এসেছি কাতাসকে। সে সবকিছু তৈরি রাখবে। আর কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানালাম।

শুধুমাত্র দিনের আলোয় চলে জাহাজ বহর। রাতের অন্ধকার যেমন মিশরের সাহসী সিংহ, নেমবেটের নৌ-চালনায় উপযোগী নয়; আমাদের ফারাও-ও রাতে বিশ্রাম নেন। প্রতিরাতে নদীর ধারে একশ তাঁবুর মেলা বসে। সব সময়ই কোনো পাম গাছের তলায়, পাথুরে খোড়লে; মন্দির বা গ্রামের কাছেই ফেলা হয় তাবুগুলো। পুরো সভাসদের মাঝে এখনও উৎসবের আমেজ বিরাজমান। আগুনের ধারে নেচে-গেয়ে, খুনসুটি আর দেহজ প্রেমে বিভোর হয় তারা। দূরের মরু থেকে বয়ে আসা মিষ্টি হাওয়া কেমন শান্তির পরশ বুলায় শরীরে। প্রতিটি মুহূর্ত আমার এবং আমার কর্ত্রীর কাজে লাগালাম আমি। রাজার কয়েক শ পত্নীর মধ্যে লসট্রিস সবচেয়ে কনিষ্ঠ পুত্র সন্তান জন্মদানের আগ পর্যন্ত ওর কোনো মূল্য নেই হারেমে। যা করার, আমাকেই করতে হবে।

প্রায় প্রতি সন্ধাতেই, আমরা তীরে তাঁবু গাড়ার পরে আমাকে ডেকে পাঠাতেন ফারাও। যদিও বাহানা ছিলো ছত্রাক সংক্রমণের অবস্থা দেখার জন্যে, আসলে মিশরের দ্বৈত-মুকুটের উত্তরাধিকারী জন্মদানের জন্যে তার প্রস্তুতির খোঁজ-খবর সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন তিনি। তাঁর সাগ্রহ দৃষ্টির সামনে গণ্ডারের শিং এবং ম্যানড্রেকের গুল্ম থেকে মিশিয়ে নিতাম। ফারাও-এর সেবন শেষ হলে, রাজকীয় সদস্যের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে মনে মনে আশ্বস্ত হলাম–একজন দেবতার অনুপাতে সামাঞ্জস্যপূর্ণ দৈর্ঘ্য বা বেড়, কোনোটিই নেই এর। এমনকি, আমার কুমারী কর্ত্রীর জন্যেও সহজ হবে ওটাকে গ্রহণ করা। যতো যাই হোক, একদিন না একদিন তো রাজপত্নীর দায়িত্ব তাকে পালন করতেই হবে। রাতে, অলিভ তেলে ধোয়া একটা পুলটিস রাজকীয় সদস্যের উপরে জড়িয়ে রাখার পরামর্শ দিলাম ফারাও-কে। ইতিমধ্যেই, আমার মলমে তিন দিনের মধ্যেই ছত্রাক সক্রমণ থেকে আরোগ্য লাভ করেছিলেন তিনি। চিকিৎসক হিসেবে তাতে করে আমার অবস্থান আরো সুদৃঢ় হয় তার দরবারে। ফারাও-এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় সভাসদের কাছে দারুন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলাম আমি। আর যখন জানাজানি হলো, আমি শুধু যে চিকিৎসক, তা নয়, বরঞ্চ একজন ভবিষ্যত বক্তাও বটে–আমার জনপ্রিয়তার কোনো সীমা-পরিসীমা রইলো না।

প্রায় প্রতি সন্ধাতেই আমার কর্ত্রীর কাছে উপঢৌকন আসতো বিভিন্ন প্রভু, মন্ত্রীর তরফ থেকে, আমার পরামর্শ ধার চেয়ে। শুধুমাত্র অল্প কয়জন সভাসদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমাকে পাঠাতে মিসট্রেস।

ধীরে, হারেমের বাদ-বাকি সদস্যরা লক্ষ্য করলো, আমি এবং লসট্রিস খুব ভালো দ্বৈত-সংগীত গাইতে সক্ষম; বিচিত্র ধাঁধা, অসাধারণ সব গল্প–এসবই আমার এবং মিসট্রেসের নখদর্পনে। হারেমের শিশু, নারীদের কাছে ক্রমশই দারুন জনপ্রিয় হয়ে উঠতে লাগলাম আমরা।

শীঘ্রই ফারাও-এর কানে আমাদের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার খবর পৌঁছে গেলো। দিনে, ভ্রমণের সময়, রাজকীয় জাহাজে তার কাছে লসট্রিসকে ডেকে পাঠাতেন তিনি। রাজার সঙ্গে রাতের ভোজে শিশুতোষ ব্যবহারে সবাইকে মুগ্ধ করে রাখতে সে। আমি সব সময়ই কাছে-পিঠে থেকে সাহস জোগাতাম তাকে। রাতের পর রাত পেরিয়ে গেলো, অথচ তাকে শয্যাকক্ষে ডেকে পাঠানোর কোনো লক্ষণই দেখালেন না ফারাও এতে করে তাঁর প্রতি লসট্রিসের অনুভূতিতে একটু হলেও পরিবর্তন এসেছিলো।

আভিজাত্যপূর্ণ গাম্ভির্যের আড়ালে ফারাও মামোস অত্যন্ত দয়ালু এবং ভালো মনের মানুষ ছিলেন। খুব দ্রুতই এটা বুঝে গিয়েছিলো লসট্রিস, তার প্রতি কিছুটা হলেও শ্রদ্ধাবোধ জাগলো ওর মনে। আমরা গজ-দ্বীপে পৌঁছানোর আগেই ঠিক পিতৃব্য আচরণ করতে শুরু করেছিলো সে, ফারাও-এর প্রতি। সারাদিন নানান গল্প-খেলায় মেতে উঠতে লাগলো রাজার সাথে। পরে, আতন আমাকে জানিয়েছিলো কোনোদিনও তার মনিবকে এতো হাসতে দেখে নি সে।

যা বোঝার, বুঝে নিলো রাজসভার সদস্যরা। কিছুদিনের মধ্যেই, সন্ধেয় আমাদের তাঁবুতে ধরণা দিতে শুরু করলো চাটুকারের দল। লসট্রিসের মাধ্যমে রাজার কানে কোনো কিছু পৌঁছানোর অভিপ্রায় তাদের সবার ।

আমাদের যাত্রা শেষ হওয়ার আগেই সভাসদের দেওয়া উপঢৌকনের বদৌলতে বেশ ভালো রকম ধন-সম্পদের মালিক বনে গেলো আমার কর্ত্রী। এছাড়াও, প্রভাবশালী বহু বন্ধু-বান্ধবও পেয়ে গেলো সে। এসব কিছুরই পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব রাখছিলাম আমি।

কখনই এমনটি বলবো না, কেবল আমার জন্যেই সম্ভব হয়েছিলো এতো কিছু। আমার কর্ত্রীর সৌন্দৰ্য্য, তার বুদ্ধিমত্তা, উছুল-মিষ্টি ব্যবহার তার বড়ো সম্পদ। হয়তো আমি থাকাতে একটু দ্রুত সহজ হতে পেরেছিলো সে সবার সাথে।

সাফল্যের হাতে হাত ধরে এলো সমস্যা। আমাদের জনপ্রিয়তা ইর্ষার আগুন জ্বাললো উঁচু মহলে। ফারাও-এর আনুকূল্য-বঞ্চিত সভাসদেরা লসট্রিসের প্রতি তার এই প্রণয়ে দারুন অখুশি ছিলেন।

একদিন সন্ধায়, আমার তৈরি তরল পান শেষে রাজা বললেন, টাইটা, তোমার এই ওষুধ অত্যন্ত কার্যকরী। বহুদিন পর নিজেকে তরতাজা তরুণ বোধ হচ্ছে। আজ সকালে ঘুম ভেঙে জেগে দেখলাম, এতো দৃঢ় হয়ে আছে ওটা সাথে সাথে আতনকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম দেখতে। দারুন খুশি হয়ে সে বললো, আজ রাতেই তোমার কর্ত্রীকে ডেকে পাঠাতে পারি আমি।

আতঙ্কে নীল; দারুন উদ্বিগ্ন আমি মুখ দিয়ে বাতাস ছেড়ে, আফসোসের ভঙ্গিমায় মাথা নেড়ে নিজের মতামত জানালাম। আতনের পরামর্শ যে মেনে নেন নি, আপনাকে সালাম। প্রভু, এক পলকে আমাদের এতো দিনের সমস্ত পরিশ্রম পণ্ড হয়ে যেতো তাহলে। যদি পুত্রসন্তান চান, আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে হবে।

সেই দিনের কথা ভেবে আশঙ্কায় বিবর্ণ হলাম আমি, যেদিন আমার নব্বই দিবস রজনীর বাধা শেষ লসট্রিসকে বিছানায় ডেকে পাঠাবেন তিনি।

লসট্রিসকে তৈরি করে নিতে হবে আমাকে এই অভিপ্রায়ে ওকে বোঝলাম, এটা অবশ্যম্ভাবী; যদি সত্যিই ফারাও-এর মৃত্যুর পরে ট্যানাসের কাছে যেতে চায় ও–তবে রাজার কাছে নিজেকে সমর্পণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। লসট্রিস বিচক্ষণ মেয়ে, বুঝলো সে।

তাহলে, তুমি আমাকে আগে থেকে বলে রাখো–কী ঘটবে সে রাতে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলো ও। এই বিষয়ে অভিজ্ঞ নই আমি, কিন্তু অন্তত প্রধান ব্যাপারগুলো সহজ করে বোঝালাম ওকে।

ব্যথা লাগবে, টাইটা? ওর প্রশ্নের জবাবে তড়িৎ বললাম, রাজা দয়ালু মানুষ। নিশ্চই বহু তরুণী মেয়ের অভিজ্ঞতা তার আছে, ব্যথা দেবেন না। এক ধরণের মলম দেবো তোমাকে যাতে করে আরো সহজ হয় ব্যাপারটা। প্রতি রাতে, শোবার আগে ওটা লাগিয়ে দেবো দেখবে, সহজে খুলে যাবে দরোজাটা। মনে রেখো, এ সমস্ত কিছুই ট্যানাসের জন্যে।

মনে-প্রাণে নিজেকে একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব পালনে ব্যাপৃত করতে চাইলাম। দেবতারা ক্ষমা করুন, আমার সেই প্রচেষ্টা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলো। লসট্রিসের নারী বৈশিষ্ট্য এতো সুন্দর, যেনো ফুটে থাকা গোলাপ। কিন্তু, অত চমৎকার পাঁপড়ি মরুর কোনো গোলাপে নেই। মলম লাগিয়ে দেওয়ার সময়ে নরম-মিষ্টি মধু ঝরলো ওটা থেকে, এতো মসৃণ-গরম কোনো তরল আমি কখনও প্রস্তুত করতে পারি নি।

গাল লাল হয়ে গিয়েছিলো লসট্রিসের, স্বর খসখসে। মৃদু স্বরে ও বললো, এতোদিন পর্যন্ত ভেবে এসেছি, কেবল বাচ্চা জন্ম হয় ওখান দিয়ে। কিন্তু, যখন ওটা লাগালে ট্যানাসের কথা খুব করে মনে পড়ে গেলো কেননা, বলো তো টাইটা?

এতো বিশ্বাস করতো ও আমাকে, আর শারীরিক-পরিতৃপ্তির অপরিচিত অনুভূতি সম্পর্কে এতো কাঁচা ছিলো; ঠিক যতক্ষণ প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি সময় ধরে মলম না লাগানোর জন্যে নিজেকে জোর করতে হলো আমার। কিন্তু, সেদিন রাতে আর ঘুমাতে পারলাম না। অসম্ভবের স্বপ্ন তাড়া করতে লাগালো থেকে থেকে।

*

যতই দক্ষিণে ভেসে চললাম আমরা, নদীর দুই তীরের সবুজের সমারোহ ক্রমশই কমে আসতে লাগলো; চারপাশ থেকে ঘিরে আসছে মরুভূমি। কোথাও কোথাও গ্রাইনাইটের বিশাল খণ্ডগুলো জলপথ আড়াল করে ফেলেছে প্রায়।

দুর্গমতম জায়গাটার নাম হাপির প্রবেশদ্বার। উঁচু, সংকীর্ণ পাথুরে পথে গর্জন তুলে বয়ে চলেছে নীল নদের পানি; উন্মত্ত, বন্য যেনো নিজস্ব খেয়াল-খুশি আছে তার।

প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় ওটা পেরিয়ে এলো জাহাজ বহর, অবশেষে গজ-দ্বীপে পৌঁছুলাম আমরা। নীলের সরু গলায়, যেখানে আগ্রাসী পাহারশ্রেণীর দাপটে সরু হয়ে গেছে নদী-প্রবাহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বেশকিছু দ্বীপ। গজ-দ্বীপ তার মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ। ছোটো মাছের ঝাকের পেছনে আক্রমণরত হাঙরের মতো আকৃতি এই দ্বীপের । নদীর দু ধারের মরুর যেনো নির্দিষ্ট রঙ-চরিত্র আছে। পশ্চিম তীরের সাহারা মরু গনগনে কমলা; ঠিক তার বুকে বসবাসকারী বেদুঈনদের মতোই। আর পুবে, আরবীয় মরুর রঙ মলিন-ধূসর; বুকে ধারণ করে আছে কালো পাহারশ্রেণী–প্রচণ্ড দাবদাহের মরীচিকায় যেনো নৃত্যরত। এই মরু দুইয়ের একটা ব্যাপার এক এবং অভিন্ন মনুষ্যজাতীর জীবনসংহারী এরা।

আর এসব কিছুর মাঝেই দারুন বৈপরিত্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গজ-দ্বীপ-নদীর রুপালি মুকুটে সবুজ পান্নার মতো জ্বলে আছে। দ্বীপের তীরে সাড়িবদ্ধ বোল্ডারের আকৃতি অনেকটা বিশাল হাতির মতো সে অনুসারেই এর নামকরণ। এছাড়াও, বিগত এক হাজার বছর ধরেই, জলপ্রপাতের ওপারে, সেই অসভ্য কূশ দেশ থেকে আইভরি নিয়ে আসা হতো এই দ্বীপে।

প্রায় পুরোটা দ্বীপে জুড়েই ফারাও-এর প্রাসাদের অবস্থান। উত্তরে যে আরেকজন ফারাও আছেন, তার থেকে সর্বাধিক দূরত্বে, নিরাপদ অবস্থানে থাকার স্পৃহা থাকা স্বাভাবিক।

চারপাশে পানি পরিবেষ্টিত এই দ্বীপ যথেষ্ট সুরক্ষিত। মহান থিবেসের পরে, পুব এবং পশ্চিম গজ-দ্বীপ আমাদের মিশরের উচ্চ-রাজ্যের সবচেয়ে বড় এবং জনবহুল নগর। নিম্ন-রাজ্যের শাসকের আবাসস্থল, মেমফিসের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।

সমগ্র মিশরে এক গজ-দ্বীপেই রয়েছে বৃক্ষের অপূর্ব সমারোহ। প্রতি বছরের বন্যার পানিতে ভেসে আসে বিভিন্ন গাছের বীজ, নদীর জল-বিধৌত উর্বর মাটিতে খুব সহজেই জন্মে ওগুলো।

শেষবার এখানে এসেছিলাম ইনটেফের প্রতিনিধি হিসেবে, নীলের জলের অবিভাবক তিনি। তার পক্ষ থেকে পানির স্তর মাপা থেকে শুরু করে সমস্ত কাজ আমাকেই করতে হতো। প্রধান মালীর সহায়তায় বহু মাস ধরে এখানকার গাছপালা, প্রাসাদের বাগানের বৃক্ষরাজীর সবকিছু টুকে নিয়েছিলাম সেবার । তো, এক এক করে সেগুলোই চিনিয়ে দিতে লাগলাম আমার কর্ত্রীকে। এখানে রয়েছে ফিকাস বৃক্ষ যা আমাদের মিশরে আর কোথাও নেই। এর মূল যেনো পেঁচিয়ে থাকা অজগর, ফল জন্মে গাছের প্রধান কাণ্ডে, শাখায় নয়। আরো রয়েছে ড্রাগন-রক্ত গাছ। ওগুলোর কাণ্ড আঁচড়ালে উজ্জ্বল লাল তরল ঝরে। রয়েছে কূশীয় সিকামোর সহ একশ প্রজাতীর বৃক্ষ অনিন্দ্যসুন্দর এই দ্বীপের উপরে সবুজ ছাতার মতো ঘিরে আছে।

উর্বর মাটির তলায় অবস্থিত একখণ্ড বিরাট গ্রানাইটের উপর নির্মিত ফারাও-এর রাজপ্রাসাদ। একটা বিষয় আমাকে সব সময়ই ভাবায়, কেবল আমাদের রাজা নন; তার পূর্বে পঞ্চাশ বংশধারার যে বহু ফারাও শাসন করেছেন বিগত এক হাজার বছরে তাঁরা সবাই গ্রানাইট এবং মার্বেলের বিশাল সমাধি নির্মাণে সমস্ত সম্পদ, শক্তি ব্যয় করেছেন, অথচ জীবদ্দশায় বাস করতেন মামুলি মাটির তৈরি প্রাসাদে। কারনাকে, ফারাও মামোসের জন্যে যে সমাধি-মন্দির নির্মাণ করা হচ্ছে, তার তুলনায় এই প্রাসাদ খুবই অনাড়ম্বর। আমার ভেতরের স্থপতি কিংবা গণিতজ্ঞের সত্তাকে যেনো অপমান করলো এর স্থাপনা-কৌশল।

তীরে পৌঁছে নিজেদের প্রকোষ্ঠে যখন এলাম আমরা, গজ-দ্বীপের সত্যিকারের আকর্ষণ যেনো আরো সুনির্দিষ্ট হলো। স্বাভাবিকভাবেই, দ্বীপের সবচেয়ে উত্তর কোণে দেয়াল-ঘেরা হারেমে জায়গা হলো আমাদের। কিন্তু দেওয়ালের কারুকাজ এবং প্রকোষ্ঠের বিশালত্ব আমাদের প্রতি ফারাও-এর সুনজরের ঘোষণা দিচ্ছে। কেবল ফারাও-ই নন, রাজ-পরিচর্যক আতন পর্যন্ত লসট্রিসের নির্লজ্জ ভক্ত বনে গেছে।

বারোটি বড়, পরিচ্ছন্ন কক্ষ, সাথে নিজস্ব আঙ্গিনা, রান্নাঘর বরাদ্দ হলো লসট্রিসের জন্যে। প্রধান দেওয়াল সংলগ্ন একটা পার্শ্ব-দরোজা সরাসরি চলে গেছে নদীর ধারের পাথুরে ঘাটে। প্রথম দিনেই তলা সমান একটা নৌকা কিনে নিলাম আমি, এতে করে মাছ ধরা যাবে নদীতে। ঘাটে বেঁধে রাখলাম ওটা।

কিন্তু, আমাদের আবাসের স্বাচ্ছন্দ্যে আমি বা লসট্রিস কেউই সন্তুষ্ট হতে পারছিলাম না। পুরো প্রকোষ্ঠ ঢেলে সাজানোর কাজে হাত লাগালাম দুজনে। প্রধান মালীর সাহায্যে, আঙ্গিনায় নিজস্ব বাগান তৈরি করলাম আমি; মাথার উপরে পাতার আচ্ছাদন দিনের গরমে যেনো ওখানে বসা যায় সে ব্যবস্থা করলাম। আমার প্রিয় শিকার বাজপাখিগুলোও কাছাকাছি বসে ঠুকড়ে খেতে পারে।

নদীর ঘা থেকে সিরামিকের তৈরি নলের ভেতর দিয়ে সবসময় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করলাম আমার জল-পদ্মের বাগান এবং মাছের পুকুরে। সংকীর্ণ একটা অংশ দিয়ে ফিরে যাবে উপচে-পড়া পানি, আমার কর্ত্রীর ব্যক্তিগত কক্ষের ভেতর দিয়ে, ছোট্ট আড়াল করা একটা অংশ হয়ে নীলের মূল প্রবাহে।

আমাদের প্রকোষ্ঠের দেওয়াল লাল-কাদায় তৈরি। ওগুলোর উপর ছবি আঁকলাম আমি এবং লসট্রিস। দেব-দেবীদের ছবি, পশুপাখি সমেত আমাদের এই মিশরের ছবি ছিলো সেগুলো। আইসিস-এর প্রতিরূপ হিসেবে অবশ্যই আমার কর্ত্রীকে ব্যবহার করলাম আঁকার সময়, তবে সমস্ত ছবির কেন্দ্রে রইলো হোরাসের ছবি লসট্রিসের আগ্রহে। লাল-সোনালি চুলো হোরাস যেনো একটু বেশিই পরিচিত অবয়বের বুঝে নিন, কার কথা বলছি!

ছবির কথা জানাজানি হতে সাড়া পরে গেলো হারেমে। রাজ-বধুরা এসে একে একে দেখে যেতে লাগলেন। হারেমের বাকি কক্ষের সাজ-সজ্জার ব্যাপারেও আমার পরামর্শ চাওয়া হলো। উপযুক্ত অর্থের বিনিময়ে সেটা অবশ্য দিলাম আমি। এতে করে হারেমে অনেক নতুন বন্ধু তৈরি হলো আমাদের।

শীঘ্রই সবকিছু শুনে চিত্রকর্ম পরখ করতে চলে এলেন ফারাও স্বয়ং। দেখা শেষ হতে, পাতার আচ্ছাদনের নিচে আঙ্গিনায় বসে সুরা পান করলেন। যাওয়ার সময় হতে আমাকে তার সাথে কিছুদূর এগুতে বললেন তিনি। আমরা হারেমের বাইরে আসতেই শুরু করলেন, গত রাতে, তোমার কর্ত্রীকে স্বপ্নে দেখেছি। জেগে দেখলাম, আমার বীজ ছড়িয়ে আছে চাদরের উপর। সেই বালক বয়সের পর এমনটি কখনও হয় নি আমার। আমি নিশ্চিত জানি, এর সঙ্গে আমার একটা পুত্রসন্তান হবে। আর দেরি করে লাভ নেই। তুমি কি বলো, এখনই কী একবার চেষ্টা করে দেখবো?

মালিক, আমার পরামর্শ হলো নব্বই দিন সম্পূর্ণ হওয়াই ভালো। এর আগে কোনোকিছু করা বোকামী হবে। রাজার ইচ্ছাকে বোকামী বলাটা মারাত্মক হতে পারতো, কিন্তু আমি নিরুপায়। এতো কম সময়ের জন্যে আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টায় জল ঢেলে দেওয়া ঠিক হবে না। গভীর চিত্তে রাজি হলেন ফারাও।

হারেমে ফিরে, রাজার ইচ্ছের কথা জানালাম আমার কর্ত্রীকে; তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া ছাড়াই ব্যাপারটা মেনে নিলো সে। এতোদিনে তার প্রতি রাজার পক্ষপাতিত্ব ভালো লাগতে শুরু করেছে মিসট্রেসের কাছে, এছাড়া আমার কথামতো ও বিশ্বাস করে বসে আছে–এই গজ-দ্বীপে তার বন্দীদশা কেবল নির্দিষ্ট একটা সময়ের জন্যে।

অবশ্য, এখানে আমাদের অবস্থানকে কোনোমতেই বন্দী-দশা বলার উপায় নেই। আমি এবং আমার কর্ত্রী–আমরা দুজনেই নীল নদের দু ধারের এই জমজ নগরীতে স্বাধীনভাবে ঘুরতে-ফিরতে পারি। দ্বীপের পথে পথে ইতোমধ্যেই দারুন জনপ্রিয় হয়ে গেছে লসট্রিস। সাধারণ জনতা ওকে দেখলেই ভীড় করে আসে–আশীর্বাদ, না হয় পরামর্শ নিয়ে। ওর নিজস্ব শহর থিবেসের মতোই এখানকার মানুষজনও তার সৌন্দৰ্য্য আর আভিজাত্যের অনুরাগী। তার নির্দেশে, সব সময় পিঠে এবং মিষ্টান্ন ভর্তি থলে নিয়ে ওর পিছনে চলতাম আমি; রাস্তায় যাদেরকেই ওর কাছে ভুখা মনে হতো–ওগুলো তাদের মাঝে বিতরণ করতো আমার কর্ত্রী । সব সময়ই, উচ্ছল বালকের দল চলতো আমাদের পিছু-পিছু।

গরিব-দুঃখী মানুষের দুয়ারে বসে, বাড়ির স্ত্রীদের মুখে তাদের দুঃখ-শোকের গল্প খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে লসট্রিস। অথবা, গাছের তলায় বসে কৃষকের সাথে ঘণ্টার পর ঘন্টা আলাপে মগ্ন হয়। প্রথম সুযোগেই তাদের সমস্ত দুঃখের কথা ফারাও-এর কানে তুলতো সে। মাঝে-সাঝে, স্নেহবশত মেনে নিতেন ফারাও। সাধারণ জনতার কাছে দেবীরূপে আসীন হতে লাগলো লসট্রিস।

অন্যান্য দিনে, নীল নদের বন্যায় সৃষ্ট হদে আমাদের ছোটো নৌকায় বসে মাছ ধরি আমরা দুজনে। না হয়, বুনো হাঁসের জন্যে ফাঁদ পাতি। অবশ্যই ট্যানাসের লানাটার মতো নয়, তবে লসট্রিসের জন্যে ছোট্ট একটা ধনুক তৈরি করে দিয়েছি আমি। খুব কমই লক্ষ্য ভেদে ব্যর্থ হতো আমার কর্ত্রী । বুনো-হাঁস শিকারে ওর জুড়ি মেলা ভার।

যখনই শিকারে বেরুতেন ফারাও, লসট্রিস তার সঙ্গী হোত। প্যাপিরাসের ঝোঁপের ধার ঘেঁষে, বাহুতে বাজপাখি নিয়ে আমি চলতাম পিছুপিছু। কোনো হীরণ উড়ে গেলেই মৃদু শীষ বাজিয়ে নির্দেশ দিতে আমার কর্ত্রী। তার নির্দেশে ঠিক ঠিক উড়ে গিয়ে আক্রমণ শানাতো শিকারী-বাজ। গাঢ় নীল আকাশের বুকে কিছু সময়ের মধ্যেই হীরণের হালকা নীল পালক ছড়িয়ে পড়তো। নদীর মৃদু-মন্দ হাওয়া ধীরে ভাসিয়ে নিয়ে যেতো সেগুলো। আনন্দের আতিশায্যে হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠতে মিসট্রেস।

আকাশ, জল আর মাটির সব পশুপাখি ভালোবাসি আমি। আমার কর্ত্রীও তার ব্যতিক্রম নয়। তাহলে কেনো আমরা দু জনেই শিকার পছন্দ করি–এ কথাটা বহুদিন ভেবেছি আমি। সম্ভবত, এটা সবচেয়ে বড় সত্যি যে, পুরুষ এবং অতি অবশ্যই নারীও, পৃথিবীর হিংস্রতম পরভোজী। শিকারী বাজ-এর গতি, তার ক্ষিপ্র-হিংস্রতা ভালোবাসি আমরা। হীরণ আর বুনোহাঁস হলো শিকারী বাজ-এর জন্যে দেবতাদের উপহার, ঠিক যেমন পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টির উপরে কর্তৃত্ব করি আমরা মানুষ। দেবতাদের দেওয়া এই দান তো আমরা উপেক্ষা করতে পারি না।

সেই শৈশবে, যখন মাত্র দাঁড়াতে শিখেছে লসট্রিস, আমার এবং ট্যানাসের সঙ্গে শিকারে বেরুতো সে। সম্ভবত প্রভু হেরাবের প্রতি তার হিংসা আড়াল করার জন্যেই ট্যানাসের সাথে আমাকে যেতে দিতেন ইনটেফ। বহু শিকার অভিযানে আমার এবং ট্যানাসের সঙ্গী হয়েছে লসট্রিস। ট্যানাস যেবারে সেই গবাদিপশু খেকো সিংহ মারলো, উপত্যকার উপরে, কালো-পাহাড়ে- সেদিনও মিসট্রেস ছিলো আমাদের সাথে। শিকারের সব কৌশল ওর নখদর্পনে। সমস্ত পশুপাখি, মাছ- সব প্রাণীর সঠিক নাম ধরে ডাকতে পারদর্শী আমার কর্ত্রী ।

তাবৎ প্রানিকুলের উপর আমাদের যেমন কর্তত্ব রয়েছে, ঠিক তেমনি, সব নারী পুরুষ হলো ফারাও-এর খোয়ারের পোষাপ্রাণী। তাকে লঙ্ন করে-এমন ক্ষমতা কারো নেই। ঠিক নব্বইতম রাতে, আমার কর্ত্রীকে তার শয্যাকক্ষে নিয়ে যেতে আতনকে পাঠালেন তিনি।

*

আমাদের মধ্যকার বন্ধুত্ব এবং মিসট্রেসের প্রতি তার ভক্তির কারণে আসার বেশ অনেকক্ষণ আগেই জানিয়ে গিয়েছিলো আতন। এতে করে, শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির কিছু সুযোগ পেয়ে গেলাম।

শেষবারের মতো মিসট্রেসকে দিয়ে অনুশীলন করিয়ে নিলাম–কী কী বলতে হবে ফারাওকে, কিভাবে ব্যবহার করতে হবে। এরপর, সেই মলমটা লাগিয়ে দিলাম ওর যোনীদ্বারে। কেবল পিচ্ছিলকারকই নয়, ব্যথাও অনেকটা কমায় এই জিনিস। অবশ করে দেয়।

আতন সদর দরোজায় আসার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত শক্তই ছিলো আমার কর্ত্রী, এরপরেই একেবারে ভেঙে পড়লো সে। আমার দিকে ফিরে কাঁদতে লাগলো লসট্রিস । আমি একা যেতে পারবো না, ভয় লাগছে। দয়া করে আমার সাথে এসো, টাইটা। আমার দেওয়া প্রসাধনীর নিচে ওর চেহারা একেবারে বিবর্ণ হয়ে গেছে, ভয়ে দাঁতে দাঁত বাড়ি খাচ্ছে।

মিসট্রেস, তুমি জানো–এটা সম্ভব নয়। ফারাও তোমাকে ডেকেছেন। অন্ততঃ এইবার আমার কিছুই করার নেই।

এবারে আতন এগিয়ে আসে। টাইটা ইচ্ছে করলে রাজার শয্যাকক্ষের বাইরে অপেক্ষা করতে পারে। আমার সাথে। সে যেহেতু রাজার চিকিৎসক–ওর সেবা প্রয়োজন হতেই পারে। আমার কর্ত্রী পায়ের আঙুলের উপর দাঁড়িয়ে আতনের গালে চুমো খায় এই কথায়।

তুমি খুব ভালো, আতন। লজ্জায় একেবারে পাকা কুমড়ো ধারণ করলো আতনের মুখাবয়ব।

শক্ত করে আমার হাত ধরে থাকলো লসট্রিস। আতনের পিছুপিছু প্রাসাদে, রাজার শয্যাকক্ষের দিকে চললাম আমরা। কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে শেষ বারের মতো শক্ত করে হাতে চাপ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে উদ্যত হয় লসট্রিস। আর কখনও এতো সুন্দর, এতো নাজুক মনে হয় নি ওকে। আমার হৃদয় যেনো ভেঙে যেতে চাইলো, কিন্তু হেসে সাহস দিলাম ওকে। পর্দা সরিয়ে শয্যাকক্ষের ভেতরে ঢুকে পড়লো মিসট্রেস। রাজার মৃদু সম্ভাষণ, প্রত্যুত্তরে লসট্রিসের নরম কণ্ঠ শুনতে পেলাম।

বাইরে, ছোটো কাঠের চৌকিতে আমার বিপরীতে বসে পড়লো আতন। বাক্য বিনিময় না করে বাও বোর্ড খুলে বসলো । খেলায় মনোযোগ দিতে পারছিলাম না আমি, পাথরের খুঁটিগুলো আনমনে নেড়ে চাল দিতে লাগলাম কাঠের বোর্ডের উপর। পর পর তিন বার জিতে গেলো আতন। এর আগে খুব কমই হারাতে পেরেছে সে আমাকে। কিন্তু আমাদের পেছনের কক্ষ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর আমার মনোযোগ সরিয়ে রাখলো পুরোটা সময়। যদিও টুকরো টুকরো কথাবার্তার কিছুই বুঝতে পারলাম না, তবু কান পেতে রইলাম।

এরপর, প্রায় পরিষ্কার শুনতে পেলাম, আমার কী বলছে, আমার প্রতি সদয় হোন, মহান ফারাও অনুরোধ করি, আমাকে ব্যথা দেবেন না। এতো মর্মস্পর্শী ছিলো সেই আবেদন, এমনকি আতন পর্যন্ত কেশে উঠে জামার হাতায় নাক মুছলো।

বেশ কিছু সময় আর কোনো শব্দ নেই। এরপরেই, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠলো লসট্রিস। তারপর আবার সব চুপচাপ।

বাও বোর্ড সামনে নিয়ে নীরবে বসে রইলাম আমি আর আতন–কেউই আর খেলার ভান করছি না। কত সময় পেরুলো ওভাবে, জানি না, রাতের শেষ প্রহরে পর্দার ওপাশ থেকে ভেসে এলো রাজার নাসিকা গর্জনের আওয়াজ। আমার উদ্দেশ্যে মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়ায় আতন।

সে পর্দা সরিয়ে ভেতরে যাওয়ার আগেই ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে লসট্রিস। আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো, টাইটা। ফিসফিস করে বলে সে।

কোনোকিছু না ভেবেই ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলাম, ছোট্ট বাচ্চার মতো আমার ঘাড় জড়িয়ে ধরে রইলো লসট্রিস। প্রদীপ হাতে হারেম পর্যন্ত রাস্তা দেখালো আতন। মিসট্রেসের শয্যাকক্ষের দরোজায় আমাদের ছেড়ে গেলো সে। বিছানায় শুইয়ে দিলাম আমি লসট্রিসকে। এরপরে, নরমভাবে পরীক্ষা করে দেখলাম ওকে। সিল্কের মতো মসৃণ দুই উরুতে সামান্য রক্তের দাগ লেগে আছে। কিন্তু রক্তপাত থেমে গেছে আপনাতেই। ওদিকে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে লসট্রিস।

কোনো ব্যথা আছে, ছোট্ট সোনা? আস্তে করে জানতে চাইলাম। চোখ খুলে মাথা নাড়লো ও।

এরপর, অপ্রত্যাশিতভাবে হাসলো মিসট্রেস। এত্তো কথা শুনেছি এটা নিয়ে, বিড়বিড় করে বলছিলো ও। কিন্তু, এ তো কিছুই নয়। বেশি সময়ও লাগে নি। কুঁকড়ে গোল হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো মিসট্রেস, আর একটি শব্দও উচ্চারণ করলো না।

স্বস্তিতে প্রায় কেঁদে ফেললাম আমি। দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং লতাগুল্মের মলম কাজ দিয়েছে। আমার মিষ্টি সোনামণি, লসট্রিসের নরম মনে বা দেহে কোনো ক্ষতি করতে পারে নি ফারাও-এর দুর্বল সঙ্গম।

*

অলসতায় কেটে যেতে লাগলো গজ-দ্বীপে দিনগুলো। ধীরে ধীরে আমার কর্ত্রীও নিজেকে সম্পূর্ণ মানিয়ে নিলো পরিপার্শ্বের সাথে । যতই সময় পেরুলো, অস্থিরতা বোধ করতে শুরু করলাম আমি। কে জানে, কী করলো ক্ৰাতাস। ট্যানাসেরই বা কি হলো–ভেবে দুই চোখের পাতা এক করতে পারছিলাম না। ওদিকে লসট্রিসও তাগাদা দিতে শুরু করেছে, এখান থেকে চলে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে আমার। মনস্থির করে ফেললাম-এখনই উপযুক্ত সময়।

যেই ভাবা সেই কাজ–পরদিন সকালে সূর্যোদয়ের আগেই একা একা মাছ শিকারে বেরুলাম আমি ছোট্ট নৌকায় চড়ে। তবে যাওয়ার আগে নিশ্চিত করে নিলাম, কমপক্ষে বারোজন দাস বালক, প্রহরী দেখেছে আমাকে নৌকায় চড়তে।

হ্রদের পেছন দিকে এসে চামড়ার থলে খুলে বের করলাম আমার পোষা বিড়ালটাকে। বুড়ো হয়ে গেছে ওটা চোখে তো দেখতে পায়ই না, দুই কানেও বিষফোঁড়ার ব্যথায় মরো মরো অবস্থা। ওর এই দুরবস্থা থেকে মুক্তির ব্যবস্থা হিসেবে ধুতুরার বিষ সমেত এক টুকরো গোশতো খেতে দিলাম। কোলে বসে আনন্দে মিউ মিউ শব্দ করে খেতে লাগলো ওটা। কিছু সময়ের মধ্যেই মরে গেলো, টু শব্দটি না করে। নিপ্রাণ জীবটার গলা কাটলাম আমি এবারে।

নৌকায় ভালো করে বিড়ালের রক্ত ছিটালাম এরপর। লাশটা রাখলাম পাটাতনে, জানি, কুমিরের দল কিছুক্ষণের মধ্যেই কাড়িকাড়ি শুরু করে দেবে ওটার জন্যে। এবারে, আমার হারপুন এবং অন্যান্য সরঞ্জাম নৌকায় রেখেই মৃদু-মন্দ স্রোতে ভাসিয়ে দিলাম নৌকা; নিজে নেমে পড়লাম প্যাপিরাসের ঝোঁপ ঘেঁষে অল্প পানিতে। পানি ঠেলে তীরে চলে এলাম।

আগেই ঠিক করে নিয়েছি, রাতের অন্ধকার পর্যন্ত অপেক্ষা করবে মিসট্রেস; এরপরে আমার অন্তর্ধানের খবর প্রকাশ করবে সে। কাজেই আগামীকাল দুপুরের আগে নৌকা বা রক্তের ছোপ আবিষ্কার করা সম্ভব হবে না কারো পক্ষে। সবাই ভাববে, কুমিরের পেটে গিয়েছি, নয়তো, শ্রাইকদের কোনো দলের হাতে কতল হয়ে গেছি আমি।

তীরে পৌঁছেই সঙ্গে করে নিয়ে আসা ছদ্মবেশ নিলাম। ওসিরিসের মন্দিরের একজন পুরোহিত সেজে নিয়েছি, আমার কর্ত্রীর আমোদের জন্যে বহুবার ওটা পরে পুরোহিতদের মতো ভাবগম্ভীর হাঁটা অনুশীলন করেছি আগে। কেবল একটা পরচুলা, কিছুটা প্রসাধনী আর সঠিক পোশাক একেবারে পুরোহিত বানিয়ে ছেড়েছে আমাকে। সবসময় পথ-চলতির উপরেই থাকে এই পুরোহিতেরা; নদীর উজান-ভাটিতে অবিরত যাওয়া-আসা–এক মন্দির থেকে অন্য মন্দিরে। পথে পথে ভিক্ষা বা সাহায্য চেয়ে ফিরে। কাজেই, খুব কম লোকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ হবে এই পোশাকে; শ্রাইকরাও আক্রমণে উৎসাহিত হবে না। মন্দিরের লোকেদের কেনো যেনো ঘটায় না এরা।

হ্রদ ছেড়ে তীরে উঠলাম। গরিব মানুষের এলাকা হয়ে পশ্চিম গজ-দ্বীপে প্রবেশ করছি। বন্দরে পৌঁছে সোজা চলে এলাম শস্যদানা ভর্তি এক জাহাজ-মালিকের কাছে। দেবতাদের দোহাই দিয়ে যথার্থ ভাবগম্ভীরতার সাথে তাকে অনুরোধ করলাম, নিরাপদে কারনাকে পৌঁছে দিতে। কাঁধ ঝাঁকিয়ে সায় দিলো সে। হতে পারে, পুরোহিতদের অপছন্দ করে অনেকেই, কিন্তু অতিন্দ্রিক যে কোনো কিছুকে ভয় পায় লোকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে, স্বয়ং ফারাও-এর মতো ক্ষমতাবান ধর্মের সেবকেরা।

পূর্ণিমা আজ। আর, নেমবেটের তুলনায় এই জাহাজের চালক অনেক বেশি দক্ষ। রাতে আর নোঙর করলাম না আমরা। বাতাসের সহায়তায়, স্রোতের অনুকূলে তরতর করে এগিয়ে চললো জাহাজ। পঞ্চম দিনে নদীর শেষ বাঁক ঘুরতেই সামনে দেখা গেলো কারনাক শহর।

তীরে নামতে অস্বস্তি বোধ হতে লাগলো, এ আমার শহর, প্রতিটি মানুষ ভিক্ষুক বা ভবঘুরে-চেনে আমাকে। যদি কেউ চিনে ফেলে, মুহূর্তেই সংবাদ পৌঁছে যাবে ইনটেফের কাছে। যা হোক, ছদ্মবেশের বদৌলতে নিরাপদে হেঁটে চললাম আমি, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্যানাসের বাহিনীর তাঁবুতে পৌঁছলাম ।

সদর দরোজা হাঁ হয়ে খোলা। সহজে ভেতরে ঢুকে পড়লাম, যেনো এটা আমারই বাড়ি। সম্পূর্ণ খালি পড়ে আছে জায়গাটা, এমন কিছু বা কেউ নেই যার থেকে কোনো খবর পাওয়া সম্ভব। মনে হলো, আমার এবং মিসট্রেসের চলে যাওয়ার পর থেকে খালি পড়ে আছে স্থানটা। খাবার পাত্রে ধুলোর পুরু আস্তরণ, দুধের জগে পচা দই।

কিন্তু, হারায় নি কিছুই; এখনও উপরের তাকে রাখা আছে সেই লানাটা ধনুক। ব্যাপারটা যদিও অস্বাভাবিক ট্যানাস সাধারণত হাতছাড়া করে না ওটা। এ অনেকটা তার শরীরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গের মতো ছিলো। বিছানার নিচে, আমারই তৈরি করা একটা গোপন জায়গায় অস্ত্রটা লুকিয়ে রাখলাম। অন্ধকার নামা পর্যন্ত ট্যানাসের আস্তানায়ই রইলাম, পাছে দিনের আলোয় কেউ চিনে ফেলে আমাকে। জায়গাটা সাফ সুতরা করে ব্যয় করলাম পুরোটা সময়।

রাতে, অন্ধকারে মিশে নদীর ধারে চলে এলাম। নোঙর করা আছে হোরাসের প্রশ্বাস। শেষবার যখন দেখেছিলাম ওটাকে, তার পরে নির্ঘাত যুদ্ধে গিয়েছে জায়গায় জায়গায় তার নিদর্শন ফুটে আছে। ভেঙে গেছে গলুই, পাটাতনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হালটা ঠিক আমার পরামর্শ মতো নতুন করে নকশা করা হয়েছে দেখে আনন্দ হলো খুব। ধাতব পাতে মোড়া গলুই চোখা হয়ে বেরিয়ে আছে কয়েক ফুট সামনে, পানির স্তরের ঠিক উপরে। ওর অবস্থা দেখে বুঝতে পারছি, মুখোমুখি সংঘর্ষে লাল ফারাও-এর নৌবাহিনীর কী ভয়ানক ক্ষতি করে এসেছে ওটা।

কিন্তু, ট্যানাস বা ক্ৰাতাস কেউ নেই পাটাতনে। বন্দরের ঘাটে শোরগোল করতে থাকা নাবিকদের উদ্দেশ্যে এগুলাম। কাছাকাছি একটা ছোট্ট প্রকোষ্ঠে ক্রাতাসের দেখা পাওয়া গেলো। সমানে পান করছে, জুয়া খেলা চলছে সব মিলিয়ে নরক-গুলজার। এই জায়গায় তাকে ইশারা করা সাজে না, অপেক্ষা করতে লাগলাম। ওদিকে, দুই রূপোপজীবনী আমাকে তাদের সম্পদ দেখানোর জন্যে উঠে-পড়ে লেগেছে বাইরের অন্ধকার গলিতে নিয়ে যেতে চাইছে। এমনকি, আমার পুরোহিতের পোশাকও তাদের প্রচেষ্টায় এতটুকু প্রভাব রাখতে পারছে না।

অবশেষে, বন্ধুদের শুভরাত্রি জানিয়ে বাইরের গলিতে পা রাখলো ক্ৰাতাস, ওর পিছু নিলাম আমি।

কী বলতে চাও তুমি, হে পুরোহিত? বিরক্ত স্বরে বললো ক্ৰাতাস। কি চাও? স্বর্ণমুদ্রা?

হ্যাঁ, তাই নেবো, উত্তরে বললাম। অন্য অনেকের চেয়ে ওটা বেশি আছে তোমার, ক্ৰাতাস। জায়গায় জমে গিয়ে সন্দেহপূর্ণ চোখে আমার দিকে তাকালো সে। সুরার প্রভাবে একটু একটু টলছে।

আমার নাম জানলে কেমন করে? আমার জামার হাত ধরে টেনে আলোর নিচে নিয়ে গেলো ক্ৰাতাস। ভালো করে পরখ করছে মুখটা, অবশেষে একটানে পরচুলা সরিয়ে ফেললো।

সেথ-এর পাছার বিষফোঁড়ার কসম! এ যে টাইটা! গর্জে উঠে সে।

দয়া করে চেঁচিয়ো না। এই কথায় সতর্ক হয় ক্ৰাতাস।

এসো! আমার কক্ষে চলো।

একা হতেই, দুই পাত্রে সুরা ঢেলে একটা এগিয়ে দিলো সে। এখনও কী যথেষ্ট পান করা হয় নি তোমার? আমার এই প্রশ্নের উত্তরে কেবল হাসলো ক্ৰাতাস।

এর উত্তর তো সকালের আগে পাওয়া যাবে না, টাইটা। এখন কী? এতো শক্ত হও কেনো রে ভাই। গত তিন সপ্তাহ ধরে নদীর ভাটিতে লড়াই করেছি। মিষ্টি মাতা হাপি! তোমার নতুন চোখা গলুই কাজে দিয়েছে! কম করে হলেও বিশটি গ্যালি স্রেফ দু টুকরো করেছি আমরা, আর দুশ বজ্জাতের কল্লা ফেলেছি। এতো কাজের চাপে কেবল পানি পরেছে পেটে–ভেবে দ্যাখো। অন্তত মদ খেতে বাধা দিও না। পান করো আমার সাথে! পাত্র উঁচু করে ধরে সে, আমারও কম তৃষ্ণা পায় নি; স্যালুট করে ঠোঁটে ঠেকালাম পাত্র। ট্যানাস কোথায়?

সঙ্গে সঙ্গে কেঁদে ফেললো ক্ৰাতাস। সে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এই কথায় অপলকে ওর দিকে চেয়ে রইলাম।

অদৃশ্য হয়ে গেছে মানে? এর অর্থ কী? নদীর ভাটিতে যুদ্ধে যায় নি সে?

মাথা নাড়লো ক্ৰাতাস। না। ও নেই হয়ে গেছে। পুরো থিবেসের পথে, পথে প্রতিটি বাড়িতে খুঁজে দেখেছে আমার লোক কোনো চিহ্নও নেই ট্যানাসের। খুব চিন্তিত আছি, টাইটা।

শেষ কবে দেখেছো ওকে?

রাজার বিয়ের দুই দিন পরে; যেদিন কর্ত্রী লসট্রিস আর তুমি গজ-দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা হলে সেই সন্ধায়। অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি, শুনলেই না।

কি বলেছে ট্যানাস?

হোরাসের প্রশ্বাস আর সমগ্র বাহিনীর দায়িত্ব আমার হাতে দিয়ে গেছে।

সে ওটা করতে পারো না, তাই না?

তা-ই করেছে সে। বাজপাখির প্রতাঁকের ক্ষমতাবলে।

মাথা ঝাঁকালাম। তারপর?

বললাম তো–হারিয়ে গেছে।

মদের পাত্রে চুমুক দিয়ে ভাবতে বসলাম আমি।

জানালার কাছে গিয়ে পেচ্ছাব করে এলো ক্ৰাতাস। নিচে, কারও গায়ে ঝরলো সেই তরল; কোনো এক রাগত পথিকের চিৎকার শোনা গেলো, কোথায় মুতিস, ব্যাটা নোংরা শুয়োর!

জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে কাতাস তার ঘাড় ভাঙার অভিলাষ ব্যক্ত করতেই ঠাণ্ডা হয়ে আসে লোকটা। সাম্প্রতিক এই বিজয়ে উল্লসিত ক্ৰাতাস আমার কাছে ফিরে আসতেই শুধালাম, তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার সময় ট্যানাসের মনের অবস্থা কেমন ছিলো?

আবারো মেঘ ঘনায় ক্রাতাসের চেহারায়। এতো ক্ষ্যাপাটে ওকে আর দেখি নি কোনোদিন। দেবতা আর ফারাও-কে সমানে অভিশাপ দিচ্ছিলো। এমনকি, কর্ত্রী লসট্রিসকে পর্যন্ত রাজকীয় বেশ্যা বলে গাল দিয়েছিলো।

আঁতকে উঠলাম। যদিও জানি, মন থেকে কথাটা বলে নি ট্যানাস। অসহায় প্রেমিকের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিলো সেটা।

ও বলেছিলো, দেশদ্রোহিতার জন্যে ফারাও ওকে লটকাতে চাইলে তা-ই সই, সেটাই নাকি ভালো হবে তার জন্যে। ভীষণ খারাপ অবস্থায় ছিলো তখন ট্যানাস, আমার কোনো কথাতেই কান দেয় নি সে।

ব্যাস, এ-ই? কী করবে, কোথায় যাবে কিছু ইঙ্গিত দিয়ে যায় নি? মাথা নেড়ে আবারো পাত্রে মদ ঢেলে নেয় ক্ৰাতাস।

বাজপাখির প্রতাঁকের কী হলো? জানতে চাইলাম।

আমার কাছে রেখে গেছে। ওর নাকি ওটা দিয়ে আর কোনো কাজ নেই। হোরাসের প্রশ্বাসে নিরাপদে রাখা আছে ওটা।

অন্যান্য যেসব ব্যাপারে তোমার সাথে কথা বলে গিয়েছিলাম তার কী হলো? যা বলেছি, করে রেখেছো?

বিষণ্ণ চিত্তে পাত্রের সুরার দিকে তাকালো ক্ৰাতাস। আয়োজন শুরু করেছিলাম, বিড়বিড় করে বলে চললো সে, কিন্তু, যখন ট্যানাস চলেই গেলো, আর উৎসাহ পাই নি। আর তাছাড়া, নদীর ভাটিতে যুদ্ধে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

খুবই অবিশ্বস্ত কাজ হলো এটাক্ৰাতাস, তোমার যোগ্য নয়। আমার কর্ত্রী, লসট্রিস তোমার ভরসাতেই ছিলো । ও বলেছে, তোমাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে সে।

ক্রাতাস আমার কর্ত্রীর আরো একজন মুগ্ধ ভক্ত। আমার এ কথাতে কাজ হলো, লসট্রিসের একটু অসন্তুষ্টির কারণ হতে চায় না সে।

ওহ্, হো, টাইটা! তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি একটা দুর্বল গর্দভ–নীরবে বসে রইলাম আমি। নীরবতা অনেক সময় খুব বেশি পীড়া দেয়। হোরাসের কসম কর্ত্রী–লসট্রিস আমার কাছে কী চান?

এখান থেকে চলে যাওয়ার আগে যা যা করতে বলেছিলাম তোমাকে ঠিক তাই, বললাম তাকে। ধপাস করে হাতের পাত্র নামিয়ে রাখলো সে।

আমি সৈনিক। দায়িত্ব ফেলে রেখে অর্ধেক বাহিনী নিয়ে কোনোরকম আজব খেলাতে অংশগ্রহণ করা সাজে না আমার পক্ষে। ট্যানাস যখন বাজপাখির প্রতাঁকের মালিক ছিলো, তখন অন্য কথা। আর এখন

আর এখন তোমার কাছে আছে ওটা। নরম স্বরে বললাম।

নীরবে তাকিয়ে থাকলো ক্ৰাতাস। কিন্তু ট্যানাসের অনুমতি ছাড়া–।

তুমি তার বিশ্বস্ত সহচর। ট্যানাস ওটা তোমাকে দিয়েছে ব্যবহার করার জন্যে। কাজেই, যা ভালো বোঝো করতে হবে তোমাকে। অবশ্যই করতে হবে। আমি খুঁজে নিয়ে আসবো ট্যানাসকে, কিন্তু ততক্ষণে তৈরি হয়ে থাকতে হবে তোমাকে। অনেক রক্ত ঝরবে সামনে, প্রচুর কাজ তোমাকে বড়ো প্রয়োজন তার। আবারো তাকে হতাশ করো না।

এই কথায় রাগে চেহারা লাল হয়ে উঠে ক্রাতাসের। এই কথা গিলে নিতে বাধ্য হবে তুমি–এই বেলা বলে দিলাম! প্রতীজ্ঞা ফুটে উঠলো তার কণ্ঠস্বরে।

নিঃসন্দেহে, সেটাই হবে আমার আহার করা সবচেয়ে উপাদেয় খাবার! বললাম তাকে। সাহসী আর সৎ লোক পছন্দ করি আমি, খুব সহজেই মানানো যায় এদের।

*

ট্যানাসকে কেমন করে খুঁজে বের করবো ভেবে কোনো কূল কিনারা পেলাম না। ক্ৰাতাসকে রেখে শহরে বেরিয়ে পড়লাম। আবারো ট্যানাসের পুরোনো ভেঁরা, শহরের গলি-ঘুপচি ওর খোঁজে চষে ফেললাম। যাকে সামনে পেলাম, জিজ্ঞেস করলাম কবে, কোথায় দেখেছে ট্যানাসকে। জানি, এতে করে দারুন বিপদের ঝুঁকি নিচ্ছি। আমার পরিচিত কারো সামনে পড়ে গেলে এই ছদ্মবেশ কোনো কাজেই আসবে না। কিন্তু আমাকে তো খুঁজে বের করতেই হবে তাকে। রাতের শেষ প্রহর পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গেলাম, শেষমেষ ক্ষান্ত দিতে হলো।

সকাল হয়ে এসেছে। নীলের তীরে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত, অসহায় আমি ভাবতে চেষ্টা করলাম কোথাও খুঁজতে বাকি রেখেছি কি না। মাথার উপরে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ডেকে উঠলো বুনোহাঁসের দল। পুব আকাশের স্নান সোনালি-তামাটে আভায় উড়ে চলেছে ওরা। অনেক সুখ-স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দিলো ওগুলো; আমাদের তিনজনের ট্যানাস, আমি আর মিসট্রেসের। কত দিন জলার ধারে সকালে শিকার করেছি আমরা, ইয়ত্তা নেই।

গর্দভ কোথাকার! হঠাৎই মনে পড়ে গেলো। ওখানেই আছে সে!

এতক্ষণে শহরের গলি-ঘুপচি জনাকীর্ণ হতে শুরু করেছে। পৃথিবীর ব্যস্ততম শহর আমাদের এই থিবেস, কেউই অলস নয় এখানে। এরা কাঁচ ভাঙে, স্বর্ণের কাজ করে, রুপোর বাসন-কোসন বানায়, পাত্র তৈরি করে। ইতিমধ্যেই দরদাম হাঁকাহকি শুরু করেছে বণিকের দল, আইনজ্ঞরা নিজ নিজ প্রকোষ্ঠে কাজ শুরু করেছে, পুরোহিতেরা তাঁদের প্রাত্যহিক যজ্ঞ আরম্ভ করেছে আর বেশ্যারাও খুলেছে তাদের ঝাপি। উত্তেজনাকর, দ্রুতগামী এক শহর থিবেস, আমি ভালোবাসি একে।

সকালের ব্যস্ততা ঠেলে এগিয়ে গেলাম। বাতাসে মশলা, ফলমূল, শাক-সবজি, মাছ-মাংসের গন্ধ ভাসছে। গরুর হাম্ভা রব, ছাগলের ব্যা ব্যা, সঙ্গে মানুষের চিৎকার সব মিলিয়ে এক দক্ষ-যজ্ঞ বেঁধে গেছে।

একবার ভাবলাম, একটা গাধা কিনে নেবো কি না–এই গরমে বেশ অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। শেষমেষ বাদ দিলাম চিন্তাটা; শুধু যে অর্থনৈতিক ভাবনা থেকে, তা নয় বরঞ্চ একবার শহরের বাইরে চলে গেলে শ্রাইকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সহায় হবে ওটা। সেক্ষেত্রে, পুরোহিতের ছদ্মবেশও লুটে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। এক বোতল পানি, কিছু রুটি কিনে নিয়ে একটা চামড়ার থলেতে ভরে নিলাম। এরপর সরু রাস্তা ধরে রওনা হলাম শহরের প্রধান ফটকের উদ্দেশ্যে।

ফটকে পৌঁছানোর আগেই হঠাৎ শোরগোল উঠলো; প্রাসাদের একদল রক্ষী তাদের হাতের লাঠি দিয়ে মেরে পথ করে নিতে লাগলো। তাদের ঠিক পেছনেই একদল দাস কাঁধে পালকি নিয়ে হেঁটে চলেছে। প্রধান রক্ষী এবং ওই পালকি আমার পরিচিত। মুখোমুখি পড়ে গেলাম একেবারে ।

আতঙ্কে হৃৎপিণ্ড যেনো বন্ধ হয়ে যাবে। রাসফার হয়তো ভালো করে না দেখলে চিনবে না আমাকে, কিন্তু এই ছদ্মবেশ সত্ত্বেও ইনটেফ সাথে সাথে চিনে ফেলবেন আমাকে। আমার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে বুড়ি এক দাসী মহিলা বিশাল দুই বুক আর জলহস্তির মতো পাছা সমেত; তার পেছনে আড়াল নিলাম। এরপর চোখের উপর পরচুলা টেনে উঁকি মেরে দেখতে লাগলাম।

আতঙ্ক সত্ত্বেও, র‍্যাসফার যে মতো দ্রুত হাটাচলা করতে পারছে এ জন্যে নিজের ভেতরে গর্ব অনুভব করলাম। সময়মতো আমার শল্যচিকিৎসা না পেলে এতক্ষণে মরে যেতো সে। কাছাকাছি এসে পড়তে লক্ষ করলাম, মুখের একদিক ঝুলে পড়েছে তার। যেনো আগুনে গলে গেছে মোমের মতো। আগে যদি সে কুৎসিত ছিলো, তো এখন হয়েছে ভৌতিক। বেশিরভাগ সময়ই মস্তিষ্কের আঘাতে এমন দশা হয়।

দলবল নিয়ে আমার পাশ ঘেঁষে চলে গেলো সে। পর্দার ফাঁক দিয়ে এক ঝলক দেখতে পেলাম ইনটেফকে–পুর থেকে আমদানি করা মসৃণ সিল্কের বালিশে আয়েস করে বসে আছেন।

সদ্য খৌরী করা গাল চকচক করছে; আনুষ্ঠানিক ভঙিতে চুল বেঁধেছেন। এক হাতের আঙুলে একগাদা আংটি, অপর হাত অলসভাবে ফেলে রেখেছেন ছোট্ট-সুন্দর এক দাস বালকের মসৃণ বাদামী উরুতে। নির্ঘাত তার নতুন সংগ্রহ ছেলেটাকে চিনতে পারলাম না।

পুরোনো মনিবের প্রতি আমার ঘৃণার প্রাবল্যে নিজেই অবাক হলাম। তাঁর হাতে অসংখ্যবার বিভিন্নভাবে নির্যাতনের সমস্ত কথা যন্ত্রণা করতে লাগলো নতুন করে। কখনই তাকে ক্ষমা করতে পারবো না আমি।

আমার দিকে ফিরতে শুরু করতেই সামনের পর্বত-প্রমাণ মহিলার আড়ালে লুকালাম। সরু আইল ধরে সামনে এগিয়ে গেলো পালকি। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে খেয়াল হলো, রাগে আমার সর্বাঙ্গ কাঁপছে।

স্বর্গীয় হোরাস, অধমের এই আবেদন মঞ্জুর করুন! যতদিন পর্যন্ত ওই শয়তানকে তার প্রভু সেথ্‌-এর কাছে না পাঠাতে পারছি, আমার বিশ্রাম নেই, বিড়বিড় করে উচ্চারণ করে প্রধান ফটকের উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগলাম আমি।

*

বাৎসরিক বন্যায় দু কূল ছাপিয়ে বয়ে চলেছে নীল নদ। সেই সৃষ্টির শুরু থেকে পলিমাটির কালো স্তর জমা করে চলেছে আমাদের মাটিতে। বন্যার পানি নেমে গেলে, এই বিস্তীর্ণ চকচকে জলের বুক চীরে আবারো দেখা দেবে জমিন সবুজে সবুজে ভরে উঠবে। মিশরীয় সূর্য আর উর্বর পলির প্রভাবে আগামী বন্যার আগেই ফসল তোলার সময় হয়ে যাবে।

জলমগ্ন মাঠের প্রান্তে রয়েছে উঁচু হাঁটা পথ। এ রকমই একটা পায়ে চলা পথ ধরে পুবে হেঁটে চললাম আমি, যতক্ষণ পর্যন্ত না পাথুরে জমিনের দেখা পেলাম । এরপরে দক্ষিণে চললাম। মনে প্রতিজ্ঞা। কিছু সময় পর পর পথের পাশে উঁচু পাথর খণ্ডের উপর দাঁড়িয়ে রাস্তা ঠিক করে নিচ্ছিলাম।

আমার ডানধারের উঁচু-নিচু জমিনের দিকে ভালো করে নজর রেখে চলেছি, ওরকম আড়াল থেকেই অকস্মাৎ আক্রমণ শানাতে ওস্তাদ শ্রাইকের দল। ঠিক যখন সংকীর্ণ, গভীর একটা গিরিপথ পেরুচ্ছিলাম, কাছ থেকে কর্কশ কণ্ঠে থামার আদেশ করা হলো।

হে দেব-দেবী–আমাকে রক্ষা করুন! এতোটাই চমকে গেছিলাম, প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম।

আমার সামনে গিরিপথের ঠিক প্রান্তসীমায় বসে একজন রাখাল বালক। দশের বেশি নয় বয়স। কিন্তু দৃষ্টিতে গভীর বন্যতা। ছোটো ছেলেমেয়েদের খবরদাতা হিসেবে ব্যবহার করে শ্রাইকেরা শুনেছি। এই ছোট্ট শয়তানটা সে জন্যে একবারে উপযুক্ত। মাথাভর্তি জটা চুল, মতো দুর্গন্ধময় একটা পোশাক পরনে এখান থেকেও নাকে আসছে। ঠিক খুনে শকুনের মতো চকচকে তার দৃষ্টি, আমার মাল-সামানের দিকে নজর।

কোথায়, কী কারণে যাচ্ছ–পাত্রী? হাতের বাঁশিতে লম্বা, প্রলম্বিত একটা সুর বাজালো সে; নির্ঘাত কোনো ধরনের সংকেত ওটা।

কিছু সময় লাগলো হৃৎপিণ্ডের ধড়ফড়ানো নিয়ন্ত্রণে আনতে। কষ্টার্জিত স্বরে বললাম, তোমার তাতে কি প্রয়োজন, বাছা? আমি কে বা কোথায় যাই জেনে কী করবে?

সাথে সাথেই কথার ভাব বদলে গেলো তার। আমি ভুখা আছি, হে পুরোহিত। এতিম আমি, নিজের খাবার নিজেই যোগাড় করতে হয় আমাকে। তোমার ওই বড়ো থলেতে আমার জন্যে কি কিছুই নেই?

তোমাকে দেখে মনে হয় না যে, না খেয়ে আছে, অন্যদিকে ফিরে বললাম, কিন্তু নদীর পার ধরে আমার সাথে সাথে আসতে লাগলো শয়তানটা।

তোমার থলেটা একটু দেখতে দাও, ফাদার, বলে চলে সে, ভিক্ষা চাই।

ঠিক আছে। থলের ভেতর থেকে একটা আঙুর বের করলাম আমি, কিন্তু শয়তানটা ওটার নাগাল পাবার আগেই মুঠো বন্ধ করে আবার খুললাম। ততক্ষণে আঙুর পাল্টে একটা বিষাক্ত কাঁকড়া দেখা গেলো হাতে। কিলবিলে শাঁড়াশি নাচালো ওটা, ভয়ে এক লাফে পেছনে চলে গেলো ছেলেটা। উঠে-পড়ে দৌড়াচ্ছে চড়াই ধরে।

ছোট্ট পাহারটার চূড়োয় পৌঁছে চিৎকার করে উঠলো আমার উদ্দেশ্যে, তুমি ব্যাটা পাদ্রী নও! তুমি হলে মরুর জাদুকর! শয়তান, খোদ শয়তান মানুষ না! এরপরে খারাপ শক্তির বিপরীতে চিহ্ন এঁকে পালিয়ে গেলো সে।

পথে, একটা চ্যাপ্টা পাথরের তলা থেকে কাঁকড়াটা সংগ্রহ করেছিলাম। বিষাক্ত দাঁড়াটা ফেলে দিয়ে ইচ্ছে করেই থলের ভেতরে রেখেছি এখনকার মতো উপযুক্ত সময়ে ব্যবহারের জন্যে। যে বুড়ো দাসের কাছে ঠোঁটের নড়াচড়া থেকে কথা আঁচ করা শিখেছিলাম-সে আরও কিছু বিষয়ে জ্ঞান দান করেছিলো আমাকে। হাত সাফাই তার মধ্যে একটা।

পাহাড়ের কাছে পৌঁছে পিছনে ফিরে চাইলাম। বহু পিছনে বিন্দুর মতো দেখা গেলো রাখাল ছেলেটাকে, তবে সে একা নয় এখন। দুই জন পুরুষ দাঁড়িয়ে সঙ্গে। আমার দিকে ফিরে ভীষণ উত্তেজিত ভঙ্গিতে কী যেনো দেখাচ্ছে বালক, মনোযোগ দিয়ে তারা শুনছে সেটা। নির্ঘাত জাদুকর দৈত্য ভেবেছে আমাকে।

এক নাগাড়ে হেঁটে চললাম আমি। দুপুরের প্রখর রৌদ্রে দৃষ্টি চলে । হঠাৎই সামনে যেনো নড়াচড়া ঠাওর হলো। ছোট্ট, সাধারণ ধরনের একটা দল আসছে আমারই দিকে। আর একটু সামনে এগুতে বুকের ভেতরটা যেনো লাফ দিয়ে উঠলো–ওটা কী ট্যানাস? একটা খচ্চরের দড়ি ধরে এগুচ্ছে। হাড় জিরজিরে জটা বোঝার ভারে একেবারে ন্যুজ। বোঝার উপরে বসে একজন মহিলা আর একটা বাচ্চা। মহিলা পোয়াতী । বাচ্চাটা কেবল কৈশোর ছাড়িয়েছে।

প্রায় দৌড়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু হঠাই বুঝলাম লোকটা ট্যানাস নয়, সম্পূর্ণ আগন্তুক একজন। লম্বা, চওড়া কাঁধ-তার চলন এবং মাথার একরাশ সোনালি-হলুদ চুল দেখে ভুল হয়েছিলো। সন্দেহভরে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, হাতের তলোয়ার তৈরি। এবারে খচ্চরটা পথ থেকে সরিয়ে আমার চোখে চোখে চেয়ে রইলো সে।

দেবতার আশীর্বাদ তোমার উপর ন্যস্ত থোক, বাছা, ঠিক পুরোহিতের মতো করেই বললাম। কিন্তু তলোয়ার না নামিয়ে আমার পেট বরাবর ধরে রইলো সে। অপরিচিতদের কেউ বিশ্বাস করে না আমাদের এই মিশরে।

এই পথে এসে নিজের এবং পরিবারের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছ, বন্ধু। বরঞ্চ ক্যারাভানে এলে ভালো করতে। পেছনের পাহাড়ে দস্যু দল ওত পেতে আছে। সত্যিই ওদের জন্যে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। মেয়েটাকে দেখে মনে হয় ভদ্র, বাচ্চাটা কেঁদে ফেললো আমার কথায়।

তোমার কাজে যাও, হে পুরোহিত! নির্দেশের সুরে বললো লোকটা। যার প্রয়োজন, তাকে উপদেশ দিও।

আপনি ভালো লোক, জনাব, ফিসফিস করে বললো মেয়েটা। ক্যারাভানের অপেক্ষায় পুরো এক সপ্তাহ কেয়েনাতে ছিলাম আমরা আর বসে থাকা সম্ভব ছিলো না। আমার মার কাছে, লুক্সরে যেতে হবে দ্রুত বাচ্চার জন্মদানের জন্যে তার সাহায্য প্রয়োজন।

চুপ করো, মেয়েলোক! প্রায় গর্জে উঠলো তার সঙ্গী পুরুষ। পাদ্রী হোক আর যাই হোক কোনো অপরিচিতের কথায় ভুলবো না।

কিছু সময় ভাবলাম, ওদের জন্য কী করার আছে। কালো, অবিসিডিয়ান পাথরের মতো চোখ মেয়েটার, হৃদয় ছুঁয়েছে আমার। কিন্তু ওর স্বামীর তাগাদায় আবার সচল হলো খচ্চর, আমার পাশ ঘেঁষে চলে গেলো। অসহায়ের মতো কাঁধ ঝাঁকিয়ে ওদের পানে চেয়ে রইলাম যতক্ষণ না দৃষ্টিসীমার আড়াল হলো। কেউ না চাইলে তো আর সাহায্য করা সম্ভব নয়।

শেষ বিকেলে জলাভূমির ধারে এসে পৌঁছলাম। প্যাপিরাসের ঝোঁপ এতো ঘন এখানে, কোনো মতেই ছোট্ট আস্তানাটা সনাক্ত সম্ভব নয়। আর তাছাড়া, ওটার ছাদও প্যাপিরাসের কাণ্ড দিয়ে তৈরি একেবারে নিখুঁত আড়াল। এক পাথর থেকে আরেক পাথরে লাফিয়ে চললাম আমি, দ্রুতই চলে এলাম জলের ধারে। নীল নদের থেকে এতো দূরে তেমন একটা তারতম্য হয় নি জলের স্তরে। বন্যার কোনো আলামত নেই।

পুরোনো সেই নৌকাটা এখনও বাঁধা রয়েছে তীরে। অর্ধ-নিমগ্ন হয়ে আছে পানিতে, বেশ কিছুক্ষণ কসরৎ করে টেনে আনতে হলো। প্যাপিরাসের সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে পথ করে এগুতে লাগলাম । জলের শেষ মাথায়, শুকনো এক টুকরো মাটির উপর রয়েছে একটা কুঁড়ে। কিন্তু এখন পানিতে ভেসে গেছে জমিন, এক মাথা সমান পানি ওখানে।

আমি যে নৌকায় চড়ে এসেছি, ঠিক একই রকম একটা নৌকা ভেড়ানো কুঁড়ের গায়ে। ওটার পাশে ভিড়িয়ে, ক্যাঁচ-কোঁচ করতে থাকা কঙ্কালসার মই বেয়ে উঠে এলাম ভেতরে। একটাই মাত্র ঘর, মাথার উপরের পাতার আচ্ছাদনের ফাঁক-ফোকর গলে সূর্যরশ্মি প্রবেশ করছে। আমাদের এই উচ্চ-মিশরে বৃষ্টি হয় না বললেই চলে, কাজেই পাতার আচ্ছাদনেই কাজ চলে যায়।

প্রথম যেদিন আমি আর ট্যানাস খুঁজে পেয়েছিলাম এই পরিত্যক্ত কুঁড়েটা আজ তার অবস্থা ঠিক সেই দিনের মতোই অবিন্যস্ত। কাপড়-চোপড়, অস্ত্র, খাবার পাত্র সব এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। বাতাসে ভুরভুর করছে মদের গন্ধ।

ঘরের শেষ মাথায় ভয়ঙ্কর নোংরা একটা চাদরের উপর পরে আছে ততোধিক নোংরা দুটো দেহ। ময়লা মেঝেতে সাবধানে পা ফেললাম, বুঝতে চাইছি ওই দুটো বেঁচে আছে কি না। ঠিক তখনই গুঙ্গিয়ে উঠে পাশ ফিরলো মেয়েটা। অল্প-বয়স্ক, একেবারে ন্যাংটো শরীরে আদিম আহ্বান। গোলাকার বুক দুটো বেশ বড়ো, তল পেটের গোড়ায় বাদামী কোঁকড়া চুল । কিন্তু, এমনকি ঘুমের ভেতরেও তার মুখের সস্তা ভাব প্রকাশ্য। কোনো সন্দেহ নেই, ওটাকে জলের ধারের ছাপড়া থেকে নিয়ে এসেছে ট্যানাস।

ওকে সবসময় রক্ষণশীল বলেই জানতাম, কখনোই পান করে মাতাল হতে দেখি নি। কিন্তু এই সস্তা চিড়িয়া এবং দেওয়াল ঘেঁষে পড়ে থাকা মদের বোতলগুলো ভিন্ন। কথা বলছে। ট্যানাসের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হতে হলো। এ আমার পরিচিত মানুষটির মুখ নয়। সুরার প্রভাবে লাল, ফোলা-ফোলা মুখ, দাড়ি-গোফের জঙ্গল সেখানে। নির্ঘাত হারেমের বাইরে শেষ যেবার দেখেছিলাম, এর পরে আর খৌরি করা হয় নি।

ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে মেয়েটা। আমার উপস্থিতি টের পেতেই বিড়ালের মতো এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে ঝোলানো খাপ থেকে ছোরা হাতে নেয় সে। তড়িৎ গতিতে ওর হাত থেকে ওটা ছিনিয়ে নিলাম আমি, নগ্ন ডগা তাক করলাম পেট বরাবর।

ভাগো, শান্তস্বরে নির্দেশ দিলাম। আমি পেট ফেঁড়ে ফেলার আগেই ভাগো এখান থেকে!

রক্তচক্ষুতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে দ্রুত কাপড় পরে নেয় মেয়েটা।

ও কোনো পয়সা দেয় নি আমাকে, কাপড় পরা শেষ হতে জানালো সে।

কোনো সন্দেহ নেই, এর মধ্যেই যা প্রাপ্য পেয়ে গেছো তুমি, বলে ছোরার ফলা দিয়ে দরোজার দিকে ইশারা করলাম।

ও বলেছিলো, পাঁচটি স্বর্ণের আংটি দেবে আমাকে, নাকী সুরে প্রায় কেঁদে ফেললো সে। গত বিশ দিনে অনেক খেটেছি। সবকিছু করতে হয়েছে–ঘর ধোয়া মোছা, রান্না করা, ওর নোংরা পরিষ্কার করা। আমার মজুরি দিতেই হবে। না দিলে–

চুলের গোছা ধরে হিড়হিড় করে টেনে দরোজার বাইরে নিয়ে গেলাম ওটাকে। ধরে বসিয়ে দিলাম একটা নৌকায় । আমার থেকে ছাড়া পেতেই এমন অশ্রাব্য গালি গালাজ আরম্ভ করলো সে, ভীত হয়ে চারপাশের নলখাগড়ার জঙ্গল থেকে উড়ে গেলো পাখির দল।

ফিরে এসে দেখি তখনো ঘুমন্ত ট্যানাস। মদের পাত্রগুলো পরীক্ষা করে দেখলাম বেশিরভাগই খালি, কেবল দুটো-তিনটে পাত্র পূর্ণ । নির্ঘাত ওই মেয়েটাকে কারনাকে পাঠিয়ে কারো মাধ্যমে এগুলো সংগ্রহ করেছিলো সে। নীল কুমির বাহিনীর সবাইকে পুরো এক মাস মাতাল করে রাখার মতো যথেষ্ট পরিমাণ আছে এখানে।

ট্যানাসের বিছানার পাশে ভাবতে বসলাম। বেচারা নিজেকে শেষ করে দিতে চাইছে, করুণায় ভরে গেলো আমার ভেতরটা। আমার কর্ত্রীর প্রতি ওর ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই, ওকে ছাড়া ট্যানাস আসলেই বেঁচে থাকতে চায় না। ট্যানাসের এহেন অধঃপতনে অবশ্যই মেজাজ চড়ে গেছে আমার, কিন্তু এখনো, এই মুহূর্তেও ওর মহৎ গুণাবলি আমার কাছে বেশি মূল্যবান। এমন তো নয়, কেবল ট্যানাস একাই ভুল করেছে। ঠিক যে কারণে নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছে সে, একই কারণে আমার কর্ত্রীও তো বিষপান করতে চেয়েছিলো। মনে মনে ওকে মাফ করে দিলাম আমি। এছাড়া আর কী-ই বা করতে পারতাম? আমার জীবনে অর্থবহ, মূল্যবান কিছু বলতে এই দু জন মানুষের ভালোবাসা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাজে লেগে পড়লাম।

ট্যানাসের গোড়ালি ধরে টেনে চললাম প্রথমটায়। গুঙ্গিয়ে উঠে গাল বকে চললো সে, কর্ণপাত না করে টেনে দরোজা দিয়ে পানিতে ফেলে দিলাম দেহটা। মাথা নিচু করে জলাভূমিতে পড়লো সে, এরপর তলিয়ে গেলো। অর্ধ-চেতন অবস্থায় আবার ভেসে উঠলো।

পাশে নেমে পড়ে চুলের মুঠি ধরে মুখটা চেপে ধরলাম পানির তলায়। কিছু সময়ের জন্যে দুর্বলভাবে বাধা দিলো সে, কিন্তু আমি ধরে রাখতে সক্ষম হলাম । দ্রুতই শক্তি ফিরে এলো ট্যানাসের দেহে, এক ঝাড়া খেয়ে শূন্যে নিক্ষিপ্ত হলাম আমি।

গর্জে উঠে আক্রমণ শানালো ট্যানাস। ওর এক ঘুষি জলহস্তিকে পর্যন্ত শেষ করে দিতে পারে, কোনো রকমে গা বাঁচিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকলাম আমি।

হাঁপাতে হাঁপাতে মইয়ের ধাপে বসলো সে, বন্য চুল থেকে পানি ঝরছে। পেটে বেশকিছু পানি গেছে, একটু উদ্বিগ্ন বোধ করলাম আমি ওর জন্যে। বেশকিছু পানি উগড়ে দিলো সে, সাথে পেটের মদও। পরিমাণ দেখে অবাক হতে হয়।

কুঁড়ের একটা ভিত্তিমূল ধরে অপেক্ষায় রইলাম আমি। আবারো বমি করছে ট্যানাস, কিছু সময় অপেক্ষা করে গলায় বিষ ঢেলে বললাম, আমার কর্ত্রী এখন তোমাকে দেখতে পেলে খুব খুশি হয়ে যেতো।

চোখ ছোটো করে আমার পানে চাইলো সে। টাইটা! নরকে যাও! আমাকে কি ডুবিয়ে মারতে চাইছিলে নাকি? মরে যেতাম তো!

যা অবস্থা এখন তোমার, কেবল মদ সাবাড় করা ছাড়া আর পারোটা কী? কী জঘন্য অবস্থা করেছো নিজের। ছিঃ!

ওকে মইয়ের ধাপে রেখে উপরে উঠে এলাম আমি। ধীরে ধীরে পরিষ্কার করতে লাগলাম জায়গাটা। বেশকিছু সময় পর লজ্জিত চেহারায় উঠে এলো ট্যানাস। ওকে উপেক্ষা করে কাজ করে যেতে লাগলাম। শেষমেষ ট্যানাসই নীরবতা ভাঙলো।

কেমন আছো, বুড়ো বন্ধু । খারাপ লেগেছে, তোমার জন্যে।

অন্যদেরও খারাপ লেগেছে তোমার জন্যে। ক্ৰাতাস তার মধ্যে একজন। নদীর ভাটিতে লড়াই করেছে পুরো বাহিনী। তোমার তলোয়ারের সাহায্য বড়ো প্রয়োজন ছিলো ওদের। আর, আমার কর্ত্রীর কথা না হয় নাই বললাম। প্রতি মুহূর্ত তোমার কথা স্মরণ করেছে সে, ওর ভালোবাসা নিখাদ। এই মাত্র যেনো বেশ্যাটাকে তোমার বিছানা থেকে তাড়ালামওটার কথা শুনলে ও কী ভাববে বলে মনে করো?

গুঙ্গিয়ে উঠে মাথা চেপে ধরে ট্যানাস। ওহ, টাইটা, তোমার কর্ত্রীর নামটাও মুখে এনো না! সহ্য করতে পারি না।

তো, আর এক বোতল মদ সাবাড় করো, নোংরার ভেতর মরো, রাগত স্বরে বললাম।

ওকে সারাজীবনের জন্যে হারিয়েছি আমি। কী করতে বলো তুমি আমাকে?

ঠিক ওর মতোই, বিশ্বাস এবং আস্থা রাখতে বলি।

করুণ চোখে আমার দিকে চাইলো ট্যানাস। ওর কথা বলো আমাকে। কেমন আছে ও, টাইটা? মনে করে আমাকে?

খুব কষ্টে আছে, দুঃখ ভরে বললাম আমি। তোমাকে ছাড়া আর কিছুই ভাবে । সেদিনের অপেক্ষায় আছে ও, যেদিন তোমরা দু জন এক হবে।

সেটা কোনোদিনও হবে না। ওকে হারিয়েছি আমি, বেঁচে থেকে আর কী লাভ?

খুব ভালো! কড়া স্বরে বললাম। তাহলে আমি আর এখানে সময় নষ্ট করছি না । আমি বরঞ্চ মিসট্রেসকে গিয়ে বলি, তার বার্তা শুনতে রাজী নও তুমি। ওকে ঠেলে সরিয়ে দরোজা গলে বেরিয়ে এলাম আমি । মই বেয়ে নেমে এলাম নৌকায় ।

দাঁড়াও, টাইটা! চেঁচিয়ে ডাকলো ট্যানাস। দাঁড়াও!

কী কারণে? তুমি তো মরতে চাও। তো, তাই করো। লোক পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা আমি করে দেবো খন। মমি করা হবে তোমার দেহ-চিন্তা করো না।

এহেন কথায় হেসে ফেললো ট্যানাস। ঠিক আছে। বোকার মতো কথা বলেছি আমি । মদ মাথা বিগড়ে দিয়েছিলো। ফিরে এসো, দয়া করে। লসট্রিস কী বার্তা পাঠিয়েছে?

নিতান্ত অনিচ্ছার ভঙ্গি করে মই বেয়ে উঠে এলাম আমি।

আমার কী তোমাকে জানাতে বলেছে তোমার প্রতি তার ভালোবাসা এখনও, এতো কিছু পরেও অক্ষুণ্ণ আছে। চিরজীবন সে শুধু তোমারই মেয়েমানুষ থাকবে ।

হোরাসের কসম-আমার লজ্জা হচ্ছে এখন, বিড়বিড় করলো ট্যানাস।

নোংরা বিছানার উপরে ঝোলানো খাপ থেকে তরবারি খুলে নিয়ে এক কোপে মদের পাত্রগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ট্যানাস। ঝর্ণার মতো ছিটকে বেরিয়ে দেওয়ালে লেপ্টে গেলো পানীয়। হাঁপাতে হাঁপাতে আমার দিকে ফিরলো সে। দ্যাখো, কি অবস্থা করেছো নিজের; বুড়ো পুরোহিতের মতো দুর্বল, বেতস লতার মতো নরম।

অনেক বলেছো, টাইটা! থামো এবারে। আর যদি একবার তামাশা করো, ভালো হবে না বলে দিলাম।

ঠিক আমার ইচ্ছে মতো, রেগে গেছে ট্যানাস। আমার বলা অপমানসূচক বাক্য বুকে বড়ো লেগেছে তার। আমার কর্ত্রীর ইচ্ছে, ফারাও তোমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা পালন করে নিজেকে সম্মানিত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করো। পাঁচ বছর পর তোমার কাছে যেনো চলে আসতে পারে সে।

ট্যানাসের পূর্ণ মনোযোগ পেলাম এই কথাতে। পাঁচ বছর? সেটা আবার কী? এই বিচ্ছেদের কি কোনো নির্দিষ্ট সময় আছে নাকি?

ফারাও-এর নির্দেশে ইন্দ্রজাল ব্যবহার করেছিলাম আমি। এখন থেকে পাঁচ বছর পরে মারা যাবেন তিনি। সাধাসিধাভাবে বললাম। একভাবে আমার পানে তাকিয়ে থাকলো ট্যানাস। ক্ষণে ক্ষণে বদলাচ্ছে মুখের রঙ। আমার রচিত যে কোনো স্কোলের মতোই ওকে পড়তে পারি আমি।

ইন্দ্রজাল! শেষমেষ ফিসফিস করে বলে সে। অনেক কাল আগে, জাদু-টোনা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করতো সে। কিন্তু এখন আমার কর্ত্রীর চেয়ে বরঞ্চ তার বিশ্বাস বেশি এগুলোতে। বহুবার আমার স্বপ্ন সত্যি হতে দেখেছে ট্যানাস।

ভালোবাসার জন্যে এতোটা সময় অপেক্ষা করতে পারবে? জানতে চাইলাম । আমার কর্ত্রী কসম কেটে বলেছে, তোমার জন্যে প্রয়োজনে সারাজীবন অপেক্ষা করে থাকতে পারবে সে। তুমি কি পারবে, অল্প কিছু সময় ধৈৰ্য্য ধরতে?

সে বলেছে, অপেক্ষা করবে আমার জন্যে? ট্যানাস জানতে চায়।

আজীবন, উত্তরে বললাম। মনে হলো, ট্যানাস হয়তো কেঁদে ফেলবে। সেটা সহ্য করা মুশকিল হবে ট্যানাসের মতো একজন মানুষ কাঁদছে–এটা আমি দেখতে পারবো না। তাই তাড়াতাড়ি বলে চললাম, ইন্দ্রজালে কী দেখতে পেয়েছি জানতে চাইলে না?

কান্না গিলে ফেলে ট্যানাস। হা, হ্যাঁ! সোৎসাহে মাথা নাড়ে সে। রাত নামা পর্যন্ত কথা বলে চললাম আমরা।

সবকিছু খুলে বললাম আমি ওকে যেগুলো এতোদিন লুকিয়ে এসেছি ওদের দু জনের কাছ থেকে। কেমন করে পিয়াংকি, প্রভু হেরাবকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিলো; ইনটেফ কেমন করে তাকে মেরেছেন–এ সমস্ত শুনে এতোটাই উত্তেজিত হয়ে পড়লো ট্যানাস, মদের শেষ প্রভাবও দূর হয়ে গেলো ওর মাথা থেকে। সকাল হতে হতে আগের মতোই শক্ত, কঠোর মানুষটা ফিরে এলো ট্যানাসের মাঝে।

তাহলে, তোমার পরিকল্পনা মতোই কাজে লেগে পড়ি চলো মনে হচ্ছে, সেটাই একমাত্র উপায়। ঝট করে দাঁড়িয়ে তলোয়ার খাপে ভরে ফেলে ট্যানাস। আমি অবশ্য চাইছিলাম আরো কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে মদের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত হোক সে, কিন্তু ট্যানাস শুনতেই চাইলো না।

এই মুহূর্তে কারানাকে ফিরে চলো! জোর গলায় বললো সে। ক্ৰাতাস অপেক্ষা করছে বাবার মৃত্যুর বদলা নিতে হবে। আমার মিষ্টি পাখি লসট্রিসকে দেখার জন্যে আর তর সইছে না!

*

জলাভূমি ছেড়ে আসতে পাথুরে হাঁটা পথ ধরে আগে আগে চললো ট্যানাস। ওর সাথে থাকার জন্যে রীতিমতো দৌড়াতে হলো আমাকে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে গরম যেনো ঝাঁপিয়ে পড়লো, ঘামের স্রোতধারা গলগল করে বেয়ে জমা হতে লাগলো কোমড়ের কাছে। ট্যানাসকে দেখে মনে হলো যেনো পুরোনো মদের ভাড়ার উপচে পড়ছে ওর দেহ থেকে। জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে, কিন্তু বিরতি বা থামার কোনো লক্ষণ দেখা গেলো না তার মাঝে। মরুর প্রচণ্ড গরমে একটানা হেঁটে চললো সে।

হঠাৎ চিৎকার করে ওকে থামালাম আমি। সামনে তাকিয়ে আছি দু জনেই। পাখির ঝাঁক উড়ছে আকাশে, দূর থেকে ওটাই আমার দৃষ্টি কেড়েছে।

শকুন, কর্কশ স্বরে বললো ট্যানাস। কিছু একটা মরে পরে আছে ওখানটায়। খাপ থেকে তলোয়ার খুলে নেয় সে, সাবধানে সামনে এগিয়ে চললাম আমরা।

প্রথমে পুরুষ মানুষটাকে খুঁজে পেলাম। শকুনগুলো উড়ে যেতে মাথার লালচে সোনালি চুল দেখে চিনতে পারলাম আমি সেই স্বামী ভদ্রলোক, আসার পথে যার সাথে দেখা হয়েছিলো। চেহারা আর চেনার যো নেই, ঠুকরে ঠুকরে খেয়ে ফেলেছে শকুনের দল। শূন্য কোটর তাকিয়ে আছে আকাশ পানে। ঠোঁট-মাংস বিহীন দাঁতে ব্যঙ্গ হাসি হাসছে যেনো। ট্যানাস দেহটা চিৎ করতে পেটের ছোরার আঘাত নজরে এলো। কমপক্ষে বারো বার আঘাত করা হয়েছিলো তাকে।

যে-ই করে থাকুক এ কাজ–নিশ্চিত করে গেছে। সৈনিকের দৃঢ়তায় মৃত্যুকে সহজভাবে নিলো ট্যানাস।

পাথরের মাঝে হেঁটে চললাম আমি, কিছু সময়ের মধ্যেই কালো, ভনভনে মাছির মেঘ দেখে স্ত্রী লোকটির মৃতদেহ আবিষ্কার করলাম। সম্ভবত, ওরা যখন আমোদ করছিলো মেয়েটাকে নিয়ে, বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গেছিলো তার। নির্ঘাত এর পরও কিছু সময় বেঁচে ছিলো সে। ওই টুকু সময়ের মধ্যেই মৃত বাচ্চাটাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলো মেয়েটা। ওই ভাবেই মরেছে সে, বোল্ডারে হেলান দেওয়া অবস্থায়, দুই হাতে মৃত-বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ধরে।

ভাঙা পথ ধরে আরো সামনে এগিয়ে গেলাম। আবারো মাছির দল খোঁজ দিলো বাচ্চা মেয়েটার দেহের। সবাই ভোগ করার পর গলা কাটা হয়েছে এর। একটা মাছি এসে বসলো আমার ঠোঁটে, হাত দিয়ে সরিয়ে দিলাম আমি । চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে এসেছে নিজের অজান্তেই।

ওদের চিনতে না কি? ট্যানাসের প্রশ্নের জবাবে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে কেশে গলা পরিষ্কার করলাম।

গতকাল রাস্তায় দেখা হয়েছিলো, আমি সাবধান করেছিলাম  কথা সরছে না মুখে। বড়ো করে একটা শ্বাস টেনে বললাম। একটা খচ্চর ছিলো সাথে। মনে হয়, শ্ৰাইকেরা নিয়ে গেছে ওটা।

সায় দেয় ট্যানাস। ফিরে দাঁড়িয়ে পাথরের মাঝে পথ খুঁজতে আরম্ভ করে।

এই পথে আসো! চিৎকার করে ডেকে পাথুরে মরুর উপর দিয়ে দৌড়াতে শুরু করে সে।

ট্যানাস! বৃথাই পেছন থেকে ডাকলাম। ক্ৰাতাস অপেক্ষায় আছে  আমার কথা শুনলোই না সে, অগত্যা আমিও ছুটলাম পিছুপিছু। যেখানে এসে খচ্চরের চিহ্ন হারিয়ে গেছে, সেখানটায় পেলাম ওকে।

তোমার চেয়ে পরিবারটির প্রতি আমার অনুভূতি বেশি, ওকে বোঝাতে চাইলাম। কিন্তু এ সবের কোনো মানে নেই। ক্ৰাতাস বসে আছে, আমাদের হাতে সময় নেই

সাথে সাথে থামিয়ে দেয় ট্যানাস। কতো হবে মেয়েটার বয়স? নয় বছর? এর একটা শোধ আমি নেবোই! ঠাণ্ডা, কঠোর তার মুখাবয়ব। কথা না বাড়িয়ে আগে চললাম আমরা।

ট্যানাস এবং আমি মিলে কেবল গ্যাজেল আর ওরিক্স নয়; সিংহের পেছনেও ছুটেছি। দল বেঁধে কাজ শুরু করলাম, আকার-ইঙ্গিতে কথা বলছি, কোনো বাঁক বা চড়াই-এ এসে সাহায্য করছি পরস্পরকে। অল্পক্ষণের মধ্যেই কর্কশ একটা জমিনে চলে এলাম, নদী থেকে পুবে মরুর আরো গভীরে চলে গেছে। সেই পথেই গিয়েছে আমাদের শিকার কাজ আরো সহজ হয়ে গেলো আমাদের জন্যে।

প্রায় দুপুর হয়ে এলো, আমাদের পানির বোতলও একেবারে শূন্য ঠিক তখনই বদমাশগুলোর দেখা পেলাম আমরা। পাঁচজন তারা খচ্চরটা আছে সাথে। একেবারেই অসতর্ক, আশা করে নি এতো গভীর মরুতে কেউ অনুসরণ করে আসবে তাদের। এমনকি, নিজেদের ফেলে আসা চিহ্ন পর্যন্ত আড়াল করে নি।

আমাকে টেনে একটা বড়ো পাথর খণ্ডের আড়ালে নিয়ে যায় ট্যানাস। জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে দু জনেরই। ঘোরাপথে ওদের সামনে চলে যাবো আমরা। চেহারা দেখতে চাই সব কটার। শ্বাসের শব্দের সাথে বলে ট্যানাস।

লাফিয়ে, বেশ ঘোরাপথে রওনা হলাম। শ্রাইকদের দৃষ্টিসীমার বাইরে দিয়ে ওদের বেশ খানিকটা সামনে চলে এলাম। এরপর তাদের মাথার উপরে এসে থামলাম। জাত-সৈনিক ট্যানাস, সঠিক জায়গাতেই ওত পেতেছে।

খচ্চরের খুরের শব্দ, হাসি-তামাশার আওয়াজ দূর থেকেই পাওয়া গেলো। অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে ভাবলাম, কতোটা বোকার মতো হলো এদের ধাওয়া করাটা। সামনের দলটা ধীরে দৃষ্টিগোচর হলো জীবনে এর চেয়ে বর্বর, নোংরা, আক্রমণাত্মক কাউকে দেখিনি। অথচ আমার সম্বল বলতে কেবল সেই ছুরিটা।

আমাদের অবস্থান থেকে একটু দূরত্বে দাঁড়ি-অলা বেদুঈন সর্দার আচমকা থেমে দাঁড়ালো। পেছনের কাউকে খচ্চরের পিঠ থেকে পানির থলে নামানোর নির্দেশ দিচ্ছে। প্রথমে সে পান করলো, এরপরে হাতে হাতে ঘুরতে লাগলো পানির থলে। তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাবে যেনো আমার।

হে হোরাস! দ্যাখো, এখনো মেয়েটার রক্ত লেগে আছে কাপড়ের সামনে। যদি লানাটা থাকতো এখন আমার সঙ্গে! ফিসফিস করে বললো ট্যানাস। ব্যাটার পেট ফুটো করে ওর পানি বের করে নিতাম। এরপর আমার কাঁধে হাত রাখে সে। আমি নড়া পর্যন্ত স্থির থাকো। কোনো ধরনের বীরোচিত কাজ যেনো না করতে দেখি। মাথা নেড়ে সায় জানালাম।

ঠিক যেখানে আছি আমরা, সেই দিকে আসতে লাগলো শ্রাইকের দল। অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত। সামনে হাঁটছে বেদুঈন সর্দার। মাথার আচ্ছাদনের কারণে আমাদের দেখতে পাচ্ছে না সে। তার পেছন পেছন আসা দুজনের মধ্যে একজন খচরটার দড়ি ধরে টেনে আনছে। জানোয়ারটার পেছনে বাকি দুজন নিহত মহিলার গা থেকে নেওয়া স্বর্ণের অলঙ্কারে পূর্ণ মনোযোগ। শেষ দুজনের হাতের বর্শা ছাড়া সব অস্ত্র খাপবন্দী।

সবাই এগিয়ে যেতে নিঃশব্দে। পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকে ট্যানাস। ওর পদক্ষেপে কোনো শব্দ হচ্ছিলো না। ক্ষিপ্র চিতার মতো দ্রুততায় তলোয়ার বের করে সবচেয়ে পেছনের জনের ঘাড় বরাবর আঘাত হানলো ট্যানাস।

ওকে সাহায্য করার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নিজের জায়গায় রইলাম ট্যানাসের নির্দেশের কথা মনে পড়ে গেছে। আসলে, আমি ওখানে গেলে সাহায্যের চেয়ে বরঞ্চ অসুবিধা ওর তলোয়ার চালনায়। এর আগে নরহত্যা করতে দেখি নি আমি, ট্যানাসকে। জানতাম, এটা তার কাজের মধ্যে পরে, কিন্তু এতো স্বাভাবিক হিংস্রতায়, নিপুণ কৌশলে কাজটা করলো সে অবাক হয়ে গেলাম। ঠিক মরুর গর্ত থেকে লাফিয়ে ওঠা খরগোশের মতো কাটা মুণ্ডুটা নিক্ষিপ্ত হলো, একপাশ থেকে আবার আঘাত হানলো ট্যানাস। দ্বিতীয় বর্বর এবারে তার শিকার। প্রথমটির মতোই নিখুঁতভাবে ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হলো এর মাথা; ঝর্ণাধারার মতো আকাশের দিকে ছুটলো রক্তের ধারা।

রক্তপাত এবং কাটা মাথার পতনের ধপধপ আওয়াজে সতর্ক হলো বাকি দস্যুরা। চট করে ঘুরে দাঁড়িয়েই জায়গায় জমে গেলো তারা নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে পারছে না, কী ঘটেছে তাদের পেছনে। এরপরেই, বুনো চিৎকার দিয়ে উঠে নাঙ্গা অস্ত্র-সমেত ট্যানাসের উদ্দেশ্যে ছুটে আসতে শুরু করলো শ্রাইকের দল। পালানোর বদলে সোজা ওদের দিকে ধেয়ে গেলো ট্যানাস। ছত্রভঙ্গ করে ফেললো দস্যু-দলটাকে। সঙ্গীদের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া বর্বকে এবারে ধরলো ও, ভীষণ এক কোপে বুকের মাংস ফালি হয়ে ঝুলতে লাগলো শয়তানটার। চিৎকার করে বুক চেপে ধরে পেছালো সে। কিন্তু তার উপরে আবারো চড়াও হওয়ার আগেই বাকিরা ঝাঁপিয়ে পড়লো ট্যানাসের উপর। নিজের তলোয়ার দিয়ে মারণ-আঘাতগুলো প্রতিহত করছে ট্যানাস; তামার সাথে তামার ঘর্ষণে ঝনঝন শব্দ উঠছে। একজন একজন করে পেছাতে শুরু করলো বর্বর দুটো। ওদিকে, পেছন থেকে নিজেকে সামলে নিয়ে আক্রমণ শানালো আহত শ্ৰাইক।

পেছনে! চিৎকার করে ওর উদ্দেশ্যে বললাম। ঠিক সময় মতো ফিরে তলোয়ারের ফলায় আঘাত ঠেকালো ট্যানাস। সাথে সাথে বাকি দুজনে ঝাঁপিয়ে পড়লো ওর উপর। চারপাশ থেকে এহেন আক্রমণে বাধ্য হয়ে পিছিয়ে গেলো ট্যানাস। শ্বাসরুদ্ধকর তলোয়ারবাজীর প্রদর্শনী চলছে যেনো। এতো দ্রুত চলছে ট্যানাসের তলোয়ার, মনে হলো যেনো নিজের চারপাশে ধাতব একটা দেওয়াল তৈরি করেছে সে। শ্রাইকদের অবিশ্রান্ত আঘাত বাধা পাচ্ছে সেই দেওয়ালে ।

এতক্ষণে দুর্বল হয়ে পড়েছে ট্যানাস। গরমে, ক্লান্তিতে হাঁপাচ্ছে হাতের কাজও ধীর হয়ে আসছে ক্রমশ। গত কয়েক সপ্তাহের মদ্য-পান এবং ব্যভিচার এতক্ষণে তার মাশুল দাবি করেছে। বেদুঈন সর্দারের এক আঘাত ঠেকাতে গিয়ে মাটিতে পড়ে গেলো

সে, পাথরে পিঠ দিয়ে মরিয়া হয়ে লড়ে চললো। আমার বসার স্থান থেকে বিপরীত দিকের বোল্ডারে পিঠ রেখে এখন শেষ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে নিজেকে রক্ষা করার। এবারে বর্বরগুলো সবাই তার সামনে। তাদের আঘাত অবিরত ধেয়ে যাচ্ছে ট্যানাসের উদ্দেশ্যে। ধীর, দুর্বল প্রচেষ্টায় বুনো কুকুরগুলোর আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করে চলেছে ও।

প্রথম নিহত শ্রাইকের বর্শাটা পড়ে আছে পথের ঠিক মাঝখানে। ট্যানাসের মরণ ঠেকাতে হলে এখনই কিছু করতে হবে আমাকে। আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এলাম আমি, নিজেদের উন্মত্ততায় আমার কথা বেমালুম ভুলে গেছে বর্বরের দল। সবার অলক্ষ্যে বর্শাটা হাতে নিয়ে নিলাম, একটু একটু করে বুকে সাহস ফিরে আসছে।

বেদুঈন-সর্দার ব্যাটা সবচেয়ে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্যানাসের জন্যে, আমার সবচেয়ে কাছেও সে-ই আছে। আমার দিকে পেছন ফিরে ট্যানাসের রক্ত-পানের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে একেবারে । বর্শা উঁচিয়ে ধেয়ে গেলাম আমি।

মানবদেহের পেছন দিকে সবচেয়ে নাজুক অঙ্গ হলো বৃক্ক । চিকিৎসাবিদ্যায় আমার জ্ঞানের বদৌলতে নিখুঁতভাবে নিশানা করতে সক্ষম হলাম। আঙ্গুলের সমান বর্শার ডগাটা পুরো সেধিয়ে গেলো মেরুদণ্ডের একপাশে। ঠিক শল্যবিদের দক্ষতায় বর্শার ডগায় বিধিয়ে ফেললাম একটা বৃক্ক। নিমিষে জায়গায় জমে গেলো বেদুঈন মন্দিরের মূর্তি যেনো। বর্শাটা মুচড়ে দিতে এমন আর্তনাদ করে উঠে হাতের তলোয়ার ফেলে দিলো সে, চমকে গেলো দুই সঙ্গী। ক্ষণিকের এই অমনোযোগিতাই প্রয়োজন ছিলো ট্যানাসের। প্রচণ্ড এক আঘাতে দুই কাঁধের মাঝখান দিয়ে তলোয়ারের ফলা সেধিয়ে দিলো সে, সামনের শয়তানটার বুকে। কিন্তু আটকে গেলো তার অস্ত্রের ফলা, যতক্ষণে ওটা টেনে বের করলো ট্যানাস শেষ বর্বর ততক্ষণে জীবন বাজী রেখে ছুটতে শুরু করেছে। কিছু সময় ধাওয়া করে ক্ষান্ত দেয় ট্যানাস দারুন হাঁপাচ্ছে সে। আমি শেষটাইটা–বদমাশটাকে যেতে দিওনা!

দৌড়ে আমাকে হারায়, এমন লোক কমই আছে। আমার জানামতে, এক ট্যানাসের পক্ষে সেটা সম্ভব; তারপরেও নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই করতে হবে তাকে সেটা হতে হলে। নিহত বেদুঈনের পিঠে পা রেখে বর্শাটা টেনে মুক্ত করলাম আমি, এরপরে শেষ শয়তানটার পিছনে ছুটতে লাগলাম।

দুইশ গজও যেতে পারার আগেই তাকে ধরে ফেললাম আমি, এতো হালকা পদক্ষেপে ছুটেছি ব্যাটা টেরই পায় নি, কেউ আছে পেছনে। বর্শার এক খোঁচায় পায়ের রগ কেটে ফেলতে পড়ে গেলো বদমাশটা। হাত থেকে ছুটে গেছে তলোয়ার । মাটিতে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে থেকে কাঁদতে লাগলো সে, বর্শার খোঁচায় তাকে জর্জরিত করতে লাগলাম।

কোন মেয়েটাকে নিয়ে বেশি মজা করেছো, হে? উরুতে এক খোঁচা লাগিয়ে জানতে চাইলাম, মা, বিশাল পেটসহ নাকি ছোটো মেয়েটা? ওটা বেশি আঁটোসাটো ছিলো, তাই না?

মাপ করো! চেঁচাতে লাগলো বর্বরটা। আমি কিছু করি নি, বাকিরা মজা লুটেছে।

তোর কাপড়ের সামনে তাহলে রক্ত কেননা রে, বললাম তাকে। হালকাভাবে বর্শাটা বেঁধালাম ব্যাটার পেটে। এখন যেমন করে চেঁচাচ্ছিস, বাচ্চা মেয়েটা কি এমন করেই আর্তনাদ করেছিলো?

কুঁজো হয়ে কুণ্ডলি পাকাতে মেরুদণ্ডের পাশে সেধিয়ে দিলাম বর্শার ডগা, মুহূর্তেই পা থেকে নিচ পর্যন্ত অবশ হয়ে গেলো শয়তানটার। ওর দিকে পিছন ফিরে রওনা হলাম আমি।

ঠিক আছে, মারলাম না তোকে। এটা ভালো হলো– পড়ে থাক এখানে।

ট্যানাসের কাছে ফিরে চললাম। দুই হাতে হিঁচড়ে কিছু সময় এগোলো বর্বরটা, পা দুটো মরা সাপের মতো হেঁচরাচ্ছে মাটিতে। এরপর ক্লান্তিতে মুষড়ে পড়লো সে। প্রখর দাবদাহে রাত নামার আগেই মরবে শয়তানটা কোনো সন্দেহ নেই।

ফিরে আসতে, অবাক চোখে আমার দিকে চাইলো ট্যানাস। তোমার মধ্যেও বুনো একটা লোক বাস করে ব্যাপারটা আগে বুঝি নি। অবাক বিস্ময়ে মাথা নাড়লো সে। সব সময় চমকে দাও, টাইটা।

খচ্চরটার পিঠ থেকে পানির থলে নামিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলো ট্যানাস, কিন্তু মাথা নেড়ে বাধা দিলাম আমি। তোমার বেশি প্রয়োজন ওটা। বললাম তাকে।

চোখ বন্ধ করে পানি পান করলো সে, বেশ কিছুক্ষণ কাশলো বিষম খেয়ে। আইসিস-এর মিষ্টি শ্বাসের কসম–তুমি ঠিক বলেছো। একেবারে মেয়েমানুষের মতো নরম হয়ে গেছি। সামান্য একটু তলোয়ার খেলা প্রায় শেষ করে দিতে বসেছিলো আমাকে। এরপর চারপাশের দেহগুলোর দিকে তাকিয়ে হাসলো ট্যানাস। কিন্তু যাই বলো, ফারাও-এর শ্রাইক-নিধন অভিযানের শুরুটা কিন্তু মন্দ হলো না!

বিশ্রী আরম্ভ, উল্টো কথা বললাম আমি। আমার উদ্দেশ্যে ভুড় উঁচাতে বলে চললাম, আমাদের উচিত ছিলো, অন্তত একটাকে বাঁচিয়ে রেখে শ্রাইকদের আস্তানার খোঁজ জেনে নেওয়া। এমনকি ওই বদমাশটাও হাত উঁচিয়ে আমার ফেলে-আসা পথের দিকে ইঙ্গিত করলাম, এখন আর কোনো কাজে আসবে না। এরকম ভুল আর করা চলবে না।

নিহত পরিবারটির মৃতদেহ যেখানে রেখে এসেছি সেখানে ফিরে চললাম আমরা। পুরুষ লোকটির মৃতদেহ ততক্ষণে দারুন পঁচা গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। খুব কম মাংসই অবশিষ্ট রেখেছে শকুনের দল।

ওর চুলগুলো দ্যাখো, ট্যানাসকে বললাম। এ রকম চুল আর কার আছে, জানো? কিছু সময়ের জন্যে থমকালো ট্যানাস, এরপরে চওড়া হেসে নিজের মাথার ঘন চুলের অরণ্যে হাত চালালো।

খচ্চরের পিঠে লাশটা উঠাতে হবে–এসো, হাত লাগাও আমার সাথে, বললাম ওকে। কারনাকে ওটা নিয়ে যাবে ক্ৰাতাস-মমি করতে হবে। সুন্দর একটা সমাধি আর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করবো আমরা তোমার নামে। আগামীকালে সূর্যাস্তের আগেই সমস্ত থিবেস জানবে, ট্যানাস–প্রভু হেরাব মরুতে মারা গেছেন; শকুনে অর্ধেক ছিঁড়ে খেয়েছে তাঁর দেহ।

কিন্তু যদি লসট্রিস এই সংবাদ পায়- উদ্বিগ্ন দেখালো ট্যানাসকে।

ওকে সতর্ক করে দিয়ে একটা চিঠি পাঠিয়ে দেবো আমি। তোমার মৃত্যু-সংবাদে যে সুবিধাটুকু পাওয়া যাবে তার জন্যে আমার কর্ত্রীর একটু দুশ্চিন্তা না-হয় হলোই বা।

*

লোহিতসাগর অভিমুখী ক্যারাভান-চলা পথের উপর অবস্থিত প্রথম মরুদ্যানে আমাদের অপেক্ষায় ছিলো ক্ৰাতাস, কারনাক থেকে এক দিনের মতো হাঁটা-পথ দূরত্বে। নীল কুমির বাহিনীর বাছাই করা একশ যোদ্ধা রয়েছে তার সাথে, আমার নির্দেশমতো সতর্কভাবে বাছাই করা হয়েছে এদের। মধ্যরাতে ক্যাম্পে পৌঁছলাম আমি। এবং ট্যানাস। যাত্রার ধকলে আমরা দুজনেই দারুন ক্লান্ত। আগুনের ধারে শুয়ে মরার মতো ঘুমালাম সকাল পর্যন্ত।

সূর্যোদয়ের সাথে সাথে নিজের বাহিনীর সঙ্গে পরিকল্পনায় মত্ত হলো ট্যানাস। ওকে ফিরে পেয়ে ওদের মধ্যকার আনন্দ যেনো বাধ মানলো না, খুশিতে একে অপরের সাথে কোলাকুলি করলো তারা। প্রত্যেকের নাম ধরে ডেকে কুশল জানতে চাইলো ট্যানাসও।

নাস্তার পরে ক্রাতাসকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে ট্যানাস জানালো, অর্ধ-গলিত মরদেহটা কারনাকে নিয়ে সমাধিস্থ করতে এবং সমগ্র থিবেসে জানিয়ে দিতে মহান ট্যানাসের মৃত্যু ঘটেছে। আমার কত্ৰী, লসট্রিসের জন্যে একটা চিঠি দিয়ে দিলাম আমি, কাতাসের কাছে। নির্ভরযোগ্য একজন বার্তাবাহকের মাধ্যমে নদীর উজানে, গজ-দ্বীপে ওটা পাঠানোর ব্যবস্থা করবে বলে কথা দিলো সে।

ক্রাতাসের পছন্দ করা দশ জন সৈনিক এবং গলিত মরদেহ সমেত খচ্চর নিয়ে নীল নদের তীরে, থিবেসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলো সে।

সমুদ্রগামী পথ ধরে আমাদের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করো, যদি ওখানে গিয়ে না পাও–তবে জেবেল-নাগারা মরুদ্যানে আমাদের ক্যাম্প পাবে। ওখানে তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করবো আমরা, পিছন থেকে চিৎকার করে ক্ৰাতাসকে জানালো ট্যানাস, আর, অবশ্যই আমার ধনুক লানাটানিয়ে এসো!

*

ক্ৰাতাস চোখের আড়াল হতেই বাহিনীর বাকি সদস্যদের একত্র করে বিপরীত দিকের সমুদ্র অভিমুখী ক্যারাভান চলাচলের পথ ধরে রওনা হলো ট্যানাস।

নীল নদের তীর থেকে লোহিতসাগর অভিমুখে চলা রাস্তাটি দারুন দীর্ঘ এবং বন্ধুর। বিশাল ক্যারাভানে করে যেতেও বিশ দিনের মতো সময় লেগে যায় । দিন-রাত দৌড়ে চললাম আমরা, চারদিনে পাড়ি দিলাম এই দূরত্ব। যাত্রার শুরুতে আমাদের দুজনের কেউই ঠিক সুস্থ অবস্থায় ছিলাম বলা যাবে না, কিন্তু যতক্ষণে জেবেল-নাগারা মরুদ্যানে পৌঁছুলাম আমরা শরীরের শেষ মেদটুক পর্যন্ত ঝড়িয়ে ফেলেছে ট্যানাস, সুরার প্রভাব আর অবশিষ্ট নেই ওর মাঝে। কঠোর, পাতলা হয়ে গেছে ও। প্রচণ্ড কষ্ট হলেও আত্মসম্মান বজায় রাখার খাতিরে সৈনিকদের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটেছি আমিও। যাত্রাপথে নীল নদের উদ্দেশ্যে চলা দুটো বড়ো ক্যারাভোনের সাথে দেখা হলো। দুনিয়ার মাল সামানে বোঝাই খচ্চরগুলোর শীর্ণ পা বাকা হয়ে গেছে বোঝার ভারে; বণিক কিংবা তাদের সাহায্যকারীর চেয়ে সশস্ত্র পাহারাদারের সংখ্যা অনেক বেশি। শ্রাইকদের মোটা অংকের উপঢৌকন না দিতে চাইলে এমন সশস্ত্র পাহাড়া ছাড়া কোনো গতান্তর নেই।

আগন্তুক কারো সঙ্গে দেখা হলেই শাল দিয়ে নিজের মুখ আড়াল করে ফেললো ট্যানাস, সোনালি চুলগুলোও এতে করে ঢাকা পড়লো। এতোই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দৈহিক অবয়বের মানুষ সে, যে কেউ একবার দেখলে চিনে ফেলতে পারে। অন্যান্য পথিকের শুভেচ্ছা বা প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে পথ চলেছি আমরা–এমনকি কারো পানে সরাসরি তাকাই নি পর্যন্ত।

সমুদ্র তীর থেকে এক দিনের মতো দূরত্বে থাকতে ক্যারাভান রাস্তা ছেড়ে পুরোনো একটা পায়ে হাঁটা পথ ধরে দক্ষিণে চললাম আমরা। বহুকাল আগে এক বেদুঈন বন্ধু পথটা চিনিয়েছিলো আমাকে। এই পুরোনো, সমুদ্রমুখী পথেই রয়েছে জেবেল-নাগারা কুয়ো । বেদুইন বা মরুর দস্যু ছাড়া আর কেউ এখন ব্যবহার করে না এটা।

শেষমেষ যখন জেবেল-নাগারার কুয়োর ধারে পৌঁছলাম, ততদিনে বেশ কষ্ট সহিষ্ণু হয়ে গেছি আমি নিজেও। রাতে, আগুনের পাশে মাঝে-মধ্যেই