খানিকটা ঝুঁকে সমস্ত মনোযোগ দিয়ে বলটাকে নাটালদের গোলের সীমানার দুইশ গজ দূরে ছুঁড়ে মারল শাসা।
টাইগার শার্ক নিজেও চমৎকার কাজ দেখাল। শাসা যেন ফুল শট পায় সে রকম দূরত্বে সরে এসে সাহায্য করল। প্লাম পুডিং নিজে থেকে এতটা বিচার বুদ্ধির পরিচয় দিতে পারত না। তবে খানিক গিয়েই থেমে গেল বল। এবারে দূরত্ব দেড়শ’ গজ, দুলে উঠল শাসার হৃদয়। বিজয় বুঝি তাদেরই হবে।
“হাহ!” আবারো তত দিল টাইগার শার্কের পেটে। কিন্তু ঠিক সে সময় নেমেসিস নিয়ে ম্যাক্সও চলে এল। সোজা শাসার দিকেই এগিয়ে আসছে ব্ল্যাক স্ট্যালিয়ন।
পরস্পরের সাথে সংঘর্ষ বাধার ঠিক আগমুহূর্তে খানিক সরে গেল শক্তিশালী টাইগার শার্ক আর নেমেসিস। ফলে এখন দু’জনের বিপরীত দিকে ছুটে যাচ্ছে শাসা আর ম্যাক্স। উত্তেজনায় চিৎকার করে দাঁড়িয়ে গেল সমস্ত দর্শক।
গত বছর এরকমই মুখোমুখি সংঘর্ষে এক ঘোড়সওয়ারকে মারা যেতে দেখেছে শাসা। অন্যজনের পা ভেঙে গিয়েছিল।
“আমার লাইন!” সামনের দিক থেকে তেড়ে আসা ম্যাক্সের উদ্দেশে চিৎকার করে উঠল শাসা।
“চুলায় যাও, কোর্টনি।”
পাল্টা শাসিয়ে গেল ম্যাক্স।
স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ম্যালকম ঠিকই টের পেলেন শাসার ভেতরকার পাগলামী। এটা কোনো সাধারণ সাহস নয়। একবার তিনি নিজে এরকম দুঃসাহস দেখিয়ে হাতে শুধুমাত্র একটা গ্রেনেড নিয়ে তেড়ে গেছেন নো ম্যানস ল্যান্ডের জার্মানদের বিরুদ্ধে।
ম্যাক্সের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে ইচ্ছে করেই সোজা এগিয়ে গেল শাসা। অখন্ড মনোযোগ দিয়ে দেখল বিশাল স্ট্যালিয়নের ভেজা নাক। এমনকি নেমেসিসের প্রত্যেকটা রক্তবাহী শিরা পর্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠল তার চোখের সামনে, মুখ উঠিয়ে তাকালো ম্যাক্সের দিকে। ক্রোধে ধকধক করছে নাটাল অধিপতির চেহারা। স্থির দৃষ্টিতে তাকালো শাসা।
আচমকা ম্যাক্সের মুখেও আতঙ্ক ফুটে উঠল। বুঝতে পারল সরাসরি ধাক্কা খেলে কপালে কী আছে। তাই নিজে থেকেই একেবারে অন্তিম মুহূর্তে ঘুরিয়ে দিল নেমেসিসের নাক। এদিকে তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে শক্ত হাতে বাড়ি মেরে বলটাকে সোজা পোস্টের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল শাসা।
একটু পরেই বিজয়ী দল এগিয়ে এল স্ট্যান্ডে দাঁড়ানো ব্লেইনের কাছে। কেবল বন্ধুত্বসুলভ একটা হাসি দিলেও শাসার ওপর অত্যন্ত খুশি হয়েছেন কর্নেল ম্যালকমস। পাশে বসে থাকা ইসাবেলাও টের পেল স্বামীর অনুভূতি। ভালো ভাবেই জানেন ব্লেইন পুত্রসন্তানের জন্য কতটা উৎসুক ছিলেন। হঠাৎ করেই তাই নিজের ওপরই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লেন ইসাবেলা। আচমকা বলে বসলেন, “এই ছেলেটা বড্ড বেশি বেপরোয়া আর দায়িত্বহীন।” নিজের রাগ ঝাড়তে বেমক্কা মন্তব্য করে বসলেও জানেন ব্লেইন মনঃক্ষুণ্ণ হবেন। তারপরেও নিজের সহ্যশক্তিও যেন হারিয়ে ফেললেন, বললেন, “একেবারে মায়ের মতই হয়েছে–” ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন কর্নেল। রাগে জ্বলে উঠল তার চোখ। তবুও স্ত্রীকে বুঝতে না দিয়ে তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, “দেখি, তোমার জন্য লাঞ্চ নিয়ে আসি।” লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেলেন ম্যালকমস।
ইসাবেলার মনে হল বুঝি হাউমাউ করে কেঁদে উঠবেন, “আয়্যাম সরি, আমি আসলে তোমাকে অনেক ভালোবাসি ব্লেইন।”
ইসাবেলা লাল মাংস খেতে পারবেন না। তাই মাছের সন্ধানে ব্যুফে টেবিলের মাঝখানে এলেন ব্লেইন। কোর্টনির শেফদের দক্ষতা আসলেই প্রশংসার যোগ্য। এত সুন্দর করে পরিবেশন করা হয়েছে যে অতিথিদের বেশিরভাগই এসে আনন্দিত হয়ে চেখে দেখলেন বিভিন্ন পদ। এতটাই আনমনা ছিলেন যে সেনটেইনের উপস্থিতিও টের পাননি ব্লেইন।
“তুমি আমার ছেলেকে কী বলেছো কর্নেল যে ও এতটা ভয়ংকর হয়ে উঠল?” তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে তাকালেন ব্লেইন। সেনটেইনকে এত কাছে পেয়ে সত্যিই খুশি হয়েছেন।
“পুরুষদের কথা, বুঝলে? পাঁচ কান করতে নেই।”
হেসে ফেললেন সেনটেইন, “যাই হোক। সত্যিই কাজে লেগেছে। ধন্যবাদ ব্লেইন।”
“এর কোনো প্রয়োজনই নেই, ও নিজেই সবটুকু করেছে। শেষ গোলের মত এতটা দর্শনীয় কিছু আমি আসলেই অনেক দিন দেখিনি। দেখবে সামনে ও আরো কত ভালো করবে।”
“গোলটা দেখার পর আমার কী মনে হয়েছে জানো?” মাথা নেড়ে আরেকটু কাছে এগিয়ে এলেন কর্নেল।
“বার্লিনের কথা মনে পড়েছে।” চমকে উঠলেন ব্লেইন। তারপরেই ঘটনাটা মনে পড়তেই রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলেন।
.
বার্লিন ১৯৩৬। দ্য অলিম্পিক গেমস্। হেসে ফেললেন ব্লেইন।
“তুমি সত্যিই সিরিয়াস?” একদৃষ্টে তাকালেন সেনটেইনের দিকে। “অবশ্যই। ঘোড়াগুলো রাখার মতন সামর্থ্য আমার আর নেই। কিন্তু ওর দাদা নাতির খেলা দেখতে ভালোবাসেন, আর যদি টপ কোনো প্লেয়ারের পরামর্শ পায় তো নিজের বিস্ময় কাটাতে খানিকটা সময় নিলেন ব্লেইন। তারপর বললেন,
“তোমার ক্ষমতা দেখে আমি সত্যিই অবাক হচ্ছি। তোমার অসাধ্য বোধ হয় কিছুই নেই, তাই না?”
কিন্তু প্রশ্নটা শুনেই সেনটেইনের চোখ চকচক করে উঠতেই আবার বলে উঠলেন, “আমি আমার প্রশ্ন ফিরিয়ে নিচ্ছি ম্যাডাম।”
পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন দু’জনে। ভাগ্যিস কেউ দেখেনি। নয়ত তাদের মধ্যেকার ভালোবাসার এত নগ্ন বহিঃপ্রকাশ আর গোপন থাকত না। একটু পরে আস্তে করে চোখ সরিয়ে নিলেন সেনটেইন।
“জেনারেল স্মুট তোমাকে খুঁজছিলেন, আমরা স্ট্যান্ডের পেছনে ওকের নিচে বসেছি। স্ত্রীকে নিয়ে চাইলে চলে এসো।” ঘুরে উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করলেন সেনটেইন।
